
১•
একটা প্রবল অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে যায় জাহ্নবীর।সেই চিৎকারটা, আবার! কানের কাছেই, স্পষ্ট, সুতীক্ষ্ম! একটা নীলচে যন্ত্রণার অনুরণন ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে তার মাথার ভেতর। কার বাঁকা একটা ধারালো নখ তার মস্তিষ্কের মধ্যে একটা গভীর আঁচড় টেনে চলেছে ক্রমাগত। নরম ঘিলু এবার গড়িয়ে আসবে নাক,কান বেয়ে। সে টের পায় শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের আরামদায়ক শীতলতার মধ্যেও গলায়, পিঠে আঠালো ঘাম জমে আছে তার। রাত বাতির মৃদু সবুজাভ আলোয় সটান উঠে বসে এবার সে। চারিদিকে ভালো করে তাকায় একবার, তারপর বারবার । জানলায় টানা রয়েছে ভারী পর্দা। নিথর, নিস্পন্দ ঘরে এই মুহূর্ত্তে দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক আর এসির হালকা যান্ত্রিক গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। মোবাইল টা হাতে নিয়ে সময় দেখে সে,রাত প্রায় সোয়া দুটো।
ঐ চিৎকরটা? রিনচেন! আবার এসেছে! কোথায় লুকিয়ে আছে ও?
ধুর,রিনচেন এখানে নেই! নিঝুমবাড়ি থেকে কলকাতার রাজারহাটের দূরত্ব ছশো কিলোমিটারের কিছু বেশি। রিনচেন এই দশ তলার ফ্ল্যাটের বন্ধ ঘরে কি করে আসবে ?
কিন্তু তাহলে?
ওহ! তাহলে আর কিছু নয়। ঘুমোও একটু, প্লিজ।
কিছু নয় কি করে? আমি স্পষ্ট শুনেছি কিছুক্ষণ আগে।
স্বপ্ন দেখেছ তুমি!
স্বপ্ন? আবার একই কথা? এত অবিশ্বাস! বারবার বলছি স্বপ্ন নয়, নয়, নয়!
নাহ্ স্বপ্নই। ডাক্তার সেনগুপ্তও তো বললেন স্ট্রেস আর এ্যাংজাইটির উপসর্গ এইসব। নিজেকে সামলাও।
সামলাও, সামলাও, সামলাও, ওহ! ঐ ডাক্তার কিচ্ছু জানেনা। চাট্টি ঘুমের ওষুধ আর উপদেশ লিখে দিয়েছেন শুধু!
সাহস থাকে তো চলো গিয়ে সবটা বলি ওনাকে। তারপর দেখব! জাহ্নবীর চোখেমুখে এক মুহূর্ত্ত আগের দিশেহারা আতঙ্কের ভাবটা কেটে গিয়ে একটা সরু ব্যাঙ্গাত্মক হাসি ফুটে ওঠে এবার।
কি,পারবে বলতে? পারবেনা! শোনো ওষুধ গিলে চুপচাপ শুয়ে পড়ো। কাল ভিজে বেড়াল সেজে অফিসে চলে যেও।
গত একমাস নিজের দ্বিধাবিভক্ত মন আর মস্তিকের সাথে প্রায় প্রতিরাতে এই বোঝাপড়া করে চলেছে জাহ্নবী। কিন্তু আর ধরে রাখতে পারছেনা সে। পারছেনা আর যে কোনো মূল্যে স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ অভিনয়টা চালিয়ে যেতে। টের পাচ্ছে ভেতরে ভেতরে একটা প্রবল ধস নামছে তার। এটাই একমাত্র সত্যি যে প্রায় প্রতি রাতে পৈশাচিক, যন্ত্রণা বিদীর্ণ ঐ এক চিৎকারে তার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। অথচ পরমুহূর্তেই নিজেকে জোর করে বোঝাতে হচ্ছে অন্য এক সত্য। আপাত যুক্তিপূর্ণ ও বাস্তব গ্রাহ্য সেই দ্বিতীয় সত্য দাঁড়িয়ে রয়েছে তার ইন্দ্রিয় অনুভূত প্রথম সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে। এই বৈপরীত্যের দানবিক চাপে জাহ্নবীর মাথাটা হয়ত মাঝ বরাবর দু ফাঁক হয়ে যাবে এবার। তারপর বেরিয়ে আসবে অগণিত সব কিলবিলে কালকীট,গোপন,কর্কটময় স্মৃতিপুঞ্জ মুখে করে।
নাহ এভাবে হবেনা। কোথায় ঘুমের ওষুধগুলো? দুটো ১ মিগ্রা এ্যালপ্রাজোলাম একসাথে মুখে পুরে এক ঢোক জল খায় জাহ্নবী। আহ! একটু অপেক্ষা শুধু,তারপর গভীর ঘুম আসবে। রিনচেনের চিৎকার আর তার কানে পৌঁছবেনা। মাটির নীচে অন্ধকারময়, সুশীতল, স্বপ্নহীন এক কবরে সে শুয়ে থাকবে অনেক জন্ম ধরে। কিন্তু কাচের গেলাসটা টেবিলে ফেরত রাখতে গিয়ে হাতটা কেঁপে ওঠে জাহ্নবীর। মুহূর্তের বেখেয়ালে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে সেটা। ঝনঝন শব্দটা ক্ষণিকের জন্যে দুলিয়ে দিয়ে যায় ঘরের স্তব্ধতা।এবার বাধ্য হয়ে টেবিলের বড় আলোটা জ্বালে জাহ্নবী। জলের মধ্যে বিক্ষিপ্ত কাচের টুকরো ছড়িয়ে আছে পায়ের কাছে, আলো ঠিকরে পড়ছে এদিক ওদিক। জলভর্তি কাচের গেলাস ভেঙে মাটিতে পড়ে থাকলে যেমন হওয়া উচিত, তেমনই, কিন্তু কি একটা সূক্ষ্ম অস্বভাবিকতা যেন আছে দৃশ্যটার মধ্যে। ঠিক কি ধরতে পারছেনা জাহ্নবী। চোখের পাতা দুটোও কেমন ভারী হয়ে আসছে এবার, অ্যালপ্রাজোলাম কাজ করতে শুরু করেছে তার রক্তে। আর কিছুতেই জেগে থাকতে পারছেনা জাহ্নবী, কিন্তু তাও জেদের বশে চেষ্টা চালিয়ে যায়। স্থির চোখে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থাকে মার্বেলের মেঝের ওপর পড়ে থাকা জলটার ওপর। হ্যাঁ! এইবার, এই তো ঠিক ধরেছে সে! জলটার মধ্যে একটা মৃদু কম্পন হচ্ছে। তিরতির করে কাঁপছে যেন জলটা। জাহ্নবী খাট থেকে নেমে মেঝেতে উবু হয়ে বসে ঝুঁকে দেখে এবার। একটা কিসের ছায়া পড়ছে জলটার ভেতরে। একটা পাহাড়ি রাস্তা। রাস্তার শেষে একটা বাংলো, বিগত শতাব্দীর ঔপনিবেশিক ধাঁচের বৃটিশ কটেজ। চেনা, খুব চেনা! কিন্তু চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে জাহ্নবীর । এই বরফ ঠান্ডা মেঝেতেই একটুখানি ঘুমিয়ে পড়বে সে, বিছানাটা বড্ড দূর। ভাঙা কাচের টুকরো গুলোর ধারে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ে জাহ্নবী । আধো ঘুম ঘোরে চেয়ে দেখে জলের ওপর ভাসমান সব চিত্রখন্ড। যেন জলছবির চলচ্চিত্র। এই মুহূর্তে জানতে চায়না সে এইসব এখানে দেখা কী করে সম্ভব! একটু ঘুম আসুক, একবার, অন্তত একবার, নাহলে উন্মাদ হয়ে যাবে জাহ্নবী। দীর্ঘ, নিরবিচ্ছিন্ন ঘুম, মৃত্যুসম ক্ষমাময়।
২•
“ইন থ্রি হান্ড্রেড মিটারস, টেক এ লেফট টার্ন, ইয়োর ডেস্টিনেশান উইল বি অন দ্য রাইট”, গুগুল ম্যাপের কায়াহীন মোহময়ী তাদের জানিয়ে দেয় প্রায় পৌঁছে গেছে ওরা দুজন, জাহ্নবী আর অভীক।
মধ্য জুলাইয়ের এক সপ্তাহান্তের দুদিনের ছুটির সাথে,জমিয়ে রাখা চারটে ক্যাজুয়াল লিভ নিয়ে দিন ছয়েকের এই ছোট্ট বেড়ানোর আচমকা আয়োজন তাদের। টুরিস্টের ভীড় নেই, একটু অফবিট এই হোমস্টেটার খোঁজ এনেছিল অভীকই।
“নিঝুমবাড়ি নামটাতেই কেমন একটা নৈঃশব্দ আছে, বল।“, গন্তব্যের নাম শুনে বলেছিল জাহ্নবী।
“ওসব নৈঃশব্দ টব্দ অনুভব করা তোর ব্যাপার, আমার আসে না ওসব। তবে ছবি যা দেখলাম, জায়গাটা অন্যরকম সুন্দর মানতে হবে। আমার প্ল্যানে শুধু দিন চারেক বিশুদ্ধ ল্যাদ, বিয়ার আর তুই।তোর বস কে বলে দিবি ফোনে একদম যেন ডিস্টার্ব না করে। আমিও কিন্তু চারদিন বিজনেস পুরো শান্তনুদার ঘাড়ে ছেড়ে যাচ্ছি।“
“নতুন ওয়েব ডিজাইনিং প্রজেক্ট না আসা পর্যন্ত এখন চাপ নেই কদিন”, জানিয়েছিল জাহ্নবী।
বাগডোগরা থেকে মাটিগাড়া- কার্সিয়াং রোড হয়ে, ন্যাশনাল হাইওয়ে হানড্রেড টেন ধরে প্রায় ঘন্টা চারেক গাড়ি চালিয়ে অবশেষে যখন নিঝুমবাড়ি এসে পৌঁছোয় ওরা দুজনে,তখন দুপুর প্রায় তিনটে। পাহাড়ের ঢালে ঝুলে থাকা ব্রিটিশ আমলের পুরোনো বাংলোটা তখন গাছেদের মাথায় জমা হওয়া পুঞ্জ পুঞ্জ ধূসর মেঘ আর অন্ধ খাদের গহ্বর থেকে সন্তর্পনে উঠে আসা ফ্যাকাসে কুয়াশার ছেঁড়া ছেঁড়া চাদরে ঢাকা পড়ে আছে। জাহ্নবী গাড়ি থেকে ব্যাগ কাঁধে নেমে দেখে মাঝ দুপুরেই ভরা এক সাঁঝবেলা নতজানু হয়ে বসে আছে নিঝুমবাড়িতে। বাংলোটার ধূসর, ক্ষয়াটে শরীরে ঘন সবুজ পাহাড়ি ফার্ন আর বেগুনী অর্কিডের সজ্জা। একটা ছোট কাঠের ফলকে লেখা রয়েছে: ওয়েলকাম টু নিঝুমবাড়ি।
“দেখ এইদিকে, নিঝুমবাড়ি নামটার নীচে ভিক্টোরিয়া কটেজ, ১৮৭০ লেখা রয়েছে। বাড়িটার আসল নাম বোধহয় এটা”, অভীক বলে।
“হ্যাঁ, সাহেবদের যখন ছিল, তখনকার নাম, আদি নাম বলতে পারিস, এখন শুধুই নিঝুমবাড়ি”, আশপাশটা নিষ্পলক দেখতে দেখতে বলে জাহ্নবী।
বাংলোর হাতার মধ্যে পান্না সবুজ ঘাসের মখমলী গালচে পাতা এক চিলতে ছোট্ট বাগান রয়েছে।ছাতাওয়ালা সাদা গার্ডেন চেয়ারগুলো ভিজে জবজবে হয়ে পড়ে রয়েছে জবুথবু। বাগানটার একদম গা ঘেঁষে ডান দিকে শুরু হয়েছে পাইন, ঝাউ, দেবদারু আর ধূপি গাছের ঘন জঙ্গল। আর বাঁদিকে,বাগানের একদম শেষে, বাঁশের নড়বড়ে বেড়ার ওপারে হাঁ করে পড়ে আছে অতলস্পর্শী এক খাদ। “আরে অত ঝুঁকে কি দেখছিস?”, হেঁকে ওঠে অভীক। কিন্তু ওর কথা গুলো নিমেষে গিলে নেয় চরাচরব্যাপী এক কুহকী স্তব্ধতা। ক্ষণিকের সে ডাকে ফিরে আসে জাহ্নবী, ডান দিকের জঙ্গলটার সামনে গিয়ে পায়ে পায়ে হেঁটে দাঁড়ায়। এই ভরা মনসুনে এখন শ্যাওলা সবুজ আঁধারে ঢেকে আছে জঙ্গলটা। প্রাগৈতিহাসিক গাছেরা দাঁড়িয়ে রয়েছে নিথর প্রহরীর মতো। মস ফার্নের নরম ঝালর ও ইতিউতি ফুটে থাকা গোলাপি আর মেঘনীল অর্কিডেরা সর্পিল কামনায় লেপ্টে আছে গাছগুলোর দৃঢ় আদিম কান্ডে। তুলো, তুলো মেঘেরা নেমে এসে প্রেতের মতো নিস্তব্ধে সঞ্চরণ করছে গাছেদের আশেপাশে, আবার পরমুহূর্তেই ভেসে যাচ্ছে সুদূর পাহাড়ের মাথায় মেঘলোকে। টলটলে অশ্রু বিন্দুর মতো ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে ভেজা পাতাদের শরীর থেকে। গভীর হৃদয় ক্ষতের মতো একটা লাল মেটে রাস্তা জঙ্গলের বুক চিরে খাড়া উঠে গেছে পাহাড়ে। সে পথের পাশ দিয়েই একটা ঝোরা নেমে এসেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। বর্ষায় ফুলে ফেঁপে তার ফেনিল জলরাশিভার প্রবল বেগে ধাবিত হচ্ছে কয়েকশো ফুট নীচে। ঝোরাটার অবিশ্রান্ত স্রোত একটা ঝিমঝিমে সুরের জাল বুনে চলেছে নিঝুমবাড়ির আশেপাশে। স্তবগানের মতো সেই সুর যেন নৈঃশব্দের আত্মা থেকে উচ্চারিত হয়ে চলেছে অনন্তকাল ধরে। একটানা কিছুক্ষণ শুনে ঘোর লেগে যায় জাহ্নবীর। নিঝুমবাড়ির আকাশে বাতাসে যেন অনন্ত এক শোক জমাট বেঁধে রয়েছে।বহতা সময়ের স্রোতও আটকে পড়েছে এই বিষণ্ন মায়ায়।
“নিঝুমবাড়ি নামটা যে শর্মা রেখেছে, ভাবনা চিন্তা করেই রেখেছে রে “, অভীকের কথায় সম্বিত ফেরে জাহ্নবীর।
“হু”, আনমনে বলে ও। জাহ্নবীর এই মুহূর্তে কথা বলতে ইচ্ছে করছিলনা একদম।
“ একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিস, ঝোরার শব্দ ছাড়া, একটা পাখির ডাক পর্যন্ত শোনা যাচ্ছেনা আশেপাশে। একটু অদ্ভুত,না?”, অভীক ফের বলে।
জাহ্নবী অবশ্য ততক্ষণে এগিয়ে গেছে মেইন দরজার দিকে।
ব্রিটিশ আমলে তৈরী দোতলা বাংলোটার ওপরতলাটা ঘিরে রয়েছে কাঠের খোলা বারান্দা। তেকোনা ছাদের ঢালে তেরচা দাঁড়িয়ে রয়েছে পাথুরে চিমনি, ফেলে আসা ঔপনিবেশিক অতীতের চিহ্ন। মূল প্রবেশ পথে ওক কাঠের পালিশ করা বড় ভারী দরজা আর জানালার বদলে চারিদিকে রয়েছে বিরাট,বিরাট ফ্রেঞ্চ উইনডো।
৩•
ভারী কাঠের দরজাটার ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছে হাস্যময়ী এক নেপালী তরুণী। “ আইয়ে সাব। নিঝুমবাড়ি মে আপ দোনোকো ওয়েলকাম স্যর, ম্যাডাম।“ ওদের দুজনকে প্রথমে কপালে চন্দনের ফোঁটা আর তারপরে গলায় সিল্কের সাদা উত্তরীয় পরিয়ে জোড়হাতে নমস্কার করে মেয়েটি।
“আরে এই সব আবার কেন?”, অভীক বলে ওঠে।
“ হমারা ইয়হী কাস্টম হ্যায় সাব। গেস্ট ভগবান মাফিক হ্যায়।“ জাহ্নবী দেখে এই ভরা বর্ষার নিঝুম মেঘছায়াতেও সে পাহাড়ি কন্যার সরল হাসি আর আন্তরিক আপ্যায়নে কেমন এক রোদ ঝলমলে সূর্যমুখী ফুটে উঠেছে বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ের বুকে। ঐ হাসিটা তার সবটুকু ভালো লাগা নিয়ে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে জাহ্নবীর ঠোঁটেও। মেয়েটির মাথা আর চিবুক আলগা স্নেহে ছুঁয়ে দেয় ও।
একটা বিরাট হলঘরের মধ্যে এসে দাঁড়ায় এবার ওরা। হলঘরটার বিরাটাকৃতি ফ্রেঞ্চ উইনডোগুলো দিয়ে ভেসে আসছে মেঘ-চোঁয়া অস্পষ্ট আলো আর তীক্ষ্ণ ফলার মতো হিমস্পর্শী বাতাস। হলুদাভ সে বিষণ্নতায় জাহ্নবী দেখে কাঠের প্যানেলিং আর দামি কার্পেটে মোড়া পাথরের মেঝেতে ছড়িয়ে রযেছে ফেলে আসা আভিজাত্যের চিহ্ন। ফায়ারপ্লেসের সামনে সাজানো গদি মোড়া হাতলওয়ালা সাবেকি চেয়ার আর তেপায়া মার্বেলটপ টেবিলে পোর্সিলিনের পরী। মূল দরজার ওপরে সাজানো স্টাফ্ড চিতাবাঘ আর সম্বর হরিণের মাথা। ওদের নিথর রক্তাভ চোখে আবদ্ধ এক অনন্ত, অপ্রস্তুত বিস্ময়। সেই একটি মুহূর্ত যখন কোনো শিকারির গুলিতে, শ্বাপদের মতো অতর্কিতে হানা দিয়েছিল মৃত্যু! আরো ওপরে মোটা কাঠের বিম দেওয়া পুরোনো সিলিং,এত উঁচুতে, যে ঘাড় উঠিয়ে দেখতে হয় জাহ্নবীকে। ফায়ারপ্লেসের লাগোয়া দেওয়াল জোড়া কাঠের বুকশেল্ফে সাজানো চামড়ায় বাঁধানো পুরোনো বইয়ের সারি। জাহ্নবী একবার আদরে আঙুল ছোঁয়ায় তাদের বৃদ্ধ শরীরে। শেষ কে খুলে দেখেছিল ওদের? একবার হলেও পড়েছিল হলদেটে পাতার কালো অক্ষরমালা? কতযুগ আগের কোন লেখক আর কেই বা সে পাঠক? সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে কোথায়! ওর হঠাৎ মনে হয় সময় আসলে ঐ খাদটার মতো, যেটার মুখে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ আগেও ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করেছে শেষ কোথায়। হয়ত শেষ বলে আসলে কিছু নেই অথবা শুরু আর শেষ টাইম গ্রাফে একই, অভিন্ন দুই বিন্দু! খাদটার মতো সময়ও সর্বভুক!
হঠাৎ নৈঃশব্দের বুক চিরে মেঘের গর্জন শোনা যায়, আর ঠিক তখনই আকাশ থেকে লাফিয়ে অঝোরধারে বৃষ্টি নামে নিঝুমবাড়িতে।
“লিজিয়ে সাহাব ঔর মেমসাহাব।“, ঘাড় ঘুরিয়ে জাহ্নবী দেখে রূপোলী ট্রেতে এবার দুটো শৌখিন কাটগ্লাসের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে নেপালী মেয়েটি। “আপকা ওয়েলকাম ড্রিংক।“
পেয়ালার লালচে তরলটার স্বাদ মিষ্টি কিন্তু ঈষৎ কষাটে ঠেকে জাহ্নবীর। এক চুমুক দিয়ে সে আবিষ্কার করে অভীক কখন গভীর আলস্যে চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে নির্দ্বিধায় পান করছে সেই ওয়েলকাম ড্রিংক, ওর সারা শরীরময় খেলা করছে একটা আরামদায়ক তৃপ্তির ঢেউ, চোখের দৃষ্টি নেপালি মেয়েটির ওপরে নিবদ্ধ। আয়েশ করে সিগারেটটা ধরিয়ে জাহ্নবী কে বলে, “খেয়ে নে, অরিজিনাল রডোড্রেন্ডন ওয়াইন মনে হচ্ছে, ঐটুকুতে নেশা হবেনা।“ গেলাসে শেষ চুমুক দিয়ে বলে, “ ঔর এক গেলাস মিলেগা?”
“জি জরুর মিলেগা। অসলি রডোড্রেন্ডন ওয়াইন হ্যায় ইয়ে। হম লোগ লোকালি বনাতে হ্যায় ইহাঁ”, মেয়েটি বলে ওঠে।
“ ওয়েসে,নাম ক্যায়া হ্যায় তুমাহারা?”
“ রিনচেন,সাব।“
“রিনচেন নাম কা ক্যায়া মতলব হ্যায়?”, অভীক রিনচেনের দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে প্রশ্নটা করে, ঠোঁটে প্রশ্রয়ের বিচিত্র হাসি।
“রিনচেন কা মতলব কুছ কিমতি চিজ সাব, য্যায়সে কোই ট্রেজার। বহুত পুরানা টিবেটান নাম হ্যায় রিনচেন। মেরে বাবা নে রখা হ্যায়।
“আপ ভি বহুত কিমতি হো রিনচেন!”, অভীকের ঠোঁটের হাসিটা আরো প্রশয়ী, আরো সাহসী এবার। জাহ্নবী নিশ্চুপে লক্ষ্য করে অভীকের সাবধানি চোখ চুরি করে দেখছে রিনচেনের সুঠাম,তন্বী শরীর। সেখানে সদ্য বিগত কৈশোর আর আগত যৌবনের দ্বন্দ্ব বড্ড স্পষ্ট বুকের আঁটোসাঁটো ব্লাউজে আর কোমরের বিপজ্জনক বাঁকগুলোতে। জংলা ফুলছাপ পাহাড়ি ঘাঘরায় আবৃত নিটোল উরু আর সুডৌল নিতম্বের আভাস রিনচেনের চলা ফেরায়।
হঠাৎ বুকে একটা খুব সূক্ষ্ম, চিনচিনে ব্যাথা টের পায় জাহ্নবী। একটা মৃদু জ্বালার অনুভব, কোথাও হালকা ছড়ে গেলে যেমন হয়, ঠিক তেমন। রিনচেনের সারল্য একটুও মুগ্ধ করছেনা না তাকে আর এই মুহূর্তে। ওর আপাত সারল্য আদতে বোকা, কামুক পুরুষদের জন্যে পাতা একটা ফাঁদ নয় তো আর কী?
অভীকের কথায় লজ্জা পায় এবার রিনচেন। একবার আড়চোখে পলককাল দেখে জাহ্নবীকে, মুখে প্রচ্ছন্ন অস্বস্তি। আগের স্বতস্ফুর্ত, চনমনে ভাবটা কেটে গিয়ে একটু আড়ষ্ট যেন এবার ও। “ও সব ছোড়িয়ে সাব, আপ লোগ কো আপকা রুম দিখানা হ্যায়, ডিনার ভী তৈয়ার করনা হ্যায়। ঔর তভী ম্যাডাম জী ভী মিলেঙ্গে আপসে। আইয়ে, আইয়ে।“
“কিরে তুই কি এখানেই বসে থাকবি?”, মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে জাহ্নবী।
“না,না, উঠছি। ফ্রেশ হব, চল”, রিনচেনের পেছনে পা বাড়ায় অভীক।
হলঘরের শেষ প্রান্তে রাজকীয় কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। একটা লম্বা প্যাসেজের শেষ প্রান্তে একটা বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ওরা।
“ ওর কোই গেস্ট নেহী হ্যায় অভি?”, জিজ্ঞেস করে অভীক।
“ নেহী সাব। ইয়ে অফ সিজন হ্যায়। ঔর টুরিস্টলোগ কো ইতনা খামোশী পসন্দ নেহী। ম্যাডাম জী কো ভি ভিড় ঔর শোর পসন্দ নেহী বিলকুল। আপকা ব্যাগ ঔর সামান বাহাদুর লেকে আ রহা হ্যায়। ইয়ে হ্যায় আপকা রুম “, বন্ধ ঘরটা চাবি দিয়ে খুলে দেয় রিনচেন। চাবিটা ওর হাত থেকে নিতে গিয়ে, নিজের আঙুল রিনচেনের আঙুলে চকিতে ছুঁয়িয়ে দেয় অভীক, ঠোঁটে একটা এঁঠো হাসি। চোরা স্পর্শটা চোখ এড়ায় না জাহ্নবীর। চমকে হাত সরিয়ে নেয় রিনচেন। পরমুহূর্তেই হাসিটা লুকিয়ে ফেলে, খুব স্বাভাবিক গলায় মন্তব্য করে অভীক, “ ম্যাডাম জী মানে বোধহয় হোম স্টের মালকিন।“ কথাটার কোনও উত্তর দেয় না জাহ্নবী।ওদের ব্যাগপওর ঘরে নামিয়ে রেখে যায় বাহদুর নামের নেপালী বেয়ারা । তারপর বিদায় নেয় রিনচেন আর বাহাদুর দুজনেই।
ঘরের মাঝখানে বিশাল ইংলিশ ফোর পোস্টার বেডে দুধ সাদা বিছানা আর দামি পশমের ব্ল্যাংকেট দেখে এতক্ষণে পথের ক্লান্তিটা ঘিরে ধরে জাহ্নবীকে। কিন্তু ঘরের দেওয়াল জোড়া ভারী পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে কাঠের ব্যালকনিতে পা রাখে ও। সামনেই একদম মুখোমুখি জঙ্গল আর ঝোরাটা, ব্যালকনির উচ্চতা থেকে আরো বিজন, আরো নিবিড়। পাহাড়ি বর্ষার হিম স্পর্শে ভিজে যায় জাহ্নবী। বুক ভরে নিশ্বাস নেয় সে, মেঘ এসে ছুঁয়ে দিক তাকে।
কিন্তু পালকের মত নির্ভার মেঘ নয়, রোমশ, পুরুষালি দুটো হাত জড়িয়ে ধরে জাহ্নবীর কোমর। অভীকের তপ্ত নিশ্বাস ছুঁয়ে যায় জাহ্নবীর কানের লতি, ঘাড়ের নরম খাঁজ। ওয়াইনের সাথে পোড়া তামাক আর কোলোনের একটা মাদক গন্ধ আসছে অভীকের শরীর থেকে,পলকেই তা নেশাতুর করে তোলে জাহ্নবী কে। পরিচিত, প্রিয় নেশাটার আবেশে ডুবতে ডুবতেই একটু আগে অভীকের লোলুপ দৃষ্টিটা মনে পড়ে জাহ্নবীর। রিনচেনের বুকের উদ্ধত শিখরে আর গহন, গোপন সব বাঁকে কেমন সর্পিল গতিতে স্বচ্ছন্দে ওঠানামা করছিল অভীকের চোখ! আচ্ছা, রিনচেনের কি ভালো লাগেনি সম্পূর্ণ অপরিচিত পুরুষের চোখে নগ্ন কামনার ঝিলিক? তার শরীরটার জন্যে অভীকের এমন হ্যাংলামি কী ভালো লাগেনা জাহ্নবীর? একটু ছোঁয়ার জন্যে এমন ব্যাকুলতা? তাহলে, রিনচেনেরই বা খারাপ কেন লাগবে? খারাপ লাগার তো তেমন কোনও কারণ নেই, বরঞ্চ গোপনে রিনচেনকে উত্তেজিত আর সাহসী করে তুলেছে ঐ চাহনি! তাহলে আড়ষ্টতার এমন ভণিতা কেন বাবা? একটা শীতল আগুনের স্রোত নেমে আসে জাহ্নবীর সিরদাঁড়া দিয়ে। ঠোঁঠে ঠোঁট ডুবিয়ে তপ্ত আশ্লেষের গনগনে আঁচে অভীক কে জড়িয়ে ধরে জাহ্নবী, অজান্তেই তার ম্যানিকিউর করা দীর্ঘ নখের আঁচড় পড়ে অভীকের পেশীবহুল, চওড়া পিঠে।
দম বন্ধ হওয়ার আগে অভীকের ঠোঁটের ওপর থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নেয় জাহ্নবী। রিনচেনের সামনে কিছুক্ষণ আগে হওয়া নিজের নীরব অপমানটা এখন জাহ্নবীর দুচোখের পলকে মুক্তো দানার মতো অশ্রু ফোঁটা হয়ে জমে আছে। ঝরে যাক অবহেলায়, লুকোনোর চেষ্টা করবেনা সে। অভীক এইসব দেখতে পায়নি কোনোদিন। তার অশান্ত হাত তখন ক্ষুধার্ত পশুর মতো জাহ্নবীর গভীর বুকের খাঁজে নরম মাংস খুঁজছে। আচ্ছা এখন কী মনে মনে রিনচেনকে ভাবছে অভীক?
নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ব্যালকনির ধারে গিয়ে দাঁড়ায় জাহ্নবী, ধূসর ম্লাণিমায় আবৃত প্রকৃতি কে দেখে নিশ্চুপে। সন্ধ্যার আঁধারে ঝোরাটার অবিশ্রাম সুর যেন এখন আরো তীব্র, আরো অপার্থিব। অভীক এসে দাঁড়ায় পাশে। “ঐদিকে ছোট টিনের শেড ঢাকা একটা একতলা বাড়ি রয়েছে দেখেছিস?” ওর কথায় জাহ্নবী লক্ষ্য করে বাংলোটার থেকে একটু পেছনে ডান দিকে জঙ্গলের গা ঘেঁষা একটা আউটহাউস রয়েছে। “ওটা সম্ভবত স্টাফ কোয়ার্টার, কাজের লোকেরা থাকে।“, উত্তর দেয় সে।
কাজের লোক বলতে তো খালি রিনচেন আর বাহাদুর কে দেখলাম। আরে! রিনচেন মনে হয় ওখানেই থাকে, ঐ দেখ যাচ্ছে ঐদিকে,” হাত দিয়ে দেখায় অভীক। জাহ্নবী লক্ষ্য করে বাগান পেরিয়ে রিনচেনের ফুলছাপ ঘাগরা আবছা কুয়াশায় ভেসে যাচ্ছে আউটহাউসটার দিকে।
“ঘরে চ, ঠান্ডা লাগছে,” জাহ্নবীর হাত ধরে টান মারে অভীক।
“তুই যা, আমি এখন এখানে একা থাকব কিছুক্ষণ।“
দরজায় মৃদু করাঘাতের শব্দ হচ্ছে। জাহ্নবী ব্যালকনি থেকে রুমে ফিরে দরজা খুলে দেখে এক ট্রে সন্যাক্স আর গরম কফির পট হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে রিনচেন। অভীক হুইস্কির বোতল আর গেলাস সাজতে ব্যস্ত তখন টেবিলে।
“ ডিনার কে লিয়ে আট বাজে নীচে আ যাইয়েগা আপ দোনো। ম্যাডাম জী ইন্তেজার করেগী,” কফির পট আর খাবারের ট্রে টেবিলে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয় রিনচেন।
“ সোডা মিলেগা?”, দুই আঙুল দিয়ে মদ্যপানের একটা অশ্লীল ইশারা করে অভীক রিনচেনের দিকে।
“জী ম্যায় লা দেতি হুঁ অভি”, বলে রিনচেন।
“ ম্যায় ভি চলতা হু “, বলে অভীক। পরমুহূর্তেই, “এক মিনিট আসছি” বলে রিনচেনের পিছন পিছন রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায় অভীক। স্তব্ধ জাহ্নবী দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে প্রায়ান্ধকার প্যাসেজে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে রিনচেন, পেছনে প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মত অভীক।“ এক সময় সিঁড়ির বাঁকে মিলিয়ে যায় দুজনে। এবার সিঁড়ির মাথায় নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় জাহ্নবী। নীচের হলঘর থেকে ভেসে আসছে অভীকের চটুল হাসি আর রিনচেনের অস্ফুট কথার শব্দ। কি আলাপ করছে ওরা গোপনে? জাহ্নবীর থেকে আড়াল খুঁজছে শুধু অভীক একা, না দুজনেই?
অভীক ফিরে আসার আগেই ঘরে এসে নরম বিছানায় শরীর ছেড়ে দেয় জাহ্নবী। মাথা অবধি টেনে নেয় নরম ব্ল্যাংকেট।
কাঁচের পেয়ালার শব্দে আর হুইস্কির ঝাঁঝালো গন্ধে ঘর ভরে ওঠে ধীরে ধীরে। নিঝুমবাড়িতে তখন নিঃসঙ্গ একটা রাত ডানা বিছিয়ে নেমে এসেছে খুব ধীরে, নগ্ন শরীরে অবগাহন করছে ঝোরাটার অবিশ্রাম ধারায়।
৪•
হলঘরটার শেষ প্রান্তে, ওক কাঠের তৈরী মার্বেল টপ সুবিশাল এক প্রাচীন ডাইনিং টেবিলের মাথায়, হাই ব্যাকড্ গদি আঁটা চেয়ারে বসে রয়েছেন এক দীর্ঘাঙ্গী মহিলা। এখানেই সান্ধ্যভোজের আয়োজনে অপেক্ষা করেছেন রিনচেনের ম্যাডামজী। বাঁদিকে বাহারি টেবিল ল্যাম্পের উজ্জ্বল আলোর রেখা এসে পড়েছে তার মুখের একাধারে। চেয়ারে বসতে গিয়ে জাহ্নবীর চোখ আটকে যায় মহিলার আয়ত দুই চোখে। এমন জ্বালাময়ী দৃষ্টি কোনো নশ্বর মানবীর হয়? কী প্রবল ব্যক্তিত্ব!
“ নমস্কার, নিঝুমবাড়িতে আপনাদের দুজনকে স্বাগত, জাহ্নবী আর অভীক। আমি কাত্যায়নী চ্যাটার্জী। দাঁড়িয়ে রইলেন কেন আপনারা? বসুন।“ শেষ কথাটা কেমন আদেশের মতো ঠেকে জাহ্নবীর কানে। দুজনেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ার ঠেলে বসে পড়ে। আকন্ঠ হুইস্কি পান করা অভীক বসতে গিয়ে সামান্য টাল খেয়ে যায়। জাহ্নবী ধরে ফেলে অভীককে।
“ স- সরি, সরি”, জড়ানো গলায় বলে ওঠে অভীক। কাত্যায়নী একপলক অভীককে দেখে চোখ ফিরিয়ে নেন, চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্ট বিরক্তি মাখানো অবজ্ঞা। চেয়ারে বসে এবার কাছ থেকে মহিলা কে লক্ষ্য করে জাহ্নবী। শীর্ণকায়া কাত্যায়নীর পরনে ঘন লাল সিল্কের শাড়ি আর কালো ওভারকোট। বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা দামি হাতঘড়িটা ছাড়া সম্পূর্ণ নিরাভরণ। বয়স ষাটের আশেপাশে, আরো বেশী হতেও পারে, আন্দাজ পায় না জাহ্নবী। রং ফর্সা না বলে ফ্যাকাসে বলাই ভালো। মাথার ঘন কেশরাশি সম্পূর্ণ শুভ্র, চূড়ো করে একটা খোঁপায় শক্ত করে বাঁধা সমস্তটাই। টিকোলো নাক, আর সরু ঠোঁট, বলিরেখাময় মুখের ভাব আরো সুতীক্ষ্ম, ধারালো করে তুলেছে। চেয়ার বসার ভঙ্গীটা ঋজু, সটান। কিন্তু মহিলার সমস্ত প্রাণশক্তিটুকু যেন নিহিত আছে দুই চোখে। চুম্বকের মত সেই দৃষ্টির সম্মোহনে আটকে পড়েছে জাহ্নবী।বুদ্ধিদীপ্ত,তীব্র,অন্তর্ভেদী দৃষ্টি! পলকেই যেন চিনে নিচ্ছেন জাহ্নবীর মনের অন্ধ সব গলি গুলো, কোথায় কামনার চোরাবালির নিঃশব্দ টান, কোথায় লুকোনো পাপ, কোথায় আঘাতের কালশিটে!
একটা সুদৃশ্য বোতল থেকে কিছুটা রেড ওয়াইন তিনটে ওয়াইন গ্লাসে ঢেলে, দুটো গ্লাস ওদের দিকে বাড়িয়ে ধরেন মহিলা। জাহ্নবী লক্ষ্য করে মহিলার হাতের আঙুলগুলো কেমন সুছাঁদে গড়া, অতি সূক্ষ্ণ। মুখাবয়বের কঠোরতা নেই ওগুলোতে, চারিত্রিক কোমলতা যদি কিছু থেকে থাকেই,সব যেন ঐ আঙুনগুলোতেই নিহিত হয়ে রয়েছে। শিল্পীর হাত বলে মনে হয় জাহ্নবীর।
“ পান করুন, উল্লাস!”, মৃদু গলায় বলেন কাত্যায়নী দেবী।
“ ইয়ে,পান করব মানে?”, জড়ানো গলায় অভীক হঠাৎ প্রশ্ন করে ওঠে। ঠোঁটে একটা বিদ্রুপ মাখানো আলগা হাসি খেলা করছে।
“ দুঃখিত! আমি ভুলে গিয়েছিলাম, আপনি এখন ব্রিটিশ বাংলোর সাহেব। ড্রিংক আপ ম্যান, চিয়ার্স!”, বাক্যে নিহিত ব্যাঙ্গের ক্ষুরধার সুরটা এড়ায় না জাহ্নবীর কানে।
রিনচেন খাবারের প্লেটগুলো বয়ে নিয়ে আসে ট্রে করে। চিকেন স্যুপ, রোস্ট, পোলাও, মাংস, পুডিং এর এলাহি আয়োজন।
“ইতনা কুছ তুমনে বনায়া হ্যায় ক্যায়া?”, অভীক রিনচেনকে জিজ্ঞেস করে। উত্তরের অপেক্ষা না করেই রিনচনের হাত ধরে টানে বেসামাল অভীক। “আই মাস্ট কিস ইয়োর বিউটিফুল...”, অভীক কথা শেষ করার আগেই রিনচেন ছিটকে সরে যায় কাত্যায়নী দেবীর দিকে, চোখে আতঙ্ক আর অসহায়তা।
“আরে রিনচেন মতলব প্রেশাস, তুমনেই কহা থা না? “, অভীক মাতাল স্বরে বলে ওঠে।
সরু চোখে রিনচেনকে জরিপ করে জাহ্নবী। এমন নাটক করছে কেন মেয়েটা? তখন অন্ধকার হলঘরে কেমন ফিসফিস করছিল অভীকের সাথে!
“তুম ইঁহা সে যাও রিনচেন। ইয়ে লোগ খুদ খানা খা লেঙ্গে।“, কঠিন আদেশের সুরে বলে ওঠেন কাত্যায়নী।
“ আরে নারাজ কিঁউ হো গ্যায়ি, রিনচেন?”, ফের জড়ানো গলায় বলে ওঠে অভীক। অভীকের দিকে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন কাত্যায়নী। মুখে যদিও কিছুই বলেন না আর।
“ আমি সত্যি দুঃখিত। আসলে মদের মাত্রাটা একটু বেশী হয়ে গেছে ওর আজ”, মুখ নীচু করে বলে জাহ্নবী। মহিলার চোখের দিকে তাকানোর সাহস হয় না আর ওর।
“শাট আপ!”, হঠাৎ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায় অভীক। অকথ্য একটা গালাগাল দিয়ে টলোমলো পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়।
ঠিক এই মুহূর্তে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে জাহ্নবীর, যদিও অভীকের এমন শিথিল ব্যবহার প্রথম নয় জাহ্নবীর জীবনে। খানিক গা সয়ে গেছে এখন! ক্যাসানোভা হিসেবে একটু আধটু দুর্নাম আছে ওর। পুরুষ মানুষ আর কবেই বা এক নারী কে নিয়ে তৃপ্ত থেকেছে? তবে এমন ব্যাড বয় ওর প্রেমে পড়েছে, শ্লাঘা অনুভব হয় বৈকি জাহ্নবীর! মেয়েগুলোর হিংসে দেখে হাসি পায় ওর! আর মেয়েগুলোও তেমন! সবল,সুন্দর পুরুষ দেখলেই একবারে টপ টপ করে জিভ থেকে জল পড়ে! রিনচেন কম ঢলানে? এখন ম্যাডামজীর সামনে ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানেনা যেন! এই ন্যাকা মেয়েটার জন্যেই ছুটিটা নষ্ট হচ্ছে ওদের। শীতল আগুনটার দহন ফের বুকের মধ্যে টের পাচ্ছে জাহ্নবী।
“আপনি কি সত্যিই দুঃখিত জাহ্নবী?” ,
জাহ্নবী চমকে দেখে মহিলা নির্নিমেষে তাকিয়ে আছেন জাহ্নবীর দিকে। আঁখিতারায় যেন দুটো আগুনের বিন্দু। জাহ্নবীর হঠাৎ মনে হয় কাত্যায়নী কোনো মানবী নয়। নিঝুমবাড়ির মতোই প্রাচীন, বাইরের জঙ্গলটার মতোই আদিম কেউ বা কিছু। হঠাৎ খুব শীত করে ওঠে জাহ্নবীর।
“ খেয়ে নিন আপনি। অভীক তো খাবার খাওয়ার অবস্থায় নেই।“ জাহ্নবীর ফের মনে হয় মহিলা তাকে আদেশ করছেন। কাত্যায়নী আসলে কে? এই বিশাল বাংলোতে, মনুষ্য সংসর্গ বিবর্জিত কী অদ্ভুত জীবন যাপন করেন তিনি!
“আপনি খাবেন না?”, জাহ্নবী কোনরকমে জিজ্ঞেস করে।
“আমি রাত্তিরে খাইনা। আপনি খান। চাকরি করেন আপনি?”
“হ্যাঁ, তথ্যপ্রযুক্তি ইঞ্জিনিয়ার। আপনি? মানে আপনি কি করেন? “
“ আমি? “, এই প্রথম একটা ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে ওঠে কাত্যায়নীর সরু ঠোঁটে। “ আমি এখানে অপেক্ষা করি, এই নিঝুমবাড়িতে।“ একটা ঠান্ডা স্রোত যেন বয়ে যাচ্ছে জাহ্নবীর চারপাশে।
“ অপেক্ষা? মানে?কার অপেক্ষা করেন?”,
“কারোর, কারোর। বুঝতে পারবেন সময় হলে। খাওয়া সমাপ্ত হয়েছে? আসুন আমার আর্ট স্টুডিও দেখাই।“
“আপনি তবে শিল্পী? ছবি আঁকেন?” জাহ্নবীর প্রশ্মের উত্তর দেয়না কাত্যায়নী।
সিঁড়ি দিয়ে কাত্যায়নীর পিছু পিছু এগিয়ে চলে জাহ্নবী। যা আন্দাজ করেছিল, মহিলা তার চেয়েও লম্বা আর শীর্ণা! সিঁড়ির মাথায় বাঁ দিকে ঘুরে যান তিনি, ওর আর অভীকের ঘরের উল্টো দিকের প্যাসেজ পেরিয়ে একটা বিশাল কাচের দেওয়াল ঘেরা হলঘরে এসে দাঁড়ায় ওরা। বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে অঝোর ধারে বৃষ্টি পড়ছে।
বিরাট বিরাট ক্যানভাস, পেইন্টের বালতি আর ইজেলে ভর্তি ঘরটা। কিন্তু ক্যানভাস একটা বাদে, সব সাদা চাদরে ঢাকা। যেটা খোলা রয়েছে তার ওপরে একটা উজ্জ্বল বাল্ব ফোকাস করা আছে। সে ছবিতে একটি প্রাচীন কক্ষে একটা সম্পূর্ণ নগ্ন পুরুষ দেহ শায়িত রয়েছে একটা কাঠের পায়া যুক্ত তক্তার ওপর। পুরুষটির দু হাত মাথার ওপরে তোলা ও লোহার শেকল দিয়ে কাঠের তক্তার সাথে বাঁধা। গোড়ালির কাছে দুই পায়ে পরানো লোহার আঙটা। কোনও প্রকার নড়নচড়ন অসম্ভব। গায়ে অসংখ্য কষাঘাতের দগদগে লাল নিশান। কিন্তু সবচেয়ে বীভৎস হলো পুরুষটির শিথিল লিঙ্গ ছিদ্র করে একটি লোহার দন্ড উল্লম্ব ভাবে উঠে গেছে কক্ষের ওপরে ছাদে।। দন্ডটি সম্ভবত ক্রমাগত ওঠা নামা করছে কক্ষের ছাদে ঝোলানো কপিকলের মাধ্যমে। নীচে লোহার এক পাত্রে ফোঁটা ফোঁটা জমা হচ্ছে কালচে লাল রক্ত। ছবি নয় মূর্তিমান বীভৎসতা! জাহ্নবী স্তব্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। এরকম বিষয় চয়ন করলেন কেন কাত্যায়নী? নিঝুমবাড়ির অপার্থিব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও আঁকতে পারতেন তিনি! হয়ত আঁকেন তাও, জাহ্নবী কেমন করে জানবে? কিন্তু এ কী? এটা কি শিল্প না মধ্যযুগীয় বর্বতার পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্রায়ন? এক প্রবল বিবমিষায় আক্রান্ত হয় জাহ্নবী। গায়ের শালটা মুখে চেপে ধরে সে। কিন্তু আরো অবাক হওয়ার বিষয় বাকি ছিল জাহ্নবীর! ছবির পুরুষটির মুখ আঁকেননি কাত্যায়নী! মুখের আদল রয়েছে, কিন্তু চোখ, নাক, ঠোঁট কিছুই নেই। একটা শূন্যতা বিরাজ করছে ক্যানভাসের ঐ স্থানে। কি আশ্চর্য! কে ঐ পুরুষ? কোন অপরাধের এমন বর্বর শাস্তি পাচ্ছে?
“মুখ আঁকেননি আপনি?”, জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারেনা জাহ্নবী।
“ এখনো সময় আসেনি আঁকার তাই। সে সময় না এলেই ভালো হয়, তবে সময় যদি আসে, আঁকতে বাধ্য হব আমি। “, কঠোর কিন্তু বিষণ্ন স্বরে উওর দেন কাত্যায়নী।
“ আমি আপনার কথা অর্থ বুঝলাম না ঠিক।“
“ সে বোঝারও সময় আগত হয়নি এখনো। আপনি এবার ঘরে যান জাহ্নবী। আমার কাজের সময় এখন। “
কাত্যায়নীর মৃদু স্বরে যন্ত্রচালিতের মত ঘাড় ঘোরায় জাহ্নবী। দরজার দিকে হাত দিয়ে ইশারা করেন কাত্যায়নী।
ঘরে ফিরে জাহ্নবী দেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে অভীক, মদ্যপের অসাড় নিদ্রা। অভীকের ভাষায় “আউট হয়ে যাওয়া”, নেশা করার পর কাঙ্খিত চরম অবস্থা! পাশে কম্বলটা টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ে জাহ্নবী। বাইরে নিকষ আঁধারে অবিশ্রান্ত বর্ষণে ডুবে যাচ্ছে নিঝুমবাড়ি। হঠাৎ চোখে জল আসে জাহ্নবীর। সুপুরুষ প্রেমিকের পাশেও, একই শয্যায়, আজ রাতে প্রগাঢ় নিঃসঙ্গতার সাথে বিষণ্ন সহবাস করবে সে!
৫•
ঘুমটা ভেঙে যায় জাহ্নবীর। একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনল কী সে? অভীক কে ডাকতে গিয়ে চমকে ওঠে সে, পাশের জায়গাটা খালি! কোথায় অভীক? বাথরুমে গিয়েছে? বাথরুমের দরজার কাছে গিয়ে ডাকবে বলে উঠে বসে জাহ্নবী আর ঠিক তখনই দ্বিতীয়বার চিৎকারটা শোনে সে! বেদনাদীর্ণ, বুকফাটা, যেন কেউ কাউকে পাশবিক আঘাতে করছে বারংবার! কার গলা? রিনচেনের নাকি? একটা তীব্র আতঙ্কে দম বন্ধ হয়ে আসে জাহ্নবীর। চিৎকারটা ঝোরার ঐদিক থেকেই তো আসছে মনে হয়!
হঠাৎ একটা কুটিল সন্দেহ খেলে যায় জাহ্নবীর মনে। বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে ছুটে যায় সে। দরজা আধ খোলা! সন্দেহটা এবার প্রত্যয়ের রূপ নেয় মনে মনে। তবে কী অভীক? রিনচেন?
তাও যদি হয়, মাথা বরফের মতো ঠান্ডা রাখতে হবে এখন জাহ্নবীকে! নিঃশব্দে,লঘু পায়ে, বেড়ালের মতো সিঁড়ি বেয়ে নামে জাহ্নবী। কাত্যায়নী দেবী কী জেগে এখনো? তবে ঐ আওয়াজ ওনার স্টুডিওতে কী করে পৌঁছাবে? সম্পূর্ণ অন্যদিকে অবস্থান সে ঘরের। হলঘরে এসে, মোবাইলের আলোতে একটা ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ছিটকিনি খুলে বাগানে নামে সে। এক মুহূর্তে বর্শার ফলার মতো বরফ ঠান্ডা বৃষ্টি ফোঁটা আর হিমহিমে বাতাসের স্পর্শে শিউরে ওঠে জাহ্নবী। অন্ধকারে আউটহাউসটার দিকে পা বাড়ায় ও। একটা জানলা দিয়ে হাল্কা মোমবাতির আলোর আভাস আসছে। সন্তর্পনে, কায়াহীন প্রেতিনীর মতো কাঁচের জানলাটার একপাশে একটু মুখ বাড়ায় সে। রিনচেনের নগ্ন শরীরের ওপর পিচ্ছিল গতিতে ওঠানামা করছে অভীকের পেশীবহুল পিঠ আর সুঠাম, সরু কোমর! একটা রোমশ হাত দিয়ে 3 সবলেও চেপে রয়েছে রিনচেনের নাক মুখ, অন্য হাত দিয়ে গলার কাছটা ধরে আছে। চিৎকারের বদলে এবার একটা অস্পষ্ট গোঙানির আওয়াজ আসছে মেয়েটার মুখ দিয়ে। নগ্ন পা দুটো ছটফট করছে বিছানায়। দু পায়ের মাঝখানের বিছানার চাদরটা লালে লাল! এক যন্ত্রণাকাতর পাহাড়ি কুসুম ফোঁটা ফোঁটা বিন্দুতে ফুটে উঠছে ঐ সস্তার চাদরে, রিনচেনের নরম যোনিপথ বেয়ে। একটা দুর্বল, অসহায় হাত ঠেলে সরাতে চাইছে শরীরের ওপরের পশুটাকে। অভীকের অন্ধ চোখে যেন একটা ক্ষুধার্ত শ্বাপদ বসে রয়েছে দেখল জাহ্নবী। চরম তৃপ্ত এখন সে! শিকার ফসকায়নি এবার!
ঘরে ঢুকবে নাকি জাহ্নবী? বাধা দেবে অভীক কে? মহান বিবেক টিবেক ইত্যাদি জাগিয়ে তুলবে জন্তুটার? ধুস! ঠোঁটে একটা ক্রুর হাসি ফুটে ওঠে জাহ্নবীর! উচিত শিক্ষা হয়েছে ছিনাল মেয়েছেলেটার! অত আঁটো ব্লাউজ, খাটো ঘাঘরা পরে, কোমর, পেট দুলিয়ে ঘুরবে পুরুষের চোখের সামনে আর কিচ্ছুটি হবে না তোমার বোন? অন্যের জিনিষের জন্যে খুব ছুঁকছুঁকানি না?
রিনচেনের পা দুটো এবার ধীরে ধীরে নিথর হয়ে পড়ছে, বোঝাই যাচ্ছে একমুঠো বাতাসের জন্য ছটফট করছে ও। কিন্তু অভীকের জান্তব উত্থান পতনের কোনো বিরাম নেই! দম আটকে মরে যাচ্ছে নাকি মেয়েটা? কতক্ষণ আর ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকবে জাহ্নবী? ওরে এবার থাম রে শালা!
ধুর মরুকগে যাক! কে জানছে? সে ছাড়া আর কেউ তো সাক্ষী নেই। টান মেরে ফেলে দিক খাদে! বাংলোটার দিকে নিঃশব্দে পা বাড়ায় জাহ্নবী। ঢোকার মুখে ওদের ঘরের ব্যালকনিতে চোখ পড়ে যায় ওর। কে? ও কে দাঁডিয়ে আছে? অন্ধকারে একটা সিল্যুট মাত্র। খুব রোগা, লম্বা একটা মানুষ না? কাত্যায়নী! না কই? কেউ নেই তো, তাছাড়া ঘরে তালা মেরে এসেছে জাহ্নবী।
ঘরে ফিরে ভেজা কাপড় জামা ছেড়ে গরম কম্বলের নীচে শুয়ে পড়ে জাহ্নবী। ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট আওয়াজে বোঝে অভীক ফিরেছে।
সকালে বেলা দেরী করে ঘুম ভাঙে জাহ্নবীর। মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। পাশের বিছানাটা আবার খালি! অভীক ফেরেনি? কিন্তু ফিরেছিল তো! আধছেঁড়া ঘুমে স্পষ্ট বুঝেছিল অভীক পাশে এসে শুয়ে পড়ল। গেল কোথায়? বিছানা ছেড়়ে ওঠে জাহ্নবী। বুকটা ধড়াস করে ওঠে এবার! অভীকের লাল ব্যাকপ্যাকটা নেই, শুধু জাহ্নবীর কালো স্যুটকেসটা পড়ে রয়েছে একই জায়গায়। গোটা ঘরেই অভীকের কোনো চিহ্ন নেই! যেন সে কখনো আসেইনি নিঝুমবাড়িতে, জাহ্নবী একাই এসেছে এখানে।
ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে জাহ্নবী। কেউ কোথাও নেই। একছুটে আউট হাউসটার কাছে যায় সে। ভেজানো দরজাটা ঠেলে দেখে রিনচেনের মৃতদেহটা থ্যাঁতলানো লাল রডোড্রেনডনের পাঁপড়ির মত পড়ে রয়েছে। জান্তব পেষণে রক্তাভ ওয়াইন বের করা হয়ে গেছে কোমল শরীরটার থেকে। প্রাণের নির্যাস টুকু শোষণ করার পর ছিবড়েটুকু পড়ে রয়েছে মাত্র। সারা শরীরে হিংস্র দাঁতের দংশনের কালশিটে, যোনিতে জমাট রক্তের ডেলা। ঘন কৃষ্ণবর্ণ চুলের ঢাল ছড়িয়ে আছে মুখের আশেপাশে। চোখের পাতা লেপ্টে আছে কালঘুমে। রিনচেন আর উঠবেনা।
কিন্তু অভীক কী তাহলে পালিয়ে গেল? এবার কী করবে জাহ্নবী তবে? আতঙ্কের ঢেউটা কে এক সেকেন্ডে গিলে ফেলে জাহ্নবী! মাথা ঠান্ডা করো, রিনচেনের শরীরের থেকেও ঠান্ডা! কি আবার করবে তুমি জাহ্নবী ! তুমি তো কোনো পাপের ভাগীদার নও।
বাংলোতে ফিরতে গিয়ে দেখে ওদের ভাড়া করা এসউভি টা দাঁড়িয়ে রয়েছে ঠিক সেখানেই, যেখানে পার্ক করেছিল অভীক। অদ্ভুত ছেলে তো! পায়ে হেঁটে পালানো সম্ভব নিঝুমবাড়ি থেকে?
সিঁড়ি দিয়ে উঠে কাত্যায়নীর স্টুডিওর দিকে পা বাড়ায় জাহ্নবী। শুধু জিজ্ঞস করবে অভীককে দেখেছেন কিনা মহিলা, ব্যস! বাকি কোনো কিছুই তো জানেনা জাহ্নবী! সে তো সত্যিই ঘুমোচ্ছিল এতক্ষণ। ঘুম থেকে উঠে অভীক কে খুঁজে পাচ্ছেনা, তাই এসেছে। দরকারে পুলিশকেও তাই বলবে সে। দেখা যাক টাকার অফার নেন কিনা মহিলা। সে রাস্তাও তো আছে! গত রাতের অন্ধকার স্মৃতি খাদটার গহ্বরে বসে রয়েছে এখন। কেউ খুঁজে পাবেনা!
স্টুডিওর দরজায় নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় জাহ্নবী। ওর দিকে পেছন ঘুরে মগ্ন হয়ে ছবি আঁকছেন কাত্যায়নী। দীর্ঘ শরীরটা ঝুঁকে রয়েছে ইজেলের ওপরে, মাথার শ্বেতশুভ্র কেশ ভার আলুলায়িত পিঠে। হাতের তুলি ক্ষিপ্র গতিতে ইজেলে ওঠা নামা করছে, যেন বাহ্যজ্ঞান রহিত প্রাচীন কোনো সাধিকা কাত্যায়নী! ইজেলের ঐ ছবি তার পূজার উপকরণ! ঘাড় না ঘুরিয়েই হঠাৎ মৃদু অথচ দৃঢ় স্বরে বলে ওঠেন কাত্যায়নী ,”আসুন জাহ্নবী, অপেক্ষা করছি অনেকক্ষণ, সময় হয়েছে এবার!” কেঁপে ওঠে জাহ্নবী। এবার এক মুহূর্তেই ক্ষিপ্র গতিতে ছবির সামনে থেকে সরে দাঁড়ান কাত্যায়নী।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই জাহ্নবীর চোখে গরম লোহার শলা ঢুকিয়ে দিল কেউ। গত রাতের সেই মুখাবয়ব হীন ছবিতে মুখ এঁকেছেন কাত্যায়নী। অভীকের মুখ! যন্ত্রণাক্লিষ্ট এক নিঃশব্দ চিৎকার অনুরণিত হচ্ছে অভীকের মুখ গহ্বর দিয়ে। অস্বাভাবিক জীবন্ত দুই চোখে ইজেল থেকে অভীক সটান চেয়ে আছে জাহ্নবীর দিকে! সে চোখে মৃত এক শ্বাপদ বসে আছে! অভীক নেই, অভীকের ছবি রয়েছে কাত্যায়নীর কাছে! না কি ঐ ছবিটাই অভীক? এখন থেকে ঐ ছবিতেই
অনন্তকাল থেকে যাবে অভীক এই নিঝুমবাড়িতে?
এবার কাত্যায়নী ঘুরে দাঁড়ান জাহ্নবীর মুখোমুখি । কাচের ঘরটা সহসা দুলছে জাহ্নবীর চোখের সামনে। খুব তীব্র গতিতে ঘুরছে ঘরটা এবার। জাহ্নবী দেখে তীব্র আলোক রশ্মির এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণের মাঝে শত শত ব্রহ্মাণ্ড, অসংখ্য সূর্য, অযূত কোটি তারকা, আর নক্ষত্রপুঞ্জ দ্রত বেগে ঘুরছে কাত্যায়নীকে ঘিরে। সেই মহাজাগতিক ঝঞ্জায় কাত্যায়নীর মাথার শুভ্র কেশ রাশি উড়ছে প্রবল বেগে। প্রবল ঘূর্ণনের মাঝেও একটি মাত্র তুলি হাতে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছেন কাত্যায়নী।
কাত্যায়নীর দুই প্রখর চোখে ও কার ছায়া পড়েছে?
কে ওই ভয়ংকরী? এক ঘোর কৃষ্ণবর্ণা করালবদনী, রুধিরাপ্লুত ওষ্ঠে নৃত্যরতা কাত্যায়নীর দুই আঁখি তারায়! সে উন্মাদিনীর হাতে তুলির বদলে উদ্যত খড়গ !
প্রচন্ড তেজরশ্মিতে পুড়ে যাচ্ছে জাহ্নবীর শরীর । চেতনা হারাচ্ছে এবার সে। একটা অন্ধকার পর্দা নেমে আসছে চোখের সামনে।
একটা প্রবন ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুমটা ভেঙে যায় জাহ্নবীর। ভাঙা গেলাসের টুকরোর পাশে শুয়ে আছে সে। ওর রাজারহাটের ফ্ল্যাট এটা, নিঝুমবাড়ি নয়। ওখান থেকে পালিয়ে এসেছে ও। কিন্তু রিনচেন আছে এই ঘরে নিশ্চিত সে। নিঝুমবাড়ি থেকে লুকিয়ে, লুকিয়ে পিছু করে আসছে জাহ্নবীর । ঐ, ঐ যে আবার সেই মারণান্তিক চিৎকার!
আর পারছেনা জাহ্নবী দৌড়াতে। দম বন্ধ হয়ে আসছে প্রবল স্মৃতিভারে। উঠে দশতলার খোলা বারান্দাটার দিকে পা বাড়ায় ও। রেলিংয়ে উঠে দুহাত প্রসারিত করে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে জাহ্নবী। মহাশূন্যের মাঝে বসে থাকা এক করালবদনী নিঃশব্দে গিলে নেয় ওকে।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.