
জোয়ার
পুলক রায়
বাঁশের সেতুর উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন
ঋজু অকুতোভয় মানুষটা,
আন্দামানে ইংরেজের নির্যাতনেও শিরদাঁড়া নমনীয় হয়নি ।
আজ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ফিরছেন
এই একটা দিনেই তাঁর কদর
বছরের বাকি দিনগুলোয় কেউ বিশেষ খোঁজখবর রাখে না ।
তবুও মাস্টারমশাই যান , এই একটা দিনেই
তাঁর রক্তে দুকূলপ্লাবী জোয়ার আসে
তিনি ফিরে যান বারুদগন্ধী যৌবনে ।

হোলি
রঞ্জনা রায়
মেঘ বৃষ্টির শিকারায় ভেসে চলে যাব বহুদূর
তখন হয়তো ছলাত্ ছলাত্ বাজছে জলনূপুর।
নুপুরে নূপুরে ছন্দ জেগেছে প্রজাপতি রূপকথা
কাব্যে নেহাত শিমুল পলাশ আগুনের কথকতা।
ঠোঁটে ঠোঁটে আজ আগুন জ্বালি বসন্ত বাতাসে
ক্যাফেটেরিয়ার ছোট্ট দুপুরে স্বপ্নে স্বপ্ন ভাসে।
মগ্নতাটুকু চাঁদ তারা সাজে আমার নিঝুম ঘুমে
জলনূপুরে ফাগ মিশে গেছে ফাগুনের মরশুমে।
নীল পাঞ্জাবি নীলচে আলো চুমু চুমু ফিসফাস
মিষ্টি দুপুরে প্রেম জ্বলে ওঠে একবার তুই হাস।
হাসি হাসি রাত উড়ন্ত নেশা জাদুকর যেন তুই
খেয়ালি ঝড় বিছিয়ে গেল যমুনা পুলিনে জুঁই ।
যত্নে রেখেছি ভালোবাসা যত রাইকানু রঙ্গোলী
জল থৈ থৈ মেঘলা দুপুরে খেলব দুজনে হোলি।

লোপাট
অমিতাভ সেন
'আর তো দেখি না' কিংবা
'আসছে না অনেকদিন'...
উপসংহার এমনতরো অপেক্ষা করে আকছার
অনেকের তরে...
কর্মে দক্ষ এরা...
নামে কম পরিচিত,
জ্যান্ত ল্যান্ডমার্ক এরা...
পাঁজরে হালকা ধাক্কা...
বিষাদ জানুদেশে লাগাতার...
অন্ধকার ছিঁড়ে হাত বাড়ায়
এদের দিকে...
কোন অক্ষরেখা?
বেমালুম লোপাট
এদের চেহারা... চরিত্র...
আর সব...

কথাটা পাড়িস না খোকা
সুপ্রভাত মেট্যা
কথাটা পাড়িস না খোকা,
বলে, মা উঠে চলে গেলেন ঘরের ভিতর।
মা-তো মঙ্গলময়, ছেলের ভালই চান সবসময়, হাতে।
নিভু অন্ধকারে ফুটে উঠছে পথ।
ধুলোর অলসতা, কাটিয়ে,
পরীশিশিরডানায় পড়েছে আলো।
কত কী বলার দৃশ্য, কত কী জানার ছন্দ,
ছাদে মেলে দেওয়া তারে ঝুলে আছে কবিতা কাঠামোয়।পাশাপাশি বিকেলবয়সী মেয়েদের
গল্পের সাথে হলুদ রোদ, শীত শীত ভয়,
সংসার ছায়ায় মায়ায় লেগে আছে, মৃদু।
এলোমেলো, কাটাকাটি কথা ঘুলঘুলির অন্ধকারে,
গলিপথ, কিংবা হালকা আলোর বিছানায়;
তুমি কি ঝড়ের কথা ভাবছ?
কথাটা পাড়িস না খোকা,
মা আজও বলে চলেছেন যেন!
কী সেই কথা?
কেন তিনি বলতে বারন জটিলতায় থম মেরে আছেন?
তবে কি কারন সে-ই? কী সেই কারন?
সংসার, সমাজ, নাকি সম্পর্ক?

চোখ
অর্কজিৎ
চোখ রাখি জানালার বাইরে
রক্তাক্ত হয়ে পড়ে গেছে পৃথিবী
ক্ষয়িষ্ণু নদী যেন বিষন্ন নারী
আর্তনাদে কান পাতা দায় ..........

অন্তর্গত বিপ্লব
তাপস কুমার দে
মৃত ঘাসের লাশ মাড়িয়ে যখন আমরা শব্দের স্বর বোঝার চেষ্টা করছি তখন পায়ের ওপর পা দোলানো সন্ধ্যা বসন্ত ছুঁই ছুঁই
অদৃশ্য সুতোর রহস্য ছিল শব্দের খেলায়
আমরা নীল জোছনার পান্ডুলিপি খুললাম
আক্রমণাত্মক শব্দগুলো বাতাসকে নিয়ন্ত্রণ করছে
ধর্মই নাকি কর্মকাণ্ড
মানুষ পিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে মস্তিষ্কে
মানুষ বহন করছে বারুদের হৃদপিণ্ড
বিরক্তিপূর্ণ উক্তিগুলো ইতিহাস গড়ছে
মুছে যাচ্ছে ঐতিহাসিক পারদের জল
একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতর আটকে আছে
আর কাঠের পরাকাষ্ঠায় আমরা খোদাই হচ্ছি
আমাদের অনুভূতিগুলো বসন্তপূর্ব হাওয়ায় ছটফট করছে
ভেতর পৃষ্ঠে লোহার আকাশ জন্মায়
স্বরবর্ণের অন্তর ছিঁড়ে বানিয়েছে সূর্য
অন্তর দৃষ্টিতে আগুনের লেলিহান
খালি গলায় গাইছে আধ্যাত্মিক অঙ্গের গান
আমরা সেই সূর্যের অন্ধকারে এক যুবতী মন পড়ছি
আর বসন্ত খুঁজছি
আমাদের মুখগুলো সেলাই করছে ব্যঞ্জনবর্ণের বীরোচিত দাঁত
এক অদ্ভুত ব্যঞ্জনা কবিতার চরণ ধরে ঝুলছে
প্রজন্মের কিছু শব্দ পাশকেটে চলে গেল
একটা কবিতার সাথে আর একটা কবিতার মিল খুঁজে পাচ্ছি না
অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো কে কার পকেটে ভরে নিয়ে গেল
পথের মোড়ে এসে মনে হচ্ছে আমরা কোন গভীর কূয়োর ভেতর নেমে যাচ্ছি।

অনুপস্থিতির স্থাপত্য
কাজল মুখোপাধ্যায়
কখনও হঠাৎ হাত ফাঁকা হয়ে যায়
যেন জীবনের টেবিল থেকে
নিঃশব্দে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে
একটি বহুদিনের পরিচিত ভার।
ঘর তখনও একই থাকে
দেয়াল, জানালা, আলোর অভ্যাস ,অপরিবর্তিত,
তবু বাতাসের ভেতর
অর্থের বিন্যাস ধীরে সরে যায়।
আমরা দাঁড়িয়ে থাকি
সেই অনুপস্থিতির সামনে
যেখানে একটু আগে ছিল
অভ্যাসের নীরব আশ্রয়।
কিছু বিদায়
অদৃশ্য নির্মাণের মতো
যেখানে অচেনা কোনো স্পর্শ
আমাদের হাত হালকা করে দেয়।
আর তখনই বোঝা যায়
শূন্য হাতই নতুন দিগন্তের মানচিত্র।

অন্য বসন্ত
অসীমা দে
প্রেমিকের ঠোঁটে একটুকরো বারান্দা,
মেয়েটি হেঁটে যাচ্ছে আকাশ ছুঁতে"
যাত্রা পথে অসংখ্য ঋণ!
পলাশের ভাঙ্গা পাঁজরে বসন্তের আঁচড়!
তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে মেয়েটির শরীর,
চারিদিকে বসন্ত উদযাপন,
ভ্রুক্ষেপহীন রাজত্বে বহাল তবিয়তে
অন্য বসন্ত!!!

যুদ্ধ
কলমে অর্পিতা কুন্ডু
করমচা রঙের ফুলদানিতে তুমি
একশো গোলাপ রেখেছিলে,
আমি আসবো বলে,
ওই দূরে নীল ব্যালকনির রেলিংয়ে নবজাতকের ছোট জমা শুকোছে,
দেখো উঠোনে জাতীয় সংগীত প্রথম পাঠে শিশুদের চঞ্চল মন
জানো কাল ফুলদানিতে জল দিয়ে রেখেছি যদি শুকিয়ে যায়।
যদি ভুলে যাও মায়ের পুরোনো কাশির ওষুধ আনতে।
কিন্তু না আজ আর সূর্য ওঠেনি
আকাশে বোমারু দানব
নিমেষে শিশুদের কান্না থেমে গেল,
মায়ের শিশির ওষুধটা আর আনা হলো না...
করমচা রঙের ফুলদানিধ্বংস স্তুপে উঁকি দিচ্ছে...
ইচ্ছেগুলো এভাবেই থমকে গেল সেদিন..
ঢেকে গেছে শহরের নিষ্প্রাণ দেহ...
যুদ্ধ বলে একটা শব্দ তখন প্রবল বেগে আছড়ে পড়লো..আমি তখন একা...

অশ্বমেধী ঘোড়া
জয় ভট্টাচার্য্য
আমার ভিতরে থাকে অশ্বমেধী ঘোড়া
আমার জীবন যৌবন জোড়া
অতীত গহ্বর থেকে ক্ষুরধ্বণি আসে
চিত্ত বল্গাহীন তার গ্রাসে
সেই বেগ ভেঙ্গেছে নগর ঘর
ভেঙ্গেছে আগল যত পরষ্পর
রাশহীন স্বাধীন সে টেনেছে মন
করেছে আভূমি চির বিচরণ
আমার অনুভবী সে ঘোড়া লাগামছাড়া
যদি তুমি দেখো কোনোদিন আশেপাশে
রাখো তব ভার আশ্বাসে
গভীর বিচরণ তবু থেকো অকুতোভয়
দিও নির্ঝরিণীর গোপন প্রশ্রয়
ছোঁবে যত শিলায়িত পর্বত কন্দর
অনুরিত মন্দার উত্থিত মন্থার
তরঙ্গে ভেঙে দেবে আজানুর জঙ্ঘার
রবাহূত হ্রেষায় কেকা ঢেকেরবে
বল্গাবিহীন সেই অনুভূতি দিগন্ত ছোঁয়াবে।

এপ্রিল ফুল
সুব্রত চক্রবর্ত্তী
আবার একটা ধাক্কা দিল
পুরাতন হয়ে গেল একটি সাল
আবার ওঁরা বলবে সবাই
এসো হে বৈশাখ।
বৈশাখী বৈঠক হবে নববর্ষের দিন
ঘর্মাক্ত শরীরে বেছে নেবে বাতানুকুল ঘর
চর চর করে বাড়বে তাপমাত্রা
অথচ কৃষক শ্রমিক করবে কাজ,একা।
ফুটিফাটা মাঠে শ্যালোর জল
হাল বলদ নিয়ে রোপণ করবে ফসলের বীজ
ওদের নেই কোন বৈশাখ
দুঃখ যাদের সাথে, সর্বক্ষণ।
বড় ইমারত,ক্ষয়ে যাওয়া পথ
সূর্যের প্রখর তাপে, চলবে কাজ
দিনান্তে মজুরি এতটাই মিলবে
ওদের ঘরে কষ্ট বিরাজ করবে।
বাঙালির প্রাণের একজন ঠাকুর
তাঁকে নিয়ে সকলে ব্যতিব্যস্ত
তিনি নীরবে শুনবেন
গঙ্গা জলে গঙ্গাপূজো চলছেই।
আমি সেদিন করে নেব বরণ
ইংরেজি বাংলা দুই সনকেই
যেদিন,শিক্ষা,স্বাস্থ্য,খাদ্যে এবং কর্মের
হবে যোগান অপ্রতুল,করবে না,কেউ,এপ্রিল ফুল।

একটি খুন অথবা আবেগের গল্প
ফাল্গুনী ঘোষ
খান খান হয়ে ভেঙে
টুকরো টুকরো ছড়িয়ে পড়েছিল
আমার আবেগগুলো।
কিন্তু হাট সেদিন বসেনি।
বিক্রয়যোগ্য থাকলেও
খরিদ্দার ছিল না আবেগের।
আমার আবেগ
আহা, আলতো আবেগ
আমার আদুরে আবেগ
আহা আতুসী আবেগ
আমার সমস্ত যন্ত্রণা একদিন
আমার বাগানে ফুল হয়ে ফুটল।
এই সহজ কথাটি বুঝলাম
একটি ভালোবাসা বাঁচাতে গেলে
অপর ভালোবাসাকে খুন করতে হয়
নিজের দু হাত দিয়ে।

খালি পৃষ্ঠা
সোমশুভ্র গঙ্গোপাধ্যায়
কোথায় যাচ্ছ কবিতা?
আছো কেমন?
বেঁচে আছো?
নাকি কোনো অদৃশ্য গলির মোড়ে
পড়ে গিয়েছ অকস্মাৎ?
কবে শেষ তোমাকে দেখেছিলাম মনে নেই।
এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে—
কলেজ স্ট্রিটের ভাঙা ফুটপাথে,
একটা বইয়ের পাতার মধ্যে তুমি
হালকা কাঁপছিলে।
শীতে নাকি ভয়ে,
জানিনা।
কেউ তখন দাম করছিল—
দশ টাকা কমাও দাদা,
পাতাটা একটু ছেঁড়া।
আমি মনে মনে বলেছিলাম—
পাতা ছেঁড়া নয়,
সময়ের হাত একটু বেশি ছুঁয়েছে
ব্যাথা লেগেছে। আবার ভালোও লেগেছে।
কাঁচা বয়েসের প্রণয় যেমন হয়।
শহরটা এখনো আছে—
ট্রামের ঘণ্টা বাজে,
চায়ের ভাঁড়ে ধোঁয়া ওঠে,
পুরোনো লাইব্রেরির জানলায়
ধুলো জমে থাকে ঠিক আগের মতো।
শুনেছি এখন নাকি তুমি
ডিজিটাল হয়ে গেছ—
পিক্সেলের মধ্যে থাকো,
হ্যাশট্যাগে জন্মাও,
আর লাইক পেলে বাঁচো।
কিন্তু আমার তো মনে পড়ে—
তুমি একসময় বেশ অন্যরকম ছিলে।
কোনো মফস্বলের ছেলের প্রথম প্রেমপত্রে,
এক রাতজাগা ছাত্রের খাতার প্রান্তে
বা কোনো বৃদ্ধ কবির প্রায় শেষ নিঃশ্বাসে।
শব্দের আগে সেখানে জমাতো নীরবতা,
এখন সেই নীরবতাও নেই।
সবাই খুব কথা বলে।
কেউ শোনে না।
এই ভিড়ের শহরে দাঁড়িয়ে
আমি মাঝে মাঝে ভাবি—
তুমি কি সত্যিই মরে গেছ?
নাকি একটু অভিমান করে
কোনো পুরোনো ট্রাঙ্কের ভেতর
ঘুমিয়ে আছ?
হয়তো কোনো লাইব্রেরির অন্ধকার তাকের উপর
ধুলো জমা মলাট মধ্যে,
চুপ করে বসে আছ—
কেউ যদি খুলে পড়ে,
আবার জন্ম নেবে বলে।
তাই আবার ডাকি—
কোথায় যাচ্ছ কবিতা?
আছো কেমন?
বেঁচে থাকলে একটু খবর দিও।
এই শহরে এখনো
কিছু মানুষ আছে
যারা রাত জেগে আছে
তোমার জন্য
একটা খালি পৃষ্ঠা বুকে করে।
তুমি আসবে বলে
খালি পৃষ্ঠায় বসবে বলে।

ভবিষ্যতের জিত হবেই।
তড়িৎ চক্রবর্তী।
তাই।
প্রত্যেকটা রক্তের ফোঁটা জ্বলবে।
মায়ের পোড়া নাভির শপথ-
স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা তুলবো।
তোদের নপুংসক বীর্য পুড়বে হাজার ঘৃণায়।
তোদের শত পাপের উপর মায়ের মিনার গড়বো।
আমার পিঠে চাবুক মারো।
ক্ষত বিক্ষত হতে চাই।
তোমার বুটের আঘাতে বিভৎস করো,
আমার মুখমন্ডল।
গরম লোহার শলাকা প্রবেশ করাও মলদ্বারে।
আমার প্রত্যেক মা রক্ষিত হোক
আমার পবিত্রভূমিতে।
তবু আমি। উত্তর পুরুষের সুরক্ষার গীত।
তোর হিংস্র পাশবিক মুখ,
ভেঙেছে শুকনো ব্যারিকেড।
গান্ধারীর নিস্তব্ধতা কেড়েছে মানবিকতা।
তাই।
নিশ্চয় তুই হারবি সুনিশ্চিত হবে ভবিষ্যতের জিত।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.