
ঔরস
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫.
আমার নতুন বস ব্রিজলাল সাক্সেনা রসিক মানুষ। অত্যন্ত দক্ষ আর অসম্ভব কাজেরও মানুষ, নইলে কোম্পানি ছেষট্টি বছর বয়স অবধি রাখত না ওঁকে কিন্তু এই সবকিছুর সঙ্গে ব্রিজলালের সেন্স অফ হিউমার এত তীব্র আর তীক্ষ্ণ যে তার সামনে কথা বন্ধ হয়ে যায়।
-আচ্ছা তোমরা বাঙালিরা এই যে সারাক্ষণ ‘খোট্টা’, ‘জাঠ’ ‘কাউ-বেল্ট’ এসব বলো; কী বোঝাও কথাগুলো বলে? ইউপি, দিল্লি, রাজস্থানের লোকগুলো খুব গোদা, বুদ্ধিহীন, এটাই তো?
সেলস প্রোগ্রেস রিপোর্ট নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম। এই প্রশ্নের কোনও উত্তর যোগাল না মুখে।
-আচ্ছা তোমার মনে হয়, মথুরায় জন্মানো কৃষ্ণ খুব বোকা একটা লোক ছিলেন? বা হারিয়ানভি অর্জুন একদম মাথামোটা? ব্রিজলাল ভুরু নাচালেন।
-এসব আসলে হাজার-হাজার বছর আগেকার কথা তাই...
-ওকে, লেটস কাম টু দ্য প্রেজেন্ট। রাজস্থান থেকে যে লোকগুলো লোটা-কম্বল সঙ্গে করে কলকাতায় এসে আজ কলকাতার প্রায় আশিভাগ প্রাইম প্রপার্টির মালিক, তাদের একদম আকাট বলে মনে করো তুমি?
-নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালির যা অবদান বা শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে , তার কাছাকাছি অন্য কেউ আসে না।
ব্রিজলাল ইলেকট্রনিক সিগারেট ঠোঁটের ফাকে নিয়ে বললেন, আই এগ্রি। কিন্তু নিজেকে যে জাতি বাঁচাতে পারবে না, সে নিজের ইতিহাসকে বাঁচাবে কী করে? যখন ছোট ছিলাম তখন আমার বাবা বলতেন যে বাংলা না শিখলে পরে ভারতে ‘এলিট’ হওয়া যায় না। আমাকে তাই বাড়িতে মাস্টার রেখে বাংলা শেখানো হয়েছিল রীতিমতো। বঙ্কিম পড়তে গিয়ে দাঁত ভেঙে যেত, শরৎচন্দ্র এনজয় করতাম, পরে শরদিন্দুও। আমার ছেলে-মেয়েরা কেউ বাংলা না শিখলেও আমার নাতি বেশ গড়গড়িয়ে বাংলা বলতে পারে। কারণ কী জানো?
-আপনি শিখিয়েছেন?
-মোটেই না। আমার সঙ্গে তো দেখাই হয় ন’মাসে, ছ’মাসে এক-আধবার।ওরা বাংলা শিখেছে বাড়ির কাজের লোকেদের থেকে। দিল্লি এবং সংলগ্ন অঞ্চলে এখন ‘ডোমেস্টিক হেল্প’দের প্রায় নব্বই শতাংশ বাংলাভাষী। বঙ্গ গরিমা একেবারে ফুল সার্কল কমপ্লিট করে ফেলেছে। হেসে উঠতেন সাক্সেনা।
আমার সেই হাসির আওয়াজটা খারাপ লাগলেও ওঁর কথার পিছনের যুক্তি খণ্ডাতে পারতাম না।
-তবে মনখারাপ করার কিছু নেই চয়ন। বাঙালিরা ভারতের একটা জিনিসের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে আর সেটা হচ্ছে ছেলে-মেয়েদের নাম। তুমি জানো আমি এমন অনেক গুজরাতি, তেলুগু, মারাঠি পরিবারের সংস্পর্শে এসেছি যাদের পরিবারের চার-পাঁচ-ছয়জন ভাইবোনের নাম শরৎচন্দ্রের কোনও না কোনও উপন্যাসের চরিত্রের নামে। কেউ রমেশ তো কেউ বিন্দু, কেউ শ্রীকান্ত তো কেউ অচলা। আমার নামই তো ‘অপূর্ব’ রাখতে চেয়েছিলেন আমার বাবা, কিন্তু আমার ঠাকুমার জেদাজেদিতে সম্ভব হয়নি। ব্রিজলাল ইলেকট্রনিক সিগারেট ঠোঁট থেকে নামিয়ে রিপোর্টে মন দিতেন।
মাঝেমধ্যে আমাকে নিয়ে পার্ক স্ট্রিট বা চাঁদনিতে ড্রিংক করতেও যেতেন ব্রিজলাল। আর দু-তিন পেগের পরই ওঁর ভিতরের যন্ত্রণাটা উথলে উঠত। মাঝবয়সে এক অধ্যাপিকার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে নিজের পরিবারের কাছে ব্রাত্য হয়ে যান ব্রিজলাল। না, সেই সম্পর্ক থেকে কোনও সন্তান আসেনি পৃথিবীতে কিন্তু বছর দুয়েক একসাথে ছিলেন সেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে। তার অল্প কিছুদিন আগেই ওঁর স্ত্রী মারা গেছেন আর নিঃসঙ্গ ব্রিজলালের কাছে সেইসময় মনস্বিতা ভার্মা একটা মরুদ্যান হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি সেই সম্পর্ক কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরা সৈনিক যেমন নিজের শরীরের বুলেটটাকে অনন্তকাল ভিতরে বহন করে, ব্রিজলালও মনস্বিতার স্মৃতি সেভাবে বহন করতেন।
গ্লাসে চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলতেন, নৌকাটাকে একবার ভাসিয়ে দিলে সে তো ভেসেই যাবে তাই না, যতক্ষণ না ডুবে যাচ্ছে! পুরুষের জীবনও তেমনই। সে তো বাই নেচার অ্যাডভেঞ্চারিস্ট। একটা সিংহ কি গরুর জীবন যাপন করতে পারে?
বুঝতে পারতাম যে প্রেমে ব্যর্থ ব্রিজলাল ওই আগ্রাসনটাকেই সেলসের কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন।
একটা বিশেষ বারে বসে আমাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন, তুমি তোমার সাংসারিক জীবনে সন্তুষ্ট?
-হ্যাঁ, অসুবিধে তো কিছু নেই।
-সুবিধে-অসুবিধের কথা জিজ্ঞেস করিনি। জিজ্ঞেস করেছি, সন্তুষ্ট কি না।
চুপ করে থাকতাম। কী উত্তর দেব? হেসে ‘হ্যাঁ’ ব’লে চলে আসতাম। কুটুস হবার পর থেকেই ঝুমা ওকে নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত । সেটাই হয়তো স্বাভাবিক, বিশেষ করে আমি যখন কাজের চাপে সেরকম খোঁজখবরই রাখতে পারি না। কিন্তু আমার আর ঝুমার নৈকট্য যে বালির তলা দিয়ে বইতে থাকা নদীর মতো অদৃশ্য হয়ে গেল প্রায় তাই নিয়ে অভিযোগ জানাব কাকে? কুটুস হওয়ার পর আমি একবার ঝুমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ও অত ঝুলন সাজাতে ভালবাসত তাহলে বিয়ের পর একবারও ঝুলন সাজালো না কেন, ফ্ল্যাটের বারান্দায়? হোক না ভাড়ার ফ্ল্যাট তবু তো নিজেদেরই।
-আসলে জ্যান্ত পুতুল আর আসল সংসার পেয়ে গিয়েছি তো, এখন ওইসব ইট-বালির নকল পৃথিবী আর প্লাস্টিকের পুতুল ঘাঁটাঘাঁটি করতে মন চায় না। কুটুসকে জড়িয়ে ধরে ঝুমা জবাব দিয়েছিল।
আমি সেই কথার উত্তরে মনে মনে বলেছিলাম, জ্যান্ত পুতুলের কিন্তু কিছু চাহিদা থাকে। শুধু ছোট পুতুলদের নয়, বড় পুতুলদেরও।
ঝুমা শুনতে পায়নি।
তবে অভিষেকের ঘটনাটার পর খানিকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল ঝুমা। সাক্সেনা সাহেবের সাহায্যেই আমি যে জাহ্নবীর একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি, মেয়েটাকে নিজের কাছে নিয়ে একজন মা যে বাঁচতে পারছে, ঘুণাক্ষরেও সেসব বলিনি ঝুমাকে। বললে পরে ও খামোখা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। পদে পদে সন্দেহ করত যে আমি এখন হয়তো অভিষেকের বিপন্ন প্রেমিকার সঙ্গে মেলামেশা করছি, অভিষেকের মেয়ের হয়তো বা বকলমে আমিই বাবা এখন।একদিন রাত্রে, যখন আমার নিশ্বাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ওর নিশ্বাস , আমার জিভের লালার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ওর লালা, ওর কপালের চুল এসে ঢেকে দিচ্ছে আমার চোখ, একটা গোটা পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে গিয়েই আলোতে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে , তখন ঝুমা আমায় জিজ্ঞেস করেছিল যে ও আবার মা হতে পারল না বলে আমি ওকেও ছেড়ে যাব কি না!
সেই রাত্রির পর থেকেই আমি অনেক মেপে কথা বলা শুরু করি ঝুমার সঙ্গে। স্থিতিস্থাপকতা হারিয়ে ফেলেছে যার মন তাকে কথা দিয়ে এদিক-ওদিক টানা একরকম অত্যাচার করাই। দ্বিতীয় যে কাজটা জোরকদমে শুরু করে দিই তা হল বাচ্চা দত্তক নেওয়ার চেষ্টা।
কিন্তু সেটাই কি খুব সহজ? চোদ্দরকম কাগজপত্র জমা করে, রোজগারপাতির অকাট্য প্রমাণ দিয়ে আরও হাজারদফা, ‘কী চাইছি’, ‘কেন চাইছি’র উত্তর দিয়েও অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হল শুধু। বোঝাতেই পারছিলাম না যে একটি ছেলে থাকা সত্ত্বেও, কেন আমরা আর একটি সন্তান, একটি মেয়ে নেব। প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠে আসছিল। ভারতে যেখানে লাখো বাচ্চা ফুটপাথে মরছে, শিশুশ্রমিক হয়ে কাজ করছে চায়ের দোকানে, কয়লা খাদানে, সেখানে একটা বাচ্চাকে আমরা ভালবাসায়, মমতায় বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছি, মানুষ করতে চাইছি, এইটাই কি যথেষ্ট নয়?
নিজের সন্তানের মতো করে নয়, নিজের সন্তান করেই মানুষ করব, একটু সংবেদনশীলতা থাকলেই উলটোদিকের লোকটার সেটা বোঝার কথা কিন্তু এই দেশে একটা চেয়ারে বসলেই বোধহয় মানুষের মানুষকে হ্যারাস করার ইচ্ছা জন্মায়। সরকারি সেট-আপ হলে সেই ইচ্ছেটা চতুর্গুণ বৃদ্ধি পায়, সেটা নিজে যখন সরকারি চাকরি করতাম তখনও বুঝেছি, এখনও বুঝছিলাম।
ওই বিশেষ বারটাতে যেদিনগুলো যেতাম আমরা, ব্রিজলাল বার-সিঙ্গারদের টাকা দিতেন। জঘন্য একটা নিয়ম ছিল বারটার। পাঁচশো টাকার নোট একবারে কেউ দিলে সে গায়িকার ব্লাউজের ভিতর হাত ঢুকিয়ে টাকাটা ভরে দিতে পারত।
-ঠিক সেই কারণেই আমি একশো টাকার দশটা নোট আলাদা আলাদা করে দিই, একসাথে পাঁচশো টাকা দেওয়ার ছলে একজন শিল্পীর ব্লাউজের ভিতরে হাত ভরে তাকে অপমান করি না।
শ্রদ্ধায় আমার মাথা নিচু হয়ে গেল, ইচ্ছে করল মানুষটাকে একটা প্রণাম করি। মাথা নামিয়ে ফেলেছিলাম নিজের, যখন তুললাম, সাক্সেনা আমার চোখ দেখেই বুঝতে পারলেন যে আমার ভিতরে একটা তোলপাড় চলছে।
-আমাকে কিন্তু মহৎ কিছু ভেবো না চয়ন। আমি আমার রিলেটিভদের মধ্যে খুব নিন্দিত একটা লোক যে বউ মারা যাবার পর, পঞ্চান্ন বছর বয়সে একজন মধ্য চল্লিশের মহিলার সঙ্গে লিভ-টুগেদার করেছে।
-সেটা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আমি সেটা মানতে রাজি নই।
-আসলে কি জানো চয়ন, মধ্যে-মধ্যে দিল্লি-বম্বে করলেও জীবনের একটা বড় অংশ কলকাতায় কাটিয়েছি তো, অনেককিছুই দেখেছি সামনে থেকে, তাই অনেক বাঙালি ভণ্ডামি আর বাঙালি সূক্ষ্মতা আমার মধ্যে মিশে গেছে।
-গল্প বলুন। শুনি। আজ তো শনিবারের সন্ধ্যা, তাড়া তো কিছু নেই। আমি একটা চুমুক দিলাম গ্লাসে।
ব্রিজলাল যেন আমার কথাটারই অপেক্ষায় ছিলেন। নস্টালজিয়ায় ডুব দিলেন, চাকরি জীবনের প্রথমদিকে ক্রিক রো’র একটা বাড়ির একটা ঘর নিয়ে ভাড়া থাকতাম। আমার পাশের ঘরের ভাড়াটে নির্মলদা আমাকে এই বারে নিয়ে এসেছিল প্রথম। চুপিচুপি। এখানে তখন নির্মলদার বউ সুমিতাবউদি গান গাইত।
-সেই সময়? বাঙালিবাড়ির বউ? বারে ?
-উপায় কী? দাদার কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তো।মোটামুটি ভাল পোস্টেই চাকরি করত লোকটা। হঠাৎ করে স্ট্রাইক শুরু হল কারখানায়, মজুরি বাড়ানোর দাবিতে। মালিকরা আশি টাকা অবধি রোজ দিতে চাইছিল কিন্তু শ্রমিক নেতৃত্ব একশো দশের নিচে নামতে রাজি হল না কিছুতেই।
-কিন্তু এই আন্দোলনটাকে আপনি অন্যায় বলতে পারেন না।
-আরে ভাই, আমি ন্যায়-অন্যায় বলার কে? নিশ্চয়ই মজুরিবৃদ্ধির দাবি যুক্তিসঙ্গতই ছিল। আমার যেটা দেখে অবাক লেগেছিল তা হল যে আন্দোলনটার নেতৃত্ত্বে ছিলেন, শিক্ষক, অধ্যাপক, সরকারি চাকরি করা বাবুরা। এবার কারখানা তো আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা লোকেদের নয়, তারা যেখানে আশির বদলে ষাট টাকা রোজে কাজ করাতে পারবে সেই মুলুকে শিফট করিয়ে দিল যন্ত্রপাতি আর মস্ত বড় বড় কয়েকটা তালা ঝুলে গেল কারখানার গেটে। এবার যেদিন কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেল তার তিন-চারদিন পর থেকেই ওই টিচার, প্রফেসর, বাবুরা সরে গেল আন্দোলন থেকে। শ্রমিকরা কেউ তাদের ঘরে একবেলা একথালা ভাত পেল না; ওদের বাচ্চাগুলো শীতে কাতরে মরলেও সোয়েটার পেল না একখানা, কেবল “তোমাদের মনের জোর রেখে লড়ে যেতে হবে”র বাইরে কোনও বাণী ভেসে এল না বিপ্লবের বুলি আওড়ানো ব্রাউন সাহিবদের কাছ থেকে।
-মালিকরা শোষণ করছিল সেটা যেমন সত্যি ...
ব্রিজলাল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, মালিকরা তো মুনাফা করতেই এসেছে, চ্যারিটি নয়। তুমি তাদের পঞ্চাশটাকা রেভিনিউ এনে দিলে, তারা তোমাকে পাঁচ টাকা দেবে। সেটাকে যদি খারপও বলি তবু এটা তো সত্যি যে রক্তশোষণ করার জন্য অন্তত পান্তাভাত খাওয়াতে হবে? এবার তুমি বলতে পারো যে শ্রমিকরা আজীবন ‘পান্তাভাত’ খাবেই বা কেন?
-যাই বলি, তার উত্তর আছে তো আপনার কাছে।
-অবশ্যই আছে, কারণ আমি স্পটেই ছিলাম, সেই সময়টার মধ্যে ছিলাম। তাই ‘পোলাও খাওয়াব’ বলে যারা ভাতটাও বন্ধ করে দিয়েছে তাদের ক্ষমা করতে পারি না কিছুতেই।
-নির্মলদার বউয়ের গল্পটা শেষ করুন।
-বউদির দারুণ গানের গলা ছিল। তখন তো এইসব টিভি চ্যানেল হয়নি, ফাংশনে চান্স পাওয়াও কঠিন ছিল, বউদি এই বারে গান গাইতে আসত।আর নির্মলদা আমাকে সঙ্গে নিয়ে আসত বউদিকে পাহারা দিতে। অবাক করা কাণ্ড কী জানো, তখনও এই ব্লাউজের ভিতর টাকা ভরে দেওয়ার ব্যাপারটা চালু ছিল। একশো টাকা লাগত সেই সময় সিঙ্গারের বুকে হাত দেওয়ার জন্য। বউদির বুকের দিকে কেউ হাত বাড়াচ্ছে দেখলেই নির্মলদা অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে নিত। তারপর আমায় জিজ্ঞেস করত, কটা নোট জমা পড়ল।
-আপনি কিছু বলতেন না?
-কী বলব, বউদি ওই কাজটা না করলে দুটো বাচ্চা সমেত পরিবারটা না-খেয়ে মরত তো। নির্মলদা আর কোনও কাজেরই উপযুক্ত ছিল না। খালি গবেষণা করত যে আদর্শ কপচিয়ে মাথাটা খেয়ে ফেলার পরও মানুষের খিদে পায় কেন।
-আচ্ছা স্যার, ওই নির্মলদার জায়গায় কোনও বিহারী বা মাড়োয়াড়ি কিংবা ইউপি’র লোক হলে কী করত বলে মনে হয় আপনার?
-ইউপি’র কায়স্থ হলে কী করত বলতে পারি না, তবে বিহারী হলে ছাতু বেচত, সর্দারজী হলে ট্যাক্সি চালাত, ওড়িয়া হলে প্লাম্বিং মিস্ত্রি বা জল-দেওয়া ভারী হত আর মাড়োয়াড়ি শ্রমিক হয় না, মালিক হয় তাই এই সিচুয়েশনেই পড়ত না।
-একমাত্র বাঙালিই তাহলে বিপদে পড়লে বউকে সামনে ঠেলে দেয়?
-মে বি, নারী-পুরুষের সমানাধিকারে বিশ্বাস করে তাই। নির্মলদা যেমন বলত যে বাচ্চাদের খাইয়ে রাখার দায়িত্ব ওর যতটা, বউদিরও ততখানি। কিন্তু আবার সেই লোকটাই গলা নামিয়ে আমাকে বলত যে ব্লাউজের ভেতর যতগুলো নোট যায় বউদি নাকি ততগুলোর কথা বাড়িতে ডিক্লেয়ার করে না। কম করে বলে।
লেট সিক্সটিজ-আর্লি সেভেন্টিজ, নকশালবাড়ি, ভাড়াবাড়ি, ইউপি’র ব্রিজলাল, বাংলার সুমিতাবউদি , ব্লাউজের ভিতর গুঁজে দেওয়া টাকা আর তার সংখ্যা নিয়ে দ্বন্দ, সব কীরকম ককটেল হয়ে ধাক্কা মারছিল মাথায়। আর তার ভিতরে গমগম করছিল গান।
-একটা জিনিস খেয়াল করেছ? নন-বেঙ্গলিরা কেউ হিন্দি গান শুনতে চাইছে না। সন্ধ্যা-লতা-আরতি শুনতে চাইছে।কেন বলো তো?
-কেন? আমি প্রতিপ্রশ্ন করলাম।
বাংলা গানের মিঠাসটা চাইছে লাইফে। বাংলা সুর, বাংলা কথা, বাংলা ছেনালিও এত মিষ্টি যে অল ইন্ডিয়ার লোক পাগল হয়ে যায়। এই সুইটনেস যে বুঝবে না, তাকে দিয়ে কি বাঙালির দোষ-গুণের বিচার হবে?
- হবে না। আমি হালকা নেশার ঘোরে বললাম।
-রাইট ইউ আর। তাই তো রুদ্রাশিসের কেসটা তোমাকেই হ্যান্ডল করতে হবে।
-মানে?
ব্রিজলাল শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ডোন্ট ওরি। তোমার সঙ্গে আর একজনকে দেব।
(ক্রমশ...)
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.