আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
মহাজীবন
রম্য রচনা/ মুক্ত গদ্য
ধারাবাহিক -উপন্যাস / গদ্য
প্রবন্ধ
বই চই
Privacy Policy
আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
মহাজীবন
রম্য রচনা/ মুক্ত গদ্য
ধারাবাহিক -উপন্যাস / গদ্য
প্রবন্ধ
বই চই
Privacy Policy
More
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • মহাজীবন
  • রম্য রচনা/ মুক্ত গদ্য
  • ধারাবাহিক -উপন্যাস / গদ্য
  • প্রবন্ধ
  • বই চই
  • Privacy Policy
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • মহাজীবন
  • রম্য রচনা/ মুক্ত গদ্য
  • ধারাবাহিক -উপন্যাস / গদ্য
  • প্রবন্ধ
  • বই চই
  • Privacy Policy

বড় গল্প

তনুশ্রী সামন্ত

ঊনিশ তম বিবাহবার্ষিকী

তনুশ্রী সামন্ত


গানের ক্লাস থেকে এইমাত্র এলো মৌলী। ভীষণ ক্লান্ত শরীর। সোফায় শুয়ে ঘুম এসে গেলো তাই। দরজাটা অবশ্য লক করেই শুয়েছিল। ইদানিং একটুতেই ক্লান্ত হয়ে যায় মৌলী। থাইরয়েড, সুগার,প্রেশার সবরকম সমস্যা বাসা বেঁধেছে শরীরে। অবশ্য শরীরেরই আর দোষ কি? তাকেও তো কম কষ্ট দেয়নি মৌলী। তবুও ঈশ্বর যখন মুখ ফিরিয়ে রইলেন তখন মনটাও কেমন অবশ হতে শুরু করলো। মৌলীর এখন ঠিক মনে পড়ে না, আগে শরীর অবশ হতে শুরু করেছিল না কি মন? অথচ তার জীবনটা যে এমন হয়ে যাবে কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবে নি মৌলী। ছোটোবেলা থেকেই ভীষণ জলি আর হৈ হট্টগোল প্রিয় মেয়ে ছিল সে। সারা স্কুল দাপিয়ে বেড়াতো। পড়াশুনায় মাঝারি মানেরই ছিল যদিও। কিন্তু গান, আবৃত্তি, নাটক সবেতেই একেবারে মন ভরিয়ে দেওয়ার মতো মেয়ে। স্কুলের স্যার ম্যাডামরাও তাই ভীষন ভালোবাসতো মৌলীকে। এতো মিষ্টি গানের গলা ওর ! তাই স্কুলের,পাড়ার সব অনুষ্ঠানে ওকে গাইতেই হতো। গান শিখতো শিউলিদির কাছে। শিউলিদিও এখানে ওখানে প্রোগ্রামে সাথে করে নিয়ে যেত ওকে। নাচ অবশ্য শেখেনি মৌলী। ওর বাবা বলতো, এতকিছু করলে পড়াশুনা করবে কখন? তাছাড়া গানটা সারাজীবন ধরে রাখতে পারবে তবুও। মেয়েদের ক্ষেত্রে সংসার, বাচ্চা কাচ্চা এসব নিয়ে নাচটা চালিয়ে যাওয়া একটু ডিফিকাল্ট। তবে ওদের দু ক্লাস ওপরে শৈলেনদা দুর্দান্ত নাচতে পারতো। কালচারাল দিক,পড়াশুনা সবেতেই স্কোয়ার ছেলে। মৌলী ভাবতো শৈলেনদা এতকিছু করতে সময় বার করে কখন! 


ওদের স্কুলের নাম ছিল ছাতিমপুর উচ্চ বিদ্যালয়। বেশ বড়োসড়ো স্কুল। পড়াশুনা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি সবকিছুতেই পাশাপাশি অন্যান্য অনেক স্কুলের থেকে অগ্রগন্য। মাঝে মাঝে ওদের কালচারাল টিম সরকারি নানা অনুষ্ঠানেও প্রোগ্রাম করার ডাক পেতো। মৌলীকে ওর বাবা সবজায়গায় পাঠাতে চাইতো না হয়তো। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হেডমাষ্টারমশায়ের কথা ফেলতে পারতেন না। তেমনি দু চারটে পোগ্রামে গিয়ে কাছাকাছি আসা শৈলেনদার। মৌলীর শুধুই মুগ্ধতা ছিল একরাশ। কিন্তু অন্যদিক থেকে শৈলেনদার তার প্রতি যে এতোটাই দুর্বলতা ছিল,তা ভাবতেই পারেনি মৌলী। একদিন টুয়েলভের ছুটি হলো ক্লাস টেনের সাথেই। মৌলীর বাড়ি পায়ে হাঁটা পথেই হাফ কিলোমিটার মতো যেতে হয়। আর শৈলেনদার বাড়ি ঐ রাস্তাতেই দু কিলোমিটার হবে। সেদিন হঠাৎ স্কুল থেকে বেরিয়ে কিছুটা আসার পর একটা রাধাচূড়া গাছের তলায় সাইকেল থেকেই শৈলেন বলল, একটু দাঁড়াবে মৌলী? শৈলেনদা এমনিতেই চুপচাপ প্রকৃতির। প্রয়োজন ছাড়া কারও সাথেই তেমন কথা বলে না। তাও এই নিভৃত চারণে হঠাৎ! মৌলীর বুকের ভেতরটা ছলাৎ করে উঠলো। 

সাইকেল থেকে নেমে সাইকেলটা রাধাচূড়া গাছটায় ঠেকিয়ে রাখলো শৈলেন। গ্রীষ্মের দুপুর। মোরাম রাস্তাটা শুনশান। দূরে একদল ছেলেমেয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে। শিপ্রার সাথে গল্প করতে করতে স্কুল থেকে একটু দেরি করেই বেরিয়েছিল মৌলী।

..... "টুয়েলভ শেষ হওয়ার পর এই স্কুল থেকে তো চলে যেতে হবে আমাকে। তোমাকে না দেখে আমি কেমন করে থাকবো মৌলী!"

মৌলী যেন আকাশ থেকে পড়লো! তার এতো আকাঙ্ক্ষিত একজন মানুষ কিনা নিজেই এসেছে তাকে প্রেম নিবেদন করতে! মৌলী খুঁজে পাচ্ছিলো না এই অত্যাশ্চর্য আনন্দের পরিবর্তে কী দেবে সে শৈলেনদাকে!মনে হচ্ছিল নিজের সর্বস্ব দেওয়াও যেন যথেষ্ট নয়। মনে হচ্ছিল,এই রাধাচূড়া গাছ, ঐ দূরের কুমুদঝিল, ঐ নীল আকাশ, আকাশের সব চাঁদ তারা অথবা সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মালকিন যদি সেই হতো তবেই হয়তো সবটুকু উজাড় করে দিয়ে তার আশা কিছুটা মিটতো।

........ "শুধু তোমার মনের একটা কোনায় একটুকু ধূলিকণার মতো করে আশ্রয় দেবে আমায়?"

এক্ষুনি যে সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডটাই শৈলেনদার নামে লিখে দেওয়ার কথা ভাবছিলো, তার এমন কথায় মৌলীর বেশ হাসি পেলো। হেসেও ফেললো মৌলী ফিক করে।

শৈলেন খুব সিরিয়াস। 

..... "আমি জানি তুমি রূপে গুণে অনন্যা। এমন একটা শ্যামলা ছেলের এমন কথায় তাই হাসি পেলো বুঝি?"

মৌলী এবার মুখ নীচু করে বললো, "কৃষ্ণ কিন্তু কালোই ছিল আর রাধারাণী তপ্ত কাঞ্চন গৌরাঙ্গিনী। তবুও রাধিকা কৃষ্ণ কৃষ্ণ করেই প্রাণত্যাগ করেছিলো। আর কৃষ্ণ রাধাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো।"

.... "বাব্বা! তুমি তো অনেক কিছুই জানো দেখছি!"

মৌলী বললো, "দাদুর কাছে এসব গল্প শুনি তো তাই। নাহলে আমি কি তোমার মতো পড়াশুনায় অতো ভালো নাকি!"


....."তাতে কি! তোমার চোখ ভালো, মুখ ভালো, মন ভালো, গান ভালো। তুমি সবটাই ভালো। আর আমি কোনদিন তোমাকে কৃষ্ণের মতো ছেড়ে পালাবো না।" 

মৌলী লজ্জায় বসন্তের নতুন কুসুম পাতার মতো লাল হয়ে যাচ্ছিল। শৈলেন এসে ওর হাতটা ছুঁয়ে বলেছিলো," তাছাড়া আমরা রাধা কৃষ্ণ থোড়াই হবো। আমরা তো হর পার্বতী হয়ে চার ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘরসংসার করবো।"

মৌলীর মুখ আরো রাঙা হচ্ছিলো, বুঝতে পারছিলো না সে সত্যিই জেগে আছে নাকি স্বপ্ন দেখছে! পা গুলো যেন মাটিতে গাড়া হয়ে গেছে দুইফুট করে! নড়বার ক্ষমতা নেই। ওর হাতে একটা চুমু দিয়ে সাইকেলটা টেনে নিয়ে শৈলেন বলেছিল বলে, "এবার বাড়ি যাও মৌলী। লোকজন এসে পড়বে একটু পরেই, মাঠে ধান কাটতে। ভালো থেকো, মন দিয়ে পড়াশুনা করবে। আর আমাকে ঐ ধূলিকণার মতো মনের একটা কোনায় রেখে দেবে। আমরা দুজনেই বড়ো হই । দুজনের মনের মধ্যে তীব্র টান থাকলে ঈশ্বর একদিন ঠিক আমাদের মিলিয়ে দেবেন। শুধু মনের কথাটা তোমাকে জানিয়ে রাখলাম মৌলী।"


ঐশিকী বললো,"পুরো পোগ্রামটা কিভাবে সেট হবে তা নিয়ে সবাই মিলে একটা আলোচনার ব্যাপার আছে শৈলেনদা। আমাদের প্রেজেন্টেশন এর ওপর অনেককিছু নির্ভর করছে।" ওড়িশি নৃত্যের একজন নামকরা শিল্পী এখন শৈলেন। চাকরির ফাঁকে একটা নাচের স্কুলেরও অর্গানাইজার। দেশে বিদেশে প্রোগ্রাম করতে যায় স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। তবে বেশিরভাগটা ঐশিকীই দেখাশোনা করে। অফিসের কাজের পর যতটুকু সময় পায় তার বেশিরভাগই অবশ্য এখন স্কুলেই দেয় শৈলেন। 

ঐশিকীর কথায় শৈলেন একমত হলো," হ্যাঁ অবশ্যই। এখানে আমরা কেউ সর্বময় কর্তা নয়। সর্বোপরি যারা পারফর্ম করবে তাদের সাথে তো আলোচনা করতেই হবে।"

.... "আপনার একটা একক নৃত্য থাকবে না শৈলেনদা?"

....." ধুর এই বয়সে কতটুকুই বা প্র্যাকটিসে থাকছি বলো?"

...... "তবুও আপনার একটা আলাদা ক্রেজ। মঞ্চে উঠলেই মঞ্চ আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে।"

...... "তেমনটা এখন তোমারও আছে ঐশিকী।" তোমারি একটা সোলো ড্যান্স রাখি নাহয়।

..... "একটা কথা বলবো শৈলেনদা?'

....... একটা কেন? একশোটা বলো!

...... বলছি যে,যদি ধৃষ্টতা মার্জনা করেন তো বলি!

..... উঃ ঐশিকী এসব আবোল তাবোল কথা রেখে আসল কথাটা বলবে? রাত হয়ে যাচ্ছে। তোমাকেও বাড়ি যেতে হবে তো!

..... বলছিলাম কি,আপনার সাথে আমার একটা ডুয়েট ড্যান্স রাখা যায় না?

..... বাপরে বাপ! এটা বলতে এতো হেজিটেশান!

হ্যাঁ রাখা তো যায়ই। তবে একটু বেশি প্র্যাকটিস লাগবে। গুরু শিষ্যায় ডুয়েট। মন্দ হবে না।

ঠিক আছে। তোমার বাড়ি থেকে কেউ আসবে? নাকি আমিই ছেড়ে দেবো তোমায়।

.... না শৈলেনদা। দাদা বাইরে ওয়েট করছে।

...... ও কে, তবে তুমি সবকিছু গুছিয়ে এসো । আমি এগোলাম। ইস! দশটা বাজতে চললো প্রায়!


ঐশিকী শৈলেনের স্কুলের প্রথমের দিকের স্টুডেন্ট। তখন স্কুলটা খুব ছোটোই ছিলো। তবে স্কুলে সময় দিতে পারতো তখন। নাচ ছাড়া থাকতে পারতো না বলে দুচারজন স্টুডেন্ট নিয়েই শুরু করেছিল ও। দুজন ছেলে মণীশ আর অর্পণ। আর দুজন মেয়ে ঐশিকী আর লোপামুদ্রা। সবার মধ্যে ঐশিকীই ট্যালেন্টেড ছিল বেশি। আর নাচের প্রতি তীব্র ডেডিকেশনও ছিল ওর। তখন সৈকত সপ্তাহান্তে একদিন বাড়িতে যেতো। ওর দেশবাড়িতেই পুরো পরিবার থাকতো। কত যে সুন্দর ছিল সেই পরিবার!

নাচের স্কুলটা শৈলেনদের ফ্ল্যাটের থেকে গাড়িতে মিনিট পনেরোর ডিসট্যান্স। ও দরজায় এসে নক করলো।


মৌলীও একাগ্র চিত্তেই ভালোবাসতো শৈলেনকে। শৈলেন যেন তার কাছে আরাধ্য দেবতা। তাই ক্লাস টুয়েলভের ফেয়ার ওয়েল অনুষ্ঠানে গৌতম স্যার যখন "যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন..."গানটা গাইতে বলেছিল মৌলীকে, মৌলী তখন স্যারকে বলেছিলো, ওটা তো আগেও গেয়েছি স্যার। এবার আমার পছন্দমতো একটা গান গাইতে চাই। গৌতমবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন কোন গান!

মৌলি একটু চুপ থেকে বলেছিলো। সেটা নয় সেদিনই শুনবেন স্যার। 

গৌতমবাবু একটু অবাক হয়েছিল যদিও, তবু মৌলীর ওপর তার বিশ্বাস ছিল। যে গান হোক ও ভালো গাইবেই।

গৌতমবাবুর বিশ্বাস অবশ্য অটুট ছিলো। শৈলেনদের বিদায়ী অনুষ্ঠানের দিন মৌলী গাইলো...

"কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া, তোমার চরনে দেবো হৃদয় ঢালিয়া....

ভেবেছিনু কোথা তুমি স্বর্গের দেবতা...

কেমনে তোমারে কবো প্রণয়ের কথা!

আপনি আজিকে যবে শুধাইছো আসি,

কেমনে প্রকাশি সখা কত ভালোবাসি!"


গানটা হয়তো অনুষ্ঠানে তেমন উপযুক্ত নয়, তবে মৌলীর অসাধারণ গায়কীতে সবাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ গানটা ছিল মৌলীর প্রাণের নিবেদন। অনুষ্ঠানের শেষে দোতালার বারান্দার এক কোনে চুপচাপ কাঁদছিল মৌলী। আর শৈলেন ওর হাতটা ধরেছিল। দু চারজন দেখেও ফেলেছিলো ব্যাপারটা। যদিও আগে থেকেই কয়েকজন বুঝতে পারতো ওদের হাবভাবে। আসলে "গোপন কথাটি রবে না গোপনে,উঠিবে ফুটিয়া নীরব নয়নে।"

তবে সেই নিয়ে কেউ হইচই করেনি তেমন। ওই বন্ধুরা টুকটাক ইয়ার্কি মারতো এই পর্যন্ত। আসলে কো এড স্কুলে এগুলো খুব সাধারণ ব্যাপার ছিল। উচ্চ মাধ্যমিকের পর ফিজিক্স নিয়ে ভর্তি হয় শৈলেন। তারপর কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এ চলে যায়। শৈলেনের বাবা আর মৌলীর বাবা দুজনেই শিক্ষক। অবশ্য দুজন দুই স্কুলে ছিলেন। মৌলী কিছুটা মধ্যমেধার মেয়ে তাই সুদীপবাবু মেয়েকে হিস্ট্রিতেই মাস্টার ডিগ্রী করালেন। সেই সঙ্গে চলতে থাকলো মৌলির গানের চর্চা। মাসে একবার করে অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর কাছেও নিয়ে যেতেন মেয়েকে। সবমিলিয়ে সুদীপবাবু মেয়েকে সুশিক্ষা ও সুসংস্কৃতির মধ্যেই বড়ো করে তোলেন। আর ফ্যামিলি স্ট্যাটাসের দিক থেকেও যেহেতু তেমন কোন পার্থক্য ছিল না, তাই শৈলেনের বাবা অনিমেষ বাবুও এই প্রস্তাবে অরাজি হলেন না। শৈলেন যদিও নিজে মুখে বাবাকে কথাটা বলতে পারেনি। বলেছিল ওর বন্ধু দীপ্তেন্দু। 

পাশাপাশি গ্রামের চেনা মেয়ে। তবুও একবার তো আনুষ্ঠানিক দেখাশোনার ব্যাপার থাকেই। শৈলেন অবশ্য যেতে চায়নি। ওর কাকারা বলেছিলেন, "আরে ওদের বাড়ির আত্মীয় স্বজন তো ছেলেকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই পারে।"

একটা বেগুনী রঙের সিল্কের শাড়ি পরে বসেছিল মৌলী। যেন মাটিতে পরী নেমে এসেছে!এমন মেয়েকে পছন্দ না করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। দেখাশোনার পর সবাই মৌলীর গান শুনতে চাইলো। মৌলী গাইলো..."আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায় দেখতে আমি পাইনি...!" সবার প্রাণ জুড়িয়ে গেলো।


মৌলী নিজেই বিয়ের পর শৈলেনদের গ্রামের বাড়িতে থেকে যেতে চাইলো প্রথমটা। সবাই এতো ভালোবাসে ওকে! তাছাড়া ওখানে শৈলেন অফিস চলে গেলে ওকে সারাদিন একা একাই থাকতে হবে। ওর মা, শাশুড়িমা সবাই বললো তোদেরও তো একটু বয়স হলো। একেবারে একটা বাচ্চা নিয়ে, আমাদের কাছে বড়ো করে নিয়ে,তারপর কলকাতায় যাস। ততদিনে ছেলেটাও একটা নতুন ফ্ল্যাট কিনে নিতে পারবে। মৌলী না করেনি। তাছাড়া অনিমেষ বাবুর শরীরটাও খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। এই অবস্থায় সবাইকে ছেড়ে বরকে নিয়ে সরে পড়তেও মন সায় দিলো না মৌলীর। প্রতি সপ্তাহেই বাড়ি আসতো শৈলেন। আর এই দিনটার জন্য একবুক মধু ভরে অপেক্ষা করে থাকতো মৌলী। শৈলেনও মৌলীকে একটু কাছে পাওয়ার জন্য আকুল হয়ে থাকতো। প্রতিটা শনি রবিবারই ছিলো যেন ওদের নতুন ফুলশয্যা। কিন্তু এতো সুখ সইবে কেন! প্রায় বছর তিনেক কাটলো মৌলীর কোলে কোনো সন্তান এলো না। কত ডাক্তার ,কত কবরেজ যে দ্যাখানো হলো মৌলীকে তার কোনো হিসেব নেই। একটা সার্জারিও হলো। কিন্তু অবশেষে ডাক্তারবাবু বলতে বাধ্য হলেন মৌলী কোনোদিন মা হতে পারবে না। 

ব্যাস সেই থেকেই শুরু হলো মৌলীর সাথে  শৈলেনের মায়ের দুর্ব্যবহার। অনিমেষ বাবু এখন কিছুটা সুস্থ। রিটার্ড করেছেন। তিনিও যেন সহ্য করতে পারেন না এখন মৌলীকে। যেন মৌলিই পুরো সংসারটাকে অকুল অন্ধকারের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একমাত্র ছেলে তাদের। তার যদি সন্তান না হয় তবে আর কী দাম থাকে এই সংসারের,এই জীবনের, এতদিন ধরে এতো কষ্টের! 

সারা সপ্তাহ শৈলেন কলকাতায় থাকে। মৌলীকে সবার সমস্ত কথা একা একাই হজম করতে হয়। সপ্তাহের শেষে শৈলেন বাড়ি এলে এখন একবুক চোখের জল ছাড়া কিছুই যেন দেবার থাকে না মৌলীর। শৈলেন ওকে বোঝায়, "তাতে কি হয়েছে মৌলী? আমরা দুজনে দুজনকে ভালোবেসে এই ছোট্ট জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবো না!"

মৌলী আরও কাঁদে, তোমাকে যে আমি কিছুই দিতে পারলাম না, সংসারের সুখ তো সন্তান। তাছাড়া বাবা,মা সবার আশাতে ছাই ঢেলেছি আমি। তুমি আমাকে ত্যাগ করে, আবার নতুন করে সংসার পাতো না কেন?

শৈলেন হাসে,"দূর!পাগলি একটা!"


নাচের স্কুলের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। নানা প্রোগ্রামেও যেতে হয়। এখন আর প্রতি শনিবার আসা হয়ে ওঠেনা শৈলেনের। তাছাড়া বাড়িতে এতো তিক্ত পরিবেশ। মন যেন আর টানে না তেমন বাড়ির দিকে। মৌলীর জন্য কষ্ট হয় যদিও। কিন্তু কী আর করবে শৈলেন। বাবার শরীরটা আবার ডিক্রিজ করছে। মৌলী কলকাতায় আসতেও চায় না। মৌলীর আরও একা লাগে। মাঝে মাঝে ভাবে হয়তো ওখানে কাউকে ভালোলাগছে শৈলেনের নতুন করে। ঐশিকী না কী যেন একটা মেয়ের নাম প্রায়ই বলে শৈলেন। মেয়েটা নাকি ভীষণ ভালো। মৌলীর চোখের কোনে জল আসে। শুধু কি ওর নাচই ভালোলাগে ওর? আর কী কিছু নয়! চোখের জল মুছতে মুছতেই মৌলী ভাবে, তাই হোক না তবে, ও সুখী হোক। মা বাবা খুশি হোক। ও নাহয় সরে যাবে শৈলেনের জীবন থেকে। শৈলেনকে এই সন্তান সুখ থেকে বঞ্চিত করার কোনো অধিকার নেই তার।


একদিন শনিবার রাতে খাওয়ার পর শৈলেন বিছানায় এসে একটা চিঠি পেলো।মৌলীর হাতেই দেখা!

আমার সোনা, 

তোমাকে এভাবে বঞ্চিত হতে দিতে পারিনা আমি। কী নেই তোমার। কেন তুমি আমার জন্য এমন অসম্পূর্ণ জীবন পাবে! আমি জানি তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো, তাই আমি না মরলে তুমি কখনোই বিয়ে করবে না। তাই আমাকে এই পথ বেছে নিতে হলো। আমার মা বলে আত্মহত্যা মহাপাপ, কিন্তু তোমাকে সুখী করার জন্য আমি মহাপাপীই হলাম নাহয়। আমার অন্তরভরা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইলো।

                         ইতি তোমার মৌ।

চিঠিটা পড়ে একমুহুর্তের জন্য থমকালো শৈলেন। এইতো একটু আগেই খেতে দিচ্ছিলো মৌলী! এইটুকু সময়ের মধ্যে কতদূর আর যেতে পারবে সে! হাতে টর্চটা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল শৈলেন বাইরে। দরজাটা আস্তে করে টেনে দিলো। বাবা মা শুয়ে পড়েছে পাশের ঘরে। প্রথমেই ও বাড়ির পেছনে আমবাগান টায় দেখলো, না ওখানে নেই, তারপর খিড়কি পুকুরের পাড়ে.... এখানেও নেই। শৈলেন পাগলের মতো ছুটছে। হঠাৎ ওর মনে হলো কুমুদদিঘির কথা। মাঠের মধ্যে পুকুরটা ওদের দুজনের বাড়ির মাঝামাঝি রাস্তার ধারে। দু একবার ওখানে দেখাও করেছে ওরা। রুদ্ধশ্বাসে সেদিকে ছুটলো শৈলেন। বোধহয় ঈশ্বর পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলো ওকে। সেখান গিয়ে চিৎকার করতে লাগলো শৈলেন পাগলের মতো, মৌলী মৌলী.... মৌ, আমার মৌ .....

পশ্চিম পাড় থেকে কেমন একটা গোঙানির শব্দ ভেসে আসছিল যেন। টর্চের আলোতে শৈলেন দেখলো একটা জামগাছের ডালে গলায় শাড়ি জড়িয়ে ঝুলছে মৌলী। মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ আসছে! সারা মুখে ভর্তি ফেনা। মৌলীর পা দুটো কাঁধে করে দাঁড়ালো শৈলেন। স্বপন গাছে উঠে শাড়ির বাঁধনটা খুলে দিলো। দিঘি থেকে জল এনে মুখে দিতে দিতে ঘোলাটে চোখ মেলে তাকালো মৌলী। কিন্তু এখনও অসাড়। যেন ঠিকঠাক জ্ঞান আসছে না। ফোনটা সাথেই ছিল শৈলেনের ‌। পাশের গ্রামের ট্যাক্সি ড্রাইভার বাচ্চুকে ফোনে ডেকে নিলো শৈলেন। তারপর তিনজনে ধরাধরি করে গাড়িতে তুলে সোজা নার্সিং হোম ‌। ভোরের দিকে জ্ঞান ফিরলো মৌলীর। ততক্ষণে মৌলীর বাবা মা এসে গিয়েছে। বাবার মুখ শুকনো। মা অঝোরে কাঁদছে! পাশে বসে শৈলেন আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। চোখ মেলেই দু চোখ দিয়ে দু ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়লো মৌলীর। ডাক্তার বাবু বললেন, পেশেন্ট এখন ঠিক আছে। আপনারা বাইরে যান। সন্ধ্যায় বাপের বাড়িতেই নিয়ে যাওয়া হলো মৌলীকে। মৌলীর  মা রান্নাঘরে। শৈলেন মৌলীকে জড়িয়ে ধরে বললো, "এমন করে শাস্তি দিতে চেয়েছিলে আমাকে মৌ?"

.... "না তো, মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম। একটা বাঁজা মেয়ের হাত থেকে। তুমি ঐশিকীকে বিয়ে করে সুখে সংসার করতে পারতে। মিছিমিছি আমাকে বাঁচাতে গেলে!"

শৈলেন মৌলীর মুখে হাত চাপা দিয়ে বললো," যা নয় তাই বলবে আমাকে মৌ! ঐশিকী আমার বোনের মতো। হ্যাঁ আমি ওকে খুব স্নেহ করি, ও নাচের প্রতি খুব ডেডিকেটেড বলে। তাছাড়া ও দীপ্তেন্দুক ভালোবাসে। আর রইলো বাকি তোমার মা হওয়া। তুমি না থাকলে আমার সারা পৃথিবী শূন্য মৌ। শত সন্তান দিয়েও যে সেই শূন্যতা ভরবে না। তুমি আমাকে এমন অগাধ শূন্যতায় ফেলে যেতে চেয়েছিলে!

আর একটা সারপ্রাইজ নিউজ তোমাকে গতকাল দেবো ভেবেছিলাম। কিন্তু তার আগেই তুমি...! যাক গে ওসব। আসল খবরটা বলি, আমি আমাদের দুজনের সংসার পাতার জন্য নতুন একটা ফ্ল্যাট কিনেছি। খুব বড়ো নয়। টু বি এইচ কে। তোমাকে এবার সেখানে নিয়ে চলে যাবো। তুমি আবার গানের চর্চা করবে।

মৌলী ক্ষীণ গলায় বললো, কিন্তু বাবা মাকে দেখবে কে? "

...."সে ভাবনা আমার। স্বপন আর ওর বউকে বাবা মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যাবো। এমনিতেই গরীব মানুষ। মাঠে ঘাটে খেটে অনেক কষ্টে সংসার চলে। একটা ভালো অ্যামাউন্ট দিলে ওরা রাজি হয়ে যাবে।" 


....."এতো রাত হলো তোমার?"

...... হ্যাঁ গো একটু চাপ ছিল। সামনেই একটা প্রোগ্রাম আছে তো। তোমার খবর কি? সামনের উইকে তো রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান তোমাদেরও। 

হ্যাঁ ঐ চলছে। এবারের মেয়েগুলো বেশ ভালোই। তবে আমার শরীরটা ঠিক যাচ্ছে না। 

.....কেন? কী হয়েছে মৌ? তোমাকে কতবার বলেছি রোজ রোজ তোমাকে ওখানে যেতে হবে না। এক একদিন রেস্ট নেবে। কথা শোনো না।

অনেক রাত হলো, চলো খেয়ে নিই। 

.....আজ খুব ক্লান্ত লাগছিল গো। দুপুরে যদিও মাসি খাবার করে দিয়ে গেছে। কিন্তু আমি রেস্ট নিতে গিয়ে ঘুমিয়েই পড়েছি। খাবার গরম করা আর হয়নি। 

......ও এই ব্যাপার। তুমি তো পোশাকও ছাড়োনি এখনও। যাও চেঞ্জ করে নাও। ফ্রেস হয়ে নাও। আমি এক্ষুনি সব গরম করে নিচ্ছি। 

.....না না তুমিও চেঞ্জ করো, দুজনে একসাথে সব করে নেবো।

হ্যাঁ তাই চলো। তাড়াতাড়ি ঘুমোতে হবে আজ। কাল সকাল থেকেই অনেক কাজ। রাতেও। কাল কিন্তু রাত জাগতে হবে।

 .. .....রাত জাগতে হবে মানে? বুড়ো বয়সে ধেড়ে শখ!

..... আমি জানি তুমি ভুলে মেরে দিয়েছো। কাল আমাদের বিয়ের উনিশ বছর হবে মনে নেই!

......হ্যাঁ গো, একদম ভুলোমনা হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। 


......কাল কিন্তু অফিস, নাচের স্কুল সবজায়গাতেই যেতে হবে আমাকে। অনেক কাজ আছে। কিন্তু তুমি বাড়িতে থাকবে। একটু রেস্ট নেবে।

..... না গো, বাড়িতে থাকতে আমার ভালো লাগে না। তাছাড়া দুপুর অব্দি তো থাকিই। ঐ বিকেল থেকে সন্ধ্যেটা একটু স্কুলে যাবো।


সন্ধ্যা সন্ধ্যাই ফিরে গেছে আজ দুজনে। একগাদা ফুল, মালা সব এনেছে শৈলেন। মৌ বকবক করছে,গেষ্ট তো ডাকোনি। সেলিব্রেট করবো তো দুজনেই। এতো কিছু আনার কি দরকার!

..... আমরা দুজনে মিলেই তো একটা পৃথিবী মৌ। তুমি কেন এটা এখনো মেনে নিতে পারো না? 

উনিশতম বিবাহ বার্ষিকী এটা মৌলীদের। মৌলী জানে গঙ্গাজলের মতো সুন্দর আর পবিত্র ভালোবাসা শৈলেনের। তবুও কোথাও যেন কাঁটা বিঁধে থাকে ওর। ওরা কলকাতায় আসার বছর দুয়েক পরে শ্বশুর মশাই যখন অন্তিম শয্যায়, তখন একবার শ্বশুরমশাইকে চোখের দেখা দেখতে গিয়েছিলো মৌলী। মৃত্যুশয্যায় শুয়েও অনিমেষবাবুর আক্ষেপ তীর বিদ্ধ করেছিলো মৌলীর হৃদয়। তারপরে শৈলেন অবশ্য আর কোনদিন বাড়ি আনেনি মৌলীকে। বাবাকে দেখতে একলাই আসতো। স্বপন আর স্বপনের বউ বেশ যত্নেই রেখেছিল শৈলেনের বাবা মা কে। শৈলেনের বাবা মারা যাওয়ার পরেও ওর মা কলকাতায় আসতে রাজি হয়নি। স্বপনদের কাছেই থেকে গেছে বলা যায়। শৈলেনের বোনও মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু উনি যাননি। বোন অবশ্য প্রায়ই মায়ের কাছে আসে,দেখা করে যায়। শৈলেনের বোনের বাড়ি বেশি দূরে নয়। 

বিছানাটা আজ মৌলী সাজিয়েছে। আর শৈলেন সাজাতে বসলো মৌলীকে। মৌলী বললো, ছাড়ো না এইবারটা। বুড়ি হয়ে গেলাম তো।

এখনও নতুন বৌয়ের মতো সাজবো!

.... শৈলেন বৌয়ের কপালে কল্কে আঁকতে আঁকতে বললো, কোনো শত্রুও বলতে পারবে না তুমি বুড়ি। আমার বউ তো এখনো ডানাকাটা পরী! 

..... তোমার এতো ভালোবাসার যোগ্য নয় যে আমি। কীই বা দিতে পারলাম তোমায় এই জীবনে?

.... কেন বুক উজাড় করা ভালোবাসা দাওনি আমাকে? না কি অন্য কাউকে দিয়েছো?

মৌলী এবার হেসে ফেললো, "এই কথাটা বললে মারবো এক কিল!"

.... আরে থামো থামো, কল্কেটা ঘেঁটে যাবে যে!

যাও এবার আয়নায় গিয়ে নিজেকে দ্যাখো।

..... মৌলীর যেন নিজেরই চোখের পলক পড়ছে না! মনে মনে ভীষন খুশী হয়ে বললো, কনে সাজালেও তোমার ভালোই রোজগার হবে কিন্তু। 

একটা বড়ো কেক রাখা হলো ড্রয়িংরুমে। মোমের মৃদু আলোয় কেমন মায়াবী লাগছে ঘরটা! নিবিড় আনন্দে মৌলীর চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। অনেকদিন পর একটা কবিতা বলতে ইচ্ছে করলো শৈলেনের...

"সমাজ সংসার মিছে সব

মিছে এ জীবনের কলরব,

কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে 

হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব!

আঁধারে মিশে গেছে আর সব!"


কেক কেটে দুজন দুজনকে খায়িয়ে দিলো। জানলার ফাঁক দিয়ে ততক্ষণে চাঁদের আলো এসে ফুল সাজানো বিছানার দখল নিয়েছে। দুজন হাত ধরে এসে বসলো বিছানায়। মৌলী শৈলেনের বুকে মাথা রাখলো।

শৈলেন বললো, বা রে আমি তো কবিতা শোনালাম। আমার গায়িকা বৌ একটা গান শোনাবেনা আজ আমাদের উনিশতম বাসর রাতে। মৌ গাইতে শুরু করলো....


"নীড় ছোটো ক্ষতি নেই.... আকাশ তো বড়ো 

হে মন বলাকা মোর, অজানার আহ্বানে চঞ্চল পাখা মেলে ওড়ো!"

ওর মিষ্টি কণ্ঠের ছোঁয়ায় বারান্দার টবের ফুলের কুড়ি গুলো চোখ মেলে তাকালো।





ডঃ দীপ্র ভট্টাচার্য

নীল শালুকের আলো

ডঃ দীপ্র ভট্টাচার্য


রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের প্রথম দিনটা ছিল খুব সাধারণ। ভিড়ভাট্টা, নাম ডাকা আর ঠাসাঠাসি একটা ক্লাসরুমের কোণে অনিরুদ্ধ বসেছিল একা।   
হঠাৎ পেছন থেকে এক মেয়ে এসে বলল, — “এই চেয়ারটা ফাঁকা তো?”
ছেলেটি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তখনই প্রথম দেখল মেয়েটিকে — ঘাড় অবধি কাটা চুল, কপালের একপাশে বিশ্রীভাবে উড়তে থাকা এক গোছা চুল, হাতে একটা নীল খাতা। নাম বলল — ঐন্দ্রিলা।
রসায়নের ক্লাসের পর ঐন্দ্রিলা বলেছিল, — “তুই দেখতে বইয়ের ভেতরের মতো। খুব চুপচাপ, কিন্তু একটা কিছু আছে। চিন্তার ধরণটা অন্যরকম।”
অনিরুদ্ধ সেদিন হাসেনি। একটু পরে বলেছিল,— “আর তুই? যা মনে হয়, তাই এরকম বলে ফেলিস?”
ঐন্দ্রিলা হেসে বলেছিল, — “হ্যাঁ, বলে ফেলি। বললে হালকা লাগে।”

সেই শুরু। দিন যেতে যেতে বন্ধুত্বটা জমে উঠল। কলেজের সিঁড়ির ধারে বসে বিকেলের আলোয় যখন নরম হাওয়া বইত, তখন তাদের দু’জনের গল্প চলত শেষ ক্লাসের ঘণ্টা পেরিয়ে। নীরবতা কখনও দীর্ঘ হত না। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সেন্ট্রাল লাইব্রেরি যাওয়া, তেলের কাগজে মোড়া ঝালমুড়ি ভাগ করে খাওয়া, একে অপরের বাড়ির গল্প করা, পরীক্ষার আগের রাতে ফোনে অঙ্ক বোঝানো — সব মিলিয়ে সেই বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে নিজের ভাষা খুঁজে নিল। 

ঐন্দ্রিলার নীল খাতাতে জায়গা পেল অনিরুদ্ধর ছোট ছোট কবিতা।
ঐন্দ্রিলা একদিন হেসে বলল, — “তোর লেখাগুলো আমি বারবার পড়ি। আমার মনে হয়, তুই আমাকে ভালোবাসিস।”
এবার অনিরুদ্ধ তাকিয়েছিল খুব গভীর করে। হেসে বলেছিল, — “এক ধরনের শালুক আছে — নীল রঙের, জলে ভাসে, কিন্তু জলকে ছুঁয়েও ভেজে না।”
ঐন্দ্রিলা চুপ করে ছিল সেদিন। 

তাদের ভালোবাসা ছিল খুব শব্দবিমুখ। একটা উষ্ণতা, একটা বোঝাপড়া, একটা গোপন হাসি —
যা বলা হতো না, কিন্তু অনুভব হতো। একবার, কলেজ ট্যুরে গিয়েছিল তারা। সবাই ঘুরে বেড়াচ্ছে, হৈ-হল্লা, সেলফি। আর তারা দু’জন হাঁটছিল লেকের ধারের নিরিবিলি একটা পাথুরে রাস্তা দিয়ে, চুপচাপ। পাহাড়ি বাতাসে ওড়াচ্ছিল ঐন্দ্রিলার চুল। লেকের ধারে অনিরুদ্ধ থেমে গিয়ে হঠাৎ একটা শুকনো ফুল কুড়িয়ে তার হাতে দেয়। — “এই ফুলটা নীল শালুক। আমি খুব ভালোবাসি।”
ঐন্দ্রিলা তাকিয়ে বলেছিল, — “তুই কি জানিস, ভালোবাসা কী?”
অনিরুদ্ধ বলেছিল, — “ভালোবাসা মানে হল... তুই যেন আমার আয়নার ভেতরে আমার আগের জন্ম হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস।”
এভাবেই কেটে যাচ্ছিল সময়। কলেজ পেরিয়ে তারা ভবিষ্যতের কথা ভাবছিল — কে কোথায় চাকরি পাবে, কোন শহরে থাকবে, কি করে জীবন গড়বে। 

বছরের শেষ দিকে হঠাৎ যেন বদলে গেল অনিরুদ্ধ। যে কথায় কথায় গেয়ে উঠত—রবীন্দ্রসঙ্গীত, কিশোরকুমারের গান—তা কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। বসে থাকে অনেকক্ষণ জানলার ধারে, ক্লাসে মন বসে না, হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে... যেন কিছু ভুলে যাচ্ছে।
ঐন্দ্রিলা প্রথমে ভেবেছিল—চিন্তা, নতুন চাকরির চেষ্টা, শহরের ব্যস্ততা—এসবেই হয়ত ছেলেটি ক্লান্ত। কিন্তু একদিন বিকেলে কলেজের বাইরে বেরোতে বেরোতেই অনিরুদ্ধ হঠাৎ পেছনের দিকে হেলে পড়ে গেল। সেই মুহূর্ত যেন সময়কে থমকে দিয়েছিল।
ঐন্দ্রিলা ছুটে গিয়েছিল, — “অনিরুদ্ধ! কি হল! চোখ খোল, প্লিজ…”
হাসপাতাল, টেস্ট, সিটি স্ক্যান—সব কিছু যেন ঝড়ের মতো এলো। রিপোর্ট হাতে পেয়ে ডাক্তার কেবল দৃষ্টি বদলালেন। তারপর বললেন নিচু গলায়: “ব্রেইন টিউমার। গ্লিওব্লাস্টোমা। স্টেজ থ্রি।” “প্রচুর কেমো, রেডিওথেরাপি। সময়? আঠারো থেকে আটচল্লিশ মাসের বেশি নয়। অপারেশন কঠিন। হয়ত সম্ভবও নয়।” তারপরে বাকিটা ছিল এক অসীম নৈঃশব্দ্য।

অনিরুদ্ধ নিজে প্রথমে কিছুই জানত না। ডাক্তার বলেছিলেন না বলার জন্য।কিন্তু সে ঠিক বুঝে গিয়েছিল — শরীরটা ফেলে আসা জাহাজের মতো ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। একদিন ওরা চুপচাপ দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে বসেছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে অনিরুদ্ধ বলেছিল, — “ঐন্দ্রিলা, যদি আমি না থাকি… তুই বাঁচতে পারবি তো?”
ঐন্দ্রিলা কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু ওর হাত ধরে বলেছিল, — “তুই থাকবি। আমার চোখে, আমার ভেতরে। আর… আমি তোর সাথে বাঁচব, প্রতিদিন।”

পরিবারে ঝড় উঠল যখন ঐন্দ্রিলা বিয়ের কথা বলল। মা চুপ করে রইল, আর বাবা স্পষ্ট বলল, — “নিজের জীবনকে এইভাবে নষ্ট করবি? ওর তো ভবিষ্যত নেই, ওর পাশে দাঁড়ানো মানে তোদের দু’জনেরই মৃত্যু!” কিন্তু ঐন্দ্রিলার ভেতর তখন অন্য এক স্পন্দন। ভালোবাসা এক আত্মিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে ফিরে দাঁড়িয়েছে দৃঢ় হয়ে।
বিয়ে হলো — মণ্ডপ নয়, মালা বদল নয়। শুধু দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে, পুরোহিতের ঠান্ডা স্তবপাঠ,
দু’জনে একে অপরকে বলেছিল, “এই জীবনের যেটুকু আছে, সেটুকুই পুরোটুকু।” আর পাশে ছিল গঙ্গার জল, আর এক অদৃশ্য বসন্ত।

বিয়ের পরের জীবনটা ছিল লড়াইয়ের। ঘরে কেমোর ঘ্রাণ, মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাওয়া, বমি, অসহ্য মাথাব্যথা,  ফ্যামিলির সঙ্গে বোঝাপড়া— ঐন্দ্রিলা রান্না করত, হাসপাতালে নিয়ে যেত, রাত জেগে অনিরুদ্ধর কপালে হাত রাখত। সেই সময়, সংসারের চাপে, অনিরুদ্ধ যেন একবার নিজেকে টেনে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল। এক রাতে খুব দুর্বল কণ্ঠে বলেছিল, — “ঐন্দ্রিলা, এখনো সময় আছে। চাকরি কর, জীবন শুরু কর। আমাকে ভুলে যা।”
ঐন্দ্রিলা তখন অনিরুদ্ধর কপালে হাত বুলিয়ে বলেছিল, “ভুলে যাওয়ার জন্য তোকে ভালোবাসিনি।
জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন মানুষ কাউকে ধরে, তখন সেটা দায় নয়—ভালোবাসার প্রকৃতি।” অনিরুদ্ধ চুপ করে চোখ বন্ধ করেছিল সেদিন। তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল, নরম বালিশে।

কোন এক সন্ধ্যায় তারা দু’জনে বসেছিল বারান্দায়। আকাশে সূর্য ডোবার মুখে, হালকা হাওয়া বইছে। অনিরুদ্ধ তখন বলেছিল: “তুই তো পড়াতে পারিস, শেখাতে পারিস। একটা ছোট স্কুল খোল। ঠিক এই শহরে, যেখানে তুই তৈরি করবি নতুন চোখ।”
ঐন্দ্রিলা একটু হেসে বলেছিল, — “স্কুল খুলব? এই পরিস্থিতিতে?”
অনিরুদ্ধ কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিল, — “এই পরিস্থিতিই তো জীবনের। বসন্ত তো এমনই—ফুল ফোটে, পাতা ঝরে, আবার গাছ বাঁচে।”
সেই রাতে, যখন অনিরুদ্ধ ঘুমিয়ে পড়েছিল ক্লান্ত শরীরে, ঐন্দ্রিলা ডায়েরিতে লিখেছিল—
“এই নদীটাকে পার হতে হবে। হাতে হাত রেখেই, না হলেও, মনে চোখ রেখে। আমি শুধু চাই, একটা জীবন—যা ওর চোখে গড়া।”

কোনো কোনো পথ একা হাঁটতে হয় না। ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে তা হেঁটে চলে… একটি অরণ্যের ভিতর দিয়েও। ঐন্দ্রিলা কাজ শুরু করল স্থানীয় এক ছোট স্কুলে—অস্থায়ী শিক্ষক হিসাবে।
সকাল আটটা থেকে দুপুর দুটো, অঙ্ক শেখায়, মাঝেমধ্যে ইংরেজিও। ঘরে ফিরে রান্না, অনিরুদ্ধের ওষুধ, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কেমোথেরাপির দিন গুনে রাখা। 

ঘরটা যেন সময়ের এক গোলকধাঁধা হয়ে উঠল— যেখানে সকালে আলো আসে, দুপুরে অসহ্য ক্লান্তি, রাতে কখনও যন্ত্রণা, কখনও বালিশের পাশে চুপচাপ ডায়েরি।
একদিন হঠাৎ অনিরুদ্ধ বলল, — “ঐন্দ্রিলা, তুই ক্লাসে যেভাবে পড়াস, সেভাবে কেউ শেখায় না।
শুধু তথ্য নয়, তুই তোদের ভাবতে শেখাস।”
সে দিন বিকেলে, বারান্দায় বসে একসাথে চা খেতে খেতে অনিরুদ্ধ কাগজে আঁকছিল— ছোট্ট একটা স্কুলের ডিজাইন। তিনটে ক্লাসরুম, একটা খোলা উঠোন, কাঠের বেঞ্চ, কাগজের ফুলে সাজানো দেয়াল। নাম দিল, “আলোরেখা”।
"এটা একটা স্কুল না। এটা সেই জায়গা, যেখানে অন্ধকার গলে গিয়ে আলো হয়ে ওঠে।" — বলেছিল অনিরুদ্ধ। ঐন্দ্রিলা মাথা নেড়েছিল। সে তখনও জানত না, এই নামটাই একদিন শহরের বাতাসে ভেসে বেড়াবে। শুধু জানত, এই মুহূর্তে ওর পাশে বসে থাকা ক্লান্ত ছেলেটির স্বপ্নটাকে বড় করতে হবে।

অনিরুদ্ধ নিজের যন্ত্রণার ভেতর থেকেও প্রতিদিন কিছু করে যেত। ছাত্রদের জন্য প্রশ্ন বানাত, ছোট গল্প লিখত, কবিতায় অঙ্ক শেখানোর কৌশল ভাবত। একদিন বলল, — “ক্লাসগুলোকে তুই ভাগ করবি, আলাদা আলাদা নামে। জাস্ট ‘ক্লাস ওয়ান’, ‘ক্লাস টু’ না। কিছু মনে রেখে নাম দে—যেমন ‘তর্পণ’, ‘প্রথম ধারা’, ‘উৎস’।"
ঐন্দ্রিলা হেসে বলেছিল, — “তুই নিজে লিখে দে, প্লিজ।”
অনিরুদ্ধ লিখেছিল। পেন ধরতে তখন কষ্ট হতো। তবু আঁকত, লিখত। যেন সে আর ঐন্দ্রিলার মধ্যে সেতু তৈরি করছিল কাগজের উপর দিয়ে।

স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত নিল ঐন্দ্রিলা সেই শীতকালে। ভাড়া নিল পুরনো একটা বাড়ির নিচতলা।
দুটো ঘর, একটা বড় উঠোন, এক কোণে একটা বাগান।
প্রথম সপ্তাহে এসেছিল তিনজন ছাত্র। দু’জন প্রথম শ্রেণি, একজন তৃতীয়।
দুজনের মা এসে বলেছিলেন, — “ম্যাডাম, পয়সা তেমন দিতে পারব না। ওরা শুধু একটু মানুষ হোক।”
ঐন্দ্রিলার চোখে জল এসেছিল। সে জানত, এই স্কুল শুধু শিক্ষার নয়, ভালোবাসার পুঁজি দিয়েই তৈরি হবে।

জীবন তখন নড়বড়ে, কিন্তু সরল। ঐন্দ্রিলা প্রতিদিন ক্লাস নিত, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে হুইলচেয়ারে বসা অনিরুদ্ধর পাশে বসে গল্প করত ছাত্রদের নিয়ে। এক সন্ধ্যায় যখন বলল, — “আজ সায়ন নামে একটা ছেলে পড়তে এল। বাবা মা নেই। আঁকা ভালোবাসে। লিখতেও পারে।”
অনিরুদ্ধ বলল, — “তুই ওকে আঁকার খাতা দে। ওর আঁকা দিয়ে তোর স্কুলের লোগো বানাব।”
পরদিন সায়নের আঁকা দিয়েই ‘আলোরেখা’র লোগো তৈরি হলো। তাতে ছিল একটা নীল শালুকফুল, আর তার চারদিকে ছড়িয়ে পড়া আলো।

একবার হঠাৎ ঝড় উঠেছিল—বাইরে না, ভিতরে। একদিন ঐন্দ্রিলা ক্লাসে পড়াতে পড়াতে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায়। রক্তচাপ লো, পেটে খাবার নেই, রাতে ঘুম নেই।
ডাক্তার বললেন, — “ওর শরীর ক্লান্ত। কিন্তু মন ভয় পায় না।”
সে রাতে অনিরুদ্ধ বলেছিল খুব শান্তভাবে, “তুই যদি নিজের খেয়াল না রাখিস, তাহলে আমি তো হেরে যাব।”
ঐন্দ্রিলা তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। হাত ছুঁয়ে বলেছিল, — “আমি হাঁটব। যতক্ষণ তুই আমার ভেতরে আছিস, আমি হেরে যাব না।”

বছর ঘুরে গেল। ‘আলোরেখা’তে তখন ৪৭ জন ছাত্র। ঐন্দ্রিলা পড়ায়, নতুন শিক্ষক নিয়েছে দু’জন, একটা চা-ওয়ালাও আসে প্রতিদিন। অনিরুদ্ধ হুইলচেয়ারে বসে ঘোরে। বাড়িওলা পাশের বন্ধ বড় হলঘরটা বিনাভাড়াতেই খুলে দিয়েছেন। ওটাই এখন তাদের স্টুডিও এপার্টমেন্ট। পাকাপাকি ভাবে এখানে চলে এসেছে ওরা, এই বাড়িতে। অনিরুদ্ধ পর্দার আড়াল থেকে শব্দ শোনে, বাচ্চাদের হাসির আওয়াজ, ক্লাসে পড়ানোর আওয়াজ। সে বুঝতে পারে—তার অস্তিত্ব মুছে যাচ্ছে, কিন্তু ঐন্দ্রিলার হাতে জীবন তৈরি হচ্ছে।

এক বসন্তের সকালে, যখন জানলা দিয়ে রোদ এসে পড়ছিল ঘরে, অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে বলেছিল, “তুই জানিস? আমি তোর চোখ দিয়ে এখন এই বসন্ত দেখি। যখন স্কুলের উঠোনে ফুল ফোটে, তুই তাদের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকিস। আমি সেখানেই থাকি।”
ঐন্দ্রিলা কিছু বলেনি। চুপ করে অনিরুদ্ধর হাতে হাত রেখেছিল। আর মনে মনে বলেছিল, "তুই চলে গেলেও, আমি তোর তৈরি পথেই হাঁটব। তুই যে শীত পেরিয়ে বসন্তে পৌঁছতে চেয়েছিলি, আমি সেই বসন্তকে ধরে রাখব।”

জীবনের এমন কিছু দিন থাকে, যেগুলোর জন্যই আগের সবদিন পার করে আসা হয়। আর কিছু রাত, যেগুলোর জন্যই জীবনের সমস্ত আলো নিভে গেলেও একটা প্রদীপ জ্বলে থাকে… এক কোণে। অনিরুদ্ধের শরীর তখন প্রায় শয্যাশায়ী। কিন্তু ‘আলোরেখা’ তখন শহরে ছড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দ আলোয়। তিনজন নতুন টিচার এসেছে, পড়ুয়ার সংখ্যা একশো ছাড়িয়েছে। 

হঠাৎ একদিন — এক পুরনো বন্ধু ফিরে এল। নাম তার — সৌগত। কলেজে ওরা একসাথে পড়ত। এখন দিল্লির এক মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে চাকরি করে। সেই সৌগতই প্রথম বলল, — “ঐ, তুই আমাদেরকে কিছু বলিসনি কেন? অনিরুদ্ধর ব্যাপারে… তোদের স্কুলের ব্যাপারে…”
ঐন্দ্রিলা কিছু বলতে পারেনি। শুধু চুপ করে বসেছিল।
সৌগত বলেছিল, — “তুই তোদের স্বপ্ন বানাচ্ছিস, আমরা পাশে না থাকলে, বন্ধু কাকে বলে?”
তারপর একে একে এলো — নীলাভ, সায়ন্তন, জয়শ্রী, রুহি, অদ্রিজা… সবাই কলেজের পুরনো বন্ধুবান্ধব। কেউ সপ্তাহান্তে এসে ক্লাস নেয়, কেউ ওয়েবসাইট বানায়, কেউ ফান্ডিং জোগাড় করে, কেউ দেয় বিজ্ঞাপন— “প্রত্যেক শিশুর শিক্ষা হোক আলোরেখা দিয়ে” এই স্লোগানে শহরের অলিগলিতে উঠে যায় পোস্টার। অনিরুদ্ধ, শুয়ে শুয়ে, এদের হাসি শোনে, কচিকাঁচাদের গলা শোনে। সেই হাসির মধ্যে সে তার নিজেরই স্বপ্নের প্রতিধ্বনি খুঁজে পায়।

এক সন্ধ্যায় সৌগত এসে বলল, — “তোদেরকে একটা কিছু দেখাতে চাই।” ল্যাপটপে খুলল এক ভিডিও। ছোট্ট ডকুমেন্টারি — ‘আলোরেখা: দুটি প্রাণের ভালোবাসা থেকে এক আশার জন্ম’। ভিডিওয় আছে অনিরুদ্ধ আর ঐন্দ্রিলার ছবি, ছোটদের পড়া, খেলা, আর বন্ধুদের মুখ।
অনিরুদ্ধর চোখ বেয়ে নামল জল। হেসে বলল, — “তোরা তো আমাকে অমর করে দিলি রে... আমি তো এই ছোট স্কুলটার মধ্যেই বেঁচে থাকব…”
ঐন্দ্রিলা কাঁধে মাথা রাখল। বলল না কিছুই। সে জানত, সময় ফুরিয়ে আসছে।

শেষ দিনটা ছিল বসন্তেরই একটা সকাল। হলুদ কুড়ির মত রোদ, জানলায় দুলছে পাতাহীন ডালের ছায়া। বাচ্চারা স্কুলে গান গাইছে: — “আলো আমার আলো ওগো…”
অনিরুদ্ধের নিঃশ্বাস হালকা, কিন্তু শান্ত। চোখ আধখোলা, ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি। ঐন্দ্রিলার হাত ধরে বলল: “আজ তুই একটু জোরে পড়া নিস। আমার শোনার ইচ্ছে খুব… বাচ্চাদের বলিস, আমি আজ ক্লাসে আসব না, কিন্তু কাল আবার আসব।”
ঐন্দ্রিলা কাঁদল না। সে শুধু বলল: “তুই তো রোজ থাকিস… তুই বসন্ত হয়েই থেকে যাবি।”
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে গেল। হাওয়ার দোলা একটুখানি থেমে গেল। প্রকৃতি যেন জানত—একটি আলোকমানব বিদায় নিচ্ছে।

তার অন্ত্যেষ্টি ছিল একেবারে সাদাসিধে। বন্ধুরা মিলে স্কুলের উঠোনের দেওয়ালে একটা ছবি লাগাল। নীচে একটি ফলক: “অনিরুদ্ধ ঘোষ — এক আলো হয়ে থাকা বন্ধু, প্রিয়তম, শিক্ষক”
বাচ্চারা এসেছে। ঐন্দ্রিলা বলল, “আজও ক্লাস হবে কিন্তু।” গলা স্বাভাবিক। চোখে তীব্রতাও নেই। কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন জেগে আছে। বাচ্চাদের বলল, — “আজ আমরা শিখব, কীভাবে মন ভালো রাখতে হয়। যখন কেউ আমাদের ছেড়ে চলে যায়, তখন তারা কোথায় থাকে, জানো? তারা থেকে যায়... আমাদের মধ্যে, আমাদের চোখে, আমাদের কাজে।”

কয়েক বছর পর— ‘আলোরেখা’ এখন একটি রেজিস্টার্ড ট্রাস্ট। দুটো শাখা, চল্লিশজন শিক্ষক, অনেক ছাত্রছাত্রী। ঐন্দ্রিলা মাঝেমধ্যে বসে, অনিরুদ্ধর ডায়েরি খুলে দেখে। এক পাতায় লেখা— “ভালোবাসা মানে হাতে হাত ধরা নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে সে একদিন তোমার অনুপস্থিতিতেও আলো হয়ে বাঁচে।” ঐন্দ্রিলা স্কুলের উঠোনের ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য চোখ বোজে। বাতাসে হালকা ধুলো, তার মধ্যেই শুকনো শালুকের গন্ধ। দূরে পাহাড়ের মতো ঢেউ খেলানো ছেলেমেয়েদের কণ্ঠস্বর। 

ঐন্দ্রিলা চোখ মেলে তাকায় ওপরে—আকাশ অদ্ভুত নীল, আর মাঝখানে ভেসে আছে একফালি মেঘ, যেন ধীরেধীরে ভেসে যাচ্ছে কোথাও… তার কানে হঠাৎ— একটা পরিচিত কণ্ঠ, নিচু গলায় বলে ওঠে— “আজ ক্লাসটা একটু বেশি সময় নিস। আমি পাশের জানলাটা দিয়ে দেখব।”  “আমরা যারা থেকে যেতে পারি না, তারা হাওয়া হয়ে ফিরে আসি। যারা ভালোবাসে, তারা তা ঠিক টের পায়।”
ঐন্দ্রিলা জানে, কোনো জানলায় কেউ নেই। তবু দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর ধীরেধীরে হেঁটে যায় ক্লাসরুমের দিকে। কিছু বলে না। শুধু একটিবার চোখ বুজে নীলশালুকের আলোর লোগোটা দেখে নেয়। তারপর ক্লাস শুরু করে—একটা নতুন পাঠ, নতুন আলোয়।
 

 
 






পরের পাতায়...

অন্য পাতায় যেতে চান?

আপনার পছন্দের বিভাগে যেতে এখানে ক্লিক করুন
  • প্রথম পাতা
  • Privacy Policy
  • Terms and Conditions

আক্ষরিক

82748 38787

Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.

Powered by GoDaddy

This website uses cookies.

We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.

Accept