আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
রম্য রচনা
ধারাবাহিক উপন্যাস
প্রবন্ধ
বিবিধ
Privacy Policy
আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
রম্য রচনা
ধারাবাহিক উপন্যাস
প্রবন্ধ
বিবিধ
Privacy Policy
More
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • রম্য রচনা
  • ধারাবাহিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • বিবিধ
  • Privacy Policy
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • রম্য রচনা
  • ধারাবাহিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • বিবিধ
  • Privacy Policy

রম্য রচনা

জঘন্য জঙ্গলভ্রমণ
অমিতাভ ভট্টাচার্য

রাস্তায় পৌঁছে দেখি চারদিকে কুকাঠ অন্ধকার । কোনো গাড়ি ফাড়িও যাচ্ছে না । বেশ খানিকটা দূরে একটা লম্ফর আলো জ্বলছে মনে হলো । এগোলুম দুজনে সেদিকে । গিয়ে দেখি ঝুপড়ি একটা চায়ের দোকান । একা দোকান মালিক রয়েছেন । দুটো চা দিতে বললুম । ভদ্রলোক বললেন, “দোকান গুটিয়ে দিয়েছি । কিন্তু আপনারা বেরিয়েছেন কেন হোটেল ছেড়ে? কেউ বারণ করে নি । কদিন একটা দলছুট দাঁতাল এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে । পরশুর আগের দিন বাড়ি ফিরতে গিয়ে সেটার সামনে পড়ে গেছিলাম । সাইকেল রাস্তায় ফেলে পাশের বাড়িতে ঢুকে বেঁচেছি । ফিরে যান এক্ষুণি হোটেলে । দলছুট হাতি কিন্তু ভয়ংকর ।” এই বলে তিনি ফুঁ দিয়ে লম্ফ নিভিয়ে সাইকেলে চেপে চলে গেলেন । আমি আর বিশু অন্ধকারে দাঁড়িয়ে । মনে হলো একটা টর্চ আনা উচিত ছিল । বিশু বলল, “টর্চ আছে তো । তবে ব্যাগের ভেতরে, হোটেলে ।” রাস্তার ওপারেই হঠাত্‌ যেন দাঁতালটাকে দেখলুম অন্ধকারে । হাত পা কাঠ হয়ে গেল । বিশুকে সেইদিকে দেখতে বললুম । বিশু বলল, “হাতি নয়, গাছ ।” কিন্তু এখন যে অনেকটা হেঁটে হোটেলে ফিরতে হবে অন্ধকারে । চারপাশেই দেদার গাছ । তার মধ্যে এক-আধটা যে দলছুট দাঁতাল নয় তার গ্যারান্টি অন্ধকারে কে দেবে?

বিশুই আমাকে জপিয়েছিল, “বেড়াতে যাবি?” বিশু ছেলে ভালো, কিন্তু ঐ এক বদভ্যেস, সুযোগ পেলেই বেড়াতে যায় । আমার ঐসব বাজে নেশা নেই । তাই শুনেই বললুম, “না ।” কিন্তু বিশু নাছোড়বান্দা, জপিয়েই গেল, যেন আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার মানত করা আছে । “চল না ডুয়ার্স যাই । জঙ্গলে ।” বলে কী? জঙ্গলে বেড়াতে যেতে হবে নাকি? আমি জীবনে দুবার পুরী আর একবার দিঘায় গেছি । তাতেই যা ধকল কী বলব । আর বিশু বলছে কিনা জঙ্গলে বেড়াতে যেতে । “না ভাই, জঙ্গলে বেড়াতে যাওয়া পোষাবে না । জঙ্গল মোটেও ভালো জায়গা নয় । জঙ্গলে বাঘ ভাল্লুক হাতি গণ্ডার ম্যালেরিয়া সাপ টারজন বিষ-মাখানো তীর ছোঁড়া পিগমি ইত্যাদি থাকে । আমি নেই ।” বিশু বলল, “স্যাংচুয়ারি তো । তাছাড়া এখানে তেমন ভয়ংকর কিছু নেই ।” জঙ্গলের আবার এখান সেখান । যাই হোক বিশু কিন্তু আমায় জপিয়ে ফেলল । পাঁচজনের ট্যুর আমি আমার বৌ আমার মেয়ে আর বিশু এবং বিশুর বৌ ।

রাজি তো হলুম কিন্তু বিশুর পেটে পেটে এত । ওয়েলিংটনের একটা বাড়িতে ছতলা না সাততলায় চড়াল আমাকে, ফরেস্টেরে ঘর বুক করতে । লিফট খারাপ । ঘর বুক হওয়ার পরে বিশু নিজেই টিকিট কাটল ট্রেনের । পাহাড়িয়া এক্সপ্রেস । দিঘা থেকে এনজিপি যায় । তারপরে বিশু আমাকে বলল, “একটা জুতো কিনে নে । জঙ্গলে চটি পরে যেতে নেই ।” কী ঝামেলারে বাবা । আমি ইস্কুলের পরে জীবনে জুতো পরি নি আমাকে কি না । কিনতেই হলো । আবার বলে, একটা জ্যাকেট কেন, উইন্ডচিটার । শীতকাল । আমি আশ্চর্য । আমার শীতকাল কলকাতাতেই চিরকাল কেটেছে । বাবার রিটায়ারমেন্টের ফেয়ারওয়েলে পাওয়া একটা শাল আর শাশুড়ির নিজের হাতে বোনা একটা সোয়েটার -- ঐতেই দিব্বি শীত কেটে যায় । বিশুর চক্করে পরে জ্যাকেট-জুতো ইত্যাদি কিনতে গিয়ে জঙ্গল ভ্রমণের ভয়াবহতা নিয়ে আগাম ধারণা হলো । ওডোমক্সের টিউব, গুডনাইটের কয়েল কিনে তো ট্রেনে চড়ে বসা গেল ।

সকালে ট্রেন থেকে নেমে দুপুর দুপুর পৌঁছলুম মূর্তি । বিশুর এক বন্ধুর শালা পথে খানিকটা আমাদের সঙ্গী হলেন । তিনি মালবাজারে থাকেন, পিডব্লুডির কন্ট্রাক্টর । জঙ্গল নাকি তাঁর নখদর্পনে । পথেই আমাদের বলে দিলেন, আজ বিকেলে খুনিয়া ওয়াচ টাওয়ারে যাবেন । আমাদের ওখানে কাজ হচ্ছে, ওদিকে নাকি এখন কিছু বাইসন আর গণ্ডার আছে । আমার পেটের ভেতরটা কেমন করে উঠল । যা শুনলুম এখানকার লোকাল লোকজন হাতিকে তেমন পাত্তা দ্যায় না । ওদের যত ভয় বাইসনকে নিয়ে ।  বাইসন নাকি মারাত্মক রগচটা জানোয়ার । সাদা গাড়ি দেখলেই তাকে গুঁতিয়ে উল্টে দ্যায় । আর তা ছাড়া খুনিয়া নামটাও কেমন যেন । উনি বললেন, আগে ওখানে একটা গ্রাম ছিল । হাতির হানায় লোক নিয়মিত খুন হতো তাই নাম খুনিয়া । এখন গ্রামটা অন্য জায়গায় সরে গেছে । যেখান থেকে মানুষ খুন হওয়ার ভয়ে সরে গেছে সেইখানে যাব আমি । বিশুর দেখলুম সেই শুনে প্রবল উত্‌সাহ । কী আর করা যাবে । পড়েছি মুঘলের হাতে ।

হোটেলে আমরা উঠলুম লগহাটে । মাটির থেকে খানিক উঁচুতে । লগ মানে সিমেন্টের লগ । হাতি যেন হাত বা শুঁড় বাড়িয়ে নাগাল না পায় । হোটেলের চত্বরে প্রায়ই নাকি হাতি ঢুকে পড়ে । হোটেলের ভেতরে ছোটো ছোটো পামগাছের পাতা খেতে নাকি ওরা খুব পছন্দ করে । শুনে আমি আরও ঘাবড়ে গেলুম । এমনি জায়গাটা খারাপ নয় । হোটেলের গা দিয়েই অনেকটা চওড়া মূর্তি নদী । থাকার ঘরটাও বিশাল । দেওয়াল সিলিং চেয়ার টেবিল সব বেতের । নদীর দিকে চওড়া বারান্দা । সরকারি সম্পত্তি বলেই এই পয়সায় এমন ঘর পাওয়া গেছে বলে বিশু জানাল । দুপুরে হোটেলের ক্যান্টিনে কালানুলিয়া চালের ভাত খেয়ে বেশ একটা ঘুম দেব মনস্থির করেছিলুম । কিন্তু বিশু তাড়া মারল খুনিয়া যেতে হবে । টিকিট কেটে গাড়ি ভাড়া করা হয়ে গেছে । ছোটো ছোটো সাফারি গাড়ি ছাড়া অন্যকিছু জঙ্গলে ঢুকতে দ্যায় না । সিস্টেমটা বেশ । স্থানীয় যুবকরা গাড়ি কিনে সাফারির কাজে লাগায় । পর্যটনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান । কেউ ড্রাইভার, কেউ গাইড, ক্যান্টিনও চালায় স্থানীয় কো-অপারেটিভ । আমাদের হোটেল থেকে অনেকগুলো গাড়ি ছাড়ল অন্যান্য জায়গায় যাওয়ার কিন্তু আমাদের খুনিয়ার গাড়ি আর ছাড়ে না । শীতকাল দেরি করলে সন্ধ্যে হয়ে যাবে । বিশু কাউন্টারে বেশ একটু তড়পাতে একটা গাড়িতে একজন ড্রাইভার আর গাইড উঠে বসলেন । গন্তব্য খুনিয়া ।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলেছে । প্রতি তিরিশ সেকেন্ডে একবার গাইড একবার ড্রাইভার গাড়ি স্লো করে আশপাশে তীক্ষ্মদৃষ্টিতে দেখছে । না কিছু চোখে পড়ে নি । কেবল একটা ময়ূর দেখলুম । রাস্তার ওপরেই পেখম মেলেছে । গাড়ির বাকিরা উচ্ছ্বসিত । আমি এতে আনন্দের কী আছে বুঝলুম না । এইবারে পিচ রাস্তা ছেড়ে গাড়ি জঙ্গলে ঢুকল । আমার বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল । চারপাশে ময়ূরের চিত্‌কার । প্রচুর ময়ূর । কেউ উড়ছে কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে । ধীরে ধীরে গাড়ি পৌঁছল খুনিয়া ওয়াচ-টাওয়ারে । ওয়াচ টাওয়ারের চারপাশটা বেশ পরিষ্কার । হঠাত্‌ ড্রাইভার সাহেব দেখি ফিসফিস করে কী বলছেন । তাকিয়ে দেখি একটা গণ্ডার । একেবারে হাতের কাছেই । ওয়াচ টাওয়ারের ঠিক উল্টোদিকে একটা মজা ছোটো ডোবা । তার ওপারে গণ্ডারটা । আমরা চুপি চুপি গাড়ি থেকে নেমে ঢুকলুম ওয়াচ টাওয়ারে । এত কাছ থেকে চিড়িয়াখানাতেও গণ্ডার দেখা যায় না । আমি ভাবছি গণ্ডার কি সিঁড়ি ভেঙে উঠতে পারে? দোতলাতে আমরা পাঁচজন । গণ্ডারটা আরও ওয়াচ টাওয়ারের দিকে সরে এল । বিশু দেখলুম বিপুল সাহসী । গাইড ভদ্রলোককে জিগেস করল, “ঐ ডোবাটার এ পাশ থেকে একটা ছবি তুলব?” গাইড ভদ্রলোক কী যে বললেন বোঝা গেল না । বিশু আর বিশুর বৌ গেল কাছ থেকে গণ্ডারের ছবি তুলতে । আমি দম বন্ধ করে ওদের দেখছি । একেবারে কাছে গিয়েই ওরা ছবি তুলল । গণ্ডারটাও দিব্বি পোজ দিচ্ছিল । ওরা ফিরে আসতে আমার বৌ হঠাত্‌ বলে বসল, “চলো আমরাও গিয়ে একটা ছবি তুলে আনি ।” একটা ক্যামেরা আমি এনেছি বটে কিন্তু তা বলে ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে গণ্ডারের ছবি তুলতে হবে? আমি রাজি নই । কিন্তু বিশু জপাল, “যা না, কিচ্ছু হবে না ।” মেয়েকে বিশুদের কাছে রেখে আমি আর গিন্নি গেলুম ডোবার ধারে । একটু দূরেই গণ্ডারটা । আশপাশের ঝোপে কী একটা নড়ল । সেসব দেখার সময় নেই । একটা ছবি তুললুম, ক্লিক । গণ্ডারটা কেমন পোজ পালটে রুখে দাঁড়ানোর পোজ দিল । ছবি উঠল । যেই আর একটা ছবি তুলেছি গণ্ডারটা দেখি আমাদের দিকে ছুটে আসছে । আত্মারাম খাঁচাছাড়া । এক ছুটে ওয়াচ টাওয়ারে আসতে গিয়ে আর একটু হলেই হোঁচট খাচ্ছিলাম আর কী । আমার গিন্নি যে এত ভালো দৌড়তে পারে আগে তার কোনো ধারণাই ছিল না । আমাদের দৌড় দেখেই বোধহয় গণ্ডারটা আর এগোল না । প্রাণ হাতে করে ফিরলুম যেন । বিশু বলল, “না । ওখানে যাওয়াটা ঠিক হয় নি । ঐ দ্যাখ ।” তাকিয়ে দেখি যেখানে দাঁড়িয়ে আমি আর বিশু ছবি তুলেছি সেখানে দুটো বুনো দাঁতাল শুয়োর দাঁড়িয়ে । ঝোপে কী যে খসখস করছিল তা এবার বুঝলুম । বিশু গাইডটাকে ঝাড়ল । আপনি বারণ করবেন না আমাদের, আমরা কী জানি কোথায় কী আছে? গাইড ভদ্রলোক আবার কী বললেন বোঝা গেল না । সন্ধ্যে নামে নামে প্রায় । আমরা আবার গাড়িতে উঠে ফিরে চললুম । দূরে দুটো বাইসনও চোখে পড়ল । গণ্ডারটা তখনও সেই ডোবার ধারে । তারপর হোটেলে ফিরে একটু চায়ের দোকানের চা খেতে বেরিয়েছিলুম আমি আর বিশু । কিন্তু চায়ের দোকানের মালিক তো দোকান বন্ধ করে সাইকেলে করে পগাড় পার ।

আমি আর বিশু সেই অন্ধকারে, সেই দলছুট দাঁতালের ভয় মনে নিয়ে হোটেলের দিকে চললুম । বিশুর মনে অবশ্য ভয় আছে বলে মনে হলো না । সে “এ যে বন্য এ অরণ্য” গানটা গুনগুন করে গাইতে লেগেছে শুনলুম । মানে দুজনের ভয় আমি একা মনের মধ্যে নিয়ে এগোচ্ছি । হঠাত্‌ দুম দুম করে আওয়াজ ভেসে এল । খুব কাছেই কিন্তু কোনদিক থেকে আসছে ঠাওর করতে পারলুম না । স্পষ্ট বুঝলুম আশপাশের গাঁয়ের লোকেরা ক্যানেস্তারা ঢাক ইত্যাদি বাজিয়ে হাতি তাড়াচ্ছে । সেই দলছুট দাঁতাল তবে তাড়া খাচ্ছে । একে দলছুট, তায় তাড়া খাওয়া -- সামনে পড়লে মিক্সিতে বাটা মুসুর ডালের মতোন মিহি করে বেটে দেবে সেটা একেবারে নিশ্চিত । বিশুকে বললুম, “হাতিটাকে তাড়াচ্ছে রে বিশু । এদিকে না এসে পড়ে ।” বিশু বলল, “হাতি না ছাই । কোনো রিসর্টে আদিবাসী নৃত্য হচ্ছে মনে হচ্ছে । তারই ঢাক বাজছে ।” আদিবাসী নৃত্য? কে জানে? হ্যাঁ আওয়াজটা কেমন ছন্দে বাঁধা  । কিন্তু এমন আওয়াজ শুনে হাতিও যদি দেখতে আসে ব্যাপারটা কী? তবে তো হয়ে গেল ।

রাস্তা ছেড়ে হোটেলের গলিতে ঢুকলুম । দূরে হোটেলের আলো । এই রাস্তাটা একদিকে নিরাপদ, হোটেলের গেট অবধি উঁচু তারের জাল দেওয়া দুদিকে । আশপাশ দিয়ে হাতি ঢুকতে পারবে না । হন হন করে হেঁটে তো হোটেলের গেটে পৌঁছলুম আর গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ । কাউকে দ্যাখা যাচ্ছে না । দলছুট দাঁতালের ভয়টা এবার দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এল । যদি হোটেলের রাস্তা দিয়েই এখন দাঁতালটা ঢোকে তো গেল দফারফা । একদিকে বন্ধ গেট আর দুদিকে উঁচু তারের জাল । একটাই পথ জুড়ে দাঁতাল । উফঃ ফাঁদে পড়া কাকে বলে । দুবার খুব চেঁচিয়ে হোটেলের লোকজন ডাকলুম । কিন্তু হঠাত্‌ মনে হলো বেশি জোরে আওয়াজ হলে যদি হাতিটা শুনে ফ্যালে । বিশু কিন্তু ম্যানেজারকে ফোন করল । টাওয়ারের সমস্যা ছিল । দুবার লাগল না । শেষে লাইনে ম্যানেজার এলেন । আর গেট খুলতে লোক পাঠালেন । একজন এসে গেটটা না খুলেই বলতে লাগলেন, “এখন বেরিয়েছিলেন । একটা দাঁতাল না এখন . . . ।”

“জানি, জানি” বলে ঝাঁঝিয়ে উঠলুম ।
হোটেলে ঢুকে শান্তি । ঘরে ঢুকে দেখি আমার বৌ আর মেয়ে আর বিশুর বৌ ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে । একে তো গণ্ডারের তাড়া খাওয়া তার ওপর হোটেলের লোকজন ওদের গায়ে পড়ে দলছুট দাঁতালের গল্প শুনিয়ে গেছে, তারও ওপরে আমরা দুজন অন্ধকারে বাইরে । আমাদের দেখে একটু স্বস্তি পেলেও ভয়ের ভাবটা গেল না । এমন সময় লোডশেডিং । ভয়টা একেবারে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল । যদিও জানি ঘরের মধ্যে উল্টোদিকের চেয়ার আমার বৌ-ই বসে আছে । তবু ঐখানে কেমন একটা হাতি হাতি ছায়া দেখলুম যেন । বাকিরাও নিশ্চয়ই কিছু না কিছু দেখছে । যাক মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আলো এল । আর একটু পরেই কলিং বেল বাজল । বিশু দরজা খুলতে যাচ্ছে । তিনজন মহিলাই চেঁচিয়ে উঠল, “খবরদার খবরদার দরজা খুলো না । নিশ্চয়ই সেই হাতি ।” বিশু বসে পড়ল । আমি তো অবাক । এরা দেখছি আমার চেয়েও বেশি ভয় পেতে পারে । আমি বললুম, “যতই অভয়ারণ্য হোক কলিং বেল বাজিয়ে হাতি ট্যুরিস্টদের সঙ্গে দেখা করে আসতে পারে না ।” কিন্তু নিজে গিয়ে দরজা খোলার রিস্ক নিলুম না । কে জানে বাবা কী হবে । চেঁচিয়ে জিগেস করলুম, “কে?” । উত্তর এল, কফি দিতে এসেছি । হাতি নয় মানুষ,  কফি আর পকোড়া দিতে এসেছে বুঝে দরজা খুললুম । দেখি ট্রে হাতে আমাদের সেই গাইড ।

আমি অবাক হয়ে জিগেস করলুম, “আপনি তবে গাইড নন?”

তিনি হেসে বললেন, “না স্যার আমি এই হোটেলে কাজ করি । খুনিয়া কাছাকাছি, পারিশ্রমিক কম বলে কোনো গাইড ড্রাইভার যেতে চায় না । এদিকে আপনারা খুনিয়াই যাবেন । তাই আমাকে গাইড সাজিয়ে পাঠিয়ে দিল । আমি এই প্রথম খুনিয়া গেলাম, ড্রাইভারও ।”

আমি বললুম, “যদি কিছু হয়ে যেত ।”

তিনি হেসে বললেন, “কিচ্ছু হবে না স্যার । সব বন্দোবস্ত করা আছে । যদি কোনো গাড়ি সন্ধের পরেও অনেকক্ষণ না ফেরে তবে এখান থেকে অন্য গাড়িতে বাজি বন্দুক নিয়ে রেসকিউ পার্টি বেরোয় । সবাইকে উদ্ধার করে আনে ।”

আমি আর কথা বাড়াই নি ।
হোটেলটির খাওয়া দাওয়া বেশ । হাতির ভয় মাথায় নিয়ে তো রাত্তিরে ঘুমোতে গেলুম । একটু ঘুমিয়েছি কি ঘুমোই নি দরজায় আওয়াজ । কে যেন চেঁচিয়ে ডাকছে । হাতি এসেছে নিশ্চয়ই ভাবলুম । তারপর বুঝলুম বিশু । আজ নাকি আমাদের দুবেলা সাফারির ব্যবস্থা । সকালেরটার জন্যে এক্ষুণি বেরোতে হবে । কী আপদ, এই ভোরবেলায় জঙ্গলে ।

একটু পরে আমাদের যাত্রা শুরু হলো যাত্রাপ্রসাদের উদ্দেশ্যে । পোষা হাতির স্মরণে ওয়াচ টাওয়ার, গরুমারা রিজার্ভ ফরেস্টে । গা ছমছমে পরিবেশ । ড্রাইভার মাঝে মাঝেই গাড়ি থামিয়ে এদিক ওদিক দেখছেন । হঠাত্‌ গাইড গাড়ি থামিয়ে দিলেন । আমরা শিহরিত । নিশ্চয়ই কোনো পশুর পাল । গাইড ফিস ফিস করে বললেন, “ঐ দেখুন গ্রেটার রেকেট টেলড ড্রংগোস । অনেককটা আছে ।” আমি তো চারদিকে তাকিয়ে বিরাট কোনো ভাল্লুক বা উল্লুক খুঁজছি । কিছুই চোখে পড়ে না । তারপর বুঝলুম কাকের মতো একটা পাখি । ধুস । কিন্তু সেই পক্ষীবিশারদ গাইড মাঝেমাঝেই গাড়ি থামান আর বলেন, “ঐ দেখুন আরটামাস ফাসকাস । ঐ দেখুন ব্ল্যাক ক্রেসটেড বুলবুল ।” কী মুশকিল বলুন দেখি । একবার গাড়ি থামিয়ে কী একটা বললেন । আমি তো আশেপাশের গাছের দিকে দেখছি, হয়তো ধনেশ পাখি । একটু পরে বুঝলুম দুটো হরিণ ছিল রাস্তায় । গাড়ির বাকিরা দেখেছে । আমি অভ্যেসের বশে পাখি দেখতে গিয়ে সেদুটো আর দেখতে পেলুম না । যাত্রাপ্রসাদে তো পৌঁছলুম । নদীর ধারে ওয়াচ টাওয়ার । বেশ চমত্‌কার । চারদিকে কুয়াশা অবশ্য । আমরা পৌঁছতেই আগের গাড়ির লোকেরা জিগেস করলেন, “হাতির পালটা দেখলেন?” ওরা আমাদের মিনিট দশেক পরে এসেছেন । হাতির পাল নাকি জঙ্গল থেকে নদীর দিকে যাচ্ছিল । আমি মনে মনে বললুম হাতি পাখি হলে নিশ্চয়ই দেখতুম । যা গাইডের পাল্লায় পড়েছি । মিনিট পনেরো পরে আর একটা গাড়ি এসে পৌঁছল । সে-গাড়ির যাত্রীরা জিগেস করলেন, “হাতির পালটা দেখেছেন?” মানে ওঁরা দেখেছেন নদীর দিক থেকে হাতির পালটা জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে । তার মানে দাঁড়াল আমাদের আগের গাড়ি হাতির পালকে যেতে দেখেছে, আমাদের পরের গাড়ি হাতির পালকে ফিরতে দেখেছে । আমরা মাঝখান থেকে ভালোয় ভালোয় চলে এসেছি । এই সাতসকালে হাতির পালের সামনে না পড়া যে কত বড় সৌভাগ্য সেই ভাবছি তখন । বিশু কিন্তু দেখলুম একেবারে মুষড়ে পড়ল, “ইশ আমরাই দেখতে পারলুম না ।” সে কী আফশোস বিশুর । দলের বাকিদেরও দেখলুম মন খারাপ । রাত্তিরে ঘরে কলিংবেল বাজালে হাতি ভাবে তারা দেখবে হাতির পাল । আমি বললুম, মনে মনেই, হাতিরা কখনো ভীতুদের দেখা দ্যায় না । তা বেশ করে । যাত্রাপ্রসাদ থেকে কেউ নদীর তীরে কেউ বাইসন, কেউ হরিণ কেউ শুয়োর দেখতে পেলেন । আমি অবশ্য কুয়াশা ছাড়া কিছু দেখতে পাই নি । অবশ্য একটা পেল্লায় হাতি দেখলুম একেবারে দুহাতের মধ্যে । বনদপ্তরের পোষা । তার পিঠে চেপে বনকর্মীরা ডিউটি যাচ্ছেন । পোষা হোক আর যা হোক হাতি তো । আর সাইজটাও দেখার মতো । বিশুর কিন্তু মুড অফ ।

দুপুরে খেয়েদেয়ে গন্তব্য চাপড়ামারি ওয়াচ টাওয়ার । আমি নিশ্চিত এইবারেও কিছু পাওয়া যাবে না দেখার মতো । গাড়িতে উঠেই গাইডকে বললুম, “আমাদের পাখি চেনার কোনো ইচ্ছে নেই ।” ফুরফুরে মেজাজে চলেছি । একটা ওয়াচটাওয়ারের সামনে গাড়িটা থামল । দুচারজন ওয়াচ টাওয়ারের সামনে বসে আছে । আমি তো নেমেই একটু গুনগুন করে গান গাইছিলুম কিন্তু যাঁরা বসেছিলেন তাঁরা চোখে ধমক দিয়ে ইশারায় চুপ করতে বললেন । তাঁদের কাছে গিয়ে তো আমার চক্ষু চরকগাছ ।

ওয়াচ টাওয়ারের গায়ে একটা বড় পুকুর । পুকুরের এইদিকে আমরা আর ঐদিকে একপাল হাতি জল খাচ্ছে, তাদের থেকে একটু দূরে একপাল বাইসন, আর অন্যপাশে একটা কিংসাইজ গণ্ডার । আমার তো প্যালপিটেশন শুরু হয়ে গেল । আমাদের সামনেই অবশ্য ইলেকট্রিক ফেন্সিং আছে । কিন্তু এখানে যা লোডশেডিং । বিশুর মুখে দেখি চওড়া হাসি । পটাপট ছবি তুলছে । যা বুঝলুম কুড়িবাইশটা হাতি । তারা যতক্ষণ না জল খেয়ে উঠে যাবে বাইসনেরা জলে নামবে না । বেশ খানিকক্ষণ পরে বড়সড় হাতিরা জল ছেড়ে উঠে জঙ্গলে ঢুকল । ছোটোগুলো কিন্তু জলেই থাকল । দু-একটা বাইসন এগোতে যাচ্ছিল । ছোটোগুলো তাদের তাড়া করল । গণ্ডারটা একমনে ঘাসপাতা চিবুচ্ছে । সবাই বলছিল, “সল্টলেক, সল্টলেক ।” সল্টলেকে আমি সেই ছোটোবেলা থেকে যাই । হাতি আছে বলে তো শুনি নি । অবশ্য শিয়াল ছিল । তারপর বুঝলুম এটা সল্টলিক । এখানে নুন দেওয়া হয় আর পশুরা সেগুলো চাটতে এখানে আসে । কী নুন দ্যায় কে জানে? মনে হয় ইলেকট্রিক নুন । নইলে ছোটো হাতিগুলো এতক্ষণ ধরে চাটবে কেন? আমি অবশ্য জানি বিপদ সবসময় যেদিকে তুমি দেখবে না সেদিক থেকেই আসে । আমরা সবাই সামনে দেখছি । পেছন থেকে যদি এখন অন্যকিছু চলে আসে তো চিত্তির । কিন্তু সেরকম কিছু হলো না ।

এরপরে আমাদের নিয়ে চলল আরও গভীর জঙ্গলে । সেখানে নাকি লোকনৃত্য দ্যাখাবে । সে রাস্তা একেবারে বাজে । একদিকে নদীর খাদ আর একদিকে উঁচু ঝোপের জঙ্গল । ঝোপের পেছনে কী আছে বোঝার উপায় নেই । যাইহোক একটা ফরেস্ট বাংলোয় গিয়ে নেপালী নাচগান দেখে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে নেমে এল । সেই বাজে রাস্তাটা সেই সল্টলিকের পাশ দিয়ে ফিরতে হবে এবার । ওমা দেখি আমাদের গাড়িতে উঠলেন একজন গানম্যান । আমাদের গাড়ি আগে যাবে তাই ঐ ব্যবস্থা । দিব্যি চলছে গাড়ি । পাথর বেছানো পথ । উঁচুনীচু । হঠাত্‌ থেমে গেল । সামনে রাস্তা জুড়ে একটা বাইসন । গানম্যান বললেন, এটা দলছুট, সাবধান । তখনই মনে পড়ল আমাদের আজকের গাড়ির রঙ সাদা । আর সাদা গাড়ি দেখলেই বাইসন নাকি চটে যায় । গাড়ি পিছিয়ে নেওয়ার জায়গা নেই । গানম্যানের নির্দেশমতো ড্রাইভার গাড়ির হেডলাইট বাইসনের চোখ তাক করে জ্বালিয়ে রাখলেন । মুখ থেকে নানান শব্দ করে গানম্যান তাড়া দিলেন, দু-একবার হ্যাট হ্যাটও বললেন (যেন পোষা বাইসন), রাস্তা থেকে একটা পাথর তুলে ছুঁড়েও মারলেন । কিন্তু বাইসন নট নড়নচড়ন । ওদিকে আমার তো ঘাম হবার উপক্রম । গাড়িকে গুঁতিয়ে যদি নদীর খাদে ফেলে দ্যায় । বাইসনটা একটু এগোল । আমি তো একেবারে গেছি । গানম্যানও দেখছি উত্তেজিত । এরকমভাবে প্রায় দশ মিনিট কাটার পর গাড়িতে বাচ্চা আছে দেখেই বোধহয় বাইসনটা পাশের ঝোপে ঢুকে গেল । আর ড্রাইভার হুশ করে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল ।

হোটেলে ফিরে ধড়ে প্রাণ এল । আজকে রাতটা ভালোয় ভালোয়া কাটলে বাঁচি । বাইসন রাস্তা আটকাতে পায়ে কটা মশা কামড়েছে । এখন ম্যালেরিয়া বা হিল ডায়রিয়া না হলেই বাঁচি । আর জীবনে জঙ্গলে আসব না । পদে পদে লাইফরিস্ক । বিশু বললেও আসব না ।

অনিন্দিতা সান্যাল

নিবারণ মাঝি

অনিন্দিতা সান্যাল


সবাই মিলে নৌকোয়ে উঠেছি। হোটেলের নিজস্ব নৌকো। দামোদরের বুকে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আবার ফিরে আসব। আমরা ছয়জন। না সাতজন। যিনি নৌকো চালাচ্ছেন, তিনিই আসল। ছিপছিপে,কালো, বেঁটে মতন। উস্কখুস্ক চুল। চোখদুটো বেশ সুন্দর। সুন্দর কথা বলেন,আস্তে ধীরে। নৌকার বাকি সবাই ছবি তুলছে। গান চলছে 'পানি পানি রে '। জলো হওয়া, কড়া ঠান্ডা। জলর্মী কথাটা কি সুন্দর দেখতে দেখতে মনে হল। মাঝির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। কি নাম? বললেন নিবারণ। বললাম কি করেন বললো এখন তো এইখানে নৌকা চালাই। আসলে আমি পেশায় জেলে। বললাম মাছ ধরতে গিয়ে তো অনেক নদী দেখছেন। হাসলেন। বললেন সুন্দরবনে অনেকদিন ছিলেন,তারপর গুজরাটে গেছেন মাছ ধরতে। বললাম গুজরাটিরা তো ধোকলা,থেপলা এইসব খায়,ওখানে মাছ ধরেছেন। হেসে বললেন হ্যাঁ। জানতে চাইলাম সব ছেড়ে এইখানে কি করে। আঙুল দিয়ে দেখালেন ওই পাড়ে আমার বাড়ি। বললাম কাছেই তো।বললো হ্যাঁ। নিজের থেকেই বললেন,জানেন এই নদীর দুই পাড় খুব উর্বর। তেমনি জলের মাছ। বললাম সব থেকে ভালো কি হয়। বললো ধান। জানতে চাইলাম বাড়িতে কে কে আছে। চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন দুই ছেলে, বড়টা উড়িষ্যা গেছে,রাজমিস্ত্রির কাজ করে আর ছোটটা মামারবাড়ি থাকে। বললাম গিন্নী?বললেন পাঁচ বছর হলো মারা গেছেন। ব্লাড ক্যান্সার হয়েছিল। নিজেই বললেন,জানেন দিদি আমার নিজের ৩টে নৌকা ছিল, ধানি জমি ছিল। সব বেঁচে দিয়েছি ওকে বাঁচাতে। প্রতি মাসে রক্ত লাগতো। শেষে আর পারিনি। মরে গেল,ক্যান্সার কি আমাদের সারানোর অসুখ। মনে মনে ভাবলাম ক্যান্সার নামের যমদূতকে চিনি, যমকেও ছাড়ে না। বললাম আর বিয়ে করেননি। বললো দুর সৎমা কি আর আমার ছেলেদের ভালবাসবে। ঠিক কথা। রূপকথা,লোককথা,পারিবারিক গল্প সব জায়গায় শুনেছি সৎমা নামেই সৎ,কাজে না। বললাম এখানে যা পান চলে যায়। বললো হ্যাঁ,অল্প চাষবাস করি আর রিসর্টের নৌকো চালাই। ওরা ৬০০০টাকা মাইনে দেয় আর দুবেলা খেতে দেয়। বললাম কলকাতা গেছেন। বললো হ্যাঁ,একবার গেছি দুই তিনদিনের জন্য। বললাম ভালো লাগেনি। বললো হ্যাঁ.....যেমন আপনাদের এখানে ঘুরতে এসে দুই একদিন ভালো লাগে, ঠিক তেমন।

আদিত্য চৌধূরী

ফ্রিজড সরস্বতী

আদিত্য চৌধূরী


সরস্বতীর গোড়ায় 'সর' ইদানিং খড়িমাটির ওপর আস্তরণ, নাকি স্রেফ কেরদানি? বিদ্যার দেবী কবেই তো হয়েছেন হরমোনের ভ্যালেন্টাইন, আর সিলেবাস, সে তো গুগল মিটের সাইরেন। এই নিয়ে প্যানপ্যানানি হয়েছে সহস্রবার, এসি ঘরের সেমিনারে কিউরেটেড দীর্ঘশ্বাস; 'বাঙালির পতন’ - এই ট্রপ তো এখন চিবানো ছিবড়ে, হাজার বার বলা বাসি কাসুন্দি। আসলে বাঙালির অবক্ষয় এখন সস্তায় বিকোচ্ছে, বাসন্তী শাড়ির ভাঁজে আর বিরিয়ানির প্যাকেটে।

কিন্তু তাই বলে কি প্রেম করাটা অপরাধ? ঠা ঠা দুপুরে একটা ছেলে কড়া ইস্তিরি করা পাঞ্জাবি চড়িয়ে, ঘাম আর ডিওডোরেন্টের ককটেল বানিয়ে গ্যাদগ্যাদে প্রেমিক সেজে প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করবে না? আরে এ তো তার গণতান্ত্রিক অধিকার রে বাবা! ওদিকে প্রথমবার শাড়ি সামলাতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হওয়া মেয়েটার ওই যে আধঘণ্টার লেট- সেটাও তো একটা বিবর্তনবাদ।

এমন তো নয় যে সরস্বতী দেবী হাতে একটা ডিজিটাল বেত নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে টহল দিচ্ছেন আর বলছেন- 'খবরদার! ওদিকে তাকাবি না, আগে জয়েন্টটা ক্র্যাক কর, তার পর ওসব লারেল্লাপা করিস,' কিম্বা বলছেন, 'এইযে গদগদ যুগল, আগে মন্ত্রটা ঠিকমত উচ্চারণ করতে শেখ, পরে প্রেমের ইশতেহার দিবি।' 

আদতে এই যে নীতিবাগীশদের 'গেল গেল' রব, এটাও তো এক ধরণের শুচিবায়ুগ্রস্ত আঁতলামি। বিদ্যা আর বুদ্ধি যেখানে বাড়ন্ত, সেখানে অন্তত হরমোনটুকু তো সচল থাক!

সরস্বতী কি এতোই ঠুনকো যে দু-চারটে বাসন্তী পাঞ্জাবি আর লাল গোলাপের ঘর্ষণে তাঁর কৌমার্য আর গাম্ভীর্য ধুলোয় মিশবে? দেবী কি মাস্টারি করতে এসেছেন, নাকি আশীর্বাদ দিতে? আসলে আমরা যারা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে 'বাঙালির কালচার' নিয়ে হাহুতাশ করি, তারা ভুলে যাই যে, শুল্ক পাণ্ডিত্যের চেয়ে রক্তমাংসের এই হরমোন-ঘটিত যাপন অনেক বেশি অর্গানিক। তত্ত্বকথার বাইরে ওই যে দু-দণ্ড চর্মচক্ষুর লেনদেন, ওতে যদি খাদ না থাকে- তবে সেই ইশারা আর প্রেম, দুটোই বেশ উপাদেয়।

আসলে জ্ঞানের দেবী জানেন, থিওরেমের চেয়ে ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা অনেক বেশি ইনফরমেটিভ। জ্যান্ত মানুষগুলো অন্তত একে অপরের হাতটা তো ধরুক। এতে মহাভারত অন্তত অশুদ্ধ হবে না, বড়জোর একটা নতুন প্যারাগ্রাফ যোগ হবে।

আসলে আমাদের এই 'বাঙালি' জাতিটার চিরকালই একটা অদ্ভুত বাতিক আছে- আমরা পিউরিটান হতে গিয়ে বড্ড বেশি ক্যাবলিয়ে ফেলি। একদিকে আমরা চাইছি সরস্বতী পুজোর মণ্ডপে ঋকবেদের বিশুদ্ধতা বজায় থাকুক, আর অন্যদিকে পাড়ার মণ্ডপে 'বক্সে' বাজছে এমন সব গান যার সঙ্গে বিদ্যার দেবীর কোনো সম্পর্কই গোলার্ধবাচক ভাবে নেই। 

অনেক ডিগনিফায়েড লোকে বলেন, "আগেকার সেই পুজো আর নেই।" এই যে একটা ক্লিশে দীর্ঘশ্বাস, এটা আসলে বার্ধক্যের প্রথম লক্ষণ। আগেকার দিনে কী হতো? কুল বর্জন করে পরীক্ষার ভয়কে জিইয়ে রাখা, আর সকালে কাঁচা হলুদ মেখে স্নান করে কাঁপতে কাঁপতে অঞ্জলি দেওয়া। ওটা কি ভক্তি ছিল, নাকি নেহাতই একটা সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশনিং? দেবীকে ঘুষ দেওয়া হতো-'মা, আমায় পাস করিয়ে দাও, আমি তোমাকে কুলের নৈবেদ্য দেব'। দেবতারাও বোধহয় তখন বেশ সস্তায় বিক্রি হতেন। 

এখন সেই ভয়টা উবে গেছে। এখনও ঠাকুরের পায়ের তলায় বই রেখে আসার ডিসিপ্লিনটা আছে ঠিকই, কিন্তু মনের মধ্যে সেই অবাস্তব নিশ্চিন্তি নেই, কারণ ছাত্রটি জানে তার রেজাল্ট ঠিক করবে গুগল, চ্যাট জিপিটি আর প্রাইভেট টিউটারের নোটস, সর্বোপরি কিছু সাজেশনস। মা সরস্বতী এখানে কেবল একজন সাইলেন্ট অবজার্ভার। আর এই যে পরিবর্তন, একেই যদি কেউ 'অবক্ষয়' বলেন, তবে তিনি বিবর্তনবাদের ক্লাসে নির্ঘাত ঘুমিয়েছিলেন।

এই যে বৈপরীত্য, এটাই তো আম মানুষ ভাত-নংকার মত গিলছে, নস্টালজিয়ার ন্যাপথলিন বর্তমানের প্লাস্টিকে ভরে আবেগ-কে খাজনা দিয়ে চলেছে।

অন্ধবিশ্বাসের অ্যানাটমি ও আধুনিক খিচুড়ি বাঙালির মজ্জায় মজ্জায় কিছু অদ্ভুত সংস্কার।

পরশুরাম (রাজশেখর বসু) তার বিভিন্ন হাস্যরসাত্মক গল্পগ্রন্থে (যেমন- 'গড্ডালিকা', 'কজ্জলী' ) হিন্দু সমাজের আচার-আচরণের হাস্যকর দিকগুলো নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে পুজোর মণ্ডপে  'নাক উঁচু' পণ্ডিতরা শাস্ত্রীয় তক্কো করে পরিবেশটা তেতো করে তোলেন। তার কাছে বাগদেবীর আরাধনা ছিল আসলে বাঙালির 'পাণ্ডিত্যের অহংকার' প্রদর্শনের একটা স্টেজ। সেখানে পুজোর মণ্ডপে পাণ্ডিত্যের চেয়ে ভোজের গুরুত্ব যে বেশি সেই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি মূর্তিপূজার চেয়ে মানুষের ভেতরের 'মূর্খতা'কে বেশি বিঁধেছেন।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কলমে উঠে এসেছে সরস্বতী পুজোর দিন বাঙালির হিপোক্রেসি। তাঁর 'লোটাকম্বল' বা অন্যান্য রম্যরচনায় দেখা যায়, যে বাড়িতে ছেলেমেয়েরা সারা বছর কুলাঙ্গার, সেই বাড়ির মা-বাবা পুজোর দিন দেবীর পায়ে বই ঠেকিয়ে এক অলৌকিক আশার চারা রোপণ করেন। তিনি পুজোর ভোগ আর খিচুড়ির 'উদরসর্বস্ব' কালচার নিয়ে প্রচুর হাসাহাসি করেছেন।

সরস্বতী পুজো মানেই ছিল সারা বছর বই না ছোঁয়া ফাঁকিবাজ ছাত্রদের 'ঘুষ' দেওয়ার দিন। মোদ্দা ভাষায়, আমরা দেবীকে ভক্তি করি না, স্রেফ 'ব্রাইব' করি। এক অঞ্জলি বেলপাতা দিয়ে তার থেকে ফার্স্ট ডিভিশন আদায় করতে চাই। দেবীও বোধহয় ভাবেন, এত অল্প পুঁজিতে এত বড় লটারি!  মোটমাট এই যে, দেবী হলেন পৃথিবীর একমাত্র মহিলা যিনি বিনা বেতনে বাঙালির কয়েক লক্ষ ফাঁকিবাজ ছেলে মেয়ের 'প্রাইভেট টিউটর' হিসেবে কাজ করেন।

‌ বাঁইবাঁই হুজুগ তুলে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্যে পোস্টালু, কমেন্টুয়া কিছু মারকাটারি, ঝলসানো ছবি, লেখা, মিম বা ভিডিও, ব্লগ নিয়ে হইহই করা, এই পুজোর অন্যতম একটি মনপসন্দ নিয়ম। এই নিয়ে টিপ্পনী না কাটলে আবার মনটা নিভে আসে। কেনো হে? যেকোনো নবজাত শিল্পপ্রচেষ্টার (ট্রেন্ডের) প্রতিমূখে দাঁড়িয়ে, "আহ, ছি! ছি! কোথায় সত্যজিৎ রায়, আর কোথায় সস্তা সায়" না বললে কি পোস্তের বড়া হজম হয়না? না তা নয়, কিন্তু তাই বলে অ্যালাব্যালা যা খুশি লিখবে, বলবে, আর সেটাকে শ্যাম্পু ট্যাম্পু মেরে উৎসাহের বত্রিশ পাটি বার করতে হবে? এও সইত্য কথা! অ্যাদ্দিন তো শুধু রিড মোর এ ক্লিক করেছি আর ফ্ল্যাশব্যাকে গেছি। হু হা ছাড়া কোনো মাপকাঠিতেই বিচার করা হয়নি, কোনো সাইকায়াট্রিস্ট তো বলেননি কিভাবে, কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে ঘচাং করে অস্পৃশ্যতাকে বাতিল করতে হবে। তবে এই যে স্টিলের বাসন ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার মত এই পোস্টগুলো বারবার বেরিয়ে আসে, সবটাই কি শুধুমাত্র শ্লেষ, রক্ষনশীল, শুচিবায়গ্রস্থ?

তল্লাই করে কোনো নকশাল, আমিষ, নোংরামির নিন্দে, শিল্প - সংস্কৃতির ফর্মুলা ইত্যাদি কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবেনা এমন তো নয়! 

এইযে হলুদ রঙের একটা সর্বগ্রাসী আধিপত্য, এটা অদ্ভুত একধরনের ইউনিফর্মিটি। একটা ছেলে, যে কিনা ব্ল্যাক মেটাল ছাড়া কিছু শোনে না, বা ওয়ান ডিরেকশন ছাড়া কিছু শোনে না, সেও বিয়াল্লিশ এর ঝুলঝুল, আলখাল্লা একটা পীতবর্ণের পাঞ্জাবী পড়ে এমন ভাবে হাবলা মুখে এসে প্রতিমার সামনে দাঁড়াচ্ছে, যেনো তার চেয়ে 'ওবিডিয়েন্ট বয়' এ তল্লাটে আর একটা নেই। এটা কে আমরা কি বলবো?

ভক্তি? রিচুয়াল? নাকি বাঙালির সোশ্যাল পারফরমেন্স? নাকি কোনো টিভি সিরিয়ালের রিপিট টেলিকাস্ট? 

এবার সরস্বতী তো বিদ্যারও দেবী, শিল্পকলারও দেবী আবার সঙ্গীতেরও দেবী, সেইক্ষেত্রে কেউ যদি ইংরিজি গান উদযাপন করে বা কোনো বিদেশি শিল্পের সাধনা করে, তাতে আপত্তি কোথায়? ইংরিজি বা বিদেশি শিল্প - সংস্কৃতির সাথে সরস্বতীর বিবাদ আছে নাকি? আরে বাবা সে তো শিল্পচর্চায় করছে। 

আসলে আপত্তিটা সেখানে নয়। আপত্তিটা হলো বাঙালি হয়ে শুধুমাত্র ঝটাক করে চোস্ত ইংরিজি বলাকেই গুরুত্ব দেওয়া, সেটাকেই সম্মান করা এবং সর্বোপরি উচ্চআসনে বসানো, তর্ক কিম্বা যেকোনো গুরুত্বপুর্ণ আলোচনায় যত পারা যায় বাংলা ভাষার পেটখারাপ করিয়ে ইংরিজি ইনো গুলে খাওয়া এবং লোককে খাওয়ানো,  নুন চাইলে সল্ট দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। 

সংরক্ষণহীন হাজমোলা খেয়ে বাঙালি জাতি যেভাবে নিজেদের ঐতিহ্য, বৈচিত্র্য, মূল্যবোধ, নীতি, নিজস্ব স্বভাব, দৃষ্টিভঙ্গি, উত্তমকুমার, নেতাজি, বিভূতিভূষণ, সলিল চৌধুরী গপগপিয়ে হজম করে ফেলছে, সেটা যে শুধু আপত্তিযোগ্য তা নয়, বরং বলা যেতে পারে এক ধরণের নিখুঁত কালচারাল ক্যানিবালিজম। নিজের পা চিবিয়ে বা স্যুপ বানিয়ে খাওয়ার পর বাঙালি এখন সগর্বে ঢেঁকুর তুলছে।

এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞানের ছাত্রটি যখন ল্যাবে বসে গড পার্টিকেল নিয়ে থিসিস লেখে, সেই হাত দিয়েই পরদিন সে দেবীর পায়ে কলম ঠেকিয়ে আসে। যুক্তিবাদের এই যে করুণ আত্মসমর্পণ, এ কি স্রেফ সংস্কার? নাকি দেবীর সাথে এক ধরণের ব্যাকআপ ডিল? যদি থিওরি অফ রিলেটিভিটি ফেল করে, তবে অন্তত মা সরস্বতীর কৃপা যেন ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করে। বাঙালির আইকিউ (IQ) আর ইমোশনাল কোশেন্ট-এর (EQ) এই যে বিচিত্র সহাবস্থান, তা নিয়ে কোনো ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করা সম্ভব হবে বলে মনে হয়না।

আদতে সরস্বতী পুজোটা হলো বাঙালির সেই বাৎসরিক মিউজিয়াম, যেখানে আমাদের প্রাগৈতিহাসিক সংস্কার আর উত্তর-আধুনিক কেলানি-দুটোই বেশ পিঠোপিঠি সাজানো থাকে। আমরা একদিকে চ্যাট জিপিটি-কে দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট লিখিয়ে নেওয়ার পর সেই ডিজিটাল চৌর্যবৃত্তির ওপর 'গোটাসিদ্ধ' আর কাঁচা হলুদের প্রলেপ লাগাই, যাতে পাপের গ্রাফটা একটু নিচের দিকে থাকে। বিদ্যা যদি সত্যি আলোর পথ দেখায়, তবে সেই আলোয় বাঙালি আসলে কেবল নিজের পাঞ্জাবির ভাঁজটা চেক করে নেয়; মগজের ভাঁজ খোলার দায় অন্তত তার নেই।

বিদ্যার দেবী কি এসব দেখে হাসেন? সম্ভবত না। তিনি হয়তো হাতে বীণা ধরা অবস্থাতেই দীর্ঘস্থায়ী এক হাই তোলেন আর ভাবেন, এই জাতিটার সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট তো মারাত্মক! যাদের আইকিউ-র চেয়ে হরমোনের আস্ফালন বেশি, যারা মন্ত্রের ভুল উচ্চারণের ফাঁক দিয়ে স্রেফ লাল গোলাপের ইশারা চালাতে সিদ্ধহস্ত, তাদের জন্য শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্য অপচয় করার মানে হয় না। দেবী এখন মণ্ডপে নিরাপদ, কারণ তিনি জানেন, বাঙালি তাঁকে পুজো করছে না, বরং এক বছরের জন্য ইম্যুনিটি কিনছে।

আসলে বাঙালির এই অবক্ষয় এখন আর ট্র্যাজেডি নয়, এটা একটা সাকসেসফুল বিজনেস মডেল। জ্ঞান বা বুদ্ধি-এসব তো এখন আউটডেটেড সফটওয়্যার; আমাদের এখন কেবল দরকার এই ভড়ং করার অক্ষুণ্ণ ক্ষমতা। এই যে নস্টালজিয়ার ন্যাপথলিন শুঁকে আমরা ভাবি বিবর্তিত হচ্ছি, আসলে আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়েই ঘামছি। কিন্তু তাতে ক্ষতি নেই। কারণ, যেদিন এই জাতিটা সত্যি সত্যি সিরিয়াস হয়ে যাবে, যেদিন আমরা ভড়ং ছেড়ে সত্যি সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াবো-সেদিন এই বাঙালির এগজিসটেনশিয়াল ক্রাইসিস এতটাই প্রকট হবে যে আমাদের যৌথ বিসর্জন ছাড়া আর কোনো গতি থাকবে না।

তার চেয়ে বরং সরস্বতীকে সাইলেন্ট মোডে রেখে খিচুড়ির পাতে আর একটা বেগুনভাজা পড়ুক। বিদ্যা না বাড়লেও অন্তত কোলেস্টেরল বাড়ুক। 

মা সরস্বতীও বুঝে গেছেন, এই যুগে তিনি ঈশ্বরী নন, বড়জোর এক বাৎসরিক পিক্টোরিয়াল ব্যাকড্রপ। আর তাতেই বাঙালির মোক্ষলাভ।

পড়তে থাকুন

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী
কবিতার পাতা - ১কবিতার পাতা - ২গল্পধারাবাহিক উপন্যাসপ্রবন্ধবিবিধ
  • প্রথম পাতা
  • Privacy Policy
  • Terms and Conditions

আক্ষরিক

82748 38787

Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.

Powered by GoDaddy

This website uses cookies.

We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.

Accept