
ইছামতী
শিখর চক্রবর্তী
"এই যে, শুনতাছেন ? কে আপনি? কই যান? এত রাইতে? কই যান গিয়া "?
লন্ঠন দাঁড়ায়, বুড়া লোক একটা। হাতে একগাছ লাঠি, আর এক হাতে একটা কেরোসিন কুপি।
এই রাতে, এদিক পানে লোকটা যায় কোথা? বিলাল হাতের টর্চটার আলো ফেলে লোকটার মুখপানে। লোকটাকে দেখেছে বিলাল, কাছাকাছিই কোথাও থাকে।
এখন আর ভয় টা নাই বিলালের। একটু আগে ভাবছিলো "চোর বাটপার নয় তো? এই অন্ধকারে জঙ্গল পথে কি করে লোকটা?"
এদিকে পানে আর কিছুটা যাইলেই ইছেমতির আঘাটা। বর্ষায় এখন জল আর জল। নদী ফুলে ফেঁপে আছে। এখানে থেকেই চর ভাঙার শব্দ শুনা যায়।
"আরে কি জিগাইছি, কানে শুনেন না নাকি? আপনে কেডা ? ইদিক পানে কই যায়েন?"
লোকটা হাত দিয়ে আবার টর্চের আলো আড়াল করে। বিলাল টর্চ নিভায়। লোকটা জবাব দেয় "মুই আনারুল"।
"তো ইদিকে যান কই ? "
বুড়া উত্তর দেয় না। লাঠি খানা উঁচিয়ে নদীর দিকে দেখায়।
"উদিকে তো নদী, এখন উদিক পানে যান ক্যানে ? শুনতাছেন না, পাড় ভাঙতিছে ক্যামনে ?"
লোকটা এবার হাঁটু মুড়ে উবু হয়ে বসে। একটা বিড়ি ধরায়। কুপির হলুদ আলো এসে পড়ে লোকটার মুখে। একমুখ সাদা দাড়ি গোঁফ, চোখটা গর্তে ঢুকে আছে। ঘোলাটে চাহনি। একটা টান দিয়ে বলে
"জেলের পো, বানে ভয় পেলি চলে? বান আসবে, মাছও আসবে।"
"তো আপনে কি করতি যান, মাছ ধরতি ? কই জাল কই দেহি আপনের ?"
লোকটা লন্ঠন টা তুলে ধরে অন্ধকার পানে তাকায়, কাউকে যেন খোঁজে। আবার লন্ঠন নামিয়ে রাখে।
বিলাল এই মুজালিয়া গাঁয়ে মাদ্রাসার নতুন মাস্টার হয়ে এসেছে কদিন হল। সবাইকে এখনও ঠিক চিনে উঠে নাই। তবু এই লোকটাকে সে বাজারের আশেপাশে দেখেছে। একটু নোংরা পোশাক আশাক বটে। তবে ঠিক পাগল না মনে হয়। আজ গঞ্জ বাজার থেকে ফিরতে রাত হয়ে গেছে। এই পথটা একটু শুনশান থাকে তবে শটকাট হয়। জঙ্গলের মধ্যে আলো দেখে কুতুহল হয়, চলে আসে পেছুপেছু ।
"কই কইলেন না তো, কি করতি যায়েন? "
লোকটা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলে,
" সব কথা তুমায় বলতি হবে ক্যান? তুমি কেডা? কোন মিঞা? নাকি পুলিশ তুমি ?"
আবার একটু চুপ করে থাকে। বলে
"না না, তুমি পুলিশ নও গো।" বিড়বিড় করে বলে "পুলিশ তো খুঁজতাছে কাশেম মিঞা রে।"
" কাশেম আবার কেডা?" জিজ্ঞেস করে বিলাল।
"আরে কাশেমরে চিন নাই ? আমাগো পোলা আছে। অরে আনতিই তো যাইতাছি, অর তো আইসবার সময় হইতাছে। যাই গিয়া। তুমি যাও মিঞা, পথ দ্যাহো।"
বিলালের ধন্দ লাগে। কেমনধারা এলোমেলো কথা। লোকটা পাগল নাকি। আবার জিজ্ঞেস করে
"তা এত রাতে কাশেম কুথা থিক্যা আইবা চাচা?"
বুড়া লাঠি খানা দিয়া জঙ্গল বাড়ি মেরে এগোয়, কয় "মাছ ধরতি গ্যাছে । আজ আইবা তো।"
"তা কবে গ্যাছে?" বিলাল জিগায়।
"এই তো কাল... পরশু.. কি জানি, কবে যেনো। যেদিন ম্যাঘ ভাঙলো, প্রচুর পানি হল, বান হলো। সিদিন ও পাড় ভাঙছিলো। অরে মানা করছিলাম। শুনে নাই। বলল বাড়িতে পোয়াতী বৌ, ট্যাহার দরকার। আজ সারা রাইত মাছ ধরুম। কাল গঞ্জের বাজারে ভালো দাম পামু।"
"অই শুন, শুনতে পাচ্ছ?" বুড়া অস্থির হয়ে ওঠে,
"দাঁড়ের আওয়াজ। যাই যাই।
চাঁদও উঠে নাই। কিছু ঠাওর হয় না। আলো না ধইরলে পোলাডা আইবা ক্যামনে। তুমি মিঞা যাও, দাঁড়ায়ে থেহ না। সাপ খোপ আসে, আমি আসি।"
বুড়া এগোয়, জঙ্গল সরাতে সরাতে। বিলাল শোনে পাড় ভাঙার ভয়ঙ্কর আওয়াজ। লন্ঠন দূরে সরে সরে ছোটো হয়ে আসে।
ইছামতী ফি বর্ষায় রাক্ষুসী হয়ে ওঠে। ওপারে ভারত বর্ডারে বাঁধ পড়ে, গাছ লাগায়, একর একর চর পড়ে। বসতি হয়, ভারত কয় ওদের জায়গা, বসিরহাট বেড়ে চলে। এপারে ইছামতী শুধু খায়, গিলে ফেলে বন, জঙ্গল, বসত বাড়ি, ইস্কুল ঘর, সব সব।
সেবার তিনদিন ধরে বৃষ্টি, থামার নাম নাই। মাঠঘাট, পুকুর বাদা টইটম্বুর। দিন আনা দিন খাওয়া কাশেম জেলের ঘরে চাল বাড়ন্ত, আয় নাই। তিনদিন শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লা কে গাল পাড়ে বুড়া আনারুল। ঘরে সাতমাসের পোয়াতী কাশেমের বৌ, দাওয়ায় পা ছড়িয়ে চালের শেষ পোয়াটাক ধুয়ে উনুনে চাপায়।
কাশেম জাল গুছিয়ে কাঁধে ফেলে। বাপ হাঁ হাঁ করে ওঠে। "করস কি? এই তুফানে নাও বাইবি না জাল ঘুরাবি? পাগল হইছস ? ইছেমতী কুটো ফেললে দু টুকরো করি দেয় আর তুই ....।"
কাশেম গরগর করে,
"না খাইয়া মরুম? বৌডার কথাও তো ভাবতি হবে নাকি? একবার শুধু মাঝগাঙে যাই, মাছ শুধু জলের উপর ঝাঁকে খ্যালে বিষ্টির সাথে। ফেলো জাল আর তুলো মাছ ।"
জাল কাঁধে কাশেম বেরিয়ে যায়।
তারপর আরও দুটা বর্ষা কেটে যায়, কাশেমের বৌ ছেলে বিইয়ে চোখ মুছতে মুছতে ছ মাস পর বাপের ঘর চলে গেলো। বিডিআর কিছু খুঁজেছিল। বেশি না। টাকা দিলে হয়তো আর একটু খুঁজতো। ওপার বিএসএফ ও বলে দিলো মানুষ বা লাশ কিছু পায় নাই।
বুড়া বাপ ভিটে আগলে পড়ে থাকে। চুল দাড়ি সাদা হয়, জট পড়ে, নজর আবছা হয়। গায়ের মানুষের দান দয়ায়, রেশনের বরাদ্দে একবেলা পেট চলে যায়। কার্ডে কাশেমের নাম কাটা যায় নাই। বুড়া কাটতে দেয় নাই। চেয়ে চিন্তে কেরোসিন জুটায়, কুপি জ্বালে, আর
ফি বর্ষায় রাতে ইছেমতীর পাড়ে ঘুরে বেড়ায়, কান খাড়া করে শুনে, দাঁড়ের আওয়াজ নাকি পাড় ভাঙে।।

মৃত্যুদণ্ড
মলয় সরকার
হঠাৎ মুখের উপর গরম জলের ফোটা, চট করে ঘুমটা ভেঙে তাকিয়ে দেখি বাবা, চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।
আমি বললাম, "মা কোথায়?"
কেননা আমার মাই আমাকে সকালে সবসময় ঘুম থেকে ডাকে।
বাবা বলল, " তোর মা চলে গেছে আমাদেরকে ছেড়ে ।" মানেটা বুঝিনি তখনও।
চোখ মুছে বাবা বলল, "মুখ ধুয়ে নে। তোর মা রাত্রে সুন্দর পায়েস রেধেছিল। আমরা বাপ বেটা মিলে এখন খেয়ে নি চল। "
দারুন সুন্দর পায়েসটা খেতে। হঠাৎ দেখলাম বাবার মাথাটা কেমন ঝুকে গেল টেবিলের উপরে। আমি বাবা বাবা করে চিৎকার করে উঠলাম। যখন জ্ঞান হল তখন তাকিয়ে দেখলাম আমি শুয়ে আছি জগদম্বা অনাথ আশ্রমের বিছানায়। আমার বয়স খুব বেশি হলে সাত আট হবে হয়তো।
এই আশ্রমে আজকে আমার সাত দিন মোটে।
একদিন রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার কেন জানি ঘুম আসছে না। অন্ধকারে হঠাৎ কে যেন আমার মুখ চাপা দিয়ে আমাকে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে গেল। চিৎকার করার আগে দেখলাম আমার সামনে নগ্ন এক দু'পেয়ে জন্ত। অসহ্য যন্ত্রণায় কেটেছিল সেই রাত। সেদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে আশ্রমের দেওয়ালের ফাটলের ফাক দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম অজানার উদ্দেশ্যে।
বগলাদার কাছে হাতে খড়ি আমার পকেট মারার। একদিন পকেট মারতে যেয়ে শক্ত হাতের কব্জায় আটকে গেলাম। আমি আবার নতুন করে বাবার ভালোবাসা, মায়ের স্নেহ পেলাম। আমি এগিয়ে চললাম নতুন দিগন্তের উদ্দেশ্যে পরগাছা হয়ে।
" ইওর অনার,এই ধর্ষণের শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। আমি সেই আবেদনে করছি আপনার কাছে।"
আমি দেখলাম জজ সাহেবের কলমের নিবটা ভেঙে গেল। জামার কলারের ওখানে কি একটা যেন কুটকুট করছে। হাত দিয়ে দেখলাম ছোট একটা পিঁপড়ে। দুই আঙুলে পিষে ফেললাম পিঁপড়েটাকে,যেন ধর্ষককে আমি নিজেই মৃত্যুদণ্ড দিলাম।

আমি যত দুখ পাই গো।
তনুশ্রী সামন্ত
"আমার পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো....."
কবির এই গানখানিকেই প্রেমের চূড়ান্ত সংজ্ঞা বলে মেনে নিয়েছিল পুরবী সেই কিশোরী বেলাতেই। তবুও এর কয়েকটা পংক্তি নিয়ে বড়ো প্রতিবাদ ছিলো তার মনে।
" যদি আর কারে ভালোবাসো
যদি আর ফিরে নাহি আসো,
তবে তুমি যাহা চাও
তাই যেন পাও,
আমি যত দুখ পাই গো...."
কলেজ ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায় বসে, কতবার তর্ক করেছে সে এই নিয়ে বন্ধুদের সাথে।
----- আচ্ছা বলতো, আমি যদি কাউকে ভালোবেসে থাকি, তবে তার সুখে তো সুখীই হবো। সে অন্য কাউকে ভালোবেসে সুখে থাকলে আমি দুখী হতে যাবো কেন? এইখানে রবিঠাকুর বড়ো সংকীর্ণ মনের পরিচয় দিয়ে ফেলেছেন বুঝলি!
বন্ধুরা হাসতো...বলতো...
------ওরে বাবা, তুই রবিঠাকুরকেও ভুল প্রমাণ করতে চাইছিস?! আমাদের বাবা অতো সাধ্য নেই রে।
ঐশিকা মোটা গলায় বলতো...
---- তোর মতো মহৎপ্রাণ আমি নই রে!! আমার আবীর যদি কারও দিকে চোখ তুলে চায়, তবে ওর চোখদুটো আমি জাস্ট...
পুরবী ভোরের আলোর মতো হেসে বলতো...
----- শুধু নামেই প্রেম করলি,প্রেমের সারমর্মটা উপলব্ধি করতে পারলি না।
এই কথা বলে পুরবী স্বপ্নালু চোখে তাকিয়ে থাকতো, কৃষ্ণচূড়ার ফাঁকের টুকরো টুকরো নীল আকাশের দিকে। এতো সুন্দর চোখ আর মুখ....স্বপ্নের ভাবাবেগে যেন ওকে রূপকথার রাজকন্যার মতো লাগতো।ওর রূপের সেই মায়াবী আলোয় বোধহয় ওর বন্ধুরাও হিপনোটাইজ হয়ে পড়তো, তাই আর তর্ক বাড়াত না।
না তখনও প্রেমে পড়েনি পুরবী, তখনও তার মনমল্লিকাবনে কোনো কলি ধরেনি ভালোলাগার। শুধু রবিঠাকুরের গান আর কবিতার প্রেমেই ডুবে ছিল সে।
বেশ অভিজাত পরিবারের মেয়ে পুরবী, বাবা শিক্ষক,মা শিক্ষিকা।মা খুব ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। বাড়িতে রবিঠাকুরের প্রায় সব বইই আলমারিতে সাজানো। ড্রয়িংরুমে রবিঠাকুরের বড়ো একটা বাঁধানো ছবি।
কলেজ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটি। স্বভাবতই সুন্দরী পুরবীর চারপাশে এতদিনে অনেক মধুমক্ষিকা ঘোরাঘুরি করেছে। কিন্তু কিছুতেই মন টানেনি তার। হঠাৎ রসায়ন বিভাগের উস্কোখুস্কো পলাশের লাল কেমন করে রাঙিয়ে দিল তার মন।
পলাশ!!... আহা নামের ভেতরেই যেন একরাশ কবিতা!! চোখের তারায়, উস্কোখুস্কো চুলে, ঠোঁটে লেগে আছে যেন রবিঠাকুরের গান....
" ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে..."
ভীষন ভালো ছবি আঁকতে পারে পলাশ।পড়াশোনাতেও বেশ। তাই ইউনিভার্সিটিতে ওর একটা আলাদা সম্মান।পুরবীর খুব ইচ্ছে করতো ওর ঘরের চাবিটা ভেঙে খাঁচার ভেতর থেকে নীলপাখিটা চুরি করে আনে।
ইউনিভার্সিটিতে নতুন বিল্ডিং থেকে পুরানো বিল্ডিং এ যাবার একটা মোরাম রাস্তা। দুদিকে সাজানো জারুল গাছের সারি। পুরবী একা একাই সেই রাস্তা দিয়ে হাঁটত। জারুল ফুল উড়ে পড়তো ওর খোলাচুলে... সালোয়ার কামিজের ওড়নায়...! আর বুকের ভেতর বাজত..." প্রাণ চায় চক্ষু না চায়,মরি একি তোর দুস্তর লজ্জা..." আর অকারণেই কেমন দুধে আলতা রঙ ধরতো পুরবীর ফর্সা মুখে।
পুরবীর স্বপ্নেরাও ধীরে ধীরে বেগুনী হয়ে উঠছিল জারুল ফুলের মতো। বড়ো অনুভবী মেয়ে সে। জীবনের এমন একটা সুন্দর অনুভবের প্রকাশ সে কত সুন্দরভাবে করবে, সেই স্বপ্নেই বিভোর হয়েছিল কিছুদিন। আর ভীষণ স্বপ্নমদিরতার অদ্ভুত এক রোগ ছিলো তার। ছোটোবেলায় ঠাকুমার কাছে গল্প শুনতো, ওদের বাড়ির পেছনের নিমগাছটাতে নাকি ঠাকুর দেবতা আসে।সেইসব একা একাই গভীরভাবে ভাবতে ভাবতে সে দুএকবার সন্ধ্যাবেলা নিমগাছের তলায় কাদের যেন দেখতে পেত। মাকে বললে মা শুধু চুপচাপ হাসতো!
এই কিছুদিন হলো সেই স্বপ্নমদিরতায় আবার পেয়ে বসেছে পুরবীকে! লাল মোরামের রাস্তাটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোন কোনোদিন হঠাৎ পলাশকে দেখতে পায়। একটু এগিয়ে দেখে আর কেউ নেই। তখন নিজেরই খুব হাসি পায় পুরবীর।বাস্তবে কোথাও কিছু নেই। তবুও স্বপ্নেই যেন তার কত আপন হয়ে গেছে পলাশ!
সে কল্পনা করতো, একদিন সূর্যাস্তের কমলা আলোয় গাছের পাতাগুলো যখন লজ্জারাঙা আবীর মেখে থাকবে গালে, দিঘির জলের
ছোট ছোট ঢেউগুলো যখন তাদের চূড়ায় চূড়ায় এই মায়াবী আলো নিয়ে ভাঙাচোরা খেলবে,নীড়ে ফেরা পাখিদের ডানায়...থোকা থোকা মেঘেদের গায়ে... উলোঝুলো কাঁটাঝোপটার ওপর এই অপরূপ আলো পড়ে যখন টার্নারের ছবির মতো সাজবে প্রকৃতি,যখন নুইয়ে পড়া ছাতিম গাছটার ডালে এসে বসবে একটা দোয়েল বা মৌটুসী, তখন সে কমলা- নীল আকাশের তলায়, টিয়ারঙা ঘাসের ওপর বসে আনত চোখ তুলে চোখ রাখবে পলাশের চোখে। হাতে হাত রেখে বলবে...
" তুমি ছাড়া আর এ জগতে, মোর কেহ নাই.... কিছু নাই গো..."
সেদিনও জারুল গাছের সারি দেওয়া রাঙা রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল পুরবী নয়নিকার সাথে, ইউনিভার্সিটির পুরানো বিল্ডিংটার দিকে। হঠাৎ চোখ পড়লো রাস্তার এককোনে একটা গাছের তলায় পলাশ আর অবন্তী পাশাপাশি বসে। কেমন যেন করোনারি থ্রম্বসিস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল ওর। একমুহুর্তের জন্য মনে হলো সেই স্বপ্নবিভ্রম নয় তো!! চোখদুটো হাতের আঙুল দিয়ে কচলে আবার তাকালো। আবার সেই একই ছবি! একটু থমকে দাঁড়িয়ে নয়নিকার হাত চেপে দেখালো ওদের। নয়নিকা হেসে বললো,
-----আরে ওদের তো মাখামাখি কেস! ইউনিভার্সিটিতে সব্বাই জানে, আর তুই জানিস না এখনো? কোন জগতে থাকিস!!
কিছুটা হাঁটার পর পুরবী নয়নিকাকে বলল, আজ ক্লাস করতে ইচ্ছে করছে না। মাথাটা ভীষণ ধরেছে রে, আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি।
নয়নিকা একটু অবাক হয়ে বলল, ----ok, dear...as you wish!
মা, বাবা কেউ বাড়ি ছিল না। প্রণতি মাসী দরজা খুলে একটু অবাক চোখে দেখে নিয়ে বললো, ----দিদিমণি! এক্ষুনি ফিরে এলে? শরীর খারাপ?
---- না, কিছু না এমনিই।
-----আচ্ছা, আমি রান্নাঘরে যাই তবে কাজ আছে।
প্রণতিদি চলে গেলো,পুরবীর ভীষণ কান্না পাচ্ছিলো।সে আলমারি থেকে গীতবিতানটা বের করে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঝরঝর করে কাঁদল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরপায়ে উঠে এলো রবিঠাকুরের ছবিটার কাছে। হাতজোড় করে নতমস্তকে বললো,
------ তুমিই ঠিক ঠাকুর, আমিই ভুল।আমাকে আমার চেয়ে তুমিই যে বেশি করে চেনো... অনেক অনেক বেশি করে চেনো।

দীর্ঘ জীবন
কাজল মুখোপাধ্যায়
শিবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা তাঁর বয়স নয়, তাঁর বয়স নিয়ে মানুষের কৌতূহল।
“একশো ছুঁইছুঁই!”এই বাক্যটা শুনে শুনে তিনি ক্লান্তি অনুভব করেন।
প্রথম প্রথম ভালো লাগত। শরীরের ভেতর একটা গর্ব কাজ করত,আমি পেরেছি। ডাক্তাররা অবাক হত, আত্মীয়রা দূর থেকে দেখতে আসত, পাড়ার ছেলেরা তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করত। তখন মনে হত, দীর্ঘায়ু বুঝি কোনও পুরস্কার।
কিন্তু পুরস্কারের সঙ্গে নিয়মও থাকে। আর নিয়মটা খুব কঠিন,সবাইকে হারিয়ে জিততে হয়।
শিবশঙ্করের স্ত্রী গায়ত্রী চলে গেছেন অনেক আগেই। সে-খবরটা তাঁর কাছে কোনও হঠাৎ ধাক্কা হয়ে আসেনি। বরং ধীরে ধীরে চলে যাওয়া,প্রথমে কথা কমল, তারপর হাঁটা, তারপর শ্বাস। দীর্ঘজীবীরা মৃত্যুকে আকস্মিকভাবে নয়, ধাপে ধাপে দেখেন।
ছেলে বিদেশে থাকে। ভিডিও কলে কথা হয়। পর্দার এপারে শিবশঙ্কর, ওপারে ব্যস্ত জীবন। নাতি তাঁকে “গ্র্যান্ডপা” বলে ডাকে, ঠিক কী সম্পর্ক,তা নিয়ে খুব নিশ্চিত নয়।
শিবশঙ্করের দিন কাটে হিসেব করে। কখন ওষুধ, কখন হাঁটা, কখন টিভি। অবসরপ্রাপ্ত হিসেবরক্ষক মানুষটার জীবনে এখন শুধু অঙ্ক,কতটা বাকি আছে।
একদিন পাড়ার ক্লাব থেকে ডাকা হল। প্রবীণ নাগরিক সংবর্ধনা। মঞ্চে বসিয়ে বলা হল,
“আপনি আমাদের অনুপ্রেরণা। এতদিন বেঁচে আছেন!”
শিবশঙ্কর মাইকের সামনে গিয়ে বললেন,
“আপনারা একে পুরস্কার ভাবছেন। আমি একে দায়িত্ব বলি।”
হালকা হাসি উঠল। সবাই ভাবল, বুড়ো মানুষ কথা বলতে ভুলছে।
কিন্তু শিবশঙ্কর ভুল বলেননি। দীর্ঘায়ু মানে সাক্ষী থাকা,একটার পর একটা বিদায়ের। পাড়ার দোকান, পুরনো সিনেমা হল, পরিচিত মুখ,সব চলে গেছে, তিনি আছেন, একা! যেন ভুল করে বেঁচে আছেন।
সেদিন রাতে তিনি একটা পুরোনো ডায়ারি খুললেন। সেখানে কোনও স্মৃতিকথা নয়, যেন এক হিসেবের খাতা। কে নেই। কে আছে। স্বাভাবিকভাবেই দেখা গেল, ‘আছে’ কলামটা খুব ছোট।
পরদিন থেকে তিনি নতুন কাজ শুরু করলেন। পাড়ার বয়স্ক মানুষদের নিয়ে সপ্তাহে একদিন আড্ডা। কেউ গল্প বলে, কেউ চুপ করে শোনে। কেউ কেবল চেয়ারে বসে থাকে। শিবশঙ্কর কারও দীর্ঘায়ু নিয়ে প্রশ্ন করেন না। তিনি জানেন, সব বয়সেরই ওজন আছে।
একদিন এক বৃদ্ধা বললেন,
“এতদিন বেঁচে থেকে কী লাভ?”
শিবশঙ্কর বললেন,
“লাভ নেই। শুধু সুযোগ। ভুলগুলো একটু ঠিক করার সুযোগ।”
মাসখানেক পর শিবশঙ্কর অসুস্থ হলেন। খুব বড় কিছু নয়,তবু শরীর যেন জানিয়ে দিল, সময় হয়েছে।
হাসপাতালে শুয়ে তিনি ভাবছিলেন,দীর্ঘায়ু আশীর্বাদ না অভিশাপ? উত্তরটা কোনও একদিকে নয়। দীর্ঘ জীবন আসলে একটা খালি পাতা। কেউ বোঝা বানায়, কেউ দায়িত্ব।
শিবশঙ্কর দায়িত্বটা নিয়েছিলেন।
তাই তাঁর চলে যাওয়ার দিন কেউ বলল না,
“উনি অনেকদিন বেঁচেছিলেন।”
মানুষেরা বলল,
“উনি দরকারি ছিলেন।”
আর দীর্ঘায়ু,সে দিন অভিশাপ নয় বলেই মনে হল অন্যদের।

ইশ্বর যা করেন
গৌতম চক্রবর্তী
অমলবাবু অফিসে ঢুকলেন অন্যান্য দিনের মতোই। কাজকম্মো শুরুও করলেন যথারীতি জল-টল খেয়ে। অফিসের সিনিয়রমোস্ট পিয়ন গিরিধারী তাঁকে একটু বেশীই খাতির করে, চা,জলটা সময়মতো এনে দ্যায় বলতে হয় না। দুজনের বয়েসের তফাৎ সামান্যই, আর বছর দুই মেয়াদ আছে চাকরির দুজনেরই। গিরিধারীর সঙ্গে অমলবাবুর শুধু সুখ-দুঃখের গল্পই হ্য়না, গিরিধারীর সার্ভিস বই-টই সব অমলবাবুই আপডেট করে দ্যান; মাইনে,ইনক্রিমেন্ট ঠিকঠাক হচ্ছে কি না সেসব দ্যাখার অলিখিত দায়িত্ব-ও ওনার, সুতরাং গিরিধারী যে তাঁকে অনেকটাই বেশী খাতির করবে সে আর আশ্চর্য কি?
কিন্তু ওঁদের দুজনের একটা বেশ বড়োরকম তফাৎ আছে যাকে বলে মৌলিক পার্থক্য। অমলবাবু মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন রোগে ভোগেন; খুব জটিল কিছু না হলেও মাসে দুচারটি ছুটি রোগের চরণে ডালি দিতেই হয়। ফলে তাঁর লিভ অ্যাকাউন্টের স্বাস্হ্যও তাঁরই মতো ক্ষীণ। আর গিরিধারীর যাকে বলে সলিড স্বাস্হ্য। গত পঁচিশ বছরে তার ছুটির ভাঁড়ারে হাত পড়েনি, ফলে ছুটি বিক্রি বাবদ দুতিন বছর অন্তর কিছু রোজগার হয়ে থাকে। মাত্র একবারই বাইকের ধাক্কায় গিরিধারীর হাত না পা কি একটা ভাঙ্গে, ডাক্তার তিন মাসের বিশ্রাম লিখে দ্যান। ছুটিও তৎক্ষণাৎ মঞ্জুর হয়ে যায় কিন্তু মাসদেড়েক পরই সে অফিসে এসে হাজির, জয়েন করবে বলে।বলা বাহুল্য সক্কলেরই বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে বুকে ঠেকে যাবার জোগাড়! এতো ছুটি হাতে, মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে ছুটি পাচ্ছে তাও নেবেনা!!
গিরিধারীর প্রধান উপদেষ্টা হচ্ছেন অমলবাবু। তিনি বোঝালেন যে ডাক্তারি সার্টিফিকেট দিয়ে যে ছুটি নেওয়া হয় সেটা আরেকটা কাগজ যাকে বলে ফিট সার্টিফিকেট সেটা না জমা দিলে কাজে যোগ দেওয়া যায় না। প্রধান উপদেষ্টার উপদেশে গিরিধারী বাড়ি ফিরে গেলো ঠিকই কিন্তু স্পষ্টই বোঝা গেলো যে এমন বিচ্ছিরি নিয়ম তাকে অত্যন্ত আশাহত করেছে। যে নিজে কাজে যোগ দিতে চাইছে তাকেও কি না অফিস বলছে তুমি বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নাও বসে বসেই বেতন পাবে!
গিরিধারীর এই প্রবল কর্মনিষ্ঠা অফিসে বলাবাহুল্য বেশ একটা আলোড়নের সৃষ্টি করলো। একজন চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী যার তেমন কোনো দায়-দায়িত্ব নেই তারও কিনা এমন অফিসপ্রীতি!! দুই অতুৎসাহী ছোকরা ওকে একটা সম্বর্ধনা দেবার উদ্যোগও নিয়েছিলো। উৎসাহদাতার অভাব হয়নি কিন্তু চাঁদা-দাতার সংখ্যা দুই থেকে আর বৃদ্ধি না পাওয়ায় উদ্যোগটা মাঝপথেই কবরে যায়।
সম্বর্ধনা হোক বা নাহোক, গিরিধারী ওসবের তোয়াক্কা করেনি। সে-ও উদ্যোগী পুরুষ, কি কৌশলে জানিনা, দিন কুড়ি পরে তার ছুটি ফুরোনোর প্রায় সপ্তা-দুই আগেই মহোল্লাসে ফিট সার্টিফিকেট এনে হাজির। আর তাকে ফেরানো যায়নি। অতএব প্রধান উপদেষ্টা অমলবাবু তাকে একটি জয়েনিং লেটার লিখে দিলেন,গিরিধারী তাতে সই করে যথারীতি কাজে ঢুকে গেলো। সেই দুই ছোকরা তো ওকে প্রায় কোলে নিয়ে দপ্তরের ঘরে ঘরে ঘুরিয়ে আনলো। অফিসের আপামর জনগণ সেদিন অকৃত্রিম বিস্ময় প্রকাশ করেছিলো। অমলবাবুসহ আরো দুজন প্রবীণ, অবসরমুখো কর্মী ওকে বোঝালেন যে মেডিক্যাল লিভ জমিয়ে তেমন লাভ নেই। এই ছুটি বেচে টাকা পাওয়া যায়না আর রিটায়ারমেন্টের দুবছর আগে থেকে কোনো ছুটিই বিক্রি করা যায়না সুতরাং যা ছুটি পাওনা আছে ভোগ করে নাও।
গিরিধারী মানুষটা সহজ,সরল মনে তেমন প্যাঁচঘোঁচ নেই। দুচারটে কথার পর প্রধান উপদেষ্টার কাছে হৃদয়-দুয়ার উন্মুক্ত করলো। ছুটি নেওয়া-না নেওয়া বা বিক্রি করা এসব আদৌ কোনো বিষয় নয়, গোলমালের কেন্দ্রে আছে ওর বহু মানে বড়োছেলের বৌ।না,না মেয়েটা খান্ডার নয় মোটেই, গিরিধারীকে সে যথাবিধি ভক্তিশ্রদ্ধা করে, সে-ও বহুমাকে খুব-ই স্নেহ করে ঠিকই কিন্তু লড়কীটা বঙ্গালী। পড়িলিখি আওরৎ,অন্ততঃ গিরিধারীর থেকে তো অনেক বেশীই জানে। ফরম্ ভরতে-টরতে পারে এমনকি সরকারী অফসর যাদের ঘরে ঢোকার সাহসই ওর হবে না কোনোদিন সেখানেও বহুমা অবলীলায় ঢুকে যায়, কথাটথাও বলে। গিরিধারীর সন্দেহ হয় বহু হয়তো আংরেজি ভি বলে। কিন্তু বাড়িতে মেয়েটা বিলকুল শান্ত, ঘরেলু কাম-কাজ সবই করে। রসুই ভি। মছলি-উছলি খায়না বলে গিরিধারী দম্পতিকে সুধ্ ভাবে ভাত, ডাল পাকিয়েও দ্যায়। সত্যি বলতে বহুমার বিরুদ্ধে ওর অভিযোগ কিছুই নেই, সমস্যা একটাই––––––– মেয়েটি খৈনি ভক্ষণের তীব্র বিরোধী।
শুধু নিজেই নয়, পরিবারের তামাম লোক এমনকি ওর সাঁসুমাকে ভি এই বিরোধীতায় শামিল করে ফেলেছে। ফলে বাড়িতে খৈনি ডলতে দেখলেই সব রে-রে করে ছুটে আসে।গিরিধারী পাঁচ-ছ পুরুষের বিহারবাসী, খৈনি ভক্ষণ ওর পুরখোঁ কি আদৎ। সেই আদৎ ওর লাটে উঠেছে এই বহুমার ঠেলায়।
অফিস থাকলে কোনো সমস্যা হয়না, হয়ও-নি এতোদিন; কিন্তু হাত ভেঙ্গে মেডিক্যাল লিভ নিয়ে বেচারী বাধ্য হয়েছে বাড়িতে থাকতে। খৈনি বিলকুল বন্ধ্, পেট ফুলে মরার দশা! সপ্তা-খানেক কোনোমতে কাটিয়ে বেচারী একটু-আধটু বাইরে বেরতে শুরু করে।দুপুরে ভাত-টাত খেয়ে চলে যেতো একটা পার্কে, শুয়ে বসে ঘুমিয়ে এবং খৈনি চিবিয়ে ক’টা ঘন্টা কাটিয়েও দিতো। চেনাজানা কেউ জুটলে গল্প-টল্পও যে হোতোনা তা নয়, কিন্তু ওখানকার শত্রুরা ছিলো আরো মারাত্মক, ওর বাঙ্গালী বহুমার থেকেও বহুগুণে সাংঘাতিক –––––– মশা! অসংখ্য, অগণ্য! সাড়ে চারটে বাজতে না বাজতেই তারা গিরিধারীকে একেবারে ছেঁকে ধরতো। তাছাড়া মশাগুলো শুধু অসংখ্য-ই নয়, অভব্য-ও বটে; ভগ্নপাণি গিরিধারীকে ন্যূনতম সৌজন্য দেখাতো না, কয়েক মুহূর্ত-ও এক জায়গায় দাঁড়াতে দিতোনা। ফলে পাঁচটা বাজতে না বাজতেই আবার সেই খৈনিরহিত গৃহবন্দীত্ব। অফিস এখানে তাকে একটা বড়ো রকম রিলিফ দিয়েছে, সকাল ন-টা থেকে মোটামুটি সাতটা পর্যন্ত অবাধ খৈনি, তারপর বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে একদলা খৈনি মুখে দিলে কে আর ঠ্যাকায়!
এই প্রবল দুঃখের কাহিনী প্রধান উপদেষ্টাকে নিবেদন করে করজোড়ে অনুরোধ করলো, “বাবু আর আমাকে ছুট্টিতে পাঠাবেন না, হাঁথ-পাঁও কুছ ভাঙ্গি গেলেও না”। এমন সরল, অচিন্ত্যনীয় স্বীকারোক্তির পর গোটা দপ্তর জুড়েই প্রবল হাসাহাসি হয়েছিলো। সব্বাইয়ের কাছেই বেশ মজার ব্যাপার হয় এই খৈনি-কাহিনী কিন্তু দুচার দিনের মধ্যেই ব্যঙ্গের লক্ষ্যমুখ ঘুরে গেলো সেই দুই সম্বর্ধনাপ্রেমী ছোকরার দিকে।ঘুরে অবশ্য এমনি-এমনিই যায়নি, ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এবং তার যথেষ্ট কারণ-ও ছিলো। দপ্তরের কুণাল নামে এক ছোকরার সঙ্গে সম্বর্ধনা-প্রয়াসী একজনের কিঞ্চিৎ রাইভ্যালরি ছিলো ঐ দপ্তরের-ই একমেবাদ্বিতীয়ম তরুণীকে নিয়ে।শারিরীক সৌন্দর্য্য, উচ্চতা প্রভৃতির দরুণ এবং মোটরসাইকেলের মালিকানার জোরে কুণালের প্রতিদ্বন্দী যে খানিক এগিয়েই থাকবে যাকে বলে অলোয়েজ ওয়ান স্টেপ অ্যাহেড, সে আর আশ্চর্য্য কি!ছুটির পর মাঝে-মধ্যেই যখন তরুণীকে বাইকের পিছনে তুলে ঐ ছেলেটি গাঁকগাঁক করে চলে যেতো তখন কুণাল ঈশ্বরের কাছে একটা ছোটোখাটো দুর্ঘটনার যেমন কোনো পথচারীকে হাল্কা ধাক্কা কিম্বা অটো, কি সাইকেলের সঙ্গে একটা নিরীহ সঙ্ঘর্ষের প্রার্থনা করতো আর সেটা এমন কিছু অন্যায়-ও নয়। বান্ধবীকে ইমপ্রেস করার জন্যে স্বয়ং রবিঠাকুরও জঙ্গলের মধ্যে একটি ভদ্রগোছের ভালুকের আবির্ভাব প্র্রার্থনা করেছিলেন।তবে বড়োরকম দুর্ঘটনার কামনা কুণাল কক্ষনো করেনি সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
এই প্রণয়-প্রতিযোগিতা নিয়ে একটি চমৎকার, চিত্তাকর্ষক উপাখ্যান হতেই পারে; আমার জীবদ্দশায় যদি কোনো সহৃদয় সম্পাদক এই গল্পটি কোথাও, কখনো ছাপেন তবে ধৈর্য্যশীল, হৃদয়বান পাঠকবর্গের বিনোদনের নিমিত্ত আমি সে কাহিনী অবশ্যই পেশ করবো।
খৈনি-ভক্ষণের কারণেই গিরিধারীর অমন নীরোগ শরীর কি না তানিয়ে অমলবাবু অবশ্য তেমনভাবে চিন্তা-টিন্তা করেননি তবে অধস্তনের রোগহীনতা তাঁকে কিঞ্চিৎ ঈর্ষান্বিতও করতো। প্রবল বৃষ্টিতে ছাতা থাক না থাক গিরিধারীর বাড়ি ফেরায় কোনো বাধা হয়না, এমনকি হাঁটুজল ভেঙ্গেও সে পরমানন্দে বাড়ি চলে যায় আর আকাশে মেঘ দেখলেই অমলবাবুর মুখ গোমড়া হয়ে যায়, চারটে বাজতে না বাজতেই আঁকুপাঁকু করেন বাড়ি ফিরবেন কি করে! তাঁর যে বড়ো কাঁচাসর্দির ধাত। রবিঠাকুরের প্রতি তিনি আমাদের মতোই পরম শ্রদ্ধাশীল। গিন্নী প্যাঁক না দিলে ‘এসো হে বৈশাখ’ কিম্বা ‘রাত পোহালো শারদপ্রাতে’ অথবা ‘বসন্ত জাগ্রত’ প্রভৃতি গান-টান চান করার সময় জোরে শাওয়ার চালিয়ে মৃদুস্বরে তিনি গেয়েও থাকেন কিন্তু কবিগুরুর মতো ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ হবার বাসনা তাঁর এক্কেবারেই নেই।
শীতকালে অবস্থা আরো করুণ। সারা শীতটা গিরিধারীর একটা আলোয়ান জড়িয়েই দিব্যি চলে যায় আর ওঁকে একগাদা জাব্বাজোব্বা চাপিয়ে অফিসে আসতে হয়। তাও না হয় হোলো, কিন্তু অফিসে এসে গরম লাগতে শুরু করে ফলে সেগুলোর একটা-দুটো খুলতেও হয়, আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখতেও হয়। তবে এই কাজে গিরিধারী তাঁকে পুরো মদৎ করে। তিনি শুধু কোট,মাফলার,হনুমানটুপি এক এক করে খুলে ওকে ডাকেন আর ও এসে সেগুলো আলমারিতে তুলে রাখে।
অমলবাবু অফিসের সিনিয়রমোস্ট কর্মচারীদের একজন, তার ওপর বছর দেড়েক হোলো রেকর্ড সেকসনের অফিসার হয়েছেন ফলে তাঁকে ব্যঙ্গ করার, পেছনে লাগার লোক এক ভোজনবাবু ছাড়া কেউ নেই। উনি যেই গরম জামাগুলো খুলতে শুরু করেন ভোজনবাবুও চিমটি কাটতে থাকেন, “স্ট্রিপটিজ শুরু হোলো না কি হে অমল? দেখো ভাই, উর্দ্ধাঙ্গে যা হচ্ছে হোক, নিম্নাঙ্গটা সামলে।মানে অফিস তো!ওটা বরং বাড়িতেই খুলো মানে ঐ সময়ে আর কি”। অমলবাবুর অন্তরাত্মা চিড়বিড় করে উঠলেও অতি উদারভাবে ক্ষমাসুন্দর হাসি হাসেন কিন্তু ক্ষমা করেন না মোটেই। রাগটা পুষে রাখেন, ঝালটা মেটান অন্য সময়ে। ঝাল যে ভোজনদা-ও মেটান না তা ঠিক নয়।সিনিয়রিটির তালিকায় কি কৌশলে যে অমলবাবু ভোজনদার ওপরে আসেন সেটা আমি ঠিক জানিনা, তবে ভোজনদা যেহেতু অমলবাবুর আগেই রিটায়ার করবেন সেজন্য তাঁর আর পদোন্নতির সম্ভাবনা নেই এবং তথ্যটি ভোজনদার হৃদয়ে এক্কেবারে শূলের মতো গেঁথে গেছে। না,না ভোজন ওনার নাম নয়। ওরকম নাম কারুর হয় না কি! দুনিয়ার সকল ভোজ্যবস্তুর প্রতি তাঁর অসামান্য প্রেম এবং তাদের হৃদয়ে থুড়ি উদরে পাচার করার প্রবলতম আগ্রহের কারণেই তাঁর ঐ নাম। সরেস না পরেশ গোছের কি একটা নাম তাঁর অফিসের কাগজপত্তরে আছে সে আমি ঠিক জানিনা আর সেসব কাগজ কি আমায় ঘাঁটতে দ্যায় যে দেখে বলবো? তাছাড়া এই ভোজন নামটা এত্তো পপুলার হয়ে গেছে যে আসল নামটা কারুর মনেই পড়েনা। এক অবাঙালী অফিসার তো প্রথম মাসকয়েক ওঁকে ভোজনজী বলেই সম্বোধন করতেন তারপর কেউ একজন ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেওয়ার পর মিত্রাজী বলে ডাকেন।
ভোজনদা এক্কেবারে সমদর্শী মানুষ মানে ভোজ্যবস্তুর বিষয়ে। যাকে বলে সন্ন্যাসীর মতো। আমিষে তাঁর প্রবল আসক্তি সত্বেও নিরামিষে তিনি নিরাসক্ত নন্ মোটেই এবং মিষ্টান্নের সঙ্গেও তাঁর মিত্রতা সমান। এমনকি রাস্তার খাবার বলে ফুচকার সঙ্গে তিনি কখনোই ফচকেমো করেন না।
তবে উনি যে শুধু গবগবিয়ে খেতেই পারেন তা নয়, হজমও করেন সব। হ্যাঁ, এই আটান্ন বছর বয়সেও হজম করতে পারেন প্রায় সব-ই মানে মনুষ্য-খাদ্য বলতে যা বোঝায় প্রায় সব-ই। আর এটাও অমলবাবুর এক গোপন ঈর্ষার জায়গা। তিনি স্বল্পাহারী তো বটেই তাও খুব ভেবেচিন্তে, বেছে বেছে। ওঁর পাকস্থলীটা ভোজনদার মতো অমন সর্বংসহা নয়।
বুফে ব্যবস্থাটা চালু হবার আগে অমলবাবু বিশেষ সুবিধে করতে মানে শোধ তুলতে পারতেন না; ইদানীং এই ব্যবস্থাটা বেশ পপুলার। সচরাচর কোনো সহকর্মীর বাড়িতে নিমন্ত্রিত হলেই মজাটা জমে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণতঃ সকলে মিলে একসঙ্গেই যায়। অমলবাবু তক্কে তক্কে থাকেন কখন ভোজনদা খেতে যাবেন। উনি হয়তো মাটনটা বেশ গুছিয়ে, কাউন্টারের ছেলেটার বিষদৃষ্টি অগ্রাহ্য করে প্লেট ভরে নিয়েছেন, অমলবাবু পেছন থেকে বলে ওঠেন, “ওহে ভোজন মানে মিত্তির, ঐটুকু ছোটো প্লেটে আর ধরবে না হে। তুমি একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসো, আমি বরং মাংসের হাঁড়িটাই তোমার কাছে পাঠানোর জন্য বলছি”। আশপাশের কৌতুহলী দৃষ্টি ওনার ওপর জড়ো হয়, দুএকটা মন্তব্যও উড়ে আসে। যতই ইচ্ছে থাক এক টুকরো হাড়ও আর নেওয়া হয়না, দাঁত কিড়মিড় করে উনি অন্যত্র পা বাড়ান। খুব পরিতৃপ্ত মনে ভোজনদার প্রস্থান দেখতে দেখতে অমলবাবু বলে ওঠেন, “একি এই সামান্য একটুখানি মাংস নিয়েই হয়ে গেলো না কি ভোজন মানে মিত্তির!আরে এই বয়েসেই তো খাবে হে, এই তো খাবার বয়স গো”! ভোজনদার তিন-চতুর্থাংশ পক্ককেশ ও গুম্ফ যে বয়সের সাক্ষ্য দ্যায় তা ষাটের আশপাশে।
তবে শুধু এই একটাই উপায় নয়, ভোজনদাকে উত্যক্ত করার বা অমলবাবুর ভাষায় মদৎ দেওয়ার আরো ভিন্ন ভিন্ন তরিকা আছে,জায়গা বুঝে উনি সেগুলি প্রয়োগ করেন এবং প্রায় ক্ষেত্রেই সফল হয়ে থাকেন।সচরাচর ভোজনদা নিতান্ত নির্লিপ্তভাবে কেটে পড়ার চেষ্টাই করেন, একবারই কেবল একদল তরুণী পাশ থেকে খিলখিল করে হেসে ওঠায় ওনার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে, সেবার ভরা প্লেট ঠকাস করে কাউন্টারে নামিয়ে অমলবাবুকে আলিঙ্গনের শুভ উদ্দেশ্যে ধাবিত হ’ন।
কিন্তু শ্রেয়াংসি বহু বিঘ্নাণি! ভালো কাজে অনেক বাধা। প্রথমতঃ ভোজনকক্ষে লোকজন কম থাকেনা সুতরাং চাইলেই কাউকে আলিঙ্গন করা যায়না, বিশেষতঃ যে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, চিমটি লাগায় ইঙ্গিতে তাকে বাগে পাওয়া অত সহজ নয়। তদুপরি ভোজনদার মৎলব বুঝেই অমলবাবু একটি মহিলা-ব্যূহের আড়ালে চলে গেছলেন।ফলে তাঁকে আলিঙ্গন করতে হলে ভোজনদাকে ঐ ব্যূহ ভেদ করে যেতে হোতো। সুতরাং সেবারের মতো ভোজনদার উদ্যোগ নিতান্তই কবরস্থ হয়।
তবে সর্বদাই যে অমলে-ভোজনে এমন ঠোকাঠুকি লেগে থাকে তা নয়; বরং অসময় অফিস কাটতে হলে তাঁরা দুই পরম বন্ধু। বিভিন্ন মৎলব এঁটে, অন্যান্যদের অনুপ্রেরণা দিয়ে মাঝে-মধ্যে অফিস কাটার উদ্যোগ নিতেন এবং সবসময়েই যে ব্যর্থ হতেন তাও নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক পদোন্নতির দরুণ তাঁর দপ্তরটাই পাল্টে গেছে; শুধু তাই-ই নয় একজন সেকসন অফিসার আগের মতো অমনভাবে ছুটির আগে পালাতেও পারেন না। এমনকি মামলা-মোকদ্দমা থাকলে ফাইল-টাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বেশ রাতও হয়ে যায়, বাড়ি ফিরে তাসের আড্ডাতেও যাওয়া হয়ে ওঠে না সুতরাং পদোন্নতি যে তাঁর পক্ষে সর্বাংশে সুখের হয়েছে তা বলা যায়না।
সেদিন দুপুরের পর থেকেই আকাশের মুখ আর অমলবাবুর মুখ সমানুপাতিক হারে গোমড়া হতে শুরু করলো।চারটে নাগাদ আকাশের রং ঘোর কালো হয়ে ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেলো আজ ঝরঝরধারে ভিজিবে নিচোল অমলবাবুর পক্ষে যা বড়োই অশান্তির।বছরদুই আগে হলেও কোনো একটা ফন্দিফিকির করে,ভোজনদার সঙ্গে আঁতাত করে ভাগার চেষ্টা করতেন কিন্তু পদোন্নতির ফলে সেসব আর পারা যায়না তবু শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে একবার ভোজনদাকে ইন্টারকমে ধরার চেষ্টা করলেন এবং শুনলেন তিনি অন্তত ঘন্টাতিনেক আগে বারাসাত ব্রাঞ্চে গেছেন, ফেরার সম্ভাবনা কম।
সংস্কৃতে যাকে বলে যৎপরোনাস্তি, মেজাজটা সেই রকম খিঁচড়ে গেলো।রিসিভারটা নামানোর আগেই বিড়বিড় করে বল্লেন, “ফেরার সম্ভাবনা কম?! ও ব্যাটাচ্ছেলে আর ফিরবেই না। শালা ওখান থেকেই ভাগবে সাড়ে-চারটের মধ্যে”। তাঁর চিন্তাকে সায় দিয়েই আকাশটা বেশ গুড়মুড় গুড়মুড় করে উঠলো। ভদ্রলোক একেবারে ছটফটিয়ে উঠলেন। আকাশের অবস্থা ক্রমেই ঘোরালো হয়ে উঠছে, একবার নামলে ঘন্টাদুত্তিনের আগে আর থামবেই না আর তাঁকে যেতে হবে মধ্য কলকাতা থেকে সেই পাইকপাড়া। যদিও একবার পাতালে ডুব মারতে পারলে দমদম পর্যন্ত নিশ্চিন্ত কিন্তু অফিস থেকে মেট্রো স্টেশন অন্তত দুটো বাসস্টপ তারপর দমদম স্টেশন থেকে বাড়ি যাওয়ার হ্যাপা তো আছেই। ঝেঁপে বৃষ্টি নামলে ভিজে ভিজে তিনি যেতেও পারবেন না তাছাড়া ঘন্টাদুত্তিন তেমন বৃষ্টি হলে সে অফিসপাড়াই হোক আর পাইকপাড়াই হোক জল একই রকম। গিরিধারীসহ আরো অনেকেই সেই জল ঠেলে ঘপাৎ ঘপাৎ করে বাড়ি চলে যায় কিন্ত ওঁর পক্ষে সেটা মোটেও সুখের কথা নয়। একদিন জল ভেঙ্গে তিনঘন্টা ভিজে গায়ে থাকা মানেই তিনদিন কুপোকাৎ। তাঁর যে বড়ো কাঁচাসর্দির ধাৎ!
‘যা থাকে কপালে’ বলে উঠলেন। উদ্দেশ্য ডেপুটি ডাইরেক্টর রহমান সাহেবকে গিয়ে একবার মোলায়েমভাবে কেটে পড়ার প্রস্তাবটা নিবেদন করবেন। তিনিও অবসরের মুখে, অতো কড়াকড়ি আর করেন না। যদি একবার রাজি করানো যায়!
একেই বলে টেলিপ্যাথি।অ্যালো-হোমিও-র বাবা! উঠে দাঁড়াতেই ইন্টারকমটা কুকুরছানার মতো কুঁইকুঁই করে উঠলো। রহমানেরই ফোন। এক্ষুণি একটি ফাইল নিয়ে যেতে হবে হাইকোর্টে উকিলের কাছে, আগামীকালই দুটোর পর মামলা আছে। অহো, কি আনন্দ! প্রভুকে ভালোমতো ডাকার আগেই উদ্ধারের ব্যবস্থা হয়ে গেলো। সবে চারটে বাজে, হাইকোর্টে গিয়ে উকিলকে ফাইল বুঝিয়ে পৌনে পাঁচটা জোর পাঁচটার মধ্যে স্বচ্ছন্দে কেটে পড়া যাবে।
শুভস্য শীঘ্রম।ঝটাপট ফাইলটি বগলদাবা করে রহমানসাহেব কে দর্শন দিলেন। তিনিও অবসরের দোরগোড়ায়, অতো ঘাঁটাঘাঁটির তাঁর দরকার নেই, আগ্রহ-ও নেই। উকিলের চিরকুটের সঙ্গে ফাইলের নামটা মিলিয়ে আড়াই মিনিটে বিদায় করলেন। চারটে দশের মধ্যেই অমলবাবু গাড়ীতে, আরো পনেরো মিনিট লাগলো হাইকোর্ট।গিয়েই উকিলবাবুকে আগমন-সংবাদ জানিয়ে দিতে উকিলের এক শাগরেদ এসে তাঁকে নিয়ে গেলো যথাস্থানে।
ঠিক পৌনে পাঁচটা না হলেও পাঁচটার মধ্যেই মুক্তি পেয়ে গেলেন অমলবাবু। বেশ পুলকিত-চিত্তে বাইরে এসেই মেজাজটা কিঞ্চিৎ বিগড়ে গেলো। আকাশ আর অপেক্ষা করতে রাজী হয়নি। ঘন্টাখানেক আগে থেকেই তাঁকে সতর্কবাণী শুনিয়েছে মেঘ, ঠান্ডা হাওয়ায় তাঁকে বোঝানো-ও হয়েছে বৃষ্টি আগতপ্রায়; তিনি না পালালে প্রকৃতি আর কি করবে? বর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। তবে সঙ্গে ছাতা আছে, গাড়িও। আর বৃষ্টিও ততো মুষলধারা নয় যে একেবারে বেরোনোই যাবে না।অতএব অমলবাবু বেরোনোর উদ্যোগ নিলেন।ড্রাইভারকে ফোন করে গাড়িটা আনতে বল্লেন তারপর ছাতা খুলে প্রায় উড়ে গিয়ে পড়লেন গাড়ির ওপর। ফল ছত্রভঙ্গ! অন্তত একটা শিক। বিড়বিড় করে কাকে জানিনা অভিসম্পাত দিতে দিতে গাড়িতে উঠলেন এবং এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনে এসে নামলেন। স্টেশনের ডিজিটাল ক্লক বলছে দুমিনিটের মধ্যে ট্রেন ঢুকছে। হুড়মুড়িয়ে গিয়ে এক মহিলার পা মাড়িয়ে, গালাগাল খেয়ে লাইনে দাঁড়ালেন এবং সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই দেখলেন ট্রেন তাঁকে গুডবাই করে চলে গেলো। তবে অফিস টাইমে ছ’মিনিটের বেশী দাঁড়াতে হয় না। পরের ট্রেন এলো, তিনিও ঠেলে ধাক্কে ঢুকলেন; কিন্তু স্বাভাবিক সময়ের থেকে খানিক দেরি করে, ক্লান্তভাবে ট্রেনটা পরের স্টেশনে পৌঁছলো। গাড়িটা না কি এতোই ক্লান্ত ছিলো যে প্ল্যাটফর্মে ঠেস দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। একটু দম নিয়ে গাড়িটা আবার ছাড়লো এবং এক অনিচ্ছুক ঘোড়ার মতো মন্থর গতিতে সেন্ট্রাল স্টেশনে ঢুকলো। ততক্ষণে উদ্যোগী যাত্রীরা এদিক-ওদিক ফোন-টোন করে জেনে গেছেন যে শ্যামবাজার স্টেশনে ঢোকার আগে গাড়িতে আগুণ দেখতে পাওয়ায় যাত্রীরা হৈচৈ শুরু করেন এবং ট্রেন ঢোকার পর স্টেশনে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখাতে থাকেন। সুতরাং মেট্রো চলাচল আপাততঃ বন্ধ্।
আলোর গতিই বিজ্ঞানীদের মতে সর্বাধিক। সেই গতিতে পৌঁছানো না কি অসম্ভব। তা হবে হয়তো, কিন্তু তারপরেই, মানে গতির হিসাবে আলোর গতির পরেই হচ্ছে গুজব তরঙ্গ।অমলবাবুদের গাড়িটা স্টেশনে ঢোকার আগেই সবাই জেনে গেলেন গাড়ি আর যাবেনা।সুতরাং এই গাড়ির যাত্রীরাও সেন্ট্রাল স্টেশনে নেমে শ্যামবাজারস্থ যাত্রীদের সমর্থনে খানিক বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন, কিন্তু ঘরমুখো যাত্রীদের বিক্ষোভ আর কতক্ষণ চলে? মিনিটকুড়ির মধ্যেই চোদ্দ আনা লোক যার যার রাস্তা দেখলেন।
অমলবাবু বিমর্ষচিত্তে ট্রেনের গার্ডের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন গাড়ি আর যাবে কি না বা গেলেও কতক্ষণে।গার্ডমহাশয় অতিশয় ঝানু,পোড় খাওয়া ব্যক্তি। তিনি একগাল হেসে পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি যাবেন কদ্দুর?” গন্তব্য দমদম শুনে একই রকম হাসিমুখে বল্লেন, “অন্য উপায় ভাবুন দাদা। এর বেশী জানতে হলে আমাদের জনসংযোগ অফিসে ফোন করুন”। বিরক্তমুখে উনি স্টেশনের বাইরে এলেন এবং এসেই আরো বহুগুণ ব্যাজার হয়ে গেলেন। বাইরেটা বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে গেছে; একটি লোকও বেরোতে পারেনি। স্টেশনের মুখটা লোকে থিকথিক করছে। সামনের বৌবাজার স্ট্রিটের জল পায়ের ডিম পর্যন্ত পৌঁছেছে অর্থাৎ কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে নিঃসন্দেহে হাটুঁজল। বৃষ্টি যে হারে হয়ে চলেছে তাতে জল যে হাঁটুতেই থামবে তা মোটেই নয়, আরো কদ্দুর উঠবে ভাবতেই ভয় করছে। গিন্নিকে একটা ফোন করে জানিয়ে দিলেন তাঁর বর্তমান অবস্থা এবং অবস্থান। আরো জানিয়ে দিলেন যে রাত দশটার আগে বাড়ি ঢোকার বিশেষ সম্ভাবনা নেই।
তবে সব দুঃখেরই শেষ আছে এমনকি টিভি সিরিয়ালেরও। ঘন্টাখানেক মুষলধারা বর্ষণের পর বৃষ্টিটা কমলো এবং বেশ দ্রুতই ঝিরঝিরে বর্ষণে পরিণত হোলো। বেশিরভাগ লোকই ঐ জল ভেঙ্গেই শিয়ালদা মুখো হাঁটা লাগালো।
ঐ প্রবল বর্ষণের মধ্যেও উনি লক্ষ্য করেছিলেন খানচারেক হাতেটানা রিক্সা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। রিক্সার মালিকের দর্শন অবশ্য পাওয়া যাচ্ছেনা কিন্তু তাঁরা আছেন এবং অমলবাবুর মতো মাছের জন্য ছিপ ফেলে বসে আছেন। আজ তো তাদেরই দিন।
স্টেশন চত্বর ক্রমেই ফাঁকা হয়ে আসছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাঁরা আছেন তাঁদের বেশীর ভাগই মহিলা অবশ্য অমলবাবুর মতো জলভীত ক’জন পুরুষ-ও আছেন। করুণ মুখে তিনি এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে এক মহিলা তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। অপরিচিতা হলেও ভদ্রমহিলা একেবারে অচেনা নন্। ঠিক ওনার অফিসে না হলেও মহিলার কর্মস্থলও একই জায়গায় কারণ লিফ্টে ওঠানামার সময় বা ছুটির সময় দুজনেই দুজনকে মাঝেমধ্যে দেখেছেন তবে আলাপ-পরিচয়ের দিকে কখনো এগোননি। কিন্তু এখন ভদ্রমহিলা নিজেই এগিয়ে আসায় সৌজন্যের খাতিরে অমলবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু বলবেন”? মহিলা দ্বিধাগ্রস্তভাবে জানতে চাইলেন, “আপনি কি শিয়ালদা যাবেন”? মুখ না খুলে কেবল মুন্ডু নেড়ে অমলবাবু বুঝিয়ে দিলেন ‘হ্যাঁ’। আরো কুন্ঠিতভাবে, বেশ লজ্জার সঙ্গে উনি বল্লেন, “দেখুন দাদা, শিয়ালদা আমাকেও যেতে হবে। ট্রেন ধরে সোদপুর যাবো কিন্তু মেট্রো তো আর যাবেনা আর এই এতোটা জল ভেঙ্গে হেঁটে যেতেও পারবো না। অন্ধকার না হলে হয়তো রিক্সায় চলে যেতে পারতাম কিন্তু অন্ধকার তো হয়েইছে তার ওপর রাস্তাঘাট দেখতেই পাচ্ছেন একেবারে ফাঁকা। যদি দয়া করে আপনার সঙ্গে নিয়ে যান! আমার সত্যিই বড্ডো ভয় করছে”।
ঠিকই। মহিলার ভয়টা নিতান্ত অমূলক নয়! আমরা সভ্য মানুষ, সভ্য সমাজ। ফাঁকা রাস্তায় আলো না থাকলে বারো থেকে বাহাত্তর কোনো বয়সের মহিলাই নিজেকে নিরাপদ মনে করেন না! অসভ্য সমাজে এই বিপদটা নেই। এ কেবল আমাদের সভ্যতার দান।
বৃষ্টিটা ঝিরঝির করে হলেও ঝোড়ো হাওয়াটা চলছেই, ছাতা উল্টে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট এবং অমলবাবুর ছাতার একটা শিক তো ইতিমধ্যেই ভেঙ্গে আছে। নিতান্ত ব্যাজার মুখে তিনি জলের মধ্যেই নামলেন এবং সামনের রিক্সাটির দিকে এগোলেন। রিক্সাওলা তাঁকে দেখামাত্রই বুঝে গেছে যে মাছ চারে ভিড়েছে, এবার গেঁথে তুলতে হবে।সে-ও হাঁটিহাঁটি পা-পা করে এগিয়ে এলো। “শিয়ালদা যাবে”?কোনো ভূমিকায় না গিয়ে অমলবাবু সরাসরি প্রশ্ন করলেন। সে তো এককথায় রাজী, সোজা বলে দিলো, “দুজন হলে দেড়শো”। শুনে তো তাঁর বিষম লেগে গেলো, সামলে নিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “এখান থেকে শিয়ালদার ভাড়া পঁচিশ টাকা, জোর তিরিশ টাকা। জল জমেছে বলে সেটা এক্কেবারে দেড়শো হয় কি করে? আর রিক্সায় একজনের ভাড়া, দুজনের ভাড়া আলাদা আলাদা কবে থেকে চালু হয়েছে রে”? সে-ও জানে যে ভাড়াটা অনেকটাই বেশি হাঁকানো হয়েছে, কিন্তু এককথায় তো আর নেমে আসা যায়না, তাছাড়া আজকেই তো মওকা; শুকনো দিনে কে আর বাড়তি ভাড়া দিতে যাচ্ছে! সে কুড়ি টাকা কমিয়ে একশো তিরিশে এলো। কিন্তু সেটাও অনেকটাই বেশি অতএব দড়ি টানাটানি শুরু হোলো। অমলবাবুর সঙ্গিনী ততক্ষণে বুঝে ফেলেছেন যে দরাদরিতে তাঁর সঙ্গীমহোদয় তেমন দড় নন্। দড়িটি অতএব ভদ্রমহিলাই হাতে নিলেন এবং অন্তত বারতিনেক ‘ধুত্তোরি, যাবোই না তোর রিক্সায়’ বলে চলে যাওয়া আর ‘ওদিদি, ও বৌদি’ শুনে ফিরে আসার পর ষাট টাকায় রফা হোলো।
ওঠার আগে অমলবাবু ভালো করে চাদ্দিক দেখেটেখে নিলেন কোনো চেনা মুখটুখ আছে কি না। রক্ষে একটাই শ্রাবন-সন্ধ্যা বেশ ঘনিয়ে এসেছে। চতুর্দিক জলে থৈথৈ, বৃষ্টিটাও এক্কেবারে বন্ধ হয়েছে তাও নয় সুতরাং রিক্সার ঘোমটা-টা তুলে দেওয়াও চলে। যথোচিত সকল প্রকার সাবধানতা নিয়ে অতঃপর দুজনে উঠলেন রিক্সায়। রিক্সাও এগোতে শুরু করলো। কলেজ স্ট্রিট মোড়ে এসে বাঁয়ে মেডিক্যাল কলেজের দিকে ঘুরতে অমলবাবু একবার বলে উঠলেন, “ওরে বাবা,এদিকে তো আরো জল হবে রে”! রিক্সাওলা অভয় বাণী শোনালো, চিন্তা করবেন না কাকু, এ আমার রিক্সা কাম নৌকা। ভেসে ভেসে চলে যাবো। কলেজ স্কোয়ারের পাশ দিয়ে এম জি রোডে গেলেই জল কমে যাবে”। তথাস্তু! মেডিক্যাল কলেজটা পেরিয়ে জল হাঁটুর ওপরে উঠলো।লোকটা বেশ কষ্ট করেই এগোচ্ছে। অমলবাবু ভাবলেন ষাট টাকাটা কমই বলা হয়েছে, শিয়ালদা পৌঁছে চা খাবার জন্যে ওকে আরো কিছু দিয়ে দেবেন।
রিক্সাটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে, ওঁরা দুজন টুকটাক কথাবার্তাও বলছেন, কলেজ স্কোয়ারটা আদ্ধেকটা মতো পৌঁছেছেন রিক্সাওলা হঠাৎ ‘আঁক’ করে একটা আওয়াজ দিয়ে লাফিয়ে উঠলো। ভয়াবহ কান্ড!! বিনাবাক্যে রিক্সাটি উল্টে গেলো পিছনদিকে একহাঁটু জলের মধ্যে। ‘ঘুবাৎ’ গোছের একটা অদ্ভুত আওয়াজ, দুই সওয়ারী ভ্যানিশ!! শুধু রিক্সার হাতল দুটো একজোড়া ঠ্যাঙের মতো সামনে উঁচু হয়ে উঠে রইলো।
অমলবাবু হাঁকপাঁক করে একটু পরেই মাথাটা তুলে দেখলেন চাদ্দিকে থৈথৈ জলের মধ্যে বুকসমান জলে তিনি বসে আছেন। কিছু না ভেবেই তিনি উঠে দাঁড়াতে গেলেন কিন্তু বোঝেন নি যে তাঁর একটি শ্রীচরণ রিক্সার ঘোমটায় আটকে আছে। যেই সোজা হয়েছেন, নিউটনের সূত্রানুযায়ী সচল দেহ আর অচল ঠ্যাং নিয়ে পড়লেন মুখ থুবড়ে একদিকে কেৎরে। কিন্তু এবারে আর জলের মধ্যে নয়, পড়লেন একটি মনুষ্য দেহের ওপর। সমাপতন বা দূঘর্টনা যাই হোক অমলবাবুর সঙ্গিনী মানে সহযাত্রিনী তখন সদ্য জল থেকে মাথাটা তুলে একটি বৃহৎ হাঁ করে দম নিচ্ছেন, বলা নেই কওয়া নেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো তাঁর ওপর একটি পঁচাত্তর কিলোর পতন!! ফলে পুনরায় নিমজ্জন এবং এক পেট জলভক্ষণ। শাস্ত্রমতে জলটা ঠিক ভক্ষ্য বস্তু নয় পানই করতে হয়, কিন্তু সামান্য জলপান শব্দে অমন ওজনদার ঘটনাকে ঠিক বোঝানো যাবে না বলে জলভক্ষণ বল্লাম। শাস্ত্রবিদগণ শব্দটা দয়া করে একবার নিপাতনে চুবিয়ে সেদ্ধ করে নেবেন, দোষ কেটে ষাবে। অমন সর্বরোগহর পাঁচন আর হয় না।
ততক্ষণে অমলবাবু পূর্বাপর ঘটনাবলী বিল্কুল সমঝে গেছেন এবং এ-ও মালুম হয়েছে তাঁর সাম্প্রতিকতম কেলোটি। জলে নিমজ্জিতা বিপন্না নারী! তিনি সযত্নে, সস্নেহে বিপন্না নারীকে জড়িয়ে ধরে জল থেকে ধীরে ধীরে টেনে তুল্লেন তারপর আবার যাতে পড়ে না যায় সেজন্য ঐভাবেই জাপটে ধরে যথাসম্ভব ধীরে ধীরে সময় নিয়ে একটা দোকানের সিঁড়ির দিকে এগোলেন। দু-দুবার চুবুনি খেয়ে মহিলারও তখন বিলকুল বেদম, বিপর্যস্ত অবস্থা; তিনিও উদ্ধারকারীকে জড়িয়ে ধরে শরীরের ভারটা ছেড়ে দিলেন। এই প্রথম অমলবাবু জল জমার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন, এমনকি সেই রিক্সাওলা যে কিনা দিগবাজির পর থেকেই এক্কেবারে উধাও তাকেও ক্রুশবিদ্ধ যীশুখ্রীস্টের মতো সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দিলেন।
কলেজ স্কোয়ারের রাস্তাগুলো যে মোটেই চওড়া নয় অন্ততঃ প্রয়োজনের তুলনায় যে মোটেই নয় এটা অমলবাবু এই প্রথম টের পেলেন। যতো ধীরে ধীরেই যাবার চেষ্টা করুন সিঁড়ি পর্যন্ত যেতে দশটা মিনিটও পাওয়া গেলো না। সিঁড়ি দিয়ে একইভাবে জড়িয়ে রেখে উঠলেন এবং যাতে হঠাৎ মাথা-টাথা ঘুরে পড়ে না যায় সেজন্য কিছুক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়েও থাকলেন। সেটা মোটেও অন্যায় নয়; একজন বিপন্না রমণীকে ছেড়ে চলে যাওয়াটা যেকোনো পুরুষ মানুষের পক্ষেই অত্যন্ত অনুচিত সুতরাং উনি যা করেছেন বেশ করেছেন, ঠিক করেছেন। এখানে বাঁকা হাসি কোনো জায়গা নেই।
আর চুপিচুপি বলি, পরস্ত্রীকে এমন আইনসঙ্গত আলিঙ্গনের সুযোগ ক’জনের হয়? সুতরাং উনি যা করেছেন বেশ করেছেন।
ঈশ্বরের এই অপার করুণার কথা ভাবতে ভাবতে উনি বোধহয় বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু কোমরের কাছে একটি ভারী, পেটমোটা বস্তুর উপস্থিতি তাঁর ঈশ্বরচিন্তার ব্যাঘাত ঘটালো। অমলবাবু সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন এতো কান্ডের পরেও সঙ্গিনীর বটুয়াটি স্থানচ্যুত হ্য়নি। সেটি যথারীতি স্কন্ধ হ’তে লম্বমান।
কিন্তু তাঁর নিজেরটি কই? সব্বোনাশের মাথায় বাড়ি!! সেটারও তো মালিকের মতোই সলিলসমাধি ঘটেছে। ইসস্! তাঁর মোবাইল ফোন, ট্রেনের মান্থলি, পাতালরেলের কার্ড সহ আরো জরুরী সব কাগজপত্র সব এতোক্ষণ ধরে জলের নীচে!! উনি আর ভাবতে পারলেন না, লাফ দিয়ে পড়লেন এক কোমর জলে এবং গিরিধারীদের মতোই ঘপাৎ ঘপাৎ করে রিক্সার কাছে গিয়ে হাৎড়ে হাৎড়ে তাঁর নিজের বটুয়া(পুং)টি উদ্ধার করলেন।একপেট জলভক্ষণ করে সেটিও বেশ ওজনদার হয়ে উঠেছে। অত্যন্ত ব্যাজার মুখে বটুয়া(পুং)টি কাৎ করে তিনি জলটা ফেলে দিলেন কিন্তু খুলতে আর সাহস হোলোনা।
ব্যাকরণবিদগণ অনুগ্রহ করে ‘জলভক্ষণ’টা আরেকবার নিপাতনে চুবিয়ে সেদ্ধ করে নেবেন, দোষ কেটে যাবে। কথা দিচ্ছি এই অপকম্মো আর হবে না, আর রিক্সা ওল্টানোর কেস নেই। মোবাইল ফোনটার তো সজ্ঞানে গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটেছেই অন্যান্য জিনিস-পত্তরেরও কি হাল কে জানে!
অতি বিষন্নচিত্তে তিনি সিঁড়ির দিকে গেলেন তারপর সঙ্গিনীর হাত ধরে (তার বেশী সাহস হয়নি) জল ভেঙ্গে এম জি রোডের দিকে এগোলেন। জল সেখানেও প্রচুর, তার ওপর বাস গুলো এক একটা জাহাজের মতো ঢেউ তুলে তুলে যাচ্ছে, হাঁটুজল তখন কোমরে পৌঁচ্ছছে। ভূক্তভোগী মাত্রেই সে বিড়ম্বনার স্বাদ জানেন। কলেজ স্কোয়ার অঞ্চলটা তবু হাত ধরাধরি করে হাঁটা যাচ্ছিলো, এম জি রোডের মতো বড় রাস্তায় সে সুখটুকুও নেই। এক তো চেনা-পরিচিতের চোখে পড়ার সম্ভাবনা, দুই ঢেউয়ের ধাক্কা সামলাতে প্রত্যেকবারই দেয়াল কি দোকানের খুঁটি বা অন্য কিছু না কিছু ধরতেই হচ্ছে, সুতরাং একলা চলোরে!
তবে টিভি সিরিয়ালের মতো অন্য সব দুঃখেরই শেষ আছে, তাঁরাও একসময় উড়ালপুলের নীচে পৌঁছলেন। উড়ালপুলের নীচটা আসলে ত্রিবেণী-সঙ্গম। জল থাক বা না থাক ভিড় থাকবেই।এতোক্ষণ ছিলো শুধু জল এবার যুক্ত হোলো লোকের ভিড়। তবু ট্রেন ধরতেই হবে কারণ বাড়ি ফিরতেই হবে অতএব স্টেশনে পৌঁছতেই হবে।
আদা-চা! গরমাগরম আদা-চা! স্টেশনে ঢুকে অমলবাবুর দিল বিল্কুল খুশ হয়ে গেলো। বৃষ্টি হোক, জল জমুক যা-ই হোক স্টেশনে চা বিক্কিরি অব্যাহত। সটাসট দু-ভাঁড় গরম চা পেটে পাচার করে তবিয়ৎ বিল্কুল চাঙ্গা। না,না,না একা নয়, সঙ্গিনীকেও খাওয়ালেন। চুবুনির বেলায় একসাথে আর চায়ের বেলায় একা! অতোটা অভদ্র অন্ততঃ অমলবাবু নন্।
ইউরোপ, আমেরিকা হলে কি হোতো বলা যায় না কিন্তু ভারতের মতো ব্যাকওয়ার্ড, তৃতীয় বিশ্বের দেশে একটু মিষ্টি হাসি দিয়েই উভয়ে বিদায়পর্ব সাঙ্গ করলেন। এই জন্যেই আমাদের কোনো উন্নতি হতে চায় না। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী স্বাধীনভাবে ----- যাকগে, সেসব দুঃখের কথা বাদ দিন।
অমলবাবু নামবেন দমদম, ফলে ট্রেন বাছাবাছির বালাই নেই, সামনেই ছিলো ডানকুনি লোকাল, উঠে বসলেন এবং বসার তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যেই তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলেন।মাথার ওপরে পাখাটা প্রবল বেগে ঘূর্ণ্যমান।ভিজে গায়ে পাখার হাওয়া! সর্দি ধরানোর জন্য আদর্শ ব্যবস্থা।অতএব একটা পাখাহীন জায়গা দেখে বসলেন। ট্রেন যথাকালে দমদমে ঢুকলো, উনিও নেমে বাইরে এলেন। স্টেশনের রাস্তার অবস্থা যেকোনো মানুষকেই ভয় ধরানোর জন্য যথেষ্ট। হাঁটুর ওপর জলের লেভেল, কেবল গোটাকতক ছেলে পরমানন্দে হুটোপাটি করছে। কোনো গাড়িই যে এই জলে যাবে না সেটা নিঃসংশয়ে বলা যায়। জলের গভীরতা যে আর বাড়বে না তা মোটেই নয় আর এই বিপুল জলরাশি ঠেলে তাঁকে যেতে হবে সেই পাইকপাড়া, তাঁর সুখী গৃহকোণে। হাঁটাপথে শর্টকাট করলে মিনিট দশের বেশী লাগেনা কিন্তু এখন এই জলের মধ্যে সেসব রাস্তা নিরাপদ নয় আদৌ। কিছু অত্যুৎসাহী গাড়োল আগুপিছু না ভেবেই নর্দমার মুখগুলো খুলে দ্যায়––––– মানুষ মারার এক অনবদ্য, উপাদেয় ব্যবস্থা।
মনে করুন, একহাঁটু জলের মধ্যে দিয়ে হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে যাচ্ছেন, নোংরা ঘোলা জলের নীচে কিছু দেখতেও পাচ্ছেন না, হঠাৎ অনুভব করলেন পায়ের তলায় শক্ত রাস্তাটা আর নেই। নর্দমার মুখটা ছোটো হলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কোমর ভাঙ্গবে, নিদেনপক্ষে পা, তিন-চার মাসের নামে হাসপাতাল। কপাল ভালো হলে আর নর্দমার মুখটা মানুষ গেলার মতো বড়ো হলে অতো কষ্ট পাবেন না, সিধে সলিল সমাধি। বর্ষাকালে কোলকাতা যখন প্রকৃত অর্থেই কল্লোলিনী হয়ে ওঠে এরকম দুএকটা ঘটনা প্রায় বছরেই ঘটে থাকে।
কিন্তু সেসব ভেবে তো আর জল নামা পর্যন্ত স্টেশনে রাত কাটানো যায় না; অতএব তিনি সাহস সঞ্চয় করে জলে নেমে পড়লেন। ঠিক করলেন বড়ো রাস্তা ধরেই এগোবেন ফুটপাথের ওপর দিয়ে শুকনো দিনে যা আদৌ হাঁটাচলার যোগ্য থাকে না।সেই ফুটপাথ এখন শুধু দখলমুক্ত-ই নয়, ওসব আনহোলি ম্যানহোলের বিপদ-টিপদ ও নেই। রাস্তায় যা-বাহন প্রায় নেই-ই তবে একটা বেশ চমৎকার জিনিস চোখে পড়লো –––––– একটা ঠেলাগাড়ীর চাকা দুটো খুলে, পাটাতনের নীচে তিন-চারটে হাওয়া ভরা টিউব বেঁধে দিব্যি এক ভেলা বানিয়ে ক’টা ছেলে তাইতে চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাঙ্গালীর উদ্ভাবনীশক্তির এক অনবদ্য নমুনা। দেখতে দেখতে তাঁর মনে হোলো বর্ষার কলকাতায় এটাও তো একটা চমৎকার পরিবহন ব্যবস্থা হতে পারে।
কিন্তু এই তত্বচিন্তার ফাঁকে ভেলাটা সাঁ-সাঁ করে বেরিয়ে গেলো, তিনি ডাকবার ফুরসৎ পেলেন না। কিঞ্চিৎ খোসামোদ করলে-টরলে হয়তো নিয়েও নিতো। জল ঠেলে ঠেলে যাওয়াটা অমলবাবুর বেশ অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো। তিনি আর খেয়াল করেননি যে বড়ো রাস্তাটা থেকে মাঝারি মাপের আর একটা রাস্তা বেরিয়েছে যেখানে ফুটপাথটা শেষ হয়ে গেছে, ফলে তাঁর পরবর্তী পদস্থাপনে হোলো সোজা রাস্তায় আর গভীর জলে। প্রায় পড়ে যেতে যেতে কিন্তু সামলে নিলেন।তবে এই প্রায়-পতনের দরুণ তাঁর একটি উপকার-ও হোলো––––– রাস্তাটা দেখে মালুম হোলো যে এটা ধরে চলে গেলেই পাইকপাড়া বাজার যেখান থেকে তাঁর সুখী গৃহকোন আর মিনিট পাঁচ-সাত, তবে শুকনো দিনে।
রাস্তাটা খারাপ নয়, তিন-চারটে তাগড়া তাগড়া বাম্পারের কল্যাণে গাড়ি-টাড়ি কমই চলে তাই ফুটপাথ দুটোও হাঁটাচলার উপযোগী। তিনি ফুটপাথ ধরে হাঁটা শুরু করলেন; বাজারের কাছে এসে তাঁর মালুম হোলো কি ভুল করেছেন। বাজারের যাবতীয় নোংরা, পচা আবর্জনা জলে ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকক্ষণ জল ঠেলে ঠেলে উনি বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, একটা উঁচু, নির্জলা রকের বসে সবে দম নিচ্ছেন, সারা দেহ-মন আলোড়িত করে দলিত-মথিত করে তিনটি হাঁচি তিনটি মিসাইলের মতো নির্গত হোলো।
সব্বোনাশ রে সব্বোনাশ, কাঁচা সর্দির পূর্বাভাস!! তাঁর পক্ষে আর বসে থাকা সম্ভব হোলো না। এক্ষুণি বাড়ী যেতে হবে। গিয়েই চার ফোঁটা অ্যাকোনাইট আর গরম জলে লেবুর রস মুখে ঢালতে হবে। না হলে কাঁচা সর্দি অবধারিত। সুতরাং ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভূ’ বলে তিনি আবার জলে অবতরণ করলেন।
বাজারে ভেতরটা বেশ সুইমিং পুলের চেহারা নিয়েছে, মাছের ঝাঁকাগুলো দড়িছেঁড়া বেওয়ারিশ নৌকোর মতো ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে; কিন্তু ঐ মনোরম, আনন্দময় দৃশ্য অবলোকন করার সময় তাঁর মোটেই নেই। সর্দির বিরুদ্ধে যাবতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা অবিলম্বে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অতএব জল ঠেলে ঠেলে তিনি গৃহাভিমুখে রওনা দিলেন এবং সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত অবস্থায় একসময় বাড়ীর দরজায় পৌঁছে গেলেন। ‘খোলো খোলো দ্বার রাখিয়োনা আর’ বলে গান গাইবার অবস্থা তাঁর তখন মোটেই নয়, ট্যাং-ট্যাং করে ঘন্টি বাজিয়ে আগমনবার্তা জানান দিলেন। গৃহিণীও উদগ্রীব হয়েই ছিলেন, ত্বরিতগতিতে এসে দ্বারোদ্ঘাটন করলেন। হাতের ব্যাগটা গিন্নীর হাতে চালান করে বল্লেন, “এটা মুখ ধোবার বেসিনে রাখো, এখনো জল পড়ছে”। ব্যাগমুক্ত হয়েই দৌড়লেন চানের ঘরে। ভিজে জামাটা গা থেকে খুলে মাটিতে ফেল্লেন। ততক্ষণে গিন্নিও হাজির হয়েছেন। জামা-প্যান্ট দুই-ই তাঁর হাতে ধরিয়ে বল্লেন পকেটগুলো একবার দেখে নিতে দরকারী কিছু আছে কি না। জামার পকেটে তেমন কিছুই ছিলো না কিন্তু প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়েই ‘মাগো’ বলে মোক্ষম, মর্মভেদী একটি চীৎকারসহ তিড়িং লাফ। কর্তাটি তখন কোমরে গামছাটি জড়িয়ে সদ্য অন্তর্বাসটি ত্যাগ করেছেন, গৃহিণীর অমন বিকটস্বরে মাতৃসম্বোধনে সচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কি ব্যাপার”? মহিলা তখনো পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেন নি শুধু বল্লেন, “বিছে”। কর্তাটি ভাবলেন বিছেটা বোধহয় বাথরুমের মেজেতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, তিনিও গিন্নির অনুরূপ আরেকটি লাফ। তখনো গামছাটি যথেষ্ট মজবুত করে বাঁধা হয়নি, এমন হঠাৎ লাফের ফলে কটির বাঁধন পড়লো খুলে ––––––– পূর্ণ দিগম্বর মূর্তি!!
সেটা অবশ্য নতুন কোনো দৃশ্য নয়, স্থান-কাল বিশেষে অন্যান্য সধবা পুরুষদের মতো ঐ একই পাত্রীর সমক্ষে ঐ একই মূর্তি বহুবার ধারণ করেছেন তবে এখন কান্ডটা বেশ হাস্যকর হয়েই দাঁড়ালো। গিন্নির তো হাসির চোটে প্রায় শুয়ে পড়ার উপক্রম। অমলবাবু ভেবেই পেলেন না স্নানাগারে বিছে এমন হাস্যকর বস্তু হয় কি করে তবে অচিরেই তাঁর ভুল ভাঙ্গলো, পুনরায় গামছাবৃত হয়ে বিরক্ত গলায় বল্লেন, “আরে বিছেটা কোথায়? এতো হাসির কি হোলো বিছে দেখে বুঝতে পারিনা”। গিন্নি যে কি দেখে হাসছিলেনসেটা তিনি ভালোই বুঝেছেন আর সেই অপ্রস্তুত বিড়ম্বনা ঢাকতেই যে তাঁর এই ছদ্ম বিরক্তি সেটাও মোটেই দূর্বোধ্য নয়। গিন্নিটি ততক্ষণে খানিক সামলেছেন, প্যান্টের দিকে ইঙ্গিত করে জানালেন পকেটে। অমলবাবু সাবধানী মানুষ; চানের বড়ো গামলায় আধাআধি মতো জল নিয়ে প্যান্টটা তার ভেতর ফেলে ঝুলঝাড়ার লাঠিটা দিয়ে পকেটের মুখটা খানিক ফাঁক করতেই দুটি নিরীহ চিংড়িশিশু নিষ্পাপ মুখে বেরিয়ে এলো। এতোক্ষণ আটকে থাকার পর মুক্তিলাভের আনন্দে একেবারে নেচে,নেচে কিলবিলিয়ে সাঁতার কাটতে লাগলো। হঠাৎ বিদুৎঝলকের মতো একটা কথা ওঁর মাথায় খেলে গেলো–––––– গিন্নির তো গত সাত-আট মাস যাবৎ স্পন্ডিলাইটিসের ব্যথা, সিঁড়ি ভাঙ্গতে কষ্ট হয়, ভালো করে শুতেও পারেন না যার জেরে মাসছয় যাবৎ বাধ্যতামূলক ব্রক্ষ্মচর্য পালন চলছে সেই মানুষ এমন লাফ দ্যায় কি করে?!
ব্যাপারটা অমলবাবু চেপে গেলেন ঠিকই সেই সঙ্গে মর্মে মর্মে উপলব্ধিও করলেন ঈশ্বর যা করে মঙ্গলের জন্যই করেন। সে জলের মধ্যে রিক্সা উল্টানোই হোক বা পকেটে চিংড়িশিশুর আবির্ভাবই হোক। সবই তাঁর কৃপাকণা।
২২-৮-২০২১.
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.