
পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ ও রুটি উপাখ্যান
রাজেশ মাজি
আমি রাত্রিবেলা সাধারণত রুটি খাই। আমাদের বাড়ির রুটি একটু বড় ও মোটা সাইজের হয়। কাল রাতে ১৪ পিস রুটি খেয়ে তিন গ্লাস ঠান্ডা জল খেয়ে যখন পরম তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি, তখন জানতে পারলাম বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সব রুটি আমিই হজম করে ফেলেছি। আমার সহধর্মিণী এখন তার পুঁচকে সমেত বাপের বাড়িতে আছে। সে থাকুক বা না-ই থাকুক, সে থাকলেও আমাদের বাড়িতে এটি নিত্যদিনের ঘটনা। আমাকে সবার আগে পরম আদর-যত্নে খাওয়াবার পর জানতে পারি যে সব রুটি আমিই পেটস্থ করেছি। আবার আটা মেখে পুনরায় রুটি করা হয়, না হলে মুড়ি জিন্দাবাদ! চলতি কথায় বলতে গেলে- আমরা অরিজিনালি বাঁকুড়ার মাল; মুড়ি খেতে কোনো অসুবিধা হয় না। বাঁকুড়ার চাষা হওয়ার সুবাদে আমার পেটে সদাসর্বদা ব্রহ্মতেজ বিরাজমান, এবং এই শরীরটা পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ। ভগবান ও পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ ছাড়া এমন শরীর পাওয়া অসম্ভব।
আমার রাত্রিবেলা কমপক্ষে প্রমাণ সাইজের ৮ পিস রুটি লাগে; তার বেশি তো কম নয়। একবার SIR চলাকালীন অফিশিয়াল কাজের সূত্রে দুপুরে বি.ডি.ও (BDO) অফিসের ক্যান্টিনে আমার সহকর্মী বি.এল.ও (BLO)-দের সাথে রুটি খেয়েছিলাম। দুপুরে রুটি? হ্যাঁ, রুটিই আমার প্রথম পছন্দ। ১০টা রুটি নিমেষে শেষ করতে দেখে সহকর্মী মস্করা করে বললেন— 'ভায়া, তোমাকে আর যাই হোক, নেমন্তন্ন করা যাবে না।' আমি আর রুটি নিলাম না; আরও ৩-৪টে আরামসে খেতে পারতাম। ক্যান্টিনের দোকানিও বলল, 'দাদা আর রুটি হবে না, এবার যা আছে বাকি স্টাফদেরও দিতে হবে।' অগত্যা উঠতে বাধ্য হলাম।
আমার স্কুলে চাকরি জীবনের প্রথম অধ্যায়ে যা ভাত খেতাম—একেবারে শৈলচূড়া করে একথালা! দেখে সহকর্মীরা বলতেন, 'রাজেশ, খাওয়াটা একটু কমাও, অনেক বেশি হচ্ছে।' এখন ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছি, ভাত এখন বেশি খাই না। তবে রুটির প্রতি ভালোবাসা আমার একই রকম। ক্লাস ফাইভে আমাকে আমাদের স্কুলের এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহাশয় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'ভাত না রুটি প্রিয়?' আমি উত্তরে বলেছিলাম, 'রুটি'। তিনি ভ্রু কুঁচকে তিরস্কার করে বলেছিলেন, 'আশ্চর্য! বাঙালির ছেলে নাকি রুটি প্রিয়?' হ্যাঁ, আমার রুটিই প্রিয়। ভগবান ও পূর্বপুরুষ প্রদত্ত এই শরীরটি রুটি দিয়েই তৈরি।"
© রাজেশ মাজী

হিমের আঁচল
অনিন্দিতা সান্যাল
হিমাচলপ্রদেশ ভারতবর্ষের অন্যতম মনোমুগ্ধকর স্থান।প্রকৃতি পাহাড় ও অফুরন্ত বৃক্ষশ্রেণী দিয়ে সাজিয়ে উপহার দিয়েছে ভারতবর্ষকে। বেড়াতে গিয়ে দেখি একি অনির্বচনীয় শিল্প। পাহাড়ের কোলে কোলে ছোট ছোট বসতি। দিল্লী থেকে কয়েকশো মাইল দূরে এই পাহাড়ি রাজ্যটি যেন রূপকথার দেশ। বিয়াস নদী বয়ে চলেছে। কখন ভীষণ খরস্রোতা,কখন ভীষণ শান্ত। পাইন,ফার, শিশু প্রভৃতি গাছ নিয়ে ঘিরে রাখা আকাশছোঁয়া পাহাড়ের মাঝের উপত্যকাগুলি নৈসর্গিক। ঘুরে আসার পড়েও সেইসব দৃশ্য বারে বারে ফিরে আসে।
হিমোচলপ্রদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে বিশিষ্ট স্থানের অভাব নেই। সিমলা, কুল্লু,মানালি, মান্ডি,চাম্বা,সাংলা,কল্পা এবং আরো অনেকগুলো জায়গা যেখানে গেলে মনে হয়,আর শহুরে জীবনে ফিরবো না। ছোট একটা আবাস বানিয়ে কাটিয়ে দেব বাকি জীবন। যদিও নাগরিক তান উপেক্ষা করা কঠিন। পুরো হিমাচল ঘুরে দেখার মত পর্যাপ্ত সময় ছিল না। যে কয়েকটি জায়গায় গেছি তার মধ্যে নিজস্ব ভালো লাগার জায়গা ছিল ডালহৌসি। লর্ড ডালহৌসি যে কেমন ব্রিটিশ কর্মচারী চিলেন্টা সবিস্তারে প্রত্যেক ভারতীয় জানেন। কিন্তু স্থানের সাথে মানুষটিকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। অপূর্ব ভূখণ্ডটি। দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চেপে পাহাড়ের ঘুরপথে যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম,রাত হয়ে গেছিল।পাহাড়ের কোলে তখন অজস্র জোনাকির মত বসতি। টিমটিম আলোগুলো পাহাড়গুলোকে জড়োয়ার মুকুটের মত সাজিয়ে তুলেছে।আকাশের সব নক্ষত্র বুঝি নেমে এসেছে। স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে জানলাম পর্যটকরা ডালহৌসিকে শহর ভাবলেও আসলে এটা একটা গ্রাম। ব্রিটিশ শাসন পদার্পণ করার আগে চাম্বা'র রাজপরিবারের শানাধীন ছিল জায়গাটি। খাসা(khasa) সম্প্রদায়ের বাস ছিল। ১৮৫৩ সালে ব্রিটিশ রাজশক্তির কর্মচারী কর্নেল নেপিয়ার এবং গভর্ণর জেনারেল লর্ড যমজ রামসের উদ্যোগে অঞ্চলটি ব্রিটিশ রাজশক্তির নজরে আসে।শীতপ্রধান অঞ্চলটি তৎক্ষণাৎ করায়ত্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশরা। অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর এই অজুহাতে কাথলোগ, পোত্রে,বাকরোডা,টেরা এবং ভানগোরা চাম্বার তৎকালীন রাজপরিবারের থেকে অধিগ্রহণ করে ব্রিটিশ সরকার।১৮৫৪ সাল থেকে এই সবকটি জায়গার নবীকরণ শুরু হয়। ব্রিটিশ সরকারী কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের অত্যন্ত প্রিয় জায়গা হয়ে ওঠে স্থানটি। গড়ে ওঠে বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়।
ডালহৌসির অন্যতম আকর্ষণ হল সেন্ট যোহন'স চার্চ। ভিক্টোরিয়ান যুগে নির্মিত এই চার্চ। সময়টা ১৮৬৩ সাল। প্রাচীনতম এবং প্রথম চার্চ এই সেইন্ট যোহন'স চার্চ। চার্চের অন্দরে গ্লাস পেইন্টিংয়ের অপূর্ব কারুকাজ। সূর্য্যের আলো কাঁচের ওপর পরলে মনে হয় রামধনুর ছটা,মায়াময় করে তোলে সেই আলো প্রার্থনা ঘরটিকে।রেভারেন্ড জন.এইচ প্র্যাটের তত্ত্বাবধানে এবং চার্চ অফ ইংল্যান্ড(Protestant missionaries and British Settlers) দ্বারা গড়ে ওঠে চার্চটি। প্রাথমিকভাবে চার্চটি নির্মিত হয় কাঠ দিয়ে। পরবর্তীকালে রেভারেন্ড প্র্যাট স্থানীয় ব্রিটিশ অধিবাসীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে পাথর দিয়ে পুনর্নির্মিত করেন। কিন্তু নকশা একই ছিল। চার্চের নিজস্ব লাইব্রেরি রয়েছে,যেখানে আছে কিছু দুষ্প্রাপ্য বই এবং পাণ্ডুলিপি না থেকে জানা যায় আঞ্চলিক ইতিহাস এবং সভ্যতার বিবরণ। পুরো চার্চটা বেশ কয়েকবার ঘুরে দেখলাম। পাহাড়ের কোলে ওইটুকু জায়গায় ওমন সুন্দর নির্মাণশৈলী সচরাচর চোখে পড়েনি এর আগে। ভিতরের গ্লাস পেইন্টিং এবং কাঠের কাজ অনবদ্য। কনফেশন বক্সের নির্মাণে ছেনি হাতুড়ির নিখুঁত বিষয়টা আমি লিখে বোঝাতে পারবো না,চাক্ষুষ অনুভব করতে হবে। এবার বসলাম প্রার্থনাগৃহে। প্রার্থনা করতে আমি জানি না। শুধু নিষ্পলক তাকিয়ে থাকি। মনের ভিতর দিয়ে বয়ে যায় একটা আরামদায়ক ঠান্ডা স্রোত। চার্চের অলৌকিক নিস্তব্ধতা এবং পরিশুদ্ধতা শান্ত করে তুলছে সমস্ত শিরা উপশিরাকে। কি ফেলে এসেছি,কি ভোগ করছি আর কি ফেলে যাব,সব কিছুর ঊর্ধ্বে এই সময়টুকু নির্মল সত্য,যেখানে আমি আর ঈশ্বর । মাঝে কেউ নেই। চোখ বন্ধ করতে ফুটে উঠলো প্রিয় মানুষদের মুখ। হাল্কা শীতল বাতাস,যা আমি গঙ্গার পাড়ে বসে পাই,ঠিক সেই রকম পড়ন্ত বিকেলের পাহাড়ি বাতাস বয়ে গেল আমাকে ঘিরে। স্থান আলাদা,কাল আলাদা কিন্তু অনুভূতি একই.…..পরিতৃপ্তির। যান্ত্রিক সভ্যতার হতাশা থেকে ক্ষণিকের মুক্তি দিয়ে আমাকে ঋণী করে গেল চার্চটি। মনে মনে কথা দিলাম......আবার আসবো ডালহৌসি তোমার এই উপাসনার আঙিনায়।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.