
পাঠ প্রতিক্রিয়া - শোকের ভেজা তুলো
কবি - দেবাশিস চন্দ
কবিতার বইয়ের নাম কখনও কখনও বইটির দরজা। সেই দরজা দিয়ে ভিতরে ঢোকার আগেই পাঠক একটি আবহের আভাস পেয়ে যান। দেবাশিস চন্দের শোকের ভেজা তুলো তেমনই একটি নাম—যার মধ্যে একই সঙ্গে রয়েছে কোমলতা, আর্দ্রতা এবং মুক্তি। শোককে তুলোর সঙ্গে তুলনা করা আপাতদৃষ্টিতে কোমল একটি উপমা, কিন্তু ‘ভেজা’ শব্দটি সেই কোমলতার ভিতরেই এনে দেয় এক অদ্ভুত ভারবোধ। শোক যেমন স্পর্শে নরম অথচ বহন করতে গেলে ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠে, এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিও তেমনই পাঠকের চেতনায় ধীরে ধীরে জমা হয়।
২০২৬-এ সিগনেট প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের কবিতাগুলির মধ্যে দিয়ে দেবাশিস চন্দ যে কাব্যজগৎ নির্মাণ করেছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে স্মৃতি, বিচ্ছেদ, সময়, প্রকৃতি, নাগরিক জীবন, সামাজিক অসুখ এবং সর্বোপরি মানুষের অন্তর্গত একাকিত্ব।
বইটির সূচিপত্রের দিকে তাকালেই কবির ভাবনার বিস্তারটি বোঝা যায়। ‘চক্রব্যূহ’, ‘হননের পোকার’, ‘তাহারা’, ‘সময়ের কম্পন’, ‘বিপরীত ক্রিয়া’, ‘হারানো স্লেট’, ‘সূর্যাস্তদর্পণ’, ‘উনিশে মে’, ‘বৃষ্টিপদ’, ‘দুঃখ রাতের গান’, ‘নগরবর্ষা’, ‘কেউ আসে না’, ‘আবেগচূড়ান্ত’, ‘উপেক্ষা’, ‘দূরে নয় কাছে’, ‘প্রত্যাখ্যানকাটা’ থেকে ‘ক্ষয়রোগ’, ‘বিষম’, ‘হাওয়ের ডাকঘর’, ‘নিজস্ব প্রাণে’, ‘শহরসংলাপ’, ‘গিরায়গিটি রং’, ‘পাটাতন-২’, ‘বন্ধন’, ‘পুনশ্চ’, ‘সহজ নয় ভোলা’, ‘অন্ধকার, শুধু অন্ধকার’, ‘গরিব আলোয়ান’, ‘আত্মসত্তা’, ‘অভিযান’, ‘শোকের ভেজা তুলো’, ‘মৃত্যুমকট’, ‘চিরঘুমসজ্জা’—নামগুলির মধ্যেই যেন একটি মানসিক যাত্রাপথের রেখাচিত্র আঁকা হয়ে যায়। এই যাত্রা সরল নয়; কখনও তা ব্যক্তিগত, কখনও সামাজিক, কখনও অস্তিত্ববাদী।
‘চক্রব্যূহ’ কবিতাটি এই কাব্যভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। ‘সত্যের কাছে মিথ্যা / মিথ্যার কাছে সত্যের খোঁজ’—এই দ্বন্দ্ব দিয়ে কবি যে আবর্তের সূচনা করেন, তা শেষ পর্যন্ত শুধু সত্য-মিথ্যার নৈতিক সমস্যায় আটকে থাকে না; মানুষের সম্পর্ক, সময়, স্মৃতি এবং সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও তার বিস্তার ঘটে। সত্য ও মিথ্যা এখানে পরস্পরের বিপরীত নয়, বরং পরস্পরের ভিতরে ঢুকে পড়া দুটি শক্তি। কবির ‘জ্যামিতিক গোলকধাঁধা’র চিত্রকল্প তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সমকালীন মানুষের অবস্থানকে তিনি যেন সরল রেখায় নয়, এক গোলকধাঁধার ভিতর দেখতে চান।
আবার ‘তাহারা’ কবিতায় কবি একেবারে অন্য সুরে কথা বলেন। একটি ভাঙাচোরা প্রাচীন চাতাল, নদী, জলকল্লোল, সবুজ পাতা, শিশুদের হাসি, লোহার গেট, কংক্রিটের দমবন্ধ বাতাস—এই সমস্ত দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে ফিরে আসে এক হারানো সময়। ‘তাহারা’ কারা? তাদের অস্তিত্ব কি বাস্তব, না কি স্মৃতির নির্মাণ? কবিতার শেষে প্রশ্নটি যখন ফিরে আসে—তাহারা কি কোনওদিন এসেছিল এই ভাঙাচোরা চাতালে?—তখন স্মৃতি ও বিস্মৃতির সীমারেখা মুছে যায়। এই অনিশ্চয়তাই কবিতাটির সৌন্দর্য।
প্রকৃতি দেবাশিসের কবিতায় কখনও নিছক পটভূমি নয়। ‘নগরবর্ষা’য় বৃষ্টি নাগরিক জীবনের একাকিত্বের সঙ্গে মিশে যায়। ‘দুঃখ রাতের গান’-এ বর্ষা হয়ে ওঠে স্মৃতি, যৌবন, পাহাড়, নদী, শৈশব ও হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের বাহক। ‘বর্ষা’ সেখানে শুধু ঋতু নয়—একটি মানসিক অবস্থা। কবি লিখছেন এমন এক বৃষ্টির কথা, যা কখনও ‘স্মৃতি, শোকের শীতলপাটি’; অর্থাৎ প্রকৃতি এখানে মানুষের অন্তর্গত ক্ষতকে ঢাকার কিংবা আরও স্পষ্ট করে তোলার একটি মাধ্যম।
এই কাব্যগ্রন্থের আর-একটি লক্ষণীয় দিক তার সামাজিক সংবেদন। ‘আসে না মহাজন্মের লগ্ন’-এ ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায় রাজনীতি, অর্থনীতি, নাগরিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। ‘মানুষে মানুষে ফাটল ক্রমশ বাড়ে’—এই উপলব্ধি কবির ব্যক্তিগত বেদনার পরিসরকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতায় পৌঁছে দেয়। ফলে তাঁর শোক একান্ত ব্যক্তিগত নয়; সময়েরও শোক।
দেবাশিস চন্দের ভাষা অলংকারের ভারে আক্রান্ত নয়। বরং কথ্যতার সঙ্গে ঘন চিত্রকল্প, দীর্ঘ পঙ্ক্তির প্রবাহ এবং হঠাৎ উঠে আসা দার্শনিক উচ্চারণ তাঁর কবিতাকে নিজস্ব স্বর দিয়েছে। কোথাও কোথাও কবিতার ঘনত্ব পাঠকের কাছে পুনর্পাঠের দাবি রাখে—এবং সেটিই সম্ভবত এই কবিতাগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। কারণ যে কবিতা প্রথম পাঠেই সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়, তার সঙ্গে দীর্ঘকাল বসবাস করা কঠিন।
শোকের ভেজা তুলো তাই শোককে অবলম্বন করে জীবনের দিকে ফিরে তাকানোর বই। এখানে মৃত্যু আছে, বিচ্ছেদ আছে, অন্ধকার আছে; কিন্তু সেই অন্ধকারের ভিতরেই আছে বৃষ্টি, নদী, শৈশব, ভালোবাসা, স্মৃতি এবং মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। দেবাশিস চন্দের কবিতার সবচেয়ে বড় সার্থকতা সম্ভবত এইখানেই, তিনি বেদনার সৌন্দর্য নির্মাণ করতে চাননি, বরং বেদনার ভিতর থেকে সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। আর সেই আবিষ্কারের ফলে শোকের ভেজা তুলো পাঠকের হাতে এসে শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে নিজের ভিতরের কিছু পুরনো, ভেজা, ভুলতে না-পারা স্মৃতিকে ছুঁয়ে দেখার এক নীরব উপলক্ষ।
অনির্বাণ কুণ্ডু
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.