
ঔরস
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
১৪.
জীবন দৌড়য়, থেমে থাকে না। থেমে থাকা সম্ভব নয় জীবনের পক্ষে। এমনকি যখন তার ভিতরে দুম করে মৃত্যু এসে আছড়ে পড়ে, তখনও নয়। কিন্তু দু’দণ্ড চুপ করে যায়। বিস্ময়ে, আতঙ্কে।
মাসখানেক পর অফিস থেকে ফিরে আমিও বোবা হয়ে গিয়েছিলাম কিছুক্ষণের জন্য। টিভির পর্দায় লাগাতার ‘শান্তিনিকেতনে অশান্তির খুন’ দেখে নয়, অভিষেক আর হোটেলে ওর সঙ্গে থাকা মেয়েটির মুখের ক্লোজ-আপ দেখে। একবার, বারবার।
ঝুমা একদম সেঁটে ছিল টিভির সঙ্গে। আমি ওকে একটা ধমক দিয়ে বললাম, করছটা কী? যাও না গিয়ে কুটুসকে পড়াও।
-রোজই তো পড়াই। আজ একটু এটা দেখতে দাও। কীভাবে নিজের বউকে মার্ডার করেছে লোকটা, নিজের প্রেমিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে।শালা, প্রেমিকা না ডাইনি! এরকম কোনও ডাইনি তোমার জীবনে আসেনি তো? ঝুমা আমার মুখের দিকে না তাকিয়েই বলল।
আমি কড়া গলায় বললাম, না আসেনি। কিন্তু তুমি এইসব বললে আমি খুঁজে দেখব পাই কি না।
-না, না, একদম খুঁজতে হবে না। আমি সরি। এই কান ধরছি। ঝুমা টিভির সামনে থেকে উঠে কিচেনে চলে গেল, আমার জন্য চা বানাতে।
-আমি এই খুনিকে চিনি জানো তো? আমি গলা তুলে বললাম।
-মানে? ঝুমা রান্নাঘর থেকেই জানতে চাইল।
-অভিষেক আমার ক্লাসমেট ছিল, কলেজে।
-তুমি ওর সঙ্গের ওই মেয়েটাকেও চেনো নাকি?
আমি হোটেলে দেখা হওয়ার ঘটনাটা চেপে গেলাম, তাকে কীভাবে চিনব? তবে অভিষেকের বউ সুস্মিতাকে চিনি। আমাদের এক ব্যাচ জুনিয়র ছিল।
-ওদের একটা মেয়েও আছে জানো।
-কাদের? অভিষেক আর সুস্মিতার?
-আরে না ওই ডাইনিটার সঙ্গে তোমার বন্ধুর একটা মেয়ে আছে। বাচ্চাটাকে দেখাচ্ছিল টিভিতে। কাঁদছিল বেচারি।
-বাচ্চাটাকেও ছাড়েনি টিভি ক্যামেরা? টিআরপি বাড়ানোর জন্য তাকেও টেনে এনেছে?
-ওকে না দেখালে তো রহস্যটা ক্লিয়ার হচ্ছে না।
-তুমি চুপ করো তো ঝুমা। একটা দুধের বাচ্চাকে ডিস্টার্ব করে যে রহস্য ক্লিয়ার করতে হয় আমি থুতু দিই তাতে।
-সে বললে কী করে হবে? নিজের বউয়ের সঙ্গে বাচ্চা করেনি, বাইরের পেত্নির কোলে ফুল ফুটিয়ে এসেছে! সত্যি ছেলেরাই পারে। একফোঁটা বিশ্বাস করার জো নেই কাউকে।
আমাকে চা দিয়ে আবারও টিভির সামনে বসে গেল ঝুমা।
আমি ওর কথার জবাব না দিয়ে চুপচাপ ভাবতে থাকলাম, যে মেয়েটার সঙ্গে অভিষেককে ‘হোটেল সানশাইন’এ দেখলাম, সে আসলে অভিষেকের বাচ্চার মা? তাহলে অভিষেক তার সঙ্গে না থেকে সুস্মিতার সঙ্গে থাকতই বা কেন? সেদিন যখন ওরা হোটেলে মস্তি করছে তখন বাচ্চাটা কোথায় ছিল?
দিনতিনেক পরে আমার এক কলিগের বউভাতে গিয়ে আমার আর এক ক্লাসমেট অত্রির সঙ্গে দেখা। অত্রি গ্র্যাজুয়েশন করে ল’ পড়তে চলে গিয়েছিল। এখন আলিপুরে প্র্যাকটিস করে। এগিয়ে এসে আমার হাতটা ধরল। তারপর ঝুমার দিকে তাকিয়ে অনুযোগ করল, ওকে বিয়েতে নেমন্তন্ন করা হয়নি বলে।
-তোর বিয়েতে আমায় বলেছিলি? তখন তো মোবাইল হাতের পাঁচ হয়নি ভাই। আমি জবাব দিলাম।
-আমি তো বিয়েই করিনি। আরে উকিলের পসার জমতে জমতে চল্লিশ পেরিয়ে যায়। যখন জমে তখন আর বিয়ের বয়স থাকে না।
-ছেলেরা চাইলেই বিয়ে করতে পারে। বয়স-ফয়স আবার কী? ঝুমা বলল।
-সে পারে, কিন্তু আমার বয়সে আপনার মতো সুন্দরী তো আর মিলবে না ম্যাডাম। খেঁদি-পেঁচি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
কথাটা শুনে ঝুমা বেশ খুশি হয়ে হেসে উঠল। আর ওর ওই আহ্লাদ দেখে মাথাটা একটু গরম হল আমার। আরে বাবা, ওটুকু তো হবে!
-মারব এক থাবড়া। ‘খেঁদি-পেঁচি’ আবার কী রে? যে মেয়েটা তোকে ভালবেসে বিয়ে করবে সেই ঊর্বশী তোর কাছে। তাকেই সম্মান দিয়ে ঘর করবি।
-ব্বাবা! চয়ন তো একদম গুরুঠাকুরদের মতো লেকচার দিতে শিখেছে। আমাদের অভিষেকও এরকম লেকচার দিত। এখন জেলে বসে কাওয়ালি গাইছে।
-তুই শেষে অভিষেকের সঙ্গে আমার তুলনা করলি? ছি ছি!
- তুলনা কই করলাম, জাস্ট বললাম। আর তাছাড়া অভিষেক ছেলেটাও খুব খারাপ নয়, কপালদোষে ফেঁসে গেছে।
-নিজের বউকে যে খুন করেছে সেই লোকটা খারাপ নয়? এ আপনি কী বলছেন? না, আপনার বিয়ে না করাই ভাল।ঝুমা রেগে গেল এবার।
-আপনারা দু’জনেই ভুল বুঝছেন আমায়। আমরা ওকালতি করি, আমাদের অনেক গভীরে গিয়ে দেখতে হয় ব্যাপারটা। অভিষেক তো আর খুন করতে চায়নি সুস্মিতাকে।
-বউ থাকতেও অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে জড়াল কেন?
-আসলে অভিষেকের মনে বাবা হওয়ার শখ ছিল খুব আর সুস্মিতা যেহেতু ওকে একটা বাচ্চা দিতে পারেনি...
- বাচ্চা দিতে পারেনি মানে? মেয়েরা কি গরু যে বাচ্চার জন্ম দিতেই হবে? কোন মান্ধাতার যুগে পড়ে আছেন আপনারা?
অত্রি ঘাবড়ে গেল, রাগ করবেন না ম্যাডাম। আমি তা বলতে চাইনি। আইন ভাঙিয়ে খাই , এক্সট্রা-ম্যারিটাল থেকে যে কত অশান্তি, কত খুনোখুনি, রোজ দেখছি। কিন্তু অভিষেকের ওই পার্টনার প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলে অভিষেক যে বাচ্চাটা অ্যাবর্ট করাতে পারেনি তার কারণ...
-আপনাদের বন্ধু বাবা হতে চাইছিল। আর বাবা হতে চেয়ে একজন পুরুষ যা খুশি তাই করতে পারে। তার সাতখুন মাফ। সত্যি, সমাজ বটে একটা।
-ঝুমা, তোমার এত উত্তেজিত হবার মতো কিছু হয়নি। অত্রি তুই বল, খুনটা কেন হল? টিভিতে দেখে ঠিক ক্লিয়ার হয়নি আমার।
-টিভিতে আলোচনা করতে আসা লোকগুলো এ ওকে হারাবে বলে এমন বাজে বকতে থাকে যে পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে যায়। আসলে কিন্তু কেসটা একদমই জটিল নয়।
-শুনি সেটা। ঝুমাই বলল।
-ব্যাপার আর কী? অভিষেক শান্তিনিকেতনে গেছে, সুস্মিতাকে নিয়ে। ওদিক থেকে জাহ্নবীও এসেছে। অভিষেক আর জাহ্নবীর মেয়েকে নিয়ে। দোলের দিনগুলো এইভাবেই বাবা-মেয়ের দেখা হবে, এরকম একটা কিছু প্ল্যান করেছিল হয়তো। কিন্তু জাহ্নবী আর বাচ্চাটাকে নিয়ে একটা ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েছিল অভিষেক। বুঝতে পারেনি যে সুস্মিতা ওখানে চলে আসবে। আর সুস্মিতা যখন এসেছে তখন অভিষেক বাচ্চাটাকে নিজের হাতে খাওয়াচ্ছে। সুস্মিতা এগিয়ে গিয়ে চার্জ করে অভিষেককে। অভিষেক তখনকার মতো ধামাচাপা দেওয়া চেষ্টা করে, আল-ফাল বকে। কিন্তু সফল হয় না। তারপর, আমি যা জেনেছি, সুস্মিতা ফর্ক কিংবা চাকু একটা কিছু দিয়ে অ্যাটাক করে ওদের। অভিষেক আত্মরক্ষার্থেই ওকে ঠেলা দেয় আর তিনতলা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়ে মৃত্যু হয় সুস্মিতার।
-বাবা, আপনি তো একদম ওই খুনিটার উকিলের মতো কথা বলছেন! ঝুমা ব্যাঙ্গের গলায় বলল।
অত্রি হাসল, আমি তো উকিলই ম্যাডাম। তবে অভিষেকের নই। যদি হতাম তাহলে অভিষেককে এতবড় অ্যাডভেঞ্চার করতে বারণ করতাম। সুস্মিতাকে লুকিয়েই যখন চালাচ্ছিল তখন দু’জনকে একই জায়গায় নিয়ে যাওয়ার দরকার কী ছিল?
-দু’জন বলছেন কেন? তিনজন বলুন। ওই জারজ বাচ্চাটাও তো গিয়েছিল।
-ঝুমা ,জারজ হলে পরেও বাচ্চাটা বাচ্চাই। সেটা ভুলে যেও না। আমি আর না বলে পারলাম না।
ঝুমা তখনকার মতো চুপ করে গেলেও, কথাটা ওর মনোমতো হয়নি সেটা বোঝাই যাচ্ছিল।
আমাদের অভ্যন্তরীন টেনশন অবশ্য অত্রি বুঝতে পারল না। ও বলে চলল, এখন তো অভিষেক জেলে আর জাহ্নবীও জামিন পায়নি। সবচেয়ে ঝামেলা হয়েছে ওই তিনবছরের মেয়েটার। সমাজের চাপে কোনও আত্মীয়স্বজনও ওকে নিজের বাড়িতে রাখতে চাইছে না। কোথায় কোন অরফ্যানেজে আছে বলে শুনেছি। জানি না, কেসের ফলাফল কী দাঁড়াবে আলটিমেটলি। যাই দাঁড়াক, বেশ কয়েক বছরের ব্যাপার। ততদন বা তারপরও মেয়েটার যে কী হবে?
- কী আবার হবে? জামিন পেয়ে গেলে দেবা-দেবী দু’জন মিলে সংসার করবে ওই অবৈধ বাচ্চাটাকে নিয়ে। আর আপনাদের মতো উকিলরা যখন আছেন তখন সুস্মিতার খুনটাকে অ্যাক্সিডেন্ট হিসেবে প্রমাণ করে দেওয়া কতক্ষণের ব্যাপার? ঝুমা বলে উঠল।
ঝুমার কথাটা কানে লাগছিল, বিশেষ করে যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ও একটা তিন বছরের বাচ্চা সম্বন্ধে মন্তব্য করছিল, কিন্তু সুস্মিতার সঙ্গে একাত্ম বোধ করার ওর নিজস্ব কিছু কারণ আছে, সেটা না বোঝার মতো গাম্বাট আমি ছিলাম না। একবার ভাবলাম ওকে বলি যে কুটুস আর ওকে নিয়ে আমি খুব সুখী। একটা মেয়ের ইচ্ছা ছিল কিন্তু এরকম কত ইচ্ছাই তো মানুষের থাকে, সব কি পুরণ হয় নাকি? কিন্তু বললাম না কারণ, বোঝাতে গিয়ে হয়তো বা ঝুমার একটা অপারগতাই ঝুমার কাছে নগ্ন করে দেব বলে মনে হচ্ছিল আমার। প্রলেপ দিতে গিয়ে রক্তক্ষরণ হবে আবার। কী দরকার?
...
অভিষেকের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ারও কোনও দরকার ছিল না সেভাবে কিন্তু ওই তিন বছরের মেয়েটার কী হচ্ছে না হচ্ছে ভেবে, আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কেউ নয়, কিছু নয়, তবু মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না ওই না-দেখা মুখটাকে।
পারছিলাম না বলেই অত্রির সাহায্যে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একদিন দেখা করার অনুমতি জোগাড় করলাম, আমার সহপাঠী অভিষেক পালিতের সঙ্গে। কিন্তু আমাকে দেখেই খচে গেল অভিষেক।
-কেন এসেছিস চয়ন? মজা দেখতে?
-না। মজা দেখার হলে অন্য অনেক জিনিস আছে দুনিয়ায়। আমি এসেছি, আমার খারাপ লাগছে বলে। কেন করলি বল তো এরকম?
- করতাম না তো কী করতাম? তিন বছরের একটা বাচ্চার বুকে চাকু বসাতে আসছিল সুস্মিতা, বসাতে দিতাম? তুই আমার জায়গায় থাকলে কী করতি? নিজের বাচ্চাকে বাঁচাতি না?
-বাঁচাতে গিয়েই হল? নাকি তুই জেনেবুঝে ধাক্কাটা দিয়েছিলি?
- না, দিইনি। আমি অনেক দিন ধরেই একটা মিটমাটের কথা ভাবছিলাম। মানুষ তো সাবমেরিন নয় যে জলের তলায় সারাজীবন লুকিয়ে থাকবে। আমি কোথাও একটা সমঝোতায় আসতে চাইছিলাম। যাতে শান্তিতে বাঁচতে পারে সবাই।
-এইরকম একটা কেসে সমঝোতা হয়? তুই কি পাগল?
-কেন হবে না বল তো? নিশাকে যদি অ্যাকসেপ্ট করে নিত সুস্মিতা, আমার আর জাহ্নবীর সম্পর্কটা মেনে নিত, কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত? তার বদলে নিজে মরল, আমাকেও মেরে গেল। আর ধ্বংস করে দিয়ে গেল আমার বাচ্চাটার জীবনটা।উফ! এত অসহিষ্ণু কেন মানুষ? অন্যের যা সেটাকে কোথাও নিজের বলে মেনে নেওয়া যায় না?
-উন্মাদের মতো কথা বলছিস তুই। পৃথিবীর কোনও মেয়ে মেনে নিতে পারে এটা? আর মেয়েদের আলাদা করে ধরলে তো হবে না, কোন ছেলে এটা মেনে নিত , তুই বল? তুই নিজে মানতি যদি সুস্মিতা প্রেগন্যান্ট হয়ে আসত অন্য কোনও ছেলের দ্বারা?
-আরে আমি তো ইম্পোটেন্ট নই। সুস্মিতার অন্যের কাছে যাওয়ার দরকারটা কী ছিল? কিন্তু সুস্মিতা তো বাঁজা। ও তো আমায় বাবা হবার সুযোগ দেয়নি। তাহলে ও একটু উদার হয়ে নিশাকে মেয়ে বলে মেনে নেবে, এটা এক্সপেক্ট করতে পারব না?
-তুই তিনশো বছর আগেকার একটা পৃথিবী থেকে কথা বলছিস। পৃথিবীটা এখন আর ওরকম নেই। তুই সাঁইত্রিশটা বিয়ে করা কুলীন বামুন নোস আর সুস্মিতাও মোগল হারেমের একশোটা বাঁদির একটা নয়। এটা টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি অভিষেক।
-থার্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি অবধি যদি পৃথিবী টেকে তাহলে সেদিনও সন্তান হওয়াটা বিয়ের একটা আবশ্যিক শর্তই থাকবে। তুই নিজে বাবা হয়েছিস, তুই বুঝিস না, বাবা হতে না পারলে কত লোকের দৃষ্টিতে নপুংসক হয়ে বেঁচে থাকতে হয়?
-তাই বলে তুই যা করলি...
-জ্ঞান দিস না তো। যা করেছি, বেশ করেছি। তার জন্য যদি ফাঁসিতে ঝুলতে হয় ঝুলব।তুই বিদেয় হ।
-সে আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু আমি আজ তোর জন্য আসিনি রে। আমি এসেছিলাম তোর মেয়েটার জন্য। আসলে আমি নিজেও একটা মেয়ের বাবা হতে চেয়েছিলাম। পারিনি। তাই, অত্রির মুখে তোর বাচ্চাটার দুর্দশা শুনে আর থাকতে পারিনি।
আমার কথার ভিতরেই হাউহাউ করে কেঁদে উঠল অভিষেক, একবার আমার মেয়েটাকে দেখলে তুই চোখ ফেরাতে পারবি না। সেদিন যখন হোটেলে তুই আমাকে আর জানুকে দেখলি, নিশা তখন ঘরে ঘুমোচ্ছে।
-মেয়েকেও নিয়ে গিয়েছিলি ওই হোটেলে?
-আমরা ওভাবেই সংসার করতাম রে। সুস্মিতাকে ফাঁকি দিয়ে, দুনিয়াকে লুকিয়ে ওই দু-তিনমাসে দু-চারদিন। ভাগ্যে সেটুকুও সইল না। কিন্তু তুই একটু দেখ না ভাই। তোর মেয়ের শখ বলছিলি, আমার মেয়েটাকেই নিয়ে গিয়ে মানুষ কর না। আমি জেল থেকে কবে বেরোব, দশ না পনেরো কতবছর লাগবে, কোনও ঠিক আছে? বেরোলেও ফিরিয়ে আনতে যাব না। ও মানুষ হচ্ছে, সেটুকুই শান্তি। নে না ভাই।
-ওর মা এখন কোথায়?
-জামিন পেয়েছে। কিন্তু যে কোম্পানিতে চাকরি করত সেটা তো গেছে। খাবে কী? মেয়েকে নিয়ে?
-তা হোক, তবু মায়ের থেকে মেয়েকে আলাদা করা উচিৎ নয়। আমি দেখছি যদি ভদ্রমহিলার জন্য কিছু করতে পারি।
-প্লিজ ভাই। আমি জানি তুই অন্যরকম ছেলে। তুই সুযোগ নিবি না।প্লিজ একটু দেখ। তাহলে জানু মেয়েটাকে নিয়ে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারবে অ্যাটলিস্ট।
আমি অভিষেকের হাতে আমার কার্ডটা দিয়ে বললাম, তোর সঙ্গে যেদিন দেখা করতে আসবে সেদিন জাহ্নবীকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলিস। একটা কথা শুধু বলে যাচ্ছি, আমি বেঁচে থাকতে তোর মেয়ে খেতে পাবে না, এটা হবে না।
-আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব তোর কাছে। আর সব চুলোয় যাক, আমার মেয়েটাকে বাঁচা।উকিল তো বলছে, অ্যাক্সিডেন্ট হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে আমি তিনবছরের মধ্যে ছাড়া পেয়ে যাব। ততদিন তুই নিশাকে একটু দেখে দে। আর প্রমাণ করা যাবে না কেন? ব্যাপারটা তো অ্যাক্সিডেন্টই বল?
-দুনিয়ায় যেখানে যখন যা ঘটে, সবটাই অ্যাক্সিডেন্ট রে। আমরা বোকার মতো প্ল্যানিং করি। আমি বেরিয়ে আসার আগে বললাম।
বেরিয়ে এসে ভাবছিলাম, মাকে প্রসবযন্ত্রণার ভিতর দিয়ে যেতে হয়, মা আর বাচ্চার অচ্ছেদ্য বন্ধনটা বোঝা যায়। কিন্তু কী আছে এই ঔরসের মধ্যে যে জেলে বসে থাকা লোকটাও নিজের প্রতিভূর জন্য পাগল হয়ে ওঠে? অভিষেকের মেয়ে আর তার মা যাতে মানুষের মতো বাঁচতে পারে তার জন্য আমি আমার সাধ্যের ভিতরে যা আছে সব করব। কিন্তু একইসঙ্গে আমি এই ফর্মুলাটাকেও জীবনের ধ্রুবসত্য বলে স্বীকার করব না। একজন কুমোর যদি গঙ্গার ধারের মাটি নিয়ে এসে মা দুর্গার মূর্তি বানাতে পারে আর অগণিত মানুষ যদি অঞ্জলির সময় সেই মূর্তিকেই দেবী ভাবতে পারে , তাহলে আমি কোনও অরফ্যানেজ থেকে নিয়ে আসা একটা ডল পুতুলকে নিজের মেয়ে ভাবতে পারব না কেন?
বাড়ি ফিরে দেখলাম ঝুমা ঘুমিয়ে পরেছে। এই অসময়ে ঘুমোচ্ছে কেন ভাবতে ভাবতে আমি ওর পাশে বসে নিচু হয়ে ওর দুটো চোখে চুমু দিলাম আলতো করে।
ঝুমা ধড়ফড় করে উঠে বসল, ও তুমি! কখন এলে?
আমি সেই প্রশ্নের কোনও জবাব না দিয়ে ঝুমাকে আমার অনেকটা কাছে টেনে নিয়ে বললাম, ঝুমা আমরা একটা মেয়ে অ্যাডপ্ট করতে পারি না?
(ক্রমশ...)
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.