
আত্মজন
তপন মুখার্জি
সন্ধে নামেনি এখনো,
তবু শহর সন্ধে সন্ধে।
এ শহরে আঁধার আসে না আর।
শুধু বিষন্নতা ডেকে আনে বিপন্নতা।
একলা একলাই মেঘ ওড়ে,
একলা একলাই মেঘ ঝরে।
ধুয়ে দেয় পিচঢালা পথ।
আমি মাপতে বসি দগদগে আকুলতা।
হাঁ করে গিলি শহুরে আগুন।
তবু আগুন হওয়া আর হয় না।
ঘোর আর বিস্ময়ে বলিরেখা স্পষ্ট হয়।
মুখ বুজে অনেক কিছু দেখতে শিখে যাই।
শুকনো খটখটে বুকে ফুটে ওঠে দু-- একটা রডোডেনড্রন পাতা।

যতিহীন উৎসর্গ
শিখর চক্রবর্তী
আমাদের বহু প্রাচীন সূর্য, ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ছে
বর্ষীয়ান পিতা গাছের আড়াল খুঁজছেন
মৃদু মন্দ বাতাস থাকলেও তারা ভীরু পাখির মতো ইতস্তত
শুশ্রূষার জল তোলা আছে, স্বস্ত্যয়নের আয়োজন সারা
সদ্য স্নান সেরে মা এসে , দক্ষিণের জানালা খুলে দিলেন
শীতলপাটি বিছিয়ে কাঁসার পাত্রে ভাত বেড়ে ডাক দিলেন
ঘাটের পাশে বসে থাকা বায়সকুল মেঘের মতো ভীড় করে
তৃপ্ত সন্ধ্যার মতো ডানায় আচ্ছন্ন হয়েছে ইহকাল
প্রণাম সেরে মাথা তুলতেই দেখি তিনি চলে যাচ্ছেন উত্তরায়নে
আমাদের বিষুবরেখায় শোভাযাত্রার খই পড়ে থাকে।

জ্যোৎস্না অধরা থেকে যায়
অর্কজিৎ
যাই করিনা কেন, জ্যোৎস্না অধরা থেকে যায়
বিচ্ছিন্নতাবাদী এই সমতল থেকে অনেক দূরে
তুষার শুভ্র ধবল উচ্চশৃঙ্গসমূহ
সারি সারি দাঁড়িয়ে মুখ তুলে সুশৃংখলে
পকেট সায় দেয় না ট্রেকিংয়ে যাওয়ার
দক্ষিণী সমুদ্র ডাক দেয় কিন্তু ঢেউগুলো
সব ফিরে ফিরে চলে যায় তটরেখায়
আমায় একা ফেলে রেখে।
এবার শ্রাবণও চলে গেল !
আষাঢ়েই বয়ে গেল বেলা,
বসন্ত পলাশ ঝরে পড়ে রোগগ্রস্ত দেহের উপর
মহুয়া নামে গলা দিয়ে পেটের ভেতর
জেগে ওঠে অন্ধকার দিনের সমস্ত
দাপাদাপি শেষ হয়ে গেলে।
উড়ে যায় পাখিরা নিজেদের বাসায়
ফিরে আসে পরিযায়ীরা নিজেদের ঠিকানায়
এত কাছে থেকেও আলোকবর্ষ দূরত্বের
দিনলিপি স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিদিন।
যাই করি না কেন জ্যোৎস্না অধরা থেকে যায়।

অভিমানের সাতকাহন
তপন কুমার নাথ
অভিমানের বড়ই যে মান,
বলবো বলেও না বলা
কথার পাহাড় মনে জমলেও
অভিমানের কুয়াশা ঢেকে
রাখে,না বলতে পারা
কথাগুলোর দুরন্ত পাখনা!
ডানা ঝাপটায় অথচ
ওড়ার আকাশ তখন
কালো মেঘ যে ঢেকে
রাখে বৃষ্টির অপেক্ষায় ---
একটু বৃষ্টি ঝরলেই সব
অভিমান ঝরে যাবে
আদর আর সোহাগে,
কিন্তু অভিমান জমে বজ্র
হলে রাগের বজ্রপাতে
ভাঙ্গবে সব সম্পর্কের ভিত!

বুঁজে যাওয়া এঞ্জেল পাতায়
তাপসী লাহা
পাতা পুড়িয়ে শহর ঘুমায়নি যেদিন
আগামীতে যারা হঠাৎ বেকার হবে
অগণিত বাচ্চাদের এক্সাম পেপারগুলো কোন হাইরাইজ জোনে এঁটো খাবারের দাগ মুছে দিচ্ছে ।
টেবিল পরিষ্কার থাকলে অত্যন্ত সুন্দর দিনের মত যত কুরুপ —
সরে যাওয়া উচিত বিনা বাক্যব্যয়ে ।
জঞ্জাল ,পরনিন্দা,হিশহিশে বিষের মত মন নিয়ে গড়ে ওঠা এক স্যাডিস্ট আধুনিকতায় বরং
ট্রাফিক জ্যামের মত একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক রোমান্টিকতায় ভবিষ্যত জ্বলে যাওয়ার ছোটখাটো ঘটনা
অত্যন্ত গর্হিত
আলোচনা বর্জন করে আমরা রাতের শহর দেখি
দুকাপ চাঁদে মুছে যাক চিৎকার ও হতাশার ঠোঁটখোচানোগুলো
বিগলিত ডার্ক চকোলেটের মত নামুক এক অমোঘ বর্ষা
জোরালো বৃষ্টিফোঁটার কান্নায়
এক এঞ্জেল ধীরে ধীরে পাপড়ি বুজিয়ে দিন ঢেকে দিচ্ছে ।

অস্তিত্ব বিসর্জন
মৈত্রেয়ী...
তুলির এক টানে এঁকে দিলাম নাক ,চোখ।
প্রাণ রোপণ করতে পারিনি!
ব্যর্থতা নয় , অপরিণত ভ্রূণকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করেছি।
মেতেছি আলো আর অন্ধকারের খেলায়।
অদূরে জলের মধ্যে বুদবুদ ভাঙতে আর গড়তে দেখলে আমার মধ্যেও সর্বনাশের নেশা জাগে।
লাটাইয়ের বাঁধন ছিঁড়ে গেলে অস্তিত্বের বিসর্জন হবে ভাবতে বেশ লাগে।
তাই শেষে তুলির টানে মুখের অবয়ব নাই বা থাকলো।
এবার অবাঞ্ছিত চাহিদার বাইরের পৃথিবীটাকে একবার দেখি!
দেখি স্বরলিপির সুরগুলো শুনে অস্তিত্ব
রক্ষার খিদে পায় কিনা।
আর শূন্যদৃষ্টি গোলপোস্টের উপর কোনো রূপোলি উচ্ছ্বাস ঝাঁপিয়ে পড়ে কিনা!

অভিষেক
সুবীর পাল
বিলাসী হৃদয় লুটায় ঝাড়বাতির আলোয়
এখন রাজধিরাজের খামখেয়ালী মন।
পরিপূর্ণতার অহংকার রাজ ঐশ্বর্যে
অভিলাষের লাল মদিরায় মজলিশ মজে।
দুঃসহ পালঙ্কে নকশা কাটে অপার ঐশ্বর্য
অসহ্য প্রাণ জীবন খোঁজে ঘুলঘুলিতে।
ওত পেতে থাকা মাকড়শার জালে রুদ্ধ দ্বার
নরম গদির ধবধবে চাদরে কান্না গুমরে মরে।
ছেঁড়া ক্যানভাসে শুকিয়ে আছে ফ্যাকাশে রঙ
ভালবাসা নিক্ষেপিত অন্ধকার কারাগারে।
বিলাসী হৃদয়, ঘোড়া ছোটায় শিকারের খোঁজে
দরবারী রাগের সুরের মূর্ছনায় সম্মান লুণ্ঠিত মদিরায়।
কালপ্রহরে সাজো সাজো রব অন্ত: পুরে ব্যাকুল চিত্তে পূর্ণ লাবণ্যে সমর্পিতা রাজেশ্বরী।
পূর্ণতার চোরা স্রোত সঞ্চালিত দেহ মন জুড়ে
এবার অভিষেকের ঘণ্টাধ্বনি নতুন প্রভাতে।

আমার স্কুল ও ছেলেবেলা
স্নেহাশিস সৈয়দ
বহু বছর পর দাঁড়িয়ে আছি-- আমার পুরনো স্কুলে
শীতের বাস্তবতার পরে আমি নিশ্চুপ - দাঁড়িয়ে থাকি- যেন আজ অনেক স্বপ্ন ও বাস্তবতার দিবারাত্রির উপখ্যান।...
দীর্ঘ দরজার ওপারে আমাদের ছেলেবেলা
হারিয়ে যাওয়া স্যারদের কঠিন কন্ঠস্বর
অচেনা জীবন নিয়ে কেবলই যুদ্ধ করেছি
ওদিকে স্যার-রা আমাদের প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়ে দ্বিতীয় জন্মের আখ্যান শুনিয়েছিলেন।..
বহু বছর পর আমি দাঁড়িয়েছি আমার স্কুলে
ওই তো সেই বেঞ্চ, ওই তো সেই টেবিল
স্যার এসে বসবেন এক্ষুনি..ঘন্টা পড়ে গেছে..
সব একই আছে ছেলেমানুষী দৃশ্যচ্ছবি..শুধু
মুখগুলো শুধু পাল্টে গেছে বন্ধুবর
আমার স্কুল যে জন্ম আমাকে দিয়েছে --
বিশ্বাস কর বন্ধুরা, আমি তাই দিয়ে জীবন কাটাচ্ছি।

তুমি বিষয়ক ৩
ফাল্গুনী ঘোষ
আজ তুমি এক দূরতর দ্বীপ
নাহ, সুচেতনা নও।
পাশের বাড়ির অরিন্দমও নও।
মনের দুয়ারে যখন পাথরের আড়াল
আটকে রাখা হয়, তখন
শরীরের নদীতে শ্যাওলা পড়ে।
তাতে পা হড়কালেও জল সেরকম কুল কুল করে নৃত্য করে না।
পলি মাটি জমে জমে তোমাকে
এক দূরতর দ্বীপে ঠেলে দেয়।
তুমি সুচেতনা নও, সু-চেতনও নও।
হলে তোমার আমার মাঝে দ্বীপ
জেগে উঠত না।

বোবা কলমের ক্ষুরধার
শিবানী চ্যাটার্জি
এখনো বোবা থাকবে??
কেন?? কিসের ভয়??
নীল দিগন্তের দিকচক্রবালে অজস্র আঁচড়ের ক্ষত,
যৌবনের বন্দরে আটকে পড়ে থাকা শতাব্দীর ইতিহাস,
এক বুক কান্নায় ভেঙে পড়ছে জোয়াল টানা শক্ত কাঁধ।
তরুণ প্রজন্মের কপালে পড়েছে ভাঁজ,
ধুকপুক করছে বাবা মায়ের বুক,
'সন্তান থাক দুধে ভাতে '
ভেবে আর লাভ কি!!
সন্তানদের অধিকার লড়াই করে ছিনিয়ে নিতে ,
বসতে হয় রাস্তায় কঠোর অনশনে।
বুক ফাটে তো মুখ ফাঁটে না,
অন্ধ ভালোবাসার গায়ে যেন জোরপূর্বক দমন,
কলম তুমি আওয়াজ তোলো,
যা হচ্ছে সব কি ঠিক??
তাহলে ভুল দেখে দরজায়
ঘা দাও।
শব্দের হুঙ্কারে জাগিয়ে তোলো মানবিক চেতনা,
বিবেক বুদ্ধির কোষ বিভাজনে নতুন কোষের জন্ম হোক।
যোগ্যতার মাপকাঠিতে হোক শিক্ষার মূল্যায়ন,
অবমূল্যায়নের অশৌচ সংস্কার থেকে দূরে সরে গিয়ে...
দিকচক্রবালে আঁকতে হবে নতুন সংজ্ঞা।
জীবনের পরিসরের মাপকাঠি জানা নেই,
জীবনের সংজ্ঞা তো আর অলৌকিক নয়,
ঈশ্বরের আর্শীবাদ প্রাপ্ত সুন্দর জীবন কেন এতো বঞ্চনার শিকার??
পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত সেই ভাইরাস ,
যেখানে ওষুধের কার্যকারিতায় সংশয় জাগে,
প্রবহমান উষ্ণ তরঙ্গের জন জোয়ার...
দিকভ্রান্ত হয়ে মুষড়ে পড়ছে ধর্মের যাঁতাকলে....
পাপ পুণ্যের বিচারের দায় নেবার অধিকার কার আছে বলতে পারো ??

কিন্তু কোথায়
ভাগ্যশ্রী রায়
বেজেছিল
একতারে।
"ফিরব ভালো হয়ে।'
তারে বাঁধতে
তারেই যে সাধন লাগে।
সে উচ্চারণে
মুগ্ধতা ছিল তুঙ্গে
সংকল্প ছিল দৃঢ়তায়।
হয়ত আমারই
ছিল ভুল !
কিন্তু কোথায়!

দেহাতি রোদ্দুরে শব্দ বাসা বাঁধে
গীতশ্রী সিনহা
সেই কবে থেকে রোঁয়া ওঠা পথে পথে রোদে ভিজছি...
স্যাঁতসেঁতে মফস্বলি মানুষের কাছে আবেদন করি...
তারা জীবন দেখে নি ! প্রস্তাবে সপাটে চড় কষায় !
পরকীয়ায় মাতবো তোদের সাথে, নিয়ম বেঁধে শব্দ কি যায় মাপা !
ইচ্ছে করে সভ্যতার আবাস একটা গড়ি, নাম রাখি তার, ' সাংস্কৃতিক পরকীয়া কেন্দ্র '।
পুরুষ শব্দ - নারী শব্দ একই নদীতে পা ভিজিয়ে শব্দ খেলা করুক। এরা চরিত্র চুরি করা মানুষ নয়...
ভাবতে ভাবতে সময়ের বয়স বেড়ে চলে... ইচ্ছেদেরও...
কতো মিস কল ফিরে গেল সঙ্ঘ সভ্যতার ঘরে...
অপেক্ষা শুধুই সাদা পৃষ্ঠা আর কলম !
পটভূমিতে দৃশ্য বলে চলেছে --- এ-কোনো বিপ্লব নয়...!
এটা একটা বিশ্বস্ত বিশ্বাসের করাঘাত... একটা খিদের নাম ! পরিযায়ী পায়ে রক্তের বলিরেখা ...
তোমরা বলো টাকা ছাড়া পুরুষ বিধবা !
আমি বলি, শব্দ ছাড়া শতাব্দী অন্ধকার, এঁটোকাটা সময়ের চন্ডাল জীবন...
সারা পৃথিবী আজ স্টুডিও সাজিয়ে বসেছে প্রদর্শনীর ভিড়ে, বেকার প্রদর্শনী মুখ বই-এর পাতাজুড়ে... সাহিত্য সেখানে খেলনা, চুপসে যাওয়া গ্যাসবেলুন... হাস্যকৌতুক ভরা চৌরাস্তার মোড়।
ফেলে দেওয়া শব্দের মাঝে কিছু শব্দ আজও দীর্ঘশ্বাস চুষে চলে।
শব্দ আর স্বপ্ন ঠোঁটে ঠোঁট ঘেষে চোখের জল চেটে খায়।
দমকা হাওয়ায় উড়তে দিও না তাদের... ওরা গর্ভের সন্তান, সায়াহ্নে ভূমিষ্ঠ হতে চায়।
ক্যাপসুল গেলার মতো আটকে যায় না যেন কন্ঠনালীতে... !!!

রথ
অর্পিতা কুণ্ডু
ফুলগুলো বিক্রি হয়নি
বরাবরের মতো...
শৌখিনতার দামী দাম্ভিকতায় ঢাকা পড়ে গেছে
রাধারাণির ফুলগুলো...
অশ্মীনিকুমার ... কোনো ফুল বা পথের অপেক্ষায়
নেই..আসলে এরকম কোনো চরিত্র হয় না।
রথের চাকার তলার কাদা মাটির জীবনে
সর্পিল বাঁকে
অন্ধকার ভেদ করে
প্রতিনিয়ত লড়তে হয় রাধারানিদের ...
রথের চাকা এতেই ঘোরে...
অসুখের ভার বয়ে একাকী ক্লান্ত
অবসাদ আর আলোর মাখামাখি জীবন
শুধু একা র....
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.