
মহাভারতের কথা: দূরে কোথায় দূরে দূরে
রঞ্জন ভট্টাচার্য
" কোথা থেকে আসছো তুমি? এতকাল ছিলে কোথায়?" - এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু হলো এক মহাবৃত্তান্ত । মহর্ষি শৌনকের আশ্রমের মুনিরা প্রশ্ন করলেন সৌতিকে । তখন নৈমিষারণ্যে মহর্ষি শৌনক দ্বাদশবার্ষিক যজ্ঞ করছিলেন। উপস্থিত ছিলেন তাঁর আশ্রমের মুনিঋষিরা । সেখানেই হঠাৎ করেই যেন এসে পড়লেন সৌতি। যিনি পুরাণকথক লোমহর্ষণের পুত্র। সৌতি নিজেও পুরাণকথক । সৌতি বললেন যে তিনি রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে গিয়েছিলেন। সেখানে ঋষি বৈশম্পায়নের মুখে মহাভারতকথা শুনলেন। তারপর বহু তীর্থ ভ্রমণ করলেন। শেষে সমন্তপঞ্চক দেশে গেলেন যেখানে কুরুপান্ডবদের যুদ্ধ হয়েছিলো। তারপর তিনি এই নৈমিষারণ্যে এলেন। এইবলে সৌতি ঋষিদের জিজ্ঞেস করলেন - বলুন কি শোনাবো আপনাদের - পুরাণকথা ? মুনিঋষি না রাজারাজড়াদের ইতিহাস? ঋষিরা বললেন - তুমি রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে যে মহাভারতকথা শুনে এসেছো তাই শোনাও । সৌতি বলতে শুরু করলেন - এই কাহিনী আমার আগে অন্যেরা বলে গেছেন। এখন অনেকে বলছেন। ভবিষ্যতে আবার অন্যেরা বলবেন । '
এইভাবেই শুরু হলো মহাভারতের কথা। বহুদূর থেকে এক কথক হঠাৎ করেই অনাহুতভাবে চলে এলেন এক গভীর অরণ্যের যজ্ঞস্থলে যজ্ঞরত ঋষিদের সামনে । তারপর তাঁদের কথাতেই উজাড় করে দিলেন তাঁর অতদূর থেকে শুনে আসা ভারতকথার বিশাল ভান্ডার।
এইবার আমরা দেখতে চেষ্টা করবো কিভাবে এই কাহিনীগুলি কিভাবে দূরাগত হয়ে এসে দাঁড়াচ্ছে আমাদের বিস্ময়ের সামনে । আর কিভাবেই বা দূরতর হয়ে চলে যাচ্ছে আমাদের বিহ্বল করে।
রাজা জনমেজয় তখন তাঁর সর্পসত্র যজ্ঞ শুরু করেছেন। সেই যজ্ঞ দেখতে এসেছেন দূরদূরান্ত থেকে অজস্র মুনি ঋষিরা। এইভাবেই সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছেন ব্যাসদেব স্বয়ং। এসেছেন তাঁর অন্যতম শিষ্য বৈশম্পায়নের সঙ্গে। যজ্ঞ কার্যক্রমের মাঝের বিরতিসময়ে রাজা জনমেজয় মহর্ষি ব্যাসদেবকে বহুবার অনুরোধ করলেন তাঁর পূর্বপুরুষদের কাহিনী বলার জন্য। কিন্তু মহর্ষি ব্যাস নিজমুখে কিছুই বললেন না । তাঁর ইঙ্গিতে অনুমতিতে তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়ন বলতে শুরু করলেন এই বিরাট ভারতকথা । এই ভাবে এই বিশাল ভারতকথার বৃত্তান্তগুলি এই প্রথম মহর্ষি ব্যাসদেবের শিষ্যবৃত্তের জ্ঞানের বাইরে এলো। এবং আশ্চর্যজনকভাবে এই কাহিনীগুলি বর্ণিত হলো দূর থেকে আসা এক ঋষির ( অর্থাৎ ঋষি বৈশম্পায়নের) মুখ থেকে।
তাই 'দূরত্ব ' ব্যাপারটি যেন এই ভারতকথার ' কথনের' সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এইভাবে ' কথিত ' অজস্র কাহিনীগুলি, যারা অতিসর্পিল ভাবে জড়িয়ে আছে একটির সঙ্গে আরেকটি , তাদের ভিতর থেকে আমরা এবার ' দূরত্বের ' কাহিনীগুলি খুঁজে নেবো। , অর্থাৎ আমরা সেই কাহিনীগুলিতে আলোকপাত করবো যেখানে কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্রটির সঙ্গে দূরগামিতার একটি আশ্চর্য রসায়ন ঘটেছে।
মহাভারতের মূল কাহিনীতে প্রবেশ করার আখ্যানগুলির অন্যতম জরৎকারুর কাহিনীতে আসছি ।
' আমি এবার চললাম ' - বললেন ঋষি জরৎকারু । বললেন তাঁর স্ত্রীকে।( তাঁর নামও জরৎকারু। এইবলে এই জরৎকারু ঋষি যে কোন দূরান্তে মিলিয়ে গেলেন আমরা আর কখনো তাঁর হদিস পেলাম না। তাঁর স্ত্রীও আর কোনো দিনও খুঁজে পেলেন না তাঁকে ঘটনাটির সামান্য পূর্বাপর বলা প্রয়োজন।
জরৎকারু নামে এক ঋষি ছিলেন। যিনি স্থির করেছিলেন যে তিনি যদি বিবাহ করেন তাহলে তাঁর নামের অর্থাৎ জরৎকারু নামের কোনো কন্যাকেই তিনি স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করবেন , নচেৎ নয় । নাগরাজ বাসুকির ভগ্নীর নাম ছিলো জরৎকারু। নাগরাজ বাসুকি শুনেছিলেন যে তাঁর ভগ্নীর গর্ভে যে পুত্র সন্তান উৎপন্ন হবে সেই সন্তানই সর্পমাতা কদ্রুর অভিশাপে সর্পকুলের যে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবে। বাসুকি ঋষি জরৎকারুর সন্ধান করে তাঁর সঙ্গে ভগ্নীর বিবাহ দিয়ে সেই ভগ্নীর পুত্রসন্তানের প্রত্যাশায় রইলেন। হঠাৎই এক তুচ্ছ কারণে ( এখানে তা বিশদে বলা অপ্রয়োজনীয়) ঋষি জরৎকারু , যিনি তাঁর স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলেন, তিনি উঠে পড়ে বললেন -' আমি চললাম।' বাসুকির ভগ্নী জরৎকারু অনেক অনুরোধ করলেন তাঁকে এই ভাবে চলে না যেতে। কিন্তু ঋষি জরৎকারু কোনো কথাই শুনলেন না। তিনি চলে গেলেন তাঁর স্ত্রী জরৎকারুকে ছেড়ে। বরাবরের মতো। যেমনভাবে তিনি এসেছিলেন বহুদূর থেকে তেমনভাবেই বহুদূরে চলে গেলেন তিনি। চলে গেলেন তাঁর স্ত্রীর দৃষ্টিপথের বাইরে। আমাদের নাগালেরও বাইরে। কারণ মহাভারতের কথায় এরপর ঋষি জরৎকারুর আর কোনো উল্লেখ রইলো না। কিন্তু চলে যাওয়ার সময় তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলেন " অস্তি"। অর্থাৎ ' আছে '। এই ' অস্তি' কথাটির তাৎপর্য ছিলো সুগভীর।( যে প্রসঙ্গে আমরা এরপরেই আসবো)
মহাভারতের আদিকথার সূত্রপাত যে ব্যক্তিটিকে ধরে তিনি এই ঋষি জরৎকারু। যিনি গল্পের আঙিনায় এলেন বহুদূর থেকে । আবার চলে গেলেন গল্পের আঙিনা ছেড়ে কোথায় কে জানে। কিন্তু রেখে গেলেন মহাভারতের কাহিনীতে প্রবেশ করার এক আশ্চর্যপথ। এই পথটির নাম' আস্তিকপর্ব' । মহাভারতের শুরুর এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ঋষি জরৎকারুর স্ত্রীর প্রতি শেষ কথাটির ( ' অস্তি ') সূত্রে তাঁর পুত্রের নাম রাখা হলো ' আস্তিক '। এই আস্তিক পরবর্তীকালে হলেন এক মহাতেজা ঋষিকুমার। রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্র যজ্ঞে এই ঋষিকুমার আস্তিক এলেন বহুদূর থেকে। অনাহূত হয়ে। এবং তাঁর জন্যই হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেলো সর্পসত্রযজ্ঞ । (এই কাহিনীটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান আলোচনার সাপেক্ষে আমাদের সেই কথাস্রোতে আসার অবকাশ নেই ) মহাভারতের কথার বিশাল বৃত্তপথের শুরু ও শেষ যে অভিন্ন বিন্দুটি থেকে আস্তিকের কাহিনী সেই বিন্দুটিকেই ধরে রেখেছে। আর এই আস্তিকও মহাভারতের আঙিনায় প্রবেশ করেছেন বহুদূর থেকে এসে। তারপর কাহিনীর প্রেক্ষিত থেকে সরে গেছেন অনেক দূরে।
" তোমার নৌকায় আমায় ওপারে নিয়ে চলো বাসবী " বলেছিলেন পরাশর মুনি । বলেছিলেন বহুদূর থেকে এসে। বাসবী অর্থাৎ সত্যবতীকে । এরপর সত্যবতীর সঙ্গে পরাশর মুনির সঙ্গমের কাহিনীর ঘটনাটি আমরা সবাই জানি। জানি ব্যাসদেবের জন্মকথা। সত্যবতীর গর্ভে পুত্র সন্তান সৃষ্টি করেই আবার কোন সুদূরে চলে গেলেন পরাশর মুনি। দূরে চলে গেলেন সত্যবতীপুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাসদেবও । মূল ভারতকথার সূত্রপাত হলো এইভাবে এক দূরাগত মুনির মহাভারতের কথায় প্রবেশ করা নিয়ে। শুধু দূর থেকে আসাই নয় - দূরে চলে যাওয়া - কাহিনীর আঙিনার বাইরে চলে যাওয়াও জড়িয়ে আছে ওতোপ্রোতভাবে এইসব কাহিনীগুলিতে । তাই চলে গেলেন পরাশর মুনি । চলে গেলেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস ।
( সত্যবতীনন্দন ব্যাস অবশ্য বরাবরের মতো চলে যান নি। তিনি আবার ফিরে এসেছেন ভারতকথার জমিতে । কিন্তু ফের চলে গেছেন দূরে। মহাভারতের কাহিনীবৃত্তে শুধু ব্যাসদেবেরই এই দূর থেকে আসা আর দূরে চলে যাওয়ার দোলাচলের বিষয়টি একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ আলোচনার যোগ্য।)
এর পাশাপাশি মহাভারতের কথা আমাদের সামনে নিয়ে এলো আরেকটি' দূরের 'কাহিনী । কুরু বংশের রাজা শান্তনুর সামনে এসে দাঁড়ালেন স্বর্গনদী গঙ্গা। তিনি এর আগেও এসেছিলেন। শান্তনুর পিতা প্রতীপের কাছে। এখন প্রতীপের কথায় তাঁর পুত্রের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর মহিষী হওয়ার জন্য। শান্তনুকে তাঁর পিতা প্রতীপ বলেছিলেন যে এইভাবে কেউ যদি তার কাছে পুত্রকামনায় আসে তাহলে সে যেন কোনো প্রশ্ন না করে সংশয় না করে সেই নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু গঙ্গার যে শর্ত ছিলো যে তাঁর কাজের জন্য শান্তনু কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না, বাধা দিতে পারবেন না । বাধা দিলে তিনি বরাবরের মতোই শান্তনুকে পরিত্যাগ করবেন । এইভাবেই গঙ্গা পরপর সাতবার পুত্রসন্তান প্রসবের পরেই তাদের জলে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছিলেন কেবল অষ্টম পুত্রের বেলায় এর ব্যতিক্রম হলো শান্তনুর তীব্র বিরোধিতায় । গঙ্গা তাঁর কথা অনুযায়ী তাঁর নবজাত অষ্টম পুত্রকে নিয়ে চলে গেলেন শান্তনুর থেকে অতিদূরে বরাবরের মতো। এই অষ্টম পুত্র হলেন দেবব্রত । এই কাহিনীটির পশ্চাদপট আমরা জানি। কিন্তু স্বর্গনদী গঙ্গার অতিদূর থেকে শান্তনুর কাছে এসে আবার অপার দূরত্বে বরাবরের মতো চলে যাওয়ার বিষয়টি আমরা খেয়াল করেছি ?
এখানে এক পুত্র জন্মের পরেই তার জন্মদাতা পিতার থেকে বহুদূরে চলে গেলো। এর আগে আমরা দেখলাম একই ভাবে আরেক পুত্র জন্মের পরেই বহুদূরে চলে গেলো তার জন্মদাত্রী জননীর থেকে। এইভাবে মহাভারতের কথা সুদূর থেকে আসা আর সুদূরে চলে যাওয়ার এক আশ্চর্য তন্তুবায়িতায় এগিয়ে যেতে থাকে।
এরপর মহাভারতের কাহিনীপথে অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর আমরা আবার দেখতে পেলাম বহুদূর থেকে আসা এক বিশেষ ব্যক্তিকে । তিনি মহাভারতকার ব্যাসদেব স্বয়ং। এলেন মাতা সত্যবতীর কথায়। বহুদূর থেকে। তাঁর গভীর অরণ্যের আশ্রম থেকে। এলেন হস্তিনাপুরের রাজবাড়ীতে। এরপর ব্যাসদেবের দ্বারা বিধবা রাজবধূ অম্বিকা ও অম্বালিকা এবং সেই অনাম্নী অঙ্গনার গর্ভসঞ্চার করার ঘটনা আমরা বিশদভাবে জানি । এবার আমরা লক্ষ্য করি এক ব্যক্তি কিভাবে বহুদূর থেকে এসে ভারতকথার গতিরেখাটিকে একটি গভীর বাঁকে ঘুরিয়ে দিয়ে আবার চলে গেলেন বহুদূরে। ( আর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো তিনিই এই বিপুল ভারতকথার রচয়িতা!)
মহাভারতের পথে এবার আমরা মূল ঘটনাক্রমে প্রবেশ করছি । আর তার শুরুতেই দেখতে পাচ্ছি অম্বালিকার পুত্র রাজা পান্ডু দিগবিজয় করে নিজের রাজ্য রাজধানী , রাজপ্রাসাদে ফিরে এসে সদ্যবিবাহিত দুই স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর রাজ্যপাটসহ সমস্ত ঐহিক অর্জন ছেড়ে হস্তিনাপুর থেকে বহুদূরে গভীর অরণ্যে চলে গেলেন। এবং চলে গেলেন বরাবরের মতো। এই ঘটনার বেশ কিছু বছর বাদে হস্তিনাপুরে ফিরে এলো তাঁর নিথর শবদেহটি, বহুদূরের একশৃঙ্গ পর্বতের উপরের অরণ্যভূমি থেকে। সঙ্গে সহমৃতা পত্নী মাদ্রী এবং অপর পুরুষদের ঔরসজাত পাঁচটি পুত্রসন্তান। রাজত্ব ছেড়ে , রাজসিংহাসন ছেড়ে পান্ডুর এই দূরে চলে যাওয়া তাঁকে চিরকালের জন্য না ফিরে আসার ভুবনে পাঠিয়ে দিলো । আর অতিদূর পার্বত্যস্থান থেকে সমভূমিতে নেমে এলেন পান্ডুর পাঁচ পুত্র ও বিধবা পত্নী কুন্তী। সেই সঙ্গেই হস্তিনাপুরের রাজনীতিতে নেমে এলো এক গভীর সংকট।
এইভাবে দূরত্বের স্রোতে চলে যাওয়া আর ফিরে আসার টানাপোড়েনে এগিয়ে যায় মহাভারতকথা । আর এই দূরত্বের আখ্যানগুলির ভিতর নিহিত থাকে ভারতকথার সুকল্পিত সংকেতগুলি। এরপর আমরা পরপর কয়েকটি আখ্যায়িকায় আসবো এবং দেখতে পাবো সেগুলির সঙ্গে দূরে চলে যাওয়া আর দূরে থেকে ফিরে আসার নিহিত পাতালছায়াগুলি।
দুর্যোধন ষড়যন্ত্র করে ভীমকে কালকূট বিষ পান করিয়ে অচৈতন্য করে গঙ্গায় ফেলে দিলেন। অচৈতন্য হয়ে ভীম চলে গেলেন জলের গভীরে বহুদূরে নাগলোকে । সেখানে তীব্র বিষধর সাপেদের দংশনে ভীমের শরীরে বিষে বিষক্ষয় হলো। ভীম চেতনা ফিরে পেলেন। নাগরাজ বাসুকি তাঁকে চিনতে পেরে আলিঙ্গন করলেন। ভীমকে বিশেষ রসায়ন পান করতে দেওয়া হলো। ভীম আট কুন্ড রসায়ন পান করে অযুত হস্তীর বল লাভ করলেন এবং স্বগৃহে ফিরে এলেন। জলের গভীরে চলে গিয়ে যার অবধারিত মৃত্যু হওয়ার কথা ছিলো সে ফিরে এলো ওই দূর থেকে বিপুল শক্তির অধিকারী হয়ে। ভীমের এই বিশাল অকল্পনীয় দৈহিক শক্তি ও তার ব্যবহার এই ভারত কথার একটি প্রকান্ড স্তম্ভ।
এইভাবেই আমরা দেখতে পাই বহুদূর থেকে প্রায় অনাহূতের মতো হস্তিনাপুরের আঙিনায় চলে এলেন দ্রোণ এবং তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা। এবং অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেলেন কুরু পান্ডবদের রাজনৈতিক আবর্তে। হস্তিনাপুর থেকে বহুদূরে বারণাবতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো পান্ডবদের। সেখানে জতুগৃহ দাহের ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে। এরপর থেকে শুরু হলো পান্ডবদের আরো আরো দূরে চলে যাওয়ার পালা। এইভাবে পান্ডবদের ক্রমশ দূরে চলে যেতে যেতে একের পর এক জটিল তন্তু বিছিয়ে এগোতে লাগলো ভারতকথা । আমরা জানি এই দূরে চলে যেতে যেতে কিভাবে হিড়িম্বা থেকে দ্রৌপদীর আখ্যান এসে গেছে পঞ্চপান্ডবদের জীবনে। আর মহাভারতকথা পৌঁছে গেছে তার নির্ধারিত জটিলতায়।
এরপর এলো আরেকটি দূরের গল্প। অতি আশ্চর্যভাবে। একটি নগন্য কারণে ( এর বিশদ বিবরণ এখানে অনাবশ্যক) অর্জুনকে ভাইদের ও সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী দ্রৌপদীকে ছেড়ে চলে যেতে হলো অতি দূরে বাণপ্রস্থে বারোটি বছরের জন্য। এই বারো বছরে অর্জুন ঘুরে বেড়িয়েছেন গঙ্গার গভীরে নাগলোক থেকে রৈবতক পর্যন্ত। এইভাবে দূরে ঘুরতে ঘুরতে তিনি তাঁর জীবনে পেলেন আরো তিন নারীকে । তাঁরা হলেন উলুপী , সুভদ্রা ও চিত্রাঙ্গদা। এই তিন নারীর গর্ভে উৎপন্ন তিন পুত্রকে মহাভারতকার ভারতকথার পরবর্তী পর্যায়ে তিনটি বিশেষ কোণে স্থাপন করেছেন।
এরপর মহাভারতের পথে আমরা এগিয়ে গিয়ে চলে আসি মহাভারতের অন্যতম সংকট মুহূর্তে অর্থাৎ সেই কুখ্যাত দ্যূতসভায় । এর ঠিক পরের ঘটনাগুলি ( অর্থাৎ দূত্যক্রীড়ায় যুধিষ্ঠিরের পরাজয় ও নিঃস্ব হওয়া , দ্রৌপদীর সীমাহীন লাঞ্ছনা এবং শেষ পর্যন্ত পান্ডবদের বারোবছরের বনবাস ও একবছরের অজ্ঞাতবাসের জন্য বিদায় নেওয়া) আমরা বহুবার চর্চা করেছি । কিন্তু এখানে আমরা এই ঘটনার নিহিত অন্ধকার ও আলোর রেখাটিকে এবার দেখতে পেলাম। এখানেই মহাভারতের কথায়' দূরে চলে যাওয়া এবং 'দূর থেকে আসা ' অতি কঠিন গুরুত্বে আমাদের সামনে চলে এলো। হস্তিনাপুর থেকে এই সুদীর্ঘ তেরো বছরের স্থানকালের দূরত্বে পান্ডবরা নিজেদের প্রস্তুত করে নিয়েছেন সেই মুহূর্তটির জন্য যে মুহূর্তটিতে দুর্যোধন বিনাযুদ্ধে এক কণা জমির অংশও পান্ডবদের দেবেন না বলে আস্ফালন করে বসলেন।
এই সুদীর্ঘ সময় ও দূরত্বের ব্যবধান কাটিয়ে পান্ডবরা এলেন। আমরা দেখলাম এই দূরত্ব তাদের ক্ষীণ করে নি কোনো ভাবেই। তাঁরা এলেন সকৃষ্ণে ও সদর্পে। এই দূরত্ব তাদের সমৃদ্ধ করেছিলো লোকবলে অস্ত্রবলে এবং আত্মবলে । এর ফলাফল আঠারো দিনের যুদ্ধে স্পষ্ট দেখা গেলো। দুর্যোধন এবং কৌরবদের সার্বিক পতন ও ধ্বংস হলো।
এরপর বেশ কিছু বছর কেটে যাওয়ার পর আবার ' দূরত্ব ' এলো মহাভারতের কথায়। ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী ও কুন্তী স্বেচ্ছায় চলে গেলেন হস্তিনাপুর ছেড়ে, পান্ডবদের ছেড়ে বহুদূরে নির্জন অরণ্যে । এবং সেখানে তিনজনই দাবানলে দগ্ধ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করলেন।
সবশেষে মহাভারতের কথায় 'দূরত্ব ' এলো এক অমেয় ব্যঞ্জনায় যখন বিধ্বস্ত অর্জুন এসে যুধিষ্ঠিরকে শোনালেন যাদবকুলের ধ্বংসের কথা। যুধিষ্ঠির বললেন - সময় আমাদের ' টানছে ' - এবার আমাদের চলে যাওয়া উচিত। তাই দ্রৌপদী ও পঞ্চপান্ডব যাত্রা করলেন দূরে - অতি দূরে - মহাপ্রস্থানের পথে। ভারতকথার শেষে মহাপ্রস্থানিকা পর্বে বিশালবুদ্ধি ব্যাস শুধু ওই অবশিষ্ট ছটি চরিত্রকে নয় , আমাদের মতো প্রতিটি মহাভারত পাঠককেই নিয়ে গেলেন এই বিপুল বহুবর্ণিল অতিসর্পিল কথাস্রোত থেকে অতি দূরত্বে যেখানে নেই কোনো উপকাহিনী , নেই কোনো পার্শ্বকথন , নেই কোনো হঠাৎ আবির্ভূত ঋষির প্রজ্ঞাপন , কিংবা কোনো অলৌকিক ঘটনার উপস্থাপনায় কোনো পূর্বজন্মীয় ইতিকথার বিবরণ। অতি নিঃশব্দে নিরুচ্চারে মহাভারতের এই ছটি ( এবং শেষ ছটি ) প্রধান চরিত্র ক্রমশ দূরে চলে গেলো আমাদের থেকে।
এইভাবে ' দূরত্ব ' নিজেই যেন মহাভারতের কথার একটি অন্তর্লীন চরিত্র হিসেবে বাহিত হয়েছে ভারতকথার উপস্থাপনা থেকে শেষকথন পর্যন্ত। দূরে কোথায় দূরে দূরে মহাভারতের কথায় প্রাণিত হয়েছে শুরু থেকে শেষ অবধি। '
.png/:/rs=w:400,cg:true,m)
উপনিষদিক মৃত্যু চেতনা
দেবাশ্রিতা দাস
মানবজীবনের অত্যন্ত মৌলিক তথা গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয় হল মৃত্যু। মানুষ বাদে অন্যকোনো প্রাণী মৃত্যু নিয়ে ভেবেছে এমন নজীর নেই। মৃত্যুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কাব্য, সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম এমনকি বিজ্ঞানও। মৃত্যু স্থান-কাল ভেদে সব মানুষকে ভাবায় এবং সত্যিকারার্থে পৃথিবীতে এমন মানুষ পাওয়া ভার, যার মৃত্যু নিয়ে ভাবনা নেই। তবে সাধারণ মানুষের কাছে মৃত্যুর স্বরূপ সম্পর্কিত কোন স্পষ্ট ধারণা থাকে না। মৃত্যু কি জ্যোতির্ময় নাকি অন্ধকারের রূপ? সাধারণের কাছে তা চির দুর্বোধ্য চির অগম্য। তবুও চিন্তায় চেতনায় মৃত্যু সম্পর্কিত ভাবনার একটি বিশিষ্ট স্থান চিরস্থায়ী। কেমন এই মৃত্যু? কেমন মৃত্যুপারের জগৎ? মহিমাময়? তাকে কি ধরা ছোঁয়া যায়? আর এই প্রশ্নগুলির উত্তর অন্বেষণেই এই গবেষণা প্রবন্ধটির পথ চলা শুরু।
মৃত্যু একটি রহস্যময় বিষয়, যা অনাদিকাল থেকে মানবজাতিকে ভীত করে আসছে। এমনকি 'মৃত্যু' শব্দটির নাম শুনলেই শরীর কেঁপে ওঠে। এটি প্রত্যেকের মনে গভীর উদ্বেগ ও অসহনীয় ভয়ের সৃষ্টি করে। মানুষ মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও এর মুখোমুখি হতে ভয় পায়, কারণ সে মনে করে যে এটিই সবকিছুর শেষ। কিন্তু এই সবই এই ধারণাটির ভুল উপলব্ধির কারণে ঘটে। কোনো নির্দিষ্ট ধারণাকে সঠিকভাবে বুঝতে পারলে, ভুল উপলব্ধির কারণে সৃষ্ট ভয় দূর হয়ে যায়। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, মৃত্যু হলো জীবকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত জৈবিক ক্রিয়াকলাপের স্থায়ী অবসান। আর যদি আমরা চেতনার নিরিখে মৃত্যুকে সংজ্ঞায়িত করি, তবে জীবটির মৃত্যু তখনই হয়েছে বলা যেতে পারে যখন চেতনার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। চেতনার অনুপস্থিতিতে, শরীর কেবলই এক দলা জড় পদার্থ। তাই এই ভয় কাটিয়ে ওঠার জন্য মৃত্যুর প্রকৃতি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
◾️উপনিষদ কি?
প্রথমেই বেদ ও উপনিষদ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। বেদ হলো সনাতন বা হিন্দুধর্মের প্রাচীনতম এবং প্রধান পবিত্র ধর্মগ্রন্থ, যা মূল জ্ঞান বা ঐশ্বরিক জ্ঞানের আধার। বেদ চারটি ভাগে বিভক্ত।যথা, ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ। বেদে মোট মন্ত্র সংখ্যা ২০৩৭৯টি। প্রত্যেকটি বেদ আবার চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: সংহিতা (মন্ত্র ও আশীর্বচন), ব্রাহ্মণ (ধর্মীয় আচার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও যজ্ঞাদির উপর টীকা), আরণ্যক (ধর্মীয় আচার, ধর্মীয় ক্রিয়াকর্ম, যজ্ঞ ও প্রতীকী যজ্ঞ) ও উপনিষদ্ (ধ্যান, দর্শন ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান-সংক্রান্ত আলোচনা)। এরপর পুরাণ, ভগবদ্গীতা ইত্যাদির মতো আরও অনেক ধর্মগ্রন্থ রয়েছে। যদিও বেদে মূলত দেবতাদের কাছে প্রার্থনা এবং আচার-অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, বেদের শেষ অংশগুলিতে জীবন নীতি রয়েছে। বেদের এই অংশগুলিকে বেদান্ত (বেদের শেষ অংশ) বলা হয়। উপনিষদগুলি বেদান্ত থেকে এসেছে। উপনিষদগুলিকে অনেক প্রাচীন বলা হয়, ৪০০০ বা ৫০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মিত হয়েছিল।উপনিষদের মূল ধারণা হল ব্রহ্ম, যা মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তি এবং মানুষের সাথে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত। তাই উপনিষদকে বলা হয় 'ব্রহ্ম-বিদ্যা', যা ব্রহ্মের জ্ঞান এবং পরমাত্মার ঐক্যের উপলব্ধি ঘটায়।
◾️মৃত্যুর স্বরূপ বিশ্লেষণে উপনিষদের ভূমিকা
মৃত্যুর স্বরূপ বিশ্লেষণে উপনিষদের ভূমিকা অনন্য ও আকর্ষণীয়, তবে এর কেবল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের উপরই আলোকপাত করা হয়েছে যা প্রয়াত আত্মা ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের সান্ত্বনা দেয়। উপনিষদ, যা বেদান্ত নামেও পরিচিত, হলো বেদের সমাপ্তি পর্ব। এগুলি বৈদিক দর্শনের সার, নির্যাস এবং চূড়ান্ত পরিণতি। প্রকৃতিগতভাবে গূঢ় হওয়ায় এগুলি সৃষ্টির নীতি, পরম সত্তার স্বরূপ, জীবাত্মা ও পরমাত্মার সম্পর্ক, জগতের প্রলয়, জীবনের লক্ষ্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। 'উপনিষদ' শব্দটি ' ষড়' মূল এবং ' উপ ' ও ' নি' এই দুটি উপসর্গ থেকে উদ্ভূত, যেগুলির সম্মিলিত অর্থ গুরুর সান্নিধ্য। এটি একটি কৌতূহলজনক বিষয় যে, উপনিষদ শব্দটি ' ষড় ' মূল থেকেও উদ্ভূত , যার অর্থ গতি বা আন্দোলন, কারণ এটি শ্রোতাকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্থাৎ আত্ম-উপলব্ধির দিকে পরিচালিত করে। একই মূল ‘ ষড়’- এর আরও একটি অর্থ রয়েছে – মানুষের সেই সহজাত অজ্ঞতার বিনাশ যা জন্ম, বার্ধক্য ও মৃত্যুর ভয়ের কারণ এবং তাকে বোধি ও উপনিষদীয় মোক্ষের দিকে চালিত করা। উপনিষদ বৈদিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সারবস্তু হওয়ায়, এটি দর্শন ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে মানবাত্মা থেকে দেবত্বে উত্তরণের পথ প্রশস্ত করে বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে মানব মনকে প্রভাবিত করে আসছে। তাদের মতে, মৃত্যু কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বের সম্পূর্ণ অবসান নয়।
◾️উপনিষদের সত্যদ্রষ্টা ঋষিরা মনে করেন-
"এই জগৎ সেই মৃত্যুহীন শাশ্বত সত্তার আনন্দ সম্মিলনের মহাপ্রকাশ।
বিশ্বসৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষহীন বলে যা কিছু বিরাজিত আছে,
তাদের সবই সেই চিরসুন্দর, চিরশুদ্ধ অমরনাথের আনন্দময় অভিব্যক্তি।
বিশ্বের সব সৌন্দর্য, পার্থিব জগতের সঞ্চিত সমস্ত সুধা তার থেকে সৃষ্ট বলেই অবিনাশী।
অনাদিকাল ধরে নানা রূপে বিকশিত। জীবনপ্রবাহ তাই মৃত্যুহীন।
হে অমৃতের অমর সন্তান, এই পরম সত্য জ্ঞাত হয়ে অমৃততত্ত্ব লাভ করো।"
উপনিষদ অনুসারে, মৃত্যু কেবল একটি শারীরিক সমাপ্তি নয়, বরং আত্মা ও ব্রহ্মের (পরম সত্য) সম্পর্ককে বোঝার একটি পথ। উপনিষদিক চিন্তায় মৃত্যুকে জীবনচক্রের একটি অংশ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে আত্মা শরীর ত্যাগ করে ব্রহ্ম বা পরম সত্যের সঙ্গে মিলিত হয়। মৃত্যুকে ভয় বা দুঃখের কারণ হিসেবে না দেখে, একে জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি এবং পরম শান্তি লাভের একটি পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মৃত্যুর সময় ব্যক্তির শেষ চিন্তাটিই তার ভবিষ্যৎ যাত্রার দিক নির্ধারণ করে এবং সেই অনুযায়ী আত্মা পরবর্তী জগতে চালিত হয়। বিবেকচূড়ামণি থেকে শঙ্করের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি-
"ব্রহ্ম সত্যম জগত মিথ্য, জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ"
[আদি শঙ্করাচার্যের ব্রহ্মজ্ঞানাবলীমালা]
অর্থাৎ ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, জগৎ অবাস্তব, এবং ব্রহ্ম এবং আত্মার মধ্যে, অর্থাৎ ব্যক্তিগত সত্ত্বার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই । উপনিষদের অন্যতম প্রধান বাণী হল, ব্রহ্ম বা পরম সত্তা এবং আত্মার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই-
"প্রজ্ঞানম ব্রহ্ম"
[ঐতরেয় উপনিষদ]
অথবা,
"ঈশা বাস্যমিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।
তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ধনম্॥"
[ঈশা উপনিষদ]
এই শ্লোকটির অর্থ, এই জগতের সকল বস্তুই ঈশ (ঈশ্বর) দ্বারা আবৃত। যেগুলি এই জগতে আছে, সেগুলিকে ত্যাগ করে উপভোগ করো; কোনো সজীব বা নির্জীব বস্তুর প্রতি লোভ করো না। এই গতিশীল বিশ্বে যাহা কিছু চলমান বস্তু আছে তাহা ঈশ্বরের বাসের নিমিত্ত মনে করিবে। কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ এবং গানের ভেতর প্রকাশিত হয়েছে এই দর্শনের অন্তর্গূঢ় রহস্য। অর্থাৎ চিন্তার সব অংশের মাঝে তিনি ছিলেন ঋজু, যার মর্মার্থ গিয়ে পৌঁছেছে বেদান্তের মর্মমূলে। মৃত্যুকে জীবনের সীমাবদ্ধতা ও বোঝা থেকে মুক্তি এবং এক পরম স্বস্তির স্থান হিসেবে দেখা হয় উপনিষদে। এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক এবং অনিবার্য পরিণতি, যা মহাজাগতিক নিয়মের অংশ।উপনিষদে মৃত্যুচেতনা বলতে মূলত মৃত্যুর পরেও কি ঘটে এবং আত্মজ্ঞান বা মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যা আমরা উপনিষদের এই শ্লোকটি থেকে জানতে পারি-পারি-
"অসতো মা সদ্গময়,
তমসো মা জ্যোতির্গময়,
মৃত্যোমা অমৃতং গময়,
ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।"
[বৃহদারণ্যক উপনিষদ]
এর অর্থ আমাকে নিয়ে চলো অসত্য থেকে সত্যি,অন্ধকার থেকে আলোকে, মৃত্যু থেকে অমৃতে। এই অনিত্য মৃত্যুময় জগৎ থেকে আমাকে শাশ্বত আনন্দের জগতে নিয়ে চলো। তোমার করুনার দীপ্তিতে আমার অন্তরাত্মা সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক। আমাকে জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে উদ্ধার করো এবং পুনর্জন্মের মূল যে কামনা বাসনা তার বিনাশ ঘটাও। এটি একটি শান্তির মন্ত্র যা জ্ঞান, সত্য ও শাশ্বত জীবনের জন্য প্রার্থনা করি।
আমাদের শাস্ত্র একটি দার্শনিক পথ নির্দেশনার মাধ্যমে মৃত্যু সম্পর্কিত ভয়কে জয় করার উপায় দেখিয়েছে-
"মৃত্যু র্বীবেশী কিম মুধা! ভীতং মুঞ্চতি বৈ যমঃ।
অজাতম নৈব গৃহ্নতি কুরু যত্নমজন্মানি।।"
এখানে অজাতম অর্থাৎ জন্মহীনতা শব্দটির তিনটি দিক রয়েছে-
১. মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবিতা উপলব্ধি
২. মৃত্যুর প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি
৩. আত্মার স্থায়ী অস্তিত্বে বিশ্বাস।
' মৃত্যু ' শব্দটি উপনিষদে একাধিকবার ব্যবহৃত হয়েছে। ঈশা উপনিষদে বলা হয়েছে, যারা জাগতিক ও পরাজাগতিক উভয় জ্ঞানে নিজেদের উৎসর্গ করেন, তারা জাগতিক জ্ঞানের দ্বারা মৃত্যুকে জয় করেন এবং পরাজাগতিক জ্ঞানের দ্বারা অমরত্ব লাভ করেন।
"বিদ্যাং চাভিদ্যাং চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ।
অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীর্त्वा বিদ্যয়ামৃতমশ্নুতে।।"
(ঈশা উপনিষদ)
মৃত্যুর স্বরূপ যথাযথভাবে বোঝার জন্য জাগতিক ও অপার্থিব উভয় প্রকার জ্ঞানই অপরিহার্য। এইজন্য মুণ্ডক উপনিষদে বলা হয়েছে, বিদ্যা দুই প্রকার— পরা ও অপরা। পরা হলো অতি-জাগতিক, অপরা হলো জাগতিক এবং উভয়ই সমর্পণের যোগ্য। কারণ পরাবিদ্যার প্রধান কাজ হলো জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি দেওয়া ও আত্মজ্ঞানের দিকে পরিচালিত করা, অপরদিকে অপরাবিদ্যা মানুষকে ভৌত জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে সক্ষম করে।
"দ্বে বিদ্যে বেদিতব্যে ইতি হ স্ম যদ্ ব্রহ্মবিদ্যা বদন্তি পরা চৈবপরা চ।
তত্রাপরা ঋগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোঽথর্ববেদঃ
শিক্ষা কল্পো ব্যাকরণং নিরুক্তং ছন্দো জ্যোতিষমিতি।
অথ পরা যযা তদক্ষরমধিগম্যতে॥"
(মুণ্ডক উপনিষদ)
এ থেকে স্পষ্ট হয়, মৃত্যুভয় জয় করতে ও অমরত্ব লাভ করতে উভয় বিষয়েই জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
কঠোপনিষদে মৃত্যু বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায় । পিতা বাজসনেয়ের অভিশাপে নচিকেত যমলোকে পৌঁছান। যম তাঁকে তিনটি বর প্রদান করেন এবং তৃতীয় বর হিসেবে নচিকেত যমের কাছে মৃত্যুর স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে বলেন।
সে জিজ্ঞাসা করল: যখন মানুষ মারা যায়, তখন এই সংশয় থাকে; কেউ বলে এই আত্মা মৃত্যুর পরেও টিকে থাকে; কেউ বলে এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। আমি আপনার শেখানো সত্যটি জানতে চাই। এটি আমার তৃতীয় বর। তখন, যম তার মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর জন্য তাকে বললেন যে, এই বিষয়টি দেবতাদের পক্ষেও বোঝা খুব কঠিন। যেহেতু মৃত্যু সম্পর্কিত সত্যটি সূক্ষ্ম, তাই যম নচিকেতাকে এর পরিবর্তে অন্য কোনো বর বেছে নিতে বললেন। কিন্তু নচিকেতা সেই জ্ঞান ব্যাখ্যা করার জন্য জেদ ধরল, কারণ তা বোঝা খুব কঠিন ছিল, এবং তা ব্যাখ্যা করার জন্য তার চেয়ে ভালো শিক্ষক আর কেউ ছিল না এবং অন্য কোনো কিছুই সেই জ্ঞানের সমান ছিল না। যম আবার দীর্ঘ জীবন, ধনসম্পদ এবং পার্থিব আরামের মতো অনেক পার্থিব সুখ প্রদানের মাধ্যমে ছেলেটির মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। অবশেষে, নচিকেতার অনুসন্ধিৎসা এবং 'এই নচিকেতা অন্য কোনো বর চাইবে না'—এই দৃঢ় সংকল্প যমকে মনেপ্রাণে সন্তুষ্ট করল এবং তিনি মৃত্যুর রহস্য ব্যাখ্যা করলেন। মৃত্যু রহস্য তিনটি দিক নিয়ে গঠিত।
১. যা জন্মায়, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী:
‘জাতস্য মরণং ধ্রুবম্’
এই সাধারণ উক্তিটি ব্যাখ্যা করে যে, জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তির জন্য মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যু বিষয়ক একটি রূপক অভিব্যক্তি এই একই বিষয়টিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে চিত্রিত করে।
খাঁচার মতো একটি কাঠামো আছে যার নয়টি দরজাই খোলা। সেখানে একটি বায়বীয় পাখি বাস করে। এটি কীভাবে এখনও বেঁচে আছে তা আশ্চর্যজনক, এবং যদি এটি চলে যায় তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। জীবনের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতি সম্পর্কে নচিকেতার আগে থেকেই ধারণা ছিল। সে নির্ভয়ে তার বাবার অভিশাপের জবাবে এর জন্য অনুশোচনা না করার অনুরোধ জানায় এবং এও বলে যে, শস্যের মতো মানুষও পেকে মাটিতে ঝরে পড়ে; শস্যের মতোই সে তার ঋতুতে আবার অঙ্কুরিত হয়।
"অনুপশ্য যথা পূর্ব্বে প্রতিপশ্য তথাপরে।
সস্যমিব মর্ত্যঃ পচ্যতে সস্যমিবাজায়তে পুনঃ॥"
(কঠোপনিষদ)
ভগবদ্গীতায়ও মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবিতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা উপনিষদের সার হিসেবেও বিবেচিত হয়। ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন
তিনি বলেন: যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু নিশ্চিত এবং যে মারা গেছে তার জন্মও নিশ্চিত। অতএব যা অনিবার্য, তার জন্য তোমার শোক করা উচিত নয়।
"জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুঃ ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ ।
তস্মাদপরিহার্যে অর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি।।"
অন্য এক প্রসঙ্গেও কৃষ্ণ মৃত্যুর স্বরূপ ব্যাখ্যা করে অর্জুনকে সান্ত্বনা দেন। অর্জুন! এই জগতের প্রতিটি জিনিসই কোনো না কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছে। জীবনের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেলে, তার আর প্রয়োজন থাকে না। মানুষের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। প্রত্যেক মানুষই জীবন নামক এই অদ্ভুত ঘটনাময় যাত্রায় চালিত হয় । তাকে একটি উদ্দেশ্য নিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেলে, পৃথিবীর তাকে আর প্রয়োজন হয় না। আমাদের সকলের ক্ষেত্রেই এটা সত্যি, এমনকি আমার ক্ষেত্রেও। আমি একটি উদ্দেশ্যেই এই পৃথিবীতে নিজেকে সৃষ্টি করেছি। এখনও তা শেষ হয়নি। কিছু কাজ এখনও বাকি আছে। যে মুহূর্তে তা শেষ হবে, আমিও মারা যাব, এবং তুমি ও তোমার প্রিয় ভাইয়েরাও মারা যাবে। শোক কোরো না।
ধম্মপদে বলা হয়েছে,
“আকাশেও নয়, সমুদ্রের গভীরেও নয়,
কিংবা পর্বতের গুহায় প্রবেশ করেও নয়;
জগতে এমন কোনও স্থান পাওয়া যায় না
যেখানে মানুষ মৃত্যুকে বরণ না করে বাস করতে পারে।”
এই সত্যটি ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের সাহিত্যে অনেক উপকথাও রয়েছে।
মহাভারত সেইসব মানুষের অদ্ভুত মানসিকতাকে উপহাস করতে ছাড়েনি, যারা প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি জীবের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও জীবনকে চিরস্থায়ী বলে মনে করে। যক্ষ যখন যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেন যে জগতে আশ্চর্যজনক কিছু আছে কি না, তখন তিনি উত্তর দেন যে প্রতি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও কেউ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে; তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা সেই মুহূর্তে জীবিত থাকে, তারা এমন অনুভব করে যেন তাদের জীবন নিশ্চিত।
"অহন্যাহানি ভূতানি গচ্ছন্তি কারামলায়ম |
শেষাঃ স্থাবরমিচ্ছান্তি কিমাশ্চর্যমতঃ পরম ||"
প্রতিদিন প্রাণীরা মৃত্যুবরণ করে পরলোকে গমন করে, অথচ বাকিরা স্থায়িত্ব কামনা করে — এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কী হতে পারে? সুতরাং মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবিতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
২.মৃত্যুই জীবন এবং জীবনই মৃত্যু:
উপনিষদ অনুসারে, মৃত্যুই হলো ব্যক্তির অস্তিত্বের প্রকৃত ও স্বাভাবিক অবস্থা, পক্ষান্তরে জীবন কৃত্রিম। যোগী শ্রী নিসর্গদত্ত মহারাজের মতে, মৃত্যু হলো একটি নির্দিষ্ট দেহের জীবন প্রক্রিয়ার পরিবর্তন। সংহতির অবসান ঘটে এবং বিসংহতি শুরু হয়। মহাভারতে, যখন অর্জুন তাঁর পুত্র অভিমন্যুর দুঃখজনক মৃত্যুতে শোক করছিলেন, কৃষ্ণ তিনি নিম্নোক্তভাবে তার মনের ভুল মোচন করার চেষ্টা করলেন: হে অর্জুন! এই বালক, যাকে তুমি নিজের পুত্র বলে দাবি করছ, সে এক অদৃশ্য আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে পৃথিবীতে নেমে এসেছিল। সে এখন সেই জগতেই ফিরে গেছে। সে তোমার নয়, যেমন তুমিও তার নও। যে বিষয়ে তোমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তা নিয়ে বিলাপ করে কী লাভ?
"দৃশ্যতস সুমুদ্ভূত পুনশ্চাদ্দর্শন গত।"
রঘুপুত্র অজ যখন তাঁর স্ত্রী ইন্দুমতীর মৃত্যুতে বিলাপ করছিলেন, তখন কালিদাসও একই মত প্রকাশ করেছিলেন। বলা হয় যে, জীবনে আমরা এক অপ্রাকৃত অবস্থায় থাকি এবং মৃত্যু আমাদেরকে আমাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। তাই মানুষ তার জীবনকাল যতটুকুই কাটাক না কেন, তাতেই তার সন্তুষ্ট থাকা উচিত এবং মৃত্যুতে তার শোক করা উচিত নয়, কারণ এটিই তার স্বাভাবিক অবস্থা।
"মরণং প্রকৃতিঃ শরীরিণাং বিকৃতির্জিবিতমুচ্যতে বুধৈঃ।
ক্ষণমপ্যবতিষ্ঠতে শ্বসন্যযদি জন্তুর্ননু লাভবানসৌ॥"
কালিদাসের কয়েক শতাব্দী পরে বসবাসকারী একই মতের জার্মান দার্শনিক জোহান গটলিব ফিট্টে (১৭৬২-১৮১৪) মত প্রকাশ করেন যে, “আমরা যাকে জীবন বলি তা সম্ভবত মৃত্যু, এবং আমরা যাকে মৃত্যু বলি তা আমাদের সেই জগতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যেখান থেকে আমাদের এই জীবনে নিক্ষেপ করা হয়।”
৩. মৃত্যু দেহের জন্য, আত্মার জন্য নয়:
কঠোপনিষদে যম নচিকেতাকে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেন যে, যাঁর আত্মজ্ঞান আছে, তাঁর জন্মও হয় না, মৃত্যুও হয় না। কারণ আত্মার কোনো কারণ বা কার্য নেই। এটি অজাত, নিত্য এবং চিরকাল একই থাকে; প্রাচীন; দেহ বিনষ্ট হলেও এটি নিহত হয় না।
"ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিন্নাস্য
কুতিশ্চিন্ন বভূব কশ্চিৎ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে॥"
উপনিষদে বিশ্লেষণ অনুসারে, মানবদেহ তিনটি দেহ এবং পাঁচটি আবরণ নিয়ে গঠিত। দেহগুলো হলো-
১. স্থূল, ২. সূক্ষ্ম এবং ৩. কার্যকারণ
ও আবরণগুলো হলো-
১.অন্নময়, ২.প্রাণময়, ৩.মনোময়, ৪.বিজ্ঞানময় ও ৫.আনন্দময়।
◾️স্থূল দেহ:
স্থূল দেহ, যা শারীরিক দেহ নামেও পরিচিত, পাঁচটি উপাদান দ্বারা গঠিত। সেগুলি হল পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু এবং আকাশ। এটি অন্নময়কোষ বা খাদ্য আবরণ গঠন করে। মৃত্যুর পরেই এটি তার উপাদান অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। এই দেহ আমাদের কর্মের ফল। জাগ্রত অবস্থায় আমরা এই দেহের অস্তিত্ব অনুভব করি। পরমাত্মার জ্ঞান উদয়ের সময় যখন কর্মগুলি ভস্মীভূত হয়, তখন আমরা আর কোনো নতুন দেহ ধারণ করি না।
◾️সূক্ষ্ম দেহ :
এটি সতেরোটি উপাদান দ্বারা গঠিত এবং তিনটি আবরণের প্রতিনিধিত্ব করে, যথা—প্রাণশক্তির আবরণ প্রাণময়কোষ, মনের আবরণ মনোময়কোষ এবং বুদ্ধির আবরণ বিজ্ঞানময়কোষ । এই উপাদানগুলো হলো পাঁচটি সংবেদী অঙ্গ—ত্বক, চোখ, কান, জিহ্বা ও নাক; পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়—মুখ, হাত, পা, মলদ্বার ও জননাঙ্গ; এবং পাঁচটি প্রাণশক্তি—প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমান; এবং মন ও বুদ্ধি। এই শরীর অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং স্থূল শরীরের চেয়ে অধিক প্রসারিত ও বিস্তৃত। স্থূল শরীরের অভ্যন্তরে অবস্থিত এই সূক্ষ্ম শরীরকে একটি ফুটবলের ভেতরের মূত্রথলির সাথে তুলনা করা হয়।
এটি কামনা ও অনুভূতির কেন্দ্র। এই শরীরই স্বর্গ ও নরকে গমন করে এবং নিজের কর্মফল ভোগ করার পর ফিরে আসে। মৃত্যু মানে এই সূক্ষ্ম শরীরের স্থূল শরীর থেকে বিচ্ছেদ। এই সূক্ষ্ম শরীরই স্বপ্নাবস্থায় ক্রিয়াশীল থাকে। এই শরীরের প্রসারণ ও সংকোচনের ক্ষমতা রয়েছে। এটি ছোট প্রাণীদের মধ্যে সংকুচিত হয় এবং বড় পশুদের মধ্যে প্রসারিত হয়। এই সূক্ষ্ম শরীর কেবল বিদেহমুক্তির পরেই বিলীন হবে । এই সূক্ষ্ম শরীরের সাহায্য ছাড়া স্থূল শরীর কোনো কাজই করতে পারে না।
◾️কার্যকারণ দেহ:
কারণ দেহ অন্য দুটি দেহের কারণ। এটি কারণ পদার্থের অতি সূক্ষ্ম মানসিক শক্তি দ্বারা গঠিত এবং বীজ আকারে ছাপ ধারণ করে। এই দেহ আনন্দময়কোষকে ধারণ করে এবং গভীর নিদ্রায় সক্রিয় থাকে। আত্মা এই তিনটি দেহ থেকে পৃথক। তাই এটি স্থূল দেহও নয়, সূক্ষ্ম দেহও নয়, এমনকি কারণ দেহও নয়। এটি এই তিনটির ঊর্ধ্বে। এটি বিশুদ্ধ সত্তা, বিশুদ্ধ চেতনা এবং বিশুদ্ধ আনন্দ। কিন্তু দেহ ও ইন্দ্রিয়ের সাথে একাত্মতার কারণে একে ব্যক্তিগত আত্মা বা মিথ্যা আত্মা বলে ভুল বোঝা হয়, কারণ এদের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই।
আত্মা এই সবকিছু থেকে ভিন্ন ও ঊর্ধ্বে হওয়ায় এগুলোর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। দেহের মৃত্যু হলেও আত্মার মৃত্যু হয় না।
যেহেতু এই জগতে আমরা যে সুখ পাই তা অনন্ত সুখের তুলনায় নিকৃষ্ট, তাই মৃত্যুকে অনন্ত সুখের (পরমানন্দ) প্রবেশদ্বার বলা হয়। গ্রিক কবি ও নাট্যকার এস্কিলাসও (খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫-৪৫৬) একই মত প্রকাশ করে বলেছেন যে, 'মৃত্যুর আগে কাউকে সুখী বলো না'।
যখন মানুষ মারা যায়, তার মানে হলো আত্মা দেহ ত্যাগ করে, এর অন্যথা নয়, কারণ আত্মার দেহের প্রয়োজন নেই, বরং দেহেরই আত্মার প্রয়োজন। এখানে স্বামী বিবেকানন্দ ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলাদা করে বলেছেন যে, হিন্দুরা বিশ্বাস করে মানুষ হলো আত্মা এবং তার একটি দেহ আছে, অপরদিকে পাশ্চাত্যের মানুষেরা বিশ্বাস করে যে সে একটি দেহ এবং তার একটি আত্মা আছে। সুতরাং, মৃত্যুই আমাদের শাশ্বত অস্তিত্বের প্রকৃত অবস্থা।
এই অভিন্নতা আসলে একটি ভ্রান্ত জ্ঞান এবং এই ভ্রান্ত জ্ঞান কোনো অবর্ণনীয় বিষয়ের ফল নয়। আত্মাকে দেহ-মনের সঙ্গে এক করে দেখার এই ভুল ধারণাটি প্রত্যেকের অভিজ্ঞতায় বিদ্যমান। এই মিথ্যা অভিন্নতার কোনো শুরু বা শেষ নেই, কিন্তু প্রকৃত আত্মার সঠিক জ্ঞানের দ্বারা একে দূর করা যায়। কোনো একটি জিনিসকে অন্যটির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার কারণ হলো সেই বিশেষ জিনিসটির প্রকৃত স্বরূপ না জানা। আত্মাকে দেহ-মন এবং দেহ-মনকে আত্মা বলে জানা একটি ভ্রান্ত জ্ঞান। শুধুমাত্র এই ভ্রান্ত জ্ঞানের কারণেই আমরা নিজেদের এবং পরম সত্তার মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধি করেছি। যদি সঠিক অনুসন্ধানের দ্বারা এই ভ্রান্ত জ্ঞানকে সম্পূর্ণরূপে বশীভূত করা যায়, তবে তা সেই সত্য জ্ঞানের দ্বারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে যা আত্ম-উপলব্ধির দিকে পরিচালিত করে। তখন আত্মা, যা একজনের সত্তার মূল, নিজেকে বিশুদ্ধ সত্তা, বিশুদ্ধ চেতনা এবং বিশুদ্ধ আনন্দ রূপে প্রকাশ করেন। এমন একজন গুরুর সান্নিধ্যে এসে নির্দেশ গ্রহণ করলে, যিনি একাধারে জ্ঞানী (প্রজ্ঞাবান পুরুষ) এবং তত্ত্বদর্শী (সত্যদ্রষ্টা), তখন ভ্রান্ত জ্ঞানের বিলুপ্তি এবং নিজ প্রকৃত সত্তা , অর্থাৎ সর্বব্যাপী আত্মার নতুন জ্ঞানের জন্ম—এই দুটি ঘটনা একই সাথে ঘটে ।
◾️মৃত্যু প্রক্রিয়া:
দেহ ও আত্মার বিসর্জন হিসেবে মৃত্যু সম্পর্কে মতভেদ না থাকলেও, এই প্রক্রিয়া ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। বৃহদারণ্যক উপনিষদ মৃত্যু প্রক্রিয়াকে নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করে। যখন আত্মা দুর্বল ও সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে, তখন যেন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো তার কাছে চলে আসে... সে হৃদয়ে আসে (বৃহদারণ্যক উপনিষদ)
আবার হৃদয়ের উপরিভাগ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই উজ্জ্বল উপরিভাগ দিয়ে আত্মা দেহত্যাগ করে, হয় চোখ দিয়ে, অথবা মাথা দিয়ে, বা শরীরের অন্য কোনো অংশ দিয়ে (বৃহদারণ্যক উপনিষদ)।
এর দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, দেহত্যাগের সময় আত্মা অঙ্গপ্রত্যঙ্গসহ হৃদয়ে আসে। সেই মুহূর্তে দেহত্যাগী আত্মা তার পূর্বজন্মের কর্মের কারণে এক বিশেষ চেতনা লাভ করে, যা তার পরবর্তী জীবনের চিত্র তুলে ধরে, এবং সেই চেতনা দ্বারা প্রকাশিত দেহে গমন করে। এটি আরও ব্যাখ্যা করে চেতনার পরবর্তী জীবনের পরিকল্পনা, দেহত্যাগের পথ এবং যে স্নায়ুগুলোর মধ্য দিয়ে চেতনা গমন করে। মৃত্যুকালে আত্মার বিভিন্ন অবস্থা, মৃত্যুর পর অমুক্ত আত্মার অবস্থা এবং মুক্তিপ্রাপ্ত আত্মার অবস্থা।
◾️মৃত্যু সবকিছুর শেষ নয়:
তারপর আত্মা একটি বিশেষ চেতনায় ভূষিত হয় এবং পরবর্তীতে সেই চেতনার দ্বারা প্রকাশিত দেহে গমন করে। এই চেতনা ব্যক্তির পূর্বজন্মের কর্ম দ্বারা নির্ধারিত হয়। তাই, প্রত্যেকেরই নিজের কর্মের বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। ভালো কাজ করা এবং মন্দ কাজ পরিহার করা উচিত। যদি কেউ অন্যের কোনো ভালো করতে না পারে, তবে তা পাপ নয়, কিন্তু অন্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিন্দনীয়। সকল উপনিষদের সারগর্ভ গীতা আমাদের আশ্বাস দিয়েছে যে, সৎকর্ম কখনও বৃথা বা অলক্ষিত থেকে যায় না। এটি পরবর্তী জন্মে ব্যক্তির মঙ্গলের দিকে পরিচালিত করে। প্রবাদটি এইরকম:
"নাহি কল্যাণকৃতশ্চিদ্দুর্গতিং তা গচ্ছতি
শুচীনাং শ্রীমতাং গেহে যোগভ্রষ্টোঽভিজায়তে।"
মৃত্যু থেকে পরবর্তী জন্মের মধ্যবর্তী সময়কাল নিয়েও বৃহদারণ্যক গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, ঘাসে বসবাসকারী জোঁক যেমন অন্য কোনো অবলম্বন খুঁজে নিয়ে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তেমনই এই আত্মাও বর্তমান দেহ ত্যাগ করে—একে সংবেদনহীন করে, নতুন দেহ ধারণ করে এবং নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
◾️দেহ হারালে কিছুই হারায় না:
মৃত্যুতে মানুষের কিছুই হারায় না। আত্মা যেমন এই দেহে শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য অতিক্রম করে, তেমনই সে অন্য একটি দেহ ধারণ করে। ঋষি এতে বিচলিত হন না।
"দেহিনোঽস্মিন্যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি॥"
◾️উপসংহার:
পরিশেষে সুস্পষ্টভাবে বলা যায় উপনিষদ অধ্যয়ন মৃত্যুভয় দূর করে। মৃত্যু শরীরের বিনাশ মাত্র, আত্মার নয়। আত্মা অবিনশ্বর, অজ ও নিত্য; মৃত্যুতে কেবল পুরনো পোশাক বদলের মতো শরীর পরিবর্তিত হয়। কর্মফল ও জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে আত্মার গতি নির্ধারিত হয় এবং অজ্ঞতা ও কামনার কারণে জীব পুনরায় জন্মচক্রে আবর্তিত হয়।
◾️গ্ৰন্থ ঋণ-
১.'উপনিষদ -১ম খণ্ড'- স্বামী লোকেশ্বরানন্দ।
২.'উপনিষদ সমগ্ৰ'- শ্রী মধুসূদন।
৩. 'বৃহদারণ্যক উপনিষদ'- শ্রীমহেশচন্দ্র বেদান্তরত্ন।
৪. 'ঈশোপনিষদ্'- স্বামী ভূতেশানন্দ।
৫. এস. রাধা কৃষ্ণনের ভাষ্য সহ ভগবদ্গীতা।
৬. ব্রহ্মসূত্র, মূল পাঠসহ, শব্দে শব্দে অনুবাদ, স্বামী বীরেশ্বরানন্দ।
৭. আমি সেই, শ্রী নিসর্গ দত্ত মহারাজ, চেতনা প্রাইভেট লিমিটেড।
৮. শ্রী বেদব্যাসের মহাভারতম।
৯. প্রধান উপনিষদ, এস. রাধাকৃষ্ণন।
১০. উপনিষদাবলী - শ্রী অরবিন্দ।

বন্দেমাতরম — এক মহামন্ত্রের শক্তি সন্ধানে
শৌনক ঠাকুর
বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম একদিকে যেমন স্বদেশ মন্ত্র তেমনি অন্যদিকে স্বদেশ গীত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সংগীত না বলে কেন একে গীত বলা হয়? তাহলে গীত আর সঙ্গীতের মধ্যে কী কোন তফাৎ আছে? তবে এ বিষয়ে একটু পরে আসছি। প্রথমে এই মহামন্ত্রের শক্তির সন্ধানে যাওয়া যাক।
আমরা জানি শব্দ ব্রহ্ম। অর্থাৎ শব্দের ক্ষমতা অপার এবং অপরিসীম। এই মহামন্ত্র বিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্বে সপ্তকোটি দেশের মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছিল। কম্পন ধরিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের শক্তিশালী ভীতকে। অরবিন্দ ঘোষের মতে বন্দেমাতরম “religion of petrism.” একই সঙ্গে তিনি এটিকে “The vision of our mother.” বলে অভিহিত করেছেন।
বন্দেমাতরম ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে গীতা স্বরূপ। এর প্রতিটি শব্দ ভারতীয়দের হৃদস্পন্দনের যেন প্রতিটি স্পন্দন। ১৮৮১ সালের এপ্রিল সংখ্যা থেকে (১২৮৭ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংখ্যা থেকে ১২৮৯ জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা) ১৮৮২ সালের মে সংখ্যা পর্যন্ত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বের হয়। পরে ১৮৮২ সালে ১৫ ডিসেম্বর পুস্তকের আকার লাভ করে।
এই ‘বন্দে মাতরম’ কবিতাটির লেখনী নিয়ে একটা ঘটনা রয়েছে। তখন ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ছাপার কাজ চলছে। হঠাৎ দেখা গেল পত্রিকাটির একটি অংশ তখনও খালি পড়ে রয়েছে। মনের মতন লেখা আসেনি। বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে এলেন রামচন্দ্রবাবু। এই রামচন্দ্রবাবু হলেন ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা দপ্তরের কর্মী। উনাকে সবাই পণ্ডিত মহাশয় বলতেন। বঙ্কিমচন্দ্র তখন অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বলে কথা। ব্যস্ততাও তুঙ্গে। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় যে সেদিন সকালে পণ্ডিত মহাশয় বঙ্কিমবাবুকে বলেন পত্রিকার পেজ মেকআপের সমস্যা হচ্ছে। যদি কোনও নতুন লেখা থাকে তো দিতে। উত্তরে বঙ্কিমচন্দ্র বলেন যে রামবাবু যেন পরে আসেন, কারণ তার অফিসে যাওয়ার তাড়া রয়েছে। রামচন্দ্রবাবু ফিরে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টি পড়ল টেবিলের ওপর। পেপারওয়েট দিয়ে একটি লেখা তাঁর চোখে পড়ল। মনে কৌতূহলের উদয় হল। লেখাটি তুলে নিয়ে তিনি পড়তে শুরু করলেন। বাংলা ও সংস্কৃত ভাষার মিশ্রণে লেখা এক নতুন ধরনের কবিতা। বঙ্কিমচন্দ্র বললেন যে এই লেখাটি সদ্য রচিত। রামচন্দ্রবাবু বলেন যে এতেই চলবে। পত্রিকার পেজ মেকআপের জন্য এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্র বিরক্ত হয়ে কাগজখানি টেবিলের দেরাজের ভিতর রেখে দিলেন। তারপর বিশ্বাস-মিশ্রিত সুরে বললেন — ‘দেখবেন এই লেখাই একদিন এই দেশকে মাতাবে।’ তবে গানটির দেরাজ থেকে বেরিয়ে ছাপা হয়েছিল তার কোনও প্রমাণ নেই। কিন্তু ড. ভট্টাচার্যসহ প্রমুখ কিছু গবেষক বিশ্বাস করেন সালে ‘বঙ্গদর্শন’-এর কোন এক সংখ্যায় ‘বন্দেমাতরম্’ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৮১ সালের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার মার্চ-এপ্রিল সংখ্যায় বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস প্রথম কিস্তির সঙ্গে 'বন্দেমাতরম' কবিতাটি সংযুক্ত করেন। তারপর তো ইতিহাস। এখন প্রতিটি লোকের মুখে এই গানের গুঞ্জন।
ও হ্যাঁ গান বলতে মন পড়ল। গান বা গীত আর সংগীতের মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। গীত হল একটি সুর ও কথার সমন্বয়ে তৈরি যা মানুষের কণ্ঠ নিঃসৃত ধ্বনি। আর গীত, বাদ্য (যন্ত্রের ব্যবহার) এবং নৃত্য— এই তিনটির সমাহার সংগীত। ভরতমুনি বলেছেন ‘গীতং বাদ্যং তথা নৃত্যং ত্রয়ং সংগীতমুচ্যতে।’ দেশের সংবিধানে বা আইনে জাতীয় সংগীতকে সম্মান জানানো নাগরিকদের একটি মৌলিক কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে এটি বাজানো বাধ্যতামূলক। জাতীয় গান দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ইতিহাসের স্মারক হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের। তাই বন্দেমাতরম সংগীত নয় শুধু গীত। স্বদেশগীত। রাষ্ট্রীয় গীত।
বন্দেমাতরম তো ছাপা অক্ষরে প্রকাশিত হল। চারিদিকে প্রশংসাও শুরু হল। কিন্তু এই গানকে কেন্দ্র করে এক নতুন বিতর্ক দানা বাঁধল। ১৯০৬ সালে হায়দ্রাবাদের ‘ডেকান টাইমস’ পত্রিকায় সিদ্ধমোহন মিত্র লিখলেন —‘বন্দে মাতরম্ ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত মাসেইলজের' ('La Marseillaise') বাংলা সংস্করণ।’ (শনিবারের চিঠি, বঙ্কিমসংখ্যা, সম্পাদনা ও সজনীকান্ত দাস )
শুরু হল তীব্র বিতর্ক। দিকে দিকে প্রতিবাদ। শানিত হল যুক্তির ফলা। এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে শুরু হল বিভিন্ন লেখালেখি। এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘পাইওনিয়ার’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় প্রবন্ধে লেখা হল – ‘কবিতা হিসাবে ও রচনা পারিপাট্যে 'বন্দে মাতরম্' ফরাসি জাতীয় সংগীতের তুলনায় অনেক উচ্চে অবস্থিত।’
ঋষি অরবিন্দ ঘোষের মতে ‘বন্দে মাতরম্’ শুধুমাত্র একটি গান নয়। এটা মন্ত্র যা মননে সাহায্য করে। ইউরোপীয়রা যাকে জাতীয় সংগীত বলে 'বন্দে মাতরম্' তা নয়। তাঁর মন্তব্য —
‘The song... was not only a national anthem to be looked on as the European nations look upon their own, but one replete with mighty power, being a sacred mantra, revealed to us by the author of Ananda Math, who might be called an inspired Rishi.’ (১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি অমরাবতীর ভাষণ )
প্রাচ্য ভাষাবিদ বলে খ্যাত ডক্টর জি. এ. গ্রিয়ারসনের বলেছেন যে হিন্দুধর্মের কোনো দেবীর (দেবী কালীর) উদ্দেশ্যে গানটি রচিত। এটা মাতৃভূমির বন্দনা হতে পারে না। ‘The idea of a 'motherland' is wholly alien to Hindu ideas’
(The Times, 12 Sept. 196) কিন্তু এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন হেনরি কটন। তিনি বলেন যে, ‘বন্দে মাতরম্ সংগীতটি জননী বঙ্গভূমির প্রতি আহ্বান।’ (The Times, 13 Sept. 1906)
অধ্যাপিকা উমা মুখোপাধ্যায়ও অধ্যাপক হরিদাস মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছে যে, কালীমাতার পূজার উদ্দেশ্যে কখনও বন্দে মাতরম্ ধ্বনি উচ্চারিত হয় নি। 'বন্দে মাতরম্' হল মাতৃপূজার মন্ত্র এবং সেই মাতা হলেন দেশজননী।
প্রখ্যাত মনীষী বিনয়কুমার সরকারের মতামত দেন ‘বন্দে মাতরম্ মন্ত্রের দেবী মামুলি হিন্দু দেবী-দেবীর অন্যতম নন। এই দেবী জলমাটির দেবী, পাহাড়ের দেবী, নদ-নদীর দেবী, দেশ-দেবী, বাঙলা দেশ। ….এই মন্ত্রে কঁৎ-পন্থী বঙ্কিম দর্শনের সমাজসেবা বা মানব-পূজা সরস মূর্তি পেয়েছে। স্বদেশপূজা প্রবর্তক বঙ্কিম নবীন অধ্যাত্ম জীবনের ভগীরথ।’
শ্রী নরেন্দ্রনাথ শেঠের ব্যাখ্যা অন্য রকম। শ্রী নরেন্দ্রনাথ শেঠ ছিলেন অনুশীলন সমিতির প্রখ্যাত বিপ্লবী। তিনি বন্দেমাতরম প্রসঙ্গে বলেন, ‘বন্দে মাতরম্ হল দেশবন্দনা গীত এবং এর মাধ্যমে চিন্ময়ী মাতার সগুণ সাকার কল্পনা গানে মূর্ত হয়ে উঠেছে।’
শ্রীললিতচন্দ্র মিত্র (দীনবন্ধু মিত্রের পুত্র) বলেছেন ‘বন্দে মাতরম্' গানের ভিতর বিদ্রোহ-বহ্নির ধূম নাই— সংহারকত্রী কালীরও আবাহন নাই ; গানটি জন্মভূমির স্তোত্র মাত্র।’ (‘বঙ্কিম-জীবনী’: শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)
তবে ফরাসি বিপ্লবের সময়কার জাতীয় সংগীত বা জাগরণী কবিতা 'লা মার্সেইয়েজ’ (La Marseillaise) এর সঙ্গে বন্দেমাতরম মন্ত্রটির আসমান জমিন তফাৎ। গণতন্ত্র-প্রিয় ও স্বাধীনতাকঙ্খী ফরাসি যুবকদের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা দেওয়ার জন্য 'লা মার্সেইয়েজ' গানটি লেখা হয়েছিল। এই গানটি প্রথম থেকেই উগ্র উত্তেজজনক এবং বিদ্রোহের বারুদ এর মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু বন্দেমাতরম এর মধ্যে এক কোমলতা সজীবতা রয়েছে যা বাংলার একান্ত নিজস্ব সম্পদ।
তাছাড়া বন্দেমাতরম মূলত ভক্তিমূলক এবং কর্ম প্রবর্তকের বার্তা বহন করে। ‘বন্দেমাতরম’ অর্থাৎ মাকে বন্দনা করা। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা এই মন্ত্রটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এখানে কোথাও ধ্বংসের কথা, বিদ্রোহের কথা বলা নেই। বলা নেই কোথাও রাজতন্ত্রের বা ব্রিটিশতন্ত্রকে শাণিত তলোয়ার দিয়ে হত্যা করার কথা।
কিন্তু ক্লদ জোসেফ রুজে দ্য লিল রচিত
'লা মার্সেইয়েজ’ এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি আক্রমণ ও সৈন্যদের বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নাগরিকদের অস্ত্র ধারণ করার ও মাতৃভূমি রক্ষার আহ্বান। আর বন্দেমাতরম আদ্যোপান্ত দেশমাতৃকার বর্ণনা। এই মা সন্তানদের জ্ঞান বুদ্ধি শক্তি দিয়ে রক্ষা করবেন। পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য সাহস যোগাবেন।
বন্দে মাতরম ভাব উন্মাদনার প্রবর্তক। এই গানটি অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ত এবং অহংকারের দাম্ভিকতার মদিরাধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু 'লা মার্সেইয়েজ’- এর প্রত্যেকটি ছত্রে ছত্রে রয়েছে উত্তেজনা উগ্রতা। বন্দেমাতরম ভাবধারা থেকে যা
সহস্র যোজন দূরে অবস্থিত।
তাছাড়া কবিতা হিসাবে বন্দে মাতরম অনেক উচ্চমার্গের। ঋষি অরবিন্দ বলেছেন ইউরোপীয়রা যাকে জাতীয় সংগীত বলে বন্দেমাতরম সে ধরনের সংগীত নয়। এটা এক বিরাট শক্তিতে পরিপূর্ণ এক মন্ত্র। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিতে ‘স্বদেশী আত্মা’।
বন্দেমাতরম-এর সুরের দিকে একবার উঁকি দেওয়া যাক। গানটার সুরটিও বড় মধুর। বর্তমানে এটি দেশরাগে গাওয়া হয়। এই গানটিতে প্রথম সুরারোপ করেন যদুনাথ ভট্টাচার্য। যদুনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রখ্যাত সঙ্গীতাচার্য (যিনি যদু ভট্ট নামে পরিচিত)। তিনি অবশ্য গানটিকে মল্লার রাগে বেঁধেছিলেন। পরবর্তীকালে ‘বন্দেমাতরম’- এর প্রথম দুটি স্তবকে সুর দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সরলা দেবী তাঁর আত্মকথা ‘জীবনের ঝরাপাতা’ গ্রন্থে লিখেছেন , ‘রবীন্দ্রনাথই "বন্দে মাতরম্”-এর প্রথম সুর বসিয়েছিলেন। তাঁর দেওয়া সুরে ঐ দুটি পদে গানটি সর্বত্র চলিত হল।’( ‘জীবনের ঝরাপাতা’ সরলা দেবী : পৃষ্ঠা ৪৭)
বাকি স্তবকগুলিতে সুর সংযোজন করেন রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী সরলা দেবী। তাঁর স্মৃতিচারণ,
‘একদিন মাতুল আমায় ডেকে বললেন- ‘তুই বাকিটুকুতে সুর দিয়ে ফেল্ না।’ওরকম ভার মাঝে মাঝে আমায় দিতেন। তাঁর আদেশে ‘সপ্তকোটিকণ্ঠ কলকলনিনাদ করালে’ থেকে শেষ পর্যন্ত ভাবের সঙ্গে ও গোড়ার সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুর দিয়ে ফুটিয়ে নিলুম।’
(‘জীবনের ঝরাপাতা’ সরলা দেবী : পৃষ্ঠা ৪৭)
শুধুমাত্র সুর সংযোজনা করেই কাজ শেষ হল না। সরলাদেবী বহুজনকেই এই গান গাইতেও শিখিয়েছিলেন ; — ‘দুই একটা জাতীয় উৎসবে সমস্বরে বহুকণ্ঠে বহুজনকে গাইতেও শেখালুম। সেই থেকে সভাসমিতিতে সমস্তটাই গাওয়া হতে থাকল।’ ( ‘জীবনের ঝরাপাতা’ সরলা দেবী : পৃষ্ঠা ৪৮)। কালে 'বন্দেমাতরম' গানটি সারা বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের অন্তরের উচ্চারণ হয়ে ওঠে।
১৯৩৭ সালে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু 'বন্দেমাতরম' গানটিকে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫০ সালে সরকারিভাবে 'বন্দেমাতরম' গানটিকে ভারতের জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
‘বন্দেমাতরম’ কোনো ধ্বনি নয়, এক অস্তিত্বতাত্ত্বিক প্রতিধ্বনি। যেখানে ইতিহাস সময়কে অতিক্রম করে স্মৃতির নৈতিক ভূগোলে পরিণত হয়। মাতৃভূমি এখানে ভূখণ্ড নয়, চেতনার আদিরূপ। তাই ‘বন্দেমাতরম’ উচ্চারণ মানে কেবল দেশকে স্মরণ করা নয়, নিজের অন্তর্লীন সত্তার কাছেও প্রত্যাবর্তন। পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য দিয়েই শেষ করা যাক —‘বন্দেমাতরম আজ আমাদের হৃদস্পন্দন। বন্দেমাতরম আমাদের এক ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, এক অনন্যসাধারণ পরম্পরা’। (‘একটি কবিতা থেকে জাতীয় চেতনা: 'বন্দেমাতরম'-এর জন্মকথা ও ঐতিহাসিক যাত্রা : পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়)
____________________
গ্রন্থঋণ
১. একটি কবিতা থেকে জাতীয় চেতনা: 'বন্দেমাতরম'-এর জন্মকথা ও ঐতিহাসিক যাত্রা : পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
২. RISHI BUNKIM CHANDRA, Sri Aurobindo Ghosh,
৩. আনন্দমঠ ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ: জীবন মুখ্যোপাধ্যায়
৪. শনিবারের চিঠি, বঙ্কিমসংখ্যা, সম্পাদনা ও সজনীকান্ত দাস
৫. সাহিত্য, ১৩১৩, শ্রাবণ
৬. Speeches, Sri Aurobindo

E20: জ্বালানির সঙ্গে বদলে যাচ্ছে হিসাব
কাজল মুখোপাধ্যায়
ভারতের রাস্তায় প্রতিদিন কোটি কোটি গাড়ি চলছে। সেই গাড়ির ট্যাঙ্কে যে পেট্রোল ঢুকছে, তার চরিত্রও নিঃশব্দে বদলে গেছে। পেট্রোলের সঙ্গে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানোর নীতি—E20—এখন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নয়; এটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বাস্তবতা।
কিন্তু এই পরিবর্তনকে ঘিরে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে,দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত লাভজনক, তা কি প্রত্যেক নাগরিকের জন্যও সমানভাবে লাভজনক?
এই প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে দেওয়া কঠিন।
ভারতের জ্বালানি অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা হল আমদানিনির্ভরতা। দেশের অপরিশোধিত তেলের বিপুল অংশ বিদেশ থেকে আসে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার অভিঘাত পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার থেকে শুরু করে পরিবহণের খরচ, পণ্যের দাম এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সংসারে।
এই জায়গায় ইথানলের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশীয় কৃষিজ উৎস থেকে উৎপাদিত ইথানল পেট্রোলের একটি অংশের বিকল্প তৈরি করতে পারে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে ইথানল মিশ্রণের ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে এবং কৃষকদের কাছেও বিপুল অর্থ পৌঁছেছে। আখ, ভুট্টা ও অন্যান্য কৃষিজ পণ্যের জন্য একটি অতিরিক্ত বাজার তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ E20-এর পেছনে কেবল জ্বালানি নয়, কৃষি ও অর্থনীতিরও একটি হিসাব রয়েছে।
পরিবেশের যুক্তিটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। উদ্ভিদজাত উৎস থেকে তৈরি ইথানল পেট্রোলের তুলনায় জীবনচক্রের হিসাবে কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের সম্ভাবনা তৈরি করে। ফলে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যেও ইথানল একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির এই বড় ছবির পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট, অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন,গাড়ির মালিকের খরচ।
ইথানলের শক্তিঘনত্ব পেট্রোলের তুলনায় কম। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানিতে গাড়ির মাইলেজ কিছুটা কমতে পারে। কতটা কমবে, তার নির্দিষ্ট উত্তর নেই; গাড়ির ইঞ্জিন, মডেল, চালানোর ধরন, রাস্তার অবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর ফলাফল নির্ভর করে। কিন্তু জ্বালানি দক্ষতায় সামান্য হ্রাসও যদি প্রতিদিনের ব্যবহারে যোগ হয়, তাহলে বছরে তার আর্থিক প্রভাব একজন সাধারণ গাড়ির মালিকের কাছে অগ্রাহ্য করার মতো নাও হতে পারে।
এখানেই তৈরি হয় নীতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈপরীত্য।
রাষ্ট্রের হিসাব হয় কোটি কোটি টাকায়; নাগরিকের হিসাব হয় প্রতি লিটারে।
নতুন প্রজন্মের E20-উপযোগী গাড়ি নিয়ে নির্মাতারা যথেষ্ট পরীক্ষা করেছেন। কিন্তু পুরনো গাড়ির মালিকদের উদ্বেগকে একেবারে অমূলক বলা যায় না। গাড়ির বয়স, ইঞ্জিনের নকশা, বিভিন্ন রবার ও প্লাস্টিকের উপাদান এবং দীর্ঘদিনের ব্যবহারের ইতিহাস,সবকিছুর ওপর জ্বালানির প্রভাব নির্ভর করতে পারে। তাই ‘E20 সব গাড়ির ক্ষতি করে’ যেমন ভুল সাধারণীকরণ, তেমনই ‘E20 কোনও গাড়ির ক্ষতি করতে পারে না’,এই দাবিও অতিরিক্ত সরলীকরণ।
আর এখানেই প্রয়োজন ছিল আরও একটি ব্যবস্থা,তথ্যের স্বচ্ছতা।
কোন গাড়ি কোন ধরনের ইথানল-ব্লেন্ডেড পেট্রোলের জন্য উপযোগী, পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে কী সতর্কতা প্রয়োজন, জ্বালানির মান কীভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।এই তথ্যগুলি যত সহজে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবে, বিতর্ক তত কমবে,E20 নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় জ্বালানির মান ও দূষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি: ইথানল মেশানো এবং নিম্নমানের বা দূষিত জ্বালানি,দুটি এক বিষয় নয়। কোনও নির্দিষ্ট জ্বালানির নমুনায় সমস্যা পাওয়া গেলে তার জন্য স্বাধীন পরীক্ষা ও প্রমাণ প্রয়োজন। সেই প্রমাণ ছাড়া তাকে গোটা E20 নীতির অন্তর্নিহিত ত্রুটি বলে ঘোষণা করা ঠিক হবে না।
একইভাবে E20 নীতির সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। ইথানল উৎপাদকদের আর্থিক সুবিধা, ক্রয়মূল্য, সরকারি নীতি এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন এবং প্রমাণ এক জিনিস নয়।
কোনও নীতিতে কারও আর্থিক লাভ হচ্ছে বলেই সেখানে দুর্নীতি হয়েছে,এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। দুর্নীতির অভিযোগকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং নির্ভরযোগ্য তদন্ত।
তবে স্বচ্ছতার দাবি আরও জোরালো হওয়ার কারণ আছে। ইথানল উৎপাদনে কত খরচ, সরকার কত দামে তা কিনছে, কৃষক কতটা পাচ্ছেন, উৎপাদকদের কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর তার আর্থিক প্রভাব কত,এই হিসাব যত বেশি প্রকাশ্য হবে, সন্দেহের জায়গা তত কমবে।
আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন রয়েছে,খাদ্যশস্য ও জ্বালানির মধ্যে ভারসাম্য।
ইথানলের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে যদি কৃষিজমি, জল বা খাদ্যশস্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, তাহলে আজকের জ্বালানি-সাশ্রয় ভবিষ্যতের অন্য সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই ইথানল নীতির সাফল্য শুধু কত শতাংশ মিশ্রণ হল, তা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে,কোন উৎস থেকে ইথানল আসছে, কত জল ব্যবহার হচ্ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী।
তাহলে E20 কি ভুল?
না।
E20 কি নিখুঁত?
তাও নয়।
বরং এটি এমন একটি নীতি, যার জাতীয় লাভ এবং ব্যক্তিগত খরচ,দুটি পাশাপাশি সত্য।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে, কৃষক নতুন বাজার পেতে পারেন, আমদানিনির্ভরতা কমতে পারে এবং পরিবেশগত সুবিধাও মিলতে পারে। একই সময়ে কোনও নির্দিষ্ট গাড়ির মাইলেজ কমতে পারে, পুরনো গাড়ির মালিককে অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণের কথা ভাবতে হতে পারে এবং জ্বালানির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্তও প্রয়োজন হতে পারে।
তাই E20 নিয়ে প্রকৃত বিতর্ক হওয়া উচিত ‘সরকার ঠিক না বিরোধীরা ঠিক’,এই সরল রাজনৈতিক সমীকরণে নয়।
প্রশ্নটা বরং হওয়া উচিত,
একটি জাতীয় নীতি থেকে দেশ কতটা লাভবান হল, আর সেই লাভের জন্য সাধারণ নাগরিককে কতটা অতিরিক্ত মূল্য দিতে হল?
এই দুই হিসাব যদি পাশাপাশি প্রকাশ্যে রাখা যায়, তবেই E20 নিয়ে বিতর্ক বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গায় পৌঁছবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত জ্বালানি শুধু গাড়ি চালায় না,একটি দেশের অর্থনীতিও চালায়। কিন্তু সেই অর্থনীতির চাকা যেন ঘুরতে ঘুরতে সাধারণ মানুষের পকেটের ওপর অদৃশ্য বোঝা চাপিয়ে না দেয়, সেটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
E20-এর সাফল্য তাই শুধু পেট্রোলে কত শতাংশ ইথানল মেশানো গেল, তার মধ্যে নয়; সাফল্য হবে তখনই, যখন জ্বালানি-নিরাপত্তার সঙ্গে ভোক্তার স্বার্থ, কৃষকের আয়, পরিবেশ এবং নীতির স্বচ্ছতা,এই চারটি হিসাব একই সঙ্গে মেলানো যাবে।
-কাজল মুখোপাধ্যায়
তথ্যসূত্র : PIB, NITI Aayog, Economic Survey

পথভ্রষ্ট
জিবউন্নিসা খাতুন
আজ আমি সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চাই—আমরা সত্যিই কোন পথে হাঁটছি? আমরা কি এগিয়ে যাচ্ছি, নাকি ধীরে ধীরে নিজেদের অস্তিত্বটাই ভুলে যাচ্ছি? পরিবর্তন সবসময়ই সময়ের সঙ্গে আসে, প্রজন্মের সঙ্গে আসে—এটা সত্য। কিন্তু আজ যে পরিবর্তন চোখে পড়ছে, তা যতটা বিস্ময়কর, তার থেকেও বেশি ভয়ানক। কারণ বদলে গেছে শুধু সময় নয়, বদলে যাচ্ছে মানুষের মন, চিন্তা, মূল্যবোধ, ভবিষ্যৎ।
আমরা যারা আগের প্রজন্ম—আমাদের ভুল ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল, কিন্তু থাকার পরেও আমরা মানুষের গল্প জানতাম, সমাজের ভাষা বুঝতাম, অন্যের কষ্টের শব্দ শুনতে পেতাম। কিন্তু আজকের ছোট বাচ্চারা—যারা আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ—তারা যেন এক অদ্ভুত অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা আজ মোবাইলের পর্দার ভেতর নিজেদের বন্দি করে ফেলেছে। Free Fire, PUBG, COC—এই কয়েকটা গেম তাদের পৃথিবীকে গ্রাস করে নিয়েছে। এখন তাদের চোখে পৃথিবী মানে হলো স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলো, চরিত্রের স্কিন, কয়েন, ডায়মন্ড, ক্ল্যান, র্যাঙ্ক, কিল। মানুষের হাসি-কান্নার জগৎ তাদের কাছে অচেনা।
দুটো কথা বললে তারা বলে—“পারব না”,
“জানি না”,
“দরকার নেই”—
একটা প্রজন্ম এরকম মনোভাব নিয়ে বড় হলে সমাজ কি এগোতে পারে?
তারা গেমের যুদ্ধ জিততে পারে, কিন্তু জানে না বাস্তব জীবনের যুদ্ধ কত কঠিন।
তারা গেমে দল বানাতে পারে, কিন্তু পাঁচটা মানুষকে নিয়ে সত্যিকারের একতা গড়তে জানে না।
তাদের হৃদয়ে ভালোবাসা আছে, কিন্তু সেই ভালোবাসাকে সমাজের কাজে লাগানোর সাহস নেই।
তাদের মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে, কিন্তু সেই বুদ্ধিকে বাস্তবতার দিকে ফেরানোর ইচ্ছাশক্তি নেই।
আমি নিজের চোখে দেখেছি—আমার বাড়ির বাচ্চারা দিনের পর দিন স্ক্রিনের ভেতর হারিয়ে যায়। তাদের কাছে বাইরের দুনিয়া কোনো গল্পের বইয়ের মত—শুধু ‘আছে’, কিন্তু তারা সেটা ‘জানে’ না। তারা পড়ে, লেখে, পরীক্ষায় পাশও করে—কিন্তু পড়াশোনার বাইরে যে বিশাল জীবন রয়েছে, সেখানে যে মানুষ, প্রকৃতি, সংগ্রাম, শক্তি, ব্যথা—তা তাদের কাছে একেবারে অচেনা অন্ধকার।
এভাবে একটা প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যারা ঘরের দেয়ালের রং চেনে, কিন্তু মানুষের চোখে আটকে থাকা জল দেখতে পায় না। যারা গেমের শব্দ শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সমাজের কান্না, প্রতিবাদ বা অন্যায়ের শব্দ তাদের কানে পৌঁছায় না। যারা ভার্চুয়াল জগতে হিরো, কিন্তু বাস্তব জীবনে নিজেদের পরিচয়টাই খুঁজে পায় না।
এ সব দেখতে দেখতে আমার ভিতর ভয় জমে যায়। ভয় পাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে। ভয় পাই কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের দেশ, আগামী দিনের সমাজ গড়বে। আর তারা যদি আজই স্ক্রিনের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকে, তাহলে তাদের চোখের আগুন নিভে যাবে, চিন্তার দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। আজ তারা শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিকভাবে তারা একা, দুর্বল আর বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে।
এরপর আসে আমার নিজের কথা। আমারও অনেক স্বপ্ন আছে। সমাজের জন্য কিছু করার ইচ্ছে আছে। আমি চাই মানুষকে নিয়ে কাজ করতে, মানুষের জন্য কিছু গড়তে, ভাঙা জিনিস জোড়া লাগাতে। কিন্তু আমাকে থামিয়ে রাখে একটা পরিচয়—আমি একজন মেয়ে। সমাজের দৃষ্টিতে আজও মেয়েদের পথ সীমিত, স্বপ্ন সীমিত, সুযোগ সীমিত। মেয়েরা চাইলে সব পারে, তবুও সমাজ বারবার তাদের ইচ্ছেকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমারও সে অভিজ্ঞতা আছে। হাজারো ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমি অনেক সময় পারি না। চাইলে এগিয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু সমাজের দেওয়াল আমাকে চাপে ধরে রাখে। মনে হয়, আমি যদি ছেলে হতাম, তাহলে অনেকে আমাকে ঠেকাতে পারত না। পাহাড় ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা থাকত। কিন্তু আমি মেয়ে বলে আমার পথই থামিয়ে দেওয়া হয়।
তবুও আমি একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—এই সমাজ বদলাবে। বদলাতে বাধ্য। কারণ পরিবর্তনের সূচনা সবসময়ই আসে একজন মানুষ থেকে। আজ যদি আমরা চুপ করে থাকি, তাহলে আগামী দিনের প্রজন্ম শুধু গেমের নেশায় ডুবে থাকা মানুষে পরিণত হবে। তারা জীবনের অর্থ বুঝবে না, সমাজের দায়িত্ব নেবে না, মানুষের পাশে দাঁড়াবে না।
তাই আমাদের আজই কথা বলতে হবে, আজই দাঁড়াতে হবে, আজই কিছু করতে হবে।
আমি চাই বাচ্চারা গেম খেলুক, হাসুক, মজা করুক—কিন্তু একই সাথে তারা যেন মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখে, সমাজের প্রতি দায়িত্ব বুঝতে শেখে, অন্যের হাত ধরতে শেখে, সাহায্য করতে শেখে। কারণ কোনো ভার্চুয়াল আলোর জয় নেই—আসল জয় মানুষের চোখের আলোয়, মানুষের শক্তিতে, মানুষের একতায়।
সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় না শুধু প্রযুক্তি। সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় মানুষ—মানুষের চরিত্র, মানুষিকতা, ভালোবাসা এবং সংগ্রাম। সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে সেইসব মানুষের উপর, যারা সত্যের পাশে দাঁড়ায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে এবং মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে।
আর আমি বিশ্বাস করি, আজ আমি একা হলেও কালকে আমার পাশে হাজারো মানুষ দাঁড়াবে। কারণ যে মেয়ের ভিতরে আগুন আছে, যে মেয়ে স্বপ্ন দেখতে জানে, যে মেয়ে ভয়কে ভেঙে এগোতে জানে—তাকে সমাজের কোনো দেয়ালই চিরদিন আটকে রাখতে পারবে না।
মানুষকে নিজের যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে না দিয়ে যেমন নেশার অন্ধকারে ঠেলে রাখা হয়, ঠিক তেমনভাবেই সমাজ আমাদের সামনে আরেকটি গভীর ষড়যন্ত্র দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আজ আমাদের চারপাশে চাকরির সংকট, শিক্ষার অবনতি, টাকার অভাব—এগুলোই হলো আসল সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যাগুলোর দিকে আমরা যাতে তাকাতে না পারি, সেই সুযোগটাই সমাজ নিখুঁতভাবে কাজে লাগায়।
আমাদের চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়—
নানারকম ভয় দেখানো হয়, অযথা নাটক তৈরি করা হয়, এমন সব বিভ্রান্তিতে আমাদের ফেলে রাখা হয় যাতে আমরা মূল প্রশ্নটা ভুলে যাই। আর সেই সঙ্গে যখন নেশার মতো দিকহীন যাপন মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন প্রতিবাদের আগুনটুকুও নিভে যায়। কারণ নেশা শরীরকে যতটা দুর্বল করে, মনের শক্তিকে তার থেকেও বেশি মাটিতে মিশিয়ে দেয়।
আজকের জেনারেশন থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই অদৃশ্য ফাঁদের মধ্যে আটকে পড়ছে। মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে, আত্মবিশ্বাসের ভিত নড়ে যাচ্ছে। নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলার মতো সাহসও যেন ভেতর থেকে শুকিয়ে যাচ্ছে। যে সমাজ একদিন তরুণদের কণ্ঠে বিপ্লব খুঁজে পেত, সেই সমাজই আজ তাদের নিঃশব্দ করে ফেলার পরিকল্পনায় ব্যস্ত।
নেশায় ডুবিয়ে রাখলে মানুষ আর প্রশ্ন করে না।
অন্যায় দেখেও প্রতিবাদ করে না।
ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয় না।
নিজের শক্তিকে চেনার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলে।
এটাই তো চাই সেই অদৃশ্য শক্তিগুলোর—
যারা সমাজের গভীর সমস্যাগুলো ঢেকে রাখতে চায়।
যারা চায় না আমরা মাথা তুলে দাঁড়াই,
নিজেদের অধিকার দাবি করি,
অন্যায়কে প্রশ্ন করি।
সেই কারণেই আজ আমাদের কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে।
আমরা যেন ইচ্ছাশক্তিহীন এক নীরব প্রজন্ম হয়ে উঠছি,
যাদের সামনে থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে
প্রতিবাদের আগুন, প্রতিরোধের স্পর্ধা,
নিজেকে বদলে দেওয়ার সাহস।
কিন্তু নেশা কখনোই শুধু ব্যক্তির ক্ষতি করে না—
এটি পুরো সমাজের অস্তিত্বকেই দুর্বল করে দেয়।
আর সমাজ দুর্বল হয়ে গেলে
তার ভবিষ্যৎও অন্ধকারে ডুবে যায়।
তাই সময় এসেছে সত্যিটা স্বীকার করার—
আমাদের কণ্ঠস্বর কেউ বাইরে থেকে বন্ধ করেনি,
ধীরে ধীরে ভেতর থেকেই নিস্তেজ করে দেওয়া হয়েছে।
আমাদের শক্তিকে দুর্বল করার জন্য
অদৃশ্য শৃঙ্খল আমাদের উপর চেপে বসেছে।
আজ দরকার সেই শৃঙ্খল ভাঙার সাহস।
নিজের চোখে সত্যিটা দেখার ক্ষমতা।
আর নিজের ভেতরের মানুষটাকে
নেশা, ভয় ও বিভ্রান্তির হাত থেকে
মুক্ত করার দৃঢ় ইচ্ছা।
কারণ সমাজ পরিবর্তন শুরু হয়
একটা মানুষের চোখে আগুন জ্বলে ওঠার মধ্য থেকেই।
আমাদের চারপাশে প্রতিদিন কত কিছু ঘটছে—চাকরির অভাব, শিক্ষার মানের পতন, নিরাপত্তাহীনতা, রাজনীতি থেকে রাস্তাঘাট – সবকিছুতেই এক অদ্ভুত অস্থিরতা। সমাজের ভেতরে ফুটছে অসন্তোষের আগুন, আর তার উপরে চলছে নিত্য নতুন হাঙ্গামা। কিন্তু এসব থেকে চোখ ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যেন আমাদের সামনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এক নতুন দুনিয়া—গেম, রিল, শো-অফ আর ভার্চুয়াল নেশা।
এটা কি সত্যি মানুষ নিজে থেকে বেছে নিচ্ছে?
নাকি এর পিছনে আছে এক গভীর ষড়যন্ত্র?
যখন সমাজে সমস্যা বাড়ে, তখন মানুষের মনকে অন্যদিকে ঘোরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও বাড়ে। আজকের ছাত্রছাত্রী—যাদের হাত ধরে দেশের ভবিষ্যৎ তৈরি হওয়ার কথা—তারাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে আছে ভার্চুয়াল উত্তেজনায়। বই, ভাবনা, প্রশ্ন, সচেতনতা—সব ধীরে ধীরে পিছনে চলে যাচ্ছে।
লাভ কার?
যারা চায় নতুন প্রজন্মকে ভাবতে না দিতে, লড়তে না দিতে, প্রশ্ন করতে ভুলিয়ে দিতে—তাদেরই।
আরো বড় সত্য হলো—সমাজে চাকরি নেই, সুযোগ নেই, মানসম্মত শিক্ষা নেই।
যদি শিক্ষার শুরু থেকেই বাচ্চাদের দুর্বল করে দেওয়া যায়, মনোযোগ ভেঙে দেওয়া যায়, চরিত্র নরম করে ফেলা যায়—তাহলে ভবিষ্যতে তারা কোন মুখে চাকরি চাইবে? কোন শক্তিতে অধিকার চাইবে?
যে মানুষ ভাবতেই ভুলে যায়, সে দাবিও করতে জানে না।
হয়তো সেই কারণেই এত কুয়াশার মতো বিভ্রান্তি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তরুণদের জীবনে।
সমাজ ভাঙছে, শিক্ষা শূন্য হচ্ছে, আর একদল প্রশ্নহীন প্রজন্ম বড় হচ্ছে যাদের স্বপ্নগুলো স্ক্রিনে আটকে যাচ্ছে। আর কেউ বুঝতে পারছে না, এভাবে ধীরে ধীরে একটা জাতির ভিতটাই দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে।
এটাই আজকের সমাজের সত্য—
পর্দার আড়ালে একটা বড় খেলা চলছে, আর খেলার মাঠে নেমে যাচ্ছে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
আজ আমরা প্রত্যেকে শুধু গেমে আটকে নেই—আমরা রিল, ফোন, ভার্চুয়াল দুনিয়া সবকিছুর দাস হয়ে গেছি। যেন হাতের মুঠোয় থাকা এই ছোট্ট স্ক্রিনটাই আমাদের জীবন, আর তার বাইরের বাস্তব পৃথিবীটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা—এই প্রযুক্তিকে ভালো কাজে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল, কিন্তু সেটা আমরা শিখিনি।
আমরা ব্যবহার করছি, হ্যাঁ—কিন্তু ভাসিয়ে দিচ্ছি নিজেদের, হারিয়ে ফেলছি মনোযোগ, চরিত্র, এমনকি ভবিষ্যতও।
একটা জিনিসকে ভালোভাবে ব্যবহার করার যে বুদ্ধি, যে সংযম, যে সচেতনতা দরকার—আমাদের সমাজে সেটা শেখানো হয় না।
ফোন আমাদের জ্ঞান দিতে পারত, দক্ষতা দিতে পারত, ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করতে পারত—
কিন্তু আমরা সেটাকে বানিয়ে ফেলেছি নেশা।
এটা আমাদের অজান্তে হয়ে যাওয়া কোনো ভুল নয়, এটা আজ আমাদের অভ্যাস, আরো কঠিন ভাষায় বললে—এটা আমাদের এক গুরুতর খারাপ স্বভাব।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, স্কুলের বাচ্চা থেকে কলেজের ছাত্রছাত্রী—সবাই এই অদৃশ্য ঘূর্ণির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।
পড়াশোনার পাতা কম খুলছে, রিলের পর রিল বেশি স্ক্রল হচ্ছে।
বাইরের পৃথিবী দেখা কমছে, ভুয়া জগতে ডুবে থাকা বাড়ছে।
নিজের সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিয়ে আমরা ডুবছি এমন এক আনন্দে, যার পরিণতি শুধু শূন্যতা।
দিনের পর দিন এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভাবতে ভুলে যাবে, পড়তে ভুলে যাবে, পরিশ্রম করতে ভুলে যাবে।
একটা শক্তিশালী জাতিকে ভেঙে ফেলতে যতটা সময় লাগে, তার চেয়ে কম সময় লাগে তাকে স্ক্রিনে বুঁদ করে দিতে।
আজ আমাদের বড় ভুলটা হলো—
প্রযুক্তিকে ব্যবহার না করে, আমরা প্রযুক্তির হাতে ব্যবহার হয়ে যাচ্ছি।
এটাই সমাজের জন্য বড় বিপদ।
এটাই আমাদের চরিত্রের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।
আর যতক্ষণ না আমরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে পারছি, ততক্ষণ এই স্ক্রিন-নেশা আমাদের মনের দেয়াল ভেঙে দিতে থাকবে—
আর একদিন বুঝতেই পারব না, আমরা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছি।
আজকের প্রজন্ম হয়তো একটু হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এখনও দেরি হয়নি। আমরা চাইলে তাদের ফিরিয়ে আনতে পারব—গেমের পর্দা থেকে জীবনের রাস্তায়, একাকীত্বের ঘর থেকে একতার মাঠে, নীরবতার খাঁচা থেকে সত্য বলার মঞ্চে। ভবিষ্যৎকে সুন্দর করা আমাদের হাতে—আর আমরা যদি চাই, তাহলে আসল বিপ্লব এখান থেকেই শুরু হবে।
ছাত্রছাত্রীরা এই দেশের এমন এক শক্তির উৎস, যারা ব্রিটিশ শাসনের অন্ধকার সময় থেকেই প্রত্যেকটি অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে—যেখানে সমাজ ভয় পেয়েছে, বয়স্করা চুপ থেকেছে, ক্ষমতাবানরা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে, সেখানেই সবচেয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে ছাত্রসমাজ। কারণ তাদের রক্ত গরম, তাদের স্বপ্ন উজ্জ্বল, তাদের চোখে ভবিষ্যতের ছবি স্পষ্ট। ডিরোজিও এই তরুণদের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন জাগরণের আগুন; তিনি বুঝেছিলেন দেশ বদলাবে কেবল তাদের হাত ধরেই। মাস্টারদা সূর্য সেনও দেখেছিলেন, তরুণদের বুকে যদি সাহস থাকে, তবে সাম্রাজ্যও কাঁপতে পারে। সেই সময়ের প্রতিটি আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ছাত্রসমাজ—যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার মশালকে উঁচু করে ধরেছিল। তাই ব্রিটিশরা সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল এই অংশকে; কারণ জানত, ছাত্রসমাজ চুপ থাকলে আন্দোলন থেমে যায়, আর তারা জেগে উঠলে সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে।
আজও সেই একই শক্তি, সেই একই সম্ভাবনা ছাত্রদের ভিতরে লুকিয়ে আছে। কিন্তু আজকের প্রজন্মকে টার্গেট করা হচ্ছে অন্যভাবে—সংঘর্ষ, ইতিহাস, সমাজ, প্রতিবাদ, সাহসের পথ থেকে সরিয়ে তাদের মনকে বন্দি করা হচ্ছে মোবাইলের গেমে, অর্থহীন নেশায়, কৃত্রিম দুনিয়ার ভাঁজে। উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার—যে তরুণ দল একসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আগুন হয়ে উঠত, যাতে তারা আর সেই আগুন জ্বালাতে না পারে। যেন তারা আর প্রশ্ন না করে, প্রতিবাদ না করে, সমাজের অন্যায় দেখেও মুখ বন্ধ রাখে। গেম আর স্ক্রিনের মধ্যে তাদের ভবিষ্যৎকে আটকে রেখে তাদের থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সেই জাগ্রত বুদ্ধি, সেই উদ্যম, সেই নেতৃত্বের শক্তি যা ইতিহাস বদলে দিতে পারত। কারণ একজন চিন্তাশীল ছাত্র বিপ্লব আনে, কিন্তু একজন বিভ্রান্ত ছাত্র শুধু স্ক্রিনে হারিয়ে যায়। এ কারণেই আজ ছাত্রসমাজকে নেশার ওপর তোলার চেষ্টা—যাতে সেই সাহসী অংশটা আর না থাকে, যাতে আগামী দিনের ডিরোজিও আর না জন্মায়, যাতে মাস্টারদার মতো নেতার পাশে দাঁড়ানোর মতো বীর ছাত্ররা আর তৈরি না হয়। ইতিহাস যেমন প্রমাণ করে—যে দেশ তার ছাত্রদের দুর্বল করে দেয়, সে দেশ নিজের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

বৃদ্ধাশ্রম : সময়ের এক নীরব প্রতিচ্ছবি
ডঃ সোমালি চৌধুরী
বৃদ্ধাশ্রমের জানালায় বসে এক বৃদ্ধ বাবা।
দূরের রাস্তায় গাড়ি ছুটে গেলে মনে হয়-
এই বুঝি ছেলে এলো।
বৃদ্ধ মা প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে বলেন, আজ বোধহয় ছেলে আসবে…. হয়তো সময় পায়নি এতদিন।
ঘরের কোণে পড়ে থাকে পুরোনো অ্যালবাম,
সেখানে হাসছে একটি ছোট্ট ছেলে, যে আজ অনেক বড়
শুধু শৈশবের হাতটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
মায়ের আঁচলে যে শিশুটি একদিন ঘুমিয়ে পড়ত
আজ সেই মায়ের চোখে ঘুম আসে না।
বৃদ্ধাশ্রম এর উঠোনে বিকেল নামে ধীরে,
কেউ রোদ পোহায়, কেউ পুরোনো দিনের গল্প বলে।
কেউ লুকিয়ে চোখের জল মোছে,
কারণ কান্নারও একটা লজ্জা থাকে।
বৃদ্ধাশ্রম কোন একটি বাড়ির নাম নয়,
সময়ের এক নীরব প্রতিচ্ছবি।
বৃদ্ধাশ্রম - শব্দটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু মুখ। কারো চোখে দীর্ঘ অপেক্ষা, কারো মুখে অভিমানের ছাপ, কারো আবার হাতে জড়ানো অতীতের স্মৃতি। এই মানুষগুলোই একদিন ছিলেন একটি পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ ও পরিবারের কাঠামো বদলেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট হয়েছে, কর্মসূত্রে সন্তানরা দূর দেশে পাড়ি দিয়েছেন, জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে। এর পাশাপাশি কোথাও কোথাও কমেছে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহনশীলতা। এই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান ফল হল বৃদ্ধাশ্রমের প্রসার।
তবে বৃদ্ধাশ্রমকে শুধু সন্তানদের দ্বারা পরিতক্ত বাবা-মায়ের আশ্রয় হিসেবে দেখলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নগরায়ন, পারিবারিক পরিবর্তন, একাকীত্ব, বার্ধক্যজনিত অসহায়তা এবং প্রবীনদের স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা।
ভারতীয় সমাজে বহুদিন ধরে যৌথ পরিবার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। একই বাড়িতে একাধিক প্রজন্ম বসবাস করত। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা ছিলেন অভিজ্ঞতার ভান্ডার এবং অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দাদু-ঠাকুমার কাছে গল্প শুনে বেড়ে ওঠা, তাঁদের কাছ থেকে পারিবারিক ইতিহাস জানা,উৎসব-পার্বনে একসঙ্গে থাকা- এই সবই ছিল পারিবারিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ। বৃদ্ধ বয়সকে আলাদা কোনো জীবনপর্ব হিসেবে দেখা হতো না; বরং পরিবারের মধ্যেই তার স্বাভাবিক অবস্থান ছিল।
কিন্তু শিল্পায়ন, নগরায়ন,শিক্ষার প্রসার এবং কর্মসংস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে,এক শহর থেকে অন্য শহরে, এমনকি এক দেশ থেকে অন্য দেশে বসবাস করতে শুরু করেছে। এর ফলে প্রজন্মের মধ্যে দৈহিক ও মানসিক দূরত্ব বেড়েছে।
তবে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রতিটি মানুষকে পরিত্যক্ত বলা ঠিক হবে না। অনেক প্রবীণ নিজের ইচ্ছায় বৃদ্ধাশ্রম বেছে নেন। কেউ সন্তানহীন, কেউ বিধবা বা বিপত্নীক, কেউ দীর্ঘদিন একা থাকেন,আবার কেউ সমবয়সী মানুষের সঙ্গে সামাজিক পরিবেশে থাকতে চান। এটি কারও জন্য আশ্রয়, কারও জন্য নিরাপত্তা, আবার কারও জন্য স্বাধীনভাবে বাঁচার একটি নতুন ঠিকানা।
বর্তমানে আধুনিক কিছু বৃদ্ধাশ্রমে চিকিৎসা,নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিকর খাবার,বিনোদন,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রার্থনা, বইয়ের ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম থাকে। তাঁরা সেখানে নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন।
তবে বৃদ্ধাশ্রম এর বেদনাদায়ক কিছু বাস্তবতাও আছে। নিজের হাতে গড়ে তোলা সংসারে যখন একদিন তাঁরা হয়ে ওঠেন অপ্রয়োজনীয়, সন্তানদের জীবনে হয়ে ওঠেন ব্রাত্য;তখনই তাঁরা খুঁজে নেন এমনই একটি আশ্রয়, যার নাম বৃদ্ধাশ্রম।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রয়োজন সবসময় অর্থ নয়; তাঁরা হয়তো চান না কোনো দামী উপহার। তাঁদের প্রয়োজন একজন কথা বলার মত মানুষ, পরিচিত মুখ,স্নেহের স্পর্শ এবং নিজের পরিবারের মধ্যে নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি। বৃদ্ধাশ্রম-এর সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলির একটি হল অপেক্ষা। কেউ অপেক্ষা করেন ছেলে-মেয়ের জন্য,কেউবা নাতি-নাতনির জন্য। উৎসবের দিনগুলিতে এই অপেক্ষা আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। একসময় যিনি নিজে বাড়িতে দুর্গা পুজোর আয়োজন করতেন, আজ তিনি অন্যের আয়োজনে অতিথিমাত্র। এই পরিবর্তন শুধু একটি ব্যক্তির জীবনের পরিবর্তন নয়; এটি আমাদের পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি।
প্রবীনদের কল্যাণ কেবলমাত্র পরিবারের দায়িত্ব নয়,রাষ্ট্র ও সমাজেরও সমান ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। প্রবীনদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যপরিষেবা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা,নিরাপদ আবাসন, আইনি সহায়তা এবং মানসিক সুস্থতার ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা দরকার। বৃদ্ধাশ্রম গুলির ক্ষেত্রেও নজরদারি জরুরী। খাদ্য ব্যবস্থা,চিকিৎসা ব্যবস্থা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও মানবিক পরিবেশ যাতে পর্যাপ্ত থাকে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একজন মানুষের মূল্য তাঁর উপার্জনের বা দৈহিক সক্ষমতার পরিমাণে নয়। একটি পরিবারের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও মানবিক অবদানও সমভাবে মূল্যবান। বার্ধক্য জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। আজ যে যুবক কাল সে বৃদ্ধ। প্রত্যেককেই এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতেই হবে। তাই প্রবীনদের প্রতি যত্ন আসলে ভবিষ্যতের নিজের প্রতিও দায়িত্ব। বাবা মায়ের বার্ধক্য কোনো দায় নয়- এটি তাঁদের জীবনের সেই সময়,যখন তাঁরা আমাদের কাছ থেকে ফিরে পেতে পারেন তাঁদের দেওয়া ভালোবাসার সামান্য কিছু অংশ।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.