
দিকশূন্যপুর
সোনালী চৌধুরী
১.
সোহিনী গড়িয়া থেকে সোনারপুরগামী অটোটা কে হাত দেখিয়ে থামায় মহামায়াতলার মোড়ে। হাতে বাঁধা ঘড়িতে একবার চোখ ফেরায় দ্রুত, প্রায় নটা কুড়ি। বসন্তের শেষ লগ্নে তাপ বাড়ছে সূর্যের, এই সকাল নটাতেই বেশ চড়া রোদ উঠেছে।রাঁধুনি আচমকা কামাই করায়, সব কিছু সামলে দশ মিনিট দেরি হয়ে গেছে তার আজ ইস্কুল বেরোতে। সোনারপুর থেকে নটা চল্লিশের শিয়ালদা নামখানা টা পাবে কিনা সন্দেহ। ইস্কুলে দশটা পঞ্চাশের মধ্যে না পৌঁছলে লেটমার্ক পড়বে হাজিরা খাতায়। প্রতিমাদির কামাই লেগেই থাকে। কিসের যে এতো ছুটির দরকার হয় কে জানে? নিজের মনেই গজগজ করতে করতে অটোটার সামনের বাঁ দিকের সিটে কোনোক্রমে বসে সোহিনী।ব্যাগ, শাড়ি আর অটোচালকের অবাঞ্ছিত নৈকট্য সামলাতে সামলাতে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে সে। ট্রেনটার অবস্থান এখন ঠিক কোথায়,আধুনিক অ্যাপের মাধ্যমে মুঠোফোনেই দেখা যায়। সেই অ্যাপ জানান দিচ্ছে ট্রেন এই মুহূর্তে ঢাকুরিয়া ছেড়ে যাদবপুরের কাছাকাছি । কামালগাজি মোড়ের সিগনালে অটো আটকালে, আজ কপালে দুঃখ আছে। এইচ এম পবিত্র বাবুর গম্ভীর মুখটা উঁকি দিয়ে যায় টুক করে। আজ আবার নাইনের ইংরেজী প্রজেক্ট জমা নেওয়ার কথা। সোহিনী না গেলে প্রজক্টে জমা পড়বেনা। আবার অন্য তারিখ ঠিক করতে হবে। বিস্তর ঝামেলা সবদিকেই। ইস্কুল থেকে ফিরে রাতের রান্না,বাবানের হোমওয়ার্ক সব তারই অপেক্ষায় থাকবে, সঙ্গে শয্যাশায়ী শাশুড়িমার ~ প্যারালিসিস আর সুগারের সমস্যা। ডাক্তার চেক আপ এ মাসে করাতেই হবে ওনার। এই যাহ! এই মাসে আর ছুটি কোথায়? দোলের ছুটি শেষ। এদিকে ডাক্তার চেক আপ না করালেই নয়। ব্লাড রির্পোট গুলো নেওয়া বাকি। ধুর কোন দিকে যে যাবে সে? ভালো লাগেনা আর! হাজার চিন্তা জট পাকাতে থাকে সোহিনীর মাথায়। আপাতত সময়ে ট্রেন ধরতে হবে। দূর থেকে কামালগাজি মোড়ের সিগনালের রক্ত চক্ষু লাল থেকে সবুজ হতে দেখে খানিকটা হাঁপ ছাড়ে সে। "দাদা একটু তাড়াতাড়ি চলুন না, ট্রেনটা ফেল হয়ে যাবে নাহলে", সোহিনীর কাতর আবেদনে একবার টেরচা চোখে তাকায় অটোচালক। সে চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ উদাসীন। নির্বিকার উওর আসে, " আমি অটোটা চালাতে পারি শুধু। তাতে আপনি ট্রেন পাবেন কি পাবেন না ভেবে আমার কি লাভ দিদি?" অর্থাৎ কর্ম করো, ফলের আশা করোনা। "বাব্বা!", মুখ ফসকে বলে ফেলে সোহিনী। পাশ থেকে আর কোনও উওর আসেনা। অটোচালকের শ্যেন দৃষ্টি রাস্তার দুধারে সম্ভাব্য যাত্রী খুঁজতে ব্যস্ত, অটোর গতিও তথৈবচ। সামনের ডান পাশের সিট এখনো খালি, না ভরা পর্যন্ত গতি বাড়বেনা।
ফেনার মতো বুজবুজ করে উঠতে থাকা বিরক্তিটা চাপতে আশেপাশে চোখ ফেরায় সে। শেষ বসন্তের মনোরম একটা সকাল দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে আসন্ন গ্রীষ্মের আভাসে। দখিনা বাতাসে আরামদায়ক শীতলতার বদলে এখন ঈষদুষ্ণ একটা ভাপ টের পাওয়া যাচ্ছে। চারিদিকে গাড়ির হর্ন, কালো ধোঁয়া, বিজ্ঞাপনী বোৰ্ড আর বিচিত্র কোলাহলে নিমজ্জিত আদ্যপান্ত কেজো একটা সকাল। প্রতিদিনের পরিচিত, ক্লেদাক্ত,ধূসর দৃশ্যপট। এর মাঝেই শিমূলতলা মসজিদের পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছটা কেমন বেমানান ভাবে লালে লাল, মেঘমুক্ত নীলাম্বরের প্রেক্ষাপটে একটা খাপছাড়া প্রশ্ন! মসজিদের পাশের বাড়িটায় বেগমবেলিয়ার ঝাড়েও বসন্তের স্পর্শ, থোকা থোকা রাণী কাগজফুলে ঢেকে গেছে তার শরীর। পথের ধুলোয় মলিন, অবহেলায় থেঁতলে পড়ে রয়েছে কিছু কোমন লাল, বেগুনি পাঁপড়ি, মানুষ ব্যস্ত পায়ে মাড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে। অত সময় কোথায় যে দেখবে ? সোহিনী ও কী আর তেমন করে লক্ষ্য করে ব্যস্ত শহরে বসন্ত কেমন চুপিসাড়ে হানা দেয়? অতর্ককিতে আনমনা করে তোলে? বেখেয়ালে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠতে গিয়ে আচমকা সোহিনীর চোখ পড়ে যায় আটোটার রিয়ারভিউ মিররে। নিজের মুখে সময়ের ভাঙচুর চোখ এড়ায় না তার। ক্লান্ত লাগছে তাকে বড়। এই আয়নাতে বড্ড স্পষ্ট আর কাছাকাছি, সে আর আয়নার ঐ পারের মানুষটা। অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নেয় সোহিনী। কোনো নৈকট্যে সে অভ্যস্ত নয় বহুদিন, বিশেষত একা একজন মানুষের নিজের সাথে নিজের যে নিভৃত আলাপচারিতা তা থেকে বহুদিন বিরত সে। বিরত না পলায়নরত? এরকম পালিয়ে পালিয়ে কতদিন বেড়াচ্ছে সে? তা ঠিকঠাক হিসেব করতে গেলে প্রায় বছর চার! এইরকম এক মার্চেই তো সেবার...!
"নাহ ভাবতে চাইনা ওসব আর। মনে নেই, কিছুই মনে নেই আমার!" কানে ইয়ারপড গুঁজে ইউটিউবে এস্রাজে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুরু করে সোহিনী। এস্রাজের সুরে কি যেন আছে! অব্যক্ত সব যন্ত্রণা নিমেষে লাল পলাশের মত ফুটে ওঠে। বেহাগের মূর্ছনায় সৃষ্ট ইন্দ্রজালে, ঘর্মাক্ত ঘোর বাস্তব বিরক্তিকর সকালটায় হঠাৎই কোনো উদাস চৈতী পূর্ণিমার "মাতাল সমীরণ" বয়ে চলে সোহিনীকে ছুঁয়ে। ধুঁকতে থাকা, যানজটে জেরবার সোনারপুর স্টেশন রোড এমশ পিছিয়ে পড়ছে তখন।
২.
"ও দিদি পেট কাটা গলিতে তে নামবেন না? ভাড়াটা দিন, লাইন ধরতে হবে আমায়। ট্রেন ঢুকছে আপনার!" অটোচালকের হেঁড়ে গলার ডাকে চমক ভাঙে সোহিনীর। ধড়মড় করে ব্যাগ খুলে ভাড়া বের করতে করতে দেখে ট্রেন আসছে। তারপর? তারপর " পেট কাটা গলির" শর্টকাট ধরে ছুট ছুট, প্রায় হৃৎপিন্ড হাতে করে লাইন পেরোনো আর অবশেষে প্ল্যাটফর্মের ঢাল বেয়ে দু নম্বরে পদার্পণ। হাঁপাতে হাঁপাতে দেখা, উল্টো দিক থেকে তখন মন্দ্র গতিতে রেল লাইন ধরে এঁকেবেঁকে এগিয়ে আসছে হলদে মাথাওয়ালা একটা কালচে সবজেটে সরীসৃপ। পূর্ব রেলের শিয়ালদা - নামখানা ডেইলি লোকাল। গেটের দলা পাকানো ভীড়টা ঠেলে তাকে এক ধাক্কায় কামরার ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। টাল সামলাতে সামলাতে সে দেখে আজ কামরায় মোটামুটি ভীড়।
" আমি এইদিকে সোহিনী", একটা স্তিমিত কিন্তু দৃঢ় গলার পরিচিত ডাক ভেসে আসে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে অনুপম রোজ গেটের ডানদিকে যেখানটায় থাকে, আজ তার উল্টোদিকের সিটের সারির কাছে জানালার পাশটাতে দাঁড়িয়ে আছে। অনুপমের পাশে কোনোক্রমে দাঁড়ানোর মত সামান্য জায়গা এখনো রয়েছে। সোহিনী ভিড় কাটিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায় দ্রুত, কাঁধের ভারি ব্যাগটা বাড়িয়ে দেয় অনুপমের দিকে। ওটা ওপরের বাঙ্কে অভ্যস্ত হাতে তুলে দেয় অনুপম, তারপর সরে এসে জানালার পাশের কোনটা ছেড়ে দেয় সোহিনী কে, ভীড়ের গুঁতো থেকে কিছুটা বাঁচোয়া। বসার সিট এই ট্রেনে পাওয়া দুর্লভ। বেশির ভাগ যাত্রী শিয়ালদা থেকে উঠে, জয়নগর, লক্ষীকান্তপুর বা একেবারে নামখানাতেই নামে। সোহিনীর ইস্কুল দক্ষিন বারাসাতে। অনুপমের তার একটা স্টেশন পরে, বহড়ুতে। ট্রেনে মিনিট চল্লিশ লাগে পৌঁছতে। অনুপম ওঠে সোনারপুরের দুটো স্টেশন আগে, নিউ গড়িয়া থেকে।
"ব্যাগটা এতো ভারী কি করে হয় আপনার? কি টিফিন দিল প্রতিমাদি, স্পেশাল কিছু নাকি?"
" ধুর! টিফিনের জন্যে ব্যাগ ভারী হতে যাবে কেন? ইলেভেনের খাতা রয়েছে। জমা দেবো। আর প্রতিমাদি আজ আসেনি। খালি কামাই আর কামাই ওর।"
" ওহ! রান্না করে এলেন নাকি?"
"হুঁ।" বুড়ো শাশুড়ি আর পাঁচ বছরের ছেলেকে হোম ডেলিভারীর ভরসায় ছেড়ে দিয়ে ঝাড়া হাত পা হয়ে থাকা যায় না আপনার মতো।কথাগুলো অনুপমকে বলতে গিয়েও থমকে যায় সোহিনী। "আপনাদের খাতা জমা দেওয়ার তারিখ দিয়েছে?", প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বলে সোহিনী।
" আগে শুনি কি রাঁধলেন দিদিমণি?" অনুপমের গলায় প্রচ্ছন্ন ঠাট্টার আভাস। সোহিনী রাগ রাগ চোখে তাকায় অনুপমের দিকে।
" মেয়েমানুষ মানেই হেঁসেল আপনাদের কাছে, তাই না?" শাড়ির আঁচল দিয়ে আলতো করে মুছতে থাকে ঘাড়ে, গলায় জমতে থাকা স্বেদ বিন্দু।
" আর আপনি রেঁধে প্রশংসা পেতে ভালোবাসেন না একটুও, বলুন?"
"মোটেই না ", প্রতিবাদ করতে গিয়ে হেসে ফেলে সোহিনী। প্রতিমাদি না এলে সোহিনী যে মোক্ষম ঝামেলায় পড়ে তা অনুপমের অজানা নয়,তবুও ওকে রাগিয়ে যে কী আনন্দ পায় কে জানে! কপালে ছড়িয়ে পড়া অবাধ্য চুলগুলো ঠিক করতে গিয়ে অনুপমের চোখে চোখ পড়ে যায় সোহিনীর। শান্ত চোখে তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। মুখে একটা হালকা হাসির আভাস। " খুব স্ট্রেসড?" মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে অনুপম।
সোহিনী মুখ নত করে থাকে। নিজের অবিন্যস্ত জীবনের ভারে অনুপম কে ভারাক্রান্ত করে তুলতে চায়না সে কখনোই, তবুও অনুপম কোথাও একটা রয়েই গেছে। কিসের যে সে জোর জানেনা সোহিনী।
"ওহ! আপনার প্রতিমাদির বিরহের ঠেলায় ভুলেই যাচ্ছিলাম, নিন ধরুন, মাসিমার রির্পোট গুলো। ", সোহিনীর দিকে একটা মোটাসোটা সাদা খাম বাড়িয়ে দেয় অনুপম। "কাল সন্ধ্যের দিকে গিয়ে নিয়ে এলাম।"
"আমি আনতামখন, আপনাকে ব্যস্ত করলাম শুধু শুধু। "
" ও কিছু না। আমিই তো চাইলাম বিলটা আপনার কাছে। কখন আর যাবেন আপনি? ইস্কুল থেকে ফিরতেই তো ছটা হয়ে যায়। একটা বুড়োমানুষ আর একটা বাচ্চা সারাদিন কাজের লোকের ভরসায় থাকে। বুঝি কিছুটা।" ইস্কুলের পরেও যে দু ব্যাচ টিউশানি করে সোহিনী, সে খবর জানা নেই অনুপমের।
" তবুও আপনি কেন শুধুশুধু বারবার...?"
" সবসময়ই কী ছাত্রদের এত খটোমটো প্রশ্ন করেন ম্যাডাম?"
" সরি, ঠিক ওভাবে বলতে চাইনি", মাঝপথে কথা থেমে যায় অপ্রস্তুত সোহিনীর।
" কি জানি কেন যে আপনাকে এমন বিরক্ত করি বারবার ? অকাজের মানুষ তো, আর কীই বা করতে পারি?", অনুপমের চোখে হাসির ঝিলিক।
"ধুর! তাই বল্লাম আপনাকে?", ফের রেগে ওঠে সোহিনী।
" ধুর, ধুর! একেবারে যা তা এক পাগলের পাল্লায় পড়েলেন আপনি", বলতে বলতে চাপা হাসিটা এবার ছড়িয়ে পড়ে অনুপমের মুখে চোখে। নিঃশব্দে হাসতে থাকে সে।
সোহিনী অনেক কিছু বলবে মনে করেও, কিছুই বলে উঠতে পারেনা শেষ পর্যন্ত, না চাইতেও হেসে ফেলে।
" এই যে আপনি রাগ করতে গিয়ে ভুল কর হেসে ফেলবেন ,ওটুকু দেখব বলে। মা বলতেন, 'আমাগো দ্যাশে এরে কয় আকাম, আকাম বোঝেন?" মাথা নাড়ে সোহিনী।
" মানে বিশুদ্ধ অকাজ", হাসতে হাসতে বলে অনুপম।
" কথার পিঠে কথা চাপান কেন এমন? কী থেকে কী!"
" আপনার কি ধারণা কী থেকে কী হচ্ছে? আচ্ছা পরে বলবেন। আপাতত চলুন স্টেশন আসছে, এগোনো যাক", সোহিনীর ব্যাগটা নামাতে নামাতে বলে অনুপম।"
" বিলটায় টাকা বাকি ছিল প্রায় হাজার খানেক। আমি আপনাকে ফোন পে করে দিচ্ছি।"
" ও চাপ নেই। আপনার এখন অসুবিধা থাকলে পরে দেবেন। আর দিন পাঁচেক পরেই তো মাইনে হয়ে যাবে।" সোহিনী নিরবে তাকিয়ে থাকে অনুপমের দিকে এক পলক। তারপর ভীড়টা ঠেলে গেটের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় দুজনকেই। এই স্টেশনেই নামবে সোহিনী, পরেরটায় অনুপম। জীবনপুরের পথিকেরা যেমন সব নেমে যায় এক এক পূর্ব নির্ধারিত গন্তব্যে,এক একটা আস্ত জীবনের পারে, অবিকল সেইরকম। কখনো সে নামা হয় ধীরেসুস্থে, সময় মতো আর কখনো দারুণ অসময়ে, আচমকাই। ঠিক যেমন সোহিনী কে পেছনে ফেলে নেমে গিয়েছে একজন, স্বেচ্ছায়, অপ্রত্যাশিত এক নিষ্ঠুর বাঁকে।
৩.
সৌরভ চলে যাওয়ার পর ফ্ল্যাটের বিপুল অঙ্কের লোন, বাবানের প্রাইভেট ইংরেজী মিডিয়াম ইস্কুলে পড়াশেনার খরচ, শাশুড়ির চিকিৎসা, সংসারের আরো সাত সতেরো খরচা সবই সোহিনী কে একা সামলাতে হয় এখন। সৌরভের নেওয়া বিভিন্ন ঋণ শুধতে গিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে ব্যারাকপুরের সৌরভদের পৈতৃক বাড়ি টুকুও। সৌরভ বেঁচে থাকতে এত কিছু ভাবতে হয়নি তাকে। বেসরকারী কোম্পানির উচ্চপদস্থ চাকুরে ছিল সে, মোটা অঙ্কের মাইনে, জাগতিক সুখ উপচে পড়েছিল তাদের সংসারে। আর এখন খরচা কুলোতে শাশুড়িমার পেনশনেও হাত দিতে হয় সোহিনী কে। সৌরভ থাকতে একটাকাও খরচা করতো না মায়ের পেনশান থেকে। দুটো কাজের লোক রাখা বিলাসিতা, অথচ লোক না রেখে উপায় নেই সোহিনীর।
শুধু ইস্কুলের চাকরিটুকু ছিল বলেই ভেসে যায়নি সে। চাকরিটা সোহিনী তার নিজস্ব তাগিদেই করেছে বরাবর , বিয়ের আগে থেকেই। তাদের সাংসারিক খরচার একটা নির্দিষ্ট অংশও সে বরাবরই সৌরভ কে দিত। বিয়ের পর সৌরভ প্রথম প্রথম প্রবল আপত্তি করলেও, পরে দাম্পত্য শান্তির খাতিরে আর কিছু বলতনা। তার স্ত্রীর অভিমান বোধ যে খুব সূক্ষ্ম তারে বাঁধা, বুঝতে অসুবিধা হয়নি ওর। "তুমি সংসারে টাকা দিতে চাইলে দাও, যদিও দরকার নেই । তুমি বরং বাবানের জন্যে জমাও কিছু। টাকাটা বড় কথা নয়, তুমি পাশে থেকো। বাবান আর তোমার মুখ চেয়েই তো সব লড়াই।" বিলাসবহুল বহুতলে কেনা সখের ফ্ল্যাটের আকাশ খোলা বারান্দায় বসে কথাগুলো সোহিনী কে এক সন্ধ্যায় বলেছিল সৌরভ। "এত ভেবোনা তো! আর যাই হোক, আমি আছি, এইটুকু নিশ্চিত"। সৌরভের হাত দুটোকে নিজের হাতে টেনে নিয়ে বলেছিল সোহিনী। সেই ফাল্গুনী সন্ধ্যায় সজল, মনকেমন করা একটা হাওয়া দিচ্ছিল খুব। সঙ্গে রিমঝিম বৃষ্টি। অকাল বর্ষণে স্নাত ছাদ বাগানের জুঁই, হাসনুহানারা ফুটে উঠেছিল দুজনের যৌথ স্বপ্নের মত। শিরশিরে ঠান্ডা বাতাসটা কেমন নেশার মতো ঝিমঝিমে ছিল, খুব ঘুম পাচ্ছিল সোহিনীর। নিজের গায়ের ফুলছাপ মেরুন ওড়নাটা সৌরভের গায়েও জড়িয়ে দিয়েছিল সোহিনী। তারপর ওর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল পরম নির্ভরতায়। এর মধ্যে যে অন্যরকম কিছু নিগূঢ় সত্য থাকতে পারে বলে টের পায়নি সোহিনী।
সেই অকাল-বৃষ্টি সিক্ত বসন্ত সন্ধ্যা, দুজনের নিভৃত আলাপ আর দখিনা হাওয়ায় ভেসে আসা হাসনুহানার মাতাল সুগন্ধ এখন পূর্ব জন্মের ভ্রষ্ট স্মৃতি বলে মনে হয় সোহিনীর, বিস্মৃতির অতলে তা চিরতরে হারিয়ে গেলে নিষ্কৃতি পাবে সে। যা গেছে তা একেবারে যাক।
অথচ প্রত্যাশিত ছিল এই যে, সেই সন্ধ্যার পর সৌরভ আর সোহিনীর সাজানো সংসার আলো করে বাবান ধীরে ধীরে বেড়ে উঠবে আর দুজনের মান- অভিমান,আদর- খুনসুটির নরম আঁচে উষ্ণ দাম্পত্য সুখ উথলে পড়বে ।এইরকম কথাই তো ছিলো তাদের। কথা ছিলো ফেসবুকে বছর বছর বিয়ের জন্মদিনের ছবিতে বন্ধুদের শুভেচ্ছা বার্তায়," পারফেক্ট কাপল "," মেড ফর ইচ আদার" ইত্যাদি লেখা থাকবে। এই সব কিছুই তো প্রত্যাশিত ছিলো, ছিলো না? কিন্তু জীবনের সৌরভ বা সোহিনী বা পৃথিবীর কারোর প্রত্যাশা মতো হওয়ার দায় নেই, অতএব এ ক্ষেত্রেও সে তা হয়নি। এ তো নিতান্তই সহজ হিসেবে। সোহিনী বরাবরই অঙ্কে কাঁচা তো জীবন কি করবে?
৪.
আচমকাই এবং খুব দ্রুত জীবন বদলে নিয়েছিল তাঁর প্রেক্ষাপট। দুহাজার কুড়ির মার্চে করোনা, লকডাউন আর বেসরকারী চাকরির অনিশ্চয়তার ঘূর্ণিঝড়ে তখন সারা দেশব্যাপী এক টালমাটাল পরিস্থিতি। সেই উত্তাল সময়ের নির্দিষ্ট সূত্র মেনেই সৌরভ ও বদলে যেতে থাকল সোহিনীর চোখের সামনেই। হাজার কাজেও হাসিমুখে থাকা মানুষটা বেশির ভাগ সময়েই তখন গুম হয়ে থাকত, সিগারেট খাওয়াও মারাত্মক ভাবে বেড়ে গিয়েছিল সেই দিনগুলোতে। দিনে প্রায় তিন প্যাকেট। এমনকি বছর খানেকের বাবানের কান্নাকাটি, আধো আধো ডাকে পর্যন্ত বিরক্ত হতো সৌরভ। " নিয়ে যাও আমার কাছ থেকে"। অবোধ শিশু তাও আঁকড়াতে যেত সৌরভকে। জোর করে ছাড়িয়ে নিলে, কেঁদে ভাসাত। সোহিনীর এখন মনে হয় সেই সময় থেকেই হয়তো গোপনে ছেলের মায়া কাটানোর চেষ্টা করছিল সৌরভ। বহু রাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে সৌরভকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে দেখত সোহিনী, পাশে খোলা ল্যাপটপ। "তুমি ঘুমোবেনা গো?"
"আর ঘুম! তুমি তো ঘুমোচ্ছিলে বেশ, কি হলো?"
" আর তুমি?"
" জানিনা, যাও না এখন এখান থেকে।"
"কি হয়েছে? এমন করে কথা বলছো কেন?"
" কিছু হয়নি। তুমি যাও। "
" অফিসে কিছু হয়েছে? কিছু বলেছে তোমায়? কি বলছিলে তখন ফোনে নোটিশের কথা? কিসের নোটিশ?"
"সব জানো যখন ন্যাকামো করছো কেন? টারমিনেশন লেটার দিয়েছে। আমার চাকরিটা আর নেই সোহিনী।" কথাগুলো দাঁতে পিষে পিষে বলেছিল সৌরভ, যেন কোনো আহত আর ক্রুদ্ধ পশু গর্জন করছে রাতের অন্ধকারে।
"চাকরি একটা গেলে আবার পাবে। এক্সপিরিয়েন্স আছে..."
"স্টুপিডের মতো কথা বলোনা। সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লকডাউনের এই বাজারে কে দেবে আর একটা চাকরি আমায়? মার্কেটের অবস্থা খুব খারাপ", সোহিনীর কথার মাঝেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল সৌরভ।
" আমার চাকরিটা তো আছে গো, হয়ে যাবে দেখো।", সৌরভ কে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিল সোহিনী। সেই শেষ বার।
"সরো তুমি! আশি লাখের লোনে কত ই এম আই দিতে হয় জানো? কিছুই কি জানো তুমি? যে আরামে থাকো, তার পেছনে কতটা রক্ত জল হয় আমার, আন্দাজ আছে?", ধাক্কা মেরে সোহিনী কে সরিয়ে দিয়েছিল সৌরভ।
" আমি তো বসে নেই সৌরভ। আমার হাইস্কুলের পোস্ট গ্রাজুয়েট শিক্ষিকার সরকারী চাকরিটা নেহাৎ ফেলনা নয়! অন্তত এমন হুটহাট করে চলে যাবেনা। সরকারী চাকরির চেষ্টা করতে পারতে তুমি,কে মানা করেছিল? চাকরিটা টিকে থাকত, অন্তত।"
" মাস্টারির মাইনেতে এই ঝাঁ চকচকে এসি ফ্ল্যাটে থেকে কুড়ি লাখি গাড়িতে চেপে যে ঘোরা যায়না তা বোঝার বুদ্ধি আছে তোমার ?
"আমি কবে এইসব দাবী করেছি তোমার কাছে? কি হয়েছে বলো তো?", আহত সোহিনী অবাক হয়ে গিয়েছিল সৌরভের অসংযত কথায়।
" কেন, তোমার ছেলের জন্যে সেরা ডাক্তার, বিদেশী জামাকাপড়, দামি বেবিফুড, নার্স, এসবের কোনটা তোমার টাকায় কুলোবে ?"
"বাবান কি আমার একার ছেলে নাকি"?
"হ্যাঁ , এরপর থেকে ধরো তাই। আমি আর এই বোঝা টানতে পারছিনা।"
" মুখ সামলে কথা বলো সৌরভ! তোমার চাকরি যাওয়ার দায় আমার বা বাবানের নয়। আমরা বোঝা? আমি তো সংসার খরচা দিই তোমায়! তোমার টাকায় থাকি আমি? ঠিক আছে এতই যখন বোঝা আমি বাবানকে কে নিয়ে চলে যাবো। পথে তো আর বসতে হবেনা।" আহত, অভিমানী সোহিনী আঘাতের বদলে প্রত্যাঘাত ফিরিয়ে দিয়েছিল। ভালোবেসে অপমানিত হলে, আহত মানুষ এর থেকে বেশি আর কী বা করতে পেরেছে কবে? সৌরভ কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকেছিল সোহিনীর দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, "চলে যাবে তুমি সোহিনী? বেশ, তোমাদের যেতে হবেনা। আমি পারিনি যখন আমিই চলে যাবো ", অদ্ভুত শান্ত আর শীতল গলায় কথা গুলো বলেছিলো সৌরভ।
" তুমি চলে যাবে মানে?"
" জানিনা! সব মানে বোঝাবার দায় নেই আমার। তোমায় জোড় হাত করছি, আমায় একটু একা থাকতে দাও, প্লিজ, প্লিজ", শেষের দিকে সৌরভের গলায় ছিল খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা নি:সঙ্গ মানুষের দিশাহীন হাহাকার। অভিমানের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সোহিনী পর্যন্ত পৌঁছেছিল কি সে ডাক?না শুনতে পায়নি সোহিনী। একদম পাশেই অথচ গোটা একটা জীবনের দূরত্বে দাঁড়িয়েছিল যে সৌরভ! তাহলে কি করে শুনবে সোহিনী? দুজনের সহজ ভালোবাসার মাঝে তখন অহং বোধের অলঙ্ঘনীয় এক প্রাচীর। কোনো পক্ষেরই ক্ষমতা হয়নি তা পেরোনোর। দুজনেই ভেবেছিল সে একাই ভালোবেসেছে আর অন্যজন শুধু নিজেকে ভালোবেসে গেছে।
এরপর যে স্টাডিতে বসে অফিসের কাজ করতো সৌরভ, সেখানেই থাকা শুরু করলো দিনরাত। সারা দিন সে ঘরের দরজা বন্ধ, খাওয়ার সময়টুকু ছাড়া ঘর ছেড়ে প্রায় বেরোতনা ও। সোহিনীর সাথে কথাও বন্ধ। খালি বাবান মাঝে মাঝে "বাব্বা বাব্বা" বলে দরজাটার বাইরে হামাগুড়ি দিয়ে সৌরভকে খুঁজতো।
খাওয়ার টেবিলে সোহিনী অবাক হয়ে দেখতো কেমন কালি পড়েছে সৌরভের দুই চোখের কোলে! চিরকালের ফিটফাট, ধোপদুরস্ত মানুষটা কেমন যেন আলুথালু। গালে না কামানো দাড়ি, হাতে বড়, বড় নখ আর গায়ে তামাক পোড়া, ঘেমো গন্ধ। চোখদুটো মোবাইলে নিবদ্ধ। সৌরভ নয়, ঘা খাওয়া একটা পশু যেন! সৌরভও দেখত হয়ত সোহিনীকে, জানেনা সোহিনী। তারপর থালা বাটি চামচের টুংটাং, ভাত, ডাল, সবজি অথবা রুটি, চিকেন ইত্যাদি। এরপর তাও বন্ধ হলো। নিজের ঘরেই খাবার খেতো সৌরভ। এমনকী শয্যাশায়ী মায়ের ঘরেও যাওয়া ছেড়ে দিল। "বাবু, বাবু" করে ডেকে ডেকে একেক সময় কেঁদে ফেলতেন সুপ্রভা।
"বাবুর কি হয়েছে বৌমা? তোমাদের কোনও অশান্তি হয়েছে? বলো না আমায়। ও বৌমা কথা কও না কেন মা?" সুপ্রভার ব্যাকুলতার কোনো যুতসই জবাব ছিলোনা সোহিনীর কাছে।
"ও কিছু না মামনি, কাজের চাপ চলছে ওর।"
"না বউমা, বাবু ভালো নেই। আমি টের পাই। তুমি দেখো গো বাপ মরা ছেলেটাকে আমার। বাবু বড্ড জেদী আর অভিমানী ।" সোহিনী মুখ নিচু করে থাকত, চোখের জল দেখলে বুড়ো মানুষ যদি ভেঙে পড়ে একেবারে?সোহিনী একাই দেখবে শুধু সৌরভকে ? আর সৌরভ? জেদ আর অভিমান নেই সোহিনীর? মানুষ নয় সে?
এই দমবন্ধ পরিস্থিতিতেই আরো মাস ছয়েক কাটলো। তারপর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ল দেশে, এবার আরো কুটিল, আরো কালান্তক। সোহিনীদের ফ্ল্যাটের ইএম আই এর শেষ চারটে কিস্তি বাকি পড়েছে তখন , ব্যাঙ্ক থেকে ঘন ঘন ফোন আসছে, ব্যাঙ্কের এজেন্ট তাগাদা দিতে দু দিন বাড়িতে এসে দেখা করে গিয়েছে সৌরভের সাথে। সেভিংস তলানিতে এসে ঠেকেছে সৌরভের।
" আমার এফ ডি গুলো ভাঙিয়ে আপাতত শোধ করে দাও তুমি। পরে না হয়...", একটা মরিয়া চেষ্টা করেছিল সোহিনী শেষ বারের মতো দুজনের মধ্যেকার দেওয়ালটা ডিঙোবার।
"তুমি ভাবলে কী করে বউয়ের দয়ায় বাঁচবো আমি? কোনোদিন একটাকা চেয়েছি তোমার কাছে?"
"চাইতে হবে কেনো? আমার উপার্জনে তোমার অধিকার নেই?"
" কি করে থাকবে? তুমি তো মনে করো তুমি শুধু তোমার টাকায় থাকো।আমার কোনও কন্ট্রিবিউশান নেই। সেই টাকায় এখন ভিক্ষে দিচ্ছে?" তীব্র একটা জ্বালা ধরানো চোখে প্রশ্ন করেছিল সৌরভ।
" ভিক্ষে?!" এরপর দুজনের মাঝে পড়ে ছিল শুধু শ্বাসরোধকারী স্তব্ধতার মহামারী, কারণ যে কোনো কথাই তখন আসলে ছিল শান দেওয়া ছুরি। তার ধারালো ফলা অনবরত সুযোগ খুঁজছে কখন চোরা আঘাতে ছিন্নভিন্ন করবে অপরজনকে। সোহিনীর মনে হতো ওরা দুজনেই যেন একটা অন্ধকার ঘরে আটকে পড়েছে। একে অপরকে খুঁজতে গিয়ে খালি আঘাত করে চলেছে। অথচ দুজনেরই লক্ষ্য ছিল হাত ধরে অন্ধ কুঠুরির দরজাটা কোথায় খোঁজার।
শেষে যেদিন ধৈর্য্য হারিয়ে বাবানকে সপাটে এক চড় মারলো সৌরভ, জ্যাঠা শ্বশুর কে জানাতে বাধ্য হল সোহিনী। এই জেঠু প্রায় ছেলের মতো মানুষ করেছেন সৌরভ কে। সোহিনীর ডাকে বুড়ো মানুষ করোনার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই, ভাইপোর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। সৌরভ স্টাডির দরজাটুকুও খোলেনি।
" বউমা তোমায় আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছি। সৌরভের চিকিৎসা করাতে হবে। আমার মনে হয় ও অবসাদে আক্রান্ত। এত দিন জানাওনি কেন তুমি"?
" সৌরভ রাগ করবে বলে বলতে পারিনি। আমার সাথে ঠিক করে কথা বলেনা অনেকদিন হলো। কিন্তু ইদানিং ও যেন কেমন অস্বাভবিক আচরণ করছে। বাবান কেও মেরেছে একদিন।"
" দাদুভাই কে মেরেছে? সৌরভ? ঐটুকু দুধের শিশু! বাবুর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? কাল ডাক্তার সেনের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি আমি। আজ উঠি।"
৫.
কালের নিয়মে সেই কাল এসেছিলো বটে কিন্তু সৌরভ সব শ্রুশুষা, সব আশ্বাসের বাইরে তখন। সোহিনীর ইস্কুলে সেদিন ছিল মার্চ মাসের ছাত্রদের করোনা কালীন বিশেষ মিড ডে মিল বিতরণের দিন। মাসে তখন একদিন শুধু এই কাজেই ইস্কুল যেতে হতো। পঠনপাঠন দীর্ঘকাল বন্ধ। ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায়, বাড়ির গাড়ি করেই গিয়েছিল ঐদিন সোহিনী।
ফেরার পথে চোখ বন্ধ করে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল সে আর ঠিক তখনই মোবাইলটা বেজে উঠেছিল। স্ক্রীনে সুমিতাদির নম্বর। " হ্যালো সুমিতাদি, বাবান খেয়েছে দুপুরে?"
সুমিতাদি সে কথায় গা না করে বলে উঠেছিলেন " দিদি ব্যাঙ্কের লোক আবার এসেছিল। অনেক ডাকলাম, দাদাবাবু সকাল থেকে একবারও দরজা খোলেনিকো"৷
" দরজা খোলেনি? কেন সকালে খায়নি?"
" না গো। সেই কথাইতো কইচি। দিদি আমার ভালো ঠেকছে না গো।"
"ভালো ঠেকছে না মানে?"
"শরীল খারাপ হলো কি না কে জানে? ইদিকে মাসিমা অস্থির করছে। সুগারের ওষুধ খেয়েছে কিন্তু দুপুরে কিচ্ছুটি খায়নি। । আমার কেমন ভয় করচে বৌদি। তুমি কোতায় এখন?"
"আমি আসছি। তুমি রাখো এখন।" ফোনটা কেটে দিয়ে সাথেসাথে সৌরভের মোবাইলে ফোন করেছিল সোহিনী। সুইচড্ অফ। একটা দলা পাকানো আতঙ্কে বারংবার কল করতে থাকে সে। একটা যান্ত্রিক স্বর বারবার তাকে জানায় , "আপনার ডায়াল করা নম্বরটি বন্ধ আছে। জিস নাম্বার পে আপনে কল কিয়া হ্যায় ও অভি বন্ধ হ্যায়। দা নাম্বার ইয়ু হ্যাভ কলড ইজ সুইচড্ অফ।" একটা ক্লান্তহীন লুপে কথাগুলো কানে বেজে চলেছিল সোহিনীর।
গাড়ি থেকে পড়িমড়ি করে নেমে, কোনওক্রমে হলঘরটা পার হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে স্টাডির দরজায় বারবার ধাক্কা মেরেছিল সে। "সৌরভ, এই সৌরভ, শুনছো? একবার দরজাটা খোলো প্লিজ, প্লিজ!" সৌরভ দরজা খোলেনি। দরজা শেষে এসে ভেঙেছিল পুলিস। প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ ফোন করেছিল সম্ভবত।
কাঠকাঠ দুপুরে সিলিং ফ্যান থেকে, ডিভানের ঠিক একটু ওপরে ঝুলে ছিলো সৌরভ। গলায় পেঁচানো সোহিনীর সেই মেরুন ফুলছাপ ওড়নাটা। ভাঙা ঘাড়, বের হয়ে আসা কালেচে জিভ আর চোখে জমাট বাঁধা রক্ত নিয়ে সৌরভ সটান চেয়েছিল সোহিনীর দিকে। না চোখ বন্ধ ছিলনা, সে যে যাই বলুক। সোহিনী জানে সৌরভ দেখছিল সোহিনী কে, সোহিনী কেই শুধু। সে দৃষ্টিতে ছিল অনন্ত এক আগুন। এত আগুন যে সোহিনী পলকে ছাই হয়ে গেলো। "তোমরা থাকো, আমিই চলে যাবো", মৃদু বাতাসে সৌরভের পা দুটো কেমন মাধ্যাকর্ষনের সূত্র মেনে দুলছিলো আর ঠিক এই কথা কটাই অশ্লীল ভাবে নেচে নেচে ঘুরছিলো সৌরভকে ঘিরে। বাক্যটা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল কালো কালো আলাদা অক্ষরে, ভেঙে গিয়ে আবার নতুন ভাবে পুর্নগঠিত হচ্ছিল। "থাকো তোমরা, চলে যাবো আমিই। আমিই যাবো চলে, থাকো তোমরা। তোমরা থাকো, তোমরা থাকো, তোমরা থাকো, যাবো শুধু আমি"।
শুধু পেছনে থেকে যাওয়ার, বেঁচে যাওয়ার, হুট করে এক দুপুরে বেবাক মরে যেতে না পারার যে গুরুতর অপরাধ সোহিনী করে ফেলেছে, তার কি শাস্তির বিধান আছে আইনে, সোহিনীকে কেউ বলেনি। সৌরভ কি তার ঐদিনের না থাকার সুযোগটুকুই নিপুন ভাবে ব্যবহার করেছিল? আচ্ছা যদি সোহিনী সেদিন থাকতো, অন্যরকম কিছু পরিণতি হলেও কি হতে পারতো? জানেনা সোহিনী। সৌরভ কি অভিমানে চলে গেলো না আজীবনের শাস্তি দিয়ে গেল তাকে? কোনটা করতে চেয়েছিল ঠিক? বহু নির্ঘুম রাত শুধু এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছে সোহিনী। মেলেনি কোনও উওর বা প্রতিদানে সামান্য ঘুম।
তবে ঐ প্রশ্নগুলোর উওর বাদে অন্য অনেক কিছু অবশ্য বলা হয়েছিল সোহিনী কে। যেমন, "তোমার তো উচিত ছিল সৌরভের যত্ন করা। এত বড় কান্ড ঘটলো টের পাওনি? ও তুমি ছিলেই না? কেন করোনাতে তো ইস্কুল বন্ধ, তুমি গিয়েছিলে কেন? কি এমন দরকার ছিল? তুমি পাশে থাকলে হয়তো ছেলেটা বাঁচতো। এই কি যাওয়ার সময়?" শেষ বাক্যটুকুর অভিমুখ কার দিকে বোঝেনি সোহিনী। কার যাওয়া উচিত হয়নি? সৌরভের না সোহিনীর?
"ও মা! স্বামী স্ত্রী আলাদা ঘরে থাকতে বুঝি? সে কি কথা?!"
"চাকরি গিয়েছিল, এ্যাঁ ? কতদিন বেকার বসেছিল বাড়িতে? বল কি! বছরখানেক? বৌ যতই চাকরি করুক, পুরুষ মানুষের রোজগার না করলে চলে? তোমার টাকায় সংসার চলতো তাহলে বলো? মাস খরচা নিতো নাকি তোমার কাছে? তুমি নিজেই দিয়েছ সবসময়? কেন? স্বামীর টাকা কি তোমার টাকা নয়?"
"বাচ্চাটা তো আয়ার হাতেই মানুষ হয়ে গেল। মায়ের যত্ন কি জানলনা। আহারে ঐ টুকু দুধের শিশু, বাপটাও অকালে চলে গেল! কিছু মনে করো না , তুমি চাকরি করা মডার্ন মেয়ে, নিজের রোজগার, তবুও নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকলে হয়? সংসার কী পুতুল খেলা রে ভাই? হাড়মাস কালি করে করতে হয়, তোমাদের সব আলগা - আলগা, ছাড়ো- ছাড়ো ভাব।"
" মেয়ে মানুষের এত গুমোর কিসের শুনি? ঘরের মানুষ গলায় দড়ি দিলে, একদিনের অবহেলাতে কি আর এই অবস্থা হয়েছে বাপু? তোমাকে একা বলছিনা বৌমা, আমার নিজের মেয়েটাও অমন!"
"থামো তো মা! সব আউটডেটেড কথা! তোমরা প্রফেশোল হেল্প সীক করলেনা কেন দিদিভাই? সৌরভদা খুব লোনলি ফিল করেছিল নিশ্চয়। ডোন্ট মাইন্ড বাট তোমাদের ফিজিকাল রিলেশন নরমাল ছিল? ঐটাই আসল। ঐটা ঠিক থাকলে কি আর কেউ সুইসাইড করে? শুনলাম তো আলাদা শুতে তোমরা। বাই দ্য ওয়ে, কিছু মনে করোনা, তুমি কি বাইরে কোথাও ইনভলভড্? তাই সময় দিতে পারোনি সৌরভদা কে? না? বাট আই ডাউট জানো! এখন সবার একটা, দুটো অ্যাফেয়ার থাকেই। নরমাল ব্যাপার। তোমার এক মেল কলিগ কে তো দেখলাম, থানা, হাসপাতালের ঝক্কি সব পোহালো। একটু অড কিন্তু। অনুপম না শুভম কি যেন নামটা বলল।" ইত্যাদি, ইত্যাদি এবং ইত্যাদি! সোহিনী দেখল সমাজের উৎসুক চোখ শকুনের মতো জরিপ করছে তাকে। চেঁছে ছেনে জেনে নেবে তার ব্যক্তিগত সবটুকু। সে চোখে বেকার স্বামী আর চাকুরে বউ দুজনেই সমান অপরাধী।
ছেলের সুইসাইড মানতে পারেননি সোহিনীর শাশুড়ি।না মানতে পারারই কথা। মাসখানেক পরে একটা স্ট্রোক হয় ওনার, ডান দিকটা পড়ে যাওয়ার সাথে, সাথে কথাও জড়িয়ে যায় তার। তবে মুখে বলতে না পারলেও সুপ্রভার চোখের চাহনি পড়তে অসুবিধা হয়নি সোহিনীর। ঐটুকু ঘেন্না আর তার প্রতি আক্রোশ তো সোহিনীর প্রাপ্য ছিলো। আর কাকেই বা দোষ দেবেন তিনি সোহিনী ছাড়া? কে আছে পড়ে ? এক ঘরে বাবানকে নিয়ে নির্ঘুম সোহিনী আর অন্য ঘরে তার নিদারুন শোকের আগুনে দগ্ধ হতে হতে, শয্যায়শায়ী সুপ্রভা, এ ভাবেই পাশাপাশি থেকে গেল দুজনে, দুজনের মাঝের যোগাযোগের মূল সূত্র টুকু ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও। হয়তো দুজনের কারোরই আর অন্য কোথাও যাওয়ার ছিলনা বলেই! সুপ্রভার নিরুপায় প্রয়োজন আর সোহিনীর অপরাধবোধ শক্ত গিঁটে বেঁধে রাখল দুজনকে।
৬.
পরপর দুটো ক্লাস নিয়ে এসে ঢক ঢক করে আধ বোতল জল খেলো সোহিনী। এই পিরিয়ড টা অফ আছে তার।ব্যাগ থেকে শাশুড়ির রিপোর্ট গুলো বের করে চোখ বুলিয়ে দেখতে শুরু করে।। সুগার, কোলেস্টেরল মোটামুটি কিন্তু ইউরিক অ্যাসিড হাই।
" কি দেখছো এত মন দিয়ে? ব্যস্ত নাকি তুমি, একটু দরকার ছিলো ", সোহিনী দেখে ইভা দি এগিয়ে আসছে তার দিকে।
" এই মামনির রিপোর্ট গুলো দেখছিলাম একটু। "
"ও আচ্ছা। না ভাই তুমি বলেই এতো সহ্য করছো। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে নতুন করে কিছু ভাবতো। কীই বা বয়েস তোমার? সমস্ত জীবনটা পড়ে রয়েছে।"
" ওসব কথা থাক না ইভাদি। তোমার কী জরুরি দরকার আছে বলছিলে?"
" হ্যাঁ আমার ছেলেটার ক্লাস নাইন হলো জানো তো? একটা ভালো অঙ্কের মাস্টার দরকার। তুমি অনুপমকে বলো না একবার আমার ছেলেকে যদি পড়ায়?"
" কিন্তু আমি যতদূর জানি অনুপম স্যর তো টিউশানি করেন না আর তাছাড়া তুমি নিজেই তো বলতে পারো ?"
" আহা! জানিতো টিউশান পড়ায় না, তাই তোমায় বলতে বলছি। আমার বলা আর তোমার বলা এক হলো নাকি? তুমি বললে কি আর না করতে পারবে?" সোহিনী দেখে ইভাদির ঠোঁটে একটা চটুল হাসি খেলা করছে। ইঙ্গিত টা বুঝতে অসুবিধে হয়না সোহিনীর। গা টা হঠাৎ গুলিয়ে ওঠে।
" ও তুমিই বলো দিদি। আমার ক্লাস আছে এখন। আসি।", ইভাদিকে আর কথা বাড়াতে দেয়না সোহিনী।
তার আর অনুপমের তথাকথতি সম্পর্ক নিয়ে আকারে ইঙ্গিতে আলোচনা নতুন নয়। একটা নামহীন টানের নাম কি সম্পর্ক? সোহিনী জানতে চায়নি আর অনুপম ও স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি আজ অবধি। 'আপনি' সম্বোধনের সংযত, নিরাপদ দূরত্ব ছাড়িয়ে 'তুমি' ডাকের ব্যবধানটুকু ও অতিক্রম করা হয় নি তাদের। কখনো একসাথে কোনো সিনেমা দেখা বা কোনও কফি শপের নিভৃতিতে আলাপ করা হয়নি। কোনও সুখী মুহূর্তের স্বপ্ন দেখেনা সোহিনী। সে সৌরভের কাঠগড়ায় যাব্বজীবনের আসামী। আসামীর ত আর কিসের অধিকার স্বপ্ন দেখার বা সামান্যতম ভালো থাকায়?
তবু সোহিনীর হাজারটা প্রয়োজনে, বিপদে, অনুপম নিরবে পাশে থেকে গেছে ছায়ার মতো। কলিগ, সহযাত্রীদের বাঁকা কথা, চাপা হাসি উপেক্ষা করেই। রোজকার আসা যাওয়ার পথের আলাপ গড়িয়েছে সোহিনীদের ফ্ল্যাট পর্যন্ত।
সৌরভের সদ্য চলে যাওয়ার সময় সেই ভয়ঙ্কর দিগুলোতে সোহিনীর পাশে থেকে থানা, হাসপাতাল আর ব্যাঙ্কের সমস্ত কাজ প্রায় একা হাতেই সামলে দিয়েছিল অনুপম। সুপ্রভার স্ট্রোকের সময় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল সেই অনুপমই।
তবে হাসপাতালে ডিসচার্জের দিন একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটেছিল যার জন্যে সোহিনী এখনো লজ্জিত বোধ করে। বাড়ি ফিরে তখন সুপ্রভাকে হুইল চেয়ার থেকে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছিল অনুপম। হঠাৎই অনুপমকে অশক্ত হাতে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় সুপ্রভা, চোখে প্রচন্ড রাগ আর মুখে অসংলগ্ন আওয়াজ, ঠোটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা। ভাগ্যিস সে সব জান্তব শব্দ বোধগম্য হয়নি কারোর, তাই রক্ষে পেয়েছিল সোহিনী, যদিও ওদের অর্থ নিয়ে কারোর মনে সংশয় ছিলনা। সোহিনীর হাত দুটোকে শাঁড়াশির মত শক্ত আঙুল দিয়ে ধরে রেখেছিলেন সুপ্রভা আর অনুপম কে দরজার দিকে যেতে ইশারা করছিলেন বারবার। অনুপম অবশ্য শান্ত ভাবে সুপ্রভাকে বিছানায় শুইয়ে, ওষুধপত্র সুমিতাদি কে বুঝিয়ে আর বিল পত্তর সোহিনীর হাতে দেওয়ার পরেই গিয়েছিল। আসার সময় হাসিমুখে সুপ্রভা কে বলে এসেছিল, " আসি মাসিমা। আপনার দরকারে নিশ্চিন্তে ডাকবেন। ভালো থাকবেন। " সুপ্রভা বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখছিল অনুপমের সেই হাসি হাসি মুখে চলে যাওয়া।
বাইরে দরজায় শাড়ির আঁচল ধরে খুঁটছিলো সোহিনী, মুখ নিচু।
" আমি রিয়েলি সরি অনুপম বাবু। মামনি কেন যে অমন করলো তখন! আপনি এত সাহায্য করেছেন, তবুও উনি মেনে নিতে পারছেন না। আমি ক্ষমা চাইছি।"
" কি আর করা যাবে, মাসিমার বোধহয় আমার চাঁদ মুখটা ঠিক পছন্দ হয়নি", নির্বিকার হাসি হেসে উওর দিয়েছিল অনুপম। সোহিনী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থেকেছিল অনুপমের দিকে। "
" একেবারে বাক্যি হারা হয়ে যাওয়ার মত কি বল্লাম? সত্যিই তো হ্যান্ডসাম নয় আমি!",
"সবটাই কি বিরাট এক ঠাট্টা আপনার কাছে?"
"একদমই না, আপনাকে খুব সিরিয়াসলি নিই আমি।"
" আজকাল আর বুঝিনা জানেন জীবনে কোনটা ঠাট্টা আর কোনটা নয়। আমার জীবনের চেয়ে বড় ঠাট্টা আর কি আছে? যাকে যেমন জানি বলে বিশ্বাস করি, দেখি সে আদৌ সেরকম নয়।"
স্মিত হেসে অনুপম বলে," জেনে কি করবেন ম্যাডাম? কারোর তো দায় নেই অপনার ভাবনার মতো করে হওয়ার, ঠিক কিনা ? শুনুন বুড়ো মানুষের কথা গায়ে মাখবেন না। পুত্রশোকের আমি আপনি বুঝিটা কি? আজ রাগ করছেন, কাল স্নেহ করবেন। উনি তো আমায় ঠিক চেনেন না ।"
" আমরা কেই বা কাকে চিনি?
" মুখ শুকনো আপনার, সারাদিন খাওয়া হয়নি মনে হয়, তাই আপাতত মুখে কিছু দিন গিয়ে। অনেক লড়াই সামনে পড়ে আছে আপনার। এখনো চেনার অনেক বাকি। আমি আসি এখন।"
চার বছর ধরে এরকম আলগোছে করা ঠাট্টার আড়ালেই অনুপম রয়ে গেছে। সেই প্রথম বারের পরেও, সুপ্রভার অসুখ বিসুখে সে এই চার বছরে অনেকবারই এসেছে। সুপ্রভা এখন মেনে নিয়েছেন। বুঝেছেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রুগী কে ঘর বার করে ডাক্তারের চেম্বার, হাসপাতাল করা সোহিনীর শক্তিতে কুলোবে না। কিন্তু আজও অনুপম এলে, সোহিনীর হাত টাকে শক্ত করে নিজের মুঠোতে চেপে থাকেন। যেন নিরবে বলেন," বৌমা, বুড়ী শাশুড়ি কে ফেলে ঐ ছোঁড়াটাকে বিয়ে করবে নাকি তুমি? কিসের এতো দরদ ওর? কে দেখবে আমায় বলো? বাবু চলে গেছে, তোমায় যেতে দেবো না কিছুতেই।" অনুপম সুপ্রভার কান্ড দেখে মুচকি, মুচকি হাসে শুধু। শুধু সুপ্রভা নয়, এই যাওয়া আসার মাঝে বাবানের সাথেও অনুপমের একটা আদর আবদারের জায়গা তৈরী হয়ে গেছে ধীরে ধীরে।
আজ রবিবার বিকেলে বাবানের সাথে দেখা করতে এলো অনুপম। গেলো বার কথা দিয়ে গিয়েছিলো ছুটির দিন দুজনে গেম খেলবে। " "আঙ্কেল তুমি যে বললে আমার সাথে গেম খেলবে? এখন ঠাম্মি ঘুমোবে। খেলি চলো।"
" খেলবো, যদি তুই তোর মামাম্মের কথা শুনিস"
" শুনি তো,কিন্তু মাম্মাম খালি বকে আর পড়ায়।"
" ভেরি ব্যাড। আসলে দিদিমণি তো, মানে তোর ক্লাসের আন্টিদের মতো, আর কিছু জানেনা। "
" এই রে বাবানকে এসব বলছেন আপনি?", কফির কাপটা অনুপমের হাতে দিতে দিতে, সোহিনী হাসতে হাসতে প্রতিবাদ করে।
" কিছু না। বলছি তোর মাম্মাম এই বিকেলে কিছু ভালো মন্দ খাওয়ালেও পারে আমাদের, কি বল বাবান?"
"আরে তুমি জানোনা, মাম্মাম এখুনি চিকেন পকোড়া ভাজবে। তোমাকেও দেবে। আংকেল কে দেবে তো মাম্মাম ?" সোহিনী আর অনুপম দুজনেই হেসে ওঠে। বাবান দুজনের মুখের দিকে চেয়ে থাকে সরল আনন্দে।
" চল পার্কে গিয়ে সাইকেল চালাই, গেম খেলতে হবেনা।"
সোহিনী বারান্দা থেকে চেয়ে দেখে বাবানের ছোট সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে পার্কের দিকে নিয়ে যাচ্ছে অনুপম, একটা হাত বাবানের কাঁধে। বাবান হাত নেড়ে কলকল করে বকে যাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে চোখ দুটো হঠাৎ জ্বালা করে ওঠে সোহিনীর। এই কাজটা তো সৌরভের করার কথা ছিলো! অনুপম করছে কেন? একটা অন্ধ রাগে মাথাটা গুমগুম করতে থাকে সোহিনীর। তার ছেলেটাকে এমন স্নেহের কাঙাল করে দিয়ে কেন মরে যেতে হলো সৌরভ কে? অন্তত বেঁচে থাকতে পারতো! সৌরভ থাকলে তো বাবানের অনুপম কে দরকার হতো না। বাবা হিসেবে সামান্যতম দায় ছিলনা কি ওর বেঁচে থাকার? সোহিনী কেন সৌরভের মত এমন একটা বেবাক দায়িত্বহীন, চূড়ান্ত স্বার্থপর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেনা? কেন তাকে যে কোনও শর্তে বাবান আর সুপ্রভার জন্যে বেঁচে থাকতেই হবে? কেন? দীর্ঘ কাউনসেলিং করিয়েও অন্ধ রাগটাকে পুরোপুরি বশে করতে পারেনি সোহিনী। একেক সময় বাবানের পাশে অনুপমের সহজ স্নেহমাখা উপস্থিতি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তাকে যে বাবান কি হারিয়েছে! সে অভাব যে সোহিনী মা হয়েও পূরণ করতে পারবেনা!
হঠাৎই বাড়ি থেকে বেরিয়ে, প্রায় অন্ধের মতো পার্কটার দিকে ছুটে যায় সোহিনী। একটা ক্রুদ্ধ আবেগ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলে অনুপম আর বাবানের দিকে। সোহিনীর পায়ের শব্দে পিছনে ফিরে তাকায় অনুপম। বাবান তখনো বেখেয়ালে আবোল তাবোল বকে চলেছে।
"কিছু হয়েছে নাকি? মাসিমা ঠিক আছে? ", শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে অনুপম।
সোহিনী কিন্তু দেখে ঈশান কোণে একটুকরো জমে থাকা মেঘ, কেমন তাল তাল আঁধার মাখিয়ে দিচ্ছে বসন্ত সন্ধ্যার অস্তরাগে। একটা এলোমেলো ছন্মছাড়া বাতাস উঠছে, ক্রমশ গতি বাড়ছে তার, ঝড় আসছে, একটা প্রবল বিধ্বংসী ঝড় আসছে। সব তছনছ হয়ে যাক, সোহিনীর আর কিছু হারাবার নেই।
" আপনি আর আসবেন না অনুপম বাবু। আমি, আমি চাইনা বাবানের কোনও প্রত্যাশা গড়ে উঠুক আপনাকে নিয়ে। ওর সত্যিটা ওকে স্বীকার করতে হবে, আজ নয় কাল। আপনি সেই পথ অবরুদ্ধ করে রয়েছেন।"
কিছুক্ষন কোনও উত্তর দেয় না অনুপম। তারপর বলে, " বুঝলাম, আর আপনার নিজের প্রত্যাশা?"
" না, কিছুমাত্র না। কোনোদিন নেই। আচ্ছা, আপনার আলাদা জীবন নেই ? কেন আসেন বারবার বাপ মরা ছেলে আর স্বামী খেকো এক বিধবার কাছে ? আমাদের যা নেই, তা নেই। আপনার মনে না করিয়ে দিলেও হবে। খুব নিষ্টুর আপনি।"
ঝড়টা সর্বশক্তি নিয়ে আছড়ে পড়ে এবার। সোহিনীর চুল, শাড়ির আঁচল সমস্ত এলোমেলো করে দিয়ে পিশাচিনী হা হা করে নাচতে থাকে ওদের তিনজনকে ঘিরে। সেই ঘনিয়ে ওঠা আধাঁরে সোহিনী দেখে অনুপম নিশ্চুপে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখে আহত বিস্ময়, কিন্তু আরো একটা গভীরতর কোনো বোধ রয়েছে সেখানে। সোহিনী বুঝতে পারেনা। চোখের ভাষা পড়ার জন্যে আলো কোথায়? মরুক গে যাক। সোহিনী আর সেসব বোঝাপড়া করতে চায়না। কিন্তু কথায়, কথায় ঠাট্টা করা মানুষটা চকিতে কোথায় গায়েব হলো? তার বদলে সোহিনী দেখল বিষন্ম,একাকী এক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। নীরব কিন্তু বাঙ্ময়। সেই মৌনমুখরতা না বোঝার মতো অসংবেদনশীল হয়তো নয় সে, কিন্তু সোহিনী শুনতে নারাজ। তার সমম্ত অস্তিত্ব জুড়ে শুধু প্রবল ঝড়ের উথালপাতাল।
" বেশ আসবোনা। আপনি না চাইলে আসবোনা। সাবধানে ছেলে কে নিয়ে ঘরে যান আপনি। আসি আমি। নমস্কার।" সোহিনী দেখে অনুপম বাবানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, তার দুটো কচি হাতে আলতো করে চুমু দেয়,তারপর পিছন ফিরে মিলিয়ে যেতে থাকে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে। দূর থেকে দূরতরে।
৭.
সোমবার ট্রেনে উঠে সোহিনী দেখল অনুপম কামরায় নেই। আসেনি? সেটাই তো স্বাভাবিক, নয় কি? সোহিনী তো আসতে মানা করেছে, তাহলে এই নিয়ে কেন ভাবছে সে? ভিড়ে ভর্তি কামরাটা বরাবর যেমন থাকে তেমনই আছে, তাও কিসের যেন অভাব! তার পাশের জায়গাটা খালি নেই, অথচ সোহিনীর মনে হচ্ছে ওখানে আজ অন্তহীন বিষন্নতা দাঁড়িয়ে রয়েছে , দুহাতে শূন্যতা মেখে।আগামী চার দিন ধরে ছবিটা বদলায়না।
যা সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে তার মধ্যে নিশ্চিত কোনও ভুল নেই, তবুও এমন দ্বন্দ্বাকীর্ণ কেন সোহিনী? অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়ার পর কেন তার এই অদ্ভুত প্রত্যাশা যে অনুপম আবার আসুক? এত অসঙ্গতি পূর্ণ আচরণ কেন করছে সোহিনী? সে কি চিরকালই এমন? কাছে টানতে গিয়ে কেবলই দূরে ঠেলে দেয়? কেন তার কেজো, অবসন্ন দিনগুলো আরো বিস্বাদ হয়ে গেছে? কারণে অকারণে কেউ তাকে রাগিয়ে দিচ্ছে না বলে? নাকি কাউকে প্রতিদিনের হাজারো ছোট বড় যুদ্ধগুলো বলে উঠতে পারছেনা বলে? কাকে যে বলবে সে! স্টাফরুমে সহেলী, ইভাদিদের আড্ডার ফাঁকে সে আবিষ্কার করে যে আসলে এই পৃথিবীতে, বাবান ছাড়া, কারোর সাথেই তার কোনো সত্যিকারের যোগাযোগ নেই। এদের কেউ নয় সে। আদতে কারোর কি কেউ কোনো দিন হতে পেরেছিল সে? কি জানি! সৌরভের অন্তত কেউ হতে পারেনি, এটুকু নিশ্চিত। অনুপম কি তার কেউ হওয়ার চেষ্টা করেছে এতগুলো বছর ধরে? সে চেষ্টারই বা কি দাম পেল সে? সামান্য সৌজন্য বোধটুকু, সামান্য বাক্য সংযম প্রকাশ করতে পারেনি সোহিনী শেষে । চার বছর আগে একজন পাথরচাপা বুকে অভিমানের হিমশৈল নিয়ে চলে গেছে, অন্য আর একজন কে সে নিজেই তাড়িয়ে দিয়েছে। এই তো সহজ পরিসংখ্যান! এর বেশি আর কি পেরেছে সোহিনী?
ইস্কুল থেকে ফেরার পথে সোনারপুর স্টেশনের বাইরে মকবুলদার চায়ের দোকানটার দিকে পা বাড়ায় সোহিনী। অনেক সময় অনুপম এখানে চা খেতে নামে কলিগদের সাথে। কয়েকবার সোহিনীর সাথেও এসেছে। চায়ের দোকানে জটলাটার মাঝে অনুপম কে খোঁজে সোহিনী। নাহ নেই। একটা ফোন করবে সে? না থাক। কি বলবে? সরি, ভুলে যান সব! হাস্যকর!
" মকবুল ভাই একটা চা দাও"
"কেমন আছেন দিদিমণি? অনেকদিনে পরে চা খেতে এলেন।"
" সময় পাই না গো, তাড়া থাকে। অনুপম স্যর এর মধ্যে এসেছিল না কি তোমার কাছে?", সোহিনী দোনোমনো করতে করতে প্রশ্নটা করেই ফেলে।
মকবুল ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে থমকায় মুহূর্তুটাক।" না দিদি হপ্তা খানেক দেখিনি স্যার কে।"
" ও", আর কিছু বলার খুঁজে পায়না সোহিনী। চায়ের দাম মিটিয়ে হাত ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করে সে । দু বার সম্পূর্ন রিং হয়ে কেটে যায়, অনুপম ফোন ধরলনা। সৌরভও ধরেনি। সোহিনীর হঠাৎ করে ম্লান বিকেলটায় ক্লান্ত লাগে খুব। অটোর লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে মনে হয় একটা অন্তহীন বৃত্ত ধরে আজীবন হেঁটে চলেছে সে। এক আদি অন্তহীন বিষাদ পারাবারের আরো গভীরতর কোন তলদেশের অন্বেষণ করে চলাই তার ভবিতব্য। এই জন্মের আগের আরো শত জন্ম ধরে সে এই একই খোঁজে নিজেকে হারিয়েছে বারবার। প্রতি জন্মেই বেঁচে থাকার নামে একইরকমের ধূসর কতগুলো দিন কাটিয়ে গেছে সে,আদতে কোনও বাস্তব গন্তব্যই নেই তার, দিকশূন্যপুর নামে এক অলীক ঠিকানা খুঁজে চলেছে সে। এই পৃথিবীতেই হয়ত নেই তা। সোহিনীও আর মানুষ নয় মানুষের ছায়া মাত্র।
" সুমিতাদি আমার ফিরতে দেরী হবে গো। তুমি বাবানের রাতের খাবারটা খাইয়ে দিও। আমি পরে আবার ফোন করছি।." অটোর লাইন থেকে বেরিয়ে আবার প্ল্যাটফর্মে ফিরে এসে শিয়ালদাগামী একটা লোকালে ওঠে সোহিনী। আজ আরো একবার দিকশূন্যপুর খুঁজবে সে। দেখবে বিষাদসিন্ধুর অন্তরে কোনও মুক্তোদানা সত্যি লুকিয়ে রাখা আছে কি না।? জন্মজন্মান্তরের তপস্যালব্ধ সেই ঐশ্বর্য পেলে হয়ত তার এই অন্তহীন পরিভ্রমণ শেষ হবে। বুকের মাঝে যে নির্ঝর ধারায় অবিরাম রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে,তা ক্ষান্ত হবে।
নিউ গড়িয়ায় নামে সোহিনী। একটা অটো তাকে পূবালিকা নামের ফ্ল্যাটবাড়িটার গেটের কাছে নামিয়ে দিয়ে যায়। "লিফটে করে দশ তলায় উঠে, বাঁ দিকের দ্বিতীয় ফ্ল্যাট, জানিয়ে রাখলাম, যদি কখনো দরকার পড়ে আপনার", অনুপম বলেছিল তাকে আসা যাওয়ার পথে একদিন। আরো দশটা কথার মাঝে একটা কথা, নিতান্তই জানানোর জন্যে জানানো। সোহিনীর আজ ভীষণ অসময়ে সেই দরকারই পড়েছে।
ফ্ল্যাটের বাইরে বেলটা বাজিয়ে অস্থির অপেক্ষা করে সে। সামান্য দরজাটুকু খুলতে এত সময় নিচ্ছে কেন অনুপম? বাড়ি নেই? অধৈর্য হয়ে আরো একবার কলিং বেলের সুইচে হাত দেওয়ার সাথে সাথেই দরজাটা খুলে যায়। সামনে অনুপম। সোহিনী দেখে অনুপম স্তব্ধ বিস্ময়ে চেয়ে আছে তার দিকে। কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা সোহিনী। বিশেষ কিছু না ভেবেই একটা আবেগের ঝোঁকে সে চলে এসেছে অনুপমের দরজায়, কিন্তু সত্যিই তো কি বলবে এখন? কেন এসেছে সে? অনুপম কি বুঝবে যে সে বড় ক্লান্ত? দিকশূন্যপুরের পথিক দু মুহূর্ত থামতে চায় তার ছায়ায়? সোহিনীর নিজের সাথে নিজের এই ব্যক্তিগত সংলাপ, এই দিকশূন্যপুরের অন্ধেষণ অনুপমের কানে হয়তো প্রলাপ ঠেকবে। কারোর অন্তর কী অন্য কাউকে যথাযথ ভাবে দেখানো বা বোঝানো সম্ভব?
অপরপক্ষও একেবারে নিশ্চুপ। কোনো চেষ্টাই নেই সেই সহজাত একটা খাপছাড়া ঠাট্টা করে পরিস্থিতি সহজ করার। না কামানো দাড়ি, উসকোখুসকো চুল আর একটা কুঁচকোনো টিশার্ট আর পাজামা পরে অনুপম দাঁড়িয়ে আছে দরজায়।
" আমি, মানে, আপনি, আসলে আপনাকে দেখনি ..." সোহিনী বোঝাতে চায়।
অনুপম দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ায়। ইশরায় সোহিনী কে ভেতরে আসতে বলে। " বসুন", সোফা সেটের দিকে ইশারা করে। "কফি করি একটু?", নিঃশব্দে মাথা নাড়ে সোহিনী। অনুপম কফি বানাতে ভেতরে চলে গেলে, বসার ঘরটাকে দেখতে থাকে সোহিনী। সেন্টার টেবিলে খোলা খাতার পাতায় জটিল সব গাণিতিক সমীকরণ, পাশে খবর কাগজে খোলা সুদোকুর পাতা, সলভ করা হয়ে গেছে নির্ভুল ভাবে। অ্যান্টিবায়োটিকের স্ট্রিপ আর একপাতা ক্যালপলও পড়ে রয়েছে। শরীর খারাপ ছিল তার মানে?ঘরের ভেতর থেকে একটা পুরোনো গানের আভাস ভেসে আসছে, সুরটা চেনা চেনা ঠেকে সোহিনীর, কিন্তু ঠিক মনে করতে পারেনা। মন কেমন করা সুর। সোফার কোনে একটা টেবল ল্যাম্পের কুসুম কুসুম নরম আলোয় ঘর ভরা এক শান্ত সন্ধ্যা এসে বসেছে নতজানু হয়ে। দখিনা বাতাসে এলোমেলো উড়ছে হলের সাদা পরদা। সামনের টিভি ক্যাবিনেটে ঠাসা বইপত্তর। কি বই পড়ে অনুপম? কেমন জীবন কাটায় সে এই একান্ত ব্যাক্তিগত পরিসরে?
সোহিনী উপলব্ধি করে সে অনুপমের জীবনের খুব একটা কিছুই জানেনা, দু একটা বাহ্যিক তথ্য ছাড়া। নিজের নিভৃত জগৎ সম্বন্ধে চিরকালই নীরব অনুপম। কফি বানাতে বেশ সময় লাগছে অনুপমের। বইপওর কী আছে উঠে দেখতে গিয়ে, সোহিনী দেখে ক্যাবিনেটের মধ্যে ফ্রেমবন্দী ছবি ও রয়েছে কয়েকটা। আগে ছবিগুলোই আকর্ষণ করে তাকে। প্রথমটাতে ছোট অনুপম বাবার কোলে, পাশে মা। একটাতে আট দশ বছরের ছেলেমেয়েরা সব একসাথে, অনুপমও রয়েছে তাদের মাঝে। সম্ভবত কারোর জন্মদিনে তোলা। পুরোনো হলদেটে ছবি, মলিন,জং ধরা ফ্রেম। নব্বইয়ের দশকের মধ্যবিও বাঙালি পরিবারের আটপৌরে ছবি। একটা ফ্রেমে রয়েছে অনুপমের মা বাবার পাশাপাশি বসে তোলা ছবি, কিঞ্চিত গম্ভীর আর আড়ষ্ট ভাব। কোনও স্টুডিও তে গিয়ে তোলা। হয়ত বিবাহবার্ষিকী ছিল সেদিন। মায়ের মুখের আদল সহজেই চেনা যায় অনুপমের মুখে। কিন্তু এই সব ফ্রেমবন্দী ছবির ভিড়ে একটা ফ্রেমের মুখ উল্টো দিকে ঘোরানো। অদ্ভুত ঠেকে সোহিনীর। এটা এরকম কেন?
" আপনার কফিটা..", অনুপমের গলার ডাকে সম্বিত ফেরে সোহিনীর। দুটো কফির কাপ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে অনুপম। কফিটা হাত বাড়িয়ে নেয় সোহিনী।
" এই পুরোনো ছবিগুলো দেখছিলাম। আপনার বাড়ি মেদিনীপুরে, না?"
"হ্যাঁ, বাবা মা ওখানে থাকেন। "
" এই ছবিটা? এরকম করে রেখেছেন কেন?"
"কোন ছবিটা?", সোহিনীর পাশে এসে এবার দাঁড়ায় অনুপম। "ওহ, ওটা! তেমন জরুরী নয় কিছু", কফিতে এক চুমুক দিয়ে বলে অনুপম। "এটাই জানবেন বলে এসেছেন হঠাৎ?"
"না, না, আমি কি করে জানবো যে আপনি ছবি এমন উল্টে রাখেন? আমি এলাম...", সোহিনী দেখে অনুপম চেয়ে আছে তার দিকে। চোখে প্রশ্ন। " কেন এলেন, আপনি সোহিনী?"
"আপনি ফোনটা ধরলে আসার দরকার পড়তনা।"
" ওহ আমারই তো দোষ তবে! যাক দোষ করলাম বলে আপনি এলেন অন্তত।"
"না ঠিক তা নয়"।
" নয়?"
"না"
"তাহলে আপনার দোষ বলছেন?"
" জানিনা আমি।", সোহিনী মুখ নিচু করে থাকে।
"এটা ঠিক বলেছেন আপনি। জানতেন যদি তাহলে.."
" তাহলে কি?"
"হয়ত অতটা রুডলি তাড়িয়ে দিতে পারতেননা সেদিন।"
" অনুপম!...",সোহিনীর চোখ দুটো আচমকা বিশ্বাসঘাতকতা করে তার সাথে। না, না এমন দুবর্লতা অনুপমকে দেখতে দেওয়া যাবেনা। অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় সে। এত কঠিন প্রাণ তার, খামোকা এমন চোখে জল আসার কথা নয়।
গালে অনুপমের আঙুলের ছোঁয়ায় চমকে তাকায় সোহিনী। তার মুখটাকে আলতো করে তুলে ধরে অনুপম, যত্ন করে আলোর দিকে ফিরিয়ে দেয়। সোহিনীর চোখ বন্ধ, কিন্তু জলের ধারা দু গাল বেয়ে তখন চিবুকে আশ্রয় খুঁজছে। অনুপম নীরবে চেয়ে দেখে। একদম ধরা পড়ে গেল সে। আঙুল দিয়ে অনুপমের হাতটা সরিয়ে দিতে চায় সোহিনী, আর সেই মুহূর্তেই সোহিনীর অশ্রুভেজা দুচোখের পলকে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়ায় অনুপম, খুব মৃদু সে স্পর্শ, ভোরের বাতাসের মতো। সোহিনীর দুচোখের কোল বেয়ে নিঃশব্দে অঝোর ধারে ঝরে পড়ে অনেকদিনের পাথর হয়ে থাকা অভিমান। অনুপমের বুকে মাথা নামিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে সে। সোহিনীর মাথায় যত্নে হাত বুলিয়ে দেয় অনুপম।
"বড্ড জেদ আপনার!"
"আমি চাইনি ঐরকম করে বলতে,"কান্নায় গলা বুঁজে আসে সোহিনীর।"
"কি চেয়েছিলেন তাহলে?"
" জানিনা আমি, কি যে চাই তাই জানিনা। আচ্ছা আপনার পাশে একটু বসতে দেবেন আমায় কিছুক্ষণ? চুপ করে থাকে অনুপম। " বলুন না দেবেন?", আকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করে সোহিনী।
আলতো হাতে সোহিনীর চোখের জলের ধারা আঙুল দিয়ে অনুসরণ করে অনুপম। চোখের কোণ বেয়ে, দু গাল ছাড়িয়ে চিবুকে কিছু ও স্খলিত হিরে কুঁচি ঝলমল করছে ল্যাম্পের মোম রঙের আলোয়।
" এত দামি জিনিস নষ্ট করতে আছে?", চোখের জল আঙুল দিয়ে পুঁছে বলে অনুপম।
" বলুন না, দেবেন বসতে?", জেদী বাচ্চার মত ফের একই প্রশ্ন করে সোহিনী। সে দেখে অনুপমের চোখে সেই তার না চিনতে পারা কিছু একটা। আগেও অনেকবার দেখেছে সে। কেমন একটা বিষন্ম অসহায়তা যেন।
" সবটুকু তেমন করে জানলে আপনি নিজেই হয়তো আর বসতে চাইবেন না।", একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে অনুপম, চোখের দৃষ্টি মাটিতে নিবদ্ধ।
" মানে? কি জানিনা আমি? আর সেটা যাই হোক আমি জানতে চাই।", গলায় জেদের আভাস সোহিনীর। সৌরভকে তেমন করে আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করলে, শেষটা হয়তো অন্যরকম হতো। সোহিনী পারেনি। অনুপমের সাথে বা পৃথিবীর কারোর সাথেই ঐ ভুলটা আরা একবার করতে চায় না সে।
"বেশ", বলে উঠে দাঁড়ায় অনুপম। সোহিনী দেখল অনুপম উঠে বইয়ের আলমারির দিকে চলেছে।
" দেখুন।"
"কী?"
"সেই উল্টো করে রাখা ফ্রেমবন্দী ছবিটা যা নিয়ে আপনার অনেক প্রশ্ন।" সোহিনী হাত বাড়িয়ে ছবিটা নেয়। এক ঝলক ছবিটা দেখে উঠে দাঁড়ায় চকিতে। এত ভুল হল,তার? ছিঃ! অনুপম তাহলে বিবাহিত! অন্তত এ ছবি তো তাই বলছে। সিঁদুরদানের পরে তোলা ছবি। ছবিতে পাশাপাশি বরবেশে অনুপম আর এক মহিলা, কনের সাজে অপরূপা, কিন্তু মুখ ম্লান, অদ্ভুত! এই তাহলে অনুপমের স্ত্রী! আর যাই হোক মহিলা অত্যন্ত সুন্দরী। কিন্তু অনুপম কোনোদিন তো বলেনি কিছু, এই ফ্ল্যাটে তো আর কেউ থাকে বলে মনে হয়নি সোহিনীর। সব কেমন ধোঁয়াশা।
" সরি, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আসলে ভাবিনি আপনি বিবাহিত। এভাবে কেন তবে?...", মাঝপথে থেমে গিয়ে কি বলবে বুঝতে পারেনা সোহিনী। কিছুক্ষণ আগে তাদের ঘনিষ্ঠতা তাহলে কী ছিল? সব জেনেও অনুপম...
" আমাকে এতটা সস্তা ভাবতে পারলেন আপনি?", সোহিনীর গলায় চেপে রাখা কান্নার দমক আর রাগ।
" থামুন! আপনার এতদিন তবে এই মনে হয়েছে যে আমি আপনাকে সস্তা ভাবি? "
চুপ করে থাকে সোহিনী। আর যাই হোক অনুপম তাকে অসম্মান করেনি কখনো। বরং সে নিজেই...
"আপনি কিছুই জানেন না সোহিনী। ও তনয়া, আমার প্রাক্তন স্ত্রী। "
"প্রাক্তন?"
"হ্যাঁ। সাত বছর আগে ডিভোর্স হয়ে গেছে। তখন আমার সাথে আপনার পরিচয় হয়নি। ন মাসের বিয়ে, তারপর মিউচুয়াল ডিভোর্স।"
"ওহ, সরি", আর কি বলবে বুঝে উঠতে পারেনা সোহিনী। অনুপমও থেমে যায়। মাথা নীচু করে বসে থাকে দুজনে মুখোমুখি। দেওয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দে স্তব্ধতা আরো গাঢ় হয়ে ওঠে।
" আমি আপনাকে জানাতে পারিনি কোনোদিন। চেষ্টা করেছিলাম, পারিনি। জানানো উচিত ছিল, স্বীকার করছি। তবে আমি আপনাকে সস্তা ভাবি কিনা, সে প্রশ্নের উওর আপনি নিজেই ভালো জানেন। "
" কেন ডিভোর্স করেছিলেন আপনারা? আপনার স্ত্রী তো দারুণ সুন্দরী।"
" হ্যাঁ নিশ্চয়, তবে বিচ্ছেদ আটকানোর জন্যে ওটা কোনও কারণ নয়। অন্তত আমার কাছে নয়।"
" তাহলে কি কারণ?"
অনুপম কিছুক্ষণ মুখ নিচু করে টেবিলে পড়ে থাকা রুবিকিউব টা নিয়ে চেষ্টা করে রঙগুলো মেলাবার। ব্যর্থ হয়ে সরিয়ে রাখে। " ধরুন এই রুবিকিউবটার মতো আমাদের মনের রঙ গুলো মেলাতে পারিনি, এই এখন যেমন আবার পারলামনা। তনয়ার হয়তো পলাশ লাল প্রিয় ছিল, আমার ভোরের আকাশের নীলাভ ধূসর। মেলে বলুন? আসলে ও একজন স্মার্ট, হ্যান্ডসাম হাজব্যান্ড চেয়েছিল, উচ্চপদস্থ কর্পোরেট এমপ্লয়ী বা বড় বিজেনস ম্যান যে একটা উত্তেজনায় ভরপুর, গতিময় জীবন উপভোগ করার সুযোগ দেবে তনয়াকে। এরকম কোনো তেজী, ভীষণভাবে পুরুষালী কোনো পুরুষের স্বপ্ন সে হয়ত দেখে এসেছে আকৈশোর। অথচ তার রক্ষণশীল পরিবার শুধু নিরাপত্তার খাতিরেই সরকারী হাইস্কুলের মাস্টারের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। তনয়া কেন রাজী হয়েছিল আমি আজো বুঝিনি। হয়ত ভেবেছিল মানিয়ে নেবে বা আমাকে নিজের মনের মতো করে গড়ে নেবে। মানুষ কেউ তো কারোর মতো নয়, বলুন?"
"তারপর?"
" তার আর পর নেই। আমার এই সাধারণ চাকরি, সুদোকু সলভ করার আনন্দে মেতে থাকা বা বইয়ে ডুব দেওয়া অন্তর্মুখী জীবনটাকে ম্যাড়মেড়ে মনে হতো তার। স্বাভাবিক, ওর কল্পনা আর বাস্তবের ফারাকটা মানতে পারছিলনা তনয়া। সেই ফ্রাসটেশনেই হয়ত, প্রায়ই বলতো আমাকে,"তুমি ভীষণ বোরিং, বুড়ো হয়ে গেছ এখনই।" জানেন, একটা নিষ্ঠুর আর শীতল বৃত্তে আটকে গিয়েছিলাম দুজনেই। অবশ্য আমি চেষ্টা করতাম, তবে সাড়া দেয়নি তনয়া। সত্যি তো সেরকম পরিপূর্ণ তৃপ্তি আমি তাকে দিতে পারিনি। শেষে যেদিন বলল যে ওর অফিসের পাঞ্জাবী বসের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরী হয়েছে, ডিভোর্স চায়, আমি আর না বলিনি। "
" খারাপ লাগেনি?"
"জানিনা। তবে নিজেকে বড্ড অযোগ্য, অপারক
বলে মনে হয়েছে। সত্যিটাই স্বীকার করা উচিত, খারাপ লাগলেই বা কি?"
" এতগুলো বছর তারপর? আমাকে তো কখনো কিছু বলেননি..."
"তারপর আর কি?... ঐ গানটা শুনলেন তো, ঐ যে ঐ গানটা, আপনি যখন এলেন, তখন সাউন্ড প্লেয়ারে শুনছিলাম", অনুপমের মুখে বিষন্ম এক হাসি, কাঁচের মতো ভঙ্গুর। একটু টোকা দিলেই নিঃশব্দে চূর্ণ হয়ে যাবে অনু পরমানুতে। মহাবিশ্বের কোন অতলে হারিয়ে যাবে চিরতরে, সোহিনী আর খুঁজেও পাবেনা।
" গানটা চেনা মনে হলো তবে ঠিক চিনতে পারিনি।"
"তাহলে শুনুন একবার। আমার চেয়ে ভালো এই গানটাই বুঝিয়ে দেবে আপনাকে আমার কথা"
অনুপম মোবাইলে গানটা চালিয়ে দেয়। লতা মঙ্গেশকরের মধুস্রাবী কন্ঠ অপার্থিব তরঙ্গ তোলে ঘরের গভীর নৈঃশব্দে। বহু পুরোনো সে গান, সময়ের দেরাজে তুলে রাখা সব ধুলো পড়া যন্ত্রনারা পিছু ডাকে সে সুরে।
" ইঁয়ু হসরতো কি দাগ মোহব্বত মে ধো লিয়ে,
খুদ দিল সে দিল কি বাত কহি ঔর রো লিয়ে।হোঁঠো কো সি চুকে তো, জমানে নে ইয়ে কহা,
ইয়ে চুপ সী কিঁউ লগি হ্যায়, অজি কুছ তো বোলিয়ে।
খুদ দিল সে দিল কি বাত কহী ঔর রো লিয়ে।"
স্তরে স্তরে সুরের লহরী তুলে, সোহিনীর হৃদয়ে নিঙড়ে নিয়ে গানটা শেষ হয়ে যায় একসময়। সোহিনী দেখে তার সামনে তারই মতো এক দিকশূন্যপুরের পথিক বসে রয়েছে। একা একজন মানুষ যে দিনের শেষে তার ব্যক্তিগত পরাজয়, অপমান, হৃদয় মোচড়ানো সব যন্ত্রণা, গ্লানিময় যাপন, শুধু নিজের সাথেই ভাগ করে নেয়। পৃথিবীর কারোর কাছে কোনো শুশ্রুষার আশা করেনা সে। নিজের সাথেই কথা বলে যায় দীর্ঘ সব নির্ঘুম রাতে। পৃথিবীর তাকে মনে রাখার বিশেষ কোনো কারণ নেই, সেও শব্দের ভীড়় বাড়াতে চায়না বলে, নিশ্চুপ হয়ে গেছে কখন, কেউ খেয়াল করেনি। এই তবে ঠাট্টার আড়ালে আসল অনুপম। স্ত্রী পরিত্যক্ত একাকী এক পুরুষ! কিন্তু কী গভীরে জীবনকে অনুভব করেছে সে। তীব্র যন্ত্রণা না পেলে এমন অসম্ভব মায়া মানুষের থাকতে পারে না। মানুষ নিষ্ঠুর ,বড় নিষ্ঠুর।
একসময় স্তব্ধতা ভেঙে সোহিনী জিজ্ঞেস করে, "আমাকে বলা যেতো না?
" কি ?"
" এই স্বরচিত সব প্রলাপ, ঐ যে গানে বলল , " খুদ দিল সে দিল কী বাত?", বলা যেত না?
"আপনি শুনতেন? আপনার হাজার লড়াই, আবার আমি...!", অনুপম নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে সোহিনীর দিকে। সে দৃষ্টিতে গভীর আর্তি, মানুষের সেই চিরন্তন তৃষ্ণা, একটু কেউ বুঝুক তাকে। "শুনতেন আপনি সোহিনী?", ফের জানতে চায় অনুপম।
" হ্যাঁ শুনবো আর আমার হাজার লড়াই তো অর্ধেক তুমি করে দাও।"
"ঐ টুকুই পারি, আর তেমন কিছু পারার যোগ্যতা নেই আমার। তোমার পাশে থাকার এক্সকিউজ ধরো।"
" তোমার পাশে বসতে দিলেই হবে", অনুপমের হাতটা নিজের হাতে টেনে নেয় সোহিনী। অগোছালো চুল গুলোকে কপাল থেকে সরিয়ে দেয়। " আর কিছু চাওয়ার নেই আমার। দিকশূন্যপুর পেয়ে গেছি",
অনুপমের কাঁধে মাথা রাখে সোহিনী।
" দিকশূন্যপুর? সে কোথায়?"
" সব মানুষের বুকে আছে, সবাই অবশ্য খোঁজ পায়না। খোঁজেও না হয়ত। কিন্তু বড় প্রশ্ন করো তুমি!"
"তুমিও!"
" ইঁয়ু হসরতো কি দাগ মোহব্বত মে ধো লিয়ে,
খুদ দিল সে দিল কি বাত কহি ঔর রো লিয়ে।", আস্তে আস্তে গুনগুনিয়ে ওঠে সোহিনী।
তখন অভিমানের বরফ হৃদয়ের ওমে গলে যাচ্ছে, তখন বসন্ত অপরাহ্নের বাতাস বয়ে নিয়ে আসছে শান্ত নিরাময়। পথে দেরী হলো খানিক, তবুও আসা হলো।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.