আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
রম্য রচনা
ধারাবাহিক উপন্যাস
প্রবন্ধ
Privacy Policy
আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
রম্য রচনা
ধারাবাহিক উপন্যাস
প্রবন্ধ
Privacy Policy
More
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • রম্য রচনা
  • ধারাবাহিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • Privacy Policy
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • রম্য রচনা
  • ধারাবাহিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • Privacy Policy

প্রবন্ধ

শৌনক ঠাকুর

এক জননেত্রীর কথা 

শৌনক ঠাকুর 


পর্ব -২ 


তবে এই ‘সত্যাগ্রহী সেবিকাদল’ এর মহিলাদের উপর ব্রিটিশ শাসকের দমননীতি এক চরম নিষ্ঠুরতার রূপ ধারণ করেছিল। যেখানে প্রায় প্রতিদিনই তাঁদের উপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ চালানো হত। এই লাঠিচার্জ কেবল শারীরিক আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল মানসিকভাবে আন্দোলনকারীদের ভেঙে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। ফলস্বরূপ, বহু সাহসিনী নারী গুরুতরভাবে আহত হন। তাঁদের মধ্যে কমলা দেবী, হেমনলিনী গাঙ্গুলী এবং সুনীতি বসুর মত সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের আঘাত বিশেষভাবে গুরুতর ও উদ্বেগজনক ছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এই নির্মম দমননীতি তাঁদের মনোবলকে ভাঙতে পারেনি। বরং প্রতিটি আঘাত, প্রতিটি নির্যাতন তাঁদের অন্তরের প্রতিবাদী সত্তাকে আরও দৃপ্ত, সুসংহত এবং অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল।


পুলিশি নির্যাতন, গ্রেপ্তার, লাঞ্ছনা এবং সামাজিকভাবে অপমানিত করার চেষ্টার পরেও এই নারীরা সংগ্রামের পথ থেকে একবিন্দুও সরে আসেননি। তাঁদের এই অবিচল অবস্থান সমগ্র বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নতুন চেতনার সঞ্চার করেছিল, যা ক্রমে গণআন্দোলনের শক্তিকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে।  তাঁরা একের পর এক সভা-সমিতির আয়োজন করতেন। স্বাধীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ত গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। এই সমবেত আন্দোলনের ঝাঁঝ  ব্রিটিশ প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দেয়।


এই আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় ঔপনিবেশিক সরকার আরও কঠোর ও দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। গ্রামবাসীদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে তাঁদের ঘরবাড়ি তল্লাশি চালানো হত। মূল্যবান সামগ্রী বাজেয়াপ্ত হত‌‌। এমনকি কখনও কখনও সম্পূর্ণ পরিবারকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেওয়া হতো। সাধারণ গৃহস্থদের জন্য এই ক্ষতি ছিল গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। তাঁদের জীবিকা, সামাজিক মর্যাদা এবং পারিবারিক স্থিতি সবকিছুই হুমকির মুখে পড়ে। তথাপি, এই দুর্দশা তাঁদের সংগ্রামী মনোভাবকে দুর্বল করার পরিবর্তে আরও দৃঢ় করে তোলে।


এ প্রসঙ্গে একটা কাহিনীর উল্লেখ করা যাক। গ্রেপ্তার ছাড়াও ইংরেজ পুলিশ অনেক সময় মহিলাদের নিয়ে গিয়ে কোন ফাঁকা মাঠে ছেড়ে দিত অথবা বন জঙ্গলে ছেড়ে দিত। তারা দু তিন দিন বহু কষ্টের পর বাড়ি ফিরতে পারত। আবার অনেক সময় তাদের ফাঁকা মাঠে নিয়ে গিয়ে তাদের পিছনে এমনভাবে ধাওয়া করা হত যাতে তারা কোথাও আশ্রয় না পান। আবার শীতের গভীর রাতে নৌকা করে নিয়ে গিয়ে জনহীন তীরে নামিয়ে দেওয়া হত। “কারারুদ্ধ মহিলা ছাডাও বহুসংখ্যক মহিলা আন্দোলনে যোগদান কবার ফলে পুলিসেব হাতে লাঞ্ছনা ভোগ করেন। পুলিস অনেক মহিলাকে গ্রেপ্তার ক'বে বহুদূবেব গ্রামে নিয়ে গিযে ছেড়ে দিত।” (স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী :  কমলা দাশগুপ্ত) 

এইরকম অনেক ঘটনা উল্লেখ বিভিন্ন গ্রন্থে রয়েছে। পুলিশবাহিনীর এই নিষ্ঠুর পরিত্যাগমূলক আচরণ নিঃসন্দেহে ঔপনিবেশিক শাসনের বর্বরতার এক প্রকৃষ্ট নিদর্শন।


এভাবে দেখা যায়, দমন, নির্যাতন এবং আর্থিক শোষণের সম্মিলিত আঘাত সত্ত্বেও বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মমর্যাদাবোধ ক্রমশ তীব্রতর হয়ে উঠেছিল। সত্যাগ্রহী সেবিকাদলের এই সাহসী নারীরা কেবল আন্দোলনের অগ্রভাগেই অবস্থান করেননি, বরং তাঁরা একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। 


 আশালতা দেবী বিভিন্ন ছোট ছোট সংঘ তৈরি করেছিলেন আসলে তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এই জাতীয়তাবাদী ভাবধারা স্বদেশচেতনার বার্তা ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি গ্রামের প্রত্যেকটি পরিবারের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া। তাই তিনি অনেক ছোট ছোট সংঘ তৈরি করেছিলেন। এ রকমই একটি সংঘ ‘বিক্রমপুর মহিলা সংঘ’। প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৩১। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল —-

ক) প্রত্যন্ত মহিলাদের মধ্যে দেশের সম্পর্কে জাগরণ তৈরি করা 

খ) তাদের স্বনির্ভর করে তোলা 

গ) দেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করা 

ঘ) সর্বোপরি পরাধীনতার থেকে মুক্তির জন্য সঙ্গবদ্ধ করার চেষ্টা করা


১৯৩২ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে এই সংঘের মহিলাদের একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তারা দলে দলে এই আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। আশালতা দেবী ডাকে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন গ্রামের মহিলারা সংসার পরিবার-পরিজন ভুলে দেশের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন।


আশালতা সেনের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় সংগঠিত  অংশগ্রহণকারী নারীসমষ্টিকে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের পুলিশবাহিনী নির্মমভাবে আটক করে।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসে নারীসমাজের আত্মোৎসর্গ, সহনশীলতা এবং অদম্য সংগ্রামী মনোবল এক অনন্য ঐতিহাসিক পরম্পরা রচনা করেছে। 


শিক্ষা মানুষের মনের পরিবর্তন ঘটায়। আশালতা দেবী অনুধাবন করেছিলেন সাধারণ মহিলাদের মধ্যে শিক্ষার বীজ বপন জরুরি। শুধুমাত্র ভাষণ বা উৎসাহব্যঞ্জক বক্তৃতার মাধ্যমে তাদের অন্তঃকরণে দেশ ভক্তির কমল প্রস্ফুটিত করা কঠিন। তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো প্রবেশ করলে তারা সহজেই দেশের বর্তমান অবস্থা পরাধীনতার সমস্যা ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে। ফলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বদেশী আন্দোলনে এগিয়ে আসবে। আর এই জন্যই ১৯৩১ সালে তিনি ‘নারীকর্মী শিক্ষা কেন্দ্র’ নামক একটি শিক্ষা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শিক্ষা দাতা রূপে পেয়েছিলেন নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্তকে। এই নিবারণ বাবুর বাগ্মিতা, শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি ছিল অভিনব। গল্পের মাধ্যমে তিনি মূলত পাঠ দান করতেন। তার বাচনভঙ্গি, উপস্থাপন কৌশল মহিলাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। মেদিনীপুরের শিক্ষাকেন্দ্র সম্বন্ধে একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন,  “মেয়েরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঋষিকল্প নিবারণ দাশগুপ্তের কথা শুনছেন, কারো মাথার কাপড় সরে গেছে, কারো বেশবাস অসঙ্গত, কেউ সন্তানকে স্তন্যপান করাচ্ছেন কিন্তু সেদিকে তাঁদের ভ্রূক্ষেপও নেই-কেবল একাগ্রমনে গুরুর কথা শুনেই যাচ্ছেন।”

নারীকর্মী শিক্ষা কেন্দ্রের উদ্দেশ্য : 

ক) এই শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল পিছিয়ে পড়া গৃহস্থ নারীদের শিক্ষার মূলধারায় অন্তর্ভুক্তকরণ। সমাজের সেই সব নারীদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসা, যারা দীর্ঘদিন ধরে গৃহকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। তাদের জন্য স্বল্প ও সহজবোধ্য পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে প্রাথমিক সাক্ষরতা, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক জ্ঞান প্রদান করা হতো। এর মাধ্যমে নারীদের মধ্যে আত্ম-উন্নয়নের বীজ বপন করা এবং তাদেরকে সমাজের উৎপাদনশীল ও সচেতন সদস্য হিসেবে গড়ে তোলা ছিল প্রধান লক্ষ্য।

খ) জাতীয়তাবাদী চেতনা ও রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করা। শুধুমাত্র শিক্ষার জন্য নয়, বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসেবেও কাজ করত। এখানে নারীদের মধ্যে জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হতো। বিশেষভাবে Indian National Congress-এর রাজনৈতিক দর্শন এবং গান্ধীজীর  অহিংসা, সত্যাগ্রহ ও স্বদেশি আন্দোলনের চিন্তাধারা নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। এর ফলে নারীরা কেবল দর্শক নয়, বরং স্বাধীনতা সংগ্রামের সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে পরিণত হতো।

গ) মানসিক শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বগুণের বিকাশে গুরুত্ব আরোপ। নারীদের সামাজিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ও নির্ভরশীল অবস্থানে রাখা হয়েছিল। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষা কেন্দ্রগুলো তাদের মধ্যে মানসিক দৃঢ়তা, সাহস, আত্মসম্মানবোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তৈরি করার চেষ্টা করত। তাদের শেখানো হতো কীভাবে সমাজের রক্ষণশীল বাধা অতিক্রম করে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হয় এবং প্রয়োজন হলে নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হয়।

ঘ) সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। সমাজে প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, পর্দা প্রথা ইত্যাদির বিরুদ্ধে নারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। নারীদের বোঝানো হতো যে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য তাদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।

ঙ) যদিও প্রধান লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা, তবুও পরোক্ষভাবে নারীদের আত্মনির্ভর করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হতো। হাতের কাজ, ছোট শিল্প এবং গৃহভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে আর্থিক স্বাধীনতার পথ খুলে দেওয়া হত।

সার্বিকভাবে বলা যায়, এখানে শিক্ষা শুধু তথ্য অর্জন নয়, বরং আত্মসচেতনতার জাগরণ। নারীকে কেবল সমাজের অনুগত অংশ হিসেবে নয়, বরং ইতিহাস ও জাতীয়তার সক্রিয় নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল মূল লক্ষ্য। এর মধ্যে নিহিত ছিল মুক্তি, মর্যাদা ও মানবিক পূর্ণতার সন্ধান। আর  আশালতা দেবীর এই হেন পদক্ষেপ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।


(ক্রমশঃ)


(পরবর্তী সংখ্যায় সমাপ্য)

ডাঃ রঞ্জন ভট্টাচার্য্য

মহাভারতের কথা : 

কটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধ ও তার পরবর্তী চিত্ররূপ মত্ত পৃথিবীর
রঞ্জন ভট্টাচার্জ  


" এরপর পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে বধ করতে লাগলো... যেন মদমত্ত হয়ে একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলো... একজনের শরীর অন্যজনের উপরে আছড়ে পড়তে লাগলো... যেমন আগুনের মধ্যে পতঙ্গেরা ঝাঁপ দিয়ে মরতে থাকে...কারোর‌ই পালিয়ে যাওয়ার কথা মনে হলো না" - এই বিবরণ মহাভারতের মৌষলপর্বের। 

" আপনি অনেক হত্যা করেছেন - এবার বলরামের খোঁজ করুন - তিনি যেখানে আছেন চলুন সেখানেই যাই" - মহাভারতের এই উক্তিটি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে রণমত্ত ভীম বা অর্জুনের প্রতি নয় । উক্তিটি কৃষ্ণের প্রতি। আর উক্তিটি করেছেন কৃষ্ণের সারথি দারুক ( সঙ্গে ছিলেন যাদববীর বভ্রু )। এই উক্তিটিও মহাভারতের মৌষলপর্বের অন্তর্গত।

এই মৌষলপর্বে এসে আমরা দেখলাম আরেক ভয়াবহ গণহত্যা। এক বীভৎস গৃহযুদ্ধ। যার ফলস্বরূপ দেখা গেলো একটি বৃহৎ, ক্ষমতাশালী এবং সম্পন্ন জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হলো। মৃত্যু হলো ওই গোষ্ঠীর সমস্ত কুশীলবদের। এবং  সবশেষে ইহলোক ত্যাগ করলেন ওই গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ ও শীর্ষ নেতা বাসুদেব কৃষ্ণ। ( মহাভারতের বিপুল কাহিনীতে এটিই শেষ গণহত্যাকান্ড। )

ওই মত্ত পৃথিবীর চিত্ররূপটির শিকড় অনেক গভীরে। মহাভারতের পথে বহু দূরত্ব পেছিয়ে। এখন আমরা সেই শিকড়টির সন্ধানে পিছিয়ে যাবো মহাভারতের পথে -  অনেক দূরত্বে - অনেকটা সময়ের ব্যবধানে। আমরা চলে আসবো দ্রোণপর্বের শেষাংশে।

" ওনাকে হত্যা করো না - হত্যা করো না" - বলে চিৎকার করে এগিয়ে গিয়েছিলেন অর্জুন। " মারবেন না মারবেন না"- চেঁচিয়ে উঠেছিলেন আরো অনেক পান্ডবপক্ষের যোদ্ধারা। কিন্তু এই সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে ধৃষ্টদ্যুম্ন ধ্যানস্থ দ্রোণের শিরচ্ছেদ করলেন সবার সমক্ষে। শুধু শিরচ্ছেদ নয়, অশীতিপর বৃদ্ধ দ্রোণের চুলের মুঠি ধরে তাঁর কর্তিত মুন্ডুটি ছুঁড়ে দিলেন কৌরব যোদ্ধাদের মধ্যে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চূড়ান্ত যুদ্ধাপরাধটি ঘটলো এই ঘটনার দ্বারা।

আমরা এর আগে এই যুদ্ধে একাধিক অনৈতিক ( তৎকালীন যুদ্ধনীতির সাপেক্ষে) কাজ দেখেছি । কৌরবপক্ষের দ্বারা অভিমন্যু হত্যার মতো নিকৃষ্ট কাজ থেকে শুরু করে পান্ডবদের দ্বারা ভীষ্ম, ভুরিশ্রবা কিংবা জয়দ্রথ বধের মতো গর্হিত কর্ম আমরা এর আগে অবশ্যই দেখেছি। তৎকালীন রণনীতিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ঘটানো হয়েছে এই সব হত্যাকান্ডগুলি। কিন্তু দ্রোণাচার্যকে যেভাবে বধ করা হলো তা যেন ছাড়িয়ে গেলো এযাবৎকালের যাবতীয় যুদ্ধাপরাধের মাত্রাকে। 

ঘটনাটিকে তলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হবে যে এই যুদ্ধাপরাধের দায় কিন্তু শুধু ধৃষ্টদ্যুম্নের একার নয়। কারণ দ্রোণাচার্যকে অবিলম্বে এবং যে কোনো উপায়ে (অর্থাৎ যুদ্ধের রীতিনীতির বাইরে গিয়েও )  হত্যা করার পরিকল্পনাটি ছিলো স্বয়ং কৃষ্ণের। যিনি কিনা এই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পান্ডবদের অন্যতম যুদ্ধপ্রকৌশলী ও কূটনৈতিক পরামর্শদাতা। তিনিই পান্ডবদের জানালেন যে দ্রোণ যদি এইভাবে যুদ্ধে পান্ডবসেনা ধ্বংস করতে থাকেন তাহলে আজ‌ই সমস্ত পান্ডব সৈন্য  শেষ হয়ে হয়ে যাবে। অত‌এব যে কোনো উপায়ে তাঁকে এখন‌ই নিহত করার চেষ্টা করা উচিত।

এর পরের ঘটনা মহাভারতে অতি কুখ্যাত যুধিষ্ঠিরের 'অশ্বত্থামা ইতি গজ '। যা 'সচিত্র ছোটোদের মহাভারত' এও জ্বলজ্বল করছে। এবং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের অন্যতম অধর্ম বলে আমাদের মনে অল্পবয়স থেকেই গেঁথে আছে। আমরা জেনেছি যে যুধিষ্ঠিরের মুখ থেকে পুত্রের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে দ্রোণ অস্ত্রত্যাগ করলেন আর সেই সুযোগে ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁকে হত্যা করলেন। কিন্তু ঘটনাক্রম এমন সরলরৈখিক ছিলো না।

দ্রোণের হাতে বিপুলভাবে সৈন্যক্ষয় ( মূলত পাঞ্চাল সৈন্য) হচ্ছে দেখে কৃষ্ণ‌ই স্পষ্টভাবে পান্ডবদের বলেছিলেন এই নিকৃষ্টপন্থাটির কথা। একথা সত্যি যে দ্রোণ নিজেই জানিয়েছিলেন তাঁর এই সংকল্পটির কথা। জানিয়েছিলেন যুদ্ধের আগে, যুধিষ্ঠিরকে। বলেছিলেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো কঠিনতম সংবাদ এলে তিনি অস্ত্র ত্যাগ করবেন। এই তথ্যটিকে আশ্রয় করে কোনো দুরভিসন্ধি যুধিষ্ঠিরের মাথায় আসেনি কখনো।

কৃষ্ণ এই তথ্যবিন্দুটিকেই তাঁর সহজাত কূটনৈতিক দক্ষতায় ব্যবহার করলেন অতিদক্ষ রাজনীতিবিদদের মতো এই  মোক্ষম সময়টিতে। তিনিই জানালেন মিথ্যা ভাষণে দ্রোণকে তাঁর পুত্র অশ্বত্থামার মৃত্যুর সংবাদ দেওয়ার পরিকল্পনাটি। এবং এই ভয়ঙ্কর অন্যায় কাজটি করার জন্য তিনি যুধিষ্ঠিরকে নিযুক্ত করতে চাইলেন। কারণ যুধিষ্ঠিরের কথায় অসত্য থাকে না এটি সর্বজনস্বীকৃত। বিষয়টি যুধিষ্ঠিরের স্বভাবতই গ্রহণীয় বলে মনে হলো না। কৃষ্ণ সম্ভবত প্রস্তুত ছিলেন যুধিষ্ঠিরের এই মনোভাবের জন্য। এইবার কৃষ্ণ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ তর্কজালে যুধিষ্ঠিরকে জড়িয়ে দিলেন। সার্বিক মঙ্গল-অমঙ্গল , চিরন্তন শুভ- অশুভের দ্বন্দ্বে বিদ্ধ করলেন যুধিষ্ঠিরকে।

'একটি মিথ্যা কথায় যদি হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচে তাহলে সেই মিথ্যাভাষণে কোনো অন্যায় নেই। বরং সেই মিথ্যার‌ই আশ্রয় নেওয়া উচিত । কারণ দ্রোণ বেঁচে থাকলে প্রতিমুহূর্তে অসংখ্য সাধারণ যোদ্ধাদের মৃত্যু হচ্ছে। আর এই যুদ্ধ্যমান দ্রোণকে কোনোভাবেই প্রথাগত যুদ্ধ রীতিনীতির ভিতরে থেকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। তাই ওই রীতিনীতির বাইরে গিয়েই দ্রোণকে হত্যা করা উচিত মানবতার স্বার্থে। এবং তা একমাত্র সম্ভব যুধিষ্ঠিরের এই মিথ্যাচারে। ' - এটিই ছিলো কৃষ্ণের অভিমত। যা কোনো ভাবেই খন্ডন করা যুধিষ্ঠিরের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। 

অর্থাৎ আমরা জানতে পারলাম যে ধৃষ্টদ্যুম্ন যে মারাত্মক যুদ্ধাপরাধটি করেছিলেন তার ঢের আগেই  দ্রোণবধের একটি ঘোরতম অনৈতিক ও গর্হিত পন্থা নেওয়া হচ্ছিলো পান্ডবদের পক্ষ থেকে, প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে। ( অর্জুন এই পন্থার সঙ্গে সহমত ছিলেন না , কিন্তু কৃষ্ণের কথার প্রতিবাদ করে ঘটনাটিকে আটকে দেওয়ার সামর্থ্য‌ও তাঁর ছিলো না)। এরপর দ্রোণ বধের জন্য একে একে আরো কয়েকটি চরম অনৈতিকতা আমরা দেখতে পাবো।

ঘটনাক্রম অনুযায়ী সবার আগে মধ্যমপান্ডব ভীমের মুখ থেকেই এই অসত্য ভাষণটি এসেছিলো। ভীম‌ই অশ্বত্থামা নামে একটি হাতিকে মেরে এমনভাবে উল্লসিত হয়ে কথাটি ঘোষণা করেছিলেন যাতে তা দ্রোণের কানে যায়। কথাটি শুনে দ্রোণের মনে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া হলো। প্রাথমিকভাবে তিনি ভীমের কথাটি অবিশ্বাস করলেন। তারপর এক ভয়ঙ্কর আক্রোশে তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ সংযম হারিয়ে হাতে তুলে নিলেন সেই ব্রহ্মাস্ত্রটি যা তিনি কখনো তাঁর এই ক্ষত্রিয়বৃত্তিতে প্রয়োগ করার কথাই ভাবেন নি । কারণ তিনি জানতেন এই ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞাটি। 

কিন্তু পরিস্থিতি ( অর্থাৎ ভীমের ওই উক্তিটি) তাঁকে অকস্মাৎ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে দিলো। তিনি নিঃশেষে ধ্বংস করতে লাগলেন পাঞ্চাল সৈন্যদের। ঠিক তখনই বিরাটবুদ্ধি ঋষিরা দ্রোণের সামনে আবির্ভূত হয়ে বললেন -' একি করছো? সাধারণ সৈন্যদের উপর এই অস্ত্র প্রয়োগ করছো? এখুনি নিবৃত্ত হ‌ও এই ভয়ঙ্কর কাজ থেকে। ' ঋষিদের তীব্র তিরস্কারে দ্রোণ সমস্ত অস্ত্র ত্যাগ করলেন । তাঁর সমস্ত চেতনা জুড়ে তখন একটি‌ই প্রশ্ন -' অশ্বত্থামা এখন জীবিত না মৃত?'  এই ঘটনাটি আমাদের দেখিয়ে দেয় দ্রোণের অস্ত্রত্যাগের তাৎক্ষণিক কারণটি কত দূরাগত।

এরপরই শোনা গেলো যুধিষ্ঠিরের মুখে সেই অতি কুখ্যাত -' অশ্বত্থামা মারা গেছে ' - এরপর খুব নীচু গলায় - ' হাতি নামের '। যা স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধের ওই পরিবেশে এবং ওই মানসিক অবস্থায় দ্রোণের কানে গেলো না। দ্রোণ তো একটু আগেই ঋষিদের কথায় অস্ত্র ত্যাগ করেছিলেন এবার পুত্রের মৃত্যুসংবাদে যেন বোধহীন জীবন্মৃতের মতো স্থির হয়ে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই অশ্বত্থামা দ্রোণের উপর অস্ত্রবৃষ্টি শুরু করলেন। দ্রোণ ওই অর্ধচেতন অবস্থাতেও ফের অস্ত্র তুলে নিয়ে অশ্বত্থামাকে প্রতিহত করতে লাগলেন ।আর তখনই শোনা গেলো মহাভারতের একটি অন্যতম কদর্যভাষণ। 

' আপনি ব্রাহ্মণ হয়ে ব্রাহ্মণের ধর্ম পালন করলে এমন ক্ষত্রিয়ধ্বংস হতো না .. কিন্তু.কার জন্য? যার কথা ভেবে আপনি বেঁচে থাকেন সেই অশ্বত্থামা তো মরে পড়ে আছে - যুধিষ্ঠির‌ও বলে গেলেন সে কথা- আপনি তার কথা তো অবিশ্বাস করতে পারেন না -তাহলে আর কেন ?' - কথাগুলি মধ্যমপান্ডব ভীম চিৎকার করে বললেন দ্রোণকে। অর্থাৎ একটি নির্জলা মিথ্যাচারকে চমৎকারভাবে প্রতিষ্ঠা করাতে যে চূড়ান্ত শঠতার ( এবং এক্ষেত্রে নির্মমতার‌ও )  উদাহরণ রাখলেন ভীম তা সচেতন মহাভারতপাঠকের ভোলার কথা নয়। 

অর্থাৎ দ্রোণহত্যার ক্ষেত্রে যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধটি হলো তার সলতে পাকানোর কাজটি শুরু হয়েছিলো ধৃষ্টদ্যুম্নের এই সীমাহীন কুকীর্তির অনেক আগে থেকেই। কৃষ্ণের কাছ থেকেই এসেছিলো এই ভয়ঙ্কর নিকৃষ্ট প্রস্তাবটি। যুধিষ্ঠিরের মুখে সেটিকে প্রকাশ করা হলো। (যদিও একটি অর্ধসত্যকে আশ্রয় করে যুধিষ্ঠির এই মারাত্মক অপরাধে ' গা বাঁচানোর ' চেষ্টা করলেন।) ঋষিদের কথার মর্যাদা দিয়ে দ্রোণ আগেই অস্ত্রত্যাগ করেছিলেন। ভীমের মাত্রাছাড়া শঠতায় তিনি দেহে ও মনে সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে নিজেকে যোগনিযুক্ত করে নিজের রথের উপরে সমাহিত হলেন। আর তখনই পান্ডবপক্ষের এই সুপরিকল্পিত এবং সুসংগঠিত যুদ্ধাপরাধটি তার চূড়ান্ত রূপ পেলো ধৃষ্টদ্যুম্নের হাতে।

ধৃষ্টদ্যুম্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সবার সামনে অনেকের ঘোরতর আপত্তি ও হাহাকারকে অগ্রাহ্য করে ( এর মধ্যে অর্জুনের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ্য) ধ্যানমগ্ন দ্রোণের চুলের মুঠি ধরে তাঁর শিরচ্ছেদ করলেন। শুধু তাই নয় দ্রোণের ওই কর্তিত মাথাটি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন কৌরবসেনাদের মধ্যে। কৌরব ও পান্ডবদের প্রধান অস্ত্র শিক্ষাগুরু সর্ববেদজ্ঞ সর্বঅস্ত্রবিশারদ দ্রোণাচার্যের জীবদেহের শেষগতি হলো এইভাবে। শুধুমাত্র জীবদেহের‌ই , কারণ মহাভারতকার বোধহয় চাননি অমন বেদজ্ঞ অস্ত্রবিশারদের মহান জীবনের এমন হীন সমাপ্তি। তাই মহাভারতকারের বর্ণনায় দ্রোণের ' মৃত্যু ' হয়েছিলো ধৃষ্টদ্যুম্নের ওই খড়্গাঘাতের আগেই।

"অশ্বত্থামা তাঁর চোখদুটি বন্ধ করে , মুখটা সামান্য উঁচু করে ওঁম শব্দটি উচ্চারণ করলেন - আমি দেখলাম একটি দিব্যজ্যোতি তাঁর ধ্যানস্থ দেহ থেকে বার হয়ে উল্কার মতো মহাকাশে মিলিয়ে গেলো - সেই সময় ওই ভীষণ তেজোদীপ্ত আলোয় আকাশে যেন একসঙ্গে দুটো সূর্য রয়েছে বলে মনে হলো - বুঝলাম দ্রোণ ব্রহ্মলোকে চলে গেলেন - দ্রোণের এই অন্তিমগতিটি দেখতে পেলো মাত্র পাঁচজন - আমি, যুধিষ্ঠির, অর্জুন ,কৃপাচার্য এবং কৃষ্ণ।" - এই বর্ণনা সঞ্জয়ের। আমরা তাঁকে জানি যে সাময়িক দিব্যদৃষ্টিতে তিনি যুদ্ধের যাবতীয় ঘটনা দেখছেন ও অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে তার বিবরণ দিচ্ছেন। এই বিবরণীটি তিনি দিয়েছিলেন ধৃতরাষ্ট্রকে । এই বিবরণ থেকে এটি স্পষ্ট যে ধৃষ্টদ্যুম্নের আঘাতের আগেই দ্রোণের প্রাণ স্বেচ্ছায় ইহজাগতিক বন্ধন ত্যাগ করে ঊর্ধ্বলোকে বিসর্জিত হয়েছিলো।

এইবার আমরা মহাভারতের বিপুল প্রেক্ষিতে এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধের পরবর্তী চিত্ররূপটি দেখতে চেষ্টা করবো। এই ঘটনার পরমুহূর্তেই আমরা দেখতে পাচ্ছি পান্ডবপক্ষের ধৃষ্টদ্যুম্ন ও ভীমের প্রতিক্রিয়া -' ট্র্যাজিক উল্লাসে '। উল্লাসের ছবিটি প্রথমে দেখা যাক। ' ট্র্যাজিক'টি আমরা অল্পকালের ব্যবধানে দেখতে পাবো। 

'এবার দেখলাম ভীম আর ধৃষ্টদ্যুম্ন পরস্পরকে আলিঙ্গন করছেন। ভীম ধৃষ্টদ্যুম্নকে বলছেন - কর্ণ আর দুর্যোধনকে বধ করার পর আবার এইভাবে তোমাকে জড়িয়ে ধরবো '- এই বলে ভীম বিরাট আনন্দে যেন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন।'- এই বিবরণী সঞ্জয়ের। ধৃতরাষ্ট্রের কাছে । এর কয়েক মুহূর্ত আগেই এক‌ই রকম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। তিনি  দ্রোণের কর্তিত মাথাটি কৌরবসৈন্যদের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তরোয়াল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মহা উল্লাসে চিৎকার করছিলেন । আর দ্রোণের কাটা মুন্ডুটিকে ওই ভাবে গড়িয়ে আসতে দেখে কৌরবসৈন্যরা যে যেদিকে পারলো দৌড়ে পালাতে লাগলো। 

এই ' দৌড়ে পালানো ' কথাটি বোধহয় অর্থে সুদূরপ্রসারী। কারণ এরপর আমরা দেখতে পাবো কিভাবে যুদ্ধের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত পান্ডবদের ত্রস্ত করে কতদূর নিয়ে গেছিলো দ্রোণের এই কর্তিতশিরটি। এখন আমরা এই বিস্তৃত ঘটনাক্রমের সূত্রপাতটিতে আসছি। আসছি অশ্বত্থামার একটি উক্তিতে। নিজের পিতাকে ‌যেভাবে হত্যা করা হলো এবং হত্যার পর যেভাবে তাঁর কর্তিত মুন্ডুটি সৈন্যদের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে চরমতম অসম্মান করা হলো তার প্রত্যুত্তরে আমরা সমতুল্য কঠোর বাক্য‌ই প্রত্যাশা করেছিলাম দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামার দিক থেকে। অশ্বত্থামার কথাগুলি শুধু কঠোর ছিলো না, তাতে বিষের মাত্রাও ছিলো ভয়ঙ্কর। কিন্তু শুধু অশ্বত্থামা নয় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিলো পান্ডবপক্ষের অন্দরমহলেও। 

দ্রোণের উপর এই মাত্রাহীন যুদ্ধাপরাধের প্রতিক্রিয়া কতটা সুগভীর হতে চলেছে তা বোঝা‌ যায় সেই সময়ে যুধিষ্ঠিরের সম্পর্কে দুটি উক্তিতে।

প্রথমটি :' সব শুনলাম - শুনলাম ওই ধর্মের ধ্বজাধারী যুধিষ্ঠির কতটা পাপ করেছে -ওই অনার্য নৃশংস যুধিষ্ঠির কতটা অন্যায় করেছে... দেখতে পাবে এর ফল...আজ এই রণভূমি ওই ধর্মপুত্রের রক্তপান করবে' - কথাগুলি অশ্বত্থামার। অশ্বত্থামার আক্রোশের মাত্রাটি বোঝার জন্য এই উক্তিটিই যথেষ্ট। মহাভারতে যুধিষ্ঠিরের প্রতি এমন প্রতিহিংসার কথা এর আগে কেউ কখনো বলেননি। 

দ্বিতীয়টি  : ' রাজা! আপনি মিথ্যা গুরুসেবা করেছেন। রাজ্যলাভের জন্য মিথ্যা কথা বলে আপনি অতি গুরুতর পাপ করেছেন। অন্যায়ভাবে বালিকে বধ করে রামের যেমন চিরস্থায়ী দুর্নাম হয়েছে, আপনার‌ও এমন অন্যায়ভাবে দ্রোণবধ করা চিরকালের অকীর্তি হয়ে থাকবে।... আপনি আপনার চিরন্তন ধর্মকে পরিত্যাগ করে এমন অধর্ম করে ধৃষ্টদ্যুম্নের দ্বারাগুরু হত্যা করালেন, এখন পারেন তো আপনার সহচরদের নিয়ে ওই ধৃষ্টদ্যুম্নকে রক্ষা করুন '- এই উক্তিটি কৌরবপক্ষের কারো নয়। উক্তিটি তৃতীয় পান্ডব অর্জুনের। যুধিষ্ঠিরকে সর্বসমক্ষে এমন তীব্র তিরস্কার এর আগে কোনো পান্ডব কখনো করেননি। 

যুধিষ্ঠিরের দিক থেকে এই কথার কোনো উত্তর আসেনি। আসার কথাও নয়। কিন্তু এর প্রেক্ষাপটে পান্ডবশিবিরে যে তীব্র অন্তর্কলহের সূত্রপাত হলো সেটি আমরা অনতিবিস্তারেই দেখবো । 

"তুমি বনের মুনি ঋষিদের মতো দয়া দেখাচ্ছো .. মুর্খের মতো কথা বলছো..  আমরা সবাই মিলে দুর্যোধনদের এত পাপকাজের যখন প্রতিশোধ নিতে এসেছি, তখন তুমি আমাদের কাজের সমালোচনা করছো. ..তুমি ক্ষত্রিয়ধর্মের কিছুই বোঝোনি ...থাক, তোমাকে কিছু করতে হবে না...আমি একাই অশ্বত্থামাকে বধ করবো...ইত্যাদি ইত্যাদি" - কথাগুলি ভীমসেনের। অর্জুনের প্রতি। 

'ব্রাহ্মণের কোন কাজটি করেছেন দ্রোণ ? নিজের ধর্ম ত্যাগ করে ক্ষত্রিয় ধর্ম নিয়ে অলৌকিক অস্ত্র দিয়ে সৈন্যদের বধ করতে করতে অসহ্য হয়ে উঠেছিলেন, তাই কূটকৌশলে ওই নিকৃষ্ট ব্রাহ্মণকে হত্যার মধ্যে কি অন্যায় আছে?... যিনি যুদ্ধে সাধারণ সৈনিকদের উপর ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করতে পারেন সেই নৃশংসকে আমি শেষ করেছি - এরজন্য আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছো না কেন? আর ওই দ্রোণের মাথাটা যেটা কালাগ্নির মতো ভয়ঙ্কর আর বিষের মতো মারাত্মক ছিলো সেটিকে আমি ছেদন করেছি বলে আমায় প্রশংসা করছো না কেন? .. ...ইত্যাদি ইত্যাদি।- কথাগুলি ধৃষ্টদ্যুম্নের । অর্জুনের প্রতি।

ধৃষ্টদ্যুম্নের কথায় পান্ডবরা নিরুত্তর র‌ইলেন। কিন্তু যে উত্তরটি শোনা গেলো তা অতি ভয়ঙ্কর। " আরে ইতর! তুই মৃত গুরুদেবকেও গালি দিচ্ছিস, এই পাপে তোর জিভ খসে পড়ছে না কেন? মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে না কেন? এতে তুই তোর প্রাণপুরুষকে নরকে পাঠালি..পাঞ্চালরা এমন‌ই গুরুদ্রোহী হয়..ফের এভাবে কথা বললে আমার এই গদা দিয়ে তোর মাথাটা তখনই গুঁড়িয়ে দেবো...- কথাগুলি সাত্যকির। 

এরপর ধৃষ্টদ্যুম্নের উত্তর-".."তুই নীচ নরাধম - তোর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি নিন্দনীয় ... মনে নেই কিভাবে ভুরিশ্রবাকে ধ্যানস্থ অবস্থায় হত্যা করেছিলি .. ফের যদি এরকম কথা বলিস তো এখানেই তোকে বাণ মেরে শেষ করে দেবো । 

এরপর সাত্যকি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন "- আর কথা নয় - এবার তোকে শেষ করেই দেবো" বলে ধৃষ্টদ্যুম্নের দিকে তেড়ে এলেন।ভীম তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করতে লাগলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন‌ও চীৎকার করে বলে উঠলেন -" আমায় তুমি ভুরিশ্রবা ভেবেছো? ভীমসেন ! ওকে ছেড়ে দাও। আমি এখুনি ওকে বধ করবো। " এইভাবে সাত্যকি আর ধৃষ্টদ্যুম্ন দুটি দ্বন্দ্বরত বৃষের মতো পরস্পর আক্রমণ করতে এগিয়ে গেলেন । কৃষ্ণ আর যুধিষ্ঠির তাদের নিরস্ত করলেন। 

এইভাবে পান্ডবশিবিরের ভিতরের ছবিটি কদর্যতম হয়ে গেলো। আর এই সমস্ত ঘটনার উৎস বিন্দুটি ছিলো দ্রোণহত্যা। সাময়িক ভাবে এই গৃহবিবাদের তীব্রতা প্রশমিত হলেও এর শিকড়টি রয়ে গেলো অতিগভীরে।

এদিকে শোক দুঃখ অনুশোচনা এবং সর্বোপরি এক সীমাহীন ক্রোধ অশ্বত্থামাকে এক ভয়ানক প্রতিহিংসার মূর্তিতে পরিণত করলো । " আমার সমস্ত অলৌকিক অস্ত্রগুলিকে ধিক - আমার এই বাহুদুটিকে ধিক - আমার সমস্ত পরাক্রমকে ধিক - আজ আমি এমন অস্ত্র প্রয়োগ করবো যে কোনো দেব দানব রাক্ষস গন্ধর্ব‌ও তাকে প্রতিহত করতে পারবেন না .. আমি আজ সমস্ত শত্রুনিপাত করবো"। এরপর‌ই অশ্বত্থামা তাঁর নারায়ণাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। নিমেষেই অজস্র সৈন্য ধ্বংস হতে লাগলো কিন্তু কৃষ্ণের অসীম যুদ্ধপ্রাজ্ঞতায় সবাই স্বেচ্ছায় অস্ত্রত্যাগ করে প্রাণে বেঁচে গেলেন। অশ্বত্থামার চূড়ান্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। তিনি ব্যাসদেবের থেকে জানতে পারলেন কৃষ্ণের অমেয় দৈবরূপ।

শোকাচ্ছন্ন বিচ্ছিন্নবুদ্ধি অশ্বত্থামা তখন প্রতিশোধের ভিন্ন পথ নিলেন। " ক্ষত্রিয়বৃত্তি নিয়ে , সর্বপ্রকারের অস্ত্রবিদ্যা শিখে যদি পিতার হত্যার প্রতিশোধ না নিতে পারি তো প্রাণ ধারণের কি প্রয়োজন? তাই যে কোনো উপায়ে প্রতিশোধ নেওয়াই এখন একমাত্র ধর্ম আমার .." এইসব কুটিলজটিল যুক্তজাল বিছিয়ে তিনি প্রস্তুত হলেন মধ্যরাতে সেই মহা সংহারের জন্য। 

মহাভারতের অন্যতম যুদ্ধাপরাধের প্রতিক্রিয়া শুরু হলো অশ্বত্থামার এই মধ্যরাতের হত্যাকাণ্ডে। অশ্বত্থামা নিশুতি রাতে পান্ডব শিবিরের প্রবেশ করে দেখলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন নিশ্চিন্তমনে ঘুমাচ্ছেন। ঘুমন্ত ধৃষ্টদ্যুম্নকে একটি প্রচন্ড পদাঘাত করলেন অশ্বত্থামা। তাঁর পর ধৃষ্টদ্যুম্নের চুলের মুঠি ধরে টেনে তুললেন। এরপর অশ্বত্থামা ধৃষ্টদ্যুম্নের গলা আর বুক চেপে ধরলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন বুঝতে পারলেন যে তিনি অশ্বত্থামার কবলে পড়েছেন। তিনি ছটফট করতে করতে অশ্বত্থামাকে অনুনয় করে বললেন -" আমায় অস্ত্র দিয়ে বধ করো- যাতে আমার ক্ষত্রিয়ের স্বর্গগতি হয়"। অশ্বত্থামা বললেন - "তোর মতো কুলাঙ্গার গুরুহত্যাকারী দুর্বৃত্তের অস্ত্রাঘাতে মৃত্যু হয়ে স্বর্গলাভ হয় না। " এইবলে তাঁর দুপায়ের গোড়ালি দিয়ে পিষে হত্যা করলেন ধৃষ্টদ্যুম্নকে। দ্রোণহত্যার মতো ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধের প্রতিক্রিয়ার বৃত্তপথটি এভাবেই শুরু হলো। 

গোটা রাতের মধ্যেই সমস্ত পাঞ্চালসহ পান্ডব সৈন্যদের ধ্বংস করে অশ্বত্থামা ক্ষান্ত হলেন। কিন্তু ঘটনাক্রম শান্ত হলো না। তাই আরেকটি রক্তাক্ত বৃত্তপথের সূচনা হলো মাত্র।। এরপর আমরা এই পথটি ধরে ক্রমশ এগিয়ে গিয়ে দেখতে পাবো আরো কিছু ভয়ঙ্কর চিত্ররূপ।

অশ্বত্থামার এই বীভৎস গণহত্যাকাণ্ডের পর এবার এলো পান্ডবদের প্রতিশোধ পালা। এবং এখানেও সর্বাগ্রে আছেন যুদ্ধপ্রিয় মধ্যমপান্ডব ভীম । তাঁর পিছনে কৃষ্ণ ও অর্জুন। যাদের দেখে নিজের প্রাণ বাঁচাতে অশ্বত্থামা নিক্ষেপ করলেন তাঁর ব্রহ্মশির অস্ত্রটি। সেটিকে প্রতিহত করতে অর্জুন‌ও এক‌ই অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। প্রধান ঋষিদের কথায় অর্জুন তাঁর অস্ত্র সংবরণ করে নিলেন। কিন্তু অশ্বত্থামার সেই বিদ্যা ছিলো না। অশ্বত্থামার ইচ্ছা অনুসারে সেই অস্ত্রের লক্ষ্য হলো উত্তরার গর্ভস্থ শিশুটি। অর্থাৎ পান্ডবদের শেষ বংশরক্ষকের উপর। অশ্বত্থামার জিঘাংসা চরিতার্থ হলো। এরপর কৃষ্ণের দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে অশ্বত্থামা চলে গেলেন সমাজসংসারবর্জিত অবস্থায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। 

এর দ্বারা কিন্তু ওই ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধের প্রতিক্রিয়ার বৃত্তটি সম্পূর্ণ হলো না। এখনো মহাভারতের কথায় কিছু মায়া রয়ে গেলো। এই বৃত্তের পূর্ণায়নের জন্য, এই মায়ার শেষরেশটুকু দেখার জন্য আমাদের আরো কিছু কাল এগিয়ে যেতে হবে। চলে আসতে হবে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আরো বেশ কিছু বছর পরের একটি ঘটনায়। ঘটনাটি মৌষলপর্বের। ঘটনাটি বেশ নাটকীয়। 

ঘটনার স্থান : প্রভাসতীর্থ। ঘটনার চরিত্রেরা: কৃষ্ণ , বললাম, সাত্যকি, কৃতবর্মা, প্রদ্যুম্ন, বভ্রু এবং অন্যান্য যাদবরা 

কৃষ্ণের সামনেই সবাই মদ্যপানে রত।

সাত্যকি: ( কৃতবর্মার প্রতি ) কোন্ ক্ষত্রিয় ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করে? তুমি যা করেছো তাই যাদবরা সহ্য করবে না 

কৃতবর্মা: ( সাত্যকির প্রতি) তুমি কি করেছিলে ভুরিশ্রবার বেলায়? ভুরিশ্রবা যখন প্রায়োপবেশনে ছিলো অর্জুন তাকে দুহাত কেটে দিয়েছিলো - তুমি তাকে সেই অবস্থায় বধ করেছিলে ।শিখন্ডীকে সামনে রেখে অর্জুন ভীষ্মকে অন্যায় যুদ্ধে বধ করেছিলো । দ্রোণাচার্য‌ও প্রায়োপবেশনেই ছিলেন - তাঁকেও ওই অবস্থায় ধৃষ্টদ্যুম্ন অত্যন্ত গর্হিতভাবে তাঁকে হত্যা করেছিলো। কর্ণ তাঁর রথের চাকা উত্তোলন করেছিলেন সেই সময় অত্যন্ত অনুচিত ভাবে অর্জুন তাকে হত্যা করেছিলো। ভীম‌ও দুর্যোধনের ঊরুতে অন্যায়ভাবে আঘাত করে তাকে বধ করেছিলো।

(কথাগুলি শুনে কৃষ্ণ কৃতবর্মার দিকে ক্রুদ্ধ ও বক্র দৃষ্টিতে তাকালেন।) 

সাত্যকি এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন -

:এই দুরাত্মা কৃতবর্মাকে সঙ্গে নিয়ে অশ্বত্থামা পান্ডবশিবিরে ঘুমন্ত অবস্থায় পান্ডব ও পাঞ্চালসৈন্যদের হত্যা করেছিলো । আজ এখন এই দুরাত্মা কৃতবর্মাকেও ওই পথেই পাঠাচ্ছি 

( এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণের সামনেই সাত্যকি তার তরোয়াল দিয়ে কৃতবর্মার শিরচ্ছেদ করলেন )

এরপর সাত্যকি অন্যান্যদের‌ও বধ করতে শুরু করলেন ।তখন অন্ধক ও ভোজরা ( এরা অন্যান্য যাদব বংশীয়) একসঙ্গে সাত্যকিকে ঘিরে ধরলো এবং উচ্ছিষ্ট পানপাত্রগুলি দিয়ে সাত্যকিকে মারতে শুরু করলো। কৃষ্ণের পুত্র প্রদ্যুম্ন সাত্যকিকে মুক্ত করতে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু সংখ্যায় অনেক বেশি অন্ধক ও ভোজরা কৃষ্ণের সামনেই সাত্যকি ও প্রদ্যুম্নকে মেরে ফেললো । নিজের পুত্রকে এভাবে মারা যেতে দেখে কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে এক মুঠো শর হাতে তুলে নিলেন। তারপর সেই শর সামনের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। ওই শরগুলি ভয়ঙ্কর মুষল হয়ে বজ্রের মতো আছড়ে পড়ে নির্বিচারে গণহত্যা করতে লাগলো। এইভাবে মদমত্ত যাদবরা একে অন্যকে হত্যা করতে লাগলো। পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে বধ করতে লাগলো। একজন আরেকজনের উপরে আছড়ে বলতে লাগলো। কারুর‌ই পালিয়ে যাওয়ার কথা মনে হলো না।কৃষ্ণ স্থির হয়ে দেখতে থাকলেন কালের এই পরিবর্তন । 

মৌষলপর্বের এই ঘটনাটি যেমন নাটকীয় তেমন‌ই নারকীয়।‌এই ঘটনার‌ই উল্লেখ করা হয়েছে বর্তমান আলোচনার শুরুতে। এইবার আমরা এই ঘটনাটির বীজকণাটিকে দেখতে চেষ্টা করবো। 

সম্পর্কে দ্রোণের সম্বন্ধী  কৌরবপক্ষীয় কৃতবর্মার অন্তরে ভগ্নীপতি এবং একান্ত আপনজন দ্রোণের এমন ভয়ঙ্কর হত্যার বিষয়টি তুষের আগুনের মতো ভিতরে ভিতরে জ্বলছিলো এতকাল ধরে। মদমত্ত সাত্যকির কথাগুলি তার উপর ছিটিয়ে পড়া আগুনের ফুলকির মতো কাজ করলো। এইভাবে একটি বাগবিতণ্ডাকে কেন্দ্র করে একটি গৃহযুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠলো। আর সেই দাবানল ছড়িয়ে পড়লো যাদবদের মত্ত পৃথিবীতে। যদুকুল ধ্বংস হলো। কৃষ্ণের চাক্ষুষে। এবং নির্বিকার অপ্রতিরোধে।

এইভাবে আমরা দেখতে পেলাম - বহুকাল আগের এক মাত্রাহীন যুদ্ধাপরাধের বহুস্তরীয় ও বহুকালব্যাপী প্রতিক্রিয়া - কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে পান্ডবপাঞ্চালসৈন্যদের গণহত্যা থেকে শুরু করে বহুকাল পরের প্রভাসতীর্থে যাদবদের আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধ অবধি একের পর এক ঘটনায় বৃত্তায়িত হয়ে মহাভারতের মত্ত পৃথিবীর অন্যতম চিত্ররূপ হয়ে র‌ইলো।

-"


ডাঃ অনির্বাণ কুণ্ডু

চেতনা কি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মৌলিক ক্ষেত্র?

ডাঃ অনির্বাণ কুণ্ডু 


চেতনার অস্তিত্ব বিশ্বব্যাপী । ঠিক যেমনভাবে Higg's field সমস্ত বিশ্ব ব্যাপ্ত হয়ে আছে, তেমনি ভাবেই চেতনা সর্বত্র বিরাজমান। যেখানেই কনা সেখানেই চেতনা।


চেতনা কী? এই প্রশ্নটি মানবসভ্যতার আদিযুগ থেকে চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সাধারণ দৃষ্টিতে চেতনা হলো জীবদেহের, বিশেষত উচ্চতর প্রাণী ও মানুষের, একান্ত নিজস্ব গুণ বা অভিজ্ঞতার অবস্থা। কিন্তু যদি চেতনা কেবল জীবদেহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটি মৌলিক ও সর্বব্যাপী ক্ষেত্র হতো? যেমনটি পদার্থবিদ্যায় হিগস ফিল্ড সমগ্র মহাশূন্যে বিরাজ করে এবং ভর সৃষ্টির মাধ্যমে পদার্থের ভিত্তি রচনা করে, তেমনই যদি চেতনা একটি সার্বজনীন ক্ষেত্র হয়, যা পরমাণু থেকে কোষ পর্যন্ত, অনু থেকে মহাজাগতিক বস্তু পর্যন্ত সকল স্তরে কোনো না কোনো রূপে বিরাজমান? এই প্রবন্ধে আমরা এই তাৎপর্যপূর্ণ সম্ভাবনা অন্বেষণ করব। আমরা দেখব কীভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গি যা দর্শনের প্যানসাইকিজম (pansychism) বা সর্বচৈতন্যবাদ ধারণার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ....বিজ্ঞান, দর্শন এবং অস্তিত্বের প্রশ্নগুলিকে নতুন আলোকে দেখতে সাহায্য করতে পারে।


আধুনিক পদার্থবিদ্যা আমাদের শিখিয়েছে যে শূন্যতা কখনই পরম শূন্য নয়। এটি কণা-অতিকণার সৃষ্টি-বিলয়ের নৃত্যক্ষেত্র, এটি শক্তির স্পন্দনে পরিপূর্ণ। হিগস ক্ষেত্র এমনই একটি সর্বব্যাপী ক্ষেত্র, যা কণাদের সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া করে তাদের ভর দান করে। অনুরূপভাবে, যদি চেতনাকে আমরা একটি মৌলিক ক্ষেত্র হিসেবে ধারণা করি, তবে তা কেবল জটিল মস্তিষ্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মহাবিশ্বের গঠনগত একক পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রতিটি পরমাণু, প্রতিটি মৌলিক কণায় একটি প্রাথমিক বা প্রোটো-চেতনার স্তরে উপস্থিত থাকতে পার

পড়তে থাকুন

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী
কবিতার পাতা - ১কবিতার পাতা - ২গল্পরম্য রচনাধারাবাহিক উপন্যাস বিবিধ
  • প্রথম পাতা
  • Privacy Policy
  • Terms and Conditions

আক্ষরিক

82748 38787

Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.

Powered by GoDaddy

This website uses cookies.

We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.

Accept