
চিঠি
তরুণ চট্টোপাধ্যায়
তোমার ঠোঁটে প্রথম যেদিন ঠোঁট রেখেছি করমচা বনে,
তোমার হাতে প্রথম যেদিন হাত,
সে সব তো বাল্যকালের স্মৃতি
সুড়সুড়ি দেয় সুরঙ্গমা, সুড়সুড়ি দেয়
পেরিয়ে গেছি সুরঙ্গের সেই রাত।
বেবী ফুডের কৌটো নিয়ে কত না টানাটানি
আজ পারিনি,কাল পারবো,পরশু গেছে চলে
আমার ভোরের সূচিপত্র ,তোমার আঁচল ধরে
কবেই যেন সে সব কথা ভেসেই গেছে চলে।
যায় সবাই আমিও যাব থাকবে পড়ে স্মৃতি
সুরঙ্গমা ব্যর্থ তো নয় আমার কাটাকুটি।
একটা জীবন নয়কো ভারি লম্বা তো বটে
আগ খুঁজছি ডগ খুঁজছি
দেরাজ খুলে বেরিয়ে এলো সে কিছু নয়
ষোল বছরে লেখা,তোমার সে এক চিঠি।

আত্মজন
তপন মুখার্জি
সন্ধে নামেনি এখনো,
তবু শহর সন্ধে সন্ধে।
এ শহরে আঁধার আসে না আর।
শুধু বিষন্নতা ডেকে আনে বিপন্নতা।
একলা একলাই মেঘ ওড়ে,
একলা একলাই মেঘ ঝরে।
ধুয়ে দেয় পিচঢালা পথ।
আমি মাপতে বসি দগদগে আকুলতা।
হাঁ করে গিলি শহুরে আগুন।
তবু আগুন হওয়া আর হয় না।
ঘোর আর বিস্ময়ে বলিরেখা স্পষ্ট হয়।
মুখ বুজে অনেক কিছু দেখতে শিখে যাই।
শুকনো খটখটে বুকে ফুটে ওঠে
দু-- একটা রডোডেনড্রন পাতা।

দুটি মন
তপন কুমার নাথ
পাশে থাকলেও কিন্তু
তাঁকে পাশে পাওয়া
যায় না,
নি:সঙ্গ মনে
তাঁর উপস্থিতিও টের
পাওয়া যায় না,
একই
ছাদের নিচে দীর্ঘকাল,
অথচ কতো দূরত্ব পেরোতে
হয় কাছে আসতে
পাশে আছি বললেই
পাশে পাওয়া,সেতো
অনেক সৌভাগ্যের কথা!
দুটি মন, ভিন্ন অস্তিত্ব,
এক হওয়ার কতো প্রতিশ্রুতি,
অলক্ষ্যে হাসেন বিধাতা!

উহ্য
তাপসী লাহা
কথাটুকু শোনা যায় উড়ুক্কু যোগে
সবেমাত্র শরীরহীন, জন্মের উত্তরীয়ে ভস্ম মেখে আকাশের প্রত্নদাহ,
ডানায় পৌঁছানোর অপেক্ষা ছুঁয়ে এই ধর্ণা,এই বৈরাগ্য,
কমন্ডলুর ধাতব গড়নে
উজ্জ্বল ঠিকরে চোখে ভাসে চোখ, বাঁকা নদী করাল,
পাথুরে লেজহীন মাছেরা সাঁতরায় নিলয় থেকে নীলে।
আলের ঘাসে জন্ম নেওয়া অলীক স্রোতরেখা
আঙুলেরাও কি অসম্ভব জীবন্ত!
যেসব মৃত্যু দু দন্ড বসতে চায় মনের কুয়াশায়
সাদা কাপড়ে মোড়া,নগ্ন স্বভাবে আটকে যায় চোখ
অন্তরীক্ষে হেটে যাওয়া শ্রাবণহীন,জীবনঘোর
শুধু তার ভবিষ্যৎটুকু ঝমঝমিয়ে রেলগাড়ির পুরুষ শাসনে
দেখে শুনে চলে যাওয়া যায়,
সূর্যাস্তের হাড় বেড়ে গেলে ব্যাথার মাঝে বাতরোগ,
মুখোমুখি হতে না চাওয়ার ফুরিয়ে আসারা ।

উল্কা পতন
সুবীর পাল
নিষ্ঠুর অবহেলা করেছো আমায়
গভীর রাতে আমি দেখেছি উল্কার পতন।
নিশব্দ পতন ছিল প্রচণ্ড গতিময়
হয়তো তোমার অবহেলার চেয়ে কম ।
গভীর রাতে আমার কষ্ট তোমায় খোঁজে
একলা আমি এলোমেলো বিছানায় ।
বালিশে তোমার গন্ধে পেয়েছি বিষাক্ত ঘ্রাণ
দম বন্ধ হয়ে আসে_ উঠে দাড়াই খোলা জানালায়।
একটাই জন্মে তোমায় পেয়েছিলাম
এক গোধূলির সন্ধ্যায় এক হয়েছিল জীবন ।
বিধাতার লিখনে শুধুই পেলাম অবহেলা
জন অরন্যের অদৃশ্য বাতায়নে বিষাক্ত স্মৃতি।
রাতের গভীরতায় চাঁদের নরম আলো
ক্রমশ দূর হতে দূরে সরে গিয়ে মিলিয়ে যায় ।
আঁকড়ে ধরি অরণ্যের কোনো এক বৃক্ষের গুঁড়ি
পড়ন্ত উল্কার কিছু পোড়া টুকরোর খসে পড়ে।

হোয়াটস আপ # ৬
স্নেহাশিস সৈয়দ
আমার আছে জীর্ণ শরীর খানি
তোমার হাতে বর্ণমালার খোঁজ
সন্ধ্যা নামে তোমার বাড়িটিতে
আমি তাকে রাস্তায় খুঁজি রোজ।
আমার মুখে পরপারের ছায়া
খুব শীঘ্র শরীর পরবাসী
আজ না হয় অন্যগল্প হোক
বুক ভর্তি কালো জলরাশি ।
কাটছে প্রহর, অপেক্ষার দ্বারে
গোধূলিতে তোমার শূন্য কাপ
মেঘ জমেছে চোদ্দতলা ঘরে
আমার কাছে ছায়াটুকুই থাক।
তোমার মুখের ছবিখানি আজ
সম্বলহীন দরিদ্রদের সহায়
দেয়াল জুড়ে কাদের উঁকি-ঝুঁকি
তারা শুধু তোমাকেই চায় ?
আস্কারা দাও অবুঝ অবহেলে
বোঝোনা কত ক্ষতের যন্ত্রনা
শরীর পোড়ার গন্ধ সেই নাকে
একটু কিও কি যাচ্ছে না চেনা?
সত্যি বলছি সবার অবসরে
দিনযাপনের স্বপ্ন বুকে বাঁধা
আর কিছুদিন সময় যদি পাই
কবরে তোমার ফুল রেখ রাধা ।

তুমি বিষয়ক ৪
ফাল্গুনী ঘোষ
আবেগের বিনিময় প্রথায় আসে
চকচকে টাকা, টাকা দিয়ে কেনা
সস্তার রঙচঙে শলমা জরি সুখ।
কিন্তু নাদান তুমি
বোঝোনি এখনও বুঝি,
হীরের ঝলকানি দিয়ে আবেগ
বিনিময় হয় না...
আহা, ওরকম আবেগের ফকিরি
কোরো না। শুধু বাউল বেশ ছেড়ে
একতারা নিয়ে পথে বেরোও...
গাঁ ঘরের পথে ঘাটেই যে
আবেগের হাট বসে...
অথবা কোনো পাহারিয়া খাদের কিনারে
দুজনে বসে সূর্যোদয় দেখি
ওসব জায়গায়
আমার জমিদারি দিল
তোমার হাতে তুলে দেবে
আনজীবন আবেগের দলিল...

শুধু মুখে ফুল
ভাগ্যশ্রী রায়
শুধু মুখে ফুল ভালোবেসে
কি হবে!
যদি মাটিকে করো
অবজ্ঞা!
কর্ষণ প্রতি ফুলকি
চমকায় ধাবমান বাতাস
সে রঙ মেহনতি মানুষের
ক্ষুধার্ত লাল
একটু ভালোবাসা ছুঁলে
জন্ম নেয় চির বসন্তকাল।
যদি মাটিকেই না ভালোবাসো!

ফেরা
অর্পিতা কুন্ডু
ফেরা হয়নি সেই ঘাস মাটি পথে
মেয়েবেলার খেলনা গুলো রাখা আছে..
স্মৃতির দেয়ালে.. কতদিন মায়ের কোলে
আর মাথা রেখে ঘুমোন হয় না..
মুঠো ফোনে গলা শুনি দিনে দুই তিনবার
দিন দিন সেই স্বর মলিন হচ্ছে..
মনে হয় ক্লান্তির পাঠ শেষে বিছানার এক প্রান্ত
অপেক্ষা করে আলিঙ্গনের জন্য..
ঠিক ঘুম নয় যেন অচেতন হয়ে পড়ি!
জানালার পাশে শুয়ে তারা গোনা হয়না ঠিক..
তারাগুলো আমার পলকের অপেক্ষায়...
ব্যালকনির নীরবতায় বসা হয় না..
যেখানে তোমার শূন্যতা ছিল..
আজ কেমন ঘড়ির কাঁটার সাথে এগোতে হয়
কবে নির্জনে কলম ধরবো?
আমার এক নির্জনতা চাই...
ঠিক তোমার কাছে থাকার মতো..

আখ্যান
নিত্যানন্দ দাস
নদী এপার ছুঁয়ে ছলাক ছলাক
দূরে ওই পরপার কে বাঁধে নিবিড়
গাছের ছায়ায় নীড় কালখণ্ডে কারা বহমান
ধূসর জলের ধারা পাহাড়িয়া ঢেউ
ঢেউ ভাঙে ঝিকমিক হাসি খিলখিল
ভাসমান ধুপছায়া দুধসাদা মেঘের পালক
মাল্লারা ডিঙি নিয়ে হল্লা মাচায়
কষ্টে জীবিকা নাচে শ্রান্তির স্বেদ
কাহারও সোহিনীসুখ টুকটাক খিস্তি-খেউড়
কখনও কী পাখি হয় নদী----
স্রোতের উপরে স্রোত নীল নীলিমায়
বিস্মিত নেত্রে দ্যাখে জনপদ শত কলরব
নদী জানে অনন্তের আহ্বানে ...
তার দুই ডানা দুই পার মরমী মাটির
অমর আখ্যান গড়ে এ-পৃথিবী অমরাবতীর ।

মৃতপ্রায় একটি জলপ্রপাত
অরূপ দত্ত
এক ফালি মেঘ,
যেন শেষ যাত্রায় ফেলে যাচ্ছে ঘর।
পথের শেষে একাকী বুড়ো বট,
এখনও দিগন্তে রেখেছে অধিকার।
এমন প্রভাত!
মনে পড়লে কান্না পায় আজও।
মনকেমনের বৃষ্টি নামে,
ফুঁসে ওঠে মৃতপ্রায় একটি জলপ্রপাত।

পটভূমি
শিবানী চ্যাটার্জি
জীবন সংগ্রামের পথ চলা,
সবুজ কার্পেটর ওপর দিয়ে শৈশবের হামাগুড়ি,
অবলম্বন আঁকড়ে ধরে নিজের ভারসাম্য রক্ষা,
তারপর চলতে শেখা একটু একটু করে...
দেখা ও জানার মধ্য দিয়ে শিক্ষারম্ভ,
কখন যেন অজান্তেই বয়সটা এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছে যায়।
অভিজ্ঞতার ঝুলি ভর্তি করে কঠিন,তরল,সরল,গরল
গল্পের আনাগোনা,
কখনও ধৈর্য্য চ্যুতি,
কখনও আবার শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়াস।
জীবনের সংজ্ঞা খুঁজতে খুঁজতে সমীকরণের বেসামাল ইঙ্গিত...
যোগফলে বিশ্বাস অবিশ্বাসের খেদোক্তি,
মানুষকে তবুও বাঁচতে হয়,
সংবহনতন্ত্রের গতিময়তা
ভুলিয়ে দেয় ক্লেশ,
রাত্রির পর সেই সকাল হয়।
রঙ্গমঞ্চে আলাপনের
যোগসাজশ,
অভিনয় থামাতে হয়,
বিয়োগান্তক ছবিতে নতুন জন্মের সার্থকতা...
ঈশ্বর প্রাপ্তি অবশেষে,
পটভূমিতে শব্দগুলোর অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ,
অশ্রুসাগরে আনন্দাশ্রুর রেখাপাত।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.