
ইচ্ছে নদীতে এঁটেছি মাস্ক
তরুণ চট্টোপাধ্যায়
আজ রাতে যদি আমার মদ্যপান করতে ইচ্ছে করে
আমি কি চলে যেতে পারবো গোয়ায়,
নিদেন পক্ষে আইরিটোলায়,
বড়জোর সন্ধ্যায় ধর্মতলা কিংবা চায়নাটাউন।
আজ রাতে যদি আমার কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে
আমি কি চলে যেতে পারবো পালামৌ কিংবা ডুয়ার্স
নিদেন পক্ষে লাল পাহাড়
বড জোর দিঘা কিংবা পুরী বা দার্জিলিং।
আজ রাতে যদি ইচ্ছে নদী এসে ভর করে
আমি ফুলঝুরির মতো জ্বলতে জ্বলতে
মশালের মতো পুড়তে পুড়তে কোথায় আর যাব।
বড়জোর দু চার লাইন,
গৃহস্থের দরজায় আঁটা সাইনবোর্ড
কেউ এসে বলবে না চল ঘুরে আসি।
গৃহী না সন্যাসী কাঁকড়া বিছে দংশনের ওষুধ
খুঁজতে খুঁজতেই বেলা শেষে।
ইচ্ছের মুখে কুলুপ লাগিয়ে বরং
কাল বাজার থেকে রজনীগন্ধা কিনে আনবো।
আমার ছবির পাশে সে মালা ধূপ চন্দন রেখে
নিজেই মালা পরাবো আমার ছবিতে।

রাতের হিমেল বাতাস
ডাঃ প্রনব কুমার ভট্টাচার্য।
তুমি কি শুনতে পাও, প্রফেসর?
এই হাওয়ার কানাকানি?
বইয়ের পাতায় পাতায় যে শব্দেরা নাচে,
সেগুলো কি কখনো তোমার নাম ডাকে?
কাল রাতের বৃষ্টি ভিজিয়ে দিয়েছে আমার জানালা,
আশ্চর্য তোমার চোখে এখনো শুকনো মরুভূমি,
আমি যেন ছায়া হয়ে বসে থাকি,
তোমার কথারা আলো ছড়ায়,
আমি নীরব। প্রদীপের মতো জ্বলি।
তুমি বোঝাও মহাকাশের ব্রহ্মান্ড এর ব্যাখ্যা,
আমি খুঁজি মনের অভিকর্ষ।
তুমি বলো, “স্ট্রিং থিওরী ,”
আমি ভাবি, প্রতিটি কর্মের প্রতিক্রিয়া
তুমি কি জানো,
নদীর জল চুপচাপ ভাসায় যেসব ভেলা,
সেগুলোও একদিন সমুদ্র চায়?
তোমাকে ছাড়াই আমি আজকাল বইয়ের পাতায় দাগ কাটি,
একদিন তুমি যদি বুঝে ফেলো—
এই বাতাস কি শুধুই বাতাস ছিল?
তুমি কি দেখেছো, প্রফেসর?
আলো-আঁধারের ফাঁকে ফাঁকে
কোনো এক ছায়া গলে পড়ে
স্মৃতির নির্জন পঙ্ক্তিগুলোয়?
আমি এখনও অপেক্ষায়,
সমুদ্রের ঢেউ যেমন ফিরে চায় আকাশ,
তুমি কি বুঝবে কখনো
আমার শব্দেরা কোথায় ভাসে?
রাতের হিমেল বাতাস
তোমার কাচের জানালায় আঁকে
নিস্তব্ধতার ভাষা,
তুমি কি পড়তে পারবে
সে নীরব ছন্দ?

আবহমান
পাপিয়া নন্দী
অনন্তকাল ধরে জীবনের আবর্তে ঘুরতে ঘুরতে,
ক্লান্ত চেনা পথগুলো,
আজ অচেনার ভঙ্গিতে।তাকিয়ে দেখে !
অনেক দিনের চেনা গলিটা দিয়ে,
নির্দ্বিধায় হেঁটে আসতে আসতে---
একসময় থমকে দাঁড়াই।
মনে হয় যেন, ওরা আমাকে প্রশ্ন করছে।
আমি কি ওদের কাছে অচেনা?
শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে---
হাঁটছি ধিক্কার আর লজ্জার মধ্যে---- দাঁড়াতে পারি না, নিজের সামনে।
মনে হয় যে পৃথিবীর পবিত্রতার মধ্যে দিয়ে, যাত্রা শুরু করেছিলাম,
আজ পৃথিবীজুড়ে জমে আছে,
ভয়ংকর জিজীবিষা।
এই পরিক্রমার অন্তিম লগ্নে বড় একা, অসহায়,
এক অস্তিত্ব সংকট তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আমাদের।

নিজের কথা
তপন কুমার নাথ
কতোদিন জানা হয়নি একবারও
'আমি কেমন আছি?...'
সবার খবর নিতে নিতে ক্লান্ত
আমি ভুলে গেছি আমাকেই!
হৃদয়ে বাঁসা বেঁধে থাকা
অন্যের নামটা বারংবার উচ্চারণ
করলেও নিজের নামটা কি রকম
স্মৃতির গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার
উপক্রম! 'আমি কি ভালো
আছি আদৌও...?' প্রশ্নটা
এখন আমাকেই করা দরকার।
অন্যের ভালোমন্দের ঠিকেদারী
তো অনেক হলো, এবার না
হয় একটু নিজের কথা ভাবি---
নিজের ভালো মন্দে অন্যের
আসে যায় না ঠিকই, কিন্তু
নিজের ভালো মন্দের খবর
না জানলে অন্যের ভালো
মন্দের হিসাবটা মিলবে কি
কখনই? একবারও সেটা ভাবার
অবকাশ হয় নি কখনই---
অতএব, এবার একটু নিজের
কথা ভাবার সময় চাই-ই চাই!

ঝরে পড়া
তাপসী লাহা
ভিজে শহরের দর্পণ থেকে মুছে যাও যদি
মুছে যাও যদি স্বনামে ও বেনামে
পোক্ত আঁচলের কারখানায় চেনা সুখ ছেড়ে যদি উড়ে যায় পাখি
উড়ে যাও খুলে দাও পাখনা বরাভয়
উড়ুক রাত এবার
স্ট্রিট ল্যাম্প ছুঁয়ে ব্যাকরণ ধাঁচে নর্দমা
এড়োনো যুদ্ধরা থিতু হলে মোড়ে মোড়ে পাখিদের পাঠশালায় ফেরি করে মায়াচোখ
আমরাও শিখি কথা শুনি হিং টিং হাসি
রাশিরাশি
ভুলে যাই ঝড় ছিল গতরাতে
বাজপড়ে মরে যাওয়ার বয়স জেনে জানালায় থমকানো স্ট্রিট ল্যাম্প,
সিক্ত চৌহদ্দি জুড়ে হুইশল বাঁশি, কান্না কান্না ঝরে ওরা কারা !

শুদ্ধ উত্তরণে
তপন মুখার্জি
এই আশ্বিনেই এসেছিলে।
জলমাটি নিয়ে তৃষাস্নানে মেতেছিলে সারাদিন।
জন্ম জন্ম আত্মবিস্মরণ শেষে
ক্ষুধা ও অন্নের মাঝে
মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে এসেছিল নদীও।
তখন তুমি আত্মমগ্ন,
হৃদয় মন্দিরে বাজাওনি শাঁখ।
ঢেউ হয়ে নদী তাই কান্নার নির্যাসে
ভাসিয়েছিল আমার অনিদ্র দুই চোখ।
সম্পর্ককে এত সহজে ভাঙতে দেওয়া যায়?

বৃষ্টিরাতের উপাখ্যান
সুমিতা চৌধুরী
অঝোর বৃষ্টি হল সারা রাত জুড়ে
কত না জলছবি এঁকে,
নিঝুম রাতের তন্দ্রা ঘোরের
গলিপথে এঁকে বেঁকে।
কোথাও বুঝি স্বপ্নে বিভোর
দু-জোড়া আঁখি,
গোলাপ বিছানো স্বপ্ন পথে
দূরত্বকে দিলো ফাঁকি!
রাতপাখিটা ভিজে ডানায়
পাতার আড়াল খুঁজে,
বৃষ্টি ভেজা রাতকে দেখে
সঙ্গীনীর ব্যথা বুঝে।
কোথাও প্রেমের ওমে
বৃষ্টিরাত মাতোয়ারা,
কোথাও চরম অসহায়তায় আশ্রয় খোঁজে
চির উদ্বাস্তু ঠাঁই নাড়া।
বৃষ্টিরাতের অবলোকনে
পথ লেখে এমনই কত উপাখ্যান,
কালের যাত্রায় সফররত যাত্রীদের
জীবনই সে লেখার উপাদান।।

বেলা শেষে
সুবীর পাল
প্রথম দিনের মতো একই আছো আজও।
চশমাটা নাকের নীচে শুধু ফ্রেমটা পাল্টেছো।
নীল রঙের শাড়িটাও প্রথম দিনের মতো।
তবে - সেদিনের উচ্ছলতায় ছিল বসন্তের ছোঁয়া, আর আজ গ্রীষ্মের দুপুর।
এক কাপ কফিতে ছিল স্মৃতির ছোঁয়া
মনে পড়ে যৌবনের কত সাহসী পদক্ষেপ।
এখন কিন্তু সব হিসেব করে চলতে হয়
ঠোঁটের কোণে তাই হয়তো মাপা হাসি।
ফাগুন হাওয়ায় এখনো মাতন লেগে আছে
নিশব্দ প্রকৃতির বুকে ঝরে পড়া পাতার শব্দ ।
আবার এসো কিন্তু একদিন- কোন এক সন্ধ্যায়
বেল শেষে দিগন্তের পাড়ে সূর্যাস্ত দেখব।
সূর্যাস্তের শেষ বেলার পড়ন্ত নরম আলোয়
তোমার গান শুনতে শুনতে আমার মনে হবে প্রথম দিনের কথা -
সোনা ঝরা রোদের সেই গান -
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে অনাদি অনন্ত মহাকাশে।

তছরুপ
শিখর চক্রবর্তী
সব অঙ্ক কি আর মেলে?
কত সহজ করে নিই -- ধরে নিই এক্স মানে বেঁচে আছি, কারণ
আজ তৃপ্তি করে পুঁইশাক চচ্চড়ি খেলাম,
দু চারজনকে "বেশ আছি" বললাম।
কিন্তু তারপরই কে সূত্র হিসেবে লিখেছে --
বড়ো বেশি শ্বাস বায়ু খরচ, আরও যা বরাদ্দ --
এই আর্দ্রতা, ডাকনাম, স্কোয়ার ফুট, প্রিমিয়াম সব হিসেব বহির্ভূত,
আরো কতদিন, এভাবে ...!
একটি লাল শাড়ি পরা দিদিমণি ক্রমাগত আসা যাওয়া করে
পথ কাটাকুটির ঢ্যারা কেটে দেয়,
জোর করে মেলালেও ধরা পড়ে যাই।
উত্তরে হতো -- বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে যতদিন বাকি,
তাকে শূন্য দিয়ে ভাগ --
মোদ্দা কথা, পুরোটাই অসীম তছরুপ,
-- সঙ্গী মেধাবীটি বলে দিলো কানে কানে।

ফিরে যাবো শব্দে তোমার
স্নেহাশিস সৈয়দ
শব্দ বিলীন হলে আমি ফিরে যাবো
ফিরে যাবো এই রাতের অন্ধকারে। লিখবার মতো ভাষা নেই ; নেই কোনো আনন্দ উৎসব, বৃষ্টি ভেজা স্বপ্ন....... ভিজে যাচ্ছি ক্রমশ চাঁদের আলোয়। ফিরে যেতে বলো যদি--তাহলে ফিরে যাবো...
তুমিই তো দিয়েছো, রক্ত জবার অভিমান, ভালোবাসার কাব্যপাঠ...
বন্ধুদের হিংস্রতা আমার দু'চোখে
পড়ে নাও বৃষ্টির ভাষা – আমার দেহে সব -অস্থি কঙ্কালে
পাগল পৃথিবীর আঘাতে এ-আত্মা আমার ছিন্ন-ভিন্ন করেছে শরীর...সত্যি এ সব...
হে সন্ধ্যাকাশ এসো, ফিরে যাবার আগে কিছুক্ষণ এক সঙ্গে কাটাই দুজনে।

সফর
যশোদা নন্দ গোস্বামী
গোনা দিনের হিসেব টা যদি জানতে,
মিথ্যে বোঝা টানতে ?
কখনও রোদে কখনও চাঁদে,
কখনও সাগরে ভেসে -
জীবনটাকে কাটিয়ে দিতে
সুযোগ পেলেই হেসে।
শরীরটাতে নেই তো তোমার ডানা -
মন ছোটাতে কে করেছে মানা ?
পোষা পাখি খাঁচায় যেমন বন্দি -
তক্কে তক্কে থাকে !
মনে তাহার - শিকল কাটার ফন্দি !
তুমি ছাড়াও উঠবে রবি ভোরে -
সঙ্গী সাথী থাকবে একই ঘোরে ।
খাঁচার পাখি নিয়ম করে খায়,
' হরে কৃষ্ণ ' বুলি গেয়ে যায়।
বন্ধ হলে - দিনের বন্দনা -
ওরও জেনো - দিনগুলো হয় গোনা !
কান্না নিয়ে জন্মেছো তো কী ?
এখন একটু হাসো -
অবয়বে আয়না ধরে,
নিজেকে দেখো দুচোখ ভরে,
নীল আকাশে মনকে ছোটাও
নিজেকে ভালোবাসো ।

পৃথিবীর প্রযত্নে
শিপ্রা চট্টোপাধ্যায়
পৃথিবীতে প্রজ্ঞাময় প্রভাবশালীর আস্ফালন
অনবরত রক্তাক্ত মাটি, চায় দুনিয়া দখলদারি
বারুদের গন্ধে বাতাস দুষিত, কালো ধোঁয়া ঢেকেছে আকাশ
ধ্বংসস্তূপের নিচে নব প্রজন্মের অকাল মহামারী ।
নির্বাক দৃষ্টিতে কাতর প্রার্থনা! কাদের জন্য যুদ্ধ ?
কোন যুদ্ধ -ই পেরেছে কি আনতে সাম্যবাদ
নিরন্তর ঘাম ঝরিয়ে উন্নত গড়ার কাজে যাদের হাত
পৃথিবীর প্রযত্নে তারাই বঞ্চিত,তারাই অসহায় আজ।
পেশি শক্তি আর পারমাণবিক শক্তি তোমাদের বেশি
অন্যায় সমরে রক্তাক্ত শিশু অধিকার বিসর্জন
পৃথিবীর মানুষ পলকা মতো জেনেও হিংস্র বোধে
বারুদে সাজাও মৃত্যু মিছিল ,সাজাও মহারণ।

নাস্তিক
নিত্যানন্দ দাস
নীরস নাস্তিক স্বপ্নে বিপ্লবের বুলি
অহোরাত্র মার্ক্স আর লেলিন চিবাই
দেশ-কে যত না জানি বচনবাগীশ
তারচেয়ে বেশি বুঝি গাজা-সাংহাই।
সারাদিন নাস্তিক ধর্মে খিস্তি ছড়াই
মানুষ মানুষ মারে কাঁচাপাকা ফল
টুপটুপ ঝরে পড়ে মাঠে ও জঙ্গলে
ভ্রমের পালঙ্কে তুলি লাশের ফসল।
সুখ বেচি সুখের পসরা ভালো ফেরি ...
মানুষ জেনেও কেনে রাংতা-মোড়ক
সুশাসন ছলাকলা সর্পিল কুটিল
গণতন্ত্র ধর্মখোর প্রেতের সড়ক !
কঠোর নাস্তিক মৃদু নিঃসঙ্গ নিশীথে
মাথায় ঈশ্বর নাচে---আনত নিভৃতে।
.png/:/rs=w:400,cg:true,m)
মনের অবগাহনে
নবগোপাল চৌধুরী
মন এক অদেখা সমুদ্র,
তার তরঙ্গের নাম অনুভব।
উপরের জল শান্ত,
ভিতরে ঘূর্ণি, অতল বিস্ময়।
যা বলা যায় না,
তা-ই গভীরতম সত্য;
যা ধরা যায় না,
তাই সবচেয়ে নিবিড়।
অনুভবের নোনা জলে
ডুবে থাকে স্মৃতির শঙ্খ,
অপ্রকাশিত কান্না,
অঘোষিত প্রেম।
এক ফোঁটা স্পর্শ ছড়িয়ে হর্ষ
ঝড় তুলতে পারে অন্তরে,
একটি মরমী দৃষ্টি এনে সৃষ্টি
ভেঙে দিতে পারে শতাব্দীর নিঃসঙ্গতা।
এই হৃদয় সমুদ্রের তলদেশে
আছে এক নীরব দ্যুতি ,
সেই আলোতেই মানুষ নিজেকে
নতুন করে চিনে নেবার পাক অনুভূতি ।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.