
ঔরস
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
(১২)
সরকারি অফিসের গয়ংগচ্ছ পরিবেশের মধ্যে কাজ করতে গিয়েও না করতে পেরে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। আসলে সেই ছোট থেকেই পরিশ্রমের ভিতরেই মুক্তি খুঁজে নিয়েছি বলে নতুন নতুন কাজে হাত দিতে, তারপর সেগুলো সম্পূর্ণ করতে খুব ভাল লাগত। মুশকিল হল, লাল ফিতের ফাঁস এমনই একটা জিনিস যে তার ভিতরে পড়ে গেলে নতুন রাস্তা বের করা খুব মুশকিল। কানাগলির অন্য প্রান্তে যেতে যেতেই জীবন কেটে যায়।
ঠিক সেইসময়ই প্রসন্ন বরদারাজনের সঙ্গে একটা সাক্ষাৎ আমার জীবনের দিশাটাই পালটে দিল । প্রসন্নর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল, চেন্নাইতে একটা সেমিনারে গিয়ে। আমাকে আমার অফিস থেকে পাঠানো হয়েছিল, প্রসন্ন এসেছিল ওর সংস্থার হয়ে। সাধারণত দক্ষিণ ভারতীয়রা সদ্য পরিচিত লোকেদের সঙ্গে বিশেষ কথা বলে না; সে যদি ভিন্ন সংস্কৃতির হয় তাহলে তো আরও নয়, কিন্তু প্রসন্ন সেদিক থেকে ভীষণই ব্যতিক্রম ছিল। হোটেলের লাউঞ্জে কেবল নয়, মেরিনা সি বিচেও হাঁটতে হাঁটতে অনেক গল্প হয়েছিল ওর সঙ্গে।
প্রসন্নর দেওয়া ঠিকানা-ফিকানা সম্বলিত কার্ড অবশ্য হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি।ফোন নম্বরও সেভ করে রাখতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাই সেদিন দুপুরে ‘ভিজিটর’ এসেছে শুনেও খুব কিছু গা করিনি। কোনও একটা কাজে ছিলাম বলে, ভুলেও গিয়েছিলাম একপ্রকার। আবারও ফোন আসায়, একটু বিরক্ত হয়েই নিচে নেমে গিয়ে দেখি প্রসন্ন বসে আছে রিসেপশনে। মাথার সামনের চুলগুলো আর একটু হালকা হয়ে গেছে বলে, ওকে চিনতে এক সেকেন্ড বেশি লাগল আমার। তারপর সমুদ্রের একটা ঢেউই যেন নিয়ে গিয়ে ফেলল, সেই সি-বিচে, সেইসব বন্ধুতায়।
সেদিন রাতেই চেন্নাই ফিরে যাওয়া বলে প্রসন্নকে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারলাম না কিন্তু ছিমছাম একটা রেস্তোরাঁয় ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম সঙ্গে করে।
-সাউথ ইন্ডিয়ান খাবারদাবারের সবচেয়ে ভাল দিকটা হচ্ছে, যতই খাও বেশি পয়সা খরচ হবে না। আর দ্বিতীয় যে জিনিসটা আমার পছন্দের তা হল, এই স্টিলের গ্লাসে কফি। আয়েশ করে বসতে বসতে বলেছিলাম আমি।
প্রসন্ন হাসতে হাসতে বলেছিল, তুমি কি পয়সা কম লাগবে বলেই আমাকে এখানে নিয়ে এলে?
আমি একটু লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম, মোটেই নয়। কিন্তু তোমার মতো কঠোর নিরামিষাশীকে তো বাঙালি হোটেলে মাছ-মাংস খাওয়াতেও নিয়ে যেতে পারি না।
-বাঙালিদের অনেক এক্সেলেন্ট নিরামিষ পদ আছে। আমি যে বাড়িটায় ছিলাম গত দু’দিন, তারা বৈষ্ণব। ফুললি ভেজিটেরিয়ান। অ্যান্ড ইউ নো, আই অ্যাম ইন লাভ উইথ, মোচার ঘণ্ট আর ছানার ডালনা।
-পরেরবার যখন আসবে আমি আমার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ওইসব খাওয়াব তোমাকে। প্লাস, কাঁচকলার কোপ্তা আর ধোকা বলে দুটো প্রিপারেশন খুব ভাল রাঁধে আমার বউ। তুমি খেলে বুঝবে।
-দুঃখের ব্যাপার এটাই যে আমি চেন্নাইতে এসবের একটাও পাব না।
-বাঙালি ডেলিকেসি টেস্ট করার জন্য তো বাংলায় আসতে হবে বন্ধু।
-বাট হোয়াই? জ্যোৎস্না উপভোগ করার জন্য কি চাঁদে যেতে হয়? আমি যদি কলকাতার সর্বত্র ইডলি-দোসা-সম্বর-উপমা পাই, শুধু দোকানে নয়, রাস্তায় গাড়ি ঠেলে লোকে এগুলো বিক্রি করে দেখলাম, তাহলে কেন চেন্নাইয়ের রাস্তায় মোচার তরকারি কিংবা রসগোল্লা বিক্রি হবে না?
-আসলে যে কোনও ব্যবসাতেই ক্যাপিটাল লাগে তো...
প্রসন্ন আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল, পুঁজির সমস্যাটা সমস্যাই নয়। আজকের দুনিয়ায় ক্রাউড ফান্ডিং খুব পপুলার। ঝামেলাটা হচ্ছে, তোমরা বাঙালিরা ‘রিচ আউট’ করতে চাও না। কিন্তু এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে রিচ আউট না করলে হবে কী করে? আর শুধু এখনই নয়, ইন এভরি এজ, যে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে, সেই সারভাইভ করেছে। ভাস্কো দা গামা আর কলম্বাস না থাকলে কোথাও কোনও কলোনি তৈরি হয় না, পাশ্চাত্যের।
-ঠিকই বলেছ, এটা আমাদের বাঙালিদের একটা দোষ...
-আজকের বাঙালিদের দোষ বলো। স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ কি ছড়িয়ে দেননি নিজেদের? না দিলে নোবেল প্রাইজ আসত? মিশন হত? ইউ নো, তামিলরা সাধারণত নিজেদের বাইরে কাউকে অ্যাকসেপ্ট করে না। ভারতের একটা অঙ্গরাজ্য হয়েও তামিলনাডু যেন একটা পৃথিবী। কিন্তু তামিল নয় এমন একজনকে তামিলরা অন্তরে গ্রহণ করেছিল। আর তিনি হলেন, স্বামী বিবেকানন্দ। চেন্নাইয়ের রাস্তায় যে পোস্টারগুলো বিক্রি হয় ফুটপাথে, তার মধ্যে তামিল না হয়েও ওই একজন থাকেন, তিনি বিবেকানন্দ। কিন্তু তোমরা তারপরও কেন যে...
আমি প্রসন্নকে থামিয়ে দিয়ে বললাম , কিন্তু লাস্ট তিরিশ বছর তামিলরা আর একজন অ-তামিলকে অন্তরে গ্রহণ করেছেন। এবং তিনি এমনই এক প্রতিভা যাঁর তুলনা গত দু’হাজার বছরের ইতিহাসে নেই।
-কার কথা বলছ? প্রসন্ন অবাক চোখে তাকাল।
আমি একটু থেমে বললাম, দ্য গ্রেট রজনীকান্ত।
পরের তিরিশ সেকেন্ড, আমাদের হাসির শব্দে চমকে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ওয়েটাররাও।
...
প্রসন্ন কেবল আড্ডা দিতে নয় আমাকে একটা প্রস্তাব দিতে এসেছিল। ও যে বিশ্বখ্যাত অটোমোবাইল সংস্থার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে আছে, তার সেলসে আমি জয়েন করি, প্রসন্ন চাইছিল।
-সরকারি চাকরি ছেড়ে প্রাইভেটে? কেউ যায়?
-মাইনে প্রায় ডবল হলে যায়। বিশেষ করে তারা, যারা পচে মরতে চায় না , যাদের ভিতরে শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হবার বিপুল বাসনা। আর আমি এই উদাহরণটা কেন দিলাম বলো তো? আমরা প্রজাপতি নিয়েই কাজ করছি এখন। এই যে আমাদের গাড়ির কালারগুলো দ্যাখো।
-অসামান্য লাগছে। এই নীল আর ওই পার্পলটা একদম চোখে এসে ধাক্কা মারছে। নতুন লঞ্চ হল এই মডেলগুলো? আমি প্রসন্নর ল্যাপটপে ছবিগুলো দেখতে দেখতে বললাম।
-এই প্রোডাক্টগুলো আগামী দশবছরের মধ্যে লঞ্চ করতে চাইছি আমরা। হোপফুলি পেরে যাব।
-ওহ! এগুলো ভবিষ্যত। কিন্তু রং ছাড়া স্পেশাল কী?
-রংটাই স্পেশাল। গাড়ির গায়ে থাকলে পরে পঁচিশ বছর আর রঙ করাতে হবে না গাড়ি। এই যে আমার ল্যাপিতে, প্রজাপতির ছবিগুলো দ্যাখো। প্রজাপতির ডানার রঙটা যে ‘মৌল’ দিয়ে তৈরি, সেটা দিয়েই রংটা বানাতে চাইছি।
-কিন্তু রংটা পাবে কী করে? প্রজাপতির থেকে?
- প্রজাপতির রং যে তন্তু দিয়ে তৈরি সেটাকেই আমরা আর্টিফিশিয়ালি তৈরি করব। ‘মৌল’টা একই থাকবে কিন্তু মৌলের উপাদান যাবে বদলে। দেবাশিস বলে একটি বাঙালি ছেলেও আছে আমাদের এই রিসার্চ টিমে। আমরা তোমাকেও চাইছি।
আমি অবাক হয়ে গেলাম। কীভাবে এরা একটা গাড়িতে, একটা জড়বস্তুর মধ্যে, একটা উড়ন্ত পতঙ্গকে ধারণ করতে চাইছে ভেবে।
প্রসন্ন বলল যে ওরা ব্যবসা স্প্রেড করতে চাইছে। কলকাতা থেকে মায়ানমার, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর। প্রজাপতি যেভাবে তার পাখনা মেলে দেয়।
-আমি কলকাতা ছাড়তে পারব না, তাই...
-তোমাকে কলকাতা ছাড়তে বলছে কে? তোমাকে তো ইস্টার্ন জোনের ডেপুটি হেড হিসেবেই চাইছি। অফ কোর্স ট্যুর থাকবে। বাট তোমার প্লেসমেন্ট কলকাতাতেই হবে।
ছোট্ট একটা ছুটিতে মা’কে সঙ্গে নিয়েই পুরী গেলাম। কুটুস পেটে আসা ইস্তক জগন্নাথদেবের কাছে যেতে চাইছিল ঝুমা। কুটুসের হাত ধরে রাতের আধো-অন্ধকার বালির ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি অনেকগুলো ঝিনুক কুড়িয়ে এনেছিলাম। তাদের একটার ভিতরেও মুক্তো ছিল না কিন্তু ঝিনুক নিজেই এত সুন্দর যে ভিতরে মুক্তো না থাকলেও কিছু যায় আসে না।
জীবনও তো তেমনই। তবুও সন্দীপদার ছেলে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেল কেন?
পুরী থেকে ফেরার পরপরই খবরটা পেয়ে একদম ধ্বসে গিয়েছিলাম আমি। কোনও দিশা পাচ্ছিলাম না কোথাও। এদিক-ওদিক থেকে শুনছিলাম অনেক কথা। কেউ বলছিল যে ছেলেটা নাকি নেশাভাঙ করত। কেউ বলছিল, দোষ সন্দীপদা আর ওর বউয়ের। ওরা জীবনে বাচ্চার মন বোঝার চেষ্টাই করেনি। কিন্তু পরিস্থিতি যাই হয়ে থাক, সাড়ে সতেরোর একটা ছেলে ওভাবে ঝুলে পড়বে কেন?
-ওর মা বকেছিল পিকলুকে একটু। সামনে জয়েন্ট, পড়াশোনায় ফাঁকি দিচ্ছিল বলে, যেরকম ক্যাজুয়ালি বকে থাকে বাবা-মায়েরা। সেটা কি এমন বিরাট কিছু যার জন্য ওকে আমাদের এভাবে ছেড়ে চলে যেতে হল? সন্দীপদা কাঁদতে কাঁদতে বললেন আমায়।
-একটু শক্ত হোন সন্দীপদা।বউদিকে বাঁচানোর জন্য এইটুকু আপনাকে হতেই হবে।
-মহুয়া বাঁচবে? কীভাবে বাঁচবে? লোকজন তো ঘুরিয়ে ওকেই অ্যাকিউজ করে যাবে, বাকি জীবন। কেমন করে কাউন্টার করব, ভেবেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ফ্রিজ আমার ছেলের পছন্দমতো, গাড়ি ওর কথামতো... ইশ ছোটবেলায় একটা ভাই কিংবা বোন চেয়েছিল, তখন যদি নিজেদের আরামের কথা না ভেবে আর একটা ইস্যু নিতাম, আজ এই সর্বনাশ দেখতে হত না। অন্তত ছোটটার থেকে খবর পেতাম, বড়টা কী ভাবছে। সন্দীপদার কথা অসংলগ্ন হয়ে যাচ্ছিল, মাঝেমাঝে।
শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল, অবুঝ, ইনসেনসিটিভ প্রাণী তৈরি হচ্ছে প্রত্যেকটা ওয়ান-চাইল্ড ফ্যামিলিতে। সর্বনাশের সীমায় এসে দাঁড়িয়েছি আমরা , এরপর শুধু একটা বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়ার অপেক্ষা।
যে স্বার্থপরতার বীজ আমরা সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে ভরে দিচ্ছি সন্তানের মধ্যে, সেই বীজই মহীরুহ হয়ে টলিয়ে দিচ্ছে বাবা-মার সম্পূর্ণ পৃথিবী। আমাদের একক বাচ্চারা ফ্র্যাংকেনস্টাইন হয়ে আমাদেরই আক্রমণ করতে ছুটে আসছে।
-আর একটা বাচ্চা চাইই আমাদের ঝুমা। ওই ‘ওয়ান চাইল্ড’এর বিলাসিতাই ‘নো চাইল্ড’ এর সর্বনাশ নিয়ে আসে।
ঝুমা শুধু বলল, ‘অফিসে তোমার এত চাপ, তোমার একার চাকরি...
আমি ঝুমার মুখটা হাত দিয়ে চাপা দিয়ে বললাম, চিন্তা ক’রো না ঝুমা। টাকার চিন্তা ক’রো না’।
-কোত্থেকে আসবে টাকা? ঝুমা সরলভাবে জিজ্ঞেস করল।
আমি চুমুতে চুমুতে ওকে কাহিল করে দিতে দিতে বললাম, লাগলে পরে, টাকা প্রজাপতি দেবে।
(ক্রমশ...)
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.