
মেঘ বৃষ্টি
তরুণ চট্টোপাধ্যায়
মেঘ বললো আমায় নিয়ে কবিতা লেখো,
আমি বললাম লিখতে পারি,
আমার সঙ্গে থাকতে হবে সারাজীবন,
ঘর সংসার গেরস্হালী।
কথা দিলো থাকবে সেতো
আলোর মতো ঘিরেই আমায়
আমিও দিলাম মস্ত এক কবিতা লিখে
মেঘের পাতায়।
বেশ চললো ভালবাসা, হাসি খুশির
ঝর্নাধারা, ভেবে নিলাম থাকবে ও তো
আমার সঙ্গে সারাবেলা,
ছিল ও কদিন আঁটোসাঁটো ।
তারপর যে কি ঘটলো বৃষ্টি এলো ঝমঝমিয়ে
ভিজিয়ে দিলো অক্লেশে
তাকিয়ে দেখি মেঘ টা কোথায়
অন্য মেঘের ঠাসাঠাসি ।
আমি তখন হন্যে হয়ে সেই মেঘকেই খুঁজতে থাকি
নদী পাহাড় জঙ্গলে তে
যখন তখন চোখকে রাখি
খুঁজতে খুঁজতে কাঁদতে থাকি।
মেঘ একদিন আবার এলো
বললো তুমি বোকার মতো কাঁদো কেন
মেঘ কখনো একার থাকে
বৃষ্টি হয়ে ঝরেই পড়ে।
বৃষ্টি এখন মেঘ হয়ছে
কালকে আবার বৃষ্টি হবে
লিখেই চলো লিখেই চলো
মনে যতো দুঃখ থাকে।

রাজহংসী
ডাঃ প্রণব কুমার ভট্টাচার্য
আমিই বপন করেছি সময়, কোয়ার্কের রং, ব্রহ্মান্ড,
আর জীবনের বীজ ।
আমি কেবল জুড়ে যাই পেরিয়ে আসা সময়, বিগ বাং, কৃষ্ণ গহ্বর।
হাঁসদের স্মৃতি, প্রেম , কষ্ট, দুঃখ, ছোট ছোট গল্প
তারা হঠাৎই নির্মাণ করেছিলো এক দিব্য পুরুষকে,।
আদতে সে ছিলো যে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত পুরুষ,
সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে সদাই ছিলো সে ব্যস্ত।
প্রতিদিনই সে হারিয়ে যাচ্ছে এখন আমার থেকে,
যেমন নীল সাগরে, এক কণা, মুক্তোর মতোই হারিয়ে যায়।।
হাঁসেরা এখনও ঘুরে বেড়ায় রাজহংসীর চারিদিকে ,
তারা কেনো রাজহংসীর কাছে দু-দণ্ড জিরিয়ে নেবে না?
কুর্নিশ জানাবে না ,এখনও তাদের রানীর সিংহাসন কে?
চারধারে নোংরা রাজনীতির খেলা, কুশীলবদের
অভিমুন্যর মত, চক্রবুহে তখন একাই রাজহংসী ।
এখন তাই আমার পালা। আমি তো জানতাম যুদ্ধের ফল।
হে দিব্য পুরুষ , তুমিও মৌন ছিলে রাজহংসীর অপমানেও?
একটা রাজহাঁস হতে তোমাকে না তো কেউ করেনি।
গভীর তুষারপাতে, যেখানে আমার দৃষ্টি,
আর প্যাঁক প্যাঁক ডাক
কখনোই পৌঁছোবে না , সেটা তো আমি জানতামই ,
অথচ বাঘটি সেখানেই তার থাবার একটি ছাপ দিয়ে গেলো
আর হঠাৎ এক লাফে লণ্ডভণ্ড করে দিলো
কবিতার সব ঐকতান ,
কবিতা দিয়ে সাজানো , ঘর আমার,
চারধারে তখন সব দশাননের “সীতা কুঞ্জের “ অসুর।
তাই হয়তো বা ছিলো আমার পালা ,দুর্গা হতে।
হে দিব্যপুরুষ ,তুমি কিন্তু তখনও অবতার হয়ে এলে না।
কলির পশুগুলো এখনও জন্মায়নি, ব্রহ্মা বলেছিলো।
সবই কি ছিল তবে রাজহংশীর মনের ভুল আর ভুল?
আর সেই টক্সিক পরিবেশটাও?
ইগোর ট্যাগ অফ ওয়ার,
“আগে তো পালাও রাজহংসী” , ময়দান ছেড়ে।
এক রাজহাঁসের ফিস ফিস “পরাজয় মেনে নিয়েই “
যদিও আমার একটা খাঁচার পরিকল্পনাও ছিল
“তাই হয়তো বা এখন আমার দেখানোর পালা “আমিও পারি।”
তোমাদের বলছি, আমিই সেই রাজহংসী।
আমারও কিন্তু একটা গল্প বলার ছিল সবাইকে ।।
বলেছি কি গল্পটা তোমাদের? সিংহাসনে বসে।
অথচ শুনলো কি কেউ গল্পটা ? বুঝিনি তো।
শিরদাঁড়া সোজা রেখেই বসেছি আর হেঁটেছি প্রতিদিন।
চটি চেটে, শিরদাঁড়া বিক্রি করে, কিছু চাইনি কোনোদিন।
ঘন্টাটিও এখনও বাজাবো আমি।
যখন তুমিও, হ্যাঁ পুরুষ, ব্রহ্মাকে বিশ্বাস করতে শুরু করবে
যখন তুমিও হয়তো শুনতে শুরু করবে।
এখন তো আঁখির প্রতিশোধের পালা।।
আমি কিন্তু বেঁচেই আছি, বা বেশ ভালোই আছি।
অনেক দূর থেকেই দেখছি এখনও তোমাকে,
“চাঁদের নিয়ম “ গুলো তুমি জানো কিনা, জানিনা!
জানিতো বলবে ! “সূর্যের নিয়ম” নিয়েই ব্যস্ত তুমি?,
রুক্ষ আর কঠিন পথেই তোমার সকল গমন,
সময় কোথায়, তোমার আকাশের চাঁদকে জানতে?
ভালবাসার মানে তুমি কিছুই কি জানো হে মহান পুরুষ?
স্নিগ্ধ ভালোবাসার মধ্যে ডুবে থাকাটাই চাঁদের ধর্ম
সূর্য জ্ঞানের থেকে চাঁদের জ্ঞান অনেক সহজ সরল।
চাঁদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে রইলে চিরকাল
দিব্য পুরুষ! আমি ছিলাম এক রাজহংসী, চাঁদেরই পথযাত্রী
শোনো অভিমানে, আঁখির চোখের মুক্তো মিশে থাকে তার ভালোবাসা।
শেষমুহূর্তেও দিব্য পুরুষ তুমি কিন্তু মৌনতা ভাঙলে না।।
শোনো হে, পুরুষ, হয়তো বা ভালবাসি, তোমাকেও
এ ছাড়া কোনো কারণ, বা গোপন উদ্দেশ্য
তো নেই রাজহংশীর এই ভালবাসায়;
হৃদয়ের ভালোবাসা থেকে, না বাসায়,
প্রতীক্ষা থেকে একসময় নির্লিপ্ততায়, নিরবতায় শীতলতা থেকে
আগুন-লাল আঁচে যাতায়াত করে।
কখনো বা, অনুভবে অশেষ ঘৃণাও লেগে থাকে,
যেভাবে গ্রীষ্মের দিন গ্রাস করে নেয় উন্মাতাল আলো,
হয়ত সেভাবেই, তোমার নির্লিপ্ততা চুরি করে নেবে
আমার তাবৎ হৃদয়ের গভীর, নিটোল সুস্থিরতা।

জন্ম থেকে জন্মান্তর
তপন মুখার্জি
প্রতিদিন নিজেকে ভাঙি, প্রতিদিন নিজেকে গড়ি। প্রতিদিন স্বপ্নে ঘুমুই, প্রতিদিন স্বপ্নে জাগি। প্রতিদিন যন্ত্রণায় নীল হই, প্রতিদিন খুনে খুনে রক্তাক্ত। আসলে, এ সবই অঙ্ক অঙ্ক খেলা --সিঁড়িভাঙার, সাপলুডোর, বাঘবন্দির। এ সবই দহনকালের ছবি --লতিয়ে লতিয়ে ওঠা, কালশিটের দাগ, শ্মশানের ছাই। এ সবই ফিনিক্স পাখির জেগে ওঠা --শব্দযুদ্ধ, ছদ্মহাসি, ধান্দাবাজি। তবু এইসব জীবনের ব্যাস না ব্যাসার্ধ, খন্ড না বিখন্ড, সমকোণ না বিষমকোণ বুঝতে গেলে অনেক জন্ম পার হতে হয়।

স্কেচ
কল্লোল বন্দ্যোপাধ্যায়
দুপাশে বালি মধ্যিখানে ঘোলা জল, কাশ ঝোপ
গ্রাম্য নদী : সন্ধ্যে বেলায় তোমাকে বলা হচ্ছে পার হও
তোমার সমস্ত জীবন দৌড়ে আসছে তোমার বুকের মধ্যে
এখন হাঁটু কাঁপে চোখে জল আসে -
অথচ কোনও কারণ নেই ; তুমিতো জানতেই
পকেটে হাত ভরে শিস দিতে দিতে যাবে, তুমিতো তেমন সফল নও
তোমার স্বপ্ন সে যেন মাঠ পারের ছোট পলাশ গাছ
একটু ভালোবাসায় লাল হয়ে যেতে পারতো
আজ তোমার কোনও গ্রাম নেই, শহর নেই
তুমি অব্যবস্থা , তুমি এক শুকনো মানুষ
বুকের মধ্যে দৌড়ে আসা এক কান্নার মেঘ ধুলোর মতো পাক খেয়ে বেড়াবে বাকি জীবন।

যে কথাটি আজও তোমায় বলতে পারিনি
মৈত্রেয়ী
আধো অন্ধকারের নাভি ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে
কত মেঘপাখি দল।
ঘুম ভাঙ্গা চোখে রবির প্রথম আলোয় ফুলেরা তাদের বিচিত্র পাঁপড়ি মেলে দিয়েছে
আপন খেয়ালে।
বিচিত্র এ পৃথিবীর কোথাও পর্ণমোচী বৃক্ষেরা দাঁড়িয়ে আছে কঙ্কালসার অভিশপ্ত
চেহারা নিয়ে।
ঘুড়িটা লাটাইযের বাঁধন ছিঁড়ল,
প্রদীপের সুখ - দুঃখ .. তেল ফুরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিভে আসা
শেষ ফুলকি ও দেখলাম !
তবু তোমাকে পারলাম না বলতে
সে কথাটি আজ ও।
ডায়েরির ছেঁড়া পাতাগুলো হয়তো আবারো কাগজের মন্ডরূপে পেপারের কারখানায় নতুন রূপ দেবে বলে।
সুনামি গেলো ,আয়লা গেলো ,কত প্রাণী বানভাসি হল..প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভ্রুকুটি
উপেক্ষা করেও বলতে পারিনি সে কথা।
বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছি কিছু টুকরো অস্তিত্ব
জীর্ণ প্রতিমার আদলে।
প্রতিটি পথের বাঁকে পড়ে থাকবে
নীরার জন্য নবীন কিশোরের প্রাণের আকুতি।
প্রাচীন দেওয়ালের ফাটলের ফাঁকে ফাঁকে
শ্যাওলা, মস, ফার্নের মতো বেড়ে উঠছে বলতে না পারা কথারা।
আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে দাঁড়িও একবার !
যদি বলতে পারি সেই বলতে না পারা
কথাটি !

স্মৃতির আঁচে
যশোদা নন্দ গোস্বামী
পুরোনো সেদিন পড়লে মনে,
বিষন্নতার হৃদয়কোণে -
দশের লাগাম একের হাতে,
ভালবাসার এক উঠোনে ।
আত্মা পৃথক - একাত্মতা ,
কর্ত্রী ছিলেন ঠাকুরমাতা -
একান্ন ফুলের মালায় গাঁথা,
সুগন্ধি আর পবিত্রতা ।
ভালবাসার সাথে ছিলো
শাসন করার হুকুমনামা -
ভাই বোনেরা খুশি হতো,
পূজোয় পেয়ে সুতির জামা ।
ছুটির দিনে দর-দালানে,
খেতে বসা একই সাথে -
তৃপ্তি পেতাম বনভোজনের,
শুক্তো পায়েস - মায়ের হাতে ।
স্বার্থ ত্যাগের উদারতায়
শৃঙ্খলিত সকল মাথা -
আমরা দুজন - মোদের দুজন,
বিচ্ছিন্নতার গোপন কথা ।
ফুলের পাঁপড়ি পড়লে খসে,
কেমন করে ফুলটা বাঁচে -
শেষ পাঁপড়ি আমরা দুজন,
বেঁচে আছি স্মৃতির আঁচে ।

এক চিলতে সোহাগ
শিপ্রা চট্টোপাধ্যায়
দূরে সীমান্ত রেখা ---
প্রান্ত বিন্দু ছুঁয়ে আছে শেষ সোহাগ
নিস্তেজ , কিন্তু পরিপাটি রূপ তার।
শীতের চাদর জড়িয়ে বেদুইন হাসি হাসে,
প্রকৃতিকে জিজ্ঞেস করে ...
এত প্রেম কেন দিলে ?
নিখুঁত সৌজন্য কার জন্য
বলতে পারো...?
সব আস্কারা রঙিন অনুরাগে বেঁধে রাখে নীরবে।
লোকাচারের আড়ালে বেড়ে ওঠে যে প্রেম
তার কোনো ঠিকানা থাকে না
কোনো প্রশ্ন থাকে না ।
অনাদরী সোহাগ মুখ লুকিয়ে হাসে
বলে -- এটাই বুঝি তোমার প্রেম !
দিন শেষে যাপিত জীবনে জড়িয়ে নেয় বুকে
ভুল করে নয়, বরং সযত্নে ---!
অদৃশ্য মন তাকে আলিঙ্গন করে ইসারায়।
কতকিছু সয়ে নেয় সারাদিন
দেখা, না - দেখা, ছোঁয়া, না - ছোঁয়ার কাটাকুটি খেলা চলে ,
প্রেম পূজারী হয় --
প্রার্থনায় জ্যোৎস্নার নরম আলোয় চুমু দেয় চোখের তারায়।

বইমেলা
ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ
বইমেলায় সবাই গেছে,
অত লোকে জ্যোৎস্না রাতেও
যায় না নলবনে!
আমি দেখেছি সেখানে
স্মার্ট লক্ষ্মী সিগারেট ঠোঁটে
ছেঁড়া জিন্স পরে হাঁটে...
লাগাতার সে মোড়ক উন্মোচনের উদযাপনে
লাখো লাখো সেল্ফি আর হাই তোলে!
ঝলসায় হিরের আংটি
তার দশটি আঙুলে!
সরস্বতী তো ডুবে গেছে কোন্ কালে
চরিত্রহীনা গঙ্গার
ঘোলা জলে!
দেখলাম বইমেলায় আছে
নিমিত্তমাফিক বইটই,
মহাকাব্যিক হৈচৈ!
চটের ব্যাগ থেকে শুরু করে
অতীব রুচিসম্মত
ফিশ বাটার ফ্রাই!
আর মেলার দশ দিশায়
একটি সে চাঁদপানা হাসিমুখ
করজোড়ে স্বাগত জানায়,
চেষ্টা করেও কেউ পাবে না রেহাই...
অবশেষে নিজের অবসরপ্রাপ্ত পকেট কেটে
কিনেই নিলাম একটা বই!
দেখলাম তাকিয়ে
বেচারি সরকারি বাসদের উদ্বাস্তু করা মহাপ্রাঙ্গণে
ধূ ধূ মরুভূমি:
বইয়ের এ প্রাণপ্রিয় মোচ্ছবে
দু দণ্ড শান্তিতে বই পড়ার
একটা ভাঙা বেঞ্চিও নেই,
নেই মুখোমুখি বসিবার কোন কবিতার মতো বনলতা সেন!
পুনশ্চ: একটু নির্জনতার খোঁজে
কখন চলে গিয়েছি পায়ে পায়ে
যেখানে মেলার পাণ্ডববর্জিত প্রান্তে সন্দেহজনক অন্ধকার রয়েছে
একটা চোখ পিটপিট করা টিউবলাইটের পেশাদারী পাহারায়;
"আর যাবেন না স্যার!"
টিউবটা হঠাৎ বলে ওঠে সিভিক পুলিশের ভাষায়;
"কেন?"
"জানেন না স্যার!
নীল শালুর আড়ালে যে আছে রাজ্যের জঞ্জাল,
আছে বগটুই থেকে হাসখালি হয়ে ক্রমশঃ জমে ওঠা পোড়া হাড়গোড়,
আছে পৃথিবীর অসমাপ্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাজাভাঙা ইউক্রেন,
আছে ছত্রিশ হাজারের
থ্যাঁৎলানো লাশের পাহাড় তুরস্কের,
আর ক্রমবর্ধমান শ্মশানসংসার গাজাস্ট্রিপের!"
মাইক থেকে তখন ভেসে আসে চমৎকার গান,
যেন ফেটে যায় কান:
"আরে ভাইয়্যা!আল ইজ ওয়েল,আল ইজ ওয়েল!...
কলকাতা পুস্তক মেলা জানায় আপনাকে
হার্দিক সুস্বাগতম!"

পথদড়ি
তাপসী লাহা
লিকলিকে জানালায় বিষণ্ণ হাওয়া
উড়ছে অপেক্ষারা
অপেক্ষারা বাড়ির মত
হা হুতাশ মেখে ধৈর্য্য ঠাঁয়
স্বপ্নের দালান মাটি ফুঁড়ে একদিন হলে গাছ
মনপাখি চইচই
আলো হোক খোয়াবের পথদড়ি
ভাসতে ভাসতে জাহাজের বাঁক থেকে পাখি ছড়াচ্ছে ডানা
মেলানিন বিরহ
কম্পাসের যেটুকু সুখ ... ফুঁড়ে বেরিয়ে পড়ে
মাটি জলে রাতে ।

বুভুক্ষুর অব্যক্ত ভাষা
পাপিয়া নন্দী
বুভুক্ষু শানিত দৃষ্টির রক্তস্রোত, বয়ে চলেছে অগ্নিদগ্ধ সমাজের-- বুকের উপর দিয়ে।
ঠিক যেমন করে, কড়া বৈশাখে---
কংসাবতীর বুক শুকিয়ে, কাঠ হয়ে যায়!
তেমন করেই, শরীরের ভিতর---
শুকিয়ে যাওয়া গ্রন্থিগুলো, নিয়তির নির্বিশেষে,
আজ জ্বলন্ত কাঠ!
প্রতিবাদী ভাষায় অভুক্ত সমাজ, পারেনা কেড়ে নিতে---
তাদের প্রাপ্য অধিকার।
পারেনা অনাহারে ক্লিষ্ট শরীরগুলো;
নির্দ্বিধায় ঘ্রান নিতে---
দুবেলা গরম ভাতের গন্ধের! রাহাজানি,হাহাকারে অভ্যস্ত সমাজ,
আজ কণ্ঠরুদ্ধ করে রাখে---- ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।
কেড়ে নেয় তাদের প্রতিবাদী ভাষা!
শুধু ঘৃণা অবজ্ঞা,আর ভিক্ষার পরিমণ্ডলে---
জীবন চলে যায় সার্বিক নিয়মে!
সমাজপতিদের তৃষ্ণার্ত হাত;
কেড়ে নেয় আগামীর আলো!
কেড়ে নেয় শিশুদের মুখের গ্রাস---
সামান্য গরম ভাতের পাশে--- একটু নুনের অধিকারকে!
কে ফিরিয়ে দেবে,
এই অভুক্ত মানুষদের;
ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নের উত্তর?
কে ফিরিয়ে দেবে,
মাথা উঁচু করে চলার অধিকার?
বলে দাও বলে দাও,
অন্ধকারে দুচোখ--
আঁধারে ঢেকে রাখা ধৃতরাষ্ট্ররা!

ভাঙন
সুমিতা চৌধুরী
শুনেছো নদীর পাড় ভাঙার শব্দ?
জেনেছো মাটির মর্ম বেদনা, হাহাকার?
শুনেছো উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন?
দেখেছো আর্তনাদ মাটির ভাঙনের?
তিলে তিলে ধরে ক্ষয়, ঘুণে ধরা কাঠের মত...
সব রস শুষে নিয়ে, তাকে করে ক্ষতবিক্ষত,
তারই বুকেতে বসে করে তাকেই জরাজীর্ণ!
এমনি এ ভাঙন, করে দীর্ণ-বিদীর্ণ,
নিঃশব্দে নিঃশ্চুপে, বোঝা না বোঝার রূপে।
ভাঙন গ্রাস করে, পরিণতি পায় ধ্বংসস্তুপে,
মাটি যায়, ঘর যায়, যায় মাঠঘাট,
যায় সবুজের সমারোহ,
বিলীন হয় চিত্রপট।
তেমনই মনেও ধরে ভাঙন,
টলে বিশ্বাস, নেভে আশার দ্বীপ,
ভালোবাসার তরী ডোবে,
জাগে অবিশ্বাসের বদ্বীপ!
নদীর পাড় ভেঙে যেমন নদীর বুকে জাগে চর,
অবিশ্বাসের চোরা স্রোতে জাগে অপমানের লোনা বালুচর।
মান ভরসা হেলায় হারায় অশ্রু রেখার তটে,
ভাঙনের চোরা স্রোতে শুধুই ধ্বংসের চিত্র ফোটে।।

হারিয়ে যেতে যেতে
সুবীর পাল
তীব্র রোদের তাপে জ্বলেপুড়ে শেষ বিশ্বাস
হারিয়ে যেতে যেতে উঁকি মারে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে।
তীব্র কান্নার বুক চেরা আর্তনাদে রক্তস্খরণ
নিভু নিভু প্রদীপ অবিশ্বাসের অন্ধকার নিয়ে ।
নিঃস্ব, রিক্ত বুকে ভোরের হাওয়া যেন শেষ সম্বল
বাড়িয়ে দেওয়া হাত নতুন রূপকথার গল্পঃ খোজে।
প্রতিটি পাথরের খাঁজে লুকিয়ে থাকা আশা বাসা বাঁধে
সকলের রোদ নরম হতে হতে মিশে যায় আঁধারে।
পবিত্র শিলায় মাখানো লাল সিঁদুরে গোধূলির আলো
ধুলো মাখা শরীর লুটায় সমর্পিত অগাধ বিশ্বাসে ।
হৃদয়ের আকুলতা করুন আর্তি নিয়ে বিশ্বাসের দরবারে
পিচ্ছিল শিলায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায় দেবতার দেহ মনে।
অসমাপ্ত কাহিনীর খোলা পাতায় থেমে থাকা কলমে
আঁকিবুকির আঁচড় মানচিত্রে, হয়তো নতুন সংযোগ।
ঘোড়ায় চড়ে আসা রাজপুত্র আদর করে তুলে নেবে
রাহুর মুক্তি ঘটলে এবার হয়তো বিশ্বাস আবার গাঢ় হবে।

আগুনের চিলেকোঠা
অরূপ দত্ত
অপরূপ সৌন্দর্যে সেজে উঠেছি,এই প্রথম বার।সূর্যাস্তের আলো মেখে যাচ্ছি শ্মশানের দিকে,পথের ধারে লিলি ফুল ফুটে আছে,অন্য সময় হলে এমন প্রাকিতিক দৃশ্যের কাছে দাঁড়িয়ে যেতাম,কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা সম্ভব নয়,সবাই কষ্ট করে এসেছে,সময়ে ফিরতে হবে।ওদেরকে সাবধানে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসবো,সে আর হবার নয়।আমি তো এসেছি, কাঠের সিঁড়ি বেয়ে আগুনের চিলেকোঠায় উঠে যাবো বোলে।

নতুন অপেক্ষা
সোমালিয়া
কিছুদিন আগেও বৃন্দা ভেবেছিল বসন্ত বুঝি আসার আগেই বিদায়ের বাঁশি বাজাবে তার জীবনে। কিন্তু তার ভাবনাকে মিথ্যে করে পলাশ তার লাল দুহাত বাড়িয়ে দেয় বৃন্দার দিকে। বুঝিয়ে দেয় রঙিন মোড়কের ভিতর খেলা করে যে সত্য সেই তো ভালোবাসা। বিচ্ছেদের ভয়ার্ত হাতছানি থেকে সাবধান হতে দুহাতের আঙুলের গোলাপী মিলনকে স্বাগত জানায় বিনা দ্বিধায়।
তারপর আবারো অপেক্ষা। ক্ষুধার্ত দুটি মন ভেজা চোখ নিয়ে সাদা ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে ভালোবাসার আঁকিবুকি।।
যেন সহস্র রাত জাগা চাতুরীর
অপার্থিব পুনর্জন্ম!

আলোর দ্বারে দাঁড়াও
নিত্যানন্দ দাস
হয় ভালো কিংবা মন্দ হও
মূর্খ দোটানা ছাড়ো
ঝড় এলে, ঝড় তো আসবেই
কখনও না কখনও ;
কোথায় পালাবে নির্বোধ ?
না পালিয়ে বরং তার
কঠোর মুখের 'পরে দাঁড়াও ;
অছিলার সব আড়াল সরাও ।
সবাই সাঁকোয় দাঁড়িয়ে বাঁচে
সাঁকো ভাঙলে নরকে
দুরন্ত আক্ষেপে জ্বলে আঁচে ।
তুমি ভালোর পারে দাঁড়াও
তুমি আলোর দ্বারে দাঁড়াও !

দ্রাঘিমা নির্ণয়
স্নেহাশিস সৈয়দ
মৃদু স্পর্শে জেগে আছে সমস্ত অতীত, বর্তমান -এভাবে শুরু করলে শেষটা ভালো হত না, সে কথা-ই বলেছিলে তুমি...অন্তস্থ আলজিভে স্মৃতির ঝাঁপি --আমি তোমার হাতের রেখায় এঁকে দিচ্ছি কলেজ জীবন...
রবীন্দ্র সদনের সামনে দাঁড়াতেই উড়ে গেল স্নায়ুপাখির দল, শ্যাওলা-পিচ্ছিল মহাজাগতিক সরলরেখার মতো; ক্লান্তিহীন বুদ্ধিজীবীদের চিৎকারে কেঁপে উঠি- শতাব্দীর অভিশাপে।..
তীক্ষ্ণ শব্দ এসে ঢেকে দিচ্ছে শরীরের সমগ্র অস্থি দেশ। জড়িয়ে যাচ্ছে সামাজিকতার দুর্বদ্ধ সম্পর্কে।
এসো, দ্যাখো, কেমন ভাবে তৈরী হচ্ছে শরীরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।.. আজও তুমি বড্ড উদাসীন!!..
আসলে মোদ্দা কথা হলো- এই তর্জনি এখনও ছোঁয়নি নির্মান কৌশলের স্পর্শ রেখা;
যেখান থেকে কেবলই বের হয়ে আসে বৃত্তের দ্রাঘিমা আর তোমার ভালোবাসা।...
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.