
হিপি
মনোজিৎ বসু
"দম্ মারো দম্ মিট যায় গম
বোলো সুবহ শাম হরে কৃষ্ণ হরে রাম"........
আনন্দ বকশী -র লেখায়,আর ডি বর্মনের সুরের জাদুতে,আশা ভোঁসলের গলার মাদকীয় নেশাতে আর পর্দায় লাস্যময়ী তন্বী জিনাত আমানের শরীরী ভাষায় দুলে উঠেছিলো আসমুদ্রহিমাচল।সালটা ১৯৭১।
একদিকে নকশাল আন্দোলনের ঢেউ সত্তর দশকের শহর কোলকাতাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে,আর অন্যদিকে সেই সময় শহরে পায়ের ধুলো পড়েছে একদল মার্কিন তরুণ তরুণীর যাদের আমরা হিপি বলে জানি।
উস্কোখুস্কো অস্তিত্ব,অগোছালো অবিন্যস্ত লম্বা চুল,একমুখ দাড়ি,উজ্জ্বল রঙের ছোপ ছোপ চাপা জামা,আবার কখনও ঝলমলে কুর্তা,বেলবটম প্যান্ট,কখনও জিন্স,বেশিরভাগ পুরুষই খালি পায়ে।মেয়েদের পোশাকও তথৈবচ।পিঠে মেলে রাখা খোলা লম্বা চুল,চোখ ধাঁধানো রঙের টপ্, কুর্তা,কখনও ঢলঢলে আলখাল্লা ,জিন্স, হট প্যান্ট,পায়জামা,আবার কখনও কোমরের অনেকটা নিচে জড়ানো শাড়ি।ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে হাতে গলায় মালার বাহার, চুড়ি, বালা,বিভিন্ন রকমারি বাহারের গয়না। কারোও কারোও চোখে উজ্জ্বল রোদচশমা।ট্রেডমার্ক অ্যাপিয়ারেন্স যাকে বলে।লক্ষ ভিড়েও হিপিদের চিনে নিতে কোনো অসুবিধে হয়না।
কিন্তু এরা কারা?এরা কেনো?
১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুকে সংগঠিত একটা যুব আন্দোলনের ঢেউ ওঠে এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।এরাই সেই হিপি(হিপ্পি)।
হিপিরা নিজেদের একটা সম্প্রদায় তৈরি করে নেয়।সঙ্গীত,যৌনতা আর নেশা, এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সমস্ত সামাজিক প্রথার বিপরীতে বয়ে চলা নদীর ঢেউয়ের আরেক নাম হিপি।
এদের অনেককেই দেখা যেতো গিটার নিয়ে গান গাইতে, নাচতে।গান ছিলো তাদের জীবনধারার একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।কিন্তু তার থেকেও বেশি ছিলো অবাধ ও বিকৃত যৌনতা আর মাত্রাতিরিক্ত নেশা।মারিজুয়ানা পট স্মোকিং, চরস,গাঁজা,হেরোইন,এল এস ডি,বিভিন্ন রকমের ড্রাগসের ছড়াছড়ি তাদের জীবনে।
"ধোঁয়া ধোঁয়া ধোঁয়া,না পারি সইতে
পারি না কইতে"......
বোহেমিয়ান জীবনে অভ্যস্ত হিপিদের মতাদর্শ ছিলো - "জন্ম আর মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই নেই।তাই মাঝের ক'টা দিন নিজের মত বাঁচো,আনন্দ ফুর্তি করো।সামাজিক নিয়ম কানুন ভেঙ্গে জীবনটাকে শরীর ও মন দিয়ে শুধু উপভোগ করো।"
পারিপার্শ্বিক সামাজিক সভ্যতার প্রতি ঘৃণা অবজ্ঞা ঝরে পড়তো পথভ্রষ্ট তরুণ তরুণীদের উদাসীন চোখে।রাষ্ট্রের ধনতান্ত্রিক ও যান্ত্রিক জীবনযাপনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই ছিল হিপিদের একমাত্র আদর্শ সম্ভবত।
জ্যাক কেরুয়াক (বিটনিকদের ‘প্রিন্স’ বলা হয়) তাঁর একটি রচনায় (‘ভিজনস অফ জিরার্ড অ্যান্ড ট্রিসটেস’ ১৯৬৪) প্রশ্ন করছেন : ‘মানুষকে এত দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হয় কেন? কেন আমরা আশায় উদ্ভাসিত মানুষের প্রশস্ত ললাট লক্ষ্য করে তপ্ত লৌহশলাকা ছুড়ে মারি?’ উত্তরে একজন বলছেন : ‘জিরার্ড, তুমি ছেলেমানুষ, তাই এখনও জানো না—জীবনটা একটা জঙ্গল, যেখানে মানুষ খাচ্ছে মানুষকে—হয় তুমি খাবে, না—হয় তোমাকে খাবে, যেমন বেড়াল—ইঁদুর খাচ্ছে, ইঁদুর পোকা খাচ্ছে, পোকা চিল খাচ্ছে, আবার শেষে সেই পোকা মানুষকেও খাচ্ছে।’
"There’s no explaining your way out of the evil of existence–‘In any case, eat or be eaten’–we eat now, later on the worms eat us."
হিপিদের জীবনদর্শন যেন বেশ খানিকটা মিলে যায় বৌদ্ধ - বৈষ্ণব সহজিয়াদের সাথে।গান নেশা যৌনজীবন সবেতেই সহজিয়াদের ছায়া,দর্শন।
মধ্য কোলকাতার কিড স্ট্রীটের ছোট ছোট হোটেলগুলোই মূলত এই শহরে হিপিদের আড্ডা বা ঠেক ছিল।নিজেদের লোক ছাড়া কম কথা,খালি পায়ে ঘুরে বেড়ানো, খ্রীষ্ট ধর্মের প্রতি মোহ মায়া ভক্তি শ্রদ্ধা নেই বললেই চলে, বরং বৌদ্ধ বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি কিছুটা অনুরাগ......গাঁজার নেশায় দুলে দুলে হরিনাম - কৃষ্ণনাম জপ.....
"একই অঙ্গে এত রূপ দেখিনি তো আগে"।
বাউন্ডুলে ভ্রাম্যমাণ বোহেমিয়ান হিপিরা ঘুরে ঘুরে বেড়াতো এই শহর থেকে অন্য শহর,এক দেশ থেকে অন্য দেশ।তবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে কোনোরকম ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণ করতে তাদের এতটুকু উৎসাহ ছিল।বরং এদের নেশা ও অবাধ যৌনতার গালগল্পে তদানীন্তন সমাজের যুব সম্প্রদায় হয়তো কিছুটা প্রভাবিত হলেও হয়ে থাকতে পারে।তবে একটা কথা ইতিহাস জানায় যে এরা সবাই প্রবল ভাবে যুদ্ধবিরোধী একটা সম্প্রদায়।বলা যেতে পারে একমণ চোনায় ওই এক ফোঁটাই দুধ।
এদের সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তাতে সামাজিক চোখে দেখলে হিপিদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা জন্মানো শক্ত।অন্তত আমরা যারা কায়েমি শাসনব্যবস্থার সামাজিক গন্ডিতে বাঁচতে অভ্যস্ত তাদের কাছে হিপিরা কখনও হাসির খোরাক,আবার কখনও ঘৃণার নিন্দার পাত্র।
তবুও পৃথিবীর ইতিহাসে হিপিরা একটা অধ্যায়।যে অধ্যায়ের পাতায় পাতায় নেশার আগুনের পোড়া দাগ,যৌনতার রক্তের ছিটে,গিটারের তারের মূর্ছনা।
আর.......
'হরে কৃষ্ণ হরে রাম'।।।।

বুদ্ধদেব বৌদ্ধধর্ম এবং স্বামীজি
শৌনক ঠাকুর
এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে বুদ্ধদেবের আদর্শ, জীবনচর্যা, ত্যাগ, তিতিক্ষা, বলিষ্ঠতা স্বামীজিকে মোহিত করেছিল। বুদ্ধের প্রতি ছিল প্রগাঢ় ভক্তি ও নিষ্ঠা। তাঁর বলিষ্ঠ ঘোষণা —- “আমি বুদ্ধের দাসানুদাসের দাস!” কিন্তু বৌদ্ধধর্ম? বৌদ্ধসংঘ?
এ বিষয়ে স্বামীজি বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বিরূপ মত পোষণ করেছেন। শুধু মত পোষণ করে ইতি টানেন নি, যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন এগুলো কেন যুগোপযোগী বা বাস্তবোচিত নয়। তবে নেতিবাচক দিকে যাওয়ার আগে আমরা বিবেকানন্দের হাত ধরে বুদ্ধদেবের কাছে যায়। বিবেকানন্দের চোখ দিয়ে তাঁকে আর একবার দেখি।
বুদ্ধদেব কথিত আত্মশুদ্ধির বিষয়টি স্বামীজিকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এই আত্মশুদ্ধির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ‘মুক্তির চাবিকাঠি’। তাই তিনি জীব সেবার মধ্য দিয়ে শিব সেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ধ্যানরত বুদ্ধমূর্তি দেখে তাঁর মনে হয়েছে, মানুষকেই বড় করেছেন বুদ্ধ। মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছেন নিজের আত্মশুদ্ধির দিকে।
স্বামীজীর চোখে বুদ্ধদেব হলেন দৃঢ়চিত্ত, প্রাজ্ঞব্যক্তি। তাঁর মধ্যে কোন লোভ ছিল না, বিভ্রান্তি ছিল না, ছিল না মোহ। এটিই বুদ্ধদেবের প্রকৃত স্বরূপ। তাই স্বামীজি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আহা! তাঁর মহাশক্তির এককণাও যদি আমার থাকত!”
দৈবশক্তি অপেক্ষা স্বীয়শক্তিতে বিশ্বাস রাখাটা শ্রেয়। তবেই মনের অন্ধকার দূরীভূত হবে। ঘটবে সাফল্যের সূর্যোদয়। তাই চলার পথে বুদ্ধের মতো বিবেকানন্দও বিশ্বাস রেখছিলেন আত্মনির্ভরতায়, আত্মশক্তিতে, এবং অধ্যাবসায়। এ প্রসঙ্গে তাঁর মতামত “মানুষ হীন নয়, দেবাধীন নয়, মানুষ তার উদ্যমে ও অধ্যাবসায়ে মহীয়ান।” ( অর্ঘ্য ,১৯৭৭ )
স্বামীজীর দৃষ্টিতে বুদ্ধদেব পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। বুদ্ধদেবের সময় ব্রাহ্মণদের অত্যাচার, অনাচার, অনিয়ম ছিল সীমাহীন। এই ক্ষমতার দম্ভের কাছে তিনি মাথা নত করেন নি। সকল ঝড় ঝাপটা সহ্য করে মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
বুদ্ধের সাম্যবাদী চিন্তাচেতনা বিবেকানন্দের পছন্দ ছিল। মানবিক বুদ্ধের মত স্বামীজিও ঘোষণা করেছিলেন সকলের সমানাধিকার। ধনী দরিদ্র সকলেই মানুষ। নিরন্ন, চণ্ডাল, দরিদ্র সকল ভারতবাসীকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। ‘ভাই’ শব্দে সম্বোধন করেছিলেন। প্রান্তিক মানুষের মুখের ভাষা, রীতি-নীতি, আচরণ শিখে, তাদের সঙ্গে মেলামেশা করে তিনি তাদের একজন হতে চেয়েছিলেন। এটি যে বুদ্ধদেবের ভাবাদর্শের প্রতিফলন তা বলা বাহুল্য মাত্র।
বুদ্ধদেবের সহজ, সরল, সাবলীল জীবনযাত্রা স্বামীকে বরাবরই আকর্ষণ করত। তিনি প্রকাশ্যে কোমল হলেও ভিতরে ছিলেন শক্তিমানের মতই মহাশক্তিতে বলীয়ান। শক্তিমান পুরুষ। স্বামীজীর শব্দে, “সর্বত্রই সেই এক প্রাজ্ঞ মনীষী,সেই সমর্থ শক্তিমান পুরুষ।”
বুদ্ধদেবের কর্মপন্থা, সাংগঠনিক শক্তি স্বামীজিকে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিনা অস্ত্রে, বিনা প্ররোচনায় শুধুমাত্র বাণীর দ্বারা তিনি মানুষের মন-মন্দিরে চির আসন লাভ করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল তরবারির সহায়তায় যে জয় হয় সেটা আসল জয় নয়। মানুষের মনকে জয় করতে পারাটাই, প্রকৃত জয়লাভ। বুদ্ধদেব এই কাজটি করতে পেরেছিলেন। আসলে বুদ্ধদেবের আস্থা ছিল ‘ভালবাসা ঘৃণাকে জয় করতে পারে’। কারণ
‘ময়লা দিয়া ময়লা ধোয়া যায় না।’ এই মতাদর্শ স্বামীজী তাঁর বহুভাষণে উল্লেখ করেছেন।
স্বাধীনতাবোধ ও নিরভিমানতা ছিল বুদ্ধদেবের সম্পদ। বারনারী অশ্বপালীর (মতান্তরে আম্রপালি) নিমন্ত্রণে তিনি নির্দ্ধিধায় গিয়েছিলেন। মৃত্যু ঘটতে পারে জেনেও তিনি এক অন্ত্যজের গৃহে ভিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। স্বামীজি লিখছেন চুন্দ নামক এক ব্যক্তি প্রচুর শূকরের মাংস এবং অন্নব্যঞ্জন প্রস্তুত করে বুদ্ধদেব ও তার শিষ্যগণকে পরিবেশন করেছিলেন। বুদ্ধদেব তার শিষ্যদের সেই খাদ্য ভক্ষণ করতে বারণ করলেন। কিন্তু নিজে যথাসাধ্য আহার গ্রহণ করলেন। তিনি প্রমাণ করলেন তাঁর সঙ্গে অতি সাধারণ মানুষের কোন তফাৎ নেই। বুদ্ধদেবের বক্তব্য ছিল– “চুন্দর কাছে গিয়ে তাকে জানিয়ে এসো, তার মত উপকারী বন্ধু আমার আর কেউ নেই। কারণ তার দেওয়া খাদ্য গ্রহণ করেই আমি নির্বাণ লাভ করতে চলেছি।” এই ঘটনা প্রমাণ করে জাতিভেদ বা ধর্মভেদ বা ধনী দরিদ্রদের ভেদাভেদের উপর নির্বাণ বা মোক্ষ লাভ নির্ভর করে না। তা একান্তই একাগ্রতা, অধ্যাবসা, ও নিষ্ঠার ফল।
আসলে সংসারের ষড়রিপুকে ত্যাগ করাটাই কঠিন। লতা পাতার মত এগুলি মনকে আষ্টেপৃষ্ঠে রাখে। বুদ্ধের উপদেশ, “রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান— এই হল পঞ্চস্কন্ধ বা পঞ্চতত্ত্ব যা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল, এবং পরস্পরের সঙ্গে সংমিশ্রিত। এরই নাম মায়া।” কোন একটি বিশেষ অবস্থা সম্পর্কে কিছুই বলা যায় না। কারণ একসময় যা ছিল, এখন আর তা নেই। গত হয়েছে। বা পরিবর্তন হয়েছে। বুদ্ধের কথা উদ্ধৃত করে ধরে স্বামীজি বললেন, “কিন্তু হে মানব, জেনো যে, তুমি সাগরস্বরূপ!”
বুদ্ধদেবের চিন্তা-চেতনা ও মতবাদে
অদ্বৈত বেদান্তের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। জনৈক বৌদ্ধ-লেখক অমর সিংহ তাঁর গ্রন্থে এ কথা স্বীকার করেছেন। আসলে ঈশ্বর সকলেই মধ্যেই বিরাজিত। “সর্বং খলু ইদং ব্রহ্ম” অর্থাৎ সর্বত্রই ব্রহ্ম আছেন। তাই সবাইকে নিজের মত দেখা উচিত।
বুদ্ধদেবের সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ স্বামী বিবেকানন্দ আজীবন মেনে চলেছিলেন। যার সার্থক প্রয়োগ বেলুড়ে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার সময় আমরা দেখতে পাই। বিবেকানন্দের চোখে বুদ্ধদেব মহামানব। মানব কল্যাণের জন্যই যার জন্ম। পদে পদে বিপদগ্রস্ত, বিভ্রান্ত মানুষকে তিনি সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন। অসাধারণ মানুষ হয়েও থেকেছেন অতিসাধারণ হয়ে। এবার আসি বৌদ্ধসংঘ ও বৌদ্ধধর্মের সম্পর্কে স্বামীজীর মূল্যায়ণে।
আমরা জানি মানুষ-পূজা বৌদ্ধধর্মে একেবারেই ব্রাত্য। তারা এর কট্টর বিরোধী। কিন্তু বুদ্ধদেবের মৃত্যুর পর দেখা গেল বৌদ্ধস্তূপ, বৌদ্ধবিহার নির্মিত হল। বুদ্ধদেবের মূর্তিতে চলল পূজা, অর্চনা, দীপ, ধূপ, ধূনা। অথচ এক শিষ্যের প্রশ্নের উত্তরে বুদ্ধদেব স্বয়ং বলে গেছেন – “আমাকে নিয়ে তোমাদের কিছুই করণীয় নেই।”
বুদ্ধদেব বলতেন তাঁর সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোন তফাৎ নেই। কিন্তু তাঁর জীবিত অবস্থাতেই তাঁর শিষ্যরা এটি মানতে চাননি। বুদ্ধদেব যখন খুব অসুস্থ আর কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর নির্মাণ লাভ হবে, তখন একজন তার সাথে দেখা করার চেষ্টা করলেন কিন্তু অনুমতি দিতেন না তাঁর ভক্তপ্রাণ শিষ্যরা। অথচ বুদ্ধদেব সারা জীবন প্রচার করে গেছেন তিনি আর পাঁচটা সাধারণ লোকের মত তিনি সাধারণ। কিন্তু বৌদ্ধসংঘ তাঁকে সাধারণ থেকে অসাধারণ স্তরে উন্নীত করেছেন। তিনি হয়ে গেলেন বুদ্ধদেবতা।
বৌদ্ধদের অহিংসার বিষয়টি স্বামীজির কাছে বড়ই গোলমেলে ছিল। তিনি বলেছেন তত্ত্ব হিসেবে অহিংসা উত্তম। কিন্তু প্রয়োগগত দিকে থেকে তা একেবারেই অবাস্তব। বাড়িতে যদি চোর ডাকাত পড়ে সেক্ষেত্রে গৃহকর্তার কি কর্তব্য? চোরকে স্বাগত জানানো? না প্রতিহত করা? একবার স্বামীজি সিংহল গিয়েছিলেন। সেখানে হিন্দুধর্মের আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়েছিল। তখন অখণ্ড ভারত। সিংহলে ছিল বৌদ্ধধর্মের আধিপত্য। তৈরি হয়েছিল বড় বড় বৌদ্ধবিহার, মঠ। স্বামীজীর ভাষণ শুরু হতেই বৌদ্ধধর্মের অনুগামীরা হই-হট্টগোল শুরু করে দিলেন। স্বামীর বাধ্য হন ভাষণ থামিয়ে দিতে। তবে তিনি অনুগামীদের উদ্দেশ্য বলেন ‘অহিংস’ ‘অহিংস’ ‘অহিংস’। অর্থাৎ অহিংসার কথা বললেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুব কমই ছিল।
বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা ‘এক জ্ঞানই সত্য’। বহু জ্ঞান মিথ্যা বা অজ্ঞান। এই তথ্যটি স্বামীজীর কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য হয়নি। তিনি স্পষ্ট বলেছেন বৌদ্ধধর্মের ক্রম অবনতির অনিবার্য কারণ এই মতবাদ।
সূত্রাকারে আবদ্ধ বা কতগুলি নিয়মের রেলপথে কখনই জীবন অতিবাহিত হতে পারে না। জীবন নদীর মত বহমান। পদে পদে বাঁক। মূর্হু মূর্হু পরিবর্তন। আসলে জীবনকে যাপন করতে হয়। কোন জিনিস যদি জোর করে আরোপ করা হয় তাহলে তা একদিন বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বৌদ্ধধর্মের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। স্বামীজি বিশ্বাস করতেন কোন মানুষের তার অগাধ জ্ঞান, অসীম পাণ্ডিত্য রয়েছে কিন্তু তিনি যদি তা প্রয়োগ না করেন তাহলে সে জ্ঞান বা পাণ্ডিত্য থেকে লাভ কি? হিন্দুধর্মের সুবিধা হল এই ধর্ম আরোপে নয়, যাপনে বিশ্বাস করে। এখানে সততা, আদর্শ, ন্যায়-নীতি, দান, ত্যাগ তিতিক্ষা সব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োগমূলক ব্যাপারটি এখানে তেমন নেই। অথচ স্বামীজি মত ‘নিষ্ঠাই সিদ্ধির ধ্রুব সহায়ক।’
মানুষের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমাত্মা এবং জীবাত্মার মিলন। অর্থাৎ ‘ঈশ্বর আর পরম পিতা এক ও অভিন্ন’ — এটাই শ্রেষ্ঠ উপলব্ধি। স্বামীজি বক্তব্য কেউ যদি মূর্তি পূজার মাধ্যমে এটি উপলব্ধি করতে পারে তাহলে অবশ্যই সে মূর্তি পূজা করবে। যদি কেউ নিরাকার উপাসনায় সিদ্ধিলাভ করে তাহলে সে তাই করবে। কারণ ঈশ্বর সর্বভূ। ‘সর্বং স্থিত’। তিনি অণু অপেক্ষা অণীয়ান, মহৎ অপেক্ষা মহীয়ান। অর্থাৎ স্বামীজি এখানে মোক্ষলাভের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেন। মাধ্যমটিকে নয়।
আসলে জ্ঞান মনকে প্রস্তুত করে। পথ দুটি — প্রেয় বা প্রবৃত্তি, শ্রেয় বা নিবৃত্ত। যে যেটিকে গ্রহণ করে। বাহ্যিক সৌন্দর্য ত্যাগ করে অন্তঃকরণে-স্থিত ‘রত্নধন’-এর সন্ধান যে পায় সেই জীবনের প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে পারে।
নির্বাণ লাভ বা মোক্ষলাভ সম্পূর্ণভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম ও মনঃসংযোগের ফল। এর সাথে জাত, ধর্ম, বর্ণের কোন সম্পর্ক নেই। বিবেকানন্দ বলেছেন বুদ্ধদেব সারা জীবন এগুলি প্রচার করে গেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে শিষ্যরা এই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেন নি।
তবে স্বামীজি এগুলির পাশাপাশি বৌদ্ধধর্মের কয়েকটি বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করেছেন।
বৌদ্ধধর্ম পৃথিবীর প্রথম প্রচারিত ধর্ম। আর এই একমাত্র ধর্ম যে অন্য কোন ধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে কেবল নিজের পথে, নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে গেছে। আসলে বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ হল ব্রাহ্মণ্যবাদ, তাদের অত্যাচার, জাতিভেদ প্রথা, ধনী-দরিদ্রদের মধ্যে ব্যবধান, অন্ত্যজশ্রেণির প্রতি অবহেলা, ইত্যাদি। স্বামীজী নিজেও এ কথা স্বীকার করেছেন “বৌদ্ধ ধর্ম একটি নূতন ধর্মরূপে স্থাপিত হয় নাই ; বরং উহার উৎপত্তি হইয়াছিল সেই সময়কার ধর্মের অবনতির সংশোধনরূপে।”
আসলে স্বামীজির চোখে বুদ্ধদেব কোন একক ব্যক্তি নন। তিনি একটা অবস্থা। একটা সত্ত্বা। কৃচ্ছসাধনের মধ্য দিয়ে বুদ্ধত্ব বা নির্বাণ বা মোক্ষ লাভ করতে হয়। এটাই জীবনের আসল উদ্দেশ্য। স্বামীজির বক্তব্য দিয়েই শেষ করা যাক — “বুদ্ধত্ব এক উচ্চ অবস্থা প্রাপ্তি, কোন ব্যক্তি বিশেষ নয়। সত্যই জগতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সম্পূর্ণ প্রকৃতস্থ ছিলেন — জগতে যত লোক জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র স্থিরপ্রজ্ঞা ব্যক্তি।”
_____________
১.স্বামী বিবেকানন্দের জীবনাদর্শে বুদ্ধ ভাবাদর্শের প্রকাশ : ড. মিলটন কুমার দেব
২.Swami Vivekananda And The Buddha : Sister Nivedita
৩. স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা : উদ্বোধন কার্যালয় কলকাতা
৪. যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে দেওয়া 'বুদ্ধের ধর্ম' শীর্ষক বিবেকানন্দের ভাষণ
৫. Wikipedia

সমুদ্রের দেবী
ঈশিতা ভাদুড়ী
অনেক সময়ই মানুষ যুক্তিবুদ্ধি বা প্রমাণের উপর ভিত্তি না করে কোনও অলৌকিক শক্তি, ভাগ্য, জাদু বা কুসংস্কারের উপর নির্ভর করে বিশ্বাস করে, সেখান থেকে আশ্চর্য সব কথকতার সৃষ্টিভয়, হয়তো সেসব আধুনিক বিজ্ঞান বা যুক্তির বিপরীত, তবুও সেসব অস্বীকার করা হয় না। শুধু আমাদের দেশে নয় বিশ্বব্যাপী এই অন্ধ বিশ্বাস আর কথকতা ছড়িয়ে আছে।
হংকং-এর টিন হাউ মন্দিরগুলো (Tin Hau Temples) মূলত সমুদ্রের দেবী টিন হাউ-কে উৎসর্গীকৃত, যা জেলে ও নাবিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করা হয়। এই মন্দিরগুলোর মধ্যে রিপালস বে (Repulse Bay)-এর রঙিন মন্দিরটি উল্লেখযোগ্য, যা সমুদ্র-দেবী টিন হাউ-এর বিশাল মূর্তির জন্য বিখ্যাত। এখানে দীর্ঘায়ু সেতু (Longevity Bridge) রয়েছে, যা পার হলে আয়ু বাড়ে বলে বিশ্বাস করা হয়। এটি একটি জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট প্লেস, যেখানে সৌভাগ্য প্রার্থনা ও অন্যান্য আচার পালন করা হয়। আবার ইয়াউ মা তেই (Yau Ma Tei)-এর মন্দিরটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যা টেম্পল স্ট্রিট (Temple Street) নাইট মার্কেটের পাশেই।
‘কজওয়ে বে’-তেও টিন হাউ টেম্প্ল্ রয়েছে। যদিও হংকং-এ অনেকগুলি টিন হাউ টেম্প্ল্, কিন্তু ‘কজওয়ে বে’-র এই মন্দিরটির অন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটিও একটি ঐতিহাসিক স্থান, যা ভিক্টোরিয়া পার্ক (Victoria Park)-এর কাছে অবস্থিত এবং টিন হাউ মেট্রো স্টেশন (Tin Hau MTR Station)-এর নামকরণ এর থেকেই হয়েছে। গ্রানাইটের এই মন্দিরটি কবে নির্মিত হয়েছে জানা যায়নি, তবে মন্দিরের ঘন্টাটি নাকি ১৭৪৭ সালে তৈরী।
হংকং-এ অ্যাবার্ডিনে টিন হাউ মন্দিরটিতে রয়েছে সুদীর্ঘ সমুদ্র-পাড়ির ইতিহাস, হংকং-এর মানুষজন সমুদ্রের দেবী ‘টিন হাউ’-এর প্রতি অনুগত। এখানে স্থানীয় জেলেরা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে ভাল মাছের মরশুমের জন্য। স্ট্যানলি-তে আরেকটি টিন হাউ টেম্প্ল্ রয়েছে। কথিত রয়েছে দেবী টিন হাউ গ্রামবাসীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। মন্দিরটি স্ট্যানলি মার্কেটের পেছনে Ma hang গ্রামের লাগোয়া অঞ্চলে।
এই মন্দিরগুলো হংকং-এর সমৃদ্ধি, চীনা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ, যা স্থানীয় ও পর্যটকদের কাছে সমান জনপ্রিয়। প্রতি বছর, তৃতীয় চান্দ্র মাসের ২৩তম দিনে, হংকং জুড়ে সমুদ্র দেবী (তিয়ান হাউ)-এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত মন্দিরগুলিতে একই সাথে তাঁর জন্মদিন উদযাপনের উৎসব পালিত হয়। উৎসবমুখর পরিবেশে কুচকাওয়াজ, কনফেটি কামান, মেলা এবং ঐতিহ্যবাহী গান পরিবেশনের মতো আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়।
১৮৭৩ সালে শাউ কেই ওয়ানের জেলেরা টিন হাউ মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, যা দীর্ঘদিন ধরে একটি মাছ ধরার গ্রাম ছিল। টিন হাউ, যার নামের অর্থ স্বর্গীয় রানী, তাঁকে দেবতা ঘোষণা করার আগে লিন মো নামে সং রাজবংশের একজন মহিলা ছিলেন। তিনি প্রায় এক হাজার বছর আগে ফুজিয়ানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর কাছে অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে বলে কথিত আছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষমতা এবং হিংস্র ঝড়ের কবলে পড়া জেলে ও নাবিকদের রক্ষা করার ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
ঐতিহাসিক বিবরণের উপর নির্ভর করে, আঠাশ বছর বয়সে, কোনও উদ্ধারকার্যে তিনি হয় মারা গিয়েছিলেন অথবা একদিন একটি পাহাড়ের ওপরে উঠে যান এবং ঘোষণা করেন যে তিনি একজন দেবী হতে চলেছেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যে তাঁকে নিয়ে এমন অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল যে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বর্গীয় সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কত কী বিশ্বাস রয়ে গেছে মানুষের অন্তরে!

আঞ্চলিক
শিবানী চ্যাটার্জী
একবিংশ শতকের মাঝে আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি।আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়ে হয়তো ভুলেছে মানুষ অনেক কিছু,আবার অনেকে সেই ফেলে আসা দিনগুলো নিয়ে বারবার ফিরে যাই নষ্টালজিক দিনের অন্দরমহলে। কারো প্রশ্ন থাকতেই পারে কি লাভ এসব ভেবে? কিন্তু মনন,দর্শন,চিন্তা ভাবনা এগুলো মস্তিষ্ক প্রসূত বলে কেউ কেউ ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারে না অঞ্চল ভিত্তিক বিভিন্ন সংস্কার, ভাষা, রীতিনীতি এগুলোর ভিন্নতা মানুষকে তার নিজস্ব সত্তা ধরে রাখার প্রচেষ্টায় মহা মূল্যবান। সুদূর গ্ৰাম বাংলার ছেলে মেয়েরাও আজ বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে প্রতিদিন বা প্রতিনিয়ত। কিন্তু নিজের পূর্বপুরুষের বাসস্থান, সংস্কার,আদব কায়দা সব কিছুকে কিন্তু ভোলা সম্ভব নয়।হয়তো কেউ ভুলে যাচ্ছে যুগস্রোতের ভাবনার তরঙ্গের উথালি পাথালিতে।
ভারতবর্ষের বুকে প্রতিটি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত তথা বিভিন্ন জেলা, অঞ্চল সব জায়গার ক্ষেত্রে এক নিজস্বতা রয়েছে জলবায়ু, মাটিকে ঘিরে।যেমন পশ্চিমবঙ্গের রুক্ষ্ম লাল মাটির বুকে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো স্মৃতি, গ্ৰীষ্ম থেকে বসন্তের হলুদ হাসি ছয় মরশুমের ভাঁজে ভাঁজে নানা উৎসব ,রঙ ,তুলির টানে প্রকৃতি সেজে ওঠে।গ্ৰামের মানুষগুলো মাটির সাথে লেপ্টে থাকা শরীর নিয়েই দুচোখে দেখে কত স্বপ্ন, সাজায় গল্প স্বপ্নপূরণের তাগিদে। তাদের কথাবার্তার আঞ্চলিক ভঙ্গিমা পরিচিতি ঘটায় নিজ নিজ অবস্থানের।
হয়তো তাদের পুরোপুরিভাবে ছুঁতে পারেনি এখনো আধুনিক ভাবনা, আধুনিক মনের রঙ,রোশনাইয়ের আলো। তাদের উৎসব, খাওয়া দাওয়া, চলন ,বলন তাদের নিজের মতো। হোক না ক্ষতি কি!!তাদের ভালোলাগাটাকে আমরা কেড়ে নেব কেন?? সাবলীল
আঞ্চলিক ভাষায় তাদের কথোপকথনে থাকে না কোনো জড়তা, মন খুলে যখন বলে তখন কিন্তু কখনো শুনে থাকলে দেখবেন, ভালো লাগছে শুনতে।তাদের সাথে কখনো দ্বন্দ্ব নয় ভালোবাসাসহ মিলেমিশে কথার আলাপনে তারাও সমৃদ্ধ হবে আমরাও সমৃদ্ধ হবো। যেমন অঞ্চল ভিত্তিক টুসু,ভাদু, করমা পরব, চৈত্র সংক্রান্তি, নবান্ন, এসব তো আছেই,ধর্মীয় রীতিনীতি মেনেও অনেক অঞ্চলে একসাথে মানুষের মেলবন্ধন ঘটে। এগুলোর খুব প্রয়োজন। রথের মেলা, ঈদ মোবারক এইসব উৎসবে আমরা একে অপরের হাত ধরে খুশিতে মাতি। আঞ্চলিক শব্দটার সাথে দৈনন্দিন জীবনের এক ইতিহাস জড়িয়ে থাকে। সার্বিক ভাবনা ছাড়াও অঞ্চল ভিত্তিক মানুষের পোশাক পরিচ্ছদ,
খাওয়া দাওয়া,বিবাহের মধ্যে কিন্তু ফারাক বা নতুনত্ব থাকে। ভাষার ক্ষেত্রেও এটা কিছুটা কুক্ষিগত হয়েছে নিজ এলাকা ভিত্তিক। যেমন বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার রুক্ষ্ম মাটির জীবনযাত্রার এক কঠিন চিত্র আমরা জানি।
হয়তো এখন কিছুটা উন্নতির প্রচেষ্টা এগিয়ে চলছে। বাড়ির বাচ্চাদের পড়াশোনা শেখানো নিয়েও মাথায় ভাবনা আছে। কারণ চিরদিন সেই দিনমজুর খেটে মাটির গন্ধ ছেড়ে বেরোতে চাইছে তারাও এখন। তবুও সেই আঞ্চলিক ভাষায় কথা,গান, কবিতা, গল্প এসব কিন্তু মন কেড়ে নেয়। যেহেতু বাঁকুড়া
জেলার প্রত্যন্ত গ্ৰামে আমার
জন্ম বাবার কর্মসূত্রে এবং বড়ো হওয়া সেই মাটির গন্ধ মাখা মানুষদের কথাবার্তা, চলাফেরা সবকিছুর মাঝেই।
জীবনের শিক্ষাদীক্ষা সব রাঢ় বাংলায়। তাই আঞ্চলিক শব্দটি ভীষণ ভাবে মনকে
নাড়া দেয়। তাদের মুখের বুলি তাদের মতো করে বলে, গান গায় তাদের মতো করে,
তাহলে তারা নিজেদের জায়গায় একদম ঠিক।এইসব পিছিয়ে পড়ে থাকা মানুষগুলোর কথা ভাবা ভীষণ প্রয়োজন। আমার চাকরি জীবনের প্রথম পাঁচ বছর কাটে পুরুলিয়ায়। কর্মসূত্রে এমন কিছু কিছু ভাষার সম্মুখীন হয়েছি যেগুলো হয়তো আমি বুঝেছি খুব তাড়াতাড়ি গ্ৰাম্য অঞ্চলে বড়ো হয়েছি বলে। প্রতিটি এলাকার মানুষের মধ্যে ভিন্ন দর্শন, রুচিবোধের ফারাক কিন্তু তাদের পরিশ্রমকে কুর্ণিশ জানাতেই হয়।
ইতিহাসের পাতায় রাঢ় বাংলার অজস্র ইতিহাস রয়েছে। বিষ্ণুপুরের ঐতিহাসিক চিত্র যেমন রয়েছে, সেরকম যামিনী রায়,রামকিংকর ব্যাজের মতো চিত্রশিল্পী ও এই রুক্ষ্ম মাটির বুকে। সম্প্রতি কয়েকমাস আগে দুখু মাঝির
সাথে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে সাক্ষাৎ করে এসেছি।
গাছ পাগল মানুষটির পেট না ভরুক সে কিন্তু সবুজকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে বারো বছর বয়স থেকে লড়াই করে আসছেন। কিভাবে সবুজ লাগিয়ে তার রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন নিজ বুদ্ধিবলে সেটা তারিফ করতেই হয় । আজ তিনি পদ্মশ্রী প্রাপক হিসেবে
সেই গ্ৰামবাংলার বুকে ইতিহাস গড়েছেন। তাঁর মুখের কথা গান তাদের আঞ্চলিক ভাষাতেই শুনলাম। গর্ববোধ করলাম।
শিক্ষিত মানে শুধুই কিন্তু আধুনিকতা নয়, মানসিক উদারতা,দৃঢ়তা, সুন্দর চেতন ও মননের অধিকারী হওয়া। হোক সে গ্ৰাম বা গঞ্জ। তাই অঞ্চল ভিত্তিক ইতিহাস পড়ে আমাদের জ্ঞানার্জন ভীষণ প্রয়োজন কারণ এই আঞ্চলিক শব্দটির সাথে জড়িয়ে থাকে নানান বৈচিত্র্য।
সেই " বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান " কবির এই সৃষ্টিকে মহিমান্বিত করতে আমরা হাতে রেখে থাকি এই পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকার অঙ্গীকারে একমুখ হাসিতে।

পূর্ণতোয়া পাঁচ কন্যা
চৈতালী ভট্টাচার্য্য
নারী স্বাতন্ত্র্যতার দীপবর্তিকা জ্বালিয়ে আপন ঔজ্জ্বল্যে ভাস্বর হয়ে যে সকল নারী ইতিহাসের পাতায় তাঁদের অবিস্মরণীয় সাক্ষর রেখে গেছেন তাঁদের মধ্যে ১)রাণী লক্ষ্মী বাঈ, ২)রাণী রাসমণি ৩)রাণী ভবানী,৪ )রাণী অহল্যাবাঈ হোলকার,৫)রাণী দুর্গাবতী উল্লেখযোগ্য। এই মহতী পাঁচ কন্যা ইতিহাসের কালতরণী বেয়ে বর্তমানে রে বিস্মৃতির অন্তরালে নিমজ্জিত হলেও আজ ও এই সমস্ত মহিয়সী নারীদের অবদান কোনোমতেই অস্বীকার করা যায়না।
১) ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মী বাঈ
ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিপ্লবী নেত্রী হিসেবে লক্ষ্মী বাঈ একজন চিরস্মরণীয় নারী ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও তিনি ঝাঁসীর রাণী বা ঝাঁসী কি রাণী হিসেবেও সর্বসাধারণের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের অন্যতম প্রতিমূর্তি ও পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন তিনি। রানী লক্ষ্মীবাঈ ১৮২৮ সালের ১৯ নভেম্বর বারাণসী শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম ছিল মণিকর্ণিকা তাম্বে এবং ডাকনাম ছিল মনু। তাঁর পিতা ছিলেন মরোপন্ত তাম্বে এবং মা ছিলেন ভাগীরথী সাপ্রে (ভাগীরথী বাই); তাঁরা আধুনিক মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা ছিলেন। চার বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। তাঁর পিতা ছিলেন বিথোর জেলার দ্বিতীয় পেশোয়া বাজি রাওয়ের অধীনে যুদ্ধের সেনাপতি। রানী লক্ষ্মীবাঈ বাড়িতেই শিক্ষিত ছিলেন, পড়তে এবং লিখতে পারতেন এবং শৈশবে তাঁর বয়সের অন্যান্যদের তুলনায় বেশি স্বাধীন ছিলেন; তাঁর পড়াশোনার মধ্যে ছিল শুটিং, ঘোড়সওয়ারি, যুদ্ধ বিদ্যা যা তৎকালীন ভারতীয় সমাজের নারীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একেবারে বিপরীত ছিল।
ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁসির রানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি তার নির্ভীক গুণাবলী এবং সাহসিকতার জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত।
বৃটিশ সরকারের মদতপুষ্ট ইস্ট ইন্ডিয়া বানিজ্য কোম্পানির আগ্রাসী মনোভাবের ফলে ছোটখাটো দেশীয় রাজ্যগুলি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিনস্ত হয়ে যাচ্ছিল। ইতিমধ্যে লর্ড ডালহৌসির স্বত্ব বিলোপ নীতি বা ডকট্রিন অফ ল্যাপটপ এর মাধ্যমে নির্দেশ জারি হয়েছিল যে সমস্ত রাজারা অপুত্রক অবস্থায় মারা যাবেন তাদের রাজ্য বৃটিশ সার্বভৌমের অধিনস্ত হবে। ফলে বহু দেশীয় রাজ্য উত্তরাধিকার ছাড়া হয়ে এইভাবে ব্রিটিশ সরকারের কুক্ষিগত হয়ে পড়ছিল।
লক্ষ্মীবাঈয়ের স্বামী মহারাজা গঙ্গাধর রাও এর মৃত্যুর পর, লর্ড ডালহৌসি ডকট্রিন অফ ল্যাপস-এর মাধ্যমে ঝাঁসির দুর্গ দখল করার চেষ্টা করেছিলেন। কারণ মহারাজ গঙ্গাধর ও লক্ষ্মী বাইয়ের একমাত্র পুত্র দামোদর রাওয়ের অকাল প্রয়াণ হয়েছিল। উত্তরাধিকারী হিসেবে ঝাঁসির রাণী কাকার ছেলেকে দত্তক নিয়ে দামোদর রাও নাম রাখেন। রানী লক্ষ্মী বাঈ তার নাবালক পুত্র দামোদর রাওকে উত্তরাধিকারী করে ঝাঁসির রাজ্য শাসন করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এই উত্তরাধিকার মানে নি । তারা স্বত্ব বিলোপ নীতি প্রয়োগ করে ঝাঁসি অধিকার করার চেষ্টা করে। তারা রানীকে মাসোহারা দিয়ে ঝাঁসি রাজ্য ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
রানী লক্ষ্মীবাঈ এই নির্দেশ মানেননি। ফলে ইংরেজ সরকারের সাথে বিরোধ শুরু হয়। এই বিদ্রোহ শুধু ঝাঁসিতেই থেমে থাকেনি। ১৮৫৭ সালে মিরাটের কিছু অংশে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
১৮৫৮ সালে, স্যার হিউ রোজ ব্রিটিশ বাহিনীকে ঝাঁসি পরিদর্শন করে দুর্গ দখল করার নির্দেশ দেন। তিনি শহরটিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন, অন্যথায়, তার বাহিনী শহরটি ধ্বংস করে দেবে।
এরপর, ব্রিটিশ বাহিনী শহরে এসে ঝাঁসির দুর্গ দখলের চেষ্টা করে।
এর পর, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ ঘোষণা করেন যে ঝাঁসিরাজ্য স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করবে।
দুই সপ্তাহ ধরে একটানা ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মী বাঈয়ের নারী-পুরুষের যুগ্ম সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছিল কিন্তু সাহসিকতার সাথে লড়াই করা সত্ত্বেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে রাণীর বাহিনী ব্যর্থ হন।
ঝাঁসির রানী তার শিশুপুত্রকে পিঠে করে কাল্পীকে ঘোড়ায় চড়িয়ে বের করে আনলেন।
ঝাঁসির রাণী তাঁতিয়া টোপে এবং অন্যান্য বিপ্লবী সৈন্যদের সাথে গোয়ালিয়রের দুর্গ দখল করেন,
এর পরে, ঝাঁসির রানী ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য গোয়ালিয়রের বর্তমান মোরারে চলে যান।
দুর্ভাগ্যবশত, ১৮৫৮ সালের ১৮ জুন, ঝাঁসির রানী ২৩ বছর বয়সে গোয়ালিয়রে মারা যান। যখন তিনি মারা যান, তখন রানী লক্ষ্মীবাঈ একজন সৈনিকের পোশাক পরেছিলেন।
রানী লক্ষ্মী বাই ছিলেন একজন অত্যন্ত সাহসী এবং বিশিষ্ট নেত্রী। তিনি অত্যন্ত সাহসী। স্বাধীনতার জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি সর্বদা নির্ভীকতা, বীরত্ব এবং নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত হন। নারী স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে রানী লক্ষ্মী বাঈ অধিকতর পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর সাহসীকতা, চতুরতা এবং অধ্যবসায়ের জন্য ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন লাভ করে আছেন।
২) রাণী রাসমণি
কলকাতার কাছে পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে দক্ষিণেশ্বরের বিশাল মন্দির - মা ভবতারিণীর মন্দির। খুব সুন্দর এই মন্দির। প্রতিদিন অজস্র ভক্ত এসে তাদের ভক্তি নিবেদন করে যান। ১৮৫৫ সালের ৩১ শেষ মে দক্ষিণেশ্বরের এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। রানী রাসমণির জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা। কামারপুকুরের শ্রীরামকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এই মন্দিরের প্রথম পূজারী। পরে এই মন্দিরের পুরোহিত হয়ে আসেন বিশ্ববিখ্যাত রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত হয়ে আসেন স্বামী বিবেকানন্দ, ব্রক্ষ্মানন্দ, সারদানন্দ, গিরিশচন্দ্র প্রমুখ সাধকগণ। ভক্ত সমাগমের পীঠস্থান হয়ে ওঠে এই মন্দির প্রাঙ্গণ।
১৭৯৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন কাঞ্চনপল্লীর 'কোনা' গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে (অধুনা নদীয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা সীমান্তবর্তী অঞ্চল) রাণী রাসমণির জন্ম হয়। পিতা ছিলেন পরম বৈষ্ণব হরেকৃষ্ণ দাস ও মাতা রাম প্রিয়া দেবী, মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি তাঁর মাকে হারান। তিনি ছিলেন অসামান্যা সুন্দরী। মাত্র এগারো বছর বয়সে কলকাতার জানবাজারের ধনী মাহিষ্য জমিদার প্রীতিরাম মাড়ের দ্বিতীয় পুত্র বাবু রাজচন্দ্র দাস-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। প্রথম দুই স্ত্রীর অকালমৃত্যুর পরে রাসমণিকে বিয়ে করেন রাজচন্দ্র, ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে। রাসমণির মা রাসমণির অতুলনীয় রূপের জন্য তাঁকে আদর করে ‘রানী’ সম্বোধন করতেন। পরে কাজের সূত্রেও তাঁর নামের পাশে ‘রানী’ উপাধি থেকে যায় চিরকালীন ভাবেই। ভক্ত প্রধান স্বামী সারদানন্দ বলেন -
" তাঁহার ঈশ্বর বিশ্বাস,তেজস্বিতা, দরিদ্রদের প্রতি নিরন্তর সহানুভূতি, অকাতরে দান, অজস্র অর্থ ব্যয় নানা অনুষ্ঠান সমূহে তাঁহাকে সকলের বিশেষ প্রিয় করে তুলিয়া ছিল। বাস্তবিক নিজগুনে ও কর্মে এই রমনী তখন আপন রাণী নাম সার্থক করিতে এবং ব্রাক্ষণেতর নির্বিশেষে সকল জাতির হৃদয়ের শ্রদ্ধা ও ভক্তি সর্বপ্রকার আকর্ষণে সমর্থ হইয়াছিলেন। "
স্বামীর মৃত্যুর পরে জমিদারির রাশ চলে যায় রাসমণির হাতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘জমিদারগিন্নি’ থেকে তাঁর উত্তরণ হয় আক্ষরিক অর্থেই ‘রানি’-র উচ্চতায়। চার কন্যা- পদ্মমণি,কুমারী,করুণাময়ী,জগদম্বা। পদ্মমণির স্বামী রামচন্দ্র দাস, কুমারীর স্বামী প্যারীমোহন চৌধুরী,করুণার বিয়ে হয় মথুরবাবুর সাথে, বিয়ের কয়েক বছর পর করুণার মৃত্যু হয় মথুরমোহন বিশ্বাস তখন জগদম্বা কে বিয়ে করেন। ১৮৩৬ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি স্বহস্তে তার জমিদারির ভার তুলে নেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তা পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি নীলকর সাহেবদের অত্যাচার বন্ধ করেন। ইংরেজদের সঙ্গে মর্যাদার সাথে লড়াই করে গরীব প্রজাদের ও সমস্ত দেশের জনসাধারণকে মায়ের মতো ভালোবেসে রক্ষা করতেন। ব্যক্তিগত জীবনে রাণী রাসমণি এক সাধারণ ধার্মিক বাঙালি হিন্দু বিধবার মতোই সরল জীবনযাপন করতেন।
রাসমণি দাস , যিনি লোকমাতা রানী রাসমণি নামেও পরিচিত, ( ২৮ সেপ্টেম্বর ১৭৯৩ - ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৬১), ছিলেন একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, জমিদার , সমাজসেবী এবং কলকাতার দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা । রানী রাসমণি অমর হয়ে রইলেন এই মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পুরোহিত শ্রীরামকুমারের ছোট ভাই গদাই অর্থাৎ অবতার বরিষ্ঠ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব পরবর্তী সময়ে হলেন এই মন্দিরের পূজারী। রামকৃষ্ণের সাধনায় ও ভক্তিতে মৃন্ময়ী মা চিন্ময়ী হয়ে তাঁর ভোগ গ্রহণ করে ধন্য করেছেন এই মন্দিরকে । তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের বাংলার সমাজ সংস্কারকদের একজন এবং বাংলার নবজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন। এছাড়াও, তিনি ব্রিটিশ প্রশাসনের দখলদারিত্ব এবং বাংলা প্রদেশের ঔপনিবেশিক সমাজের সকল স্তরে তাদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে অনেক প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার অন্যান্য নির্মাণ কাজের মধ্যে রয়েছে সুবর্ণরেখা নদী থেকে পুরী পর্যন্ত তীর্থযাত্রীদের জন্য একটি রাস্তা নির্মাণ , বাবুঘাট (বাবু রাজচন্দ্র দাস ঘাট নামেও পরিচিত), গঙ্গায় প্রতিদিন স্নানকারীদের জন্য আহিরীটোলা ঘাট এবং নিমতলা ঘাট । তিনি ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি (বর্তমানে ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার ) এবং হিন্দু কলেজ (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় ) -এও যথেষ্ট দান করেছিলেন। একজন বিশিষ্ট ধর্মপ্রাণ, আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নারী হিসেবে বাংলার মানুষ তাঁকে আজীবন মনে রাখবে।
৩) রাণী ভবানী
মহারাণী ভবাণী (১৭১৬ - ১৮০২) ইংরেজ শাসনাধীনে বর্তমান বাংলাদেশের নাটোরের একজন জমিদার ছিলেন। তার পিতা আত্মারাম চৌধুরী এবং মাতা তমাদেবী চৌধুরী । দান, ধ্যান, শিক্ষা, পানীয় জলের ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চিকিৎসা ও ধর্মীয় কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তার প্রজারা তাকে ‘মহারাণী’ নামে আখ্যায়িত করে। রাজশাহী রাজ বা নাটোর জমিদারি ছিল বাংলার বৃহত্তম জমিদারি যা বিশাল এলাকা দখল করে রেখেছিল । নাটোর জমিদারির আয়তন প্রায় ৩২,৯৭০ বর্গকিলোমিটার (১২,৭৩১ বর্গমাইল) এবং কেবল উত্তরবঙ্গের বেশিরভাগ অংশই নয়, পরবর্তীকালে মুর্শিদাবাদ , নদীয়া , যশোর , বীরভূম এবং বর্ধমান প্রশাসনিক জেলাগুলির একটি বিশাল অংশও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল । ১৭৪৮ সালে ১১৫৩ বঙ্গাব্দে রাণী ভবাণীর স্বামী রামকান্ত ইহলোক ত্যাগ করার পর নবাব ‘আলীবর্দি খাঁ’ রাজা রামকান্তের স্ত্রী রাণী ভবানীর ওপর জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তখনকার দিনে জমিদার হিসাবে একজন মহিলা অত্যন্ত বিরল ছিলেন, কিন্তু রাণী ভবাণী রাজশাহীর বিশাল জমিদার কার্য অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নির্বাহ করেন।
অনাড়ম্বর ব্যক্তিগত জীবনযাপন করার সাথে সাথে রাণী ভবাণীর উদারতা এবং সমাজহিতৈষী মনোভাব তাঁকে সাধারণ জনগনের মাঝে জনপ্রিয় করে। রাণী ভবানীর সময়ই ইতিহাসের সেই ভয়ংকর ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ঘটে (১৭৭৬ খ্রি.)। এতে বহুলোকের মৃত্যু ঘটে। ইতিহাসের এই ক্রান্তি লগ্নে নাটোরের রাণী ভবানী নিজের রাজ কোষ শূন্য করে লাখ লাখ প্রজার অন্নকষ্ট নিবারণের জন্য মুক্তহস্তে দান করেছিলেন। ছিয়াত্তরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় সমগ্র বাংলার এক তৃতীয়াংশ লোক মৃত্যুবরণ করে। তিনি প্রজাদের জীবন বাঁচানোর নিমিত্তে খাদ্য ভান্ডার খুলে দেন। ফলে প্রজারা নিদারুণ খাদ্য কষ্ট থেকে রক্ষা পান। তিনি বাংলায় শত শত মন্দির, অতিথিশালা এবং রাস্তা নির্মাণ করেন। তিনি প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট দূর করার জন্য অনেকগুলি পুকুরও খনন করেন। তিনি শিক্ষা বিস্তারেও আগ্রহী ছিলেন এবং অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদারভাবে দান করেন। ১৭৫৩ সালে কাশী অর্থাৎ বেনারসে ভবানীশ্বর শিব ও দুর্গাবাড়ী, দুর্গাকুণ্ড, কুরুক্ষেত্রতলা নামক জলাশয় স্থাপন করেন । তিনি তারাপীঠ মন্দিরেরও সংস্কার করেন। হাওড়া থেকে কাশী পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন যা রানী ভবানী রোড বা বেনারস রোড নামে খ্যাত ছিল। বর্তমানে এটি বোম্বে রোডের অংশ।শুধু তাই নয়।উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ বাতায়নে তার ভূমিকা লক্ষনীয় ছিল। বগুড়া জেলার শেরপুরে অবস্থিত পীঠস্থান ভবানীপুরের মন্দিরসমূহের উন্নয়নে রাণী ভবাণী অনেক অবদান রাখেন। রাণী ভবাণীর নাটোর রাজবাড়ী বাংলাদেশে একটি দর্শনীয় স্থান। দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণর হাতে রাজ্যভার দিয়ে তিনি মুর্শিদাবাদ চলে আসেন ও বড়নগরে কন্যাসহ বাস করতে থাকেন। ওয়ারেন হেস্টিংস পরবর্তী কালে জোরপূর্বক তার নাটোর জমিদারি কেড়ে নেন। মুর্শিদাবাদ জেলায় ভাগীরথী নদী তীরবর্তী বড়নগরে তার নির্মিত ১০০ টি শিবমন্দির ছিল। কালের প্রবাহে অল্প কয়েকটি মন্দির টিকে আছে। মন্দিরগাত্রের টেরাকোটা শৈলী আজও দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করে।
রাণী ভবানীর কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি দত্তক পুত্র গ্রহণ করেন। রঘুনাথ লাহিড়ী নামক এক যুবকের সঙ্গে তিনি তার একমাত্র কন্যার বিবাহ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তার এই জামাতার নামেই রাজ্য ভার অর্পণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, কিন্তু অদৃষ্টে নির্মম পরিহাস ১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে স্বীয় জামাতার মৃত্যু হওয়ায় তিনি আবার রাজ্য ভার গ্রহণ করতে বাধ্য হন।১৮০২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৫০ বছর রাজকার্য পরিচালনা করে ৭৯ বছর বয়সে দেহ ত্যাগ করেন। বৃটিশ গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস এর সাথে তার মনো মালিন্য হয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ইংরেজদের দূরভিসন্ধি। মানুষকে আগাম সতর্ক করেছিলেন। তাঁর নিজের পুত্র ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দত্তক পুত্রের পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে পারিবারিক বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। ফলে তাঁর জমিদারি ইংরেজ সরকারের হস্তগত হয়।
রাণী ভবানী যেমন অসাধারণ বুদ্ধিমতি তেমনি ধর্মনিষ্ঠ, পরদুঃখকাতরা ও আড়ম্বর পরিশূন্যা ছিলেন। এই বাংলার বাঘিনী, স্বাধীনচেতা, আপসহীনা, দূরদৃষ্টি সম্পন্না, এরকম নানা গুণের অধিকারিণী ছিলেন।
৪) রাণী অহল্যাবাঈ হোলকার
রাণী অহল্যাবাঈ ছিলেন হিন্দু মন্দিরের একজন মহান পথিকৃৎ এবং নির্মাতা । তিনি ভারতজুড়ে শত শত মন্দির এবং ধর্মশালা নির্মাণ করেছিলেন। অহল্যাবাঈ ১৭২৫ সালের ৩১ মে বর্তমান মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলার চৌন্ডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মানকোজি রাও শিন্দে ছিলেন গ্রামের পাতিল। সেই সময় মহিলারা বিদ্যালয়ে যেতেননা, কিন্তু অহল্যাবাঈয়ের বাবা তাকে পড়তে ও লিখতে শিখিয়েছিলেন।
ইতিহাসের পর্যায়ে তার প্রবেশ একটি দুর্ঘটনার মতই ছিল : মল্লার রাও হোলকর, মারাঠা পেশোয়া বালাজী বাজি রাও এর সেবায় নিয়োজিত একজন সেনাপতি এবং মালওয়া অঞ্চলের শাসক ছিলেন। তিনি একবার পুণে যাওয়ার পথে চৌন্ডি গ্রামে থামেন, এবং, কিংবদন্তি অনুযায়ী, আট বছর বয়সী অহল্যাবাঈকে গ্রামের মন্দিরের সেবায় নিযুক্ত দেখেন। তার ভক্তি এবং চরিত্র মহিমা অনুধাবন করে, তিনি মেয়েটিকে তার পুত্র খান্দেরাও (১৭২৩–১৭৫৪) এর বধূ হিসাবে হোলকার অঞ্চলে নিয়ে আসেন। ১৭৩৩ সালে তার খান্দেরাও হোলকর এর সঙ্গে বিবাহ হয়। তিনি, ১৭৪৫ সালে, তাদের পুত্র মালেরাও এবং ১৭৪৮ সালে, কন্যা মুক্তাবাঈ এর জন্ম দেন। মালেরাও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং ১৭৬৭ সালে অসুস্থতার কারণে মারা যান। অহল্যাবাঈ আরেকটি ঐতিহ্য ভেঙ্গেছিলেন, যখন তিনি তার মেয়ের বিবাহ, একজন সাহসী কিন্তু দরিদ্র এর সঙ্গে দেন। মহারাণী অহল্যাবাঈ ন্যায়পরায়ণ, জ্ঞানী একজন মহারাণী। এবং অত্যন্ত সুচারু নীতিতে মালওয়া শাসন করেছিলেন। অহল্যাবাঈয়ের শাসনামলে, মালওয়া তুলনামূলকভাবে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা উপভোগ করত এবং তার রাজধানী মহেশ্বর সাহিত্য, সঙ্গীত, শৈল্পিক এবং শিল্প সাধনার এক মরুদ্যানে পরিণত হয়েছিল । কবি, শিল্পী, ভাস্কর এবং পণ্ডিতদের তার রাজ্যে স্বাগত জানানো হত , কারণ তিনি তাদের কাজকে উচ্চ সম্মানের সাথে গ্রহণ করতেন।
সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি প্রতিদিন জনসাধারণের সাথে আলোচনা করতেন। তিনি কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না, বরং তার জনগণের জন্য একজন অভিভাবক এবং পথপ্রদর্শকও ছিলেন। তার শাসনব্যবস্থা ইন্দোরের বাইরেও বিস্তৃত ছিল এবং তার উদ্যোগগুলি করুণা এবং দূরদর্শিতা উভয়েরই প্রতিফলন ছিল।অহল্যাবাঈ ভারতজুড়ে রাস্তাঘাট ও বিশ্রামাগার নির্মাণের সূচনা করেছিলেন এবং হরিদ্বার, কাশী, সোমনাথ এবং রামেশ্বরমের মতো তীর্থস্থানগুলিতে মন্দিরগুলি পুনরুদ্ধার করেছিলেন । তবে, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মের বাইরেও বিস্তৃত ছিল - তিনি কৃষকদের সমর্থন করেছিলেন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ করেছিলেন। শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরে তিনি অনেক গুরুকুল এবং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তাঁর সময়ের জন্য একটি বিপ্লবী পদক্ষেপে, তিনি একটি মহিলা সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন এবং তাদের যুদ্ধ, আত্মরক্ষা এবং প্রশাসনিক সুরক্ষায় প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। এই বাহিনী রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা, আইন শৃঙ্খলা এবং নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দে শ্রাবণ মাসে করুণাময়ী অহল্যাবাঈ নশ্বর দেহ ত্যাগ করেন।
৫) রাণী দুর্গাবতী
রানী দুর্গাবতী (৫ অক্টোবর, ১৫২১ - ২৪ জুন, ১৫৬৪) ১৫৫০ সাল থেকে ১৫৬৪ সাল পর্যন্ত থেকে গন্ডোয়ানার ক্ষমতাসীন রানী ছিলন । তিনি চান্দেল রাজা কিরেট রায়ের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কালিঞ্জার দুর্গ ( বান্ডা, উত্তর প্রদেশ ) এ জন্মগ্রহণ করেন। রানী দুর্গাবতীর অসামান্য সাফল্য, সাহস তাঁর পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যের গৌরবকে আরও শক্তিশালী করে।
১৫৪২ খ্রিষ্টাব্দে গন্ডোয়ান রাজ্যের রাজা সংগ্রাম শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র দালপত শাহ মারভিয়ের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। এই বিবাহের কারণে চান্দেল এবং গন্ডোয়ান বংশের আত্মীয় হয়। এর ফলে কিরেট রায় শের শাহ সুরির মুসলিম আক্রমণের সময় গন্ডোদের সাহায্য লাভ করেন।
১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বীর নারায়ণ নামে পুত্র সন্তান জন্ম দেন। ১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে দালপত শাহ মারা যান এবং বীর নারায়ণের অল্প বয়সের কারণে তিনি শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। রাণী তার রাজধানী সিংহরগড় দুর্গের চৌরগড়ে নিয়ে যান। এটি সাতপুরা পর্বতশ্রেণীতে অবস্থিত সুকৌশলী এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি দুর্গ ছিল।
শেরশাহের মৃত্যুর পর সুজাত খান মালওয়া দখল করে এবং ১৫৫৬ সালে তার পুত্র বাজ বাহাদুরের মাধ্যমে উত্তরাধিকারী হন। সিংহাসনে আরোহণের পর, বাজ রাণী দুর্গাবতীতে হামলা চালান কিন্তু আক্রমণটি ব্যর্থ হয়।
১৫৬২ সালে সম্রাট আকবর মালওয়া শাসক বাজ বাহাদুরকে পরাজিত করেন এবং মালওয়া দখল করেন। এবং মুঘল সাম্রাজ্য আধিপত্য তৈরি করেন। ফলস্বরূপ, রাণীর রাজ্যের সীমানা মুঘল সাম্রাজ্যকে স্পর্শ করে।
উচ্চাভিলাষী খাজা আব্দুল মজিদ আসাফ খান রেওয়া শাসক রামচন্দ্রকে পরাজিত করেন। রানী দুগার্বতীর রাজ্যের সমৃদ্ধি তাকে মুগ্ধ করেছিল এবং মুঘল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার পর তিনি রানীর রাজ্যকে আক্রমণ করেন। মুগল আক্রমণের এই পরিকল্পনা আকবরের সম্প্রসারণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অংশ ছিল।
আসাফ খানের আক্রমণ সম্পর্কে রানী যখন শুনেছিলেন, তখন তিনি তাঁর রাজ্যের প্রতিরক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রানী মনে করতেন, অসম্মানদায়ক জীবনযাপন করার চেয়ে সম্মানজনকভাবে মৃত্যুবরণ করা ভালো।
একটি প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে লড়াই করার জন্য, তিনি নারায়ণে গিয়েছিলেন। একদিকে পাহাড়ী অঞ্চলে এবং দুই পাশে গৌড় ও নর্মদা নদীর মধ্যে অবস্থিত। এটি ছিল মুঘল প্রশিক্ষিত এবং আধুনিক অস্ত্রের সৈন্যদের সাথে অসম যুদ্ধ এবং রানি দুগার্বতীর পাশে পুরাতন অস্ত্র নিয়ে কয়েকজন অপরিচিত সেনা ছিল।
এই পর্যায়ে রানী তার পরামর্শদাতাদের সাথে তার কৌশল পর্যালোচনা করেছিলেন। তিনি রাতে শত্রুদের আক্রমণ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তাদের লেফটেন্যান্টরা তার সে পরামর্শ গ্রহণ করে নি। পরের দিন সকালে আসফ খান বন্দুক এনেছিলেন। রানী তার হাতি নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। তাঁর ছেলে বীর নারায়ণও এই যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মুগল সেনাকে তিনবার পিছনে যেতে বাধ্য করেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আহত হন এবং নিরাপদে স্থানান্তরিত হন। যুদ্ধের সময় রানীও তার কানের কাছে একটি তীরের আঘাতে আহত হন। আরেকটি তীর তার ঘাড়ে বিঁধে এবং তিনি তার জ্ঞান হারান। চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পরাজয় অবশম্ভাবি । তার মাহুত তাকে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং ২৪ জুন, ১৫৬৪ তারিখে নিজেকে আত্মাহুতি দেন। তার শহীদ দিবস (২৪ জুন ১৫৬৪) আজও ভারতে "বলিদান দিবস" হিসাবে স্মরণ করা হয়।
এই পাঁচ মহিয়সী নারী তাঁদের অসামান্য কৃতকর্মের জন্য ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে আছেন। তাঁদের অনুদান বর্তমান প্রজন্ম বিস্মৃত হলেও তাঁদের অবদানকে কোনো মতেই অস্বীকার করা যাবে না।
সমাপ্ত

আত্মা, চেতনা, আমিত্ব: কিছু জিজ্ঞাসা
ডাঃ অনির্বাণ কুণ্ডু
মানুষের সভ্যতা যত পুরোনো, আত্মার ধারণাও ততটাই প্রাচীন। মানুষ কেবল একটি জৈব দেহ....এই ধারণা কখনোই তাকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি। জন্ম, মৃত্যু, স্বপ্ন, স্মৃতি, ভালোবাসা, নৈতিকতা, আত্মবোধ, এই সব কিছুর মধ্যেই সে খুঁজে পেয়েছে এমন এক সত্তার আভাস, যা দেহের চেয়ে গভীর, স্থায়ী ও সূক্ষ্ম। সেই সত্তাকেই বিভিন্ন সংস্কৃতি ও দর্শনে বলা হয়েছে আত্মা, চেতনা, আত্মসত্তা বা স্পিরিট। আত্মার অস্তিত্ব নিয়ে আধুনিক যুগে সংশয় থাকলেও, বহু যুক্তি ও অভিজ্ঞতা আত্মার অস্তিত্বের পক্ষেই কথা বলে।
১. আত্মা ও আমিত্ব:
প্রতিটি মানুষ নিজেকে “আমি” বলে চেনে। কিন্তু কে এই "আমি" এই ‘আমি’-বোধ কি কেবল শরীর? শরীর তো প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে, কোষ জন্মাচ্ছে, কোষ মরছে। শিশুকালের দেহ আর বৃদ্ধাবস্থার দেহ এক নয়। তবু মানুষ বলে, “আমি সেই একই মানুষ।” প্রতিদিন এই "আমি"কেই সে বহন করে চলে, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত! সে রাতে ঘুমোতে যায় যে "আমি"কে নিয়ে, পরের দিন সকালে চোখ খোলে সেই "আমি" নিয়ে! এই ধারাবাহিক আত্মপরিচয় কোথা থেকে আসে?
যদি মানুষ কেবল শরীর হতো, তবে শরীর বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘আমি’-ও বদলে যেত। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। এই ধারাবাহিক আত্মপরিচয়ই ইঙ্গিত দেয় যে দেহের আড়ালে কোনো স্থায়ী সত্তা আছে, যাকে আমরা আত্মা বলি।
২. চেতনা: দেহের বাইরে এক রহস্য
বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত চেতনাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেনি। মস্তিষ্কের নিউরন কীভাবে কাজ করে, তা জানা গেছে। কিন্তু নিউরনের বৈদ্যুতিক সংকেত কীভাবে অনুভূতি, ভালোবাসা, সৌন্দর্যবোধ বা নৈতিক দ্বিধায় রূপ নেয়—এই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর নেই।
একটি মৃত মস্তিষ্ক আর জীবিত মস্তিষ্কের রাসায়নিক উপাদান প্রায় একই। পার্থক্য শুধু একটি জিনিসে,...চেতনার উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি। এই চেতনা কি কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়া? নাকি এটি দেহের সঙ্গে যুক্ত কিন্তু দেহ-অতিক্রমী কোনো সত্তা....অর্থাৎ আত্মা?
কিন্তু এই আমি র ও প্রকার ভেদ আছে। প্রতিটি জীবের মধ্যে তাহলে একটি করে আমি থাকার কথা। এককোষী প্রাণী অ্যামিবা থেকে আরম্ভ করে বহুকোষী বাঘ, সিংহ, কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, প্রজাপতি, মাছ, পাখি সকলের মধ্যেই আমি বর্তমান। কিন্তু এই আমির প্রকাশ প্রকাশ মস্তিষ্কের তারতম্য হয়।
এই আমি সর্বনিম্ন প্রকাশ দেখা যায় একটি কোষে যার মস্তিষ্ক বলে কিছু নেই। আর সর্বোচ্চ প্রকার দেখা যায় মানুষের কোটি কোটি নিউরন সংবলিত মানব মস্তিষ্কে। অর্থাৎ এই যেন একটা জানলার কাঁচের মতো - জানলার কাঁচ যত পরিষ্কার তত বেশি আলো! অর্থাৎ মস্তিষ্ক যত বেশি উন্নত, চেতনার প্রকাশ তত বেশি প্রকট। অথবা যেন আপনি একটি রেডিওতে গান শুনেছেন। রেডিওর নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যত ভালো টিউনিং করা যাবে তত স্পষ্ট হবে গানের কথা ও সুর। আবার রেডিও ভেঙে গেলে কোন কিছুই আর শোনা যাবে না অর্থাৎ মৃত্যুর সাথে সাথে চেতনা অপ্রকাশিত হবে। অর্থাৎ আত্মা বা চেতনা পূর্ব থেকেই বিরাজমান, জীব দেহ বা প্রাণীদেহ চেতনার প্রকাশের একটি মাধ্যম। যেখানেই সে মাধ্যম পাবে সেখানেই তার প্রকাশ হবে। অর্থাৎ আত্মা বা চেতনা Higgs Field এর মতো ব্রহ্মাণ্ড বা cosmos এ পরিব্যাপ্ত। কোনো fragmented and invisible entity নয়, যেটা এক দেহ থেকে গ্যাসের মতো বেরিয়ে আরেক দেহে প্রবেশ করবে। যেন একটা জ্বলন্ত লণ্ঠন কালো কাগজে মোড়া আছে, সেই কাগজের গায়ে যেখানে যেখানে ছিদ্র আছে সেখান দিয়ে আলো বেরোবে। চৈতন্যগতভাবে আমরা সকলে একই জায়গায় যুক্ত, শুধু ভিন্ন ভিন্ন দেহের জন্য নিজেদের বিচ্ছিন্ন ভাবি।
৩. নৈতিকতা ও বিবেকের উৎস
মানুষের মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত নৈতিক বোধ আছে—ভালো ও মন্দের পার্থক্য। অনেক সময় সমাজ বা ব্যক্তিস্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়েও মানুষ নৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। প্রশ্ন হলো, এই বিবেক কোথা থেকে আসে?
যদি মানুষ কেবল বিবর্তনের ফল হয়, তবে নৈতিকতা হতো কেবল সুবিধার হিসাব। কিন্তু বাস্তবে মানুষ নিজের ক্ষতি জেনেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, শহিদ হয়, আত্মত্যাগ করে। এই নৈতিক উচ্চতা কেবল জৈব প্রবৃত্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। আত্মার ধারণাই এই নৈতিক চেতনার একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা দেয়।
মানুষ যখন একা থাকে তখন নিজেকে তার বিরাট মহান মনে হয়। কিন্তু সেই যখন হাজার বা লক্ষ লোকের ভিড়ে গিয়ে পড়ে, তখন তার মধ্যে একটা পিঁপড়ের মতোই বা দলবদ্ধ পশুর মতোই survival instinct জেগে, যেটা তার মহত্বকে ক্ষুদ্র করে দেয়। সেই মুহূর্তে সে আর দশটা লোককে পায়ে মাড়িয়ে ছুটে যেতে পারে খাবারের প্যাকেট দখল করার জন্য।
৪. নিকট-মৃত্যু অভিজ্ঞতা (Near Death Experience)
বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে ফিরে এসে আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।নিজের দেহকে বাইরে থেকে দেখা, অজানা আলো, মৃত আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ, গভীর শান্তির অনুভূতি। আশ্চর্যের বিষয়, অনেক ক্ষেত্রে তারা এমন তথ্য জানিয়েছেন, যা শারীরিকভাবে তাদের জানার কথা নয়।
এসব অভিজ্ঞতাকে অনেকে হ্যালুসিনেশন বলে উড়িয়ে দেন, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ধর্মের মানুষের অভিজ্ঞতা কেন এতটা মিল? কেন এই অভিজ্ঞতাগুলো মানুষের জীবনে গভীর নৈতিক পরিবর্তন আনে? আত্মার ধারণা এই অভিজ্ঞতাগুলোকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।
৫. স্বপ্ন ও সৃজনশীলতা
স্বপ্নে মানুষ এমন জগতে প্রবেশ করে, যেখানে দেহ শুয়ে থাকে কিন্তু মন বা চেতনা সক্রিয়। অনেক সৃষ্টিশীল কাজ কবিতা, সঙ্গীত, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার স্বপ্ন বা গভীর ধ্যান থেকে এসেছে।
স্বপ্নে স্থান কালের সীমা ভেঙে যায়। ভবিষ্যৎ ও অতীত একাকার হয়। যদি মানুষ কেবল দেহ-মস্তিষ্ক হতো, তবে এই সীমাহীন অভিজ্ঞতা কীভাবে সম্ভব? আত্মা ধারণা এই অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাগুলোকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয়।
৬. পুনর্জন্মের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা
বিশ্বের নানা প্রান্তে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে, পূর্বজন্মের স্মৃতির অসংখ্য ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অনেক শিশু এমন ব্যক্তিগত তথ্য বলে, যা যাচাই করে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। যদিও বিজ্ঞান এখনো এই বিষয়টি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়নি, তবু ঘটনাগুলোর সংখ্যা ও নির্ভুলতা প্রশ্ন তোলে—চেতনা কি দেহের মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায়? কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মতে মৃত্যু হল একটি ব্যাংক একাউন্ট ক্লোজ করে দেওয়ার মতো ব্যাপার যেটি আপনি কোনভাবেই ল্যাপস হয়ে যাওয়া জীবন বীমার মত পেনাল্টি দিয়ে আর রিভাইভ করতে পারবেন না। মৃত্যুর সাথে সাথেই সেই জীবনের যাবতীয় স্মৃতি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়।
অবশ্য এর একটি দুর্দান্ত উপযোগিতা আছে। যদি জন্মান্তর বা পূর্বজন্ম থেকেও থাকে, তাহলেও আপনি আপনার গত জন্মের অভিজ্ঞতাকে পুনরুদ্ধার করে সেখানে গিয়ে কোন ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারবেন না। উদাহরণস্বরূপ দেখা যাক ধরুন আপনি গতজন্মে একজন কোটিপতি ছিলেন পরবর্তী জন্মে আপনি একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছেন। তাহলে পূর্ব জন্মের কথা স্মরণ করে আপনার মনোকষ্ট হতে পারে। অথবা যদি দেখেন আপনার পূর্বজন্মের স্ত্রী আপনার মৃত্যুর পরে অন্য কারো সঙ্গে সংসার পেতেছেন, সেটাও কষ্টের কারণ হতে পারে।
আবার যদি আপনার বর্তমান জন্মের অবস্থা পূর্ব জন্মের তুলনায় উন্নত হয় তাহলেও আপনি হীনমন্যতায় ভুগতে পারেন পূর্বজন্মের স্মৃতিকে স্মরণ করে। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের এক সুন্দর সকালে উঠে মনে পড়ে যায় তিনি গতজন্মে রাস্তার নেড়ি-কুকুর ছিলেন তাহলে তার মনের অবস্থা কী হবে তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তাই chapter পুরোপুরি closed হওয়াই ভালো।
যাই হোক, মূল কথা....আত্মা যদি থাকে, তবে পুনর্জন্ম বা দেহান্তরের ধারণা যুক্তিসঙ্গত হয়।
৭. ধর্ম ও দর্শনের সর্বজনীনতা
প্রায় সব ধর্ম ও প্রাচীন দর্শনেই আত্মার ধারণা আছে। নাম আলাদা, ব্যাখ্যা আলাদা, কিন্তু মূল ধারণা এক। এত ভিন্ন সভ্যতা ও সময়ে একই ধারণার পুনরাবৃত্তি কি কাকতালীয়? নাকি এটি মানব অভিজ্ঞতার কোনো গভীর সত্যকে নির্দেশ করে? ধর্ম এখানে কেবল বিশ্বাস নয়, বরং দীর্ঘ মানব অভিজ্ঞতার সঞ্চিত জ্ঞান।
৮. বিজ্ঞান ও আত্মা: বিরোধ না সেতু?
আধুনিক বিজ্ঞান আত্মাকে অস্বীকার করে না, বরং বলে যা পরিমাপযোগ্য নয়, তা বিজ্ঞানের সীমার বাইরে। এক সময় বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব, এমনকি জীবাণুও অদৃশ্য ছিল। আজ তা বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবতা।
আত্মা হয়তো এমনই এক সূক্ষ্ম বাস্তবতা, যা ভবিষ্যতের বিজ্ঞান একদিন বুঝতে পারবে। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের অনেক পরীক্ষা বিশেষ করে Quantum Enigma, পর্যবেক্ষকের ভূমিকা, Uncertainty principle চেতনাকে আবার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
৯. মৃত্যুভয় কী ও কেন?
মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়। কিন্তু মানুষের এই মৃত্যুভয় মৃত্যুকালীন যন্ত্রণা বাস শ্বাসকষ্টের ভয় নয়....তার থেকেও অনেক ভয় সে সারা জীবন যা কিছু অ্যাচিভ করেছে সেগুলোকে এক নিমেষে হারানোর ভয়, নতুন পৃথিবী, নিত্য নতুন ঘটনাবলী নতুন নতুন আবিষ্কার দেখতে না পারার ভয়।
আবার একই সঙ্গে সে মৃত্যুর অর্থ খোঁজে। মৃত্যুর প্রতি তার আকর্ষণ। এইজন্যই প্রতিবেশীর মৃত্যুতে সে জানালা দিয়ে উঁকি ঝুঁকি মারে, রাস্তার ট্র্যাফিকে তার গাড়ির পাশে শববাহী গাড়ি এসে দাঁড়ালে সে মৃতদেহের মুখটি আড়চোখে একবার না তাকিয়ে থাকতে পারে না।
যদি জীবন কেবল রাসায়নিক দুর্ঘটনা হয়, তবে ভালোবাসা, শিল্প, আত্মত্যাগ সবই অর্থহীন হয়ে যায়। কিন্তু আত্মার ধারণা জীবনকে একটি বৃহত্তর অর্থ দেয়, জীবন শুধু বেঁচে থাকা নয়, এক ধরনের যাত্রা।
এই অর্থবোধই মানুষকে নৈতিক, সৃজনশীল ও মানবিক করে তোলে।
আত্মার অস্তিত্ব হয়তো পরীক্ষাগারে ধরা পড়ে না, কিন্তু মানব অভিজ্ঞতার প্রতিটি স্তরে তার উপস্থিতির ইঙ্গিত রয়েছে। আত্মবোধে, চেতনায়, নৈতিকতায়, সৃজনশীলতায়, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের অভিজ্ঞতায়। আত্মাকে অস্বীকার করলে মানুষকে কেবল যন্ত্রে পরিণত করতে হয়, যা তার গভীর মানবিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
অতএব বলা যায়, আত্মা কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়; এটি মানব অভিজ্ঞতার একটি যৌক্তিক ও গভীর ব্যাখ্যা। আত্মা আছে, এই ধারণা মানুষকে কেবল জীবিত রাখে না, মানুষ করে তোলে।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.