
সামান্য অসামান্য
মলয় গোস্বামী
সামান্য শুয়ে পড়ি | অসামান্য উঠে পড়ি |
' বিহানবেলা ' নিয়ে, শুধু ভেবে যাই |
ভেবে যাই সূর্যের ওঠা ও নামার কথা |
ভাবি সেই লেবুগাছের ছায়া | যে- ছায়ায়
একদিন এক ছেঁড়াখোড়া জামাপরা লোক,
মাথায় গানের মতন নীল- সূর্যালোক ,
ভাত খেতে আর ভাত খেতে খেতে
লেবুগাছের তলার ছায়ায় ---- শুয়ে পড়েছিলো |
শুয়ে ভাবি --- মা তখন লোকটার মাথায়
পাখা দিয়ে হাওয়া করছিলো ...
সামান্য শুয়ে পড়ি | শুয়ে শুয়ে
অসামান্য ভাবি |

আয়না
প্রীতি সান্যাল
কখনও মনে হয়,
আমার ভেতরে একটি আয়না জন্ম নেয়—
তার ভেতরে আর-একটি আয়না,
তারও গভীরে
একটি মুখ,
যাকে আমি কোনোদিন দেখিনি।
এভাবেই
আয়নার পর আয়না পেরিয়ে
আমি ক্রমশ নিজের কাছ থেকেই
দূরে সরে যাই।
যে রঙে আমি সকালে জেগে উঠি,
সন্ধ্যা তাকে আর চিনতে পারে না।
হাওয়া আমার নাম বদলে দেয়,
ছায়া বদলে দেয় আমার মুখ,
আর সময়
নিঃশব্দে মুছে দেয়
আমার পদচিহ্ন।
শুধু অনুভবটুকু থেকে যায়—
একটি অদৃশ্য পাখির মতো,
যে কোনো আকাশেই
নিজের জন্য একটি বাসা খুঁজে পায় না।
অনুভবেরও একটি গোপন দেশ আছে—
সেখানে কোনো ভাষা জন্মায় না,
কোনো শব্দের প্রবেশাধিকার নেই।
সেখানে শুধু আলো
নিজের ছায়াকে ছুঁয়ে থাকে,
আর নীরবতা
নিজেরই গভীরতায় ডুবে যায়।
আমি প্রতিদিন
এক মুঠো নীরবতা বুনে রাখি
সময়ের অনামা বাগানে।
হয়তো কোনো এক অচেনা ভোরে
সেই বাগানের অন্ধকার ভেদ করে
ফুটে উঠবে
আমার অজানা সত্তার
প্রথম ফুল।
তখন আর কোনো আয়নার দরকার হবে না।
নীরবতাই হয়ে উঠবে আমার মুখ,
আলো— আমার স্বাক্ষর,
আর অনুভব—
আমার একমাত্র জন্মভূমি।
তখন বুঝব,
যে অনুভবের কোনো ভাষা নেই,
সেই অনুভবই
আমার সবচেয়ে সত্য কবিতা।
সে কবিতার কোনো পাঠক নেই—
শুধু আকাশ,
একটি দীর্ঘশ্বাস,
আর আমার নীরব আত্মা।
তারা প্রতিদিন
অদৃশ্য কালিতে
আমার অস্তিত্বের নাম লিখে যায়—
আর আমি,
আয়নার ওপারে দাঁড়িয়ে,
প্রথমবার
নিজেকেই পড়তে শিখি

শিকড়
হিন্দোল ভট্টাচার্য
ক্রমশ পিছিয়ে যাই, জানি যে কার্নিস, তার ওপারেই খাদ
বুকের ভিতরে শুধু হুহু লিফট নিচে নেমে গেছে
যতবার শ্বাসকষ্ট হয়, জানি ফুলের ভিতর
কখনও কখনও তার পরাগরেণুর মৃত্যু অসম্ভব নয়।
কোথায় পিছিয়ে যাই? এক পা দু পায়ে
যেদিকে রয়েছে আরও পিছুডাক, খাদের ভিতর
অসীম বিবাদীবাগ, জনপদবধূদের মতো কিছু চিকন হোটেল
ক্রমশ পিছিয়ে যাই, যে শহর ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে
সেখানে তোমার সঙ্গে চলে যাব ভেবে
আজ শ্বাসকষ্ট বুঝি, এ শহর ভালো নেই আর
সমুদ্র এগিয়ে আসছে, নোনা হাওয়া জানলা দিয়ে সতীর্থ এখন
যে আসে আসুক, আমি এগোব না, পিছিয়ে যাব না

নবজাতকের নিশ্চিন্দিপুর
ধীমান ব্রহ্মচারী
অনুভূতিটুকু থাক তোমার অস্তিত্বে,
মেঠো পথ, লোক মুখে কৃষ্ণনাম জপ
আর অজস্র প্রশ্ন তুলে রাখি এক অজানা
ভবিষ্যতের জন্য...এই যে পথ বাউলের আস্তানা,
নিশ্চিন্দিপুর হতে পারে আমাদের নিজস্ব ভাবনায়
জলে ডুবন্ত পানকৌড়ি আর ভাসমান স্রোত আজও
আগলে রাখে একে অপরের তফাৎ, আষাঢ়ের মেঘ যেভাবে
ঘনিয়ে বর্ষা নামায় শুকনো মাটির বুকে,
সেভাবেই উড়ে আসে প্রেমের কোন বায়বীয় রসায়ন,
তন্দ্রাচ্ছন্ন মলিন মুখ তুলে দেখে নেয় কোনো কুলীন
পুরুষ, আর আমরা বিপ্লবের গান স্লোগানে স্যালুট দিই
লুপ্ত পৃথিবীর বিষণ্ন এক দুপুরে, যেখানে আমাদের
শৈশব শুধু স্মৃতি আঁকড়ে ধরতে যায় নব জাতকের জন্মক্ষণ...

দেহ
অমিতাভ সেন
থাকল দেহটা... হারিয়েও যদিবা
গেল গণনার
ভুলে বা এপার-ওপার যাতায়াতে
নসিবের ফেরে
সবকিছু ফেলে রেখে চ'লে যাওয়া
কি ভালো দ্যাখায়...
নিয়ে যেতে হয় সাথে দরদালান
বাসনকোশন
ভর ক'রে দেহ
বাঁচে তবু প্রাণ

ভুলে যাওয়া যে কী স্বাস্থ্যকর মানুষের
সুপ্রভাত মেট্যা
মেঘের দিন এই পরিষ্কার লেখা,
এখন যদি ধরো তুমি গঙ্গানদীর ধারে,
মৃদু বয়ে যাওয়া হাওয়ায় দূরে কোথাও
ওই যে নৌকামেয়ে,
ঝড় ওঠার ঠোঁট, লালটিপের আকাশ অন্ধ হলে,
শ্রাবণ শেষের কবিতা, তুমি কি আর ঘরে ফিরবে না?
বলো যদি, সরিষা ক্ষেতের হলুদ আলোয় বিকেল নামিয়ে, এখনই প্রেম ফলাতে পারি তোমাকে।
তোমাকে আগুন-ও বিহঙ্গ সমান উড়িয়ে দিয়ে
জ্বালিয়ে দিতে পারি এই ।
আমার সবজি বাগান না হয় তোমার সংসারে
যদি রান্নায় লাগে কিছু,
তোমার বিবাহ জ্যোৎস্নায় যদি
রাত্রি বিছানা ফুটে, সুন্দর হয় প্রেম;
তাহলে তোমাকে বলব ভুলে যেতে।
হ্যাঁ যাও ভুলে সে কথা।
ভুলে যাওয়া যে কী স্বাস্থ্যকর মানুষের,
সে তোমাকে আমি কী বলে, কী করে বোঝাব!

স্মৃতিজর্জর যাত্রিক
পুলক রায়
বৃষ্টি নামলেই কবেকার এসরাজ বাজে
বিষাদের গর্ভ থেকে কুড়িয়ে নেওয়া সুখ
আঁতিপাঁতি করে খুঁজি বন্ধ দেরাজে।
এপার-ওপারের মাঝে পথজোড়া দেওয়াল
হামেশা ভাঙচুর করি মনে মনে
তবুও অটুট থাকে, বিধির খেয়াল।
স্টিমারের বাঁশি শুনে স্মৃতিজর্জর যাত্রিক
শেষ পারানির কড়ি হাতে নিয়ে
তল্লাশ করে এক দেশ, নদীমাতৃক ।

বিয়োগান্ত
মল্লিকা দাশগুপ্ত
বিয়োগান্ত বৈভবে আড়াল লুকায় বিধবা সাজ,
আত্মভূক অঙ্গীকারে কাঙ্খিত উষ্ণতায়
মুক্তির পথ খোঁজে শতাব্দীর শেকড়।
কৌশিকী অমাবস্যায় তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে
অজস্র পাণ্ডুলিপি আহুতী দেয়
অপঠিত প্রশ্বাসের দীর্ঘ একাকীত্বে!
কূলহারা যে জাল ফেলেছে সমুদ্রের বুকে,
বিমূর্ত উচ্ছ্বাসে দুঃখ খুঁটে খায় সে,
শূন্য বুকে যাকে রাখা ছিল কোনো গোপন প্রয়োজনে!
ক্ষতের অহংয়ে দ্বিধাজন্মে যে ব্যথাফুল সাঁড়াশি প্রমাদে পাথর সয়,
হরিদ্রাভ আকাশের অতল ইচ্ছেয় এপিটাফে জায়গা রাখি,
স্মৃতিকলেবরে দাঁড়ি পড়ে, ধূমায়িত চোখে তার বিধবা সাজ,
ভাঙাচোরা সেতার আলগোছে বোঝায়
সে আমার মনের ভুল...

মোহাবিষ্ট আকাশ
তাপস কুমার দে
হাঁয়ের ভেতর ঢুকে পড়া ঘরবাড়িগুলো ভেতরকার রক্তনীল চেহারার সাথে বদলে নিচ্ছে হাড়ের হাওয়া আর মুছে যায় মোহাবিষ্ট আকাশ
মাংসের দেওয়াল ধরে চারপাশের মানুষেরা বেরিয়ে আসছে
যেখানে রক্ত বয়ে আসা নদীর উৎস বারবার আমাদেরকে ধর্মের অস্ত্র দিয়ে খুন করে
আমরা খুনের মতো ঘুনি ধরা দূর দূরান্তের পথে পা রেখে শূন্যে দুলছি
চাঁদটা ধীরে ধীরে একটি ঝুলন্ত ঝুলিতে ঘুমিয়ে পড়লে পায়ের তলায় সূর্য নিয়ে হেঁটে আসে যে আকাশ তাকে বসতে দিই আমাদের পাঠের আঙিনায়
চোখ মুছে পাখিপাখি শব্দে লিখতে থাকি দিনও লিপির গম্বুজ আর বেড়ে ওঠে হাত-পা গজানো শরীর
জীবন্ত ছায়া ঝরা ঢেউয়ে বৃষ্টি হবে বলে কিছু অন্তর্নিহিত মেঘ খেয়ে লবণের জীবন কেটে যাচ্ছিলো সরল রেখার অবস্থানে আর আমরা দিব্যি জলের ধোঁয়ায় ধাঁধিয়ে বেড়াচ্ছি প্রতিবেশীর শরীর
আমরা ঘুমাবো অথচ আমাদের মাথা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চাষাবাদের নির্ঘুম আইলের ফাঁটলে
আমরা ফসল নয় পুঁজ বয়ে নিয়ে আসছি শিরার মধ্যে নক্ষত্রের পাঁজর ভাঙা জোছনা থেকে।।
তাপস কুমার দে
খুলনা, বাংলাদেশ

রূপান্তর
জয় ভট্টাচার্য্য
মেঘ বিকেলের আকাশে তখনো মলিন আলো
রাতচরা পাখির দল নিয়েছে আকাশের দখল
মাঝ শ্রাবণের রোদ ঝলসানো দিনের অবসানে-মুখর প্রোমোদ উদ্যান তবু এক বিষন্ন বিরহ
যে বা যারা তাদের মনের ভিতর টের পেয়েছিল
এক অতি প্রাচীন প্রস্রবণ, কীট জীবনের শেষে-
বর্ণপক্ষে উত্তরণ, তাদের ঘিরে আছে এ মহাক্ষণ;
সবচেয়ে নধর ঘণ তরুটির নীচে অন্ধকার যেখানে গাঢ়
বিস্তর ফারাকে বসা দুটি জীবন ঘণ সন্নিবিষ্ট এখন,
তাদের আলাপচারিতায় বিরহী ক্ষণ, সেতু মেলবন্ধন ;
একজন প্রকৃতিগত সদ্য বিচ্ছিন্ন অপরজন জন্ম বিচ্ছিন্ন তবু প্রাকৃতিক;
দুই মন রেচকের কাল মনমন্থন- উঠে আসে অমৃত,
যে রস পানে তরুর বুদ্ধজীবন, মন ভরে প্রজ্ঞান;
একজীবন তার শূককীট জন্মলগ্নে টের পেয়েছিল পাখনার স্পন্দন
অন্যজীবন যার ত্রুটিহীন পূর্ণতা তবু অপরিপূর্ণ মন;
রুপান্তর যা অমোঘ, সৃষ্টিসঞ্জাত, আবহমান সেই স্রোতে-
দুই রূপান্তরকামী, এই উচ্ছল সন্ধ্যা তার বিপরীত অন্ধকারে;
তরুর শাখা, মূল প্রোথিত গভীরে যার সেও এসে হাত রাখে ওদের কাঁধে,
ওরা নামে ওদের গভীর গভীরে, টের পায় লাভার সমুদ্র গর্জন;
রূপান্তরিত প্রকৃতি, তার রঙিন বিচ্ছুরণ, উপগ্রহ আলোয় ছায়াঘণ যখন।

শূন্য
অসীমা দে,
এতো আয়োজন!
সুদীর্ঘ যাত্রাপথ,
দিন শেষে শূন্যের ভেলা,
ভেসে যায় একলাটি,
নিথর বসত ভিটে,
শূন্য রা ফেলে দীর্ঘশ্বাস!
ইতি উতি ভাঙ্গা জোড়া,
কত খেলা,
শূন্যের দালান কোঠায়
ঝুরি বট, অশ্বত্থের পরম্পরা,
কংক্রিট প্রেম,
খানিক অবসর সেই ময়নার চাহনি,
প্রস্থান শূন্যের বাস্তবতায়,
অশান্ত দিন রাত্তির,
রং তুলি বিবর্ণ ক্যানভাস,
শত সহস্র শূন্যের আদল!!!

কবিতা
শিবালোক দাস
আগুনের কাছে চেয়েছি ক্ষমা...
রাখো হাত, তলে শুকিয়ে যাক
অবশেষ...
আমি ধরে নেব, একদিন সমস্ত
লুকোচুরি এভাবেই গ্রহণ করবে।
তবু কি প্রাণ রাত্রিকালীন নয় ?
ফিরে আসার সাহসে তুমি নৌকা
ভাসাও বাহুডোরে,
ভাঙো প্রশ্ন, চিহ্ন, ঘূর্ণি !
দেখো, বাতাসে প্রাচীন গন্ধ
কেমন আনকোরা হয়ে যায়---

অভিপ্রায়
জবা ভট্টাচার্য
রাতভর হৃদযন্ত্র ঘসে মেজে,তোমাকে আলতো ছুঁতে চেয়েছি
যে হাতে তুলে দিয়েছি এতোকালের বিশ্বস্ততার পান্ডুলিপি
বুকের মধ্যে যে প্রতিশ্রুত শব্দসংকেত,দাউ দাউ আগুন
তাকে এক নিমেষের স্ফুলিঙ্গে পোড়াতে চেয়েছি।
সবটাই মিথ্যে প্রতিশ্রুতি,
দেবে বলে দাও না কিছুই
অথচ তোমাকে পাবো বলে এক পৃথিবী ভালোবাসি একাই
এবার যেতে যেতে মধ্যবর্তী বিরতিতে, সেখানেই যাবো
যেখানে দীর্ঘ যতিচিহ্ন শেষে তোমাকে পাবো।
সর্বনাশের শেষের আনন্দ জানে কি কেউ
এখনই সেই কাকচক্ষু সময়,আবেগের ঢেউ
মরসুম চলে গেলে নরম মাটির গন্ধ উড়ে যায়
সীতার অগ্নিপরীক্ষা সে তো ভালোবাসারই দায়।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.