
জুঁইগন্ধী বৃষ্টি
তনুশ্রী সামন্ত
মাঝে মাঝে বিমলেন্দুর চোখে জল এসে যায় বৌমার এমন নিষ্ঠুর ব্যবহারে। বিস্কুট যে ফুরিয়ে গেছে,তা সকাল বেলায় সে যখন সব্জি বাজার করতে গিয়েছিল তখন বললেই হতো। তা নয়,এই এখন বেলা গড়িয়ে এলো, আকাশে ঘুটঘুটে মেঘ, এখন বলছে কিনা বিস্কুট একেবারেই নেই। এবছর জৈষ্ঠ্য মাসেও বিকেলের দিকে বেশ ভারী বৃষ্টি হচ্ছে কদিন।আজও হবে বোধহয়।
বৌমার বক্তব্য...... "সন্ধ্যায় তাতানের টিউশান টিচার আসবে। তাকে কি চায়ের সাথে বিস্কুট না দিলে চলে!"
আরে বাবা একদিন বিস্কুট না দিলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে! তাছাড়া এই আবহাওয়ায় মাষ্টার মশাই আদৌ আসতে পারবেন কি না তার ঠিক নেই! বাড়িতে যদিও কুচো নিমকি আছে, ভেজে দিলেই হতো,কিন্তু মাষ্টার মশাইয়ের আবার তেলের জিনিস দেখলেই নাক কোঁচকানো স্বভাব। তাই অগত্যা! না গেলে বৌমা পাড়া মাথায় করবে!
অর্ক পূর্ব মেদিনীপুরের একটা বি ডি ও অফিসে ক্লার্ক এর কাজ করে। যেতে আসতেই তার প্রায় সারাদিন ফুরিয়ে যায়। তাই হাট,বাজার,দোকান দানি, ঘরের এটা ওটা কাজ বিমলেন্দুকে করতেই হয় এই বয়সে। টিউশান টিচারকে বুবাইদের মতো রোজ এটা ওটা টিফিন দেওয়ার সাধ্য তাদের নেই। তবে নাতি পড়াশুনায় বেশ ভালো। তাই প্রাইভেট টিউটর দেওয়া আছে। বৌমা অবশ্য নিজের ছেলের পড়ার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। এই ব্যাপারটা অবশ্য ভালোই লাগে বিমলেন্দুর।
অর্ক তখন খুব ছোট,বিমলেন্দু একটা স্কুলে পিয়নের চাকরি নিয়ে চলে এলো পশ্চিম মেদিনীপুরের একটা গ্রামে। তখন যদিও পূর্ব আর পশ্চিম মেদিনীপুর ভাগ হয়নি। আদি বাড়ি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা। কিন্তু সেখানে পাঁচ ভাই বোন। জমি জায়গা তেমন বিশেষ নেই। তার ওপর জলা জায়গা। এখানে এসে ওই ছোট্ট চাকরি টুকু সম্বল করেই একটুকরো জায়গা কিনেছিলো সে। প্রথমে অবশ্য ধীরেন বাবুর বাড়িতে থাকত।তার দুই ছেলেকে পড়াত। এটা ওটা কাজও করে দিত। অর্কর মা তখন দেশ বাড়িতেই থাকত। মোটামুটি অল্প দামেই পেয়েছিলো জায়গাটা। ধীরেন বাবুদেরই জায়গা। একটু বাঁশবাগান ঘেঁষা.... স্যাঁতসেঁতে। তা হোক নিজের মতো করে একটা সংসার তো পাতা যাবে। রোহিনী খুব ঘরনী মেয়ে, যেখানেই থাকুক সে সব সাজিয়ে গুছিয়ে নেবে ঠিক,এই ভরসা বিমলেন্দুর ছিল। তাছাড়া এই গ্রামটা স্কুল থেকে কাছেই। সাইকেল তো চালাতে জানেনা বিমলেন্দু। ছোটবেলায় বাড়িতে একখানা মাত্র সাইকেল ছিল। সেটা নিয়ে দু দাদারা টানাটানি করতো। বিমলেন্দু সাইকেলে হাত দিতেই পেত না। তারপর বড়ো হয়ে কেমন যেন ভয় ধরে গেলো। তাই সাইকেলটা আর শেখা হয়ে ওঠেনি। বিমলেন্দু তার দাদাদের মতো অতোটা শক্তিশালী ছিল না। তবে দাদাদের থেকে পড়াশোনাটা একটুখানি শিখেছিলো। সেই সুবাদেই,এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের যোগাযোগে এই কাজটা জোগাড় হয় তার। বছর তিনেক বিয়ে হয়েছে তখন বিমলেন্দুর। এখানে এসে আরো বছর চারেক কাটার পর জায়গাটা কিনেছিল। জায়গা কিনে একটুকু মাটির বাড়ি করেই বৌ বাচ্চাকে নিয়ে এলো চাকুরী স্থলে। অর্ক তখন পাঁচ বছরের।
দুজনেই ধীরেন বাবুদের বাড়ির ফাই ফরমাশ কাজ করে দিত। ধীরেন বাবুর মা নলিনী জ্যাঠিমা ভীষণ ভালোবাসতেন ওদের।একটু একটু করে বড়ো হলো অর্ক। অর্কর মা ছেলেকে মানুষ করার জন্য ধীরেন বাবুর বাড়ির পার্মানেন্ট কাজের লোক হয়ে গেলো প্রায় । নলিনী জ্যাঠিমা হঠাৎ প্যারালাইসিসে। অলকা বৌদির পক্ষে অতোবড়ো সংসার সামলানো সহজ ছিল না। কিন্তু অলকা বৌদি জ্যাঠিমার মতো অতো দয়ালু মহিলা ছিলেন না। ধনী বাড়ির গৃহকর্ত্রী যেমন হয়, তেমনি ছিলেন। সারাদিন কাজ করতে হতো রোহিনীকে,তাই ভোর চারটে থেকে ছেলেকে তুলে দিয়ে পড়াতে বসতো নিজে। শ্যামলা বৌ হলেও লেখাপড়া কিছুটা জানত অর্কর মা। অর্ক তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তো, সন্ধ্যাটায় বিমলেন্দু নিজে পড়াত। ঐ আটটা অব্দি। সারাদিন কাজের পর বিমলেন্দুরও ক্লান্ত লাগতো। ধীরেন বাবুর দুই ছেলে তখন বড়ো হয়ে বাইরে চলে গেছে। বিমলেন্দু কিছুটা টাকা রোজগারের জন্য পাশের গ্রামে,তার স্কুল পাড়াতেই একটা টোল করত। তবে ছেলে খুব ছোট আর বেশ দুষ্টু বলে সঙ্গে নিয়ে যেত না। ভোরবেলা মায়ের কাছে পড়ে, সারা সকাল মায়ের সাথেই ঘুরঘুর করতো। কাজের ফাঁকেই রোহিনী ছেলেকে গুছিয়ে গাছিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিত। ছেলে যেন তার বড়ো মানুষ হয়, এই ছিল রোহিণীর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বৌমারও ছেলের প্রতি সেই টানটা আছে দেখে ভালো লাগে বিমলেন্দুর। তবে নিজের ছেলের মতো নাহলেও,বৃদ্ধ শ্বশুরমশাইকেও যদি একটু আধটু স্নেহের চোখে দেখত বৌমা! এই বুড়ো বয়সে এসে আবার স্নেহ পেতে ইচ্ছে করে বিমলেন্দুর। কতদিন জীবনে স্নেহের পরশ নেই। মা,নলিনী জ্যাঠিমা সবাই তো মারা গেছেন সেই কবেই। রোহিনীর মৃত্যুও প্রায় সাত বছর হল।
নাঃ, মেঘটা ঝুলে থাকলেও বৃষ্টি পড়ছে না এখনো! বিমলেন্দু দু প্যাকেট মারী বিস্কুটের প্যাকেট লাইলনের ব্যাগে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালো। পেছন থেকে অজিতদা ডাক দিলো, আরে বিমলেন্দু, বাজারে এলে আর এককাপ চা না খেয়েই চলে যাচ্ছো যে!
....."না আজ আর চা খাবো না, আকাশে যা মেঘ! তাছাড়া সন্ধ্যা হয়ে এল!"
বাজারে এলে বিমলেন্দুর এই একটাই শখ,চা খাওয়া। ঝড়ু চা টাও বেশ বানায়। পেনশনের যে কটা টাকা পায় তার কিছুটা নিজের হাতখরচ রেখে সংসারের কাজেই ব্যায় করেন তিনি। এই যেমন আজকের বিস্কুটটা!
ইদানিং একটু বেশি জোরে হাঁটলে হাঁফ ধরে বিমলেন্দুর। ডাক্তার বাবু বলেছেন,ইশ্চেমিক হার্ট ডিজিজ! সেই একবারই অর্ক বড়ো ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করিয়েছিল। বৌমা বলেছিল, বাব্বা এ তো রাজরোগ ! এক বারেই এতো খরচ! তার পর থেকে বিমলেন্দু আর বড়ো ডাক্তারের কাছে যায়নি। অর্কও অবশ্য যেতে বলেনি সেভাবে। কুমুদপুরের নগেন ডাক্তারের কাছেই ওষুধ খায় এখন বিমলেন্দু। নগেন ডাক্তার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেন। তবে বেশ নামডাক আছে। আশেপাশের পাঁচ সাতটা গ্রাম থেকে মানুষ জন আসেন চিকিৎসার জন্য।
বাজারটা একটু ছেড়ে আসতে না আসতেই অঝোরে বৃষ্টি এলো। এখনো প্রায় এক কিলোমিটার গেলে তবে বাড়ি। ঝমঝম বৃষ্টির ফোঁটা তাকে প্রায় ভিজিয়েই দিলো। হাতের ভাঙা ফুটো ছাতাটায় বৃষ্টি আটকাচ্ছে না। তাছাড়া হাওয়ায় দমকও বেশ!একটু এগিয়ে খামরইদের গোয়াল চালা। দিনের বেলায় এখানে গোরু বাঁধা থাকে। সন্ধ্যে হলে গোয়ালঘরে ঢুকিয়ে দেয় গরুগুলোকে। বৃষ্টিতে প্রায় ভিজে গেছে বিমলেন্দু । মনের দুঃখে চোখ দিয়েও বৃষ্টি নামছে। হঠাৎ বিমলেন্দুর মনে হলো, বৃষ্টিতে কেমন যেন জুঁই ফুলের গন্ধ!একটু অবাক হতে হতেই ছুটে গিয়ে উঠে পড়ল খামরইদের গোয়াল চালায়। এখন এখানে গোরু নেই। আকাশে কালো মেঘ দেখে গরুগুলোকেও যত্ন করে গোয়ালে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দুর্যোগে বোধহয় শুধু বিমলেন্দুই বাইরে!
কিন্তু কী অবাক কান্ড! অঝোর বৃষ্টি জুড়ে সেই জুঁই ফুলের গন্ধ! গোয়াল চালায় গোবর পড়ে আছে কিছু। তার লাগোয়া, দু চার পা দূরেই ওদের বড়ো গোয়ালঘরটা। সন্ধ্যের আগে গোরু গুলোকে গোয়ালে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে একটা গোরু হাম্বা হাম্বা করছে এখনও।
বিমলেন্দুর হঠাৎ মনে হলো,এমন জুঁইগন্ধী তেল চুলে দিতো রোহিনী। ডুরে শাড়ি,পণ্ডস্ পাউডার, আর এই জেসমিন তেল, এটুকুই ছিল রোহিণীর বিলাসিতা। তাও খুব তুলে তুলে রাখতো সে এসব। সপ্তাহের অন্য দিন চেক চেক লুঙ্গি শাড়ি পরতো।লক্ষ্মীবার হলেই ডুরে শাড়ি পরে, জুঁইগন্ধী তেল মাথায় দিয়ে লক্ষ্মীর থানে আর ঘরে ঘরে ধুনো দিত রোহিনী। অর্ক ঘুমিয়ে পড়লে সেদিন বিমলেন্দু রোহিনীর একরাশ চুলে মুখ ডুবিয়ে বুক ভরে গন্ধ নিতো জুঁই ফুলের। রোহিনী হাসতো,সেই হাসিতে যেন ঝরে ঝরে পড়তো কোমল স্নিগ্ধ আলো। বিমলেন্দু বলতো আমার রোহিনী, আমার লক্ষ্মী বউ!!আজ কতদিন পরে মনে হলো, রোহিনী বুঝি তার কাছে এসেছে অদৃশ্য হয়ে! বিমলেন্দুর চোখের জল যে রোহিনী কোনদিন সহ্য করতে পারতো না! তাই হবে। বিমলেন্দু একরকম নিশ্চিতই হলেন। নাহলে এই গোবরের ভেতর জুঁই ফুলের গন্ধ আসবে কোথা থেকে!
......"রোহিনী আমার রোহিনী! কেমন আছি দেখতে এসেছো বুঝি?"
বিমলেন্দু নিজে নিজেই বিড়বিড় করতে লাগলো। আর তার কোঁচকানো চোখের গর্ত দিয়ে, শুকনো গাল বেয়ে,গলে গলে গড়িয়ে পড়তে লাগল তার বুকে জমে থাকা ব্যথার মেঘ!
ধীরে ধীরে বৃষ্টি থেমে আসছে। দিনের আলো একেবারেই ম্লান। সন্ধ্যা যেন তার এলোচুল ছড়িয়ে দিয়েছে দিকে দিগন্তরে! তবে পথঘাট আবছা দেখা যাচ্ছে এখনো। সাথে টর্চটাও আছে। বিমলেন্দু রাস্তায় নামলো আবার। পিটপিট বৃষ্টি পড়ছে যদিও,তবুও তা এই ছাতায় মোটামুটি আটকে যাবে। খামরইদের বড়ো গোয়ালঘরটাকে বেজ দিয়ে পশ্চিমদিকে যে রাস্তাটা গেছে সেই রাস্তায় ফেরার পথ ধরলো বিমলেন্দু। এই রাস্তাটা একটু বেশি হবে। তবে ঢালাই করা আছে। সন্ধ্যার মুখে শর্টকাট জলজমা মোরাম রাস্তাটা দিয়ে না যাওয়াই ভালো। চোখেও এখন কম দেখে সে।হয়তো হোঁচট খেয়ে পড়বে। পশ্চিমে বাঁক নিয়ে বড়ো গোয়ালঘরটার পেছন দিকে আসতেই বিমলেন্দুর ধ্যান ভাঙলো। গোয়ালের পশ্চিমের পুরো দেওয়ালটা ঘেঁষে জুঁই ফুলের বড়ো লম্বা একটানা ঝোপ! ঝোপটা ফুলে ফুলে সাদা! টর্চ বন্ধ করে বিমলেন্দু কিছুক্ষণ দাঁড়ালো সেখানে। চোখ দিয়ে আবারো জল এলো। একটু দীর্ঘশ্বাস পড়লো। নাঃ রোহিনী,আমারই ভুল! তুমি আমার কাছে আসোনি। আর হয়তো আসবেও না কোনোদিন। আমি তোমাকে কতটুকুই বা সুখ দিতে পেরেছিলাম! কিংবা হয়তো একবার চলে গেলে আর আসা যায় না। তা হোক, আমার যাওয়ার পথ তো খোলাই আছে। শীঘ্রই আমি নিজেই চলে যাবো আকাশে। আর সেখানে গিয়ে আমার রোহিনী নক্ষত্রকে ঠিক খুঁজে বার করবো,দেখে নিও।
সন্ধ্যার মৃদু আলোয় জুঁই ফুলগুলোর শুভ্রতা যেন স্নিগ্ধ আলো হয়ে জ্বলছে। যেন তার রোহিনী নক্ষত্রের আলো! বিমলেন্দু সেই আলোতে স্নান করলো আবার অনেক দিন পর!
তারপর তাড়াতাড়ি বাড়ির পথে পা বাড়ালো। তাতাইয়ের মাষ্টার মশাই আসতে পারলো কিনা কে জানে!!
তনুশ্রী সামন্ত।

টুকরো প্রতিবিম্ব
মলয় সরকার
আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুলটা স্বীকার করতে এখন আর কোনো বাধা নেই। নারী পুরুষের সম্পর্কটা অস্বীকার করে বিচ্ছেদের ভাগিদার হয়ে অন্য নারীকে নিজের জীবন সঙ্গিনী করে নেওয়াটা বিশ্বাসঘাতকতার নাম দেওয়া যেতে পারে। বন্ধুর সাথে যে প্রতারণাটা করেছিলাম আজকে তার মূল্যটা বুঝতে পারছি..... এটুকু লিখে একটু থামলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক সাত্যকি মুখার্জী। চোখ বুজে সোফাতে বসে আজকে তার মনে হচ্ছিল নিজের সমস্ত দুর্বলতা, কপটতা ও উদারী বিষন্নতার সমস্ত কথা স্বীকার করে নিতে। নিজের জীবনে সফলতা যত না পেয়েছেন ব্যর্থতাও কম পাননি। সবাই তার জীবনের সফলতা সম্বন্ধে জানে কিন্তু তার পরিবার মা-বাবা ভাই-বোন সহকর্মী সহধর্মিনী সবাই কেন জানিনা তার প্রতি হতাশ।
গতকাল পাওয়া একটা চিঠি তাকে অস্থির করে দিয়েছে। চিঠিটা অনেকবার পড়েছেন তিনি। শকুন্তলা …... চোখ বুজে স্মৃতির সাগরে আবার ডুব দিলেন সাত্যকি মুখার্জি।
হু হু করে চলছে গৌহাটি ব্যাঙ্গালোর এক্সপ্রেস। এসি টু টায়ার কামরায় কম্বল গায়ে দিয়ে একটা বই পড়ছিলেন।
" আপনি সাহিত্যিক দুষ্মন্ত না? " চমকে তাকালেন সাত্যকি।
দেখলেন তার উল্টো দিকেই বার্থে এক সুন্দরী মহিলা। বয়সটা ঠিক আন্দাজ করতে পারলেন না সাত্যকি। বছর চল্লিশও হতে পারে অথবা পঞ্চাশও হতে পারে।
" ওটা আমার ছদ্মনাম। আমি ওই নামেই অবশ্য লিখে থাকি। আপনি আমাকে চিনলেন কি করে? "
" আপনাকে কেই বা চেনে না। আপনি এত বড় সাহিত্যিক। আচ্ছা বলুন তো আপনি প্রেমের গল্প গুলো লেখেন কি করে? আপনি কি সত্যি কোনদিন এরকম প্রেম করেছেন? "
এরকম প্রশ্নের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না সাত্যকি।
কিছু বললেন না সাত্যকি শুধু হাসলেন।
" আমার নাম তো জিজ্ঞেস করলেন না? আমি নিজেই বলছি আমার নাম শকুন্তলা। শকুন্তলা মৈত্র। "
একটু অবাক হলেন সাত্যকি। কিছুতেই নামটা মনে করতে পারলেন না। না স্মৃতিটা আজকাল মাঝে মাঝে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
" অবাক হলেন তাই না। এই দেখুন আমার আধার কার্ড। এবার বিশ্বাস হলো তো। "
তাকিয়ে দেখলেন সত্যি আধার কার্ডে জ্বলজ্বল করছে নাম শকুন্তলা মৈত্র। সত্যি ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত। দুষ্মন্ত শকুন্তলা প্রাচীন কাহিনীটা যেন সত্যি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
" আমি কিন্তু আপনার বিশাল বড় ফ্যান। আপনার সমস্ত বই আমি পড়ে ফেলেছি। কিন্তু আপনার ওই শেষ বইটা ওই কি যেন নাম,...........। "
" প্রেমের মাধুরী। "
" হ্যাঁ হ্যাঁ ওই বইটা। অনেক খুঁজেছি কিন্তু কিছুতেই ওই বইটা পাইনি। কোথাও পাচ্ছিনা। "
বাইরে বেরোলে সাত্যকি কয়েকটা নিজের লেখা বই নিজের কাছে রাখেন। কখন কোথায় কাকে উপহার হিসেবে দিতে হয় ঠিক নেই। সাত্যকি উঠে ব্যাগ থেকে ওই বইটা বের করলেন। নিজের হাতে শুভেচ্ছা বার্তা লিখে সই করে শকুন্তলার হাতে দিলেন। বইটা হাতে পেয়ে লাফিয়ে উঠলেন শকুন্তলা।
" আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ জানাবো আমি বুঝতে পারছি না। আমি মনে হয় আনন্দে কয়েকদিন ঘুমোতে পারবো না। "
একটু হাসলেন সাত্যকি। দেখলেন শকুন্তলা বইটা হাতে নিয়ে এক মনে পড়ছেন।
তাড়াতাড়ি উঠে ব্যাগপত্র গোছাতে শুরু করলেন সাত্যকি। ব্যাঙ্গালোর ক্যান্টনমেন্ট আসতে আর বেশি দেরি নেই। যদিও স্টেশনের বাইরে ওর জন্য গাড়ি অপেক্ষা করবে। দেখলেন শকুন্তলা উঠে ব্যাগ পত্র গোছাচ্ছেন। ট্রেন থেকে নামার সময় হঠাৎ শকুন্তলা একটা খাম সাত্যকির দিকে এগিয়ে দিয়ে ভিড়ের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেল সাত্যকি দেখতে পেলেন না। গাড়িতে বসে কৌতূহল বসে খামটা খুললেন
" দুষ্মন্ত, আপনার শকুন্তলা অনেকদিন ধরে আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে। " নিচে একটা ফোন নাম্বার। খামটা সাথে কাগজটা কুটি কুটি করে জানলা দিয়ে উড়িয়ে দিলেন।
এতদিন পর হঠাৎ সাত্যকিকে নাড়া দিয়ে গেছে একটা ছোট্ট চিঠি। বেশ কিছু দিন আগে পাওয়া চিঠিটা খুলে দেখলেন সাত্যকি।
" আমার দুষ্মন্ত এখনো কি অপেক্ষা করে আছে তার শকুন্তলার জন্য?"
রুমাল দিয়ে চশমার কাঁচটা একটু মুছলেন। বুঝতে পারলেন না চোখটা জলে ঝাপসা হয়ে গেছে না চশমার কাঁচটা সত্যি ঝাপসা হয়ে আছে। ভাবলেন না,এবার চশমার কাঁচের পাওয়ারটা মনে হয় পাল্টাতেই হবে।
দরজার আওয়াজ হওয়াতে তাকিয়ে দেখলেন ঋতিকা বেরিয়ে যাচ্ছে। ঋতিকা ওনার স্ত্রী মৃত্তিকার আগের পক্ষের মেয়ে। মনে পড়ে গেল সাত্যকির, আজ ঋতিকার বাবার জন্মদিন। ঋতিকা আগেই জানিয়েছিল যে আজ ও ওর বাবার সাথে দিনটা কাটাবে।মানা করেননি তিনি। সাত্যকি আকাশটাকে বাধঁতে চেয়েছিলেন বোকার মতো। আকাশটাই আজ যেন দৈত্যের মতো ওকে গিলে ফেলেছে। জোরে জোরে পাগলের মত হেসে উঠলেন সাত্যকি। জোরে কাঁচ ভাঙার আওয়াজে চমকে তাকালেন সাত্যকি।দরজার ফাঁকা দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় অনেকগুলো সাত্যকি দেখতে পেলেন। চিনতে পারলেন না আসলে তিনি কোনটা। শুধু বুকের বা দিকটা যেন জোরে মোচড় দিয়ে উঠলো। চশমার কাঁচ দিয়ে সত্যি এবার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পুরোটাই ঝাপসা।
©মস

ভাষান্তর
অনির্বাণ কুণ্ডু
না, অর্পিতা চৌধুরীর জীবনে এযাবৎ কোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেনি। ডালহৌসি পাড়ায় একটি পাঁচতলা অফিস বাড়ির তৃতীয় তলায়, একটা মধ্যমানের শেয়ার কেনাবেচা ফার্মে একটি কাঠের ডেস্ককে আঁকড়ে ধরে, অন্যের আদেশ-নির্দেশে কলুর বলদের মতো শেয়ার কেনাবেচা করতে করতে কাটিয়ে দিয়েছেন তিনটি দশক। প্রতিদিন সকাল ন’টায় অফিস পৌঁছানো, এক কাপ পাতলা চা, তারপর কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে লাল-নীল লাইনের উঠানামা দেখতে দেখতে দুপুর কেটে যাওয়া, টিফিন বক্সে ঠাণ্ডা হয়ে থাকা ভাত-তরকারি খেয়ে নেওয়া, আবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সংখ্যার পাহাড় গড়া—এই নিয়মিত, অনড় জীবনযাপনের মধ্যেই তিলে তিলে ক্ষয় হয়ে গেছে তার যৌবন। বছর খানেক পরেই অবসর। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কম্পিউটারের সামনে বসে লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে করতে নারীত্বের লক্ষণগুলো কখন ধীরে ধীরে বিদায় নিয়েছে, সেটাও খেয়াল নেই তাঁর! চুলে পাক ধরা, চোখের নিচে কালি পড়া, হাঁটতে হাঁটতে হাঁপ ধরা—এসবই যেন খুব স্বাভাবিকভাবে এসে গেছে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই।
বিরাটির দোতলা বাড়িটাও এখন নির্জন, নিঃশব্দ। সিঁড়ি বেয়ে উঠলে শুধু শুনতে পাওয়া যায় নিজের পায়ের আওয়াজ। অংকের শিক্ষক স্বামী মারা গেছেন দশ বছর আগেই, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাতের মধ্যেই চলে গেছেন। একমাত্র মেয়ে মিতিন, বিয়ের পরে পাড়ি দিয়েছে লস এঞ্জেলেসে। স্বামীর জীবনবীমা ও নিজের সঞ্চয় দিয়ে ঋণ শোধ করে বাড়িটা বাকি থাকলেও, এখন অফিস থেকে বাড়ি ফিরলেই মনে হয় চারদিকের দেয়াল যেন ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে তাকে চাপ দিচ্ছে। নিজের জন্য রাতে কিছু রান্না করতেও ইচ্ছা করে না আজকাল। সকালের রান্নাই গরম করে খেয়ে নেন। কোন কোন দিন তাও ইচ্ছা করে না। টিভি অন করে রাখেন, কিন্তু কোনো অনুষ্ঠানই দেখেন না—পর্দায় মানুষের কথোপকথন, হাসি-কান্না যেন ভিনগ্রহের সংকেতের মতো ঠেকে। এখন জীবন নিরবিচ্ছিন্ন ধূসর, যেন কোথাও একটু রঙের আঁচড়ও নেই।
তবে শখ একটা আছে—বা বলা যায় ছিল—চিলেকোঠার লাগোয়া ছোট্ট ছাদবাগান। তিনটে টবে গন্ধরাজ, দুটো টবে জুঁই, আর এক-এক টবে বেল, জবা এবং একটি লেবুগাছ। স্বামী বেঁচে থাকতেই শুরু করেছিলেন এই বাগান। তিনি চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর নিয়মিত পরিচর্যা করতেন অর্পিতা, কিন্তু ধীরে ধীরে উৎসাহ কমে আসে। এখন শুধু মাঝে মাঝে জল দেন, আর বেলাপাতা ঝরে পড়লে কুড়িয়ে নেন। লেবুগাছটা গায়ে-গতরে বেশ বেড়ে উঠেছে, বেশ ঝুপসি হয়েছে পাতার সমারোহে। কিন্তু বছর তিন-চার ধরে একটা লেবুও ধরে নি। তো সেই লেবুগাছের দুই শাখার ফাঁকে, এক শনিবার সকালে, জল দিতে গিয়ে অর্পিতা দেখলেন একটি ক্ষুদ্র মৌচাক। মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা, মৌমাছির সংখ্যাও কম, সবে শুরু হয়েছে তাদের বসতি স্থাপন।
প্রথমে ভয়ই পেয়েছিলেন অর্পিতা। কীটপতঙ্গের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক অনীহা। শীতকালে তেলাপোকা বের হলে তিনি নিজে মারতে পারেন না, বাড়ির কাজের লোক ডাকেন। আর মৌমাছি, বোলতা হলে তো কথাই নেই! আজই কীটনাশক দিতে হবে—এই ভেবেই নিচে নেমে এলেন।
কিন্তু বাজারে যাওয়ার পথেই একটা কথা মনে পড়ল। বছর দুই আগে, অফিসের এক সহকর্মীর বাড়িতে মৌমাছির দংশনে তার শিশু ছেলেটির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল, হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। সেই স্মৃতি তাকে উৎকণ্ঠিত করল। কীটনাশকের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি ভাবলেন, “আমার তো এখানে কেউ আসে না। মেয়েও নেই, অতিথিও নেই। আর মৌমাছিরা তো বাইরে গিয়েই মধু সংগ্রহ করে, আমার ক্ষতি কী?” এক অদ্ভুত কৌতূহল, কিংবা অনিঃসঙ্গ জীবনে কিছু নতুন পরিবর্তনের ইচ্ছা—যেটাই হোক, তিনি ফিরে এলেন খালি হাতে। “আচ্ছা থাক না, কদিন দেখা যাক না,...ওরা তো কোনো ক্ষতি করছে না” — এই ভাবনা নিয়ে ছাদে উঠে আবার মৌচাকটার দিকে তাকালেন। সূর্যের আলোয় তখন সদ্য গড়ে ওঠা মৌচাকের প্রান্তগুলো সোনালি হয়ে ঝিলিক দিচ্ছিল।
দিন যেতে থাকল। মৌচাকের আকার বাড়ল, মৌমাছিদের আসা-যাওয়া বাড়াল। অর্পিতা লক্ষ করলেন, সকালে যখন তিনি ভয়ে ভয়ে ওই টবে জল দিতে আসেন, কয়েকটি মৌমাছি তার কাছাকাছি এলে একটু সরে যায়, মৌচাকে ঢুকে যায়, যেন জায়গা করে দেয়। এক সপ্তাহ পর তিনি আর ভয় পেলেন না। বরং মৌমাছিদের ব্যস্ততা দেখতে শুরু করলেন। কী সুশৃঙ্খলভাবে তারা উড়ে যায়, ফিরে আসে, নতুন কক্ষ নির্মাণ করে। তাদের জীবনযাত্রায় এক নিয়মিত ছন্দ আছে, যা তার নিজের একঘেয়ে জীবনের চেয়ে অনেক বেশি উদ্দেশ্যময় মনে হল।
এক হেমন্তের পড়ন্ত দুপুরে, শনিবার। অর্পিতা ক্লান্তিতে বসে ঢুলছিলেন ছাদের চেয়ারে। শরীরে এক অলস ভাব, মনে হচ্ছিল চিরকাল এভাবেই কাটিয়ে দেবেন। চোখ বুজে এসেছিল। তখনই আশ্চর্য একটা শব্দ শুনতে পেলেন। যেন খুব মৃদু গুঞ্জনের মতো, অথচ যেন খেয়াল করলে কথাবার্তার মতো লাগছে! মাথার ভিতরেই যেন কোনো সুতোয় বাঁধা অর্থহীন শব্দের পর শব্দ ভেসে আসতে লাগল, “উত্তর-পূর্ব দিকে, দুশো গজ, আকন্দ ফুল ফুটেছে... পশ্চিম দিকে রঙ্গন গাছ আছে... সাবধান, মানুষও আছে... তৃতীয় সারির কক্ষ ভরে গেছে, মধু জমা রাখার স্থান প্রয়োজন...”
অর্পিতা চমকে সোজা হয়ে বসলেন। আশেপাশে তাকালেন। কেউ তো নেই! তবে কে কথা বলল? চোখ মেলে দেখলেন, মৌচাকের সামনে কয়েকটি মৌমাছি অদ্ভুত বৃত্তাকারে নাচছে। আটের আকারে চলছে তাদের ওড়াউড়ি। আর সেই নাচের ছন্দের সঙ্গেই তার মাথার ভেতর উচ্চারিত হচ্ছে বার্তাগুলো।
ভয়ে, বিস্ময়ে, আতঙ্কে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। পরক্ষণেই টের পেলেন, ব্যাপারটা সত্যি। তিনি উঠে দাঁড়াতেই মাথার ভেতরে শুনতে পেলেন গুনগুন শব্দ হঠাৎ হইচই করে উঠল, “সাবধান, সাবধান! মানুষ উঠছে! মানুষ উঠছে! উচ্চ সতর্কতা!” কয়েকটি মৌমাছি তৎক্ষণাৎ মৌচাকে প্রবেশ করল, কিছুটা দূরে সরে গেল অন্যরা।
তাঁর আর কোন সন্দেহ রইল না—তিনি যেটা শুনছেন মাথার ভেতরে, সেটা মৌমাছিদের বার্তালাপ! তিনি হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলেন, পা দুটো কাঁপছিল। এটা কি পাগলামি? নাকি সত্যিই কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটছে?
তবু দিন কয়েক নিজের ওপর সন্দিহান রইলেন অর্পিতা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শাসমলের কাছে গেলেন, বললেন সব। ডাক্তার হাসলেন, বললেন, “অনিদ্রার ফল, মিসেস চৌধুরী। অনেক একা থাকেন, তাই মন এমন ভ্রম তৈরি করে। কিছু ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি।” কিন্তু অর্পিতা জানেন, এটা কোনো মনোবৈকল্য নয়। ঘুম তাঁর বেশ ভালোই হয়, অন্তত গত কয়েকদিন তো অবশ্যই—মৌমাছিদের বিশ্ব পরিচালনা নিয়ে স্বপ্ন দেখার পর থেকে।
তিনি একটা পরীক্ষা করে দেখলেন। মৌচাকের সামনে এক টুকরো পাটালি গুড় রেখে দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর কয়েকটি মৌমাছি গুড়টার কাছে এল, ঘুরে দেখল, তারপর মাথার ভেতরেই স্পষ্ট গুনগুন শুনতে পেলেন: “মিষ্টি! মিষ্টি! সংগ্রহ করো! মধু-নয়, গুড়-হ্যাঁ। নিরাপদ। রানীকে জানাও।” মৌমাছিরা গুড়ের টুকরো থেকে কিছু সংগ্রহ করে নিয়ে গেল মৌচাকে। অর্পিতার বুকটা ধক করে উঠল। এটা ভ্রম নয়। সত্যি সত্যিই সে তাদের কথা বুঝতে পারছে।
অর্পিতার জীবনটা দেখতে দেখতে বদলে গেল। তিনি বাড়ির ছাদে বাগান আরও বড় করতে লাগলেন। টবের সংখ্যা বাড়ল। গন্ধরাজ, জুঁই ছাড়াও যোগ করলেন গাঁদা, কসমস, সূর্যমুখী, রঙ্গন। সবই ফুলগাছ। এখন বাগানের পরিচর্যাতেই কেটে যায় অনেকটা সময়। প্রতি সকালে উঠেই প্রথম কাজ ছাদে যাওয়া। মৌমাছিরা এখন তাকে চিনতে শিখেছে। তারা তাকে “মানুষ-ফুল” নামে ডাকে—কারণ সে ফুলের টবে জল দেয়, কিন্তু নিজে স্থির থাকে। তিনি শিখছেন তাদের জটিল সামাজিক কাঠামো, রানী-মৌমাছির নির্দেশ, শ্রমিকদের কর্মবিভাজন, প্রহরীদের সতর্কবার্তা। মাথার ভেতরে যেন “রেডিও স্টেশন” চালু থাকে দিনের বেলায়। তিনি জানতে পারছেন, আশেপাশের গাছপালা, জলাশয়, ঝোপের ভেতরে লুকানো ফুলের সমস্ত খবর। কোনো দিন দূরে কোথাও লিচু বাগানে ফুল ফুটেছে, কোনো দিন কাছেই কারও বারান্দার গোলাপ ফুটে আছে—সব খবরই পাচ্ছেন মৌমাছিদের সংকেতে।
একদিন, খুব ভোরে, ঘুম ভেঙে গেল অর্পিতার। মাথার ভেতর তীব্র আওয়াজ: “বিপদ! কালো ধোঁয়া! বিষ বিষ! বাসা ছাড়ো! সবাই বের হও!” সঙ্গে এক তীব্র দুর্গন্ধের অনুভূতি। অর্পিতা বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে বারান্দায় ছুটে গেলেন। দেখলেন পাশের বাড়িতে ফুমিগেশন চলছে, কীটনাশকের বিষাক্ত বাষ্প তাঁর বারান্দার দিকেও আসছে। মৌচাকের কাছে গিয়ে দেখলেন, মৌমাছিরা বিশৃঙ্খলভাবে উড়ছিল, কয়েকটা মাটিতে পড়ে পা ছুঁড়ছিল। তাড়াতাড়ি একটি কার্ডবোর্ডের বাক্স এনে সযত্নে মৌচাকটি ঢেকে দিলেন অর্পিতা, মুখে রুমাল চাপা দিয়ে। প্রায় আধঘণ্টা পর, যখন ধোঁয়া সরে গেল, তিনি বাক্সটা খুললেন। কয়েকটি মৌমাছি মরে গিয়েছিল, কিন্তু বাকিরা বেঁচে ছিল। মাথায় বার্তা এল: “বিষ কাটছে। বাসা দূষিত। পরিষ্কার করতে হবে। মানুষ-ফুল, ধন্যবাদ।”
পরের দিন সকালে, মিতিন লস এঞ্জেলেস থেকে ভিডিও কল করল। প্রতি শনিবারই করে। কথায় কথায় মেয়ে বলল, “মা, তুমি জানো, গতকাল রাতে তোমার কথা ভেবে আমার কান্না পেয়েছিল। হঠাৎ মনে হচ্ছিল তোমার কাছে ছুটে যাই। তুমি কত একা! মা। তুমি কি চলে আসবে আমাদের কাছে স্থায়ীভাবে? তোমাকে ওখানে একা রেখে যে শান্তি পাই না।”
অর্পিতা হেসে বললেন, “আমি একা নই রে। আমার কয়েকজন নতুন বন্ধু হয়েছে। বাড়ির খুব কাছে থাকে। রোজ বেশ কয়েক ঘণ্টা করে কথা হয় ওদের সাথে।” মিতিন বিস্মিত হল, জিজ্ঞেস করল, “কোন বন্ধু? পাড়ার কেউ?” অর্পিতা শুধু হেসে বললেন, “ওরা একটু আলাদা ধরনের। পরে বলব।”
ফোন শেষ হলে অর্পিতা আবার ছাদে গিয়ে টবের জল দিতে লাগলেন। একটি কর্মী মৌমাছি তার মাথার কাছে এসে বৃত্তাকারে ঘুরে আবার উড়ে গিয়ে একটা গাঁদা ফুলে বসলো। মাথার ভেতর মৃদু বার্তা এল, “মানুষ-ফুল, তোমার দুঃখের গন্ধটা কমেছে আজ। তোমার কণ্ঠস্বর মধুর হয়েছে। ভালো থেকো। আমরা তোমার ফুলগুলো যত্ন নেব।”
অর্পিতা আপন মনে হাসলেন। হাত বাড়িয়ে দিলেন গাঁদা ফুলের দিকে, মৌমাছিটি তার হাতের ওপর ভর দিয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়াল, তারপর উড়ে গেল। এটা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, তিনি ভাবলেন। অলৌকিক শুধু এই উপলব্ধি যে, আমরা কেউই সত্যিই একা নই। পৃথিবীটা কতগুলো অদৃশ্য সুতো দিয়ে বোনা, যেগুলো আমাদের চোখে পড়ে না, কিন্তু অনুভব করা যায়, যদি একটু থেমে শোনার চেষ্টা করি। প্রকৃতির গভীর, নীরব সংগীত শোনার ক্ষমতা, যা হয়তো একদিন সব মানুষেরই ছিল, কিন্তু কালক্রমে হারিয়ে ফেলেছে আমাদের নাগরিক ব্যস্ততা, যান্ত্রিক জীবনযাপনের ভিড়ে। আমরা যে গাছ, পাখি, পোকামাকড়ের সাথে এক বৃহত্তর পরিবারের অংশ, তা আমরা আর অনুভবই করি না। পৃথিবীর নিজস্ব এক গোপন ভাষা আছে, যা সমস্ত কোলাহল থেকে একা হলেই শোনা যায়—যদি কান খোলা রাখি, যদি ভয়কে জয় করি, যদি কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রাখি।
অর্পিতা চৌধুরী আজ ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে দেখছেন সুদূর আকাশ। সূর্য অস্ত যাচ্ছে, আকাশ রাঙা হয়ে উঠেছে। মৌচাক থেকে মৌমাছিরা ফিরছে, দিনের শেষ সংগ্রহ নিয়ে। তাদের পাখার শব্দ, গুনগুনানি, আর মাথার ভেতরের মৃদু সংকেত—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব সিম্ফনি। তিনি জানেন, আগামীকাল আবার অফিসে যেতে হবে, শেয়ার মার্কেটের উঠানামার মধ্যেই কাটবে দিন। কিন্তু এখন তিনি আর ভয় পান না সেই একঘেয়েমি। কারণ তিনি জানেন, ফিরে আসবেন এই ছাদে, তাঁর বন্ধুদের কাছে, যারা তাঁকে শিখিয়েছে যে জীবন শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়—জীবন হল ফুলের সুবাস, মধুর সন্ধান, এবং একে অপরের প্রতি নিঃশব্দ যত্নের সম্পর্ক। আর এই সম্পর্কের ভাষা তিনি বুঝতে পেরেছেন, শুধু একটু কৌতূহলী হওয়ার দরুন। তাই তিনি হাসিমুখে নামলেন নিচে, মনে মনে ভাবছিলেন, কাল সকালে উঠেই ছাদে যাবেন, নতুন ফুটবে যে ফুল, তার খবর প্রথমে পাবেন তিনি—মানুষ-ফুল—মৌমাছিদের কাছ থেকে, পৃথিবীর সেই গোপন ভাষায়, যা শোনার সৌভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.