
নিজের হিসেব
কাজল মুখোপাধ্যায়
সকালের আলোটা আজ একটু ফিকে লাগছিল শ্যামলের কাছে।
বারান্দার রেলিং -এর ফাঁক দিয়ে যে রোদ প্রতিদিন একই জায়গায় এসে পড়ে, আজ যেন একটু সরেছে। অথবা হয়তো চোখটাই বদলে গেছে।
চা হাতে বারান্দায় বসে ছিল সে। সামনের রাস্তায় লোকজনের যাতায়াত আগের মতোই। কেউ তাড়াহুড়োয়, কেউ অন্যমনস্ক। শহর নিজের ছন্দে চলছে। এই চলার ভেতরেই কোথাও একটা চাপা অস্থিরতা, যা বাইরে থেকে ধরা পড়ে না।
শ্যামল একটি ছোটো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসেবরক্ষক। সংসার ছোটো, চাহিদা খুব বড় নয়, তবু কোথাও যেন হিসেব মেলে না। প্রতিদিনের মতো দিন কাটে, কিন্তু প্রতিদিনের শেষে একটা অদৃশ্য ঘাটতি থেকে যায়।
গতকালের ঘটনাটা মাথার ভেতর ঘুরছে।
অফিসে বসে কাজ করছিল, তখনই ম্যানেজার ডেকে পাঠান। সামনে একটি ফাইল। খুলতেই শ্যামল বুঝতে পারে সংখ্যার ভেতরে গরমিল আছে। বড় অঙ্কের কিছু লেনদেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। চোখ সরিয়ে নিতে চেয়েও পারেনি।
ম্যানেজার খুব স্বাভাবিক গলায় জানতে চেয়েছিলেন সব ঠিক আছে কি না। শ্যামল একটু থেমে বলেছিল যে গরমিল আছে। উত্তরে একটি মৃদু হাসি। তারপর বলা হয়েছিল, সব জায়গায় এমন সামান্য ভুল থাকে, ফাইনাল হিসেব ঠিক করে দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের কথা মনে রাখতে হবে।
এরপর খুব স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি কথা আসে, এই মাসেই বেতন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শ্যামল কিছু বলেনি। শুধু মাথা নেড়েছিল।
বাড়ি ফিরে কথাবার্তা কম ছিল। খাওয়ার টেবিলে মধুমিতা ছেলের স্কুলের খরচের কথা তোলে। ভর্তি হতে গেলে এবার কিছু বেশি টাকা লাগবে। শ্যামল তখন শুধু বলে যে দেখছে।
তারপর রাতে ঠাকুরঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সে। ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। হাত জোড় করেছিল, কিন্তু প্রার্থনা আসেনি। মনে হচ্ছিল সে কী চাইছে তা নিজেই স্পষ্ট নয়।
সত্যি, নাকি সুবিধা?
ছোটোবেলায় বাবার কথা মনে পড়ে। খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন। বলতেন, সত্যি সহজ নয়, কিন্তু মাথা নিচু করতে হয় না। সেই কথাগুলো আজ যেন দূরের কোনো আওয়াজের মতো শোনায়।
পরদিন অফিসে এসে আবার ফাইল খুলে বসে শ্যামল। সংখ্যাগুলো স্থির, অথচ তার ভেতরটা অস্থির। চারপাশে সবকিছু স্বাভাবিক। সহকর্মীদের কথাবার্তা, কীবোর্ডের শব্দ, ফোনের রিং। এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
কলমটা হাতে নিয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করে। কিছু সংখ্যা বদলে যায়। কয়েকটি শূন্য সরে যায় তাদের জায়গা থেকে। খুব বেশি সময় লাগে না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মধুমিতা জানায়, স্কুল থেকে ফোন এসেছিল। সময়মতো টাকা দিলে ভর্তি হয়ে যাবে। তার গলায় একরকম স্বস্তি, অনেকদিনের চাপ যেন একটু কমেছে।
শ্যামল হাসে। অনেকদিন পর। কিন্তু সেই হাসির ভেতরে কোথাও যেন একটা ফাঁক থেকে যায়, যা বাইরে থেকে ধরা পড়ে না।
রাতে ছেলের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিঃশ্বাসের ওঠানামা নিয়মিত। এই ছোটো জীবনের নিশ্চিন্ততা তার নিজের অস্থিরতার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিশে যায়।
সে ভাবতে চেষ্টা করে আজ সে কী করল। কোনো নির্দিষ্ট উত্তর আসে না। ধর্ম, আদর্শ, দায়িত্ব, প্রয়োজন সবকিছু একসঙ্গে এসে জড়ো হয়, তারপর আবার ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন সকালে আবার রোদ আসে। এইবার ঠিক আগের জায়গায়। সবকিছু স্বাভাবিক। শহর তার মতো করে চলছে।
শুধু শ্যামল জানে, একটি হিসেব এখনও বাকি আছে।
যে হিসেব কাগজে মেলে না, শুধু মনের ভেতরে থেকে যায়।

নিজেই নায়ক
মলয় সরকার
সাহিত্য সভা থেকে ফিরতে একটু রাতই হয়ে গেল আমার। শরীরটা খুবই ক্লান্ত লাগছে। দাশু দরজা খুলে দিতেই আমি বললাম " আজ আর কিছু খাব না রে ভালো লাগছে না। তুই খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পর।"
দাশু কিছু না বলে দরজা বন্ধ করে চলে গেল। আমি ঘরে যেয়ে একটু অবাক হয়ে গেলাম। দাশু তো এত গোছালো লোক নয় তবে আমার ঘরটা এত সুন্দর করে কে গোছালো। ঘরের ফুলদানিতে এক গোছা রজনীগন্ধা রাখা। আমার অগোছালো লেখার টেবিল সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা। না এত রাতে দাশুকে ডাকা ঠিক হবে না। কাল সকালে ওর সাথে কথা বলতে হবে।
জামাকাপড় ছেড়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই যত রাজ্যের ঘুম আসে আমার চোখে যেন হাত বুলিয়ে দিল।
হঠাৎ মাঝরাত্রে আমার গালে একটা ঠাণ্ডা স্পর্শে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙ্গে মনে হল বিছানায় আমার সাথে আরো কেউ যেন আছে। গালে হাত দিয়ে দেখলাম গালে একটা জায়গা সত্যি খুব ঠান্ডা। না হয়তো আমারই ভুল। এক গ্লাস জল খেয়ে আবার শুয়ে পড়লাম।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শরীরটা মনে হচ্ছে খুব ঝর ঝরা ।
" দাদাবাবু আপনার চা "। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে দাশুকে জিজ্ঞেস করলাম " কিরে তুই কালকে আমার ঘরটা গুছিয়েছিস? " নাতো দাদাবাবু। আমি তো কালকে তোমার ঘরে একবারও যাইনি। "
" তাহলে আমার ঘরটা অত সুন্দর করে কে গুছিয়ে দিল। ফুলদানিতে ফুল পর্যন্ত রাখা। এবার আমার অবাক হবার পালা।
না সামনে পুজো সংখ্যার গল্পটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। সম্পাদক তাড়া দিচ্ছে। ডাইরি আর পেন নিয়ে বসলাম। গল্পটার শেষটা কি হবে সেটা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না।
রাত্রিবেলা তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে বসলাম গল্পটা শেষ করার জন্য। হঠাৎ দেখলাম আমি একটা ভাঙ্গা বাড়িতে এসে পৌঁছে গেছি। দরজা খুলে ঘরের মধ্যে ঢুকতেই দেখলাম এক ভয়ংকর দৃশ্য। একটা লোক জোর করে এক মহিলার শ্লীলতা হানি করছে।
অবাক হয়ে আমি তাকিয়ে দেখলাম এ তো আমার গল্পের নায়িকা শ্রীলতা আর ঐ লোকটা ওতো ধীমান। হঠাৎ করে আমার সব গল্পের চরিত্ররা যেন আমার সামনে। চোখের সামনে ধীমান শ্রীলতাকে ধর্ষণ করলো বীভৎস ভাবে।
তারপর গলা টিপে মেরে ফেললো শ্রীলতাকে। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম।
" দাদাবাবু কি হয়েছে? আপনি অমন করে চিৎকার করে উঠলেন কেন? "
দাশুর ডাকে আমি যেন সম্বিত ফিরে পেলাম। আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে।
" না আমি ঠিক আছি যা তুই শুতে যা। "
এটা কি হচ্ছে এটা কি আমার অবচেতন মনের কল্পনা না সত্যি অন্য অলৌকিক কিছু।
বিছানায় যেয়ে চোখ বুজলাম। একটা ভালোমতো ঘুম হলেই মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে। হঠাৎ মনে হল আমাকে কে যেন জড়িয়ে ধরেছে। হাত ছোঁয়াতে উফ কি ভীষণ ঠান্ডা।
" কে তুমি? "
" হি হি আমি শ্রীলতা তোমার গল্পের নায়িকা। তুমি তোমার গল্পে আমাকে এরকম অবস্থা করলে। এটা তোমার কাছে আশা করিনি। আমি সত্যি ভালোবাসা চেয়েছিলাম বিতানের কাছে। তুমি আমাদের ভালোবাসার গল্পের মাঝে ধীমানকে এনে ফেললে।
আমার ভালবাসাকেও মেরে ফেললে। কিন্তু আমি যে ভালোবাসার কাঙাল। এখন যে আমি তোমাকেই ভালোবেসে ফেলেছি। এখন থেকে তুমি আমার। তোমার গল্পের নায়ক এখন তুমি নিজেই আর আমি তোমার গল্পের নায়িকা। তোমাকে যে এখন এভাবেই গল্পটা লিখতে হবে। "
এ কি শুনছি আমি। আলতো করে কে যেন আমার গালে একটা চুমু দিলো। সত্যি কি আমার গল্পের নায়িকা জীবন ফিরে পেয়েছে? আমি মেতে উঠলাম আমার নায়িকার সাথে। রাত কেটে ভোর হয়ে গেল। আমি লাফ দিয়ে উঠলাম বিছানা থেকে। কি আশ্চর্য আমার গালে সত্যি একটা লিপস্টিকের ছাপ।
আবার নতুন করে লেখা শুরু করলাম গল্পটা। এবার যে গল্পের নায়ক আমি নিজেই। জানিনা এর শেষটা কোথায় হবে। এরপর প্রতি রাত্রে আমি আর শ্রীলতা নতুন নতুন গল্পের প্লট লিখতে লাগলাম।তারপর?

রূপকথা ঘর
তনুশ্রী সামন্ত
যেদিন আমরা একসাথে হাত ধরাধরি করে নেমেছিলাম মধুমতী নদীটার জলে, ঘাসে ঘাসে বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে, পাড়েই দাঁড়িয়ে ছিল একটা হেলানো কুসুম গাছ। সেইখানে তুলে রেখেছিলাম আমাদের পার্থিব নাম।আর নামের গায়ে লেগে থাকা সমস্ত সাজ পোশাক। সূর্যোদয়ের সোনালী আলোয় নদীজলে গুলেছিলো গুঁড়ো গুঁড়ো স্বর্ণের রেণু। আমরা যখন স্নান করে উঠে এলাম, তখন আমরা স্বর্ণমানব...স্বর্ণমানবী! তারপর আমরা ঠিক করলাম আমরা একটা ঘর গড়বো কনকচাঁপা দ্বীপের বুকে।
আমি বলেছিলাম,--" ঘরের দেওয়াল হবে রামধনুর! সাতরঙা দেওয়াল আমার ভীষণ ভালো লাগে।"
তুমি বলেছিলে,--" তা হোক তবে ছাদ হবে জ্যোৎস্নার! সারাদিন কাজ শেষে জ্যোৎস্নার তলায় বসে মায়াবী আলোয় আমি তোমার ছবি আঁকবো।"
আমি বলেছিলাম,--" তাহলে মেঝে কিসের হবে মশাই? শিশিরের না কি সুগন্ধের?"
তুমি ভোরের আকাশের মতো স্নিগ্ধ নীল চোখে আমার মুখের পানে চেয়ে বলেছিলে..." ভালোবাসার!"
" আমাদের কোনো বিছানা থাকবে না। ভালোবাসার মেঝেতে শুয়ে জ্যোৎস্নার আলো মাখতে মাখতে আমরা একে অপরের হৃদয়ের গন্ধ শুষে নেবো।"
আমি বলেছিলাম---"আমার কিন্তু একটা নতুন নাম চাই!"
তুমি আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিলে--"হাসনাহেনা!"
আমি তোমার আদরে দ্রবীভূত হতে হতে, তোমার কানে ফিসফিস করে বলেছিলাম--"তাহলে তোমার নাম গন্ধরাজ!"
আমি আবেগের স্রোতে ভাসতে ভাসতে তোমার গলা জড়িয়ে বলেছিলাম --"আর আমাদের ঘরের নাম কি হবে?"
তুমি হঠাৎ টুপ করে বলেছিলে..." রূপকথা ঘর!"
আমি খুব খুশি! "আহা রূপকথা ঘর! দিনের বেলায় আমাদের ঘরের সামনে অনেক হলুদ প্রজাপতি উড়ে বেড়াবে সারাক্ষণ! আর রাতে একঝাঁক জোনাকি! আর লাল নীল ছোট্ট পাখিরা মিষ্টি শিষে ভরিয়ে রাখবে বাতাস।"
আমি আনন্দে আবেগ আমার বুনোফুল আঁকা আঁচল উড়িয়ে নাচতে শুরু করলাম!
তুমি খুব খুব হাসতে হাসতে বললে... "তুমি পাগল হলে না কি?"
আমি দুবাহু প্রসারিত করে চিৎকার করে বললাম--- "উঁহু, পাগলী হলাম!"
হঠাৎ আকাশ থেকে ঝরে পড়তে লাগলো ইলশেগুঁড়ি! অস্তগামী সূর্য মুচকি হেসে একমুঠো আলো ছড়িয়ে দিলো তাদের গায়ে! আর তক্ষুনি, ঠিক তক্ষুনি চোখের নিমেষে তৈরী হলো আমাদের রূপকথা ঘরের রংধনু দেওয়াল! আমরা ভালোবাসার মেঝেতে বসে অনিমিখে তাকিয়ে থাকলাম আকাশের দিকে। জ্যোৎস্নার ওড়না উড়তে উড়তে এসে গড়ে দিলো আমাদের ঘরের ছাদ। আমরা সারারাত ধরে দ্রবীভূত হতে থাকলাম!মিশে যেতে থাকলাম! লাল নীল পাখিগুলো রাতেও ঘুমায় না বোধহয়! ওরা মিষ্টি সুরে শিষ দিতে থাকলো।
এভাবেই কাটছিলো কি সুন্দর আমাদের রূপকথা জীবন! তুমি ফুলের মধু নিয়ে আসতে। আমি নদী থেকে কলস কাঁখে নিয়ে আসতাম তিরতিরে ঝর্ণার জল! একদিন তুমি মধু আনতে গিয়ে ফিরলেনা অনেক রাত পর্যন্ত! আমি কাঁদলাম! জোনাকিগুলো মনখারাপ করে উড়ে এসে বসলো আমার শাড়িতে! হলদে প্রজাপতিগুলো সন্ধে হলেই ডানা গুটিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আমার অশ্রুফোঁটার শব্দে তারাও জেগে উঠলো।লাল নীল পাখিরা শীষ থামিয়ে দিল। সবাই উড়তে উড়তে আমায় পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো অনেক অনেক অনেক দূরে! আমার নরম পায়ে কাঁটার আঁচড় লাগছিল। রক্ত ঝরছিলো খুব! তবুও হাঁটছিলাম। হঠাৎ তোমায় এসে পেলাম দ্বীপের শেষপ্রান্তে। যেখানে নীল সমুদ্রের সফেন জলরাশি মেঘের মতো ঘনিয়েছিল চারিদিকে। আমি তোমায় তুলে নিয়ে এলাম অনেক অনেক কষ্টে আমাদের রূপকথা ঘরে।
ফুলের মধু দিলাম তোমার মুখে। তিরতিরে ঝর্ণার জলে ধুইয়ে মুছিয়ে দিলাম তোমার গা! প্রজাপতিরা তাদের কোমল পাখার বাতাস দিলো... ফুলের পরাগ এনে মাখিয়ে দিলো তোমার সারা শরীরে! ছোট্ট পাখিরা সারাদিন সারারাত তোমার পাশে বসে গান গাইতে থাকলো। অবশেষে তিনদিন তিনরাত পর তুমি সুস্থ হলে! সারাদিন আমি নাচলাম প্রজাপতিদের সাথে। গাইলাম পাখিদের সাথে গলা মিলিয়ে! রাতে জোনাকিদের ঘরের বাইরে সাজিয়ে এসে আমি তোমার কাছ ঘেঁষে বসলাম! আমি আমাদের হারিয়ে যাওয়া রাতগুলো ফিরে পেতে চাইলাম আবার! তোমাকে জড়িয়ে ধরলাম! তোমার বুকে মুখ ডুবিয়ে তোমার হৃদয়ের গন্ধ নিতে চাইলাম! কিন্তু কেমন অচেনা লাগছিল তোমায়! অচেনা লাগছিল তোমার হৃদয়ের গন্ধ! আমার... আমার কেমন উদভ্রান্ত লাগছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম --তুমি আমার গন্ধরাজ তো? তোমার গলার স্বরে কেমন কুহেলিকা মিশে যাচ্ছিলো! আর আমাদের গায়ের সোনার রেনুগুলো ঝরে ঝরে পড়ে যাচ্ছিলো সব! জোনাকিরা পুঁতির দানার মতো খসে পড়ছিলো। প্রজাপতির হলুদ ডানা হঠাৎ বর্ণহীন! লাল নীল পাখিগুলো টুপটাপ ঝরে পড়ছিলো ঝরা ফুলের মতো! মিলিয়ে যাচ্ছিলো রংধনু দেওয়াল!জ্যোৎস্নার ছাদ থেকে ঘুটঘুটে আঁধার চুইয়ে নামছিলো! আমাদের রূপকথা ঘর ঝুরঝুর করে ঝরে যাচ্ছিলো এভাবেই! আমি অবাক হয়ে দেখলাম চারপাশে নীল কুয়াশায় ভেতরে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে আরো অনেক অনেক অনেক রূপকথা ঘর! আচ্ছা, ওদের হৃদয়ের সুগন্ধেও কি দূষনের দুর্গন্ধ মিশেছিল?! জানিনা! তবে মেঘের মতো ঢেউগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছিলো এদিক ওদিক! আর ধুয়ে মুছে দিচ্ছিলো একের পর এক সব রূপকথা ঘর!!

পত্র সাহিত্য
শিবানী চ্যাটার্জী
টেক্সাস থেকে
-----------------
২৯/০৪/২০২৬
মা, কেমন আছো?? প্রবাসে থাকতে থাকতে জীবনটা আজ ভীষণ যান্ত্রিক। ওখানের সাথে এখানের সময়ের ফারাকে কথা বলার সুযোগ ব্যাহত হয়। তুমি যখন ঘুমের দেশে তখন হয়তো সময় মেলে ,আবার আমি যখন সময় পাই তখন তোমার সময় হয় না। মাঝে মাঝে ভীষণ মনে পড়ে মা সেই শৈশবের রঙিন দিনগুলো। হয়তো এখানের রঙিন আলোয় সাথে তাল মেলাতে পারবে না তবুও সে রঙিন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে যায়। কত উৎসব ,মেলা, নববর্ষ, রবীন্দ্র জয়ন্তী সবকিছুর স্বাদ যেন ভুলতে বসেছি। বছর শেষে চৈত্র মাস মানেই ভোক্তাদের ভিড় পাড়ায় পাড়ায়। জেঠিমা কাকিমা,ঠাকুমারা ,পাড়ার সবাই ,তুমি কত নিয়ম কানুন মেনে সংস্কার, রীতিনীতি বজায় রাখতে। চড়কের মেলা,গাজন, তারপর নাগরদোলায় ভোক্তারা পিঠে
বাঁশের কঞ্চি দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করত সন্ন্যাস রাখতে। খুব ভয় করত। ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছিলাম।
গাঁয়ে গঞ্জের মানুষের সরলতা মনকে এখনো টানে। কি জানি, আমরা যন্ত্র সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে জীবনটাকে যন্ত্র বানিয়ে ফেলেছি। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য খুব চিন্তা হয়। ওরা তো মাঠঘাট ধুলোবালি কিছুই জানলো না। পিঠ শক্ত করতে গেলে কতবার আছাড় খেয়ে পড়তে হয় কিছুই জানলো না। ঘড়ির কাঁটার সাথে ইঁদুর দৌড়ে আমরাও সামিল, ওদেরকেও তাই করছি। আচ্ছা মা, সংক্রান্তির দিন সেই ছাতু বারা উৎসব এখনো হয়?? ঐদিন সবাই স্নান করে মুড়ি ছাতু খেতো সাথে ফলমূল। ভুলেও গেছি ছাতার মাথা!! ভুল হলে জানিও তো মা। আজ একটু সময় পেয়ে তোমাকে চিঠি লিখতে বসলাম মোবাইল সরিয়ে রেখে। মুঠোফোনে বন্দী হয়ে সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা মা, নববর্ষের দিন সেই হালখাতা করতে যায় সবাই?? নববর্ষের দিন দোকান সাজিয়ে গুছিয়ে লাল খাতা খোলা হতো।থাকত সিঁদুরের টিপ আর স্বস্তিক চিহ্ন।কারণ এখন তো সব অন লাইন। ব্যবসাপত্রের কাজকর্ম কম্পিউটারে লোড থাকে।নববর্ষে সবাই তখন গুরুজনদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতাম। এখনতো সব লুপ্তপ্রায় । জানি না মা দশ বছর পর আবার কি দেখব?? তখন তোমার নাতিও প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাবে। আমিও অনেকটাই বুড়ো হবো। চুলে পাক ধরবে। দাঁত হয়তো নড়বে। মাংস চিবিয়ে খাবার ক্ষমতা কমে যাবে।
সবকিছুই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে কেমন!! নববর্ষের নতুন জামার গল্প বোধহয় এখন শেষ তাই না মা?? কারণ বাড়িতে বসেই প্রতিদিনের শপিং এখন রোজনামচার মধ্যেই পড়ে।
আমার খুব মনে পড়ে। পূজো আর নববর্ষে ছিল নতুন জামা পড়ার সুযোগ।
সারাবছর এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ছিল বুকভরা খুশির সাথে খুনসুটি। আচ্ছা মা গ্ৰামের মানুষদের মধ্যে এখন কিছু পরিবর্তন হয়েছে?? আধুনিকতা ওদের ছুঁয়েছে একটুও?? তুমি অবশ্য বললে সেদিন এখনকার ছেলেমেয়েরা খুব
ডাকাবুকো।
বুঝতে পারি সোশ্যাল মিডিয়া এখন খুব শক্তিশালী। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছে। কদিন পরেই রবীন্দ্র জয়ন্তী।
জোরদার সেই রিহার্সাল। খাওয়া দাওয়া ভুলে স্কুলে পাড়ায় একভাবে চলত। সুন্দর বিশুদ্ধ পরিবেশে পালন করার চেষ্টা করা হোত। শান্তিনিকেতনের সবুজ ছায়ায় বৈশাখী অনুষ্ঠান,এসব গল্পগুলো নস্টালজিক করে তোলে মাঝে মাঝে। আজ ও হয়তো হয় ঠিকই। কিন্তু এখন সবকিছুর মাঝে আড়ম্বরের গন্ধ পাই। এখন হয়তো অনেক স্কুল,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,বাচিক কেন্দ্র হয়েছে। কিন্তু তখন সেই ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলোই জীবনের রঙ্গমঞ্চে তুলত ঝড়। এখানেও বিদেশ বিভুঁইয়ে হয় কিন্তু দেশের মাটির গন্ধ তো আর পাই না।
বাংলার সেই বারো মাসে তেরো পার্বণ। প্রতি মাসে লেগেই থাকে। তবে এই সব পার্বণের ইতিহাস এখন কেউ সেভাবে জানতে আগ্ৰহী নয়। আমাদের কিন্তু এখনো সেই খিদে রয়ে গেছে। মা,তুমি কিন্তু চেষ্টা করবে আমার চিঠির উত্তর নিজে হাতে লিখতে। কেন বলোতো মা, এই সময়ের বুকে আমি একটা চিহ্ন রেখে যেতে চাই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। তখন যদি বাংলায় ভালো চাকরি পেতাম তাহলে কি বিদেশের মাটি ছুঁয়ে দেখতাম!! যাদবপুর থেকে পাশ করেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আসা তারপরেই পরিস্থিতি বাধ্য করেছে। এখন সেই অপেক্ষা কখন এদেশ থেকে জন্মভূমিতে গিয়ে দিন কাটাবো। বাংলায় তো আজ ভোট উৎসব কারণ এটাকে এখন উৎসবের মতোই মনে করে বেশিরভাগ মানুষ। মানুষের মৌলিক অধিকার বোধহয় মানুষ ভুলে যায়।
যাই হোক সাবধানে যাবে ভোট দিতে। উজাড় করে দিলাম মনের জমানো যত কথা। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই অধ্যায়টি প্রায় অবলুপ্ত। পাতার পর পাতা চিঠির গল্প বললে হোস্টেলের কথা মনে পড়ে যায় । পিয়ন দাদা বস্তা এনে ফেলে দিত। তার মধ্যে থেকে সবাই সবার জিনিস খুঁজে নেবার তাগিদে ছুটত। বাবা মা আত্মীয় স্বজনের পরেও
প্রেম পত্রের অপেক্ষায় কিছু বন্ধুর উৎকণ্ঠা দেখে অবাক হতাম। তোমার মনের কথাগুলো ,গ্ৰামের মানুষের গল্প একটু জানিও আমায়। খুব জানতে ইচ্ছে করে।
তোমার বৌমা ও নাতি এখনি এসে পড়বে সুইমিং থেকে। যেটুকু সময় পেলাম আজ তোমার সাথে অনেকদিন পর মনের আলাপনে ব্যস্ত ছিলাম। ভালো থেকো। সুবিধা অসুবিধা জানিও।
তুমি আমার প্রণাম নিও।
তোমার দুহাত ভরা আর্শীবাদ প্রার্থী আজও আমি।
ইতি---
তোমার ছেলে
সৌনক।
প্রযত্নে:-ভারতী মিত্র
গ্ৰাম:- গোবিন্দপুর
পোঃ:- গোবিন্দপুর
জেলা:- বাঁকুড়া
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.