এসে গেল অক্টোবর। এসে গেল বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো।
বছরের অন্য এগারোটি মাসের সঙ্গে অক্টোবরের যেন কোথাও একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় সে নিছক আর-একটি মাস হলেও বাঙালির মনে অক্টোবর মানেই অপেক্ষার অবসান, ঘরে ফেরার ডাক, পুরোনো সম্পর্কের ধুলো ঝেড়ে আবার কাছাকাছি আসা, আর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায় ভেসে আসা এক আশ্চর্য আনন্দের পূর্বাভাস।
শিউলির গন্ধ, কাশফুলের দোলা, ভোরের বাতাসে হালকা শিরশিরে ভাব, দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ—এসব মিলেই যেন আমাদের মনে ঘোষণা করে, মা আসছেন।
দুর্গাপুজো কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; অন্তত বাঙালির জীবনে তাকে শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডির মধ্যে বেঁধে রাখা যায় না। এ আমাদের সামাজিক মিলনোৎসব, আমাদের শিল্পের উৎসব, আমাদের স্মৃতির উৎসব, আমাদের শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার উৎসব। যে মানুষটি সারা বছর কাজের চাপে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সময় পান না, তিনিও পুজোর চারটে দিন পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ করেন। যে সন্তান কর্মসূত্রে বহু দূরে থাকে, তার কাছেও পুজো মানে বাড়ি ফেরার আকুলতা। আর যাঁরা কোনও কারণে ফিরতে পারেন না, তাঁদের মনও এই ক’দিন অদৃশ্য এক সুতোয় বাঁধা থাকে নিজের শহর, নিজের পাড়া, নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর সঙ্গে।
ছোটবেলার পুজোর স্মৃতি আমাদের প্রত্যেকের কাছেই আলাদা। কারও মনে আছে নতুন জামা পরে বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বেরোনোর কথা, কারও মনে আছে অষ্টমীর অঞ্জলি, কারও নবমীর রাতের আড্ডা, আবার কারও কাছে পুজো মানে প্যান্ডেলের পাশের দোকানের ফুচকা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে উদ্দেশ্যহীন হাঁটা। সময় এগোয়, শহর বদলায়, পুজোর আয়োজন আরও বড় হয়, প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে আরও দ্রুত করে তোলে; কিন্তু আশ্চর্যভাবে কিছু অনুভূতি একই থেকে যায়। ঢাকের প্রথম আওয়াজ আজও বুকের কোথাও সেই পুরোনো উত্তেজনাটাই জাগিয়ে তোলে।
তবে উৎসবের আনন্দের মধ্যেও আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর কথা মনে রাখা জরুরি। আমাদের আলোর পাশে কোথাও যেন অন্ধকার না থেকে যায়। নতুন পোশাক কেনার আনন্দের পাশাপাশি যদি আমরা কারও মুখে সামান্য হাসি তুলে দিতে পারি, বিপন্ন কোনও মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি, একাকী কোনও প্রবীণের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে পারি, তাহলেই হয়তো দেবীপক্ষের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে।
দেবী দুর্গা তো শেষ পর্যন্ত শক্তির প্রতীক—অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভবোধের শক্তি, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর শক্তি। সেই শক্তি কেবল মণ্ডপে আরাধ্য হয়ে থাকলে চলবে না; তাকে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও ধারণ করতে হবে। অসহিষ্ণুতার পরিবর্তে সহমর্মিতা, বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা এবং বিভেদের পরিবর্তে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ—এই হোক এবারের পুজোর সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।
‘আক্ষরিক’-এর পক্ষ থেকে আমাদের সমস্ত পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ী এবং তাঁদের পরিবারকে জানাই আন্তরিক শারদীয় শুভেচ্ছা।
এই পুজো সকলের জীবনে নিয়ে আসুক আলো, শান্তি এবং নতুন আশার বার্তা।
ভালো থাকুন, কাছের মানুষদের ভালো রাখুন।
শুভ শারদীয়া।
অনির্বাণ কুন্ডু
সম্পাদক
আক্ষরিক অনলাইন মাসিক পত্রিকা
.jpeg/:/rs=w:400,cg:true,m)
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.