
এলোমেলো
প্রীতি সান্যাল
এলোমেলো
আজ আমার সবচেয়ে আপন শব্দ।
যেন বহুদিনের চেনা এক ঘর,
যেখানে জানালার ধারে ধুলো জমে থাকে,
পুরোনো চিঠির ভিতরে শুকিয়ে যায় নীল ফুল,
আর রাত নামলে আলোর বদলে
স্মৃতিরা এসে বসে থাকে নিঃশব্দে।
আমার চুল এলোমেলো—
কারণ বাতাস এখনও আমাকে চিনে রাখে।
আমার বিছানা এলোমেলো—
কারণ ঘুমের ভিতরেও আমি বহু জীবনের পথ হাঁটি।
আমার শব্দ এলোমেলো—
কারণ প্রতিটি বাক্যের পিছনে
একটা না-বলা কান্না দাঁড়িয়ে থাকে।
জীবনও কি খুব গুছিয়ে বাঁচা যায়?
যে নদী সোজা পথে চলে,
সে তো সমুদ্রের গভীরতা শেখে না।
যে আকাশে মেঘ নেই,
সে বৃষ্টি নামার ভাষাও জানে না।
আমার ভিতরে কত ভাঙা সিঁড়ি,
কত অসমাপ্ত দরজা,
কত নামহীন স্টেশন পড়ে আছে।
কখনও মনে হয়
আমি যেন এক পুরোনো রেলগাড়ি—
ধোঁয়ায় কালো, ক্লান্ত, তবু চলেছি
অদৃশ্য কোনও শহরের দিকে।
হৃদয়টাও এলোমেলো।
সেখানে কেউ এসে আলো জ্বেলে রেখে গেছে,
আবার কেউ
সব আলো নিভিয়ে চলে গেছে।
কিছু মুখ আজও কুয়াশার মতো ভাসে,
কিছু স্পর্শ
.প্র্ সকালের রোদ হয়ে
হঠাৎ এসে পড়ে হাতে।
তবু এই বিশৃঙ্খলাকেই আমি ভালোবাসি।
কারণ নিখুঁত জিনিসে প্রাণ থাকে না।
একটু ছড়িয়ে থাকা বই,
অর্ধেক লেখা কবিতা,
চায়ের কাপের পাশে শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ,
হঠাৎ ভোরে জেগে ওঠা একাকীত্ব—
এসব নিয়েই তো মানুষ।
আমি জানি,
আমার জীবন কোনও সুন্দর সাজানো অ্যালবাম নয়।
বরং ঝড়ে উড়ে যাওয়া কিছু পৃষ্ঠা,
যেখানে কালি লেগে আছে,
জল পড়ে দাগ হয়ে গেছে,
তবু প্রতিটি পাতায়
একটা জ্বলন্ত হৃদয়ের স্পন্দন রয়ে গেছে।
এলোমেলো বলেই আমি বেঁচে আছি।
গুছিয়ে গেলে হয়তো
আমি আর কবিতা লিখতে পারতাম না।

বনফুল
পুলক রায়
লোকালয় থেকে দূরে বনবাদাড়ে
অলক্ষে জন্মাই , নীরবে দেহ রাখি,
ফুলের জলসায় দুয়োরানি হলেও
রুক্ষ মাটিতে জীবনের ছবি আঁকি ।
আমরা বনফুল
অভাগা পুষ্পকুল ।
জন্মান্তরে যদি ফিরে আসি
সৃষ্টিসুখের বেদনার উচ্ছ্বাসে,
ঠাঁই যেন হয় পুজোর থালায়
রক্তজবার পাশে ।

বংশীধ্বনি
দেবজ্যোতি রায়
ইঁদুরের দাঁত ফুটে আছে চাঁদে!
আমার ছায়াকে কেটে কুচি কুচি ক'রে
বাতাসে উড়িয়ে দেয়, দাঁত।
সব তত্ত্বজ্ঞান, ছাতা ও গামছা কেটে
ইতিহাস ভারমুক্ত করে।
ওরা সুড়ঙ্গের প্রাণী, ক্রমশ সুড়ঙ্গ ধরে
স্বপ্নপাতালের দিকে নামে….
আপনি তখন অবলুপ্ত ট্রামডিপো থেকে
হাঁটতে শুরু করেছেন হ্যামলিন শহরের দিকে
ডাকাতিয়া বাঁশি অজ্ঞাত নদীর দিকে নিয়ে যায়।
গাড়িবারান্দায় একে একে জড়ো হল জাদুকর, প্রেত,
তস্করের নীলাভ নির্জ্ঞান।
পশ্চিমে টাকার থলি, পুবে ইস্তাহার
বাঁশি বাজে, বাঁশির সন্ত্রাসে,
বাঁশিওয়ালা, কৃতজ্ঞতা জানাই আপনাকে
কোথায়, কোথায় যেন—
টাওয়ার অব সাইলেন্স-এ আমাদের
শেষ দেখা হয়েছিল?

সংবাদ পরিক্রমা
অমিতাভ সেন
পানপাত্রে কিন্নরসুরা থাক রাতভর। মুখে সব আগুন মাখা। বাড়িওয়ালা বিধাতা সর্বদা। নজর রেখে চলে কোথায় ময়লা ফেলে ভাড়াটিয়া। হাড়কাটা গলির উমাপিসি বাস্তবধর্মের দায়ে চোখের জলে ছোপানো কোনো নাটকীয় চরিত্র নয়। বাবার নেমন্তন্ন থাকত ভাইফোঁটায়। আমার জন্য আসত আটার পুরি আর আলুর দম। কবে খড়খড়ি বুজে গেল অশথের হামলায়। কেউ দেবে না ঠাঁই জেনেও ক্লান্ত যৌবন ফেলে রেখে ঘুমঘোর জোছনায় এগিয়ে চলি স্বপনমোহনায়। এগোই কীটের প্রকল্প মেনে। কপোলে লিখি নিটোল স্থানীয় সংবাদ... সংবাদ পরিক্রমা বরুণ মজুমদার...

ব্যবধান
সুপ্রভাত মেট্যা
বৈষয়িক মেয়েমনস্ক ব্যাপার-স্যাপারে
ব্যবধান, বাস্তবিকই তা বাড়ে।
বিচ্ছেদ সম্পূর্ণতায়
প্রেম কখনও একা থাকে না।
যেভাবে যন্ত্রণা এড়িয়ে বিশ্বাসযোগ্যতায়
সেই সুখ এসে ঢুকে পড়ে,
তাকেও কি সন্দেহচোখ
তোমার বাড়ি অবধি দৌড় তাড়া করবে?
প্রেক্ষাগৃহ নীল, মানে অশ্লীলই; তা কেন হবে?
নীল তো শূন্যতা অপার, নগ্নতার, খোলামেলা ছবি,
শুদ্ধ ও সত্যের ঐশ্বরিক ছায়ায় স্থির হয়ে আছে!

আয়না টলটল অশ্রু
তাপস কুমার দে
কখনো স্মরণসভায় আয়না টলটল অশ্রু দাঁড়িয়ে যায়
কখনো অশ্রু তাড়িয়ে বেড়ায় শরীর স্বর্গলোক
কখনো অশ্রু মায়া দিয়ে জড়িয়ে ধরে চোখ শিখা।
কি ভাবে ধ্রুবতারা হয়ে ওঠে একটি মানুষ
একটি মানুষ কতো সুক্ষ্ম সুতোয় বাঁধা
একটি মানুষ কতো স্থির হিমেল হাওয়া হাওয়া কবিতা
ষড়ঋতু পায়ে চলে গেছে কতো আপন সময়।
কর্মই ধর্ম বাকি সব মিথ্যে হয়ে যায়।
মিথ্যে মানুষ খনন প্রকৃিয়ায় বহুরূপী প্রজনন
প্রজনন অর্থে কৃত্রিমতাকেই বুঝে নিলাম
মৌলিকত্ব কেবল মানবিকতার জলে থাকে
সে জল দিয়ে অশ্রু হয়, তৃষ্ণায় পরম তৃপ্তি আনে
যার উৎস্যে বসে আছেন আদি পিতা।
তৃপ্তির নায়ে কবি উঠেছিলেন কি-না জানি না
তবে বুঝতে পেরেছি নিজ আঙ্গিনায় থেকে দেখা যায় দেবদারু সতেজ প্রাণ।
যে প্রাণে বিদগ্ধ আলোছায়া ফসল ফলায়
একলা ফেরার প্রতিজ্ঞা আছে, পাখি পাখি রঙের খেলা আছে।
প্রতিটি আঙিনা ফুটিয়ে তোলা কবিত্ব নিয়ে ঘাস বোনে
আয়না টলটল অশ্রুতে আমি সেই কবিত্ব দেখলাম।

অপমান আর উপেক্ষা
ঈশিতা ভাদুড়ী
ইস্তানবুল থেকে জাফরানি রঙের
যে কৌটোখানি কিনেছিলাম পোর্সিলিনের,
ইদানীং তার মধ্যে সব
অপমান আর উপেক্ষাগুলি ভরে রাখি।
বদ্ধ কৌটোয় থাকতে থাকতে
কোনোদিন যদি
ফুলেফেঁপে বার হয়ে পড়ে তারা,
আর, শতগুণ হয়ে তারপর
ছুটে যায় যদি তোমাদেরই দিকে,
তখন অপরাধ নিও না আমার।
আমি তো আটকেই রাখতে চেয়েছি
তাদের বন্ধ কৌটোয়।
তারা যদি ফুলে উঠে ধেয়ে যায়,
কী দোষ আমার বলো!

কালবৈশাখী
অসীমা দে
ঝুরো হৃদয়ের গহীন গাঁ!
এলোমেলো বারান্দা ছেঁড়া শাড়ি বীভৎস বেয়াদপ,
থেমে যাওয়া প্রেমালাপে শুধু ছায়ামুখ,
বাস্তবতার জানালা ধরে দাঁড়িয়ে আছে সময়!
কত স্মৃতি কত আবেগ মাটিতে গড়াগড়ি,
যুদ্ধ শেষ,
রক্তাক্ত সাঁঝ নামে,
ঘরে ঘরে তবুও মঙ্গল শঙ্খ নিত্য যাপনের এক চিলতে জোনাক বাতি,
নতুন নির্মাণে বসুন্ধরার নব সাজ,
একঘরে কালবৈশাখী সটান উপত্যকায়,
ছায়া মুখে গোধূলির আন্তরিকতা,
আগামী ভোরের নব প্রত্যাশায় কাঁপা ঠোঁটে শক্তি ও সঞ্চয়!!
বহুদুরে ভেসে আসে রবীন্দ্র সংগীত,
নব ধারাপাতে খরস্রোতায় পুঞ্জীভূত মেঘেরা পরম্পরায়!!

প্রবাহে
জয় ভট্টাচার্য্য
দিনের প্রবাহ থেকে যে অন্ধকার তুমি তুলে নিলে
তার মধ্যে আলো আছে
নেই প্রতিফলক
কথার প্রবাহ থেকে যে নৈঃশব্দ তুমি নিলে তুলে
তার মধ্যে আছে অনুরণন
নেই সংবেদনীমন
সুগন্ধির ভিতর থেকে যে কটু গন্ধ তুমি পেলে
তার মধ্যে সৌরভ আছে
নেই ঘ্রাণশক্তি
রঙের বর্ণালীর থেকে যে বেরঙ তোমার চোখ ছুঁল
রঙ সুপ্ত শোষণে সেখানে
নেই স্ফটিক
যেখানে প্রবাহ আবেগের বেগে সেখানেও দেখো শ্লথতা যতি
শ্লথতাও প্রবাহিত অ বেগে
নেই আঙ্গিক
সত্যের প্রবাহে অসত্য দেয় ধরা কোথাও সত্য ব্যতিক্রমী
অসত্যের প্রবাহে স্তিমিত সত্য
নেই বোধ
আর সেইসব পরাক্রমী।

তুমি বিষয়ক ২
ফাল্গুনী ফাগুন ঘোষ
আমার একলা আমি'র দস্তাবেজে,
তোমাকে দোয়াত কালি বানিয়েছি।
দিন-রাত...
হিসেব-নিকেশ...
প্রেম-অপ্রেম....
বিপ্লব-দ্রোহ ...
যাই লিখি না কেন,
দলিলে তুমি ফুটে ওঠো।
শুধু দোকান ঘরের দেওয়ালে টকটকে পোস্টার,
" এখানে আবেগের বন্ধকী কারবার হয় না!"

ভাবছি
মলয় গোস্বামী
ভাবছি, জীবনের মাঝখানে একটা টর্চ জ্বালিয়ে রাখা দরকার |
এমনিতে কথাবার্তার মাঝখানে পড়ে থাকে আলপিন
ভালোবাসার মাঝখানে খচ্ করে মাথা উঁচু করে
ব্লেডের টুকরো
কোয়েলিয়া কোয়েলিয়া কোয়েলিয়া কবে উড়ে আসবে
কবে গান শোনাবে , তার জন্যে
খাটের উপর মাথা খুঁসে কেঁদে চলে মাস্টারমশাইয়ের
দোহারা মেয়েটি ...
অন্ধকারে হাঁটছি ...
ভাবছি, জীবন কি হাইলাকান্দির অধ্যাপকের
মাথার চুলের মতন কোঁকড়ানো
অন্ধকারে টর্চ মারলাম
টর্চ থেকে বেরিয়ে এলো সাপ
জীবনের মতন হিলহিলে আর রহস্যময় ...
আর ক্লাদামিনি ...

এক অনাবৃত নক্ষত্রগন্ধে
শিবালোক দাস
এক অনাবৃত নক্ষত্রগন্ধে পুনরায়
অনাবিল হও
মিশে থাকুক গন্ধর্বের শেষ ছাই
অথচ সবচেয়ে রহস্যময় ঘুণে যতটুকু
খুঁজে পাও প্রারম্ভিক অন্তর্যাম
তার খানিকটা তোমার ঋতুতে
নিবিড় হয়েছে..
স্বচ্ছ শ্বাপদে এগিয়ে তুমি আবার
তাকে গুণবান করো, আবর্ত!
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.