আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
রম্য রচনা
ধারাবাহিক উপন্যাস
প্রবন্ধ
Privacy Policy
আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
রম্য রচনা
ধারাবাহিক উপন্যাস
প্রবন্ধ
Privacy Policy
More
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • রম্য রচনা
  • ধারাবাহিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • Privacy Policy
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • রম্য রচনা
  • ধারাবাহিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • Privacy Policy

প্রবন্ধ

তরুণ চট্টোপাধ্যায়।

ক্ষুদিরাম জন্মস্থান বিতর্ক।

তরুণ চট্টোপাধ্যায়।


ডিসেম্বর মাস বিপ্লবী ক্ষুদিরামের জন্মমাস। 1889 সালের 3 রা ডিসেম্বর ক্ষুদিরামের বসুর জন্ম। সে কথা সকলের জানা।কিন্তু জন্মস্থান ,সে বিতর্ক আজও যে রহে গেছে।আজও পরিস্কার করে জানা যায় নি শহীদ ক্ষুদিরামের জন্ম স্থান ঠিক কোথায় ছিল।

হবিবপুর সে কথা সকলের ই জানা।আর তা নিয়ে মতান্তর সকলে করেন না।কিন্তু কলাগ্রাম ও মোহবনীর নামটিও তো এসেছে বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরামের জন্মস্থানের ভাগীদার হিসাবে।ফলে নানা বিতর্কের দানা বেঁধেছে।হবিবপুর,মোহবনী ও কলাগ্রামের মানুষ সকলেই দাবি করছেন ক্ষুদিরামের জন্ম তাঁদের গ্রামে।ফলে প্রতিদিনই নানা তথ্য উঠে আসছে।থাক সে সাতকাহন।বিশদে পরে আলোচনা করা যাবে।

ক্ষুদিরাম বসুর বাবা ছিলেন তৈলোক্য নাথ বসু।মা লক্ষী প্রিয়া দেবী।মেদিনীপুর টাউনের হবিবপুরে তিনি বসবাস করতেন।আর সেখানেই জন্ম ক্ষুদিরামের। সিদেশ্বরী কালীমন্দিরে পাশেই তাঁদের মাটির বাড়ি। অপরুপা দেবী ক্ষুদিরামের দিদি।তিনি তাঁকে মাতৃস্নেহে মানুষ করেন।

সেই দিদির বক্তব্য ছিল,ছিয়ানব্বই সালের 19 শে অগ্রহায়ণ  মঙ্গলবার সন্ধ্যা পাঁচটা নাগাদ ক্ষুদিরামের জন্ম হলো হবিবপুরের বাড়িতে।আগে পর পর দুই ভাই মারা গিয়েছে। তাই সেদিন সংসারে আনন্দের বন্যা।আমারা তিন বোন এরি মাঝে ভাই এর জন্ম। আনন্দ তো স্বাভাবিক ঘটনা।নবজাতক ভাইটিকে মার কাছ থেকে কিনে নিলাম তিন মুঠো খুদ দিয়ে। সে সময় সংস্কার ছিল এই খুদ দিয়ে কিনে নেওয়ার। মা ছেলের ওপর সমস্ত লৌকিক অধিকার ত্যাগ করে খুদের বিনিময়ে বিক্রি করে দিলেন।এতে করে ক্ষুদিরামের পরমায়ু বৃদ্ধি হবে এই ছিল বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসে মা বিক্রীর ভান করলেন কোলের শিশুটিকে।ছেলে তো বাঁচুক দিদির কোলে।

ক্ষুদিরামের বাবার জন্মস্থান ছিল মোহবনী।সেই গ্রাম ছেড়ে তৈলোক্য নাথ চলে আসেন মেদিনীপুর শহরে।তিনি কাজ করতেন নাড়াজোল রাজার কাছারীতে।তিনি ছিলেন তহশীলদার।মোহবনীতে থাকতেন বিধবা মা।সেখানে তিনি ভূসম্পত্তির দেখাশোনা করতেন।

ক্ষুদিরামের মা লক্ষীপ্রীয়া দেবীর বাপের বাড়ি ছিল কলাগ্রাম। মোহবনী ও কলাগ্রাম দুটি জায়গাই ছিল কেশপুর থানার অধীনে।একটি ক্ষুদিরামের পিতৃভূমি অপরটি মাতৃভূমি। আর তাই ধরে নেওয়া হলো যেহেতু হবিবপুরে দুই পুত্র সন্তানের মৃত্যু হয়েছে তাই লক্ষীপ্রীয়া দেবী চাননি হবিবপুরে থাকতে।ফলে তিনি নয় মোহবনী নতুবা কলাগ্রাম চলে যান ক্ষুদিরামের জন্ম কালে।যাতে করে পুরানো বিপদ আর না আসে।যদিও ক্ষুদিরামের দিদি অপরুপা দেবী বলেছিলেন ভাই ক্ষুদিরামের জন্ম হবিবপুরেই।

বছর কুড়ি আগে ক্ষুদিরামের জন্মস্থান বিতর্ক নিয়ে কথা বলেছিলাম, মেদিনীপুর শহরের দেশবন্ধু নগরের অপরুপা দেবীর নাতি পূর্ণ চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। এদিন সন্ধ্যায় ঠাকুরমা অপরুপা দেবীর প্রসঙ্গে কথা বলার সময় তিনি নস্টালজিয়ায় ডুবে গেলেন।ঠাকুরমা অপরুপা দেবী বার বার ক্ষুদিরামের জন্য চোখের জল ফেলতেন তা তিনি নিজেই দেখেছেন। নানা স্মৃতি ভাসছিল সেদিন ও তাঁর চোখে।কাজী নজরুল ইসলাম বঙ্গ সাহিত্য সন্মেলনে এসে হবিবপুরে ক্ষুদিরামের জন্মস্থানের মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন পূন্য মাটি জেনে।সে কথাও বাদ গেল না।

জন্ম স্থান নিয়ে প্রশ্নের উওরে তিনি জানান এ বিতর্কে আমি অংশগ্রহণ করতে চাই না।ক্ষুদিরামের জন্ম দেশ জুড়ে। জন্মসূত্রে সেই পরিবারের একজন হতে পেরে আমি গর্বিত। হবিবপুর, মোহবনী, কলাগ্রাম নিয়ে বৃথা তর্ক। গ্রামের জন্ম স্থান দিয়ে ক্ষুদিরাম কে বাঁধতে যাব কেন।তিনি তো ভারত মাতার সন্তান। 

ক্ষুদিরাম বসুর ভাইপো মালতী মোহন বসুর মত ,ক্ষুদিরামের জন্ম স্থান কলাগ্রামে।পারিবারিক আলোচনা থেকে তা তিনি জেনে ছিলেন।মালতী মোহন বসুর ভাই মুরারী মোহন বসুর বড় ছেলে বছর কুড়ি আগে 147 ই রাম দুলাল সরকার স্টীটের বাড়িতে বসে কথা প্রসঙ্গে জানান,কলাগ্রামেই ক্ষুদিরামের জন্ম। বড় দুর্দশা গ্রামটির।ক্ষুদিরামের জন্মস্থান টির উন্নয়ন করুক সরকার। 

এদিন ই দেখা করি,40 হরি ঘোষ স্টীট এ অনিতা ঘোষ (বসু) নামে আর এক জন ক্ষুদিরামের পরিবারের সদস্যার সঙ্গে। তিনিও কলাগ্রামের কথাই জানান।

ক্ষুদিরাম বসুর বড় ভাগ্নে ললিত মোহন রায় এক বিবরনীতে লিখেছিলেন ক্ষুদিরামের পিতা তৈলোক্য নাথ 1875 সালে নাড়াজোল এস্টেটের তহশীলদার ছিলেন।বসবাস করতেন মেদিনীপুর শহরে।হবিবপুরের ছোট এক চিলতে জমিতে বাড়িও করেছিলেন মাটির।ক্ষুদিরামের মা লক্ষীপ্রীয়া দেবী কখনো মোহবনী আবার কখনো হবিবপুরে থাকতেন।হবিবপুরে যে হেতু দুই সন্তানের মৃত্যু হয়েছিল তাই তিনি সে সময় মোহবনী তে চলে আসেন।

জন্ম স্থান নিয়ে এই বিতর্ক আগে একেবারেই ছিল না।সকলেই জানতেন হবিবপুরের কথা।এই সব প্রসঙ্গে আলোচনা হয় পরে।

কলকাতার এক দৈনিকে প্রকাশিত খবরের সূত্রে জানা যায় মোহবনী গ্রামের সুবল বিশ্বাস নাকি জানিয়েছিলেন, তাঁর ঠাকুরমা সৌরভী বিশ্বাস ক্ষুদিরাম কে প্রসব করান মোহবনী গ্রামের তৈলোক্য বসুর দেশের বাড়িতে। ক্ষুদিরামের দলিলের কপিতে বাসস্থানের যে রেকর্ড পাওয়া যায় তাতে মোহবনীর সমর্থনই আছে।

মালতী মোহন বাবুর বক্তব্য ছিল , ক্ষুদিরাম স্বদেশীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার পর তাঁর পরিবারের ওপর ব্রিটিশ পুলিশের নির্যাতন শুরু হয়।মালতী মোহনের পিতা ও নিরুদ্দেশ হন।দাদাও নিখোঁজ হন।তখন কেশপুরের কলাগ্রাম ছেড়ে চলে আসেন।আর খুদ দিয়ে কেনার প্রথা শুধুমাত্র কলাগ্রামেই ছিল।

ক্ষুদিরামের জন্মস্থান বিতর্ক নিয়ে বহূদিন আগেই খোঁজ খবর শুরু করি।তাঁর নানা আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তায় বুঝি কেউ জন্মভূমি নিয়ে একমত নন।

পেডি ও বার্জ হত্যার পর ক্ষুদিরামের শেষ লেখাটুকু ও নিয়ে চলে যায় ব্রিটিশ পুলিশের দলবল।শেষ স্মৃতি চিহ্ন মেদিনীপুরের বাস্তু ভিটেটুকু বাকি খাজনার দায়ে নিলাম করেন পঁচেটগড়ের জমিদার। একে একে হারিয়ে গেছেন ক্ষুদিরামের কাছের মানুষেরাও।কে আর বলবেন আসল সত্য। তবুও চেষ্টার কসুর করিনি।

অপরুপা দেবীর কথাতেই আসি।তিনি তাঁকে মাতৃ স্নেহে মানুষ করেন।তিনি বলেছিলেন , তিনমুঠো খুদ দিয়ে ক্ষুদিরাম কে কিনেছিলাম,মনে মনে লোভ ছিল একাই ভোগ করবো। কিন্তু কখন চোখের অগোচরে দেশের ছেলেরা তাঁকে আঁচলা আঁচলা রক্ত দিয়ে কিনে নিয়েছে,বুঝতেই পারিনি।

শুরু করেছিলাম জন্মস্থান বিতর্ক নিয়ে। হবিবপুর, কলাগ্রাম, মোহবনী ঘুরে নানা আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে কথা বলে নানা রঙের সন্ধান পাওয়া গেছে।থাক জন্ম স্থান বিতর্ক। ক্ষুদিরামের জন্মস্থান নিয়ে আরো তথ্য আসবে ভবিষ্যতে ও।

তবে ভারতজুড়ে সমস্ত মানুষের হৃদয়ে আজও তিনি অমর।ফাঁসির দড়ি গলায় দিয়ে তিনি মারা গেলেও আজও তিনি অমর।আর জন্মস্থান সমগ্র ভারত।ভারত মাতার বীর সন্তান জন্মেছিলেন ভারতে। ভারতবর্ষ তাই তাঁর জন্মস্থান। 

হবিবপুর, কলাগ্রাম, মোহবনী নয়।ভারত ই তাঁর জন্মভূমি।

শৌনক ঠাকুর

এক জননেত্রীর কথা 

শৌনক ঠাকুর 


পর্ব - ১


‘জননেত্রী’ শব্দটি কেবলমাত্র একটি অভিধানগত শব্দ নয়; এটি এক গভীর মানসিক অভিঘাত, এক সামষ্টিক চেতনার প্রতিফলন এবং মানুষের বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের এক সজীব প্রতিমূর্তি। এমন এক ব্যক্তিত্বকে বোঝায় এই শব্দ, যিনি সাধারণ মানুষের অন্তর্লোকে সুপ্ত হয়ে থাকা সাহস, আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমের বীজকে জাগ্রত করে তুলতে সক্ষম হন। যাঁর প্রতি আস্থা রেখে গ্রামবাংলার নিভৃত পল্লির অগণিত সাধারণ নারী মাতৃভূমির শৃঙ্খলমোচনের মহান ব্রতে নিজেদের নিবেদিত করেছিলেন; যাঁর আহ্বানে বাংলার পল্লীসমাজে দেশাত্মবোধের এক প্রবল জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল; যাঁর প্রেরণাময় বাণী সাধারণ ঘরের মা ও কন্যাদের হৃদয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল আত্মত্যাগ ও স্বদেশপ্রেমের অনির্বাণ শিখা। সেই দৃষ্টান্তমূলক নেতৃত্ব, সেই আধ্যাত্মিক শক্তি ও মানবিক প্রেরণার মূর্ত প্রতীকই প্রকৃত ‘জননেত্রী’—আর সেই বিরল মর্যাদার অধিকারিণী ছিলেন আশালতা দেবী।


আশলতা দেবীর শৈশব ছিল একটু ভিন্ন একটু কেন বলছি অনেকটাই আলাদা। সাধারণভাবে একটা বয়সের পর মনের অন্তঃকরণে দেশের ভবিষ্যৎ, পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণার জন্ম হয়। কিন্তু পুতুলখেলার বয়স থেকেই ছোট্ট আশালতাকে দেশের বর্তমান অবস্থা, দেশবাসীর করুণ পরিণতি ভাবিয়ে তুলেছিল। অবশ্য এক্ষেত্রে তার দিদার অবদান ভুললে চলবে না। তার এই জাতীয়তাবোধের হাতে খড়ি হয়েছিল  দিদা নবশশীদেবীর হাত ধরেই।


আশালতা দেবীর জন্ম হয় নোয়াখালীর (অধুনা বাংলাদেশ) এক সমৃদ্ধ ও শিক্ষিত পরিবারে। ১৮৯৪ সাল, ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখ। বাবা বগলামোহন দাশগুপ্ত ছিলেন নোয়াখালী জর্জ কোর্টের আইনজীবী। মা মানদাসুন্দরী দাশগুপ্ত ছিলেন একজন আদর্শ মহিলা। দেশের করুণ অবস্থা, ব্রিটিশদের অত্যাচার, ইত্যাদি বিষয় ছোট্ট আশালতার মনকে নাড়া দিত। এই সময় বঙ্গভঙ্গের জঘন্য পরিকল্পনা শুরু হলে বাংলার আকাশে বাতাসে এক ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। শুরু হয় বিরোধিতা। প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন ছোট্ট আশালতা। ১৯০৪ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে‘অন্তঃপুর’ নামক একটি মাসিক পত্রিকায় কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন। এই কবিতাগুলির মূল সুর ছিল জাতীয়তাবাদী চেতনা ও স্বদেশভাবনা। তখন তার বয়স মাত্র দশ। ভাবা যায় যে বয়সে তার পুতুল নিয়ে কিংবা রান্নাবাটি নিয়ে খেলার কথা সেই বয়সে আশালতার কলম হয়ে উঠেছিল শাণিত তলোয়ার। তার ভাবনা কতটা ম্যাচিওর, কতটা দূরদর্শী ছিল কতটা তার প্রমাণ এই কবিতাগুলো। পরিণত বয়সে তিনি বাল্মিকীর মূল রামায়ণ থেকে যুদ্ধ কান্ডটি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। 


আশালতা দেবীর দিদা নবশশীদেবীর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন ভারত। মুক্ত ভারত। তিনি বিভিন্ন স্বদেশীমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছোট্ট আশালতাকে তিনি বিভিন্ন বীরগাথামূলক গল্প শোনাতেন। কখনও শিখ যুদ্ধের ইতিহাস ,শিখদের বীরত্ব, আত্মত্যাগের কাহিনী। কখনও মনিপুরের টিকেন্দ্রজিতের কথা। সহজ সরল ভাষায় বলতেন ম্যাটিনি, গ্যারিবল্ডির জীবনী। এভাবেই বাল্যকাল থেকেই আশালতার হৃদয়পঙ্কে উপ্ত হতে থাকে স্বদেশচেতনার বীজ, পরবর্তীতে যা মহীরুহে আকার ধারণ করে।


শুধু কাহিনী বা গল্প নয়, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য ছোট্ট নাতনিকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন সভা-সভাপতিতে। বিলাতি দ্রব্য বর্জন ও স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণ আন্দোলন শুরু হলে নবশশীদেবী ‘বিলাতি বর্জনের সংকল্প পত্র’ নামক একটি পত্র তৈরি করেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জনমানসে সচেতনতা বৃদ্ধি। স্বাক্ষরের জন্য এই পত্রটি তিনি ছোট্ট আশালতাকে দিয়েছিলেন। আশলতা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে গ্রামের মেয়ে, বউদের স্বাক্ষর নিয়ে আসতেন। তখন তার বয়স মাত্র এগারো।


সমাজ বড়ই বিচিত্র। তার থেকেও বিচিত্র সমাজের রীতিনীতি, সংস্কার। বয়স একটু বাড়তেই সুশীলা, সুকন্যা আশালতার জন্য পাত্রের সন্ধান আসতে থাকে। প্রচলিত ভাবনার গড্ডালিকা প্রবাহ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারলেন না নোয়াখালীর জর্জ কোর্টের আইনজীবী ও তার স্ত্রী। ফলে অল্প বয়সেই আশালতাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হল। পাত্র সত্যরঞ্জন সেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে ১৯১৬ সালে স্ত্রী আশালতা ও শিশুপুত্রকে রেখে চোখ বুঝলেন সত্যরঞ্জনবাবু। অন্ধকার নেমে এল সদ্যবিধবা আশলতার জীবনে। কিন্তু বিধাতাপুরুষ একটি দরজা বন্ধ করার প্রাক্কালে অপর দরজার সন্ধান দিয়ে রাখেন। আশলতা সামনে উন্মোচিত হল বিশ্বসংসার। তিনি ব্রতী হলেন দেশমাতৃকার সেবায়। আদর্শ হল গান্ধীজীর বাণী, পথ, কর্মপন্থা। 


সাধারণভাবেদেখা যায় স্বামী মারা গেলে শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে চিরতরে সম্পর্ক ঘুচে যায় বৌমার। কিন্তু গুণী আশালতাকে শ্বশুরবাড়ি লোক ঠিকমত চিনতে পেরেছিলেন। আর তাই বৈধব্যজীবনে তাকে উৎসাহ প্রদানের জন্য তারা বরাবরই তার পাশে থেকেছেন। শ্বশুরমশায়ের সহযোগিতায় ঢাকায় গেন্ডারিয়ায় আশালতা একটি ‘শিল্পাশ্রম’ তৈরি করেন। 


এই ‘শিল্পাশ্রম’ মূলত একটি বয়ানাগার। শুধুমাত্র মহিলাদের নিয়েই এটি তৈরি হয়েছিল। এখানে মূলত খদ্দরের কাপড় তৈরি হত। মহিলারা নিজেদের হাতে-বোনা কাপড়ে অভিনব সব নকশা আঁকতেন। কাপড় বোনার পাশাপাশি সাধারণ মহিলাদেরও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল। এই শিল্পাশ্রমের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল –

ক) মহিলাদের স্বনির্ভর করে তোলা। 

খ) তাদের অন্তর্নিহিত সত্তার বিকাশ সাধন।

গ) তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা 

ঘ) দেশীয় কাপড় তৈরিতে এবং ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান 

ঙ) সর্বোপরি গান্ধীজীর স্বপ্নকে সার্থক করার প্রয়াস। 

আসলে শিল্পাশ্রম দেশীয় কাপড় বোনার ক্ষেত্রে ছিল এক বিপ্লব। কমলা দাশগুপ্ত লিখছেন –

“তিনখানা ফ্লাই-শাটন তাঁত যখন মহিলাদের হাতে সশব্দে চলতে থাকত তখন সেই তাঁত বোনার সঙ্গে সারা পাড়াময় যেন গান্ধীজীর বাণী ও খদ্দরের কথাই প্রচারিত হত।” (স্বাধীনতা-সংগ্রামে বাংলার নারী : কমলা দাশগুপ্ত : পৃঃ ৯৬)


আশালতাদেবী পরিচালিত এই শিল্পাশ্রম ও তাদের কর্মকাণ্ডের খবর খুব দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশংসিত আশলতার নেতৃত্বদান, জনসংযোগের দক্ষতা। এই সময় তার জীবনে একটা সুবর্ণ সুযোগ আছে। কংগ্রেস থেকে তিনি একটা প্রস্তাব পান। ১৯২২ সালে ঢাকা জেলার মহিলা প্রতিনিধিরূপে তিনি ডেলিগেট হয়ে কংগ্রেসে যোগদান করেন। দেশের জন্য এক বৃহৎ পরিসর উন্মুক্ত হল তার সামনে। 


শিল্পাশ্রমকে আরও বেশি প্রচারের জন্য প্রতিবছর শিল্পমেলার আয়োজন করা হত। মহিলাদের দাঁড়ায় পরিচালিত হত এই মেলা। কাপড়ের ধরণ, নকশার কাজ অনুযায়ী তৈরি হত স্টলের গঠন ও আকৃতি। এই মেলার সবথেকে বড় আকর্ষণ ছিল গান্ধীমন্ডপ। মেলার মাঝখানে এই বৃহৎ মণ্ডলটি থাকত। এখানে বুদ্ধদেব থেকে শুরু করে গান্ধীজি পর্যন্ত বিভিন্ন মনীষীদের মূর্তি, ঐতিহাসিক ঘটনা সমন্বিত ছবি ও মূর্তি রাখা হত। সঙ্গে থাকত বুদ্ধদেবের জীবনী, জাতকের গল্প-সম্বলিত ছবি। বুদ্ধদেবের অহিংসার বাণী যুগ যুগান্তর অতিক্রম করে গান্ধীজীর মধ্য দিয়ে আবার সার্থক রূপ লাভ করেছে। অহিংসায় শ্রেষ্ঠ পথ। সাধারণ মানুষকে দেশের অবস্থা, বর্তমান পরিস্থিতি, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন করায় ছিল মূল অভিপ্রায়।


স্বদেশী আন্দোলনের কাজকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করতে ১৯২৪ সালে ‘গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি’ গঠন করা হয়। অবশ্যই ক্ষেত্রে তার প্রধান দুই সহযোগিনীর অবদান ভোলার নয়। একজন সরমা গুপ্তা, অন্যজন সরযু গুপ্তা। এই সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল – জনসংযোগ বৃদ্ধি করা। 

খ) তাছাড়া ঘরে ঘরে জাতীয়তাবোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।

গ) গান্ধীজীর বাণী প্রচার করা। 

ঘ) এতদিন পর্যন্ত মহিলারা শুধুমাত্র খদ্দরের কাপড় তৈরি করতেন। কিন্তু এবার তারা সেই কাপড় ঘরে ঘরে গিয়ে বিক্রি ব্যবস্থা করেন। 

ফলে একটা জনসংযোগ তৈরি হয়েছিল।

ঙ) এছাড়াও বিভিন্ন স্থানের রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা বিভিন্ন তথ্য আহরণ করত।


আশালতা দেবীর বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক গভীর সামাজিক দর্শন—সমাজের তথাকথিত পশ্চাৎপদ ও প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে যদি শিক্ষার আলো পৌঁছে না দেওয়া যায়, তবে স্বাধীনতার যে স্বপ্ন উচ্চারিত হচ্ছে, তা কখনোই সামগ্রিক ও সর্বজনীন রূপ লাভ করতে পারে না। তাঁর দৃষ্টিতে স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি ছিল মানুষের চেতনার মুক্তি, আত্মমর্যাদার পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক বন্ধনমুক্তির এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ার প্রধান উপায় ছিল শিক্ষা—যা মানুষের অন্তর্লোকে প্রশ্ন জাগায়, সচেতনতা সৃষ্টি করে এবং তাকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের অংশীদার করে তোলে।


এই দার্শনিক উপলব্ধি থেকেই তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া ব্রিটিশ শাসনের অবসান কেবল কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই স্বাধীনতার সংগ্রামকে প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন করে তোলার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯২৯ সালে গেন্ডারিয়ার নিকটবর্তী জুরান নামক একটি গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জুরান শিক্ষা মন্দির’।


নমঃশূদ্র অধ্যুষিত সেই গ্রামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ ছিল না; এটি ছিল যুগযুগান্ত ধরে চলে আসা সামাজিক অবহেলা, জাতিভিত্তিক বৈষম্য এবং অজ্ঞতার অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী প্রতিবাদ। ফলে এই উদ্যোগ কেবল শিক্ষার প্রসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল মানবমুক্তির এক প্রতীকী পদক্ষেপ—যেখানে শিক্ষা, সমাজচেতনা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এক অভিন্ন সূত্রে গাঁথা হয়ে উঠেছিল।

 

১৯৩০ সালে ‘ঢাকায় সত্যাগ্রহী সেবিকা দল’ গঠিত হয়। এখানকার কর্মীরা আইন অমান্য আন্দোলনের পরিচালনা করতেন। আশালতা দেবী ও তার সহযোগী সরমা গুপ্তা, ঊষাবালা গুহ প্রমুখ প্রথমসারির নেতৃবৃন্দা নোয়াখালী থেকে বেআইনি লবণ জল ঢাকায় নিয়ে আসেন। বুড়িগঙ্গার তীরে উনান জ্বালিয়ে একটি মাটির পাত্রে লবণ তৈরি করেন। হাজার হাজার মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। ওই লবণ গ্রহণ করে গ্রেপ্তার হওয়ার একটা হিড়িক পড়ে যায়। যে জননেত্রীর ডাকে সেদিন এত মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন তিনিই জননেত্রী আশালতা সেন ।


(পরবর্তী সংখ্যায় সমাপ্য)

ঈশিতা ভাদুড়ী

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া 

ঈশিতা ভাদুড়ী


বিশ শতকের শুরুর দিকের মহিলা সাহিত্যিক হিসেবে যে নাম অবধারিতভাবে উঠে এসেছে সেই নাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর জন্ম এবং মৃত্যু একই দিনে হয়, ৯ ডিসেম্বর ১৮৮০-তে জন্মগ্রহণ এবং ৯ ডিসেম্বর ১৯৩২-এ মৃত্যুবরণ করেন এই উল্লেখযোগ্য লেখিকা। 

১৯০৫ সালে তাঁর লেখা চটি উপন্যাস ‘সুলতানাস ড্রিম’ আজও ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম ফেমিনিস্ট ইউটোপিয়ান উপন্যাস হিসেবে আদৃত। বাংলায় লেখা নয় বলে হয়তো এই বইয়ের বাঙালি পাঠকের সংখ্যা হয়তো কম, কিন্তু তদানীন্তন সমাজে দাঁড়িয়ে এক বাঙালী নারীর লেখা এই উপন্যাস নারীবাদের শীর্ষস্থান পাওয়ার উপযুক্ত। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে ধ্রুপদী নারীবাদী কল্পকাহিনীর একটি আদিতম উদাহরণ। বেগম রোকেয়া যে সময়ে এই বইটি লিখেছেন সেই সময়ের ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় এটিকে অত্যন্ত সাহসী ও বিপ্লবী সাহিত্যকর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়।

তৎকালীন সমাজব্যবস্থা অনুসারে বেগম রোকেয়ার স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ ঘটেনি। বাড়ির ভেতরেই আরবী ও উর্দু ভাষার পাঠ চলত। তবে তাঁর বড় ভাই আধুনিকমনস্ক ছিলেন, তিনি রোকেয়াকে ঘরেই গোপনে বাংলা ও ইংরেজি লিখতে পড়তে শেখান। রোকেয়ার স্বামীও ছিলেন মুক্তমনা মানুষ, তিনি রোকেয়াকে লেখালেখি করতে উৎসাহ দেন এবং একটি মেয়েদের স্কুল তৈরির জন্য অর্থ আলাদা করে রাখেন। সেই অর্থে পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে তিনি ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল স্থাপন করেন। কিন্তু পারিবারিক কারণে রোকেয়া ভাগলপুর ছেড়ে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন, এবং ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতায় মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে তিনি নবপর্যায়ে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। রোকেয়া বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া নারীর মুক্তি সম্ভব নয়।

যে যুগে কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে বাঙালি মুসলমানরা মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করত, সেই অন্ধকার যুগে বেগম রোকেয়া পর্দার অন্তরালে থেকেই নারীশিক্ষা বিস্তারে প্রয়াসী হন এবং মুসলমান মেয়েদের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তিলাভের পথ সুগম করেন। শৈশব থেকে মুসলমান নারীদের যে দুর্দশা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করাই ছিল এই স্কুল প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য। প্রথমদিকে কেবল অবাঙালি ছাত্রীরাই পড়ত সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল স্কুলে। রোকেয়ার অনুপ্রেরণায় ক্রমশ বাঙালি মেয়েরাও এগিয়ে আসে পড়াশোনার জন্য।

বাংলার নারী জাগরণে বেগম রোকেয়ার অবদান অবিস্মরণীয়। সমাজে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক অধিকার, সুবিচার নিশ্চিতকরণ ও মানবিক মর্যাদার সংগ্রামে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এক বিদ্রোহী সত্তার প্রতীক। নারীর প্রতি সমকালীন সমাজব্যবস্থা, সামাজিক বৈষম্য, অবরুদ্ধ, প্রথাবদ্ধ সামন্তীয় মূল্যবোধের সংস্কৃতিতে তাঁর ক্ষোভ তীব্র বিক্ষোভে পরিণত হয়েছিল। আশাবাদী ছিলেন, স্বপ্ন দেখেছিলেন নারী একদিন পুরুষের সমকক্ষ হিসেবে সমাজকাঠামোর মূল স্রোতে প্রতিষ্ঠিত হবে। 

সেই দৃপ্ত শক্তিতে বলীয়ান রোকেয়া কলম ধরেছিলেন সাহিত্যের প্রান্তরে। ১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ নামে একটি বাংলা গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যজগতে পদার্পণ করেন। ১৯০২ সালে রোকেয়া রচনা করেছিলেন ‘পদ্মরাগ’ নামের একটি উপন্যাস, যদিও গ্রন্থাকারে সেটি প্রকাশ পেয়েছিল অনেক বছর পরে, ১৯২৪ সালে। এক অনগ্রসর, অচেতন সমাজের বুকে দাঁড়িয়ে রোকেয়া এক তারিণীভবনের চিত্র এঁকেছিলেন সেই উপন্যাসে, যেখানে নানা ধর্মের, নানা বর্ণের নির্যাতিতা, নিপীড়িতা, সমাজ - নিষ্পেষিতা, স্বামী-পরিত্যক্তা মেয়েদের ভিড়। তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে যাবতীয় রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ভেঙে মুসলমান নারীদের প্রগতির কথা তিনি বলে গেছেন উচ্চকণ্ঠে। রোকেয়া আরও বেশ কয়েকটি উপন্যাস এবং ছোটগল্প লিখেছেন।

 ‘মতিচুর’ (১৯০৪), ‘অবরোধবাসিনী’ (১৯৩১) ইত্যাদির মতো বিখ্যাত সব রচনা রোকেয়ার সৃষ্টি। ‘অবরোধবাসিনী’-তে তিনি সমাজের অযৌক্তিকতাগুলি প্রকাশ করেন। প্রত্যেকটি লেখাতেই রয়েছে নারীর অবরোধের কাহিনী। ‘নবনূর’, ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’ ইত্যাদি পত্রিকায় তাঁর লিখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো৷ তাঁর কিছু ব্যঙ্গধর্মী রচনা হলো: ‘পরী-ঢিবি’, ‘তিনকুড়ে’, ‘বিয়েপাগলা বুড়ো’ ইত্যাদি। প্রবন্ধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ‘চাষার দুক্ষু’, ‘এন্ডিশিল্প’, ‘লুকানো রতন’ ইত্যাদি। 

রোকেয়া ‘স্ত্রীজাতির অবনতি' প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কি রূপে? কোনো ব্যক্তি এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা আমাদের লক্ষ্য তাহাই।' রোকেয়ার দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল নারীশিক্ষা ও সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন। রোকেয়া লিখেছিলেন – “আমরা বহুকাল হইতে দাসীপনা করিতে করিতে দাসীত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। ক্রমে পুরুষরা আমাদের মনকে পর্যন্ত দাস করিয়া ফেলিয়াছে। … তাহারা ভূস্বামী গৃহস্বামী হইতে হইতে আমাদের ‘স্বামী’ হইয়া উঠিয়াছেন”। 

তিনি তাঁর প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস, কটাক্ষ ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর রচনা পড়লেই বোঝা যায় যে তিনি কতটা সমাজ-সচেতন ছিলেন। তাঁর লেখার ধরণ ছিল একদম স্বকীয়। আর প্রকাশভঙ্গীও ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। যার ফলে সহজেই তাঁকে সমসাময়িক নারীদের সাহিত্যকর্মের তুলনায় এগিয়ে রাখা যায়। এই নিয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিক কাজি আবদুল ওদুদ বলেন, ‘বাস্তবিকই মিসেস আর‍, এস, হোসেন একজন সত্যিকার সাহিত্যিক, তাঁর একটি বিশিষ্ট স্টাইল আছে। সেই স্টাইলের ভিতর দিয়ে ফুটেছে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর কান্ডজ্ঞান আর বেদনাভরা অথবা মুক্তি অভিসারী মন।’

রোকেয়া লিখেছিলেন – ‘যখনই কোনও ভগ্নী মস্তক উত্তোলন করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। … আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্যে পুরুষগণ এই ধর্মগ্রন্থগুলি ঈশ্বরের আদেশ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষরচিত বিধিব্যবস্থা ভিন্ন কিছুই নহে। মুনিদের বিধানে যে কথা শুনিতে পান, কোনো স্ত্রী-মুনির বিধানে হয়তো তাহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন। ধর্ম আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন’। তিনি সর্বদা বিশ্বাস করতেন যে নারীরা তাদের নিজস্ব অধিকার এবং দায়িত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে পিছিয়ে পড়ে।

শোনা যায় কলকাতার কোনও কবরখানায় সমাহিত করা সম্ভব হয়নি তাঁকে, কেননা তিনি নারী হয়ে মুসলমান মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, নারীর অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, তদুপরি সাহিত্য রচনা করেছিলেন। ধর্মীয় অনুশাসনের বেড়াজালকে ছিন্ন করে তিনি নারীকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন। তিনি বলতেন ‘কারাগারে বন্দীগণ প্রায় লৌহ নির্মিত বেড়ী পরে, আমরা স্বর্ণ-রৌপ্যর বেড়ী অর্থাৎ মল পরি। উহাদের হাতকড়ি লৌহ নির্মিত, আমাদের হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্য নির্মিত চুড়ি।’ শিক্ষার মাধ্যমে নারীসমাজকে আধুনিক প্রগতিশীল করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। 

তাঁকে একজন খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক বলে মানা হয়। নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং আলোর দিশারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন-এর হাত ধরেই বাঙালি নারী ও বাংলা উপন্যাস অনেকখানি পথ হেঁটে এসেছিল। নারীকে আত্মবিকাশ ও সংস্কারমুক্তির পথে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিলেন এই নারী। বাংলা উপন্যাসে নারীর আদর্শায়িত জগতে পুরুষের ফাঁকিটুকু চিহ্নিত করে নারীকে আত্মজিজ্ঞাসায় উন্মুক্ত করেছিলেন।


ডাঃ রঞ্জন ভট্টাচার্য্য

মহাভারতের কথা : 

একটি অমহান মৃত্যু ও তার 'মহাভারতীয় ' পরিণতি
রঞ্জন ভট্টাচার্য্য 


"সূর্য অস্ত যাচ্ছে। এইসময়ে আমার মৃত্যুতে কোনো দুঃখ নেই। ভয়ও নেই। এবারে শৃঙ্গীমুণির কথা সত্যি হোক। এই কীটটিই তক্ষকনাগ হয়ে আমাকে দংশন করুক। তাহলেই শমীকমুনিকে অপমান করে আমি যে পাপ করেছি তার ফল ফলবে" - কথাগুলি বলেছিলেন সেই  ' মরণোন্মুখ কর্তব্যজ্ঞানশূণ্য ' রাজা। এই কথাগুলি বলে তিনি ওই কীটটিকে নিজের গলার উপরে রেখে হাসতে লাগলেন। এর অল্পক্ষণ পরে ওই কীটের দংশনেই  মৃত্যু হলো তাঁর।
মহাভারতের বিপুল কাহিনীস্রোতে আমরা অজস্ৰ মৃত্যু দেখেছি অসংখ্য বর্ণচ্ছটায়। সঙ্গমকালীন আশ্চর্য মৃত্যু থেকে ভয়ঙ্কর ইচ্ছামৃত্যু,  নির্বিকল্প দেহত্যাগ থেকে নিদারুণ আত্মহনন, এবং ' সম্মুখসমরে' কত ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় মৃত্যু এসে গ্রাস করেছে কৌরবপান্ডবপাঞ্চাল রাজপুরুষদের তা আমরা বারবার দেখেছি। আমরা জেনেছি ক্ষত্রিয়ের মৃত্যু মহান হয় এই সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ দিয়েই। এইবার আমরা এক কুরুবংশীয় রাজার মৃত্যুর প্রসঙ্গে আসবো যে মৃত্যু কোনো সম্মুখসমরে ঘটে নি।কোনো বীরের  খড়্গাঘাতে কিংবা তীক্ষ্ণ তিরের ফলায় আসে নি। এমনকি কোনো শত্রুমানুষের হাতেও ঘটে নি। ঘটেছে এক সাপের দংশনে।' অমহান' ভাবে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আসার জন্য আমাদের মহাভারতের পথে পিছিয়ে যেতে হবে আদিপর্বে। সেখানে এই বৃত্তান্তের শেষ। এবং এগিয়ে আসতে হবে সৌপ্তিকপর্ব হয়ে আশ্বমেধিক পর্বে। এখানে এই বৃত্তান্তের সূচনা ও বিস্তার। (মহাভারতের কবি বহু কাহিনীকে এইভাবে আশ্চর্য বৃত্তপথে চক্রায়িত করেছেন।) আমরা এখন কাহিনীটিকে  ঘটনাক্রম অনুযায়ী দেখবো।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষপর্যায়ে অর্থাৎ সৌপ্তিকপর্বে এসে আমরা দেখতে পেলাম  সেই মধ্যরাতের বিভীষিকাকে যেখানে অশ্বত্থামা এক মহা হন্তারক হিসেবে দেখা দিলেন। অর্ধরাত্রের মধ্যেই অশ্বত্থামা ধৃষ্টদ্যুম্ন, উত্তমৌজা, যুধামন্যু, শিখন্ডী এবং দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র সমেত পান্ডবশিবিরের সমস্ত সৈন্যদের হত্যা করলেন।
শোকে অস্থির হয়ে দ্রৌপদী ভীমকে বললেন -' ওই মহাপাপী দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামাকে বধ করো।' অশ্বত্থামা তখন পালিয়ে গিয়ে ব্যাসদেবের আশ্রমে অন্যান্য ঋষিদের মধ্যে বসেছিলেন। ভীম ধনুর্বাণ নিয়ে অশ্বত্থামার দিকে ধেয়ে গেলেন। তাঁর পিছনে ছিলেন কৃষ্ণ, অর্জুন ও যুধিষ্ঠির। এঁদের দেখে অশ্বত্থামা প্রচন্ড ভয় পেয়ে আত্মরক্ষার জন্য ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ করলেন।
সেই দেখে কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন -' তুমি অশ্বত্থামার অস্ত্র নিবারণ করার জন্য ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ করো। তখন ওই দুই দিব্য অস্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট বিশাল অগ্নিরাশির সামনে এসে দাঁড়ালেন মহর্ষি ব্যাসদেব ও নারদ। তাঁরা বললেন -' তোমরা একি করছো? এই অস্ত্র কোনো অবস্থাতেই মানুষের উপর প্রয়োগ করা যায় না। তোমরা তোমাদের এই ভয়ঙ্কর অস্ত্র এখুনি প্রত্যাহার করো।' অর্জুন বললেন যে তিনি অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্র নিবারণের জন্যই এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছেন। এই বলে অর্জুন তাঁর ব্রহ্মাস্ত্র প্রতিসংহার করলেন।
কিন্তু অশ্বত্থামা বললেন যে তিনি প্রাণভয়ে ভীত হয়ে এই দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু এই ব্রহ্মশির অস্ত্রটির প্রত্যাহার করার ক্ষমতা তাঁর নেই। তাই অস্ত্রটি অবশ্যই কোথাও গিয়ে আঘাত করবে।  সেইজন্য এটি অভিমন্যুর বিধবা স্ত্রী উত্তরার গর্ভস্থ শিশুটির উপর নিক্ষিপ্ত হবে। কৃষ্ণ বললেন -' উত্তরার সন্তান মৃত অবস্থায় যেই ভূমিষ্ঠ হবে তখনই  আমি তাকে প্রাণদান করবো। এবং এই গর্হিত অপরাধের জন্য অশ্বত্থামা তিন হাজার বছর স্বজনহীন বন্ধুহীন অসহায় অসুস্থ  হয়ে পুঁজরক্তমাখা দেহ নিয়ে  ঘুরে বেড়াবে।'
এইভাবে আমরা জেনে গেলাম অশ্বত্থামার প্রেরিত ওই ব্রহ্মশির অস্ত্রের শেষগতি কোথায় আর কিভাবে নির্ধারিত হলো। এবং যথাসময়ে তার প্রমাণ পাওয়া গেলো। উত্তরার সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো। যে তার জন্মের ঢের আগে থেকেই বিনাদোষে চরম আঘাতপ্রাপ্ত। তাই সে মৃত বলে ঘোষিত হলো জন্মমুহূর্তেই। অর্থাৎ এই জাতক জন্মাবার আগে থেকেই চরম ভাগ্য নিপীড়িত। কিন্তু কৃষ্ণের কৃপায় তার পুণর্জন্ম হলো। এইভাবে জীবনের এক অবিশ্বাস্য আরম্ভ হলো এই শিশুটির। নাম হলো তার পরীক্ষিৎ। ( তখন কুরুবংশ যুদ্ধের কবলে পড়ে অতি ' ক্ষীণ' হয়ে গেছে বলে জাতকের নাম হলো পরীক্ষিৎ। নিষ্প্রাণ শিশুটির অলৌকিক ভাবে প্রাণ ফেরানো হলো। সেই 'প্রাণ''টিও কি ' ক্ষীণমান' ছিলো ?)
 পান্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথে যাওয়ার আগে পরীক্ষিৎ রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হলেন। ( যতদিন না তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হলেন ততদিন শাসনভার ছিলো যুযুৎসুর উপর )।  এরপর যথাসময়ে পরীক্ষিৎ নিজের হাতে রাজত্ব ও প্রজাপালনের ভার নিলেন। তাঁকে মহাভারতকার  পান্ডবদের যোগ্য উত্তরসূরী বলে উল্লেখ করলেও আমরা তাঁর কোনো বর্ণোজ্জ্বল গৌরবগাথা শুনিনি। শুনিনি কোনো প্রবলপরাক্রমশালী প্রতিপক্ষ নৃপতিকে যুদ্ধে ধরাশায়ী করতে। কিংবা তাঁর রাজসিক জীবনে কোনো ' সোনার হরিণ চাই ' বলে ছুটে বেড়াতে। কিন্তু একটি সামান্য বনের হরিণের পিছনে ছুটে রাজা পরীক্ষিৎ এসে পড়লেন তাঁর জীবনের গভীর অন্ধকারে।
ঘটনাটি অতি সাধারণ কিন্তু তার পরিণাম সুদূরপ্রসারী। এখন আমরা ঘটনাটির অনতিবিশদে আসবো। রাজা পরীক্ষিৎ মৃগয়া করতে গিয়ে একটি হরিণকে বাণবিদ্ধ করলেন। এরপর সেটিকে অনুসরণ করতে করতে গহন বনে এসে পড়লেন। কিন্তু সেই হরিণটিকে আর দেখতে পেলেন না। বরং দেখতে পেলেন এক ধ্যানস্থ মুনিকে। যাঁর নাম ছিলো শমীক মুনি।পরীক্ষিৎ তাঁকে ওই হরিণের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি নিরুত্তর হয়ে থাকলেন। কারণ তিনি তখন মৌনব্রতে ছিলেন।
এতে রাজা পরীক্ষিৎ ক্রুদ্ধ হয়ে একটি মৃত সর্প ওই মুনির কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে নিজের প্রাসাদে ফিরে এলেন।  শমীকমুনির শৃঙ্গী নামে এক অতি তেজস্বী পুত্র ছিলো। তিনি এসে তাঁর পিতার এমন অবস্থা দেখে এবং তার কারণ জেনে রাজা পরীক্ষিৎকে অভিশাপ দিলেন যে আগামী সাতদিনের মধ্যেই মহাবিষধর সর্প তক্ষকের দংশনে রাজা পরীক্ষিৎ প্রাণ হারাবেন।  পিতা শমীকমুনির বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও শৃঙ্গী তাঁর অভিশাপবাক্যে অনড় রইলেন। শমীকমুনি গৌরমুখ নামে এক শিষ্যকে রাজা পরীক্ষিতের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে তাঁকে সতর্কবার্তা দিয়ে দিলেন।
এরপর আমরা দেখতে পাবো কিভাবে রাজা পরীক্ষিৎ নিজেকে একটি একটি করে পরপর অনেকগুলি দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার বলয়ে ঘিরে ফেলতে লাগলেন। তিনি একটিমাত্র স্তম্ভের উপর একটি সুরক্ষিত প্রাসাদ নির্মাণ করলেন যেখান থেকে তিনি মন্ত্রীদের সাহায্যে রাজকার্য করতে লাগলেন। তাঁর ত্রিসীমানায় কেউ আসতে পারতো না। তিনি বিষচিকিৎসক ও মন্ত্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণদের নিযুক্ত করলেন এবং কাশ্যপ নামে একজন অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন বিষচিকিৎসককে নিয়ে আসার বন্দোবস্ত করলেন। ( এগুলি থেকে কি ভাবা যায় যে তিনি নিজেকে নিশ্চেষ্টভাবে অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন? নিজের জীবনের প্রতি বীতস্পৃহ হয়ে শৃঙ্গীমুণির অভিশাপকে শিরোধার্য করে শেষের সেদিনের অপেক্ষা করছিলেন?)
এরপর যা ঘটলো তা যেন আজকের দিনের মূল্যবোধবর্জিত একটি রাজনৈতিক ঘটনার চমৎকার উদাহরণ। যা অবশ্যই অত্যন্ত নাটকীয়। এইজন্য ঘটনাটির কিছুটা অনুপুঙ্খ বিবরণ প্রয়োজন।
 শৃঙ্গীর অভিশাপের পর এই দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার বলয়ে পরীক্ষিতের জীবনের ছটি দিন নির্বিঘ্নে পার হলো। এই বার এলো সপ্তম দিন অর্থাৎ শৃঙ্গীর অভিশাপের হিসেবে পরীক্ষিতের জীবনের শেষদিন। ওই কাশ্যপ নামে এক ব্রাহ্মণ যিনি শ্রেষ্ঠ সর্পবিষচিকিৎসক, তিনি যাত্রা করলেন পরীক্ষিতের উদ্দেশ্যে। কারণটি তাঁর দিক দিয়ে খুব স্পষ্ট। 'আজ তক্ষকনাগের রাজা পরীক্ষিৎকে দংশন করার দিন। সেটি যেই ঘটবে আমি তখনই রাজাকে বিষমুক্ত করে প্রাণে বাঁচাবো। এতে আমার প্রচুর অর্থপ্রাপ্তি হবে। নামযশ অনেকগুণ বেড়ে যাবে '- বিরাট আত্মবিশ্বাসে এই কথাগুলি ভেবেছিলেন সেই শ্রেষ্ঠ সর্পবিষবিশেষজ্ঞ ব্রাহ্মণ কাশ্যপ। তাই ।পরীক্ষিতের প্রাসাদের দিকে একটি পথ ধরে অতি দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি।
ওই একই পথ ধরে  একই জায়গার দিকে যাচ্ছিলেন তক্ষক। যাচ্ছিলেন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে। ছদ্মবেশী তক্ষক কাশ্যপকে জিজ্ঞাসা করলেন -' আপনি এত হন্তদন্ত হয়ে কোথায় চলেছেন?'কাশ্যপ  স্পষ্টভাবেই বললেন তাঁর উদ্দেশ্য। তখন তক্ষক নিজের পরিচয় দিয়ে বললো -' আমি সামনের এই বটগাছটিকে দংশন করছি। দেখি কি ভাবে আপনি একে বাঁচাতে পারেন '। তক্ষকের দংশনে মুহূর্তের মধ্যেই বটগাছটি ভস্মীভূত হলো।
কাশ্যপ তখন বটগাছের সমস্ত ভস্মগুলি একত্রিত করে ওই ভস্মের স্তূপের উপর তাঁর মন্ত্র প্রয়োগ করলেন।তক্ষক অবাক হয়ে দেখলো যে তার দংশনে দগ্ধ গাছটির ভস্ম থেকে অঙ্কুরিত হলো একটি সদ্যোজাত বটের চারা। এরপর একটি একটি করে তার পাতা সৃষ্টি হতে হতে তার পূর্ণ চেহারাটি প্রকাশিত হলো। তক্ষক বুঝলো যে এই কাশ্যপ ব্রাহ্মণের ক্ষমতা অসীম! ।এইবার শুরু হলো তার নিপুণ রাজনৈতিক বাকচাতুরী।
তক্ষক  কাশ্যপকে বললো -' আপনি যে ভাবে এই বটগাছটিকে বাঁচিয়ে তুললেন এতে আশ্চর্যের কিচ্ছু নেই। কারণ আপনি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার মতোই অসীম ক্ষমতাশালী! কিন্তু কত অর্থ পাবেন বলে আপনি রাজা পরীক্ষিৎকে বাঁচাতে চলেছেন ? রাজা পরীক্ষিৎ আপনাকে যত অর্থ দেবেন আমি তার থেকে অনেক বেশি অর্থ দেবো যদি আপনি ফিরে যান। তাছাড়া জেনে রাখুন এক ব্রাহ্মণের অভিশাপে রাজা পরীক্ষিতের আয়ু আজ শেষ হবেই। আপনি ওই অভিশাপকে কখনোই খন্ডাতে পারবেন না। মাঝখান থেকে আপনার সুনাম নষ্ট হবে। তাই এ কাজ করতে যাবেন না। আপনি ফিরে যান।'
এবং তাই হলো। কাশ্যপ তক্ষকের থেকে প্রচুর অর্থ নিয়ে ফিরে চলে গেলেন। ( কাশ্যপ তখন ধ্যান করে বুঝলেন যে রাজা পরীক্ষিতের আয়ু ফুরিয়ে গেছে। অতএব পরীক্ষিতের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা বৃথা! পুরো ঘটনাটিতে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। )
এইবার তক্ষক কয়েকটি নাগকে তপস্বীর ছদ্মবেশে রাজা পরীক্ষিতের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।' তোমরা এই ফল ফুল কুশ আর জল নিয়ে সাধুর বেশে ধীরস্থির ভাবে রাজার কাছে গিয়ে এগুলো নিবেদন করে আসবে।'- এই বলে তক্ষক ওই ফলগুলির একটির মধ্যে নিজেকে একটি ক্ষুদ্রাকৃতি কীটের আকারে লুকিয়ে ফেললেন । এই সমস্ত ফলমূল তপস্বীবেশী নাগদের দিয়ে রাজা পরীক্ষিতের কাছে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিলেন। রাজা  অখণ্ড বিশ্বাসে ছদ্মবেশী তপস্বীদের ফলফুল ইত্যাদিকে দৈবপ্রেরিত মনে করে গ্রহণ করলেন। তাঁরা চলে গেলে তিনি  তাঁর মন্ত্রী ও অমাত্যদের বললেন - ' সাধুরা যেসব ফল এনেছেন সেগুলি নিন, খান। আমিও এর থেকে একটি ফল নিয়ে খাচ্ছি। ' অদৃষ্টের হিসাবে যে ফলটি পরীক্ষিৎ  তুলে নিলেন ওই ফলটিতেই তক্ষক লুকিয়ে ছিলো। পরীক্ষিৎ ফলটি যেই খেতে যাবেন তখনই তিনি দেখতে পেলেন ওই ফলের মধ্যে রয়েছে একটি তাম্রবর্ণ কৃষ্ণচক্ষু একটি ক্ষুদ্র কীট। সমস্ত ব্যাপারগুলি যেন একটি অবধারিত দুর্দৈবের মতো ঘটে গেলো।
এরপর  পরীক্ষিতের আচরণ অতি আশ্চর্যজনক। তিনি  কেমন করে যেন চিনতে পেরে গেলেন তাঁর মৃত্যুদূতকে। এবার পরীক্ষিতের কথাগুলি সকরুণ স্বগতোক্তির মতো শোনালো। ' রাজা ফলের সঙ্গে সেই কীটটিকে হাতে ধরে বললেন -' সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আমার এই মৃত্যুতে দুঃখ নেই। ভয়ও নেই। শৃঙ্গীমুনির কথা সত্যি হোক। এই কীটটি তক্ষকনাগ হয়ে আমাকে দংশন করুক। তাহলেই আমি শমীকমুনিকে  অপমান করে যে অপরাধ করেছি তার থেকে মুক্তি পাবো। ' নিজের মৃত্যুকে নিজে হাতে ডেকে এনে মরণের সামনে দাঁড়িয়ে রাজা পরীক্ষিতের সাধারণ বোধবুদ্ধি যেন হঠাৎ লোপ পেয়ে গেলো। তিনি নিজের হাতে ওই কীটটিকে নিজের গলায় রেখে হাসতে লাগলেন। মহাভারতের বিপুল কথাসাগরে একজনের আপ্রাণ চেষ্টায় বাঁচতে চাওয়ার পর মৃত্যুকে অবধারিত জেনে জড়িয়ে ধরে এই হাসার চিত্রটি বড়ো মর্মান্তিক।
এই হত্যাকাণ্ডটিকেও মহাভারতের কবি তাঁর অসামান্য শব্দগৌরবে আলোকিত করেছেন। কিন্তু সেই আলো উজ্জ্বল হয়ে আছে ঘাতকের দিকে!   কবি লিখছেন - 'এরপর কীটরূপধারী তক্ষক সেই ফলটি থেকে বেরিয়ে  প্রকান্ড শরীরে প্রকাশিত হয়ে রাজার শরীর বেষ্টন করে ভয়ঙ্কর গর্জন করে তাঁকে দংশন করলো। সেই দেখে পরীক্ষিতের মন্ত্রী আর অমাত্যেরা সভয়ে চারিদিকে পালাতে লাগলো। তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলো পদ্মের মতো রক্তবর্ণ অদ্ভুত আকারের প্রকান্ড তক্ষকনাগ যেন নিজের শরীর দিয়ে ওই আকাশকে সিদুঁরের রেখায় দুভাগে চিরে দিয়ে কোথায় অতিদ্রুত চলে গেলো। আর তক্ষকের বিষের আগুনে পরীক্ষিতের ঘরখানি যেন আলোয় জ্বলে উঠলো। '
এই সমস্ত ঘটনাগুলি তলিয়ে দেখলে তাহলে কয়েকটি  বিষয় উঠে আসবে। আমরা এবার সেই বিষয়গুলিকে অন্তর্নিহিতে দেখবো। প্রথমত - উত্তরার পুত্র পরীক্ষিত জীবন শুরুর আগেই অভিশাপে বিদ্ধ হলেন। যে অভিশাপটি  কোনোভাবেই এড়ানো গেলো না। তিনি শবদেহে ভূমিষ্ঠ হলেন।  পরীক্ষিতের জীবনের শেষগতিও হলো একটি অভিশাপে। শতচেষ্টাতেও তাকে এড়ানো গেলো না। তিনি নিথর নিস্পন্দ হয়ে পড়ে রইলেন তাঁর নিজের রাজগৃহে তাঁর মন্ত্রী অমাত্যদের সামনেই। অর্থাৎ দুটি অনড় অভিশাপের মাঝেই  জীবন'ধারণ' করেছিলেন এই হতভাগ্য রাজা পরীক্ষিৎ।
দ্বিতীয়ত মৃতজন্মা পরীক্ষিতের  প্রাণলাভ ছিলো একটি অকল্পনীয় ঘটনা যা সম্ভব হয়েছিলো কৃষ্ণের অসামান্য দৈবকৃপায়। পরীক্ষিতের মৃত্যুও ছিলো একটি অবিশ্বাস্য পরিণতি যেখানে নিজের তৈরি নিশ্ছিদ্র বজ্র আঁটুনিকে পরীক্ষিৎ যেন নিজের হাতেই শিথিল করে  মৃত্যুকে  কোলে নিয়ে এলেন। অর্থাৎ দুটি অত্যাশ্চর্য ঘটনায় গাঁথা ছিলো পরীক্ষিতের জীবন ও মরণ।
তৃতীয়ত এই অতি আশ্চর্য জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে পরীক্ষিৎ যে জীবন যাপন করলেন সেই যাপিত জীবনের  কোনো ঘটনার আধারিত  রাজকীয় সুবর্ণগাথা মহাভারতকার আমাদের শোনান নি।( অবশ্য রাজা পরীক্ষিতের মহানুভবতার এক প্রশস্তি আছে মহাভারতে)। তাঁর জীবনের যে ঘটনাটি মহাভারতকার বিশদে বর্ণনা করেছেন তাকে আমরা তখনকার রাজধর্মের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসাবে নিতে পারবোনা কখনোই। কুরুবংশের অনেক রাজাই ছিলেন মৃগয়াপ্রিয়। পরীক্ষিৎ ও তাই। কিন্তু বাণবিদ্ধ হরিণটিকে  না দেখতে পেয়ে ধ্যানস্থ ঋষি শমীককে এবিষয়ে জিজ্ঞাসা করা এবং উত্তর না পেয়ে ওই ধ্যানরত মৌণ ঋষির গলায় একটা মৃত সাপ ঝুলিয়ে দিয়ে আসা অবশ্যই কোনো রাজোচিত কাজ নয়। বিশেষত কুরুবংশীয় রাজা হিসাবে কাজটি যথেষ্ট অগৌরবের।
চতুর্থত এই কুরুবংশীয় রাজা পরীক্ষিতের প্রাণ গেলো একটি   সর্প দংশনে। কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। কোনো সম্মুখসমরে নয়। পরীক্ষিতের জীবনের এই শেষ পরিণতিটিকে আমরা মহাভারতীয়  বীক্ষায়  'বীরগতি' প্রাপ্তি বলা যাবে না কিছুতেই। এই বিপুল ভারতকথায় বহু ক্ষত্রিয় রাজাদের যেভাবে জীবনাবসান হয়েছে তার তুলনায় পরীক্ষিতের মৃত্যু যথেষ্ট‌ অমলিন। কুরুবংশীয় রাজার হিসেবে  অমহান।
এবার আমরা দেখবো মহাভারতের কবি এই নিভৃত নির্ভার মৃত্যুকেও কি আশ্চর্যভাবে এই ভারতকথায় মহনীয় করে তুললেন তাঁর আশ্চর্য কথাশিল্পে। এবং  কিভাবে এই অমহান ঘটনাটিকে এই বিপুল কাহিনীসমূহের ' মহা' ভরকেন্দ্র হিসেবে স্থাপন করলেন।
পরীক্ষিত এর অকালমৃত্যুর পর রাজসিংহাসনে বসলেন তাঁর পুত্র জনমেজয়। মহাভারতকার জানাচ্ছেন যে তিনি তাঁর প্রপিতামহ ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠিরের মতো মন্ত্রী ও অমাত্যদের পরামর্শ নিয়ে সুষ্ঠুভাবে রাজ্যপালন করতে লাগলেন। এরপর একদিন তিনি তাঁর মন্ত্রীদের থেকে জানতে পারলেন তাঁর পিতার মৃত্যুর কারণটি। জানতে পারলেন তক্ষকনাগ কিভাবে হত্যা করেছিলো তাঁর পিতাকে। এরপরই জনমেজয় ওই তক্ষকের উপর চরম প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য  প্রস্তুত হলেন। শুরু হলো মহাভারতের প্রথম সংকল্পিত ও সংঘটিত মহাহত্যালীলা। একটিমাত্র অপরাধীর ( অর্থাৎ তক্ষকনাগ)  মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য গোটা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে শুরু হলো এক বীভৎস নিধনযজ্ঞ। অর্থাৎ সর্পসত্রযজ্ঞ।
' এবার সর্পসত্রের বিধান অনুযায়ী কাজ শুরু হলো। যাজ্ঞিকরা কৃষ্ণবস্ত্র পরে মন্ত্রপাঠ করতে করতে যজ্ঞে আহুতি দিতে লাগলেন। তারপর দেখা গেলো অসংখ্য সাপ পরস্পরে জড়াজড়ি করে কাঁপতে কাঁপতে সেই যজ্ঞের আগুনে এসে পড়তে লাগলো। ফোঁস ফোঁস করতে করতে, ছটফট করতে করতে শিশু, যুবক, বৃদ্ধ নানা বর্ণের নানা আকারের শতশত সহস্র সহস্র সাপ এসে পড়তে লাগলো ওই আগুনে। তাদের শরীরের পোড়া রক্তমাংসের ছোট ছোট নদী বয়ে যেতে লাগলো। তাদের বিকট আর্তনাদে চারিদিক ছেয়ে গেলো...'
এই বিবরণ মহাভারতকারের। আমরা সর্পসত্রযজ্ঞের কাহিনীর বিশদে যাবো না। কিন্তু এই যজ্ঞের ঘটনার সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে ঘটে গেলো আরেকটি ঘটনা। রাজা জনমেজয় সর্পসত্রযজ্ঞ করছেন জেনে মহর্ষি ব্যাসদেব  এলেন সেই যজ্ঞস্থলে  তাঁর শিষ্যদের নিয়ে।  রাজা জনমেজয় তখনই বৃদ্ধ ব্যাসদেবকে  তাঁর পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে অতি কৃতজ্ঞচিত্তে সমাদর করে সুবর্ণ আসনে বসালেন। এরপর জনমেজয় মহর্ষি ব্যাসকে বললেন যে তিনি তো তাঁর ( অর্থাৎ জনমেজয়ের) পূর্বপুরুষ কৌরব পান্ডবদের সমস্ত ঘটনা সচক্ষে দেখেছেন , তাই তিনি যদি এই যজ্ঞের সময়ের অবকাশে সেই ঘটনাগুলি এই তাঁকে বলেন।কারণ এগুলি জানতে তাঁর প্রবল আগ্রহ রয়েছে।
মহর্ষি ব্যাসকে বারংবার অনুরোধ করা হলেও তিনি নিজমুখে এ বিষয়ে কিছুই বললেন না। বরং তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে বললেন কৌরব পান্ডবদের এই ইতিবৃত্ত বর্ণনা করতে।  বৈশম্পায়ন তাঁর গুরু কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের আশীর্বাদ নিয়ে এই বিপুল ভারতকথার  বর্ণনা শুরু করলেন। এইভাবে সর্পসত্রযজ্ঞের অবকাশে দিনের শেষে বলা হতে লাগলো অজস্র কাহিনী। সেই কাহিনীর সূত্র ধরে রাজা জনমেজয় ঋষি  বৈশম্পায়নকে জিজ্ঞাসা করলেন আরো বহু বিষয়ে। সেই সব বিষয়ের উত্তর দিতে গিয়ে চলে এলো আরো কিছু কথা ও কাহিনী। এইভাবে সৃষ্টি  হলো এক বিরাট ইতিবৃত্ত। যাকে আমরা মহাভারত বলে জানি।
এই সুবিশাল ইতিবৃত্ত  মহর্ষি ব্যাসদেব রচনা করেছিলেন কুরুপান্ডবরা লুপ্ত হওয়ার অনেক পরে। এরপর সেটিকে  পাঠ করিয়েছিলেন  কেবলমাত্র তাঁর পুত্র শুকদেব ও কয়েকজন শিষ্যের মধ্যে। বৈশম্পায়ন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। যিনি ঘটনাক্রমে হলেন এই ভারতকথার প্রথম কথক। যেখানে এই কথকতার আদিক্ষেত্রটি ছিলো রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্রযজ্ঞস্থল।
এতক্ষণে আমরা জেনে গেছি যে এই সর্পসত্রযজ্ঞের একমাত্র কারণ ছিলো প্রতিশোধ। রাজা জনমেজয়ের প্রতিশোধ।  মূলত তক্ষকের প্রতি। যে তক্ষক তাঁর পিতা রাজা পরীক্ষিতের নিষ্ঠুর হত্যাকারী। আমরা এও জানলাম  যে মহান কুরুবংশীয় রাজা পরীক্ষিতের মৃত্যু  রাজোচিত হয় নি। ক্ষত্রিয় রাজার মৃত্যূত্তীর্ণ বীরগতি তিনি পান নি। অবধারিত মৃত্যুর সামনে তাঁর আত্মসমর্পণ যেন কুরুবংশীয় রাজার মাপকাঠিতে অতি অসহায় ও বড়ো অমহান একটি ঘটনা। যার পরিণাম নিয়ে এলো ওই সর্পসত্রযজ্ঞের ঘটনাটিকে। আর সেই যজ্ঞের আঙিনায় শুরু হলো ঋষি বৈশম্পায়নের মুখে ভারতকথার বর্ণনা।  সেই প্রেক্ষিতে এলো রাজা জনমেজয়ের অজস্ৰ প্রশ্ন। এবং সেই প্রশ্নের সূত্র ধরে বৈশম্পায়ন বিবৃত করলেন আরো অনেক প্রসঙ্গ এবং অপ্রসঙ্গও। সৃষ্টি হলো পৃথিবীর বৃহত্তম কথামালা।    একটি নিতান্তই সর্পদংশনে মৃত্যুর কাহিনী ভারতকথার   অনেক কাহিনীর থেকে ধারে ও ভারে ক্ষীণমান হয়েও  সমগ্র ভারতকথার ভরকেন্দ্র হয়ে  রইলো।  অর্থাৎ ভারতকথার একটি অমহান কাহিনী 'কবির অভিপ্রায়ে' মহাভারতীয় পরিণতি পেলো।


অমিতাভ ভট্টাচার্য

ভারতের নাস্তিক নিরীশ্বর ঐতিহ্য
অমিতাভ ভট্টাচার্য


ভারতে এখন হিন্দু পুনরুত্থানের চেষ্টা চলছে । ধর্মের পুনরুত্থান বর্তমানে কোথাও ভালো কাজে লাগে না । ধর্মীয় পুনরুত্থান হলে পিছিয়ে যাওয়া অনিবার্য । বলা হচ্ছে ভারত অধ্যাত্মবাদের দেশ, ধর্মের দেশ । সেটা সকলে বেশ খাচ্ছে । পালে হাওয়া আছে তাই ধর্মরক্ষার নিরাপদ আন্দোলনে অনেকেই নাম লিখিয়েছেন । সেই সুযোগে ছড়ি ঘোরাচ্ছে ধর্মের কারবারিরা ।

হ্যাঁ ভারতে অধ্যাত্মবাদ ছিল, ধর্মচিন্তা ছিল । শুধু ভারতে কেন, গোটা পৃথিবীতেই ছিল । দ্বন্দ্বতত্ত্ব বলে সমস্ত চিন্তাই একমুখী হয় না । অধ্যাত্মবাদ, ঈশ্বরবাদ থাকলে তার সঙ্গে সংশয় (মানে ঈশ্বরে সংশয়), নাস্তিক্যবাদ (মানে ঈশ্বরকে অস্বীকার)ও থাকবেই । গোটা পৃথিবীতে এঁরাও ছিল, হয়তো খুব ক্ষীণ হয়েই ছিল, কিন্তু ছিল । ভারতে কিন্ত ক্ষীণ নয়, খুব স্পষ্ট শক্তিশালী একটা সংশয়ী, নাস্তিক, না-ধার্মিক ধারা ছিল । এঁদের উপস্থিতি প্রাচীন ভারতের ধর্মগ্রন্থগুলোতেও এত প্রবল যে একে শুধু একটা ধারা না বলে ঐতিহ্যই বলা উচিত্‌ । হ্যাঁ ভারতের একটা স্পষ্ট শক্তিশালী নাস্তিক, নিরীশ্বরবাদী, না-ধার্মিক ঐতিহ্য সেই প্রাচীন কাল থেকেই আছে । যদিও নাস্তিক বলতে ভারতীয় দর্শনে বোঝায় পরলোকে অবিশ্বাসী (যেমন চার্বাক) অথবা বেদে অবিশ্বাসীদের (যেমন বৌদ্ধ, জৈন) । আমরা এখানে নাস্তিক বলতে ঈশ্বর, ধর্ম, পরলোক, পুনর্জন্ম, যাগযজ্ঞ, ব্রাহ্মণদের দানধ্যানে সংশয়ী ও অস্বীকারকারীদের কথাই বলব ।

হিন্দুধর্ম মানেই বেদ । অনেকেই মনে করেন ‘ব্যাদে সব আছে’ । আছে তো । সবচেয়ে প্রাচীন ঋগ্‌বেদেই ঈশ্বরই যে জগৎ সৃষ্টি করেছেন‌ তা নিয়ে প্রবল সংশয় আছে । ঋগ্‌বেদের দশম মণ্ডলের ১২৯ নম্বর স্তোত্রটি নাসদীয় সূক্ত নামে পরিচিত । জগত্‌ সৃষ্টির কারণ নিয়ে আলোচনা চলেছে ঐ স্তোত্রটিতে । সেখানে পরিষ্কার বলা আছে জগত্‌সৃষ্টির কারণ কেউ জানে না । স্তোত্রের ৭টি শ্লোকের ৬ নম্বর শ্লোকটি হলো:

কেই বা প্রকৃত জানে? কেই বা বর্ণনা করিবে? কোথা হইতে জন্মিল? কোথা হইতে নানা সৃষ্টি হইল? দেবতারা এই সমস্ত নানা সৃষ্টির পর হইয়াছেন। কোথা হইতে যে হইল, তাহা কেই বা জানে? (রমেশচন্দ্র দত্তর অনুবাদ)

অর্থাৎ দেবতারা এই জগত্‌ সৃষ্টি করেন নি । তাঁরাও এই সৃষ্টির কারণ জানেন না কারণ জগত্‌ সৃষ্টি হওয়ার পরে দেবতাদের সৃষ্টি হয়েছিল ।

ঐ শ্লোকের একটি পদ্য অনুবাদ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত করেছিলেন । সেখানে তিনি লিখেছিলেন ‘সৃষ্টদেবতা অর্বাচীন’ (নতুন, প্রাচীনের উলটো) । মানে, দেবতা নিজেই সৃষ্ট, তিনি স্রষ্টা নন । সৃষ্টির দায় না থাকলে দেবতার থাকা আর না-থাকায় কোনো ফারাক হয় না ।

আঠেরোটা মুখ্য উপনিষদ । সেগুলোও কোনো একজনের লেখা নয় । নানান লোকের নানান মত তাতে প্রতিফলিত । প্রথমে আসা যাক "শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ" (১।২)-এ । জগত্‌কারণ হিসেবে ছটা মতের কথা বলা হচ্ছে : কাল (সময়), স্বভাব, নিয়তি, যদৃচ্ছা (রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন: যেদিকে গতি, অনিয়ম, ইংরিজিতে অ্যাক্সিডেন্ট), ভূতানি এবং পুরুষ (ঈশ্বর) । মানে ঈশ্বর ছাড়াও সৃষ্টির আরও পাঁচটি কারণ নিয়ে মতবাদ এ দেশে প্রাচীন কালে চালু ছিল । সেটা এই শ্লোক প্রমাণ করে ।

(ভূতানি : :   ভারতীয় দর্শনে ভূত মানে পদার্থ । আগুন, জল, মাটি, হাওয়া আর শূন্য (আকাশ বা ব্যোম) ।
যাঁরা মনে করেন দেবতা বা ঈশ্বর নন প্রাণ সৃষ্টি হয় এই পাঁচটি প্রাকৃতিক উপাদানের থেকে (যেমনভাবে গুড় থেকে মদ তৈরি হয়) আর মৃত্যুর পর শরীর আবার এই পাঁচটি পদার্থে মিশে যায় (মানে শরীর ছাড়া চেতনা, আত্মা ইত্যাদি থাকে না । মানে পরলোক, পুনর্জন্মে দাঁড়ি) তাঁরা হলেন পঞ্চভূতবাদী । যাঁরা মনে করেন শুধু প্রথম চারটিই উপাদানই এমন ঘটায় তাঁরা চতুর্ভূতবাদী (যেমন চার্বাক) )

আর একটি প্রাচীন উপনিষদ: "কঠ উপনিষদ" এর গল্পটি এইরকম: বাজশ্রবস-এর ছেলে উশন্‌ । উশন্‌ সমস্ত পার্থিব জিনিস দেবতাদের দান করছিলেন (সম্ভবত দেবতাদের আশীর্বাদ পাওয়ার আশায়) । তাঁর অল্পবয়িসি ছেলে নচিকেতা দেখল যে বাবা যে গরুগুলো দান করছেন সেগুলো বুড়ো, নিষ্প্রাণ । সেগুলোর দুধ দেওয়ার ক্ষমতা নেই । নচিকেতা তার বাবাকে বারবার জিগেস করছিল, ‘বাবা আমিও তো তোমার সম্পত্তি । আমাকে কোন দেবতাকে দান করবে?’ তখন উশন খানিক বিরক্ত হয়েই বলে ওঠেন ‘তোমায় আমি মৃত্যুকে দান করলাম ।’ যম হলেন মৃত্যুর দেবতা । নচিকেতা তখন জীবন্তই যমালয়ে পৌঁছলেন । যম তখন যমালয়ে ছিলেন না । নচিকেতা তিন রাত কিছু না খেয়েই তাঁর জন্যে অপক্ষা করতে লাগলেন । যম ফিরে নচিকেতা-কে দেখে লজ্জিত হলেন । তাঁর অতিথি । অতিথি অনাহারে ছিলেন । যম তখন নচিকেতা-কে তিনটি বর দিতে চাইলেন । প্রথম বর চেয়ে নচিকেতা বললেন, সে যেন তার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারে । দ্বিতীয় বরে নচিকেতা জানতে চাইল কীভাবে মানুষ স্বর্গে যেতে পারে । যম তখন নচিকেতা-কে সেই যজ্ঞের পদ্ধতি নিয়ম বললেন যা করলে মানুষ স্বর্গে যেতে পারে । সেই যজ্ঞর নাম হলো নচিকেত অগ্নি । তৃতীয় বরে নচিকেতা জানতে চাইল মানুষের মৃত্যুর পরে তার কী হয় । যম কিছু টালবাহানার পরে তার জবাব দিলেন । সেইটিই এই উপনিষদের মূল উপজীব্য । এমন ভাববাদী গল্পর মধ্যেও নচিকেতা কিন্তু জানতে চান (১। ২০), ‘অনেকে বলেন মৃতরা আছেন, অনেকে বলেন মৃতরা নেই, আমাকে সত্যিটা বলুন’ । মৃতরা নেই মানে, মৃত্যুর পরে আর আত্মার অস্তিত্ব নেই । পরলোক নেই, পুনর্জন্ম নেই । মানে সংশয়ীদের অস্তিত্বের প্রমাণ । অনেকেই তার মানে তখনও এসবে বিশ্বাস করতেন না ।

এবার আসা যাক "ছান্দোগ্য উপনিষদ"-এর উদ্দালক-শ্বেতকেতু উপাখ্যানে (অধ্যায় ৬) । অরুণের পুত্র বলে তাঁর পুরো নাম উদ্দালক আরুণি । দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মনে করতেন, গ্রীসের থালেস নন, ছান্দোগ্য উপনিষদে বর্ণিত উদ্দালকই পৃথিবীর প্রথম বৈজ্ঞানিক । রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যর মতে তিনি আদি বস্তুবাদীদের একজন । কেন এমন ধারণা? কী করেছিলেন উদ্দালক?

উদ্দালক আরুণির ছেলে শ্বেতকেতুকে বারো বছর বয়েসে গুরুগৃহে পাঠানো হলো শিক্ষালাভ করার জন্যে । বারো বছর শিক্ষালাভ করে শ্বেতকেতু বাড়ি ফিরলেন । ছেলের মধ্যে একটু বিদ্যালাভের অহঙ্কার ছিল মনে করে উদ্দালক তাঁকে কিছু প্রশ্ন করলেন । ছেলে সেসবের জবাব দিতে পারলেন না এবং জানালেন গুরুগৃহে তাঁকে এগুলো শেখানো হয় নি । উদ্দালক ছেলেকে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করলেন । উদ্দালক জানালেন, অন্নই হলো মন । একথা শ্বেতকেতু বুঝতে পারলেন না । উদ্দালক তখন তাঁকে বললেন পনেরোদিন শুধু জল খেয়ে থেকে তাঁর কাছে আসতে । শুধু জল খেয়ে পনেরোদিন থেকে শ্বেতকেতু ষোলোদিনের দিন বাবার কাছে এলেন । উদ্দালক তখন ছেলেকে বেদ আবৃত্তি করতে বললেন । না খেয়ে কাহিল শ্বেতকেতু এত বছরের চর্চা করা বেদের কিছুই মনে করতে পারলেন না । উদ্দালক তখন তাঁকে অন্নগ্রহণ করে তাঁর কাছে আবার আসতে বললেন । শ্বেতকেতু তাই করলেন । উদ্দালক আবার বেদ আবৃত্তি করতে বললেন । শ্বেতকেতুর তখন সবই মনে পড়ল । উদ্দালক তাঁকে বোঝালেন অন্নই হলো মন । উদ্দালকের বক্তব্য হলো, মন মানে ব্রহ্ম, পরমব্রহ্ম, শরীর অতিরিক্ত চেতনা কিছুই নয় । আদি অনন্ত অক্ষয় প্রাণ বলে কিছু নেই । মন আসলে শরীরেরই অংশ । খাবার না খেলে যেমন শরীর কাহিল হয় । মনও তাই হয় ।

এরপর উদ্দালক শ্বেতকেতুকে বটগাছের একটি ফল দিয়ে সেটিকে ভাঙতে বললেন । ভাঙতে ভাঙতে শ্বেতকেতু আর চোখে সেই ফলের বীজের কোনো অংশ দেখতে পেলেন না । উদ্দালক তখন বললেন তুমি যা দেখতে পাচ্ছ না তার ভেতরেই সবকিছুর সূক্ষ্ম সার (ইংরিজিতে subtle essence) রয়েছে । ‘তুমিও তাই’ (তত্‌ ত্বম অসি =‌ তত্ত্বমসি) । এবার তিনি ছেলেকে এক কলসী জলে খানিক নুন গুলতে বললেন । শ্বেতকেতু তাই করলেন । নুন জলে গুলে গেলে উদ্দালক ছেলেকে কলসির ওপর থেকে একটু, মাঝখান থেকে একটু আর নীচ থেকে একটু জল খেতে বললেন । শ্বেতকেতু তাই করলেন । তখন উদ্দালক ছেলেকে জিগেস করলেন জলের স্বাদ কেমন । ছেলে বললেন, নোনতা । উদ্দালক বললেন, নুন দেখা যাচ্ছে না কিন্তু নুন সর্বত্রই আছে । সেইটি হলো সূক্ষ্ম সার । ‘তুমিও তাই’ (তত্ত্বমসি) । এখানে বাঙলা সূক্ষ্ম সার যে সংস্কৃত শব্দর অনুবাদ তা হলো "অণিমা" । রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সম্প্রতি প্রমাণ করেছেন অণু থেকেই অণিমা, উদ্দালক এখানে সূক্ষ্ম সার অর্থে পরমাণুর কথা বলেছিলেন । উদ্দালকের এই ধারণাই পরে বৈশেষিক দর্শনের কণাদের হাতে পরমাণুবাদের রূপগ্রহণ করেছিল । এই তত্ত্বমসি মানে ‘তুমিও তাই’-কে ভাববাদীরা নিজেদের মতো করে নানানভাবে ব্যাখ্যা করেছেন । ‘তুমিও তাই’ মানে তুমিই ব্রহ্ম ইত্যাদি ইত্যাদি । রামকৃষ্ণবাবু এইসব মত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন উদ্দালক আরুণি একেবারেই পরমাণুবাদের কথাই বলেছেন । 

মানে উপনিষদ শুধু ঈশ্বরপ্রাপ্তি আর ব্রহ্মচর্চা নয়, সেখানে পরিষ্কার পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ আর সিদ্ধান্তর কথা আছে । উপনিষদের ব্রহ্মবাদ যদি আমাদের ঐতিহ্য হয়, তবে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণও আমাদের ঐতিহ্য । তবে এই দুই ঐতিহ্যর সম্পর্ক জল-অচল । দুই ঐতিহ্য কখনোই মেলে না । জোর করে যত চেষ্টাই করা হোক না কেন তারা দু-মেরুতে থাকবেই । কেউ চাইলে যে কোনো একটাকেই বাছতে হবে । ধর্ম আর বিজ্ঞানের সমন্বয় হয় নি, হয় না, হবে না, দাঁড়ি । ধর্মর সঙ্গে সংগ্রাম করেই বিজ্ঞান এগোয় । দুটোর ভিত্তি সম্পূর্ণ বিপরীত । ধর্মর মূল দাবি, অন্ধ আনুগত্য । বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত প্রশ্ন ও অনুসন্ধিত্‌সার ওপর । অবশ্য গণতান্ত্রিক দেশ । আপনি চাইলে চব্বিশ ঘণ্টা অষ্টপ্রহর বিজ্ঞানের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে ধর্মতে জীবনের সার খুঁজতেই পারেন । বিজ্ঞানের যেখানে শেষ, দর্শনের সেখানে শুরু -- জাতীয় প্রলাপ বকতেই পারেন । ভাবের ঘরে চুরি নিয়ে পেনাল কোডে কিছু বলা নেই ।

প্রসঙ্গত বলে রাখি প্রাচীন ভারতের দার্শনিকরা পরমাণুর একটা ধারণা করেছিলেন মাত্র । তার মানে কিন্তু এই নয় যে তাঁরা বিজ্ঞানসম্মতভাবে পরমাণুর সম্বন্ধে জানতেন । উদ্দালক আর কণাদের পরমাণুবাদে আধুনিক বিজ্ঞান খুঁজতে যাবেন না । সেটা হবে চরম বোকামি । পরমাণু সম্পর্কে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আধুনিক কালে ইউরোপ থেকেই এসেছে ।

"ছান্দোগ্য উপনিষদ"-এর প্রণেতাদের অন্নকে মূল ধরার একটা প্রবণতা ছিল । ছান্দোগ্য উপনিষদ হলো সামবৈদিক । সেখানে উদগীথ শব্দকে সিলেবেলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে উদ্‌, গী আর থ-এর মাধ্যমে । ছান্দোগ্য উপনিষদকার এর মতে থ-এর অর্থ খাদ্য, অর্থাৎ এই জগত্‌ খাদ্যর ওপর স্থিত (১।৩।৬) । ব্রহ্ম, পরম ব্রহ্ম, হিরণ্ময় পুরুষ নয় -- জগত স্থিত খাদ্যর ওপর । এর থেকে বড় বস্তুবাদী কথা কী হতে পারে ।

"মৈত্রায়ণী উপনিষদ"-এর (৭।৮) একটি শ্লোকে স্বর্গপ্রার্থীরা কাদের সঙ্গে মিশবেন না তাঁদের একটা তালিকা আছে । যে ব্রাহ্মণেরা যাঁদের যজ্ঞের অধিকার নেই তাঁদের যজ্ঞ পরিচালনা করেন, শূদ্রর শিষ্য, যে শূদ্র পবিত্র গ্রন্থ পাঠ করেন, অভিনেতা, নর্তক, সৈন্য, রাজকর্মচারীদের সঙ্গে বেদবিরোধীদের উল্লেখ এই তালিকায় আছে । বোঝা যায় বেদবিরোধীরা তখন ধর্মধ্বজাধারীদের যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ ছিল । 

তিনি ছিলেন বুদ্ধর কিছু আগের মানুষ । মানুষের চুলের কম্বল পরতেন বলে তাঁর নাম কেসকম্বল, অজিত কেসকম্বল । রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁকে অভিহিত করেন মুক্তমনা দার্শনিক হিসেবে । রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যর মতে তিনি ভারতের একজন আদি বস্তুবাদী । প্রাচীন ভারতের দর্শন জগতে অজিত কেসকম্বল ও তাঁর মত অতি গুরুত্বপূর্ণ । অজিত কেসকম্বল বলেছিলেন:

‘দান-ধ্যান . . . যজ্ঞ নেই (=বেকার), সুকৃত-দুষ্কৃত কর্মের ফল = বিপাক নয়। ইহলোক-পরলোক নয়, মাতা-পিতা-দেবতা নেই। সত্যলোকে পৌঁছে যাওয়া এমন কোনো সত্যারূঢ় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ নেই, যিনি স্বয়ং ইহলোক-পরলোককে জ্ঞাত হয়ে, মানুষকে বোঝাতে পারেন। মনুষ্য চতুর্ভূতের সৃষ্টি। মৃত্যুর পর (দৈহিক) পৃথিবী পৃথিবীতেই বিলীন হয়। . . . অনল অনলে . . . জল জলে . . . বায়ু বায়ুতেই লয় প্রাপ্ত হয়।  ইন্দ্রিয় আকাশে গমন করে । মৃত ব্যক্তিকে খাটে করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। চিতায় অগ্নিসংযোগ পর্যন্ত তার অস্তিত্ব দৃষ্টিগোচর হয়; তারপর অস্থিসমূহ ক্রমশ ক্ষুদ্র ও ধূসরবর্ণ হয়ে আসে, অবশেষে চিতাভস্ম ব্যতীত আর কিছুই থাকে না। দান করার পরামর্শ মূর্খের উপদেশ, যিনি আস্তিক্যবাদের কথা বলেন তিনি তুচ্ছ ও মিথ্যা কথা বলেন। মূর্খ-বিদ্বান সকলেই বিনষ্ট হয়, বিচ্ছিন্ন হয়, মৃত্যুর পর আর কিছু থাকে না ।’ (রাহুল সাংকৃত্যায়নের অনুবাদ)

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ধর্মের পীঠস্থান নামে পরিচিত আমাদের দেশে এমন কথা প্রচার করা হতো । ঈশ্বর, পরলোক, অজর-অমর আত্মা, পুনর্জন্ম সবকিছুকেই পরিষ্কার অস্বীকার করা হয়েছে ।

'কামসূত্র' লেখককেও দেখা যায় নাস্তিক মত খন্ডনের চেষ্টা করতে । সেই নাস্তিকদের যে যা বক্তব্য সেখানে আছে তা হলো:

১। ধর্ম আচরণ করবে না ১।২।২৫
২। যেহেতু তার ফল ভবিষ্যতে পাওয়া যায় । ১।২।২৬
৩। যেহেতু (তা) অনিশ্চিতও । ১।২।২৭
৪। কোন্‌ বুদ্ধিমান লোক হাতের জিনিস পরের হাতে দেয় [এখানে সম্ভবত ব্রাহ্মণদের দান করার কথা বলা হচ্ছে ] । ১।২।২৮
৫। আগামীকাল ময়ূর পাওয়ার চেয়ে আজকের পায়রা পাওয়া ভালো । ১।২।২৯
৬। অনিশ্চিত (=সন্দেহজনক) সোনার টাকার চেয়ে নিশ্চিত (=আসল) রূপোর টাকা অনেক ভালো । ১।২।৩০
(রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যর অনুবাদ)

বাঙলা কথা হলো, পরলোকের সোনার টাকা বলে কিছু নেই, ইহলোকের রূপোর টাকাতেই কাজ চালাও ।

"রামায়ণ" এবং "মহাভারত"-এও বস্তুবাদী মতের উপস্থিতি । "রামায়ণ"-এ জাবালি বনবাস থেকে রামকে নিবৃত্ত করতে লোকায়তিক মত মানে বস্তুবাদী মত বর্ণনা করেন । সেখানেও সেই দেহবিহীন আত্মা থাকতে পারে না । যজ্ঞে কোনো ফল দেয় না । শ্রাদ্ধ করে কোনো লাভ নেই ইত্যাদি কথা উঠে আসে ।

"মহাভারত"-এও নাস্তিক শব্দটি অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে এবং তাঁরা যে পাপী এবং তাঁদের কঠিন শাস্তি দেওয়া উচিত সে-কথাও আসে । অন্যান্য কুকর্মকারীদের সঙ্গেই নাস্তিকদের নিন্দা করা হয় । "মহাভারত"-এর ‘শান্তিপর্ব’-র মোক্ষধর্ম পর্বাধ্যায়ে সমসাময়িক দার্শনিক মতগুলির কথা আসে । প্রসঙ্গত বলে রাখি রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সম্প্রতি প্রমাণ করেছেন শান্তিপর্বর শান্তির অর্থ কিন্তু যুদ্ধর পর শান্তি যাকে ইংরিজিতে পিস বলে তা নয় । শান্তিপর্বর শান্তি হলো ইংরিজি ট্রানকুইলিটি । জ্ঞাতিহত্যার গ্লানিতে বিব্রত যুধিষ্ঠিরের মনের শান্তি ফেরাতেই ভীষ্ম শরশয্যা থেকেই তাঁকে নানা জ্ঞান দেন । এই শান্তিপর্বর মোক্ষধর্ম পর্বাধ্যায়ে জনক-পঞ্চশিখ সংবাদে সাতটি শ্লোকে নাস্তিক মতের কথা আছে । তার মধ্যে সাত নম্বরটি বেশ আগ্রহজনক:

"শুক্র থেকেই (মানুষের জন্ম), ঘি খেয়ে হজম হলে দেহেই শুক্র জন্মায় (তার মধ্যেই মানুষ নিহিত থাকে) -- যেমন বটের বীজ (যার মধ্যে পুরো বটগাছ নিহিত থাকে) । জন্ম, স্মৃতি -- এ সবই চুম্বক, সূর্যকান্তমণি ও আগুনের জল খাওয়ার মতো ।  (অর্থাৎ শুক্র-র মতো জড়বস্তু থেকেও প্রাণের উদ্ভব সম্ভব; তার দৃষ্টান্ত: জড় চুম্বক লোহাকে আকর্ষণ করতে পারে, সূর্যকান্তমণি থেকেও তাপ বেরোয়, আগুনও জল শুষে নিতে পারে ) ।"

মহাপ্রাণ বা পরমব্রহ্ম থেকে জীবের আত্মার চেতনার উত্‌পত্তি---এই ধারণাকে একেবারে সমূলে খণ্ডন করে এখানে বস্তু থেকেই প্রাণের উত্‌পত্তি হয়েছে তা প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে ।

মহাকাব্য তো দেখা হলো । এবার পুরাণে আসি ।  বিষ্ণুপুরাণ, পদ্মপুরাণ, ইত্যাদি অনেককটা পুরাণেও নাস্তিক বেদবিরোধী মতের পরিচয় পাওয়া যায় । তার মধ্যে পদ্মপুরাণের গল্পটি বেশ । দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি আর অসুরদের শুক্র । শুক্র একবার মায়াবলে অদৃশ্য হয়েছিলেন । সেই সুযোগে শুক্রর রূপ ধরে গিয়ে বৃহস্পতি অসুরদের বেদবিরোধী নানা উপদেশ দ্যান এবং ধর্মভ্রষ্ট করেন । বৃহস্পতি কী বলেছিলেন একটু দ্যাখা যাক:

'. . . ঐহিক স্বার্থপর নীচজনেরাই যজ্ঞ ও শ্রাদ্ধকার্যের প্রবর্তক । . . .বৈদিক পক্ষাবলম্বী অন্য যেসকল দেবর্ষি আছেন; তাঁহারাও হিংসাবহুল, ক্রর, মাংসাশী ও নিত্য পাপকারী, এতদ্বিন্ন দেব ও ব্রাহ্মণরাও মদ্যপায়ী ও মাংসাশী । সুতরাং ইহাদের অবলম্বিত ধর্ম্ম দ্বারা কে কিরূপে স্বর্গ বা মোক্ষ লাভ করিবে? শ্রুতি[বেদ]স্মৃতি[ধর্মশাস্ত্র]বিহিত যেসকল যজ্ঞাদি ও শ্রাদ্ধাদি কর্ম্ম আছে, তাহাতে অপবর্গ (=মোক্ষ)লাভ নাই । এ সম্পর্কে প্রবাদ শুনা যায় যে যজ্ঞে পশু মারিয়ে রুধির কর্দ্দম প্রস্তুত করিয়া যদি স্বর্গে যাওয়া যায়, তবে নরকে যাইবে কে? যদি একজন ভোজন করিলে অন্যের তৃপ্তি হয় তবে প্রবাসী ব্যক্তিকে শ্রাদ্ধ তাহার কি অপর খাদ্য আহরণ করিতে হয় না ।'

এরপর দেবতাদের একটি কেচ্ছাকাহিনী বর্ণনা করে বলা হয়:

"সুতরাং দেখ, এ ধর্ম্ম কিপ্রকার ও জগতে এইরূপ এবং অন্যরূপ অনেক পাপকর কার্য্য দেখা যায় । ধর্ম্ম, যেখানে এইপ্রকার, সেখানে আর পরমার্থ কী?"

এইরকম গল্পর মূল শিক্ষা হলো নাস্তিক মত মানলে তোমাকেও অসুরদের মতো হেরে যেতে হবে, ধ্বংস হতে হবে । কিন্তু সেটা বলতে গিয়ে পুরাণকার আসলে তখন চালু নাস্তিক মতটাকে প্রায় পুরোটাই বিবৃত করেছেন ।

এবার চার্বাকদের কথায় আসা যাক । চার্বাক কিন্তু আসলে এক দার্শনিক মতের নাম । পুরোপুরি নাস্তিক, বস্তুবাদী একটি মত । আট শতাব্দী থেকে বারো শতাব্দী পর্যন্ত দর্শনের জগতে এঁদের বিরাট দাপট ছিল । নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে তাঁদের একাধিক সূত্রগ্রন্থও ছিল । কিন্তু সেগুলির কিছুই পাওয়া যায় না (ব্রাহ্মণ্যধর্মর চক্রান্তেই সম্ভবত তাঁদের পুঁথিগুলি পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে) । তাই চার্বাকদের মত সংগ্রহ করতে হয় তাঁদের বিরোধীদের লেখা থেকে । ভারতীয় দর্শনের নিয়ম ছিল নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে হলে অন্যের মত আগে খণ্ডন করতে হয় । জৈন, বৌদ্ধ, নৈয়ায়িক, বেদান্তিন সব ধারার দার্শনিকরাই চার্বাকমত খণ্ডন করেছেন । সেখান থেকেই চার্বাকদের মতের কথা জানা যায় । গ্রীসের দার্শনিকদের মতোই চার্বাকদের সূত্রগুলি পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে । দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী, মামোরু নামাই, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এই কাজটি চালিয়েছেন । সেই পথ ধরেই রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য বর্তমানে চার্বাকসূত্র পুনর্গঠনের কাজে অনেকটাই এগিয়েছেন । তাঁর দীর্ঘ পরিশ্রমী বিজ্ঞানসম্মত গবেষণায় বর্তমানে চার্বাকসূত্রগুলির একটা পরিষ্কার রূপ পাওয়া গেছে ।

আসুন দ্যাখা যাক জগত্‌, আত্মা, পরলোক, যাগযজ্ঞ নিয়ে চার্বাকদের মত কী ছিল: :

"সুতরাং এখন আমরা তত্ত্ব (=বস্তুজগতের স্বরূপ) ব্যাখ্যা করব ।

তত্ত্বগুলি (হলো) মাটি, জল, আগুন আর বাতাস । [কোনো দেহঅতিরিক্ত পরম চেতনা নেই । বস্তু থেকেই প্রাণের সৃষ্টি হয় ।]

তাদের মিলিত (রূপের) নাম শরীর, ইন্দ্রিয় ও বিষয় ।

সেগুলি থেকে চৈতন্য (দ্যাখা দেয়) । [প্রাণ দ্যাখা দেয়]

বিজ্ঞান (চেতনা) হলো কিণ্ব (মদ তৈরির উপাদান, যেমন ভাত, গুড়) ইত্যাদি থেকে মদশক্তি (নেশা ধরানোর ক্ষমতা)-র মতো ।

চেতনাসমেত শরীরই পুরুষ (=আত্মা) ।

কায়া (শরীর) থেকেই (চেতনা আসে) । [অর্থাৎ আগে শরীর, পরে আত্মা]

শরীর থাকলে তবেই (চেতনা ইত্যাদি থাকে) । [শরীর ছাড়া আত্মা থাকে না । মানে বিদেহী কিছু নেই]

জীব (আত্মা) গুলি জলের বুদ্‌বুদের মতো ।

জন্মবৈচিত্র্যর বিভিন্নতার কারণেই জগৎও বিচিত্র ।

ময়ূরচন্দ্রক (ময়ূরপুচ্ছর ভেতরের চিহ্ন)-এর মতো ।

প্রতক্ষ্যই প্রমাণ ।

প্রমাণের অগৌণতার কারণেই তার (অনুমানের) থেকে অর্থনিশ্চয় দুর্লভ (=সর্বদা নিশ্চিত লক্ষ্যে পৌঁছনো যায় না) । [রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন প্রতক্ষ্য ছাড়াও চার্বাকরা প্রত্যক্ষসিদ্ধ অনুমান মানতেন । কিন্তু যা প্রতক্ষ্য নয় তার অনুমান মানতেন না, যেমন ঈশ্বর বা আপ্তবাক্য]

পরলোক অসিদ্ধ -- প্রমাণের অভাবে ।

পরলোকবাসী (পরলোকের বাসিন্দা অর্থাৎ আত্মা) না-থাকায় পরলোকের অভাব (=পরলোক নেই)

পরলোকবাসী চৈতন্য দেহহীন (হয়) -- সেই কারণে (সেটি অগ্রাহ্য) ।

অন্য দেশ, অন্য কাল বা অন্য অবস্থাই পরলোক ।

(পূর্ব-)জন্মর স্মৃতি অসিদ্ধ । এক গ্রাম থেকে আসা সকলের স্মৃতিও (এক রকম হয়) ।

ধর্ম (আচরণ) করা ঠিক নয় ।

তার (ধর্মর) উপদেশে বিশ্বাস করা উচিত নয় ।"

এছাড়াও বেশকিছু লোকগাথা বা আভাণক যেগুলো মুখে মুখে চলত ও বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল সেগুলি থেকেও চার্বাকদের মত জানা যায় বলে অনেকে মনে করেন । সায়ণ-মাধব, চোদ্দো শতকের একজন বৈদান্তিন, তাঁর গ্রন্থ "সর্ব-দর্শন-সংগ্রহ"-এ খণ্ডন করার জন্যে চার্বাকমত হিসেবে যেসব শ্লোক তুলে ধরেছেন সেগুলি হলো এই লোকগাথাগুলি:

‘স্বর্গ নেই, অপবর্গ (=মোক্ষ) নেই বা পারলৌকিক আত্মাও নেই । বর্ণ-আশ্রম ইত্যাদি ক্রিয়াও কোনো ফল দেয় না ।।

‘অগ্নিহোত্র, তিন বেদ, ত্রিদণ্ড (সন্ন্যাসীর উপকরণ), ছাই দিয়ে গা ঢাকা -- বুদ্ধি ও পৌরুষহীনদের (এই) জীবিকা ধাতা (=ঈশ্বর)-র তৈরি ।।

‘জ্যোতিষ্টোম যজ্ঞে নিহত যদি স্বর্গে যাবে, যজমান কেন তার নিজের বাবাকে হত্যা করে না? [তিনিও তাহলে নির্ঘাত স্বর্গে যেতেন] ।।

‘মৃত জীবদের শ্রাদ্ধ করলে যদি (সেটি তাঁদের) তৃপ্তির কারণ হয়, তবে নিভে-যাওয়া প্রদীপেও তেল দিলে তার শিখা বড় হয়ে যাবে ।।

‘ইহজগত্‌ ছেড়ে যে প্রাণীরা চলে গেছেন, তাঁদের পাথেয় (=পিণ্ড) কল্পনা করা বৃথা, কারণ গৃহস্থের করা শ্রাদ্ধে (তাহলে) পথেই পথিকের তৃপ্তি হতো [তাহলে পাথেয় হিসেবে চাল-চিঁড়ে বয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকার হতো না]।।

‘দান করলে যদি স্বর্গবাসী ব্যক্তির তৃপ্তি হতো, তবে প্রাসাদের ওপরে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের (খাবার) কেন এখানেই (মাটিতেই) দেওয়া হয় না?

‘যতদিন বাঁচবে, সুখে বাঁচবে; ধার করেও ঘি খাবে । ছাই-হয়ে-যাওয়া দেহ আবার কোথায় বা, (কোথা থেকে) ফিরে আসে?

‘দেহ থেকে বেরিয়ে যদি কেউ পরলোকে যায়, বন্ধুর প্রতি স্নেহে প্রচণ্ড আকুল হয়ে কেন সে বারবার (ইহলোকে ফিরে) আসে না?

‘ব্রাহ্মণদের বাঁচার উপায় হিসেবেই মৃতদের এই প্রেতকার্য (=শ্রাদ্ধ-অনুষ্ঠান)-র বিধান দেওয়া হয়েছে । এ ছাড়া (এর মধ্যে) আর কিছু নেই ।।

‘তিন বেদের কর্তা (=রচয়িতা) -- ভণ্ড, ধূর্ত আর নিশাচর (রাক্ষস) । 

‘জর্ফরী-তুর্ফরী’ [ঋগ্‌বেদ, ১০।১০৬।৬] পণ্ডিতদের বচন বলে পরিচিত (যদিও শব্দগুলি একেবারেই আবোল-তাবোল) ।।

‘(অশ্বমেধ যজ্ঞে যজমানের) স্ত্রী ঘোড়ার লিঙ্গ ধরবেন -- এমন বলা হয়েছে । তেমনি ভণ্ডরা অন্য জিনিসও ধরতে বলে । রাক্ষসরাই বলে [যজ্ঞে] মাংস খাওয়ার কথা ।’ (রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যর অনুবাদ) ।

তবে আধুনিক গবেষকরা ঐসব আভাণকগুলির সবকটাকেই চার্বাকদের শ্লোক বলে মনে করেন না । সেগুলি জৈন বৌদ্ধদেরও হতে পারে ।

তবে এখানে ব্রাহ্মণদের পরিষ্কার ভণ্ড, ধূর্ত, নিশাচর, কাপুরুষ মাংসখেকো, প্রতারক বলা হয়েছে । যজ্ঞের মন্ত্রকে বলা হয়েছে আবোল-তাবোল । হ্যাঁ, আমাদের ভারতেই ।

ব্রাহ্মণ্যধর্মর ভিত নাড়িয়ে দেওয়া কথা বললে কি বৈদিকরা ছেড়ে কথা বলবেন । তবে বৈদিক পাণ্ডারা অনেক বেশি ধুরন্ধর ছিলেন । তাঁরা লেগে পড়লেন চার্বাকদের মূলগ্রন্থগুলি হাপিস করার কাজে কিন্তু নিজেদের লেখাতেই যে খণ্ডনের জন্যে তাঁরা চার্বাকদের কিছু কথা উদ্ধৃত করে বসে আছেন সেটা সম্ভবত খেয়াল ছিল না । সেই সূত্রগুলো থেকেই চার্বাকদের মত পুনর্গঠন করা হচ্ছে । কিন্তু সমস্যা আছে । বিরোধীরা খণ্ডনের জন্যে প্রায়সই চার্বাক মতকে বিকৃত করেছেন । তাঁদের ইহসুখবাদী প্রমাণ করতে চেয়েছেন । ধার করে ঘি খাওয়া মানে "ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত্‌" শ্লোকটি সেইরকমই একটি বিকৃতি বলে সম্প্রতি রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য প্রমাণ করেছেন । মূলে শ্লোকটি ছিল:

যাবজ্‌ জীবেত্‌ সুখং জীবেন‌ নাস্তি মৃত্যোর্‌ অগোচরঃ।‌
ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ ।।

যতদিন বাঁচবে, সুখে বাঁচবে; কিছুই মৃত্যুর অগোচর নয় ।
ছাই-হয়ে-যাওয়া দেহ কোথায় (বা কোথা থেকে) আবার ফিরে আসে?

সায়ণ-মাধব তাঁর বইতে চার্বাকদের হেয় প্রতিপন্ন করতে শ্লোকটি করে দ্যান:

যাবজ্‌ জীবেত্‌ সুখং জীবদ্‌ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত্‌
ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ ।।

যতদিন বাঁচবে, সুখে বাঁচবে; ধার করে ঘি খাবে ।
ছাই-হয়ে-যাওয়া দেহ কোথায় (বা কোথা থেকে) আবার ফিরে আসে?

এইরকম বিকৃতির উদাহরণ আরও অনেক আছে । সত্যিই বদমায়েসি কত রকমের হয়!

নাস্তিকতা বা নিরীশ্বরবাদ শুধু উত্তর ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না । তা ছড়িয়ে পড়েছিল দক্ষিণেও । দুটি তামিল এপিক, "মণিমেকলাই" ও "নীলকেসী"-তে যথাক্রমে লোকায়ত ও ভূতবাদী নামের দুটি আলাদা ঘরানার বস্তুবাদী মতের কথা পাওয়া যায় । তাঁরাও বিশ্বাস করতেন প্রাকৃতিক উপাদান (ভূত) থেকেই প্রাণের সৃষ্টি হয় ।

এগুলো ছাড়াও নাস্তিকতার এরকম বহু নমুনা বেদ, বেদাঙ্গ, উপনিষদে আছে । মোদ্দা কথা ভারত যেমন একদিকে ভক্তির পীঠস্থান, বিশ্বাসীদের দেশ তেমনি আবার সংশয়ী, নাস্তিক আর বস্তুবাদীদের মাতৃভূমি সেই প্রাচীন কাল থেকে । দুটো বিপরীত সমান্তরাল (অর্থাৎ কখনোই মিলবে না) ধারা বয়ে গেছে প্রাচীন কাল থেকে । শাসন শোষণের সুবিধের জন্যে ধর্ম সবসময়তেই রাজারাজড়াদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এসেছে ।

একদিকে আমাদের ঐতিহ্য, ব্রহ্ম সৎ না অসত্‌, এক না অনেক, চিত্‌ না অচিত্‌ সে নিয়ে তুমুল তক্ক বিতক্ক, জগত্‌ মায়া বা শূন্য কিনা সে নিয়ে বিবাদ-বিসংবাদ, তাল ঢিপ করিয়া পড়ে না পড়িয়া ঢিপ করে তা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ ।

আবার অন্যদিকে ভারতেই প্রথম শূন্য আবিষ্কার হয়েছিল, তুলো থেকে সুতো তৈরি হয়েছিল, আহ্নিক গতির ধারণার জন্ম হয়েছিল । সম সময়ের তুলনায় ভারতের চিকিত্‌সাশাস্ত্র বেশ উন্নত ছিল । চরক ও সুশ্রুত সংহিতা তার প্রমাণ । (মনে রাখবেন আমি কিন্তু বলেছি তখনকার তুলনায় চিকিত্‌সা বিজ্ঞান অনেক উন্নত ছিল, তার মানে তা এখনকার তুলনায় বেশি উন্নত ছিল না) । বৈদিক ভারতের জ্যামিতির উত্‌স শুল্বসূত্র । সেই জ্যামিতিতে কোণের কোনো ধারণা ছিল না । শুধু বাহু-জ্যামিতির মাধ্যমেই ভারতীয় পিথাগোরাসের সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিল ।

মজা হচ্ছে দেশের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হতে গেলে যে কোনো একটিই বেছে নিতে হবে কারণ দুটি পরস্পরবিরোধী । আমি ঐ দ্বিতীয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে গর্বিত ।


গ্রন্থসূচি

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য । চার্বাকচর্চা । ন্যাশনাল বুক এজেন্সি । ২০১৭ ।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন । দর্শন দিগ্‌দর্শন (দ্বিতীয় খণ্ড) । চিরায়ত । ২০০৮ ।

Bhattacharya, Ramkrishna. More Studies on the Cārvāka/ Lokāyata. New Castle Upon Tyne: Cambridge Scholars Publishing 2020.

Bhattacharya, Ramkrishna. Uddalaka: A Materialist among the Upanisadic Sages, Indian Skeptic, Vol. 12 No. 8, 1999, pp. 7-9.

Bhattacharya, Ramkrishna. More Studies on the Cārvāka/ Lokāyata. New Castle Upon Tyne: Cambridge Scholars Publishing 2020.

Olivelle, Patrick (Ed. and Trans.). The Early Upanisads. New York: Oxford University Press, 1998.

পড়তে থাকুন

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী
কবিতার পাতা - ১কবিতার পাতা - ২গল্পরম্য রচনাধারাবাহিক উপন্যাস বিবিধ
  • প্রথম পাতা
  • Privacy Policy
  • Terms and Conditions

আক্ষরিক

82748 38787

Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.

Powered by GoDaddy

This website uses cookies.

We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.

Accept