
ঔরস
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
(৮)
অনেকটা উল্লাস এসে মানুষকে স্থবির করে দেয়। সে রসের গামলায় পড়ে যাওয়া মাছির মত হাঁকপাঁক করতে থাকে। আমারও প্রাথমিকভাবে সেই অভিজ্ঞতাই হল। আমি তো জন্মের ভিতর দিয়ে যাইনি জীবনে। বোনের জন্ম আমার মনে পড়ে না। কিন্তু বোনের মৃত্যু, জেঠুর মৃত্যু, ইত্যাদি অনেক মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে আবারও সূর্য উঠবে এই বোধটা আমার গুলিয়ে গিয়েছিল। আমি প্রত্যেকদিন কান পাততাম ঝুমার পেটে। বুঝতে চেষ্টা করতাম যে নতুন কেউ আসছে, আমাদের মধ্যে আসছে। আমারই ঔরসজাত কেউ। সে একটা ধারা। সে প্রথম কবে এসেছিল, জানি না । এই দেশেরই কি ছিলাম আমি নাকি হিন্দুকুশ পর্বত পেরিয়ে আমার পূর্বপুরুষ কোথাও থেকে এসেছিল? এখানে এসে নতুন একটা সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। তার ভেতরে কত কত জটিলতা, কতরকম বৈপরীত্য , তবু সব মিলিয়ে টলমল করতে করতে দেশটা চলছে। ঠিক যেমন পেটের মধ্যে ওই বাচ্চাটা। মা যা খাচ্ছে তার থেকেই খাচ্ছে; নিজের গতিপথ জানে না, ভবিষ্যৎ জানে না তবু এক বিপুল ভরসায় ক্রমাগত বড় হয়ে উঠছে , মায়ের গর্ভে।
ঝুমা খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে অবহেলা করত, এটা ছিল ওর একটা বড় দোষ। মা এই নিয়ে ওকে খুব বকাঝকা করত।শুধু বকাঝকা করেই শান্ত হত না, ঝুমাকে সকাল-বিকেল যখনই পারত কখনও দুধ, কখনও ফল খাওয়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠত।
ঝুমা মাঝেমাঝে বিরক্ত হয়ে উঠত , উফ খাইয়ে মেরে ফেলবে আমাকে, এই রাক্ষসটার জন্য।
আমি শুনলে পরে বলতাম, না খেলে পরে রাক্ষস দেবতা হবে কী করে?
ঝুমার মাসতুতো দিদি সুধা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন এই সময়টা। ভদ্রমহিলা প্রায় দিন পনেরো থেকে গেলেন। পরে আবার পনেরো দিন থাকবেন বলে গেলেন। অসম্ভব কষ্টের জীবন এই সুধাদির। ঝুমার মেসোমশাইয়ের ক্যানসার হয়েছিল অল্প বয়সে। মাসি একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষিকার কাজ নিয়ে, মেয়েকে মানুষ করে তুলেছিলেন। সুধাদির বিয়ে হয় জামশেদপুরে। একটি মেয়েও হয় কিন্তু সেই মেয়েটা সাতদিনের জ্বরে মারা যায়। তারপর একটা ছেলে হয় সুধাদির।কিন্তু সেই ছেলেটাকে ভ্যাক্সিনেশনের সময় হাসপাতালের কোন অপদার্থ কম্পাউন্ডার একটা ডেট পেরিয়ে যাওয়া ভ্যাকসিন ইনজেকশন পুশ করে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায় ছেলেটা।
-মামলা করোনি? খুনের মামলা? ওর তো ফাঁসিতে ঝোলা উচিত। ঝুমা উত্তেজিত হয়ে উঠত ।
আমি বুঝতে পারতাম ঝুমার পক্ষে উত্তেজনাটা এই সময়ে খারাপ। কিন্তু আমি নিজেই তো উত্তেজিত হয়ে যেতাম সুধাদির কথার সামনে। কেঁপে কেঁপে উঠতাম। একটা ছোট বাচ্চা তাকে ইনজেকশন দেওয়ার আগে ডেটটা পরীক্ষা করবে না? এই আমার দেশ?
সুধাদি খুব শান্তভাবে বলেছিল, ওই লোকটা ওখানে কাজ পেয়েছিল পয়সা দিয়ে, ইংরেজি অক্ষর বা সংখ্যার সঙ্গে কোনও পরিচয় ছিল না তার। ভ্যাকসিনের গায়ে কবেকার তারিখ, সে দেখেওনি, দেবার আগে দেখতে যে হয় তাই জানত না।
আমি চুপ করে ভাবতাম, এরকম ইতর, অশিক্ষিত বসে আছে ভারতবর্ষের জায়গায় জায়গায়। ডেট পেরিয়ে যাওয়া ভ্যাকসিন যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিনছে, যে ওই লোকটাকে অ্যাপয়েন্ট করছে ঘুষ খেয়ে, প্রত্যেকে দায়ী সুধাদির ছেলের খুনের জন্য। কিন্তু শাস্তি পাবে কে?
কেউ না। হাসি-মজায় যাদের জীবন চলছে, তারা পাত্তাও দেবে না ঘটনাটাকে। কিন্তু সুধাদির জীবনটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে আর সেই ধ্বংসস্তূপই থাকবে। পরপর দুটো বাচ্চার মৃত্যুর পর ,সুধাদির বর, সুধাদিকে ছেড়ে আবার একটা বিয়ে করেছে । তার একটা ছেলেও হয়েছে এই নতুন বিয়ে থেকে।
-পুরুষের ভালবাসা অনেক আলগা তো। বেদনাটা নিতে পারে না। সুধাদি বলত।
আমি ভাবতাম, কেবলমাত্র নারীই তার গর্ভস্থ ভ্রূণের যন্ত্রণা বা সুখের সঙ্গে আজীবন সংশ্লিষ্ট হয়ে যায় ? এ যেন এক দুর্ভেদ্য নিয়ম। কিন্তু আমাকে অন্যরকম হতেই হবে। এমন একজন বাবা হতে হবে যার সঙ্গে সন্তানের নিবিড়তম যোগাযোগ গড়ে উঠবে , যে একইসঙ্গে বাবা এবং মা দুটোই হতে পারবে। পৃথিবীতে পুরুষের বিরুদ্ধে ওঠা যত অভিযোগ , অবহেলার- স্বার্থপরতার-নিষ্ঠুরতার , সবকিছুকে কোথাও একটা মিথ্যে প্রমাণ করতে হবে।
-সবটা পারবে না, এত এত কাণ্ড করে রেখেছে পুরুষজাতি। তুমি একা যতই ভাল হও, সবটা খারাপ মোছার সাধ্য তোমার নেই। ঝুমা হেসে উঠত।
সেই হাসির ভিতর থেকে সত্যিটা এসে পিন ফোটাত আমার সর্বাঙ্গে। মেয়েদের মধ্যে কুটিলতা, জটিলতা, হিংসে, পরস্পরকে সহ্য করতে না পারা ,এমন কত দোষের কথা বলে থাকে লোকে। কিন্তু কখনও তো পৃথিবীর ইতিহাসে এমন হয়নি যে একসঙ্গে এক হাজার মেয়ে বেরিয়েছে অন্য মেয়েদের বাড়িতে আগুন দেবে বলে। লাখ লাখ মানুষকে খুন করার কৃতিত্ব সবসময়ই পুরুষের, শহরের পর শহর, হাতি-ঘোড়ার পা কিংবা ট্যাঙ্কের চাকার নিচে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব পুরুষেরই; লাইব্রেরি পোড়ানো , তলোয়ারের কোপে মানুষের মাথা নামিয়ে দেওয়ার গৌরব, পুরুষ ভিন্ন আর কেউ নিতেই পারবে না। আচ্ছা, কী করে এই নৃশংসতার উত্তরাধিকার পুরুষ একাই পেল? একই ঔরস থেকে তো জন্ম পুরুষ এবং নারীর। মায়ের পেটেও দেওয়াল তোলা থাকে না কোথাও। এক্স+এক্স কিংবা এক্স+ওয়াই কম্বিনেশন যাই হোক, ‘এক্স’ তো থাকছে দু’জনের মধ্যেই। গায়েগতরে খুনে তাহলে পুরুষ একাই হয়ে উঠল কেন?
-গৌতম বুদ্ধ কী পুরুষ নন ? রামকৃষ্ণ পরমহংস পুরুষ নন? চৈতন্যদেব পুরুষ ছিলেন না? ঝুমা আমার ভাবনার কথা শুনতে শুনতে বলত।
-নিশ্চয়ই পুরুষ। কিন্তু এই লক্ষ বছরের ব্যপ্ত হিংসার যে ইতিহাস সেখানে তাঁদের রিচ কতটুকু, কতজন শুনেছে তাঁদের কথা? বিদ্বেষবিষ নাশ করতে কতজন এগিয়ে এসেছে? ভালবেসেছে কতজন? হিংসাই তো চালিকাশক্তি, প্রায় প্রত্যেকের।
বলতে বলতে থেমে গেলাম আমি। ‘প্রায় প্রত্যেকের’ মধ্যে আমিও তো আছি। নিজের বাবার প্রতি বিদ্বেষ আমাকেও দিনের পর দিন দৌড় করিয়ে বেরিয়েছে। আজ আমি খুব গদগদ প্রেমিক হয়ে উঠলেই আমার সেই আগের ইতিহাস চাপা তো পড়ে না। জেগেই থাকে।
জেগে থাকে বলেই বোধহয় হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে, মা যখন ওই লোকটা বেঁচে আছে না মরে গেছে জানতে চাইল, আমি কেঁপে গেলাম পুরো। সেই তুমুল বৃষ্টির রাতটা আমার ভিতরে কোত্থেকে যেন জাগ্রত হল আবার। আমি তাড়াতাড়ি তাকে মাথা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় মাকে অন্য কথা বলতে শুরু করলাম। মায়ের বিড়বিড়ানির মধ্যে তবু দু’তিনবার ফিরে এল সেই লোকটা, যাকে ক্লিনিক্যালি বাবা বলতে আমি বাধ্য।
(ক্রমশ...)
Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.
Powered by GoDaddy
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.