
পথে হলো দেরি
শিখর চক্রবর্তী
সেদিন যখন সতেরো নং নিউরো বেডের মিসেস শিউলি মিত্র, ট্রেনি নার্স রাকা মুখার্জি র হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আবেগমথিত গলায় বলেছিলেন, " এসো না আবার নতুন করে সব শুরু করি। তোমার গত চার বছরের স্মৃতি ভুলে অর্ণব কে নিয়ে, তোমার ছোট্ট মিতুলকে নিয়ে আমার সংসার টা আবার সেজে উঠুক। অর্ণবের তোমাকে খুব দরকারও এই মুহূর্তে, তোমারও ওকে, তাই না?"
রাকার মনটা একমুহুর্তের জন্য আলোয় ভেসে গিয়েছিল। তাই তো, এই স্বপ্নটাই তো সে দেখেছিলো আজ চার বছর আগে। কিন্ত কেনো যেনো সেটা হলো না, দুটো বাক্য এসে মাঝে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে গেছিলো।
" এতো তাড়া কিসের। কটা দিন অপেক্ষা করতে হবে।" বলেছিলো এই অর্ণবই। আজ কি এই কথাগুলো অর্ণবের মাকে সে বলবে? আজ তো সত্যিই তার তত তাড়া নেই।
*******। ********** ******** *****""
কলেজের দুবছরের সিনিয়র অর্ণবের সঙ্গে রাকার সম্পর্ক টা একেবারেই নিখাদ ছিল, অন্যদের কাছে উদাহরণও হয়ে উঠেছিল একরকম। বিত্তশালী পরিবারের একমাত্র ছেলে হলেও মধ্যবিত্ত জৌলুশহীন রাকার সঙ্গে ভালোবাসার রাজপ্রাসাদের ভিত মজবুত ই ছিলো। এমনকি স্নাতকোত্তর পড়াশুনার দিকে না গিয়ে রাকা যখন নড়বড়ে পরিবারের হাল ধরতে যথাশক্তি প্রয়োগ করে টিউশন আর সঙ্গে চাকরির পরীক্ষার আর অর্ণব মাস্টার্স ফাইনালের প্রস্তুতি তে মন দিলো, তাদের এই ভালোবাসার রথের গতি একেবারেই স্লথ হয় নি। মাস্টার্স ফাইনাল দিতে দিতেই একটা ভালো কোম্পানির অফার পেয়ে আর দুবার ভাবে নি অর্ণব। পনেরো দিনের নোটিসে তড়িঘড়ি জয়েন করে চলে গেছিলো দিল্লী, প্রোবেশনের দু বছর সেখানে কাজের বাধ্যতামূলক অঙ্গীকারে সই করে।
পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ জলে পড়ে যাওয়া রাকার বিহ্বল চোখের হাজার প্রশ্ন, অনাগত ভবিষ্যৎ এর প্রশ্ন শুনে ঠিক এই উত্তর টাই দিয়েছিলো অর্ণব, খুব স্বাভাবিক ভাবেই। না, কোনো পালিয়ে যাওয়া নয়, প্রত্যাখ্যান নয়, বিশ্বাস হনন নয়, চেয়েছিলো এই বছর দুয়েক সময়, চাকরির স্থায়ীকরণের আশ্বাস অবধি। সম্পূর্ণ বিশ্বাসের ওপর তৈরি হওয়া সম্পর্কের মধ্যে রেজিস্ট্রি করে রাখার মতো প্রস্তাব দুজনের কারোর মাথাতেই আসে নি।
********* ********** **********"
সময়টা হয়তো অর্ণবের কাছে খুব বেশি কিছু ছিলো না। কিন্তু এটাই পাহাড়প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো রাকার স্ট্রোকে শয্যাশায়ী বাবা, চিররুগ্না মা আর বেকার ভাই এর সংসারে। বাবার দ্বিতীয় বার স্ট্রোক হলো, মাও রুগ্ন শরীরে শয্যা নিলেন স্বামীর পাশেই। দুবছর বিলম্বের এই আশ্বাস যে শুধুই প্রহেলিকা, সে কথা রাকা ছাড়া সবাকার মনেই গেঁথে বসলো। একা এক নারীর আবেগসর্বস্ব প্রতিরোধ খড়কুটোর মতো উড়ে গেলো এই ত্রিমুখী সুনামির সামনে। হ্যাঁ, বেকার ভাইয়ের কোনো এক স্বপ্নের স্বার্থ ও যে ধাক্কা খেয়েছিল বড়লোক হবু জামাইবাবুর এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তে।
এরপরের ঘটনার ঘনঘটা মুহুর্মুহু ঝড়ের ঝাপটা র মতো। তড়িঘড়ি এক মানানসই পাত্রে কন্যাদান, দুবছরের মধ্যে জটিল কিডনির রোগে রাকার স্বামীবিয়োগ। ছমাসের ব্যবধানে পিতৃমাতৃহীন, স্বামীহারা রাকা শিশুকন্যা মিতুলকে নিয়ে ভাইয়ের সংসারে গলগ্রহ হয়ে না থেকে সামান্য কিছু পুঁজি, কিছু টিউশনি বিদ্যে আর নার্সিং শিখে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অটুট জেদ নিয়ে গিয়ে ওঠে মফস্বলের এক ভাড়াবাড়িতে। বাড়িওয়ালা বিধবা মহিলা আর তার একমাত্র সন্তান বছর ছাব্বিশের দেবর্ষি র অভিভাবকত্বে শুরু হয় তার পথচলা। শিশুসন্তান কে বাড়িওয়ালা মাসিমার জিম্মায় রেখে ট্রেন ধরে কলকাতায় যাতায়াত, নার্সিং ট্রেনিং। এই ছাদটুকু আর মানুষকটা আবার নতুন করে তার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিয়েছিলো প্রতিষ্ঠার। এসব খবর কি অজানা ছিল অর্ণবের ? হয়তো তাই। কোনো অনিবার্য কারণে কোনো অনুভূতি অন্ততঃ এসে দাঁড়ায় নি ওপ্রান্ত থেকে রাকার কাছে।
*************। ***********। ********""
হাসপাতালে ট্রেনি ডিউটির শেষ দিকে, একদিন ১৭ নং বেগ পেশেন্ট আ্যটেন্ড করতে গিয়ে চমকে উঠেছিল রাকা। বেডের পাশের টুলে বসে থাকা অর্ণব ও কিছুক্ষণ বাক্যরহিত হয়ে গিয়েছিল তাকে দেখে। তারপর ঘোর কাটিয়ে স্বাভাবিক হয় দুজনেই। শিউলি মিত্রর সাতদিনের হাসপাতাল বাসে যত্নের ত্রুটি হয়নি রাকার তরফে। পেশাদারি দক্ষতায় সামলেছে সবকিছু সুচারু ভাবে। একইসঙ্গে অর্ণবের সঙ্গে কিছুটা ভেসেছে, ভাসতে চেয়েছে চেনা পুরনো স্রোতে। আগ্রহ ভরে শুনেছে তার অসফল দাম্পত্যের কথাও।
" আমার ওকে বুঝতে ভুল হয়েছিল রাকা। আমি মনে প্রাণে চেয়েছিলাম এক ঘরোয়া হোম মেকার। কটা দিন কলকাতার বাড়ি সামলাবে মা কে নিয়ে। তারপর তো আমি চলেই আসতাম। তোমার বিয়ের খবর শোনার পর মায়ের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে তো এছাড়া আর কিছু ভাবার ছিলো না। আমার নিজস্ব রোজগারে অর্থকষ্টের কোনো সম্ভাবনা ই নেই। তমালিকা বেঁকে বসলো। নিজ যোগ্যতায় চাকরি করার জেদ চাপলো। অনেক বুঝিয়েও লাভ হলো না। চলে গেলো।"
হাসপাতাল ক্যান্টিনে কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলেছিলো অর্ণব।
অনুনয় মাখা চোখে রাকার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলেছিলো,
" চলো না রাকা, আমরা আবার প্রথম থেকেই শুরু করি , মাঝের টুকু ভুলে যাই। তোমার যা আছে, যেমন আছে, সবটুকু নিয়ে সত্যি সত্যি এবার এক হই। আমার ভুলত্রুটি, গাফিলতি মাপ করে একটা সুযোগ কি দিতে পারো না তুমি? আমি এখন ভীষণভাবে তোমাকে চাই, পাঁচ বছর আগের মত করেই চাই। "
রাকা পাচ্ছিলো, খুঁজে পাচ্ছিলো একটু একটু করে সেই হারিয়ে যাওয়া অর্ণবকে। চোখে চোখ রেখে তলিয়ে যেতে চাইছিলো একদম বুকের ভেতর পর্যন্ত, সেই চেনা আবেগ, আকুতিতে ভরাট করে নিতে চাইছিলো এতদিন ধরে হাঁ হাঁ করে থাকা নিজের ভেতরের গহ্বরটা।
************। ************** *********
রাত দশটা পনেরোর আপ বর্ধমান লোকাল থেকে স্টেশনে নেমে রাকার একটু ভয় করতে লাগলো। এতটা রাত হয়ে যাবে আগে বুঝতে পারেনি সে। মোবাইল বার করে ফোন করে দেবর্ষি কে। মিনিট পনেরো মধ্যে চলে আসে দেবর্ষি বাইক নিয়ে। রাকা আশ্বস্ত হয়, উঠে বসে বাইকের পেছনে।
মাসিমার মতোই দেবর্ষি বড়ো ভরসা রাকার। তার সমবয়সী বা একটু ছোটই হবে হয়তো। সেই অর্থে বেকার, এলআই সির এজেন্ট এর কাজ করে টুকটাক, এছাড়া চায়ের দোকানে আড্ডা, সময় বিশেষে রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা হাতে মিছিলেও দেখা যায়। এককথায় ডাকাবুকো পরোপকারী। মোড়ের দোকানে বসে থাকা ছেলেগুলোর টিপ্পনির সামনে দাঁড়িয়ে একদিন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো প্রথম দিকে। হিসহিস করে দু চারটে কথায় কানে হাত চাপা দিতে যাচ্ছিলো রাকা। তারপর কানে এসেছিল " এই ম্যাডাম আমার লোক, চিনে রাখ। ফের যদি কোনদিন দেখি ..."
না, আর কোনদিন এই অস্বস্তি অপমানের সামনে পড়তে হয় নি তাকে, বরং একটু বাড়তি সম্ভ্রম ই জুটেছিল। তার জীবন কাহিনী, সংগ্রাম কখন যেন দেবর্ষি র চোখে তাকে একটু সম্মানের জায়গা করে দিয়েছিলো। আপদে, বিপদে, দরকারে এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। জহুরীর চোখ দিয়ে অনেক বার বোঝার চেষ্টা করেছে রাকা, কোনো অন্যায় চাহিদা লুকিয়ে আছে কিনা এই স্বতস্ফুর্ততার আড়ালে। আশ্বস্ত হয়েছে সে। কিছু কিছু সান্নিধ্য থাকে, কিছু সাহায্যের হাত থাকে যা গ্রহণে কোনো কুন্ঠা বোধ হয় না। বড় নিশ্চিন্ত লাগে সে গ্রহণ। এ সাহায্যে কি সবসময় গ্রহীতা লাভবান হয়? হয়তো না। কিছু গ্রহণে দাতার চোখেও ফুটে ওঠে এক পরম তৃপ্তি। এ তৃপ্তি দেবর্ষির চোখেও খুঁজে পেতো রাকা। একটা ছেলেমানুষী, একটু প্রশ্রয় এর কাঙালপনা চোখ এড়ায় না রাকার। রাকা জানে, বোঝে, এটা এই বয়সের তারল্য। তবু মনে মনে একটা ভালোলাগা শেকড় ছড়ায়। ভাবতে ইচ্ছে করে সে তো একা নয়। কেউ, বা কেউ কেউ তো আছে তার পাশে, এই বিপন্ন সময়ে। এমন ভাবেই চলতে থাকে তিনটি মানুষের উপর নীচ ঘর গেরস্থালি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে, আবার কিছু বেঁধে বেঁধে পথচলা। দেবর্ষি র বিশ্বস্ত মহীরুহ ছায়া দেয় ক্লান্ত রাকার বিশ্রামে।
************ ************* ************
" রাকা, একটা ভালো খবর আছে" বলে অর্ণব।
" সাত তারিখ রেজিস্ট্রি অফিসে টাইম বুক করেছি। আর ভুল করতে চাই না রাকা। তুমি সকাল সকাল চলে এসো। আমার কিছু বন্ধু বান্ধব কেও জানিয়ে দিয়েছি। ওরাও থাকবে। তুমি খুশি তো? বলো ...."
চোখ চলে যায় রাকার হাতে ধরে থাকা খামটার দিকে।
" কি ওটা?" প্রশ্ন করে অর্ণব।
সারপ্রাইজ টা সেভাবে ঠিক জমে না। আস্তে আস্তে এগিয়ে দেয় খামটা। সরকারি নার্স হিসেবে কাজে যোগদান পত্রের, কালনা সাব ডিভিশন হাসপাতালে। আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে যোগদানের নির্দেশ।
বিস্মিত অর্ণব প্রশ্ন করে,
"একি, তুমি চাকরি করবে নাকি! তোমায় তো বললাম কোনো দরকার নেই। ধুস, এসব ভুলে যাও। "
রাকার পায়ের তলায় মাটি দুলে ওঠে। এটা তো চাকরি নয়! এটা তার পরিচয়, একটা ছাদ, একটা বিশ্বাস। অনেক টা যুদ্ধ, অনেকটা রক্ত, ঘাম, তৃপ্তি। অনেকটা স্বপ্ন। কে বুঝবে? কাকে বোঝাবে? সে তো তখন রেস্টুরেন্ট এর বিল মিটিয়ে, বেরিয়ে যেতে যেতে মনে করিয়ে দেয়,
" সাত তারিখ কিন্তু সকাল সকাল, দেরি করো না।"
রাকা বুঝতে পারে না, সত্যিই কি দেরি হয়ে যাচ্ছে? নাকি স্বপ্নের দিক ঠাহর করতে একটু বেশিই তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে?
********** *********** **********"
ঘুমন্ত মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে রাকার। খোলা হাওয়ায় চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। এ দুটো দিন বড়ো ঝড় ঝাপটা গেছে তার আর এই পরিবারের মানুষ গুলোর ওপর দিয়ে। খেলতে খেলতে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছিলো মিতুল। রাকা তখন কলকাতায়, হাসপাতালে ডিউটিতে। ফোন যায়, তড়িঘড়ি ফেরে। ততক্ষণে মিতুলকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে দেবর্ষি। ছুটেছিলো সোজা হাসপাতালে। মাসিমা উদ্বিগ্ন চোখে এগিয়ে এসে বলেছিলেন,
"ডাক্তার বলেছে ভয়ের কিছু নেই, একটু আ্যনিমিক হয়ে পড়েছে। সাথে একটু চেস্ট ইনফেকশন ও আছে। রক্ত দিতে হয়েছে। দেবর্ষি সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ব্লাড চলছে। ওষুধ পত্র সব এনে দিয়েছে। তুমি মা একদম ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা আছি তো।"
রাকা আর পারে নি। স্থান কাল পাত্র ভুলে মাসিমাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠেছিল। প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে মাসিমার হাত ও তখন রাকার চুলের মধ্যে বিলি কাটতে আরম্ভ করেছে। মাসিমা কখন যেনো মা হয়ে উঠছে তখন।
"তুমি একদম কান্নাকাটি করবে না কিন্তু, বলে দিলাম। দেবু আছে, ওর বন্ধু বান্ধব সব এখানে আছে। কোনো দরকার হলে ওরাও থাকবে, একেবারে মিতুলকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত।"
একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার যোগ করেছিলেন,
" লোকে যত ই দূর ছাই করুক , আমার ছেলেটা বেকার বাউন্ডুলে হলেও বড়ো খাঁটি মানুষ গো। ওর বুকটা অনেক বড়ো, শুধু যদি একটা ঠিকঠাক কিছু করতো, তাহলে ওর একটা সংসার আর তোমার মতো একজন..."
কথাটা আর শেষ করেন না, আঁচলের খুঁটে চোখ মোছেন।
রাকা বিব্রত হয়ে আস্তে আস্তে উঠে যায়। সিঁড়ির মুখে দেখা হয় দেবর্ষি র সঙ্গে, হাতে একটা স্যালাইন বটল নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে উঠে আসছে। থতমত খায়,
" একি, আপনি কখন এলেন? "
রাকার চোখ আবার ছলছল করে ওঠে, ধরা গলায় কিছু বলতে চায়। দেবর্ষি ঘাড় নাড়ায়, ছদ্ম গাম্ভীর্য নিয়ে বলে,
" একদম নয়, একদম কোনো কান্নাকাটি নয়। সব ঠিক আছে। আপনি আমার সঙ্গে চলুন, কিছু খেয়ে নিন। বুঝতে পারছি, কিছু খাওয়া হয় নি আপনার।"
রাকা সবেগে ঘাড় নেড়ে, আপত্তি জানাতে চায়। দেবর্ষি কড়া অভিভাবক , শক্ত হাতে রাকার হাত ধরে টান দেয় । দু পা গিয়ে একটু লজ্জা পেয়ে আবার ছেড়েও দেয়। রাকা আবার অনুভব করে একটা বটের ছায়া, একটা ভরসা।
শুধু কি ভরসা? দেবর্ষি র শক্ত মুঠোয় একটুকরো উত্তাপ ও পড়ে পাওয়া গিনিসোনার মতো জমিয়ে রাখে মনের ভেতর।
********** **********" *********""
একটু আগেই দেবর্ষি রাতের আড্ডা সেরে ফিরলো বাড়িতে। ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রাকাকে দেখে একটু হাসে। খবর নেয় মিতুলের। একটু বিষণ্ণ আলো আঁধারি খেলা করে যায় ওর মুখে। কাল অর্ণবের সঙ্গে রেজিস্ট্রির কথাটা মাসিমা শুনেছেন। তার পর থেকেই একটু মেঘলা। চোখের জল লুকিয়ে মাসিমা আশীর্বাদ করেছেন, সুখী দাম্পত্য জীবনের কামনা করেছেন। কোথাও একটা তার ছিঁড়লেও বেসুরো বাজেননি। দেবর্ষি আজ বোধহয় কোনো কাজে সারাদিন ই বাইরে ছিলো।
টিকিট কাউন্টারের সামনের বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে এরকমই কত কথা ভীড় করে আসছিলো রাকার মনে। সবকিছু কেন জানি ঠিক হয়েও ঠিক হচ্ছে না কিছুতেই। দেবর্ষি তাকে বসিয়ে হাওড়ার টিকিট কাটতে গেছে। অনেক বার চেষ্টা করেছে রাকা মন খুলে ওকে কৃতজ্ঞতা জানাতে, নিদেনপক্ষে একটা থ্যাঙ্কসগিভিং করতে। কোথায় যেনো আটকেছে। কেনো জানে না, বারবার মনে হয়েছে, এই পাশে থাকাটা তো তার প্রাপ্য ই ছিলো। সে ছাড়া কে করবে? কেন এই অদ্ভূত অধিকার বোধ বোঝে না সে। দেবর্ষি ও বার বার সরে যাচ্ছে, নানা অছিলায়। অভিমান? হবে হয়তো। এতদিনের শেকড় ছেঁড়া, ব্যথা তো হবে একটু। একসময় ট্রেনের খবর হয়। দেবর্ষি আর থাকতে চায় না। বাইক স্টার্ট করে। যাবার আগে অবশ্য ভবিষ্যতের শুভাকাঙ্খা জানাতে ভোলে না। একটু ম্লান হাসি, কিছু একটা চাপা দিয়ে যায়।
ডাউন হাওড়া লোকাল চলে যায়। আপ কাটোয়া লোকালে একটা ফাঁকা সিটে উঠে বসে রাকা। কালনা হাসপাতাল। টিকিট আছে, তবে ভুল পথের, উল্টো পথের। আজ না হয় একবার ফাইন দেবেই সে। ভুল পথের মাশুল দিলে যদি আর পথ ভুল না হয়। এতো তাড়া কিসের, ঠিক রাস্তাটা বুঝে নিতে চাই একটু সময়!!
**********

জারজ
প্রদীপ মাশ্চরক
ছোটবেলায় প্রাইমারি স্কুলে আমার ক্লাসে পড়তো সোহন, পুরো নাম সোহনলাল মিশ্র। আমাদের মফস্বল শহরের তেলের কারখানায় ওর বুড়ো বাবা গিরধারি মিশ্র তেলের ঘানি মেরামতির কাজ করতো। ওরা থাকতো আমাদের বাড়ির পেছনের বস্তিতে, সোহনের মাকে প্রায়ই রাস্তার কল থেকে জল নিয়ে যেতে দেখতাম। গিরধারির বয়েসের চেয়ে অনেক ছোট সেই মহিলাকে দেখে আমার একটু যে অবাক লাগতো না তা নয়।
সোহন ছিলো একটু মিচকে আর তার মাথায় সর্বদা দুর্বুদ্ধি দাপিয়ে বেড়াতো। প্রায় রোজ বিকেলেই প্রতিবেশীর অভিযোগের পর সোহনকে গিরধারিকে বেধড়ক পেটাতো। তার উঁচু গলার কান্না আর আকুল আবেদন সন্ধ্যে বেলার শাঁখের আওয়াজের সাথে মিশে যেত। সকালে স্কুলে সোহনের গালে, ঘাড়ে, গলায় কালশিটে আমরা দেখেও দেখতাম না আর সোহনেরও দুষ্টুমির শেষ ছিলো না।
সেবারে অফিসের ছুটিতে নকুড়মামা বাড়ি এলে আমার কপালে জুটলো আমার প্রথম ফাউন্টেন পেন। এমন কিছু দাম নয়, তবে টুকটুকে লাল রঙের পেনটি দেখতে লোভনীয়। ক্লাসে সহপাঠীদের দারুণ ঈর্ষা আর চমক উপভোগ করার আগেই পেনটা হারালাম। দুদিন খোঁজাখুঁজির পর আমার পাশের সিটের সহপাঠী নিমাই জানালো যে সে সোহনকে আমার ড্রয়ার থেকে পেন নিয়ে চলে যেতে দেখেছে।
শেষ বিকেলে সাহস করে সোহনের বাড়ি গেলাম। ক্লান্ত গিরধারি কারখানা থেকে ফিরে দরজায় বসে বিড়ি ফুঁকছিলো। আমার অভিযোগ শোনার পর মানুষটার রূপ বদলে গেলো, মনে হোল এক অসুর তাকে ভর করেছে। লাল চোখে সে ঘরের মধ্যে থেকে সোহনকে টেনে বার করে রাস্তায় এনে পাগলের মত পেটাতে লাগলো। ওই রকম মার আমি কখনো দেখি নি। গিরধারির চোখে পৃথিবীর সব ঘৃণা আর আক্রোশ, জ্ঞানশূন্য হয়ে সে নির্দয় হাতে ছোট ছেলেটিকে মেরে চলেছে। সোহন মাটিতে পড়ে সেই মার খাচ্ছে আর দরজার কাছে ছটফট করছে সোহনের মা, হাত জোড় করে বার বার সে আবেদন করছে গিরধারি যেন সোহনকে মাপ করে দেয়। গিরধারির চোখের জিঘাংসা দেখে আমি সেদিন অবাক হয়ে যাই, ওই চোখ পিতার নয়! মিনিট দশেক পর শেষ লাথিটা মেরে “শালা বেজম্মা” বলে গিরধারি মাটিতে থুতু ফেলে ঘরে ঢুকে গেলে সোহনের মা দৌড়ে এসে ছেলেকে ধুলো থেকে বুকে তুলে নিলো। তার অশ্রুভরা চোখের দিকে তাকিয়ে নির্বাক আমি মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরে যাই সেদিন। সোহনের ওই নিদারুণ শাস্তির কারণ সেদিন বুঝি নি।
বড় হবার পর জেনেছিলাম সোহন গিরধারির জারজ সন্তান। ওর প্রতি বিতৃষ্ণা আর ক্রোধের কারণে যে কোন অজুহাতেই সে সোহনকে পেটাতো। বাবার চাকরির বদলির কারণে দু বছর পরেই আমরা সেই শহর ছেড়ে চলে যাই। গিরধারি কোনোদিন সোহনকে মাপ করে দিয়েছিলো কি না তা জানা হয় নি।

গাছগুলো এখনো টানে
তড়িৎ চক্রবর্তী
চুল এলোমেলো করে দিচ্ছিলো, বাম হাত দিয়ে সামলাতে একেবারেই অপারক। জানলার বাহিরের ছবিগুলো সব পিছনে ছুটে চলছিল। খুব মনে পড়ছিল এই রকম জানলার ধরে বসে বৈদ্যবাটি যাবার সময়ে মা থাকত পাশে- আর বারবার বলত,
-‘হাতের কুনুইটা সরা খোকা।’
মোটামুটি ফাঁকা ট্রেনের জানলার ধারের সিট এখনও অভিকে টানে।
আজ চলেছে নতুন কলেজের প্রথম দিন। একটু তাড়াতাড়িই পৌঁছাবার প্রয়োজন, রকম সকম জানা নেই।
এই কলেজের বাংলার অধ্যাপক হিসাবে চাকরিটা নেবার কারণ কলকাতা থেকে যাতায়াত করতে পারবে তাই।
পাঞ্জাবি, পাজামা, কোলাপুরীর সাথে কাঁধের ঝোলা ব্যাগ। কোলাঘাটে নেমে অটো অথবা তিন চাকার ভ্যানেই ভরসা রাখতে হবে।
আপন মনে টেলিগ্রাফের প্রথম পাতাতে সবে মন দিয়েছে, হঠাৎ চেনা গলার ডাকে চমকে সামনে তাকিয়ে অবাক হলো ওর ঠিক উল্টোদিকে দুটো সিট পরে পৃথা, অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
পৃথা বোস। ইউনিভার্সিটির ওর এক বছরের জুনিয়ার ব্যাচ। সুন্দরী, বোটানিতে মাস্টার্স করছে, একটু দাম্ভিক। সব সময়ে জিন্স টপ আর পেনসিল হিল। প্রায় প্রতি কথায় ইংরেজী শব্দ।
অভি দু’ একবার কথা বলার চেষ্টা করেনি তা নয় কিন্তু এত সংক্ষিপ্ত উত্তর, তাতে বুঝেছিলো এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। ওসব হাল ছেড়ে ইউনিভার্সিটির পাট শেষ করে একটা স্কুলে এক বছরের জন্যে প্যারা টিচার তারপরে এই অধ্যাপনার চাকরীতে ইন্টারভিউ শেষে যোগদানের আহ্বান।
ইতিমধ্যে খুব কাছের দুজন বন্ধু ছাড়া আর কারুরই খবর রাখা হয়নি।
পৃথা সমন্ধে বিশেষ কোনো খবর রাখেননি, শুধু একবার শুনেছিল মাস্টার্স শেষ করার আগেই ইউনিয়নের এক হিরোকে ভালোবেসে বিয়ে করে সংসারী হয়ে গিয়েছে।
অবাক ব্যাপার পৃথার কাছেই জানলো, ও কোলাঘাটেই একটা নার্সারির দায়িত্বে। ওখানেই থাকতে হয়, আজ সপ্তাহের প্রথম দিন তাই চলেছে, ফিরবে এক্কেবারে শুক্রবার বিকেলে। এ ক’দিন এখানে কৃচ্ছ সাধন।সপ্তাহের শেষ আড়াই দিন কলকাতায় শাশুড়ির কাছে। সুশান্ত নাথ। অর্থাৎ যাকে পৃথা বিয়ে করেছিল, গতবছর একটা রোড একোডেন্টে মারা গিয়েছে। পৃথা এখন একলা শাশুড়ীর সাথে মির্জাপুরে ভাড়া বাড়িতে থাকে।
ওরা এক সাথে কোলাঘাটে নেমে, পৃথা ওর নার্সারীটা অভিকে দেখিয়ে চলে যায়।
প্রথম দিন কলেজে কোনো ক্লাস ছিলনা। দুপুরে ফেরার পথে অভি ভ্যান চালককে পৃথার নার্সারির কাছে দাঁড়াতে বললো।
গাছ নিয়ে ওর কোনদিনই ওর খুব একটা বড়ো আগ্রহ ছিলনা। কিন্তু এখানে ঢোকার পরে ছোট বড় মাঝারি গাছ ওকে অবাক করলো।
পৃথা কি সুন্দর করে সাজিয়েছে তাদের।
ওর গেট খোলার শব্দে ইতিমধ্যে পৃথা এগিয়ে এসেছে। ও হাসি ভরা মুখে বিস্ময়ে বললে,
‘এলে তবে’!
উত্তর না দিয়ে অভির চোখ তখন সূর্যমুখীর মাথা দোলানো দেখছিল। ওরা কেমন যেন অপূর্ব, ওরা যে এতো সুন্দর হতে পারে, আগে সে তা জানতো না।
কতো জানা-অজানা ফুল।
সত্যই অপূর্ব লাগছিল।
তারপরে পৃথার ডাকে যখন সম্বিত ফিরল, দেখল, পৃথার খোলা চুলে ঢলা সূর্যের আলো পড়েছে, ওর নাকছাবিটা অর্ধ্যেক চাঁদের মতো চমকাচ্ছে। ফুলের রাজ্যে মোটা পেড়ে খোলতাই শাড়িতে ওকে দেবীর মতো লাগছিল।
পৃথা এগিয়ে এসে ওকে অভর্থনা করে বলল,
-‘এসেছো যখন, একটু বসে যাও।’
ও মনোযোগ একটুও টাল খেলোনা।
ফুলেদের খেলা, ঢলাঢলি, কতো নাচনকদন, জড়াজরি।
আজ বুঝলো। পৃথিবীতে এখনও আছে প্রাণ, আছে ইচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে বাঁচবার। আছে প্রেম। কবিতা।
এই নতুন ভাবে পৃথিবীর ঐশ্বর্য তার প্রাণ ভরিয়ে দিল।
সে পৃথার কাছে আজ বড়ই কৃতজ্ঞ।
এরপরে কলেজ থেকে ফেরার পথে অভি মাঝেমাঝেই পৃথার বাগানে ঢুকতো। ফুলগাছগুলো তার খুব আপন হয়ে গিয়েছিল। অভি ওদের দেখতো ওরা দক্ষিণী হওয়ায় দুলতো। জুঁই বেলি নিজেদের মধ্যে হাসতো, অপরাজিতা খেলা করতো, মোরগজটা একটু যেন দেমাকি। মাধবীলতা তার ভরসার মাথায় দুলতো। অভির মনে হতো ফুলগুলো ওকে চিনেছে। ওকে দেখলে ওরা খুশি হতো। অভি ওদের সাথে কথা বলতো। কত ঝাটপটানি, খসখাসানি। প্রতিদিনই বাগান থেকে বের হয়ে স্টেশন অবধি যাবার সময়ে খুব কষ্ট হতো ওদের ছেড়ে যেতে। শুক্রবার পৃথা তার সাথেই কলকাতা ফিরতো।
বেশ হাঁসি খুশীতেই চলছিল দিনগুলো, পৃথার দেওয়া লাল’চা আর প্রিয় ফুলগুলোর নাচনকদন। পৃথাকে যত দেখতো, অবাক হতো, ইউনিভার্সিটির পৃথা আজ কত মাটির কাছাকাছি। অভির কাছে ওর অনুরোধ কিছুদিন অন্তর বাগানে বসে অভির স্বরচিত কবিতা পাঠ। পৃথা প্রায়ই তাকে ফুলের নাম ধাম শোনাতো। ওর শিক্ষা এখন ও কাজে লাগাচ্ছে, গাছগুলো যেন পৃথার প্রান। শনিবার, রবিবার কিছুতেই অভির সময় কাটতে চাইতনা। সোমবার আবার ফুলগুলোর সাথে দেখে হতো। কর্নিয়া ভরে ওদের একটু একটু করে বড় হওয়া দেখতো। নিজের খেয়ালে বাচ্ছাদের মতো নিজেই হাততালি দিতো। কিন্তু একটা ফুল ঝরে গেলেও পরমাত্মীয় বিয়োগের কষ্ট পেত সে।
সেদিন মঙ্গলবার কলেজে থাকতেই খবর এলো উত্তর-পূর্ব দিক থেকে খুব জোরে ঝড় বৃষ্টি আসছে। টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হতে সে অন্য অধ্যাপকদের সাথে স্টেশনের দিকের অটো ধরলো। ইচ্ছে থাকলেও প্রথার খোঁজ নেওয়া হলোনা। ফোনও পৃথাকে পেলোনা। হয়তো ঝড়ের জন্যে ফোনে যোগাযোগ করতে পারলোনা।
পরেরদিন বিকেলে ফোনে পৃথাকে পাওয়া গেল।
ফোন ধরে কিছুক্ষণ পৃথা কথা বলতে পারলোনা। পরে গলায় কান্না আটকে জানালো,
-‘আমার সন্তানদের ছেড়ে আমি কোথাও যাইনি। কিন্তু আমার গাছগুলো তছনছ হয়ে গিয়েছে। এবাগানের একটা গাছও বেঁচে নেই গো। ঝড়ে ওদের মাথা নুইয়ে দিয়েছে আর নদীর জল উঠে গাছ মরে গিয়েছে।
অভিদা তুমি আর এখানে এসোনা, শুধু শুধু কষ্ট পাবে।
আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামাল দিয়েছি। ভালো থাকার চেষ্টা করো।’
অভি আর কোলাঘাটে কোনদিন যায়নি।
কলেজে তার পদত্যাগ পত্র পোস্টে পাঠিয়ে দিয়েছিল।
—————————

আত্মারা এখনো আছে
মলয় সরকার
আত্মা আছে কি নেই এই নিয়ে জোর তর্ক চলছিল অর্ক আর রেহানের মধ্যে। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে আঁকাবাঁকা রাস্তায় খুব সাবধানে রেহান গাড়ি চালাচ্ছিল। পাহাড়ি রাস্তা। একটু এদিক ওদিক হলে রক্ষা নেই। রেহানের উত্তর দেবার আগেই গাড়িটা একটা ঝাকুনি দিয়ে থেমে গেল। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি তার সাথে ভয়ানক হাওয়া। প্রচন্ড বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে সাথে বাজ পড়ছে। বাইরে অন্ধকারে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। অর্ক ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। " রেহান কি হবে? " রেহান ছাতাটা মাথায় দিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। তাকিয়ে দেখল দূরে একটা বাড়ী দেখা যাচ্ছে। জানলায় আবছা আলোয় আবছায়া কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করে জোরে একটা বাজ পড়লো। চারিদিক যেন কেঁপে উঠলো।কোথায় যেন করুন সুরে একটা কুকুর ডেকে উঠলো।
" অর্ক দৌড় দে। ওই দূরে একটা যেন বাড়ি দেখা যাচ্ছে। " রেহান বলল।ওরা দৌড় দিলো বাড়িটার উদ্দেশ্য করে।
" এসো ঘরে এসো " বাড়িটা যেমন ভুতুড়ে তেমনি বাড়ির মালিকটাও কেমন যেন ভুতুড়ে। ঢুকবে না ঢুকবে না করেও অর্ক আর রেহান ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘরে একটা মাত্র কালি পড়া হ্যারিকেন জ্বলছে। আসবাবপত্র বলে খুব একটা কিছু নেই।
I" আমার বেশি আলো সহ্য হয় না তাই এরকম আলোর ব্যবস্থা।আমার বাড়িতে এত রাত্রে কিন্তু কোন খাবার নেই আর একটাই সিঙ্গেল চৌকি । তাই তোমাদের এই ঘরে বসে গল্প করে কাটাতে হবে। দুজনেই মাথা ঝাকালো।
" কাকু আপনি বলুন না দু'চারটা ভুতের গল্প। আমার ভূতের গল্প হেভি লাগে। তাছাড়া এরকম একটা পরিবেশ। ভূতের গল্প শোনার জন্য আদর্শ।আমাদেরও সময় কেটে যাবে ।" রেহান হাসতে হাসতে বলল। কোথায় যেন একটা খুব জোরে শিয়াল ডেকে উঠলো। বিদ্যুতের আলোতে অর্ক জানলায় অনেকগুলো ছায়া দেখতে পেল। কিন্তু বাড়িতে তো আর কেউ নেই। তাহলে ওরা কারা? অর্ক ভয়ে রেহানের হাত চেপে ধরল।
" তোমরা আত্মা বিশ্বাস করো।"
"ধুস আত্মা বলে কিছু হয় না। আমি ওসব আত্মা ফাত্তা বিশ্বাস করি না ।" রেহান বেশ একটু জোর গলায় বললো।ভদ্রলোক শুধু হাসলেন,মুখে কিছু প্রকাশ করলেন না । অর্ক খেয়াল করল ভদ্রলোকের চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠলো।
" প্রমাণ চাই তোমার। বেশ তবে আমার গল্পটা শোনো তুমি প্রমাণ পেয়ে যাবে আত্মা আছে কি নেই। আমি প্রায় চল্লিশ বছর হলো এই বাগানে কাজ করেছি । যদিও বাগান এখন বন্ধ। তাও আমি বাগানের কেয়ারটেকার হিসেবে এখনো এই কোয়ার্টারে থাকি।। " ভদ্রলোকের কথা শেষ হতে না হতে অর্ক চিৎকার করে উঠলো " ওই যে ওটা কার চোখ। " রেহান ঘুরে তাকিয়ে দেখল কিছু নেই কোথাও।
" কিরে ওরকম চিৎকার করলি কেন? " রেহান তাকিয়ে দেখল অর্কর মুখ শুকিয়ে গেছে। ভয়ে কাঁপছে ও।
" ওই জানালায় দুটো ভয়ংকর চোখ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। " অর্ক তাকিয়ে দেখলো ভদ্রলোক মুচকি মুচকি হাসছেন ।" ওসব কিছু না তুমি বিদ্যুতের আলোতে ভুল দেখেছো।ওদিকে মন দিও না এখন গল্পটা শোনো।এই বাগানের মালিক সুদর্শন সরকার আমাকে খুব ভালবাসতেন। একদিন হঠাৎ উনি ওনার চেম্বারে ডেকে পাঠালেন। বললেন ওনার সন্দেহ ফ্যাক্টরি এবং গাড়ি থেকে চা পাতা চুরি হয়ে যাচ্ছে। আর সেটাই আমাকে ধরতে হবে গোপনে । কয়েকদিন পর হাতেনাতে ধরলাম। ওদের জেল হয়ে গেল। একদিন রাতে নাইট ডিউটি শেষ করে কোয়ার্টারে ফিরছি। হঠাৎ সামনে দেখলাম দুটি ছায়া মূর্তি। কিছু বোঝার আগেই একটা মিষ্টি যন্ত্রণার সাথে দেখলাম আমার গলাটা প্রায় দুই ইঞ্চি হা হয়ে গেছে আর সেখান থেকে গল গল করে রক্ত পড়ছে।"
অর্ক আর রেহান অবাক হয়ে দেখল ভদ্রলোকের গলাটা প্রায় দুই ইঞ্চি ফাঁকা আর গলা দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। অর্ক আর রেহান দৌড়ে বাইরে বেরোতে গেল। বন্ধ দরজা কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না। অর্ক আর রেহান চিৎকার করে উঠলো। একটা বিকট হাসিতে ঘর যেন কেঁপে গেল।
" পারবেনা যেতে পারবেনা। ওই দেখো মেঝেতে তোমরা শুয়ে আছো।
রেহান তাকিয়ে দেখলো সত্যি সত্যি মেঝেতে দুটো
বডি সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা। পাগলের মত রেহান দৌড়ে চাদরটা উঠালো। চমকে উঠল একি! এই ডেড বডিটা তো ও নিজেই। পাশেরটা উঠালো, দেখল এত অর্ক। দুজনেরই গলা প্রায় দুই ইঞ্চি ফাঁকা আর সেখান থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। অর্ক দৌড়ে রেহানকে ধরতে গেল। অর্কর মনে হল ও যেন ধোয়ার ভিতর দিয়ে হেঁটে গেল। একি ভদ্রলোক কোথায় গেল। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। শুধু শুনতে পেল আত্মারা এখনো আছে,এখনো আছে।
*************************+**********************::**::*::::**

নিঃশব্দতার অনুবাদক
আবরারুল হক মনির
এক
শরাফত আলীর পেশাটা অদ্ভুত। তিনি মানুষের নৈঃশব্দ্যকে শব্দে রূপান্তর করেন।
দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপনা শেষে অবসর নেওয়ার পর তিনি একটি বিশেষায়িত স্কুলে কাজ শুরু করেছেন। সেখানে তিনি বধির মানুষদের ইশারা ভাষা বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শেখান, আর তাদের না-বলা কথাগুলোকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় অনুবাদ করে দেন। হাতের আঙুলের সূক্ষ্ম নড়াচড়া, চোখের দৃষ্টি আর কপালের ভাঁজ দেখে তিনি অনায়াসেই পড়ে ফেলতে পারেন একজন বাকহীন মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা বিশাল কোনো হাহাকার।
অথচ কী আশ্চর্য এক পরিহাস! যিনি সারাদিন অন্যের নৈঃশব্দ্যকে নিপুণভাবে অনুবাদ করেন, তিনি গত সাত বছর ধরে নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুমের জমাটবাঁধা নিস্তব্ধতার কোনো অর্থ বের করতে পারেননি।
শরাফত আলীর একমাত্র ছেলে, অনিক। অনিক বোবা নয়, তার কণ্ঠস্বর যথেষ্ট জোরালো এবং স্পষ্ট। কিন্তু গত সাতটি বছর ধরে এই বাবা-ছেলের মাঝে একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি। সাত বছর আগের এক ঝড়ো রাতে অনিক যখন ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়ার জন্য জেদ ধরেছিল, শরাফত আলী তার সমস্ত শিক্ষাগত অহংকার নিয়ে বলেছিলেন, "যেদিন ওই ক্যামেরার ফিতা গলায় ঝোলাবি, সেদিন থেকে এই বাড়ির দরজা তোর জন্য বন্ধ।"
অনিক কোনো উত্তর দেয়নি। সে শুধু নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে একই শহরে বাস করেও তারা দুজন যেন যোজন যোজন দূরের দুটি ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। শরাফত আলী তার ইগো আর অহংকার নিয়ে একা এই বিশাল ফ্ল্যাটে পড়ে আছেন, আর বিশ্বাস করে গেছেন—ভুলটা অনিকেরই ছিল, তাই ক্ষমাটা তাকেই চাইতে হবে।
দুই
শ্রাবণ মাসের এক মেঘলা বিকেল।
শরাফত আলী তার স্কুলের ছোট অফিস কক্ষটিতে বসে আছেন। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। এমন সময় দরজায় হালকা টোকা পড়ল।
ভেতরে ঢুকল চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটি মেয়ে। মেয়েটির নাম তৃণা। এই স্কুলেই বছর দুয়েক আগে শরাফত আলীর কাছে সে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের উচ্চতর কোর্স করেছিল। তৃণা জন্ম থেকেই বধির।
শরাফত আলী ইশারায় তাকে বসতে বললেন। "কী খবর তৃণা? হঠাৎ আজ?" তিনি হাতে ইশারা করলেন।
তৃণা তার কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর আঙুলের ইশারায় খুব দ্রুত কিছু কথা বলল। যার অনুবাদ হলো—"স্যার, এই পেনড্রাইভে একটা ভিডিও আছে। আমি নিজে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে একটা কথা রেকর্ড করেছি। আপনি কি প্লিজ ভিডিওটা দেখে আমার ইশারাগুলোকে একটা কাগজে চিঠি আকারে লিখে দেবেন? আমার খুব দরকার।"
শরাফত আলী একটু অবাক হলেন। "কাকে দেবে এই চিঠি?"
তৃণা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর তার ডান হাতটা নিজের বুকের কাছে নিয়ে গিয়ে একটা বিশেষ ভঙ্গি করল। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে এই ভঙ্গিটার অর্থ—'বাবা'।
শরাফত আলী আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। তিনি ল্যাপটপে পেনড্রাইভটা যুক্ত করলেন। ভিডিওটা চালু হলো। তৃণা সামনের চেয়ারটায় মাথা নিচু করে বসে রইল।
তিন
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তৃণা একটা ছাইরঙা সোফায় বসে আছে। তার চোখের নিচে কালি, কিন্তু দৃষ্টিতে একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা। সে ধীরে ধীরে দুই হাত তুলে ইশারা শুরু করল।
শরাফত আলী ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে খাতা-কলম টেনে নিলেন। তিনি ইশারাগুলো দেখে তার স্বভাবসুলভ দক্ষতায় অনুবাদ লিখতে শুরু করলেন:
"বাবা, গত পাঁচটা বছর আমি তোমার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখিনি। আমি ভেবেছিলাম, আমার এই নীরবতা তোমাকে শাস্তি দেবে। আমি ভেবেছিলাম, আমি একা বেঁচে থেকে তোমাকে প্রমাণ করে দেব যে, তোমাকে আমার একটুও প্রয়োজন নেই।"
শরাফত আলীর কলমটা হঠাৎ একটু থমকে গেল। তিনি ঢোক গিলে আবার লিখতে শুরু করলেন। ভিডিওতে তৃণার আঙুলগুলো এখন কাঁপছে।
"আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি বাবা। আমি প্রমাণ করেছি যে আমি পারি। কিন্তু জানো? প্রতিবার যখন আমার জীবনের কোনো ভালো কিছু ঘটে, তখন সবার আগে আমি পেছনের দিকে ঘুরে তাকাই। আমি ওই ভিড়ের ভেতর তোমার মুখটা খুঁজি। কিন্তু সেখানে কেবল একটা বিশাল শূন্যতা থাকে। আমার এই বোবা পৃথিবীতে তুমি ছিলে আমার একমাত্র কণ্ঠস্বর। আমি জেদের বশে সেই কণ্ঠস্বরটাকেই গলা টিপে মেরে ফেলেছি।"
ল্যাপটপের স্ক্রিনে তৃণা এবার দু'হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। তার কাঁধ দুটো কাঁপছে। কিছুক্ষণ পর সে আবার হাত তুলে ইশারা করল।
শরাফত আলী আর লিখতে পারছেন না। তার মনে হচ্ছে, ল্যাপটপের স্ক্রিনে তৃণা নয়, বরং সাত বছর আগের সেই রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া অনিক দাঁড়িয়ে আছে। আর সে এই ইশারাগুলো শরাফত আলীকে লক্ষ্য করেই করছে।
"বাবা, অহংকার মানুষকে খুব একা করে দেয়। আমি আর একা থাকতে পারছি না। তুমি কি তোমার এই বোবা মেয়েটাকে আরেকবার তোমার বুকে টেনে নেবে?"
ভিডিওটা শেষ হয়ে গেল।
চার
অফিস ঘরটায় একটা পিনপতন নীরবতা।
শরাফত আলী তার চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। তিনি দীর্ঘক্ষণ ওই লেখা কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তৃণা তার নীরব ভাষা দিয়ে যে কথাগুলো আজ স্বীকার করল, সেই কথাগুলো তো শরাফত আলী নিজেও গত সাত বছর ধরে নিজের ভেতরে বহন করে চলেছেন। তিনি কি সত্যি একা হয়ে যাননি? তিনি কি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজ পড়ার সময় একবারও ভাবেননি যে, সামনের খালি চেয়ারটায় অনিক বসে থাকলে কেমন হতো? তার এত বড় ডিগ্রি, এত বছরের অহংকার তাকে আসলে কী দিয়েছে? একটা নিশ্ছিদ্র, দমবন্ধ করা একাকীত্ব ছাড়া তো আর কিছুই না!
শরাফত আলী কাগজটা ভাঁজ করে তৃণার হাতে দিলেন।
তৃণা কাগজটা বুকে চেপে ধরে শরাফত আলীকে ইশারায় ধন্যবাদ জানাল। তারপর ধীর পায়ে অফিস কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
শরাফত আলী একা বসে রইলেন। তিনি আজ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বধির মানুষ তারা নয়, যারা কানে শুনতে পায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে বধির মানুষ হলো তারা, যাদের ইগো আর অহংকারের দেয়াল এতই পুরু যে, তারা নিজেদের বুকের ভেতর ডুকরে কাঁদতে থাকা বিবেকের শব্দটাও শুনতে পায় না।
পাঁচ
সন্ধ্যা নেমেছে। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে।
শরাফত আলী তার অফিসের জানালা বন্ধ করলেন। তারপর ড্রয়ার থেকে নিজের মোবাইল ফোনটা বের করলেন। কন্ট্যাক্ট লিস্ট স্ক্রল করে তিনি একটা নামের ওপর গিয়ে থামলেন। 'অনিক'। গত সাত বছরে এই নাম্বারে তিনি একবারও কল করেননি, নাম্বারটা মুছেও ফেলেননি।
তার আঙুলগুলো কাঁপছে। যে আঙুল দিয়ে তিনি সারা জীবন অন্যের নীরবতা অনুবাদ করেছেন, আজ সেই কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে তিনি কল বাটনে চাপ দিলেন।
ফোনটা রিং হচ্ছে। একবার... দুবার... তিনবার...
শরাফত আলীর বুকের ভেতর যেন হাতুড়ি পেটা হচ্ছে। যদি অনিক ফোন না ধরে? যদি সে নাম্বারটা পরিবর্তন করে ফেলে থাকে?
হঠাৎ রিংটোনটা থেমে গেল। ওপাশ থেকে একটা সংযোগের শব্দ হলো। কয়েক সেকেন্ডের একটা দীর্ঘ, ভারী নীরবতা।
তারপর খুব নিচু, অস্পষ্ট এবং পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "হ্যালো... বাবা?"
শরাফত আলী চোখ বন্ধ করলেন। তার গাল বেয়ে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি কোনো কথা বললেন না। তার মনে হলো, গত সাত বছর ধরে জমে থাকা সমস্ত নৈঃশব্দ্য আজ কেবল একটা 'হ্যালো' শব্দের কাছে চিরকালের জন্য অনুবাদ হয়ে গেছে। মানুষের তৈরি করা ইগোর দেয়াল যত বড়ই হোক না কেন, সত্যিকারের ভালোবাসার একটা সামান্য আঁচড়ে তা মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে যেতে বাধ্য।
বাইরে তখনো অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। তবে শরাফত আলীর বুকের ভেতর আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তির রোদ উঁকি দিতে শুরু করেছে।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.