আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
রম্য রচনা/ মুক্ত গদ্য
ধারাবাহিক -উপন্যাস / গদ্য
প্রবন্ধ
Privacy Policy
আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
রম্য রচনা/ মুক্ত গদ্য
ধারাবাহিক -উপন্যাস / গদ্য
প্রবন্ধ
Privacy Policy
More
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • রম্য রচনা/ মুক্ত গদ্য
  • ধারাবাহিক -উপন্যাস / গদ্য
  • প্রবন্ধ
  • Privacy Policy
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • রম্য রচনা/ মুক্ত গদ্য
  • ধারাবাহিক -উপন্যাস / গদ্য
  • প্রবন্ধ
  • Privacy Policy

প্রবন্ধ

ডাঃ রঞ্জন ভট্টাচার্য্য

মহাভারতের কথা: ছন্দোবন্ধনে দুটি অধরা মাধুরী 

ডাঃ রঞ্জন ভট্টাচার্য্য 


তখন বসন্তকাল। চারিদিকে অশোক, চাঁপা, বকুল, চন্দন, অর্জুন ইত্যাদি গাছ ফুলে ভরে আছে। কোকিলরা সেই গাছে গাছে গান গাইছে। ভ্রমররা গুনগুন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে রাজার মন কামে আকুল হয়ে উঠলো - বলছেন মহাভারতের কবি। আমরা এই এখন এই ঘটনাটির আঙিনায় আসবো।

ঘটনাটি মহাভারতের আদিপর্বের গোড়ার দিকের। রাজা উপরিচর বসু মৃগয়া করতে বেরিয়েছেন এক গভীর অরণ্যে। সেই অরণ্যে এসে তিনি দেখতে পেলেন  বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। যদিও মৃগয়া করতে বেরিয়েছেন , তবুও রাজা উপরিচর বসুর চোখের সামনে তাঁর পরমাসুন্দরী স্ত্রী গিরিকার মুখশ্রীটিই বারবার ভেসে আসছে। মিলন হবে কবে এই ভাবনায় তিনি অস্থির হয়ে উঠছেন। অথচ সেইসময়ে গিরিকা তাঁর শরীর- সংস্পর্শের থেকে বহুদূরে। এইসব ভাবতে ভাবতে রাজা একটি অশোকগাছের তলায় এসে বসলেন। গাছটি ফুলেফুলে ছেয়ে আছে। সেই গাছের ছায়ায় এসে বসলেন রাজা উপরিচর বসু। তখন‌ই ওই 'গন্ধবিধুর সমীরণে', 'আম্রমুকুল সৌগন্ধ্যে' স্ত্রী গিরিকার সংস্পর্শের এক কাল্পনিক 'পুলকিত পরশনে'  তাঁর রেতস্খলন হলো। তখন বসন্তকাল।

মহাভারতের কবি অসংকোচে এই বর্ণনা দিয়েছেন। কারণ তিনি মহাকবি। এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে যা ঘটলো তা সংক্ষেপে এই - 

" এই শুক্র যেন নিস্ফল না হয়"- এই কথা মনে করে রাজা উপরিচর বসু একটি অশোকপত্রে সেই শুক্র ধারণ করলেন। এরপর সেই পাতাটিকে মুড়ে নিয়ে একটি শ্যেনপক্ষীর কাছে গেলেন । এবং পাখিটিকে বললেন -"যাও -" তুমি আমার স্ত্রীর কাছে যাও । তার কাছে গিয়ে এই শুক্র দান করো ।  সে ঋতুমতী হয়েছে। তার এই ঋতুকাল যেন ব্যর্থ না হয় । "

শ্যেনপক্ষীটি রাজার নির্দেশে ওই পাতায় মোড়া বীর্যটি ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যেতে লাগলো রাণী গিরিকার উদ্দেশ্যে। মাঝপথে তাকে দেখতে পেলো আরেকটি শ্যেনপক্ষী। সেই পক্ষীটি ভাবলো অন্য পক্ষীটি নিশ্চয়ই কোনো মাংসের টুকরো মুখে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সে সেটিকে কেড়ে নেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লো । শুরু হলো দুই শ্যেনপক্ষীর প্রবল লড়াই। এতেই প্রথম শ্যেনপক্ষীটির মুখ থেকে পড়ে গেলো অশোকপাতায় মোড়া উপরিচর বসুর বীর্যটি । সেটি গিয়ে পড়লো তাদের নিচে যমুনার জলে। সেই জলে বাস করতো এক মৎসী । সেই মৎসী ওই বীর্যটি মুখে নিয়ে নিলো এবং খেয়ে ফেললো।

এর দশ মাস বাদে এই মৎসীটি ধরা পড়লো ধীবরদের জালে । ধীবররা দেখলো ওই মৎসীর পেটে রয়েছে এক যমজ মানবসন্তান। একটি পুত্র ও একটি কন্যা। ঘটনাটি তারা তখন‌ই রাজা উপরিচর বসুকে জানালো। রাজা পুত্রসন্তানটি গ্রহণ করলেন আর কন্যাসন্তানটি ধীবররাজকে দিয়ে দিলেন। এই পুত্রটি পরে মৎস্যরাজা নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। আর কন্যাটি মৎস্যগন্ধা সত্যবতী নামে ধীবররাজের ঘরে পালিত হয়ে যথাসময়ে অসামান্যা রূপবতী বলে খ্যাত হলেন । 

আমরা মহাভারত পাঠকেরা এরপর সত্যবতীর কাহিনীটি জানি। জানি যমুনার জলে সত্যবতীর নৌকা বাওয়া - পরাশর মুনির সেই নৌকায় যাত্রী হ‌ওয়া - পরাশর মুনির সঙ্গে সত্যবতীর নৌকায় সঙ্গম - কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের জন্ম ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা সেই বহুশ্রুত কাহিনীর ভিতরে আসছি না।  আমরা সত্যবতীর কাহিনীর সূত্রপাত যে আখ্যানটি থেকে সেই আখ্যানটির পরিসরেই থাকছি। অর্থাৎ আলোচনার শুরুতে উল্লেখ করা উপরিচর বসুর কাহিনীটিতে ।যে কাহিনীটিকে  অনেকক্ষেত্রে এই বিপুল ভারতকথার প্রথম আখ্যান বলে চিহ্নিত করা হয় ।

আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এই অতিকল্পিত বহুবর্ণিল কাহিনীটির সূচনা হচ্ছে একটি ' অধরা মাধুরীর ' ছবি এঁকে। এই "মাধুরী" হলো রাজা উপরিচর বসুর অসামান্য রূপবতী স্ত্রী গিরিকার রূপের মাধুরী। আর সেই গিরিকাকে সেইসময়ে উপরিচর বসু কামনা করছিলেন তীব্র ভাবে। কিন্তু  তাঁকে শারীরিকভাবে সংস্পর্শে পাচ্ছিলেন না। কারণ উপরিচর বসুকে যেতে হয়েছিলো মৃগয়ায় ,  গভীর অরণ্যে।‌ আর এদিকে রাজপ্রাসাদের ভিতরে রয়েছেন একাকিনী রাণী গিরিকা । তাই রাজা উপরিচর বসুর কাছে সেই মুহূর্তে তিনি 'অধরা' ।  যে মুহূর্তে  রাজা তাঁর প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করছিলেন -'বসন্ত এসে গেছে।' তাঁর মনে হচ্ছিলো ' মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে । ওই অধরা মাধুরীর জন্য‌ই রেতস্খলন হলো রাজার। 

মহাভারতের কবি এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ছন্দোবন্ধনে তাঁর কুহক লেখনী ছুটিয়ে কুসুম তুলতে  দ্বিধা করেন নি । 

এইভাবে শুরু হলো মহাভারতের বিপুল কথামালা। যার পরতে পরতে কল্পনার অজস্র রঙীন সুতো আশ্চর্য ভাবে বুনতে থাকে একের পর এক বিচিত্র বৃত্তান্ত। আমরা দেখতে থাকি মুগ্ধ হয়ে সেই বৃত্তান্তগুলির ছবি-   ভুলে গিয়ে যুক্তি তর্কের সমস্ত কঠোর বাঁধন। 

সত্যবতীর এই আশ্চর্য জন্মবৃত্তান্তের পর, এবার আমরা মহাভারতের কাহিনীর পথ ধরে আরো অনেকদূর এগিয়ে যাবো । ততদিনে সত্যবতীর সঙ্গে রাজা শান্তনুর বিবাহ হয়ে গেছে। এর আগে ঘটে গেছে গঙ্গার সঙ্গে শান্তনুর বিবাহ - ভীষ্মের জন্ম ইত্যাদি। এরপর সত্যবতীর দুই পুত্র চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্যের জন্ম হলো। তারা দুজনেই অকালপ্রয়াত হলেন । পড়ে র‌ইলেন বিচিত্রবীর্যের দুই যুবতী বিধবা অম্বিকা ও অম্বালিকা। মহর্ষি ব্যাসের ঔরসে তাঁদের দুই পুত্র ধৃতরাষ্ট্র ও পান্ডুর জন্ম হলো। পরবর্তী কালে ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহ হলো গান্ধারীর সঙ্গে এবং পান্ডুর বিবাহ হলো কুন্তী ও মাদ্রীর সঙ্গে। অতি আশ্চর্যভাবে গান্ধারীর শতপুত্রের জন্ম হলো। আর পান্ডুর স্ত্রীসঙ্গমে বাধকতার কারণে কুন্তী তিন জন পরপুরুষের ঔরসে তিনটি পুত্র ( যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন) এবং মাদ্রী এক যুগ্ম পুরুষের দ্বারা দুটি যমজ পুত্রের ( নকুল ও সহদেব) জন্ম দিলেন। 

এত সব ঘটনার বিস্তারে না গিয়ে আমরা চলে আসবো নকুল সহদেবের জন্মের পরের একটি ঘটনায় ।আমরা এসে দাঁড়াবো আরেক বসন্তের সামনে - উপস্থিত হবো আরেকটি অধরামাধুরীর আখ্যানের কাছে। 

আমরা সরাসরি মহাকবির বর্ণনায় আসি - ' তখন বসন্ত এসে গেছে। । বনে বনে অসংখ্য ফুল ফুটেছে। পলাশ , অশোক, চম্পক , নাগকেশর আরো অনেক অনেক গাছ ফুলে ভরে গেছে। কোকিল আর ভোমরা উড়ে বেড়াচ্ছে চারিদিকে। পুকুরগুলো ভরে আছে পদ্মফুলে। এ এমন একটা সময় যে সবাই কামে পাগল হয়ে যায়।' বলেছেন মহাভারতের কবি। 

ঠিক এইসময় রাজা পান্ডু ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ওই অরণ্যে। হঠাৎই তিনি দেখতে পেলেন ওই নির্জন বনের মধ্যে অতি সূক্ষ্ম বস্ত্র পরে চলেছেন তাঁর স্ত্রী। অর্থাৎ সেই পদ্মনয়না পরমাসুন্দরী মাদ্রী। পান্ডু বারবার তাকিয়ে দেখতে থাকলেন মাদ্রীকে । আর এতেই তাঁর কামনার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। তিনি পুরোপুরি ভুলে গেলেন তাঁর মাথার উপরে খাঁড়ার মতো ঝুলতে থাকা কিমিন্দম মুনির অভিশাপ -' তুমি আমাকে যেভাবে সঙ্গমের সময় হত্যা করলে , তোমার‌ও ওইরকম সুখের মুহূর্তেই মৃত্যু ঘনিয়ে আসবে।' তাই বলা যায় যে ওই 'ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়' পান্ডু তাঁর 'আপনহারা বাঁধনছেড়া প্রাণ' টিকে দান করতে এগিয়ে গেলেন । পান্ডু শেষনিঃশ্বাস ফেললেন মাদ্রীকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে।

পান্ডু মাদ্রীকে একান্তভাবে পেতে গিয়েও পেলেন না। মাদ্রীর রূপের মাধুরী পান্ডুর কাছে ধরা দিয়েও যেন অধরা রয়ে গেলো।  পান্ডুর শীতল নিষ্প্রাণ দেহটি পড়ে র‌ইলো মাদ্রীর অসংযত বসনে ঢাকা শরীরের উপর । মহাভারতের কবি সুষ্পষ্টভাবে সেই বিবরণ‌ দিলেন।‌ 

দুটি বসন্তের বর্ণনা। দুটি অরণ্যের শোভা। দুই রাজা । এবং দুটি কামমোহিত মুহূর্ত। কিন্তু এদের মধ্যে সময়ের বিরাট ব্যবধান।মহাভারতের কবি এই দুটি দীর্ঘ দূরত্বের মুহূর্তকথাকে বেঁধেছেন প্রায় একই রকম ছন্দোবন্ধনে। এবং এদের ভিতরে কি আশ্চর্য অন্তমিল। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিলো এক রাজার নিজের পরমাসুন্দরী স্ত্রীর কথা ভেবে। তাঁকে প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে না পেয়ে , 'একটুকু ছোঁয়া লাগে' ভাবতে ভাবতে নিজের মনেই নিজের ফাল্গুনী রচনা করছিলেন তিনি। প্রত্যক্ষ দৈহিক সংসর্গ না পেয়ে এই ভাবে রেতস্খলনেই তৃপ্তি পেতে হলো তাঁকে। 

দ্বিতীয় ঘটনাটিতে আরেক রাজা তাঁর নিজের অসামান্যা রূপবতী স্ত্রীকে দেখে তার সঙ্গে মিলনের চেষ্টা করতেই সেই রাজাকে স্থির হয়ে যেতে হলো চিরকালের মতো। নিজের স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গমের উপক্রমের তৃপ্তিটুকু পেয়েই মৃত্যুবরণ করতে হলো তাঁকে। 

দুটি ক্ষেত্রেই এই দুই রাজার কাছে আপন ভার্যার রূপের মাধুরী যেন ধরা দিয়েও অধরা রয়ে গেলো। প্রথম ঘটনাটিতে জন্ম হলো সত্যবতীর। রোপন হলো মহাভারতের বিশাল কাহিনীর মহাবীজটি । যা পৃথিবীর অন্যতম বিপুল মর্মান্তিক আখ্যানমালা। দ্বিতীয়টিতে মৃত্যু হলো পান্ডুরাজার । যারপর থেকেই ভারতকথা এগোতে থাকলো একের পর এক ক্লেদাক্ত ঘটনাচক্রে । 

এই দুটি ঘটনামেরু মহাভারতের কবির ছন্দোবন্ধনে ধরা দুটি অধরামাধুরীর আখ্যান হয়ে রয়ে গেলো এই বিপুল ভারতকথায় ।

' 


শৌনক ঠাকুর

এই রথে জগন্নাথদেব একাই যাত্রা করেন

শৌনক ঠাকুর 


‘রথ’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ত্রিমূর্তি —- জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা। দুই ভাই তাদের আদরের বোনকে নিয়ে মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু এমন একটি রথের কথাও জানা যায় যেখানে শুধুমাত্র জগন্নাথদেব একাই যাত্রা করেন। তার পাশে বলরাম নেই। সুভদ্রাও নেই। হ্যাঁ , বউবাজারের যদুনাথ দত্তের রথের রীতি ছিল এটাই। প্রাচীন কলকাতার ইতিহাস ঘাটলে এমন অনেক অত্যাশ্চর্য তথ্য পাওয়া যাবে। আসলে কলকাতা তো তিলোত্তমা। তার ইতিহাসে যে টুইস্ট থাকবে এ কথা বলা বাহুল্যমাত্র। অতীত তো আর ভবিষ্যতের মত মূক নয়। সে কথা বলে। তার বুকে রয়েছে কত কথা। কত কাহিনি। সেগুলি সে ব্যক্ত করতে চায়। যাইহোক মূল আলোচনায় আসা যাক। জেনে নেওয়া যাক এই যদুনাথ দত্ত কে ছিলেন?


যদুনাথ দত্ত ছিলেন একজন জমিদার। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তার রক্তে বনেদিয়ানা বহমান। সে সময় শোভাবাজারের দুর্গাপূজা ছিল খুব বিখ্যাত ছিল। জাঁকজমকপূর্ণ। কথিত আছে এই দুর্গাপুজোকে টেক্কা দেওয়ার জন্যই নাকি বউবাজারের রথযাত্রার সব আয়োজন। 

একসময় বউবাজারের প্রত্যেকটি বাড়িতে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হত। শুধু মাত্র বউবাজার থেকেই ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় গোটা তিরিশ রথ বের হত। কোনটা রুপোর, কোনওটা কাঠের ওপর লোহা দিয়ে সাজানো আবার কোনওটা পিতলের। উত্তর কলকাতার তারক প্রামানিক রোডের প্রামানিক বাড়ি পিতলের রথ বের করতে। এই কারণে এই অঞ্চলটি ‘রথপাড়া’ নামে বিখ্যাত হয়েছিল।



যাই হোক বউবাজার অঞ্চলে যদুনাথ দত্তের ঠাকুরবাড়ির এই রথযাত্রার বয়স প্রায় ১৩০ বছর। রথযাত্রার ইতিহাস বলতে গিয়ে বাড়ির এক সদস্য সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেন যে ১৩০৩ বঙ্গাব্দে এই মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত কারিগর বিভিন্ন কারুকার্যে জগন্নাথদেবের মন্দির ও সিংহাসনটি তৈরি করেছিলেন। 


 এই মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসটিও বেশ চমকপ্রদ। এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক অসাধারণ ভক্তি, গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং এক বিরল ঐতিহ্যের কাহিনি। জনশ্রুতি অনুসারে, শৈশবকাল থেকেই যদুনাথ দত্ত ছিলেন জগন্নাথদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত। পারিবারিক পরিবেশে ধর্মচর্চার মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা হলেও, জগন্নাথদেবের প্রতি তাঁর ভক্তি ছিল একান্ত ব্যক্তিগত, গভীর এবং অনন্য। প্রতিদিন নিয়মিত পূজা, জপ, ধ্যান ও আরাধনার মাধ্যমে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করেছিলেন তাঁর ইষ্টদেবতার চরণে।‌ কথিত আছে, দীর্ঘদিনের এই নিষ্ঠা ও আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে এক রাত্রে জগন্নাথদেব তাঁকে স্বপ্নে দর্শন দেন। সেই স্বপ্নে দেবতার কাছ থেকে তিনি একটি সুস্পষ্ট নির্দেশ লাভ করেন। নিজের গৃহেই তাঁর জন্য একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সেখানেই নিয়মিত সেবা ও পূজার ব্যবস্থা করতে হবে। যদুনাথ দত্ত এই স্বপ্নাদেশকে ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ ইচ্ছা হিসেবে গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি নিজের বাসভবনেই জগন্নাথদেবের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই মন্দিরে নিত্যসেবার সূচনা করেন। সেই ধারাবাহিকতা আজও এই মন্দিরের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য হিসেবে বহমান।


যদুবাবুর রথের অনুষ্ঠানটি সাতদিন ধরে চলত। বিভিন্ন সাজে সজ্জিত করা হত প্রভুকে। এক এক দিন এক এক ধরণের পোশাক। তবে প্রথম দিন তাঁকে পরানো হয় পদ্মপোশাক। আর উল্টো রথের দিন রাজবেশ। স্নানযাত্রার পরে প্রভু অসুস্থ হন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। রথের আগের দিন তিনি নবযৌবন লাভ করেন। রৌপ্য সিংহাসনে বসিয়ে পূজা অর্চনা করা হয়। তারপর রথের দিনে শুরু হয় প্রভুর যাত্রা। আগে নহরৎ বসানো হত। সঙ্গে থাকত ঢাক ঢোল সানাইসহ বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র। উল্টো রথের দিনেও একই রকম। 


রথ মানেই মেলা। ভিড়। এবার প্রশ্ন হচ্ছে কেন রথে লোকের এত ভিড় হয়? তার কারণ, ‘রথে চ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’ অর্থাৎ রথের এমনই মাহাত্ম্য যে রথে স্থিত দেব দর্শন করলে আর পুনর্জন্ম হয় না। তবে রথ বলতে আমরা আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়াতে অনুষ্ঠিত জগন্নাথ দেবের রথযাত্রাকেই বোঝানো হয়। জনসমাগমের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে ছিল না যদুবাবুর রথ। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন এই রথ দেখতে আসত। শুধু এই রথ নয়, সেকালে কলকাতায় রথের দিনে রাস্তায় খুবই ভিড় হত। যাতায়াত করা মুশকিল হয়ে পড়ত। অতুলবাবু জানিয়েছেন , “সেই যুগে কলকাতার রথে এত ভিড় হত যে ১৮৩৪ সালে ‘মাঝের রাস্তা’ দিয়ে রথ নিয়ে যাওয়া পুলিশ কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছিল।” (৩০০ বছরের কলকাতা : পটভূমি ও ইতিকথা: ডঃ অতুল সুর)। তবে বর্তমানে দত্ত পরিবারে রথের অনুষ্ঠানে জাঁকজমক কিছুটা কম হলেও ভক্তিতে কিন্তু ভাঁটা পড়েনি। বাড়ির প্রত্যেকটি সদস্য এই সাতদিন একসঙ্গে থাকেন। একসাথেই চলে খাওয়া দাওয়া।


এই রথ কেবল কাঠ, চাকা ও অলংকরণের সমষ্টি মাত্র ছিল না। সে সময়ের নন্দনতত্ত্ব, ভক্তিরস এবং শিল্পচেতনার এক জীবন্ত প্রতীক ছিল। রথের প্রতিটি খোদাই, প্রতিটি কারুকাজ এবং প্রতিটি নকশার রেখায় যেন লুকিয়ে ছিল শিল্পীর নিষ্ঠা, ধর্মীয় অনুভব এবং সৌন্দর্যসন্ধানী মানবমনের এক অনন্য প্রকাশ। এই রথের অভিনবত্ব শুধু তার বাহ্যিক রূপে সীমাবদ্ধ ছিল না , বরং তার প্রতিটি অলংকরণ যেন ঘোষণা করত ঈশ্বরের আরাধনা। ভক্তির উৎকর্ষতা। 


রথে অধিষ্ঠিত প্রভু জগন্নাথের স্বর্ণমুকুটে শোভা পেত মূল্যবান রত্নরাজি। যার দীপ্তি কেবল ঐশ্বর্যের পরিচয় বহন করত না বরং তা মানুষের বিশ্বাসে ছিল চৈতন্যের আলোকপ্রভা। জড়-চেতন, পার্থিব-অপার্থিবের মধ্যে এক অলীক সেতুবন্ধন রচনা করত। তাঁর গলায় স্বর্ণহার, মুক্তার মালা এবং নানাবিধ অলংকারের সমাবেশ যেন এই উপলব্ধিকেই দৃশ্যমান করে তুলত যে, পরম সত্তাকে মানুষ তার কল্পনার সর্বোচ্চ সৌন্দর্যে অলংকৃত করতে চায়। ভক্তির প্রকৃত স্বরূপ বস্তুগত ঐশ্বর্যে নয়, বরং উৎসর্গের আন্তরিকতায়, অলংকারের আলংকারিত্বে।


প্রভুর ভোগের আয়োজনও ছিল অনন্য ও রাজকীয়। অন্নের পরিবর্তে নিবেদন করা হত লুচি, রাবড়ি, বিভিন্ন প্রকার ভাজা, পায়েস এবং নানাবিধ মিষ্টান্ন। এই নিবেদনকে কেবল খাদ্যসম্ভার হিসেবে দেখলে তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অধরা থেকে যায়। ভারতীয় ভক্তি-দর্শনে দেবতার ভোগ আসলে মানুষের আত্মসমর্পণের প্রতীক। খাদ্যের স্বাদ অপেক্ষা নিবেদনের অনুভূতিই অধিক মূল্যবান। মানুষ তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন, প্রিয়তম সম্পদ এবং পরম আনন্দকে ঈশ্বরের চরণে অর্পণ করে এই বিশ্বাসে যে, উৎসর্গের মধ্য দিয়েই জাগতিক ভোগ আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তিতে রূপান্তরিত হয়।


এই রথযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ হল এই জগন্নাথদেব মাসির বাড়ি যেতেন না। তার বদলে পাড়ার প্রত্যেকটি বাড়িতে জল গ্রহণ করেন। ওই এলাকার প্রায় প্রত্যেকটি বাড়ির সদস্যরা জগন্নাথদেবকে আগে নিমন্ত্রণ করে আসতেন। তারপর উল্টোরথের দিন মিষ্টান্ন ভোগ সাজিয়ে এই রথের জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। একে বলা হয় ‘দ্বারে ভোগ’ বা ‘দ্বারভোগ’। এই রীতি আজও রয়েছে।


অপরূপ কারুকার্য, দেবমূর্তির ঐশ্বর্যমণ্ডিত অলংকরণ এবং রাজকীয় ভোগের আয়োজন এসবই কেবল এক ধর্মীয় উৎসবের বহিরঙ্গ নয়, এগুলো এক সমগ্র সাংস্কৃতিক দর্শনের বহিঃপ্রকাশ। এভাবেই আভিজাত্যের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এবং অবশ্যই ব্যতিক্রমী এই যদুনাথ দত্তের রথ। অতীতের গৌরবকে নিয়ে , বর্তমানকে সাক্ষী রেখে, ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে এ রথের চাকা আজও বহমান। কবি অজিত দাসের কবিতা দিয়েই শেষ করা যাক —-

“হারানো কাহিনী যত, ডুবে যাওয়া কথা /

সব রশ্মি ধরা দেয় হাসি কান্না ব্যথা

কভুও কেউ বা যদি ভুলতে চায় মোরে।” 

( কবিতা : ‘ইতিহাস কথা বলে’)



       …………………………..


 গ্রন্থঋণ 

১. কলিকাতা কাহিনী : সুকুমার সেন 

২. “৩০০ বছরের কলকাতা : পটভূমি ও ইতিকথা: ডঃ অতুল সুর

৩. আনন্দবাজার পত্রিকার বিভিন্ন রিপোর্ট 

৪. কলিকাতার ইতিবৃত্ত : প্রাণকৃষ্ণ দত্ত 

৫. আভিজাত্যে ব্যতিক্রমী কলকাতার বনেদি বাড়ির রথযাত্রা :

আনন্দবাজার পত্রিকা

ডঃ সোমালি চৌধুরী

বাংলার নবজাগরণ ও ভারতীয় আত্মপরিচয় পুনর্গঠন 

ডঃ সোমালি চৌধুরী 


বাংলার নবজাগরণ ছিল ১৯ শতকের শুরু থেকে ২০ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত বাংলায় সংঘটিত এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক জাগরণ। এর প্রভাবে শিক্ষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজ সংস্কার এবং জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। ইউরোপীয় রেনেসাঁর মত এটি কেবল শিল্প-সাহিত্যের আন্দোলন ছিল না; বরং বহুমাত্রিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়,শিক্ষাগত ও বৌদ্ধিক পরিবর্তনের যুগকে বোঝায়। নবজাগরণ ভারতীয় আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯ শতকে  ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে ভারতীয়দের নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবা শুরু হয়।একদিকে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ,অন্যদিকে ভারতীয় সভ্যতার মূল্যবান দিকগুলোর পুনর্মূল্যায়ন - এই দুই প্রবণতার সমন্বয়েই ভারতীয় আত্মপরিচয়ের নতুন রূপ গড়ে ওঠে।

আত্মপরিচয় পুনর্গঠন বলতে বোঝায়,একটি জাতি তার ইতিহাস, ধর্ম, ভাষা ও মূল্যবোধকে নতুন দৃষ্টিতে বিচার করে নিজের পরিচয়কে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা। ঔপনিবেশিক যুগেব্রিটিশ শাসকেরা ভারতীয় সমাজকে অনেক ক্ষেত্রে ‘ পিছিয়ে পড়া’বা ‘অসভ্য’হিসেবে উপস্থাপন করত। এর প্রতিক্রিয়ায় বাঙালি শিক্ষিত সমাজ প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে ভারতীয় সভ্যতারও গভীর জ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য রয়েছে। 

নবজাগরণের প্রধান পর্যায় –

প্রথম পর্যায় (১৮১৫-১৮৩৩) 

*রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার 

*সতীদাহ প্রথা বিলোপের আন্দোলন

*একেশ্বরবাদ ও যুক্তিবাদী চিন্তার প্রচার

দ্বিতীয় পর্যায় (১৮৩৩-১৮৫৭) 

*হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও এবং ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর উত্থান

*স্বাধীন চিন্তা, যুক্তিবাদ ও সামাজিক প্রশ্ন তোলার প্রবণতা বৃদ্ধি 

তৃতীয় পর্যায় (১৮৫৭-১৯১৫) 

*ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়,স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখের নেতৃত্বে সাহিত্য, বিজ্ঞান,শিক্ষা ও জাতীয়তাবাদের বিকাশ 

বাংলার নবজাগরণের প্রধান ব্যক্তিত্ব এবং তাদের অবদান-

*রাজা রামমোহন রায়

নবজাগরণের জনক হিসেবে পরিচিত।

সতীদাহ প্রথা বিলোপের নেতৃত্ব দেন।

নারী অধিকার ও ধর্মীয় সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।

*ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 

বিধবা বিবাহ প্রচলনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন ।

বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেন ।

নারীশিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন।

বাংলা গদ্যকে সহজ ও প্রাঞ্জল রূপ দেন।

*বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 

আধুনিক বাংলা উপন্যাসের পথিকৃৎ।

বন্দেমাতরম রচনা করেন যা জাতীয়তাবাদকে অনুপ্রাণিত করে ।

*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

সাহিত্য, সংগীত, শিক্ষা ও দর্শন বিশ্বমানে অবদান রাখেন।

১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ।

বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন ।

*জগদীশচন্দ্র বসু 

উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা নিয়ে গবেষণা করেন ।

বেতার যোগাযোগ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান ।

*আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় 

আধুনিক রসায়ন গবেষণার পথিকৃৎ ।

দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন ।

*স্বামী বিবেকানন্দ

মানবসেবা ও আত্মশক্তির প্রচার করেন ।

যুব সমাজকে আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় চেতনার শিক্ষা দেন।

নবজাগরণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি শক্তিশালী করে।এর ফলে -

*স্বাধীনতার আকাঙ্খা বৃদ্ধি পায় 

*জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা হয় 

*দেশীয় শিল্প ও স্বদেশী আন্দোলন শক্তিশালী হয় 

*সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দেশপ্রেমের উত্থান ঘটে

নবজাগরণের পটভূমি:-

বাংলার নবজাগরণের পেছনে কয়েকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল-

*ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের ফলে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিজ্ঞান, দর্শন ও আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রবেশ করে। যদিও ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ মূলক ছিল তবুও এর মাধ্যমে নতুন জ্ঞান ও চিন্তার প্রসার ঘটে। 

*আধুনিক শিক্ষার বিস্তার- ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষা, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও দর্শনের চর্চা শুরু হয়। তখন থেকেই নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে ওঠে। 

*মুদ্রণযন্ত্র ও সংবাদপত্র- বাংলা সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের প্রসার সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন চিন্তা, মতবিনিময় এবং সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করে। 

*ইউরোপীয় আলোকায়নের প্রভাব- Age of enlightenment -এর যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও ব্যক্তি স্বাধীনতার ধারণা বাঙালি শিক্ষিত সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

বাংলার নবজাগরণে ভারতীয় আত্মপরিচয় পুনর্গঠন এর উপায়-

অতীত ঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়ন –

রাজা রামমোহন রায় প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগ্রন্থ বিশেষত উপনিষদের একেশ্বরবাদী ও যুক্তি নির্ভর ভাবধারাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে ভারতীয় দর্শন আধুনিক যুক্ত সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

আধুনিক শিক্ষা ও যুক্তিবাদের বিকাশ –

হিন্দু কলেজের মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান,দর্শন ও ইতিহাসের শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ভারতীয়রা নিজেদের সমাজকে সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করতে শেখে এবং একইসঙ্গে নতুন আত্মবিশ্বাস অর্জন করে। 

সমাজ সংস্কার ও নতুন সমাজ চেতনা –

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ,নারী শিক্ষা ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে সমাজের সংস্কার ভারতীয় ঐতিহ্যের বিরোধী নয়; বরং মানবিক মূল্যবোধেরই একটি অংশ। 

জাতীয়তাবাদের উত্থান – 

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্য,বিশেষ করে বন্দেমাতরম – এর মধ্য দিয়ে মাতৃভূমিকে এক পবিত্র সত্তা হিসেবে কল্পনা করে জাতীয় পরিচয় কে শক্তিশালী করেন। সাহিত্য সাধনার আকাঙ্খা কে, সাংস্কৃতিক ভিত্তি দেন। 

ধর্মের নতুন ব্যাখ্যা –

স্বামী বিবেকানন্দ ভারতীয় আধ্যাত্মিকতাকে দুর্বলতার নয়, শক্তির উৎস হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আত্মবিশ্বাস, মানব সেবা ও কর্মই প্রকৃত ধর্ম। এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি পায়। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং স্বামী বিবেকানন্দ ভারতীয় আত্মপরিচয়কে আধ্যাত্মিক মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন রূপ দেন।।

সাহিত্য ও সংস্কৃতির নবধারা –

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বমানবতার সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর রচনায় জাতীয়তাবাদ থাকলেও তা সংকীর্ণ নয়; তিনি মানবিক ও উদার আত্মপরিচয়ের ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর প্রবন্ধ ‘জাতীয়তাবাদ’এবং ‘সভ্যতার সংকট’এই বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার নবজাগরণের ফলে ভারতীয়দের মধ্যে আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। আধুনিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি গড়ে ওঠে এবং সামাজিক সংস্কারের পথ উন্মুক্ত হয়। নবজাগরণের ফলে যেমন  বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিক্ষার প্রসার ঘটে,তেমনই স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শিকভিত্তি শক্তিশালী হয়। আধুনিক ইতিহাসবিদদের এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত লক্ষ্য করা যায়। অনেকে মনে করেন বাংলার নবজাগরণ ছিল ভারতের আধুনিকতার সূচনা; আবার অনেকে মনে করতেন এর প্রভাব সামাজিকভাবে সীমিত ছিল এবং এটি মূলত:ছিল শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজের আন্দোলন। সুমিত সরকার মনে করতেন নবজাগরণ মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আন্দোলন ছিল এবং এর প্রভাব গ্রামীণ সমাজে নিম্নবর্গ ও কৃষক সমাজের প্রতিনিধিত্বে সীমিত ছিল। মুসলিম সমাজের অংশগ্রহণ প্রাথমিক পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। নারী অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও সম্পূর্ণ সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে অনেকে দাবি করেন। অনেকে আবার মনে করেন,ইতালির ফ্লোরেন্স নগরী, ইউরোপের নবজাগরণের যে ভূমিকা পালন করেছিল কলকাতা তা করতে পারেনি। অন্যদিকে পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন যে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের মধ্যেও ভারতীয়রা একটি স্বাধীন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র গড়ে তুলেছিলেন যা রাজনৈতিক স্বাধীনতার পূর্ব শর্ত হিসেবে কাজ করেছে।তবু অধিকাংশ গবেষক অনেকাংশেই একমত ছিল এই বিষয়ে যে এই সময়ে ভারতীয়দের মধ্যে নিজেদের ইতিহাস,সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবনা শুরু হয়,যা পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনের বৌদ্ধিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।

বাংলার নবজাগরণ ভারতীয় আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনের ইতিহাসে এক মৌলিক অধ্যায়। এটি কেবল অতীতের পুনরাবিষ্কার নয়; বরং ঐতিহ্য,আধুনিকতা, যুক্তিবাদ, ধর্ম, মানবতাবাদ এবং জাতীয়তাবাদের সুজনশীল সমন্বয়। এই নবজাগরণ থেকেই এমন এক ভারতীয় পরিচয়ের জন্ম হয় যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের বৌদ্ধিক ভিত্তি গঠন করে এবং আধুনিক ভারতের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এই ধারার উত্তরসূরী হিসেবে অরবিন্দ ঘোষ, বিপিনচন্দ্র পাল এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মতো ব্যক্তিত্বরা ভারতীয় সংস্কৃতিক আত্মপরিচয়,শিক্ষা এবং জাতীয় চেতনাকে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করেন।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতীয় সমাজে গভীর পরিবর্তন আসে। ইংরেজ শিক্ষাব্যবস্থা, আইন, প্রশাসন এবং খ্রিস্টান মিশনারীদের কার্যকলাপ ভারতীয় সমাজকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পাশ্চাত্যের বহু লেখক ভারতীয় সভ্যতাকে স্হবির,,কুসংস্কারাচ্ছন্ন অনুন্নত হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে শিক্ষিত ভারতীয়দের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে -ভারতীয় হওয়ার অর্থ কি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নবজাগরণের সূচনা। ভারতীয় মনীষীরা, একদিকে পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানকে গ্রহণ করেন,অন্যদিকে ভারতীয় ঐতিহ্যের মূল্য পুনরাবিষ্কার করেন। এই দ্বৈত প্রক্রিয়ায় আধুনিক ভারতীয় আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করে। 

বাংলার নবজাগরণ ভারতীয় আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের ইতিহাসে এক মৌলিক অধ্যায়। এই নবজাগরণ থেকেই এমন এক ভারতীয় পরিচয় এর জন্ম হয় যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের ভৌতিক ভিত্তি গঠন করে এবং আধুনিক ভারতের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

তথ্যসূত্রঃ 

বাংলার নবজাগরণ - সুশোভন সরকার 

বাংলার রেনেসাঁ: স্বরূপ ও অনুসন্ধান - অমলেশ ত্রিপাঠী 

A critic of colonial India - Sumit Sarkar

Bengal Renaissance and other essays - Krishna Kumar Dutta

ডাঃ অনির্বাণ কুণ্ডু

পরিদর্শক 

ডাঃ অনির্বাণ কুণ্ডু 


মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে তাকিয়েছিল, তখন সে নক্ষত্র দেখেছিল; কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে, আমরা শুধু নক্ষত্র দেখি না....আমরা বাস্তবতাকেও নির্মাণ করি। এই ধারণার সবচেয়ে রহস্যময় উৎস Quantum Mechanics। সেখানে বস্তু কখনও কণা, কখনও তরঙ্গ; কখনও অস্তিত্ব নির্দিষ্ট, কখনও সম্ভাবনার অসীম সমুদ্র। আর এই রহস্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে একটি শব্দ- “observer”।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো কণাকে পর্যবেক্ষণ করার আগে সেটি নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকে না। ইলেকট্রন একই সঙ্গে বহু সম্ভাব্য অবস্থায় থাকে, যাকে বলা হয় superposition। কিন্তু যখন একটি পর্যবেক্ষণ ঘটে, তখন সেই অস্পষ্ট সম্ভাবনা ভেঙে একটি নির্দিষ্ট বাস্তবতায় পরিণত হয়। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ যেন বিশৃঙ্খলা থেকে বাস্তবকে জন্ম দেয়।

এই ধারণা থেকেই একটি বিস্ময়কর দার্শনিক প্রশ্ন উঠে আসে। তাহলে কি মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য observer অপরিহার্য? যদি কোনো সচেতন সত্তা না থাকে, তবে কি বাস্তবতা কেবল সম্ভাবনার কুয়াশা হয়ে থাকবে? আর যদি observer-ই wave form-কে particulate form-এ রূপান্তরিত করে, তবে কি জীবনের মূল উদ্দেশ্যই হল মহাবিশ্বকে “বাস্তব” করে তোলা?

এই ভাবনাটি বিজ্ঞান, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রাচীন ভারতীয় দর্শনেও বাস্তবতাকে অনেক সময় “মায়া” বলা হয়েছে। উপনিষদে বারবার বলা হয়েছে, জগৎ একটি চেতনার প্রকাশমাত্র। আবার পাশ্চাত্য দার্শনিক George Berkeley বলেছিলেন, “To be is to be perceived.” অর্থাৎ কোনো কিছুর অস্তিত্ব তখনই অর্থপূর্ণ, যখন সেটি অনুভূত বা পর্যবেক্ষিত হয়।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব যেন এই প্রাচীন ধারণাগুলিকে নতুন বৈজ্ঞানিক ভাষা দিয়েছে।

ধরা যাক, কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না। তখন পাহাড় ছিল, সমুদ্র ছিল, বজ্রপাত ছিল....কিন্তু “অভিজ্ঞতা” ছিল না। একটি সূর্যাস্ত ঘটত, কিন্তু কেউ তা দেখত না। একটি ফুল ফুটত, কিন্তু কেউ তার রং অনুভব করত না। সেই বাস্তবতা ছিল নিঃশব্দ, অচেতন, যেন সম্ভাবনার এক অন্তহীন প্রবাহ।

তারপর একদিন জীবনের উদ্ভব হল। এককোষী প্রাণী থেকে ধীরে ধীরে জটিল স্নায়ুতন্ত্র, চোখ, মস্তিষ্ক, চেতনা তৈরি হল। মহাবিশ্ব প্রথমবার নিজেকে দেখতে শুরু করল। মানুষের চোখ দিয়ে প্রকৃতি নিজেকে দেখল; মানুষের মস্তিষ্ক দিয়ে মহাবিশ্ব নিজেকে চিনল।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, জীবন কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং মহাবিশ্বের আত্মসচেতন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া।

একটি গাছ সূর্যের দিকে মুখ তোলে। একটি পাখি আকাশ চিনতে শেখে। একজন কবি চাঁদের দিকে তাকিয়ে প্রেমের কবিতা লেখে। একজন পদার্থবিজ্ঞানী ইলেকট্রনের সমীকরণ আবিষ্কার করে। এই সমস্ত কাজের মধ্যে যেন মহাবিশ্ব নিজেকে নির্দিষ্ট করছে, wave থেকে particle-এ নামিয়ে আনছে।

মানুষ তখন শুধু একটি প্রাণী নয়; সে reality generator।

এই ধারণা আরও গভীর হয় যখন আমরা Double-slit Experiment-এর কথা ভাবি। সেখানে দেখা যায়, পর্যবেক্ষণ না করলে কণা তরঙ্গের মতো আচরণ করে; কিন্তু পর্যবেক্ষণ করলেই তা নির্দিষ্ট কণায় পরিণত হয়। যেন প্রকৃতি observer-এর উপস্থিতি বুঝতে পারে।

তাহলে কি চেতনা মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান?

Eugene Wigner একসময় বিশ্বাস করতেন, মানুষের consciousness-ই wave function collapse ঘটায়। যদিও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক বিজ্ঞানী এই মতের সঙ্গে একমত নন, তবু প্রশ্নটি এখনও পুরোপুরি মরে যায়নি। কারণ quantum mechanics এখনো সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাত নয়।

Wigner’s Friend হল কোয়ান্টাম বলবিদ্যার একটি অত্যন্ত বিখ্যাত ও জটিল চিন্তা-পরীক্ষা, যা ১৯৬১ সালে হাঙ্গেরীয়-মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী Eugene Wigner প্রস্তাব করেন। এই চিন্তা-পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল কোয়ান্টাম জগতের পর্যবেক্ষণ, বাস্তবতা এবং চেতনার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় একটি কণার অবস্থা পর্যবেক্ষণের আগে নির্দিষ্ট থাকে না; বরং সেটি একাধিক সম্ভাব্য অবস্থার “superposition”-এ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ইলেকট্রন একই সঙ্গে দুই স্থানে থাকার সম্ভাবনা বহন করতে পারে। কিন্তু যখন কেউ সেটিকে পরিমাপ করে, তখন সেই সম্ভাবনাগুলির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া যায়। এই ঘটনাকে বলা হয় “wave function collapse”।

Wigner এই ধারণাটিকে আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করার জন্য একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি কল্পনা করেন। ধরা যাক, একটি বন্ধ পরীক্ষাগারে Wigner-এর এক বন্ধু একটি কোয়ান্টাম পরীক্ষা করছেন। বন্ধুটি একটি কণার অবস্থা মাপলেন এবং একটি নির্দিষ্ট ফল পেলেন। বন্ধুর দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষাটি শেষ হয়ে গেছে; কণার অবস্থা নির্ধারিত হয়েছে।

কিন্তু পরীক্ষাগারের বাইরে থাকা Wigner এখনও জানেন না ভেতরে কী ফল পাওয়া গেছে। তাই তাঁর কাছে পুরো পরীক্ষাগার (বন্ধুসহ ) এখনও superposition অবস্থায় আছে। অর্থাৎ Wigner-এর দৃষ্টিতে তাঁর বন্ধু একই সঙ্গে দুটি সম্ভাব্য ফলাফল দেখছেন! এখানেই সমস্যার সূত্রপাত।

তাহলে, বাস্তবতা আসলে কোনটি? বন্ধুর দেখা ফলাফল, নাকি Wigner-এর মতে এখনও অনির্ধারিত অবস্থা? যদি উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই সত্য হয়, তবে কি বাস্তবতা পর্যবেক্ষক-নির্ভর? এই চিন্তা-পরীক্ষা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মৌলিক ব্যাখ্যাগুলিকে চ্যালেঞ্জ করে।

এই পরীক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল চেতনার ভূমিকা। Wigner প্রথমদিকে মনে করতেন, মানুষের সচেতন মনই wave function collapse ঘটায়। অর্থাৎ কোনো সচেতন পর্যবেক্ষক না থাকলে বাস্তবতা নির্দিষ্ট হয় না। যদিও পরে তিনি এই মত থেকে কিছুটা সরে আসেন, তবু তাঁর চিন্তা-পরীক্ষা বিজ্ঞান ও দর্শনের সংযোগস্থলে এক বিশাল বিতর্ক সৃষ্টি করে।

২০১৯ সালে কিছু বাস্তব পরীক্ষাও করা হয়েছিল, যেখানে Wigner’s Friend ধারণার সীমিত সংস্করণ ব্যবহার করে দেখানো হয় যে ভিন্ন পর্যবেক্ষকের কাছে ভিন্ন “বাস্তবতা” থাকতে পারে। যদিও এই ফলাফল নিয়ে এখনও বিতর্ক আছে, তবু এটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের রহস্যকে আরও গভীর করেছে।

সারকথা, Wigner’s Friend শুধু একটি পদার্থবিজ্ঞানের চিন্তা-পরীক্ষা নয়; এটি মানুষের জ্ঞান, চেতনা এবং বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন। এই ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মহাবিশ্ব হয়তো আমাদের সাধারণ বোধের চেয়ে অনেক বেশি অদ্ভুত ও রহস্যময়।

কেউ বলেন, observer মানেই সচেতন প্রাণ নয়; যেকোনো interaction-ই measurement ঘটাতে পারে। আবার কেউ বলেন, চেতনা ছাড়া “অভিজ্ঞ বাস্তবতা” অর্থহীন। একটি পাথর আর একটি মানুষের মধ্যে পার্থক্য হল—মানুষ বাস্তবতাকে অনুভব করতে পারে।

এই অনুভবই হয়তো অস্তিত্বের প্রকৃত কেন্দ্র।

যদি এই ধারণা সত্য হয়, তবে জীবনের উদ্দেশ্য অর্থ, ক্ষমতা, সভ্যতা বা প্রযুক্তি নয়। জীবনের উদ্দেশ্য হল মহাবিশ্বকে উপলব্ধি করা। প্রতিটি চোখ, প্রতিটি মস্তিষ্ক, প্রতিটি চেতনা যেন অসীম সম্ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবতার একটি রূপ নির্বাচন করছে।

একজন শিল্পী যখন ছবি আঁকেন, তিনি শুধু রং ব্যবহার করেন না; তিনি সম্ভাবনা থেকে একটি নির্দিষ্ট দৃশ্যকে বাস্তবে নিয়ে আসেন। একজন প্রেমিক যখন প্রিয়জনের মুখের দিকে তাকায়, তখন সেই মুহূর্ত আর নিছক পরমাণুর বিন্যাস থাকে না; তা হয়ে ওঠে অর্থপূর্ণ বাস্তবতা। একটি শিশুর প্রথমবার বৃষ্টি দেখা, একজন বৃদ্ধের শেষ সূর্যাস্ত দেখা, এই সব অভিজ্ঞতা মহাবিশ্বকে নির্জীব পদার্থ থেকে জীবন্ত বাস্তবতায় রূপ দেয়।

তাহলে কি পৃথিবীতে প্রাণের উদ্দেশ্য কেবল observer হওয়া?

এই ধারণার একটি গভীর অস্তিত্ববাদী দিকও আছে। যদি observer না থাকে, তবে “সৌন্দর্য” বলে কিছু নেই। একটি গ্যালাক্সি সুন্দর কারণ কেউ তাকে সুন্দর বলে অনুভব করে। সঙ্গীত অর্থপূর্ণ কারণ কেউ তা শোনে। প্রেম বাস্তব কারণ কেউ তা অনুভব করে। চেতনা ছাড়া universe একটি নীরব গাণিতিক কাঠামো মাত্র।

অর্থাৎ জীবন মহাবিশ্বকে অর্থ দেয়।

এখানে একটি বিপজ্জনক প্রশ্নও আসে, মানুষ কি তবে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে? আধুনিক বিজ্ঞান সাধারণত anthropocentric ধারণা এড়িয়ে চলে। পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, মানুষও নয়। কিন্তু consciousness হয়তো একটি বিশেষ ঘটনা। কারণ মহাবিশ্বে যতদূর জানা গেছে, একমাত্র জীবিত চেতনাই নিজ অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

একটি নক্ষত্র জ্বলে, কিন্তু সে জানে না যে সে জ্বলছে। মানুষ জানে।

এই “জানা” হয়তো cosmic evolution-এর সর্বোচ্চ ধাপ।

তবে এই দর্শনের সমালোচনাও আছে। অনেক পদার্থবিদ বলেন, quantum mechanics-কে অতিরিক্ত দার্শনিক করে দেখা ভুল। wave function collapse-এর জন্য সচেতন observer জরুরি, এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। decoherence theory অনুযায়ী পরিবেশের সঙ্গেই interaction যথেষ্ট। অর্থাৎ মানুষ না থাকলেও বাস্তবতা নির্দিষ্ট হতে পারে।

কিন্তু তবুও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। যদি কোনো বাস্তবতাকে অনুভব করার কেউ না থাকে, তবে সেই বাস্তবতার অর্থ কী?

সম্ভবত মহাবিশ্বের সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় পদার্থ নয়, চেতনা। কারণ চেতনার মাধ্যমেই universe নিজেকে প্রত্যক্ষ করে। আমরা তার ক্ষুদ্র অংশ হয়েও তার আয়না। মানুষের চোখে যে আকাশ প্রতিফলিত হয়, সেটাই হয়তো cosmos-এর আত্মদর্শন।

তাই পৃথিবীতে প্রাণের উদ্দেশ্য হয়তো কেবল বেঁচে থাকা নয়; বরং দেখা, অনুভব করা, প্রশ্ন করা এবং বাস্তবতাকে নির্দিষ্ট করা। observer ছাড়া universe হয়তো সম্ভাবনার অনন্ত সাগর। আর জীবনের কাজ সেই সম্ভাবনার ভিতর থেকে একেকটি বাস্তব মুহূর্তকে জন্ম দেওয়া।

পড়তে থাকুন

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী
কবিতার পাতা - ১কবিতার পাতা - ২গল্পরম্য রচনাধারাবাহিক উপন্যাস বিবিধ
  • প্রথম পাতা
  • Privacy Policy
  • Terms and Conditions

আক্ষরিক

82748 38787

Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.

Powered by GoDaddy

This website uses cookies.

We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.

Accept