আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
রম্য রচনা
ধারাবাহিক উপন্যাস
প্রবন্ধ
Privacy Policy
আক্ষরিক
প্রথম পাতা
কবিতা - ১
কবিতা - ২
গল্প
বড় গল্প
রম্য রচনা
ধারাবাহিক উপন্যাস
প্রবন্ধ
Privacy Policy
More
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • রম্য রচনা
  • ধারাবাহিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • Privacy Policy
  • প্রথম পাতা
  • কবিতা - ১
  • কবিতা - ২
  • গল্প
  • বড় গল্প
  • রম্য রচনা
  • ধারাবাহিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • Privacy Policy

ধারাবাহিক উপন্যাস

ঔরস

ঔরস

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় 


(১১)

 

মা জবুথবু হয়ে পড়েছিল কিন্তু কুটুস আসার পরে যেন নতুন একটা শক্তি কোত্থেকে এসে ভর করল মায়ের মধ্যে। ছেলেটা কখন খাবে, কখন স্নান করবে, কাশি হলে কী ওষুধ, পেটের ব্যথায় কোনটা, মা একেবারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। উলটোদিকে ঝুমা, কুটুসের প্রতিদিনকার খাবারে কতটা ভিটামিন, কতখানি মিনারেল তার চুলচেরা হিসেবে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দু’দিক থেকে দু’জন আমার মাথা চিবিয়ে খেতে শুরু করল এমনভাবে যে মাঝেমাঝে মনে হত, উফ কী কুক্ষণে বাবা হতে গেলাম! 

ঝুমার আর আমার সেক্স-লাইফ বলে বিশেষ কিছু অবশিষ্ট ছিল না, কখনও দু-চারটে চুমুর পর আর একটু ঘনিষ্ঠতার দিকে এগোতে যেতাম না তা নয় কিন্তু মাঝপথেই কুটুস কেঁদে উঠত কিংবা বমি করত অথবা একটা সাইক্লোন-ফাইক্লোন আসত পৃথিবীতে, আমি আর ঝুমা পরস্পরের থেকে অনেকটা দূরত্বে ছিটকে যেতাম; আবারও। 

-আমাদের জীবন এখন আর আমরা চালাই না। আমাদের বাচ্চাটা চালায়।জানি না কতদিন এভাবে চলবে। আমি সন্দীপদাকে বলেছিলাম। 

-এটা এখন থেকে চলতেই থাকবে। সময়টা আর আমরা যেরকম দেখেছিলাম, সেরকম নেই, বদলে গেছে পুরোপুরি। এখন বাচ্চারা চালায় পরিবারকে। কী রঙের ফ্রিজ কেনা হবে থেকে শুরু করে, কোন মডেলের গাড়ি, সব বাচ্চারাই ঠিক করে, বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারে। সেই কারণে দেখবে এখন সব ভোগ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনে, বাচ্চাদের কত বেশি বেশি করে দেখা যায়। 

-কিন্তু তার ফল কি খুব একটা ভাল হয়? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম সন্দীপদাকে।

-ফল নিয়ে কে ভাবছে ভায়া! ফুল তুলতে তুলতেই সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাচ্ছে। সন্দীপদা জোরে হেসে উঠেছিলেন।  

আমাদেরই অফিসের একটা পিকনিকে সন্দীপদার সঙ্গে আলাপ, যদিও সন্দীপদা চাকরি করতেন অন্য একটা সংস্থায়। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যাদের, সংস্থা, পদমর্যাদা কিংবা প্রোটোকল দিয়ে বাঁধা যায় না, সন্দীপদা তাদেরই দলে। আলাপ হওয়ার মাসখানেক পরে আমায় একদিন রাস্তা থেকে ডেকে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়েছিলেন সন্দীপদা। বাড়ির কাছাকাছি নামিয়ে দিয়েছিলেন। 

-আপনি বাড়ি না ফিরে কোথায় চললেন এখন? আমি গাড়ি থেকে নেমে জিজ্ঞেস করেছিলাম। 

-আমার কি আর বাড়ি ফেরার উপায় আছে ভাই? কল্লোলের বউ কুহু গায়ে কেরোসিন ঢেলে বসে আছে, কল্লোলের উপর রাগ করে। এখন আমাকে মহারানির মেজাজ ঠান্ডা করতে হবে বুঝিয়ে-বাঝিয়ে। নইলে কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে যায়?

-এরকম একটা কাণ্ড করেছেন সেই ভদ্রমহিলা আপনি জানলেন কী করে? 

-আমাকে ফোন করে জানাল তো। এখন এই নতুন যন্ত্রটি এসেছে না। যখন যাকে চাই, হাতের নাগালে। সন্দীপদা বুকপকেট থেকে বের করে নিজের মোবাইল ফোনটা দেখালেন। 

ক’দিন আগে আমিও একটা ফোন কিনেছি, ঝুমার তাড়নায়। ঝুমা নিজে একটা ফোন কেনার পাশাপাশি আমাকে দিয়েও কিনিয়েছে যাতে দিনে বারোবার আমাকে ফোন করে জানাতে পারে, কুটুস গোলাপি পায়খানা করেছে নাকি সবুজ। 

-আপনার কপাল সত্যিই চৌখস সন্দীপদা। বন্ধুর বউ ভেজা গায়ে, সিক্ত বসনে আপনাকে কল করছে। উফ ভাবলেই রোমাঞ্চ হচ্ছে। বাই দ্য ওয়ে, এই ভদ্রমহিলা আপনার প্রেমিকা নাকি? 

-না রে ভাই। প্রেমিকা হলে কি গায়ে কেরোসিন ঢেলে ডাকে? ময়েশ্চারাইজার মেখে টেখে...

-কেন কেরোসিনের গন্ধই বা খারাপ কী? আপনি গাড়ি ঘুরিয়ে যান তাড়াতাড়ি। বেশি দেরি হলে আবার গায়ে ডিজেল, পেট্রোল না ঢেলে নেয়। 

-সেই ভয়েই তো মহুয়াকে যেতে বললাম কুহুর কাছে। মহুয়া একটু ঠান্ডা করুক কুহুকে। আমি পৌঁছচ্ছি তারপর। 

-মহুয়াটা আবার কে? আপনার জীবনে তো দেখছি নারীর ছড়াছড়ি।

-আরে, মহুয়া তোমার বউদি, আই মিন আমার বউয়ের নাম। ওর সাথে কনসাল্ট না করে পরোপকার করতে যাই না আমি। 

-ধুস! আপনি একদম বোগাস সন্দীপদা। শেষে বউদিকে সঙ্গে নিয়ে অন্য এক অভিমানিনীকে উদ্ধার করতে যাচ্ছেন? কী হবে আপনার দ্বারা?

-যা হয়েছে, তাই এনাফ। এখন ছেলেটা তোমাদের আশীর্বাদে ঠিকঠাক মানুষ হয়ে গেলেই আমরা বুড়ো-বুড়ি ঝাড়া-হাত-পা। তোমার হয়তো মনে হবে যে আমি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছি কেন? ব্যাপারটা কী জানো? প্রত্যেকটা মানুষই অনেক ক্ষোভ, যন্ত্রণা, রাগ বয়ে বেড়াচ্ছে। আর এই সব সে রিলিজ করতে চায়। কিন্তু উলটোদিকের মানুষটাকে সে দেখছে কালা হয়ে ঘুরে বেড়াতে। এমনই বদ্ধ কালা যে কোনও কান্না, কোনও আর্তনাদ শুনতে পায় না। 

-আপনি যে শুনতে পান তাতে কষ্ট বাড়ে না আপনার? 

-হয়তো বাড়ে।কিন্তু সেই বাড়াটা তাৎক্ষণিক। যে মুহূর্তে অন্য কারও একটু কাজে আসি এমন একটা স্বর্গীয় আনন্দ হয় যে বলে বোঝাতে পারব না। আসলে শুধু নিজের জন্য, নিজের ফ্যামিলির জন্য বাঁচা এমন কষ্টকর, গ্লানি ছাড়া আর কিছুই বাড়ে না তাতে। 

মহুয়া বউদি আর ওদের ছেলে বিভাবকে নিয়ে একদিন কুটুসকে দেখতেও এসেছিলেন সন্দীপদা। ঝুমার ‘ছেলে-ছেলে’ মায়ের ‘নাতি-নাতি’ করে আতিশয্য বুঝে নিয়েছিলেন দশ মিনিটের মধ্যে। 

ডিনারের পর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে আমাকে বললেন, বাচ্চার ছোট থেকে বড় হওয়ার সময়টা হাতের তালুতে জলের মতো। কখন যে জলটা গলে পড়ে যাবে আঙুলের ফাঁক দিয়ে, তুমি টেরটিও পাবে না। তাই যতদিন জলটা হাতে লেগে আছে ততদিন এই সামান্য বাড়াবাড়িটুকু এনজয় করো।

বাড়াবাড়ি অবশ্য প্রকৃতির নিয়মেই কমে যায় একদিন। ঝুমার মায়ের ক্যানসার ধরা পড়তে যখন ওঁকে নিয়ে আমি মুম্বাই গেলাম, ঝুমা কলকাতা থেকে মিনিটে মিনিটে ফোন করত। কিন্তু কলকাতায় ফিরে আসার পনেরোদিনের মধ্যে যখন মারা গেলেন আমার শ্বাশুড়ি, ব্যাপারটা এত শান্তভাবে অ্যাকসেপ্ট করল যে অবাক হয়ে গেলাম, আমি নিজে। 

-মানুষ একবার ‘বডি’ হয়ে গেলে আর কিছু করার নেই। যতক্ষণ সে বডি হচ্ছে না, লড়াই ততক্ষণ। ঝুমা গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে বলেছিল আমাকে। ওর দাদা তখন ওদের মায়ের অস্থি ভাসিয়ে দিচ্ছে জলে।  

 সহজভাবে নিতে পারলেই যে একটা মৃত্যুর অভিঘাত কিছু কম হবে তা নয়। বরং বেশিও হতে পারে। ঝুমার সময়ে-সময়ে চুপ করে যাওয়া, ঘুমের ভিতরে কেঁদে ওঠা আমাকে একটা সঙ্কেত দিয়ে যেত। আমি সেই সঙ্কেতটাকে মান্যতা দিয়েই দার্জিলিং গেলাম ঝুমা আর কুটুসকে নিয়ে। বাড়িতে সবসময়ের কাউকে ঝুমা নিজেই রাখেনি, কাজের জন্য। ওর বক্তব্য ছিল, বাড়ি হলে ঠিক আছে কিন্তু একটা ফ্ল্যাটে পরিবারের বাইরের কেউ থাকলে প্রাইভেসি বলে কিছু থাকে না আর। কুটুস আসার পর কাজ অনেক বেড়ে গেলেও ঝুমা নিজের অবস্থান থেকে নড়েনি। 

আমি প্রথম প্রথম খুব তর্ক করতাম ঝুমার সঙ্গে এটা নিয়ে।

ঝুমা হঠাৎ একদিন কেঁদে ফেলল, আমি কি তোমার অফিসে তুমি কী করবে তাই নিয়ে কিছু বলতে যাই? তুমি এই ফ্ল্যাটটুকুর ভিতরে আমার নিয়মই চলতে দাও না! 

লজ্জা পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। রাতে ওর ঘুম ভাঙিয়ে বলেছিলাম, আই অ্যাম সরি। এই ফ্ল্যটের চৌহদ্দির মধ্যে তুমি যে নিয়ম চাইবে সেই নিয়মই চলবে।

সকালে এসে সন্ধ্যে অবধি থাকত যে দু’জন তাদের ভিতরেই একজনকে ঝুমা দায়িত্ব দিয়ে গেল মায়ের দেখভালের। আর দার্জিলিং পৌঁছনো ইস্তক, ফোনে খবর নিত, দিনে তিনবার-চারবার। 

কুয়াশার জন্য কাঞ্চনজঙ্ঘা যে খুব বেশি দেখতে পাচ্ছিলাম, তা নয়। কিন্তু ঝুমার ইচ্ছেমতো ম্যালটাকে পাক দিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হাঁটতাম । খুব হাঁটতে ভালবাসত ঝুমা। ওর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে মনে হত, পৃথিবীর সব অসুখ, সমস্ত কষ্ট মানুষ যেন হেঁটে হেঁটেই পার হয়ে যেতে পারে।

অনেক হাঁটাহাঁটির ভিতরে একদিন বুদ্ধমন্দিরে ধ্যান করতে বসেছিলাম ঘণ্টাখানেক। ধ্যান মানে চোখ বন্ধ করে বসে থাকা। সামনের দিকে তাকানো চোখদুটোকে বন্ধ করে পিছনের পথটা কীভাবে পাড়ি দিয়েছি তার একটা খতিয়ান পাওয়া। কিন্তু অল্প একটু সময়ের জন্য শান্ত হয়ে বসে থাকতে দিল না কুটুস। লাফালাফি আর চিৎকার করে পুরো নরক গুলজার করে তুলল। আশেপাশে বসে যাঁরা ধ্যান করছিলেন, অসুবিধে হচ্ছিল তাঁদের।আমি ওকে নিয়ে বেরিয়ে যাব বলে, হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

-বাচ্চাকে বাচ্চার মতো যা খুশি করতে দাও না। কুটুস কি করছে না করছে, তাই নিয়ে তুমি এত বদারড হচ্ছ কেন? ঝুমা জিজ্ঞেস করল। 

-দ্যাখো ঝুমা, আমাদের বাচ্চার জন্য অন্য দশজনের যদি প্রবলেম হয়, তাহলে তার দায়িত্ব আমাদেরই। এটা মানুষের মেডিটেশন করার জায়গা। এখানে কেউ যদি বাঁদরের মতো নাচে আর শেয়ালের মতো চেঁচায় তাহলে সেটা অন্যায় ।এবার অন্যায়টা আমার ছেলে করলেই তো আর সব দোষ স্খালন হয়ে যায় না। 

-তুমি এত ভদ্রলোক, তোমার ছেলের ভিতরে এমন বাঁদরের স্বভাব, শেয়ালের মর্জি  কোত্থেকে এল, ভগবান জানে। ঝুমা ব্যঙ্গ করল নাকি মন থেকে বলল, বুঝতে পারলাম না। 

ঝুমার সেই কথাটাই যেন শতগুণ জোরে আমার কাছে ফিরে এল যখন মা একদিন বহু পুরনো একটা সাদা-কালো ছবি আমার মুখের সামনে ধরে বলল, তোর বাবার বাচ্চা-বয়সের ছবি। ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে খুঁজে পেলাম। কুটুসের সাথে মুখের কী মিল দ্যাখ! 

 ষাটবছর আগেকার একেবারে ধূসর হয়ে যাওয়া একটা ছবি। পাটপাট করে চুল আঁচড়ানো একটা বাচ্চার ওই ছবিটার সঙ্গে সত্যিই কি কোনও মিল আছে আজকের কুটুসের? ছবিটার বাচ্চার যা বয়স কুটুসেরও প্রায় তাই, এটা ছাড়া আর তেমন কোনও মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন কারণ জায়গায় জায়গায় ছোপ ধরা ওই ছবিটা দেখে বিশেষ কিছু বোঝাই যায় না।তবু ক্রমাগত বলে গেলে গল্পের ঠাকুরমশাইও যেমন মেনে নেন যে তাঁর কাঁধে ছাগল নয় কুকুর রয়েছে, আমারও তেমনই মনে হতে শুরু করল যে সত্যিই অনেক মিল, আমাকে জন্ম দেওয়া লোকটার সঙ্গে আমার ছেলের। পিতৃহৃদয় থাকুক না থাকুক, বাবা তো বাবাই। আর আমার বাবা, আমার ছেলের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হবে না তো কার মধ্যে দিয়ে হবে? 

-কে জানে বেঁচে আছে কি না লোকটা? থাকলে কেমন আছে?  মা বিড়বিড় করল। 

প্রশ্নটা আমার ভিতরে একটা গহ্বর খুঁড়ে ফেলল সহসা। সেই ঘটনা-দুর্ঘটনা পেরিয়ে আদৌ কি বেঁচে রয়েছে লোকটা? কিন্তু মরার খবরও তো পাইনি। এতদিন পর না বেঁচে থাকার সম্ভাবনাই প্রবল কিন্তু বেঁচে যদি থাকে তবে কোথায় আছে?

সেই প্রশ্নের ঠেলায় আমি বহু-বহুদিন পর আমার শৈশবের পাড়ায় ফিরে গেলাম, স্রেফ একটা খবরের জন্য। আছে? 

সময় নিজে প্রবলভাবে থাকে বলেই, বাকি সব ‘থাকা’গুলো ‘নেই’ হয়ে যায় পলকে। আমাদের বাড়িটাকেই তাই খুঁজে পেলাম না আর। কিন্তু গেল কোথায়? ওই তো সেই বটগাছটা যার নিচে আমিও ঘুমিয়েছি। একটা বেদি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে এখন গাছটাকে ঘিরে। একটু এগোলেই যে জোড়া কৃষ্ণচূড়া ছিল, তারা অবশ্য উধাও। ডানদিকে বাঁক নিলেই একটা নবগ্রহ মন্দির ছিল মঞ্জুমাসিমাদের একতলায় কিন্তু সেই বাড়িটাই পাঁচতলা ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। চার পা এগোলে একটা হনুমান মন্দির হয়েছে, এটা নতুন। মঙ্গলবার বলেই হয়তো, প্রচুর ভিড় তার সামনে। সেই ভিড়ের একজনকেই আমি আমার বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞেস করলাম। সে কিছু বলতে না পারায়, একটু বয়স্ক একজন লোককে।

-বোসদের পুরো ফ্যামিলিটাই কীরকম কপ্পুরের মতো ভ্যানিশ করে গেল। লোকটা আমার বাবার নাম শুনে বলল। 

-ফ্যামিলির সবাই? কেউ থাকত না বাড়িতে?

-বউ আর ছেলেটা কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল। মরে-ফরে গেসল বোধহয়। লোকটা আবার বিয়েও করেছিল শুনেছি। কিন্তু সেই বউকে দেখিনি। আর কেউ দেখেছে বলেও শুনিনি।যাকেই জিজ্ঞেস করতাম, সেই বলত যে শুনেছে। ঘর থেকে গভীর রাতে চপল বোসেরই আওয়াজ ভেসে আসত। তারপর একদিন বন্ধ হয়ে গেল আওয়াজটা। কোথায় যে বিবাগী হয়ে গেল চপল বোস… 

আমি ততক্ষণে জয়রাম রক্ষিতকে চিনে ফেলেছি। অনেক পেয়ারা চুরি করেছি ওর বাড়ির বাগান থেকে। একবার ধরা পড়ে কানমলাও খেয়েছিলাম। অথচ এখন আমার সামনে দাঁড়িয়েও আমাকে চিনতে পারছে না বুড়ো। 

আমিও আমার বাড়ির সামনে দিয়ে দু’বার ঘুরে গেলেও বাড়িটা চিনতে পারিনি। কীভাবে পারব? আমাদের পাশের দাশগুপ্তদের বাড়ি আর আমাদেরটা মিলিয়ে বেশ একটা পেল্লাই চারতলা ফ্ল্যাট হয়েছে আর তার গ্রাউন্ড ফ্লোরের সামনের অংশটা নিয়ে একটা চাইনিজ হোটেল। 

চাইনিজ হোটেল? এই গলির ভিতরে? ভিতরে ঢুকে স্যুপ আর এক প্লেট চিলি ফিশ অর্ডার করে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম যে দোকানটা চলে কি না। 

-সন্ধে সাতটা তো এখন, আর একঘণ্টা পরে এলে বসার চেয়ার পাবেন না হয়তো। যে ছেলেটা অর্ডার নিল, সেই সার্ভ করতে করতে বলল। 

মাছটা ভাল হলেও, স্যুপটা জমাতে পারেনি। বেশি ঝাল। খারাপ লাগছিল না আমার অবশ্য। জিভে ঘোরাচ্ছিলাম, গিলে ফেলবার আগে। ঘোরাচ্ছিলাম বাঁধাকপির পাতা, লেটুস, লঙ্কার গুঁড়ো, তুলি আর আমার শৈশবের লাল সিমেন্টের মেঝে, রাতে খেতে বসার জন্য মায়ের ডাক। 

হারিয়ে যা যায়, একেবারেই যায়?   


(ক্রমশ...)

পড়তে থাকুন

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী
কবিতার পাতা - ১কবিতার পাতা - ২গল্পরম্য রচনা প্রবন্ধবিবিধ
  • প্রথম পাতা
  • Privacy Policy
  • Terms and Conditions

আক্ষরিক

82748 38787

Copyright © 2026 আক্ষরিক - All Rights Reserved.

Powered by GoDaddy

This website uses cookies.

We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.

Accept