
প্রেমের রাজ্য, রাজ্যের প্রেম
অমিতাভ ভট্টাচার্য
যা একখানা প্রেম করেছিল না একদল মানুষ -- যে কী বলব । এমন প্রেম ইতিহাসে বিরল । একজন বুঁচি বা একটা টেঁপার প্রেম নয়, এক্কেরে রাজ্যসুদ্ধু সক্কলে প্রেমে পুরো মশগুল হয়ে উঠেছিল । গণপ্রেম যাকে বলে । একজন মানুষকে আবালবৃদ্ধবনিতা এত ভালোবেসে ফেলেছিল যে না শুনলে বিশ্বাস হবে না । হয়েছিল কি সোজা শিরদাঁড়া মানুষের রাজ্যকে দেবদেবীদের আর পোষাচ্ছিল না । ঐ রাজ্যের মানুষদের বড্ড দেমাক -- লেখাপড়ার দেমাক, বুদ্ধির দেমাক, লড়ে নেওয়ার দেমাক, আগুয়ান চিন্তার দেমাক, সবচেয়ে বড় কথা মাথা না নোয়ানোর দেমাক । কেমন একটা বেখাপ্পা পাবলিক সব । দেবদেবীরা ঐ দেমাকগুলো ভাঙার কত চেষ্টাই না করল-- ছলে বলে কৌশলে-- কিন্তু সব ফেল । রাজ্যটাকে কেটেকুটে খানিক এপারে খানিক ওপারে খানিক সেপারে পাঠিয়ে অনেকদিন আগে ঐসব পাবলিককে টাইট দেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল । সেইসব ব্যবস্থাতেও তেমন কাজ হলো না । মারের পথে সুবিধে তো হলোই না উল্টে পাল্টা মারও খেতে হলো । কিন্তু শেষে যখন জল স্থল এমনকি আকাশপথে বোমাবন্দুক চালান করেও সুবিধে হলো না তখন দেবদেবীরা অসরকারি কনসালটেন্টদের পরামর্শ নিতে গেল ।
বাঘা বাঘা মাথারা একসঙ্গে মিলে অনেক মাথা মেরে অর্বুদ অর্বুদ টাকা খরচ হবে এমন একটা পরিকল্পনা করলে । ঐ রাজ্যের মানুষকে প্রেমে ফেলতে হবে, প্রেমে পড়লে মানুষের বুদ্ধি ঘুলোয় -- সেই সুযোগে ব্যাটাদের শিরদাঁড়াগুলো পট পট করে ভেঙে দিতে হবে । অসরকারি কনসালটেন্ট দের পরামর্শে এক মানবী তৈরির কাজ শুরু হলো যার প্রেমের ফাঁদে ঐরাজ্যর মানুষকে ধরতে হবে । ইয়াঙ্কিদেব, প্রভুমাও, জামাতিষ্ণু, রামায়েৎস্বামী, মাতাসুসি ইত্যাদি ইত্যাদি দেবতারা নিজেদের শরীরের নানা অংশ দিয়ে সেই মানবীকে তিলে তিলে গড়ল । সঙ্গে তাঁরা গড়ে দিলেন সেই মানবীর চল্লিশ স্যাঙাৎ । এইবার সেই শিরদাঁড়া সোজা রাজ্যে সেই মানবীর মহিমা কীর্তনের ভার দেওয়া হলো উপদেবতাদের রাজা সদানন্দ বর্তমানের । সে গুচ্ছের নটনটী কবি লেখক শিল্পী গায়ক ভাড়া করে ঐ রাজ্যে প্রেম বিলোনোর সুচারু বন্দোবস্ত করে দিল । কয়েকজন দেবতা একটু খুঁতখুঁত করেছিল যে একটা প্রেমের জন্যে এত টাকা খরচ করাটা কি ঠিক হচ্ছে । তখন ঐ অসরকারি কনসালটেন্টরা দেবদেবীদের এক ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করে দেখালেন । দেখা গেল প্রেমটা বছর পনেরো টিঁকে গেলে বছর খরচের একশগুণ টাকা উঠে আসবে ।
ব্যাস তারপর সেই রাজ্যে শুধু প্রেম আর প্রেম । সেই মানবীর প্রতি মানুষের প্রেম । একেবারে প্রেমের নীল আকাশ আর সাদা মেঘ যেন সেখানে মাটিতে নেমে এল । যেদিকে চোখ যায় খালি সাদা আর নীল, নীল আর সাদা । প্রেমে পড়লে মানুষ অন্ধ হয় কিন্তু সেই রাজ্যের মানুষ তার সঙ্গে বোবা কালা পঙ্গু এবং আর যা যা হওয়া যায় সবই হলো । গোটা রাজ্যের মানুষ দেবতাদের সেই মানবীকে এমন ভালোবেসে ফেলল যে সে যা বলায় তারা তাই বলে সে যা করায় তারা তাই করে । বোধবুদ্ধি যমের দক্ষিণ দুয়ারের দিকে পাঠিয়ে তাঁরা হরিণ শিশু যেমন হায়নার প্রেমে মজে তেমনি বিহ্বল হলো ।
প্রেম পাক ধরল কি ধরল না দেবদেবীরা সেই মানবী আর তার সাঙাৎদের নামিয়ে দিল শিরদাঁড়া সোজা রাজ্যে ধ্বংসের কাজে । তারা সেই রাজ্যের প্রাণভোমরা শিক্ষা খেয়ে ফেলল আর প্রেমে দিওয়ানারা বলল, শিক্ষা ছিল এক ভারী বোঝা, সেটা নেই তাই কেমন হাল্কা লাগছে, আহা কী ভালো! সেই মানবী আর সাঙাৎরা কাজ খেল, লোকে বলল বেকার জীবনই সার্থক জীবন, আহা কী ভালো! ওরা চাষ খেল, সকলে বলল চাষবাস কি মানুষে করে ছো, আহা কী ভালো! ওরা ঘর খেল, চাল খেল, তিপ্পল খেল, ওষুধ খেল, দিনের পর দিন পিঠে খেল, সামনে যা পেল তাই খেল -- প্রেমে পাগল সকলে বলল আহা কী ভালো! ওরা সন্তানের ভবিষ্যৎ খায় আর পূর্বরাগে আচ্ছন্ন বাবা-মা বলে আর তো কোনো বিকল্প নেই । খরচের একশগুণ তুলতে সেই মানবী আর তার সাঙাৎরা সেই শিরদাঁড়া সোজা রাজ্যের সব সম্পদ দেবতাদের দেশে চালান করে দিল । সকলে বলল, সব হারিয়ে কী যে সুখ এখন বুঝছি, আহা কী ভালো! নিরীহদের রক্তের নদী বয়ে গেল, প্রেমে উন্মাদরা সেই নদীতে স্নান সেরে উসুম জলে নেয়ে নেওয়ার আনন্দ পেল, আহা কী ভালো!
সকলে অবশ্য একলোকের সঙ্গে দীর্ঘদিন প্রেমে খুশি হয় না । একটু ছোঁকছোঁকানি করে । তখন দেবদেবীরা ঐ মানবীর কটা সাঙাৎকে কার্তিক ঠাকুর সাজিয়ে বাজারে ছেড়ে দিল । ছোঁকছোঁকানিয়ারা এখন তাদের সঙ্গে প্রেম করছে ।
শিরদাঁড়া সোজা রাজ্যের মানুষ নুয়ে পড়ে এখনও প্রেমদিবস পালন করছে । তাদের খুরে খুরে শুভেচ্ছা

প্রশ্নবাণ
অনিন্দিতা সান্যাল
বাচ্চারা একটা সময় পর্যন্ত বেশ সহজ সরল থাকে। প্রচুর প্রশ্ন করে। কিন্তু সেগুলোর উত্তর প্রশ্নের থেকে সহজ হয়। এরপর সেই বাচ্চা যখন চৌবাচ্চা স্তরে পৌঁছায় প্রশ্নগুলো বাণের মত ছুটে আসে। হয় এড়িয়ে যেতে হয়। নয়তো গাঁজাখুরি কিছু বোঝাতে হয়। আর বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে একদম নিপাট সত্যিই জানাতে হয়। আমার বাচ্চা এখন চৌবাচ্চা স্তরে। অনেক প্রশ্ন তার। কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর বন্ধুরা নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করে ঠিক করে নিয়েছে। আর বাকিগুলো আমার কাছে ধেয়ে আসে। এই যেমন সেদিন জানতে মা নেতাজী তো বাঙালি। বললাম হ্যাঁ। সুভাষ চন্দ্র বোস। তারপর জানতে চাইলো গান্ধীজি গুজরাটি,বললাম হ্যাঁ। নিজেই বললো মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। বললাম হ্যাঁ। তাহলে বাঙালি আর গুজরাটি সবার নামের পেছনে জী বসে? আমরা কি রবীন্দ্রনাথজী বলবো? বললাম একদম না উনি কবিগুরু এইটুকু ঠিক আছে। বললো তাহলে নেতাজী কে নেতা বলবো না কেন। বললাম সারা দেশ ওনাকে শ্রদ্ধায় নেতাজী বলেন। কিভাবে নেতাজী হলেন সে সময়মত জানান হবে। এইবার পরের প্রশ্ন নেতাজী আর গান্ধীজির মধ্যে কে বেশি ভালো। পুরোপুরি ধর্মসংকটের প্রশ্ন। বোঝাতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে,আর আমি বুঝিয়ে যাব কিন্তু ও কিছুই বুঝবে । বললাম দ্যাখ তুই শ্যামবাজার গেছিস। বললো কতবার। ওখানে কি দেখেছিস। বললো ঘোড়ায় চড়া নেতাজী। বললাম তুই টাকা দেখেছিস,বললো হ্যাঁ। সেখানে কে থাকেন?বললো গান্ধীজি। ব্যস হয়ে গেল। দুজনে দূরকমের বরেণ্য মানুষ। আর ভালো মন্দের দিকটা,বিশাল বড় আলোচনা,পরে বোঝাবো। বললো তাহলে কোনো বাঙালির নামের সাথে জী বলবো না তো নেতাজী ছাড়া। বললাম একদম।
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.