
ছেড়ে আসা ঠিকানায়
পুলক রায়
পিচঢালা রাস্তাটা আগের মতোই আছে
বাড়িটায় জরার আঁচড়,
পলেস্তারা খসে গেছে,এখানে-ওখানে
বট-অশ্বত্থের চারাগাছ,
দোতলার ব্যালকনিতে সেদিনের ঔৎসুক্য নিয়ে
আজ আর কেউ দাঁড়ায় না ।
হৃৎপিণ্ড হাতে নিয়ে গতায়তের ব্যাকুলতা
যেন ফিরে আসে, নোনাধরা দেওয়ালের পাঁজরে
ফুলে-ফেঁপে থাকা অভিমানগুলোয়
সময়ের ধূলিমলিন আস্তরণ,
আমি অলীক ফুল দিয়ে হাভেলি সাজাই
মনের ভেতরে গুনগুন করে আখতারি বাই ।

ভ্রমের আড়ালে
সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিরহী রোদের থেকে শিখে নিও–
কীভাবে দাউদাউ ফেলে ছুটে যেতে হয়
সম্পর্ক তো শুধু রক্তের নয়!
মৃত্যু আসছে অতি ধীরে,
ক্ষয় হতে হতে যেভাবে
জমেছে পলি–
মনে কি আছে বিকেলের কুহু ডাক?
চিহ্ন খুলে দিয়েছি ফেরত,
শূন্যতা এখন শুধু আমার!
শীতের বিকেলে যেমন হাড় গিলগিলে কাঁপা হাত-
বুকের ভেতরেও ঠিক!
প্রশ্ন করি কেন? কেন উচিত ছিল আমারও
ক্ষয়কে বিদায় বলার–
শিকড়ে জড়িয়ে কাম–
ক্রোধের ওপর বয়ে যায় হিম শীতল স্রোত,
এ কোন সকাল ডাকে– নাকি বসন্ত আসবে চুপিচুপি–
ভ্রমের আড়ালে বলে যাবে রক্ত নয় সম্পর্ক শুধু,
যে স্রোতে ভেসে যায় গ্রাম কে গ্রাম–
কেয়াপাড়, শিকড় আর একটা প্রাচীন পুঁথি!

বিক্রয়যোগ্য বিদ্বেষ
অমিতাভ সেন
মন্ত্রবলে ছড়ায় বিষ দেশের
অন্ত্রে-উপকূলে-সীমান্তভূমিতে,
মারহন্তারক কামড়ে ধরেছে
মাসের খণ্ড, অল্প আঁচে তাতানো
বিক্রয়যোগ্য বিদ্বেষ অগ্রসর
উপমহাদেশের সুরম্য বুকে,
ঈশ্বর কি মাগে বিপ্লবসায়াহ্নে
তন্দুর রুটি, না জাগায় বিতৃষ্ণা?
উঠলে রুখে পর্বত মরুভূমি
থামে, আর ক্রমে ঝরে আশীর্বাদ

মা নেই; অথচ আছেন
সুপ্রভাত মেট্যা
মা। চলে গেলেন।
নব্বই একটা বয়সের গায়ে তিনি দুই চক্ষু, হাস্য মুখ, লাল ঠোঁট, শুকিয়ে যাওয়া জলের কষ্ট, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার নীল যন্ত্রণা, বুক ভর্তি মস্তিষ্কের হা-হুতাশ, ছেড়ে, তিনি চলে গেলেন দূরে।
কে সনৎ? পচু এলি? কচি নাকি?
বৌমা, কাল রাত্তিরে সুবোধকে স্বপ্ন দেখলাম।
সুপ্রভাত, আমার প্রেসারের ওষুধটা বোধহয় শেষ হয়ে গেছে রে!
না, এসব বলবার আর কেউ নেই। সমস্ত বলবার পৃথিবী পেরিয়ে, নীরবতার গাঢ় অন্ধকারে মা দূর সংসারসর্বস্বের লাউ ডাঁটার ঝোল, চাকা চাকা আলুভাজা, কলামচার তরিতরকারি
আর আমাদের ভালোবাসাবাসি মাখা আলুভাতের তালের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, কোনও অনুযোগ নেই, অভিপ্রায়হীন, স্থির।
আমাদের অনুতাপ, ভুল, আর ছোট ছোট অবহেলাজনিত অপরাধের চারদিকে আত্মা অদৃশ্যের ছবি হয়ে ঘুরে বেড়াতে বাড়াতে আশির্বাদ ছড়াচ্ছেন, আমাদেরই মঙ্গল কামনায় ঈশ্বরের ছায়া সংস্পর্শের আকাশের দিক থেকে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে হয়তো এই অশ্রুর সন্তানদের উপর।
আমরা মা দেখতে পাচ্ছি,
হাতের বাইরে থেকে, হৃদয়ের ঘরে, লাইট জ্বেলে বসে থাকতে থাকতে অনন্ত ডেকে চলেছেন, কইরে পচু এলি? কচি নাকি? সনৎ? সুপ্রভাত? বৌমা, সুবোধকে স্বপ্ন দেখলাম।

এই সময়
অর্কজিৎ সেন
এই সময় জোট বাঁধার
এই সময় ভালোবাসার
ফুল চাষের এইটাই সময়
আগুন নিয়ে খেলতে শেখার
এই তো সময়।
চিহ্নিত করণ করে চিনে রাখি
কারা চায়না আমাদের ভালো থাকা
কারা মিশিয়ে দিচ্ছে আমাদের খাবারে বিষ
কারা সরিয়ে দিচ্ছে আমাদের নিজেদের থেকে
জমায়েত করে তাদের উৎখাত করি চলো সবাই।
এই সময় চাই তীব্র লড়াই
এই সময় চাই পাশে থেকে
ভালবেসে একসঙ্গে সকলের
কাছাকাছি থেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে
নবজোয়ারে ভাসা।

ইট ভাঙা ব্যথা
তাপস কুমার দে
আমি ভাবি মৃত্যু
এক একটি রেখা ধরে
শব্দের পায়ে পা রেখে
ছন্দ কেটে কেটে
বুকে এসে বসা তুলতুলে শিশু
তুমি ভাবো প্রেম
সে তো নদী
বুক চিরে চিরে বয়ে যায়
জোয়ার ভাটার গান গায়
গলা থেকে পলি উঠিয়ে দ্বীপ গড়ে
আঁচলের গল্প ছিঁড়ে সলতে পাকায়
নিজেকে জ্বালিয়ে রাখে সবুজ লোহায়
সবুজ পাতায়
সবুজ গানের কিরণ মেখে দেহ দোলায়
দিব্যি দেয়
ইট ভাঙা ব্যথা ছড়ায়
অদৃশ্য দেয়াল গড়ে বিনা সুতোয়
মিথের মাথায় সূর্য রেখে পৃথিবী ভাঙে
পৃথিবী গড়ে
ভাঙা গড়ার খেলায় অশ্রু গাথে
অশ্রুর শিরায় মিথ জাগে
শ্লোগান জাগে
বাস্তব পরাবাস্তবের তুমুল আলোর ডানায় আমরা জাগি
চন্দ্র সূর্য
বুকের ভেতর নড়েচড়ে বানডাকে
তারা এসে চোখের মনিতে বসে
এক অনন্ত যাত্রায় আয়না ধরে
আয়নার ভেতর তুমিও নেই
আমিও নেই
শুধু একটি রেখা হাত দুলিয়ে ডাকে
মনে হয় বিভ্রম
আত্মগোপন
খয়েরী রঙের মলাটের মেয়েরা
জল জোছনায় কবিতাকে দিয়েছে আড়ি।।

জন্মচক্রে ফিরে অপেক্ষায়
অরুণ কুমার মহাপাত্র
অপেক্ষারা এখনো জেগে আছে ...
মনের ইচ্ছে উদগ্রীব হলে হবে কি
কোথাও যেন একটা নিষেধের আঙুল
সতর্ক করে ... ।
একান্ত নিবিড় উদ্ধত ইচ্ছেরা দেখি এখনো সুখ খোঁজে তন্ন তন্ন করে ...
নিমেষের সে সুখ !
তবুও ভাঙতে উদ্যত সীমানার সে পাঁচিল
পুরনো অভ্যাসে ...
স্বপ্নের উড়ানে শরীরী আদর আলগোছে
ছুঁয়ে যায় সমস্ত শরীর ...
জেগে ওঠে ঘুমন্ত শরীর ... ।
প্রিয় মুহূর্ত ফিরে পাবার আকুতি ।
দ্বিখন্ডিত মনে ম্রিয়মাণ আয়ুরেখায় এ যেন
ছোঁয়াচে অসুখ ... ।
তবে কি এখনো আমি ... ছুটছি নদীর
তির তির শরীর ছুঁয়ে দ্বন্দ্বের চৌকাঠ পেরিয়ে কোন ভোগবিন্দুর দিকে ... ?
সে যাই হোক ... ,
আমি কিন্তু পাতাঝরা গাছের শিকড় ছুঁয়ে
আনত দুই চোখ মেলে বুকের ওম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি জন্মচক্রে ফিরে আসার
অপেক্ষায় ... ।

ঝরাপাতা
অসীমা দে
খসে পড়া হলুদ বিবর্ণ পাতায় ঝড় ওঠে,
মুহূর্তে বাঁচার ইচ্ছে রা ইশারায় পাহাড় ছুঁয়ে আসে,
কি হবে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথ চেয়ে,
এসো হেঁটে আসি ঝরা পাতার গল্প মাখি,
আজ প্রেম আসে কথা গুলো ঝিরি স্নানে ব্যস্ত!
কমলা রোদের বারান্দা তে সাধের নকসী কাঁথা,
কত ফুল পাখি আদরে যত্নে,
ধরে রাখা সময়ের ইতিবৃত্ত মনে পড়ে ফেলে আসা স্মৃতির রোদেলা দুপুর,
ঝরা আবেগের মুহুর্ত রা আজো জীবন্ত সাধের নকসী কাঁথায়,
সে ছিল অতীত সবুজ পাতার ছন্দোময় জীবন গাথা,
সারা বেলা গাঁথা মালার ইচ্ছে পুতুল সেজেছে বহু যতনে,
বয়ে গেছে বেলা ময়ূরাক্ষীর জলে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে,
গোলাপি স্বপ্ন গুলোয় হলুদ আস্তরণ ধীরে ধীরে ধূসর মরুর বেশে এসে দেখাবে জীবনের কত ক্ষয় কত জয় পরাজয়!
কি হবে শুনে!
এসো ঘুরে আসি সন্ধ্যের পবিত্র গঙ্গায় কিছু সঞ্চয় থাক,
ঝরা পাতার বেলা শেষে মায়া হীন সংসারে চলো দু দণ্ড বসি
আবোল তাবোল কথা মালা দের শূন্যে ভাসাই,
সমুদ্রের ঢেউ ভাঙ্গা গুনে গুনে মনোযোগে সংখ্যা টা হোক ঠিক ভুল,
গোধূলির রং হৃদয়ে ছড়িয়ে বাকি পথ টুকু যাই এগিয়ে,
মুহূর্ত টা সত্যি বাকি কথা হয়তো বা বিচ্ছেদে ঝরাপাতার দরজায় কেউ কড়া নাড়ে,
অভিমানী মুখ আঁধারে লুকায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ক্ষীণ রেখায়,
নকসী কাঁথায় থেমে গেছে সময়
ময়ূরাক্ষীর শুকনো বালিতে শূন্যতার কালো মেঘ ঝড়ের পূর্বাভাস,
ঐ দেখো দুরে এখনো শিমুল পলাশ বসন্তের অপেক্ষায়,
লাল রং পশরা সাজানো সময় কে পেতে চায় প্রাণপণে,
বোবা কান্নার দৃষ্টিরা ঝরাপাতায় মিলে মিশে একাকার,
স্নিগ্ধ ভোরের সতেজতায় কুয়াশায় ঢাকা শুধু দুটি মুখ দুরে পাহাড়ী গাঁ,
বিচ্ছেদ নাকি ফেলে আসা ময়ূরাক্ষীর চর!
মুহুর্ত টি আজো বড্ড সুন্দর,
কি হবে জেনে পাহাড়ী বাঁকের গল্পে বেঁচে!!!!

অলিখিত সময়
অর্পিতা কুন্ডু
ভালোবাসা যদি বসন্তের কোলে মাথা রাখে...
আর শীতের রোদ্দুর মাখে... অমন ভালোবাসা আমার চাই না
যেদিন ঝরা পাতার উপর সুখের দিনগুলো মর্মর ধ্বনি তুলবে...
জোয়ারের উদ্দাম স্রোত ভাটার টানে হারিয়ে যাবে..
শরীরের সবকটা বাঁক যেদিন বয়সের ভারে কুঁকড়ে যাবে ..
তবুও তুমি থাকবে এক নিঃশর্ত সন্ধ্যায়...
সেই তুমি আর এই আমি ঋতু র মতো পাল্টে যাব
তবু হাত দুটো শুধু ছুঁয়ে থাকবে ....
অলিখিত সময়ে।

অরূপ
জয় ভট্টাচার্য্য
পশ্চিমের বাতাস কিছু পাতা নিয়ে এল দক্ষিণ দরজায়..
দাঁড়ানো বাসন্তী আঁচল বেয়ে উড়ছে ওরা
উড়ন্ত চিকুরচূর্ণের জালে গাঢ়নীল আঁখি স্রোত সবুজ সিঁথির কোল ঘেঁষে ওষ্ঠ মদির হাসি
ওরা বিহ্বল
বাসন্তী হৃদয় ঢেউ
দুলছে পলাশ মালা
জুঁই ঘ্রাণ দোলা দখিনা বাতাসে-
আঁখি অপলক সম্মোহিত হৃদয়
ঊর্ণনাভ মোহজালে অসার অস্তিত্ব..
পশ্চিমে মাঝি দাঁড় বেয়ে এল
চিল ছুঁল নদীর বুক বারংবার
শিকারি মাছরাঙ্গা তুলে নিল মাছের শরীর-
অভুক্ত নয় তবু..
কখন যেন গোধূলি এল;
রঙ মিলেছে নদীর বুকে
বিপরীতে বইছে তরণী
সব অবয়ব নিশির ছোঁয়ায় কৃষ্ণকায়..
“শ্যাম রাখি না কূল রাখি”!..ঘুরে দেখি উধাও দক্ষিণ দ্বার..
ওখানে নদীর শরীর এখন
দক্ষিণ জুড়ে শুধুই গোধূলির রঙ
গতি নদীর প্রবাহে
নির্বাক গোধূলির স্তব্ধ তীর..
সাঁঝ-আঁধারে দমকা বাতাসে শুধু পাতা ওড়ে।

আর্মি
শ্রী সুব্রত চক্রবর্ত্তী
প্রতিটি প্রিয় মানুষের শেষ কথা
ভালো থেকো! ভারতীয় সেনা !
তোমরাই আমাদের চির ভরসা
প্রদীপের নীচে থাকে আঁধার
মাথায় আছে ঋণের বোঝা
সঙ্গে আছে ঝড় তুফান
নিয়তি সর্বদা করছে পরিহাস
সুস্থ থেকো সবাই চিরকাল
চলতে হবে একা একাই
এই দুনিয়ায় কেউ কারো নয়
তথাপি তোমাদের নিরালস সেবায়
শান্তিতে আছে সকল ভারতীয় জনগণ।

জীবনের পথে
তপন কুমার নাথ
ছোট ছোট সুখগুলো
পকেট ভর্তি করে হাঁটি
জীবনের রাস্তায়...
অন্ধকারে পকেটে রাখা
জোনাকির মতো সুখগুলো
আমায় আলো দেয়
ছোট ছোট আলোর বিন্দুর মতো ---
অন্ধকারে পথ না হাতড়ে
স্বল্প আলোয় অল্প সুখে
জীবনের পথ পেরিয়ে চলে
আসি, কিন্তু কতোখানি যে
হাঁটতে হবে জানি না তা!
জানি হাঁটতে হবে এক
অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে
পকেটে রাখা ছোট ছোট
সুখগুলো নিয়ে,যারা
অন্ধকারে আমায় পথ দেখায়
জোনাকি হয়ে, গোটা জীবন টায়!

ভাবনা
সংবেদন চক্রবর্তী
দেশের ভাবনা যদি আমিও খানিক নিতে পারি
তবে কি দেশ হাল্কা? না আরও রকমের ভারী হবে?
ভারী বৃষ্টি হয়ে গেল তাও বেশ কিছুক্ষণ আগে
মেঘকে মৌসুমী বায়ু বলে ডেকে থাকি বর্ষাকালে।
আবহাওয়া দপ্তরের খবর এবারে বর্ষা বেশি।
গতানুগতিক বাংলা বাজার আমার পছন্দের
আপনার পছন্দের কোন কারণ নাই থাকতে পারে।
এতে আমার কিছুই ছেঁড়া যায় এমন ব্যাপার নেই।
একটা কবিতা লিখতে সফেদ পাতার মৃত্যু হয়
ছিঁড়ি আর টুকরো টুকরো করে ফেলে দিই
জীবনানন্দ দাশ প্রেম নিয়ে আসেন, ফেরেন
হয়না বলেই প্রতিনিয়ত হাজারবার চেষ্টা করি...

বুঝি
সোমশুভ্র গঙ্গোপাধ্যায়
আমি অসুখে সুখ খুঁজি
কখনো অবুঝ , আবার
মাঝে মাঝে খুব বুঝি
আমি , অসুখে সুখ খুঁজি
আমি বিয়োগে যোগ খুঁজি।
নিজের মনের টানাপোড়েন,
নিজের ভাবনা সঙ্গে যুজি।
কখনো অবুঝ, আবার কখনো বুঝি।
আমি , বিয়োগে যোগ খুঁজি।
আমি মরণে জীবন খুঁজি।
মৃত্যুই শেষ, জানি নিশ্চিত।
অবুঝের মত ভান করি ।
তবু , একটা কিছু আছে , বুঝি
আমি মরণে জীবন খুঁজি
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.